Empty Vessel Sounds Much… Our Railway Minister…

 

টেবিল চাপড়ানোর পর এবার কপাল চাপড়ানোর পালা

নিজস্ব প্রতিনিধি

        কলকাতা, ২৫শে ফেব্রুয়ারি— আগের দু’বার মমতা ব্যানার্জির রেল বাজেট দেখে বিশেষ করে বাংলার যাঁরা টেবিল চাপড়েছিলেন, এবার তাঁদের কপাল চাপড়ানোর পালা।

        সবাই যে টেবিল চাপড়েছিলেন, তা নয়। ২০০৯ সালে যেমন মমতা ব্যানার্জির রেল বাজেট পেশের পর যখন দেখা গেলো, তার আগে ঘোষণা হওয়া সত্ত্বেও দু’শোরও বেশি প্রকল্প অর্থের অভাবে তখনও কার্যকর করা যায়নি, তারপরেও আরও নতুন নতুন প্রকল্প ঘোষণা, রেল বোর্ডের প্রাক্তন সদস্য এস বি ঘোষদস্তিদার বলেছিলেন, ‘রেল লাইন এখন পরিবহন ক্ষমতার চূড়ান্ত সীমায় পৌঁছে গিয়েছে। স্যাচুরে‍‌টেড জায়গায়। রেল কাঠামোর আমূল পরিবর্তন ছাড়া বাড়তি বোঝা নেওয়ার সুযোগ নেই। আর সেই পরিবর্তন করতে গেলে চাই বিপুল অর্থ।’ এবারে রেলমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির বাজেট দেখে রেল বোর্ডের আরেক প্রাক্তন সদস্য সুভাষ ঠাকুর যেমন বলেছেন, ‘…দেখুন বাসন্তীতে রেল হবে, তা কলকাতায় বসে ভাবতে ভালোই লাগে। করতে পারলে তো ভালোই। কিন্তু বাস্তব কি আদৌ করতে পারবে?’

        রেলমন্ত্রী হিসাবে মমতা ব্যানার্জি যা-ই ঘোষণা করুন, বাস্তব যে তা নয়, সেই সত্যটাকেই চোখে আঙুল দিয়ে মানুষকে দেখিয়ে দেবার সময় এবার উপস্থিত হয়েছে। ২০০৯ সালের জুলাই মাসে ও ২০১০ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে এর আগে পর পর দুটো রেল বাজেট পেশ করেছিলেন মমতা ব্যানার্জি। কী বলেছিলেন তখন, এখন কী অবস্থা, তা বোঝাবার জন্য একটা উদাহরণ তুলে দেওয়া যেতে পারে শুক্রবার মমতা ব্যানার্জি তৃতীয় যে রেল বাজেট পেশ করলেন, সেই ভাষণ থেকেই। মমতা ব্যানার্জি বললেন, ‘‘এর আগে আমি বেশ কিছু স্টেশনকে ‘বিশ্বমানের স্টেশন’ করা হবে বলে ঘোষণা করেছিলাম। কিন্তু দেখছি, তাতে অনেক সমস্যা রয়েছে। আন্তর্জাতিক যেসব কনসালটেন্সি সংস্থা আছে, তাদেরও ফি অত্যন্ত বেশি। আরও সমস্যা। তাই কাজ হচ্ছে না।’’ অথচ ২০১০ সালেও তিনি আগের বছরের ৫০টি’র সঙ্গে আরও ১৩টি স্টেশনের নাম ঘোষণা করেছিলেন বিশ্বমানের করবেন বলে!

        একথা শুনে প্রশ্ন তো উঠবেই, তাহলে কি এর আগে দু’দুটো বাজেটে সব কিছু খতিয়ে না দেখেই টেবিল চাপড়ানো শুনতে এমন ঘোষণা করেছিলেন? কী বলেছিলেন? সেই ২০০৯ সালের জুলাই মাসে বলেছিলেন, ‘আমরা দেশে ৫০টি স্টেশনকে বিশ্বমানের স্টেশন বানাবো। তাতে থাকবে আন্তর্জাতিক মানের সব সুযোগ-সুবিধা ও পরিষেবা। এগুলি বানানো হবে পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপ বা পি পি পি মডেলে।’ মোট ৫০টি স্টেশনের নাম জানিয়েছিলেন মমতা। তার মধ্যে ‘বাংলার জন্য’ ছিলো হাওড়া, শিয়ালদহ, কলকাতা, নিউজলপাইগুড়ি ও মাঝেরহাট স্টেশনের নাম! ২০১১ সালে এসে মমতা জানালেন, হবে না। সমস্যা আছে!

        সেই ২০০৯ সালেই মমতা বলেছিলেন ৩৭৫টি স্টেশনকে ‘আদর্শ স্টেশন’ বানানো হবে। আদর্শ স্টেশন মানে ‘পর্যাপ্ত পানীয় জল, পর্যাপ্ত ও স্বাস্থ্যকর শৌচাগার, খাওয়া-দাওয়ার উপযুক্ত ব্যবস্থা, ওয়েটিং রুম, মহিলা যাত্রীদের জন্য ডর্মিটরির সুবিধাসহ আনুষঙ্গিক সবরকম সুযোগ-সুবিধা’’। মমতাই সেই সংবাদ শুনিয়েছিলেন। ৩৭৫টির মধ্যে শ’তিনেক ছিলো ‘বাংলার জন্য’! তাতে ‘নানুর’ স্টেশনের নামও ছিলো। যদিও নানুর নামে কোনো স্টেশন নেই। যাই হোক। কেমন হয়েছে দু’বছরে ‘আদর্শ স্টেশন’? ধরুন কামারকুণ্ডু স্টেশনের কথা। বারো বগির ট্রেন দাঁড়ালে এই স্টেশনে চালককে দু’বার ট্রেন দাঁড় করাতে হয়! প্রথমে ৩০ সেকেন্ড দাঁড়ায়। তখন পেছনের দুটো কামরার যাত্রীরা প্ল্যাটফর্ম পান না। প্ল্যাটফর্ম তো ছোট! তারপর ট্রেন আরও একটু এগিয়ে দাঁড়ায়। যাতে পেছনের দুই কামরার যাত্রীরা নামতে পারেন। অতঃপর ট্রেনটি প্ল্যাটফর্ম ছাড়ে ‘আদর্শ স্টেশন’ থেকে! রঙচঙে অবশ্য খামতি নেই!

        ২০০৯ সালেই ৫০টি স্টেশনে মালটি ফাংশনাল কমপ্লেক্স বানানোর কথা বলেছিলেন রেলমন্ত্রী তার বাজেট ভাষণে। সেই বস্তুটা কী? যেমন স্টেশন চত্বরে যাত্রীদের জন্য শপিং কমপ্লেক্স, ফুড স্টল, রেস্তোরাঁ, বুক স্টল, ফোন বুথ, ওষুধ ও স্টেশনারি দোকান, হোটেল, ভূগর্ভস্থ পার্কিং ইত্যাদি থাকবে। কাজ করবে ইরকন এবং আর এল ডি এ। সেই ৫০টি স্টেশনের তালিকায় ‘বাংলার জন্য’ ছিলো, আলিপুরদুয়ার, দার্জিলিঙ, দীঘা, সাগর ও তারাপীঠ। দু’বছরে কোথাও কিছু হয়েছে? শিলা পোঁতাও কি হয়েছে? ২০১০ সালের বাজেটে এর আওতায় আরও ৯৩টি স্টেশনকে আনার কথা বলেছিলেন মমতা। গোটা দেশে তিনটি ছাড়া আর কোথাও কিছু হয়নি। এরাজ্যে তো নয়ই!

        ২০০৯ সালেই ৭ খানা নার্সিং কলেজ গড়ে তোলার কথা বলেছিলো রেল। কলকাতায় নাকি হবে একটা। কী অবস্থা সেই ঘোষণার? কোনও খোঁজ নেই। বারাসত, খড়্গপুর, বি আর সিং হাসপাতালে রেলের মেডিক্যাল কলেজ গড়ার ঘোষণা ছিলো রেল পরিবারের ছেলেমেয়েদের জন্য। কোনো খোঁজ নেই দু’বছরেও।

        ২০০৯ সালেই মমতার ঘোষণা ছিলো, নন্দীগ্রাম থেকে সিঙ্গুর নতুন রেলপথ হবে। দু’বছরে এক ইঞ্চিও রেলপথ পাতা হয়নি। মজার ব্যাপার দেখুন, শুক্রবার তিনি এবারের রেল বাজেটে, মানে তৃতীয় রেল বাজেটে বলেছেন, ‘ভাদুতলা থেকে লালগড় হয়ে ঝাড়গ্রাম পর্যন্ত রেলপথ বানানো হবে। তার কী হলো, সেটা না জানিয়ে পুরানো ঘোষণাটাই ফের এবার নতুন করে! শুধু ‘শালবনী’ নাম পালটে ‘ভাদুতলা’ বললেন এবার! কিন্তু যাঁরা জানেন, তাঁরা তো জানেনই যে, ভাদুতলাটা শালবনীতেই! সেই ২০০৯ সালেই তিনি ডানকুনি-ফুরফুরা শরিফ রেলপথ বানানোর কথা বলেছিলেন। দু’বছরে জমি পর্যন্ত জোগাড় হয়নি। বরং ‘রেলকে জমি দিলে চাকরি মিলবে’ ঘোষণা করে বিপদে পড়েছেন। চাকরি যে মিলবে, সরকারীভাবে এদিনও বাজেটে ঘোষণা করলেন না মমতা। মানুষ কেন তাহলে বিশ্বাস করবেন? ২০০৯ সালেই আদ্রায় বিদ্যুৎ প্রকল্পের ঘোষণা করেছিলেন মমতা। দু’বছরে শুধু শিলা পুঁততে পেরেছেন। এন টি পি সি’র সঙ্গে কাজ করবেন বলে ঘোষণা করেছেন। কাজ এগিয়েছে কতটা? ওইটুকুই! যে কাঁচড়াপাড়ায় রেলের প্রকল্প এখন টাকার অভাবে ও প্রাইভেট পার্টনারশিপের অভাবে স্থগিত রেখেছে রেল, যেখানে এখন শুধুই জলা আর জমি, দু’বার শিলা পোঁতা হয়েছে সেখানে, তা বিলকুল চেপে গিয়ে মমতা এবার ব‍‌লেছেন, ‘কাঁচড়াপাড়ার প্রোজেক্ট অন প্রসেস’। সেই কাঁচড়াপাড়ার ঘোষণাও মমতা করেছিলেন সেই ২০০৯ সালেই। ২০০৯ সালেই রেলের ১২৪টি প্রকল্পের কাজ বাকি ছিলো। সেসব বিচার না করে, মমতা সেবার বসুমতী অধিগ্রহণের কথা বলেছিলেন। এখন আর বসুমতীর নামও নেন না। ২০০৯ সালেই দীঘা-জলেশ্বর, হাসনাবাদ-হিঙ্গলগঞ্জ, তারকেশ্বর-মগরাসহ বিভিন্ন রেলপথ বাজেটে সংযোজিত হয়েছিলো। কাজ কতদূর? কেউ জানেন না।

        ২০১০ সালে আরও প্রতিশ্রুতির ফুলঝুরি ছুটিয়েছিলেন মমতা। ‘পারমাণবিক শক্তি কেন্দ্র’ ছাড়া আর প্রায় সবকিছু রেলই করতে পারবে বলে ভাব দেখিয়ে হাসপাতাল থেকে শুরু করে স্পোর্টস আকাদেমি সবই গড়ার ঘোষণা ছিলো। কলকাতায় স্পোর্টস আকাদেমি, পশ্চিমবঙ্গের আলিপুরদুয়ার থেকে শুরু করে লালগড় পর্যন্ত ২৭টি রেল স্টেশনে (যদিও লালগড় নামে কোনো স্টেশন নেই) ‘নতুন আউটডোর হাসপাতাল ও ডায়গনোস্টিক সেন্টার’, শিলিগুড়ি থেকে শুরু করে সিউড়ি পর্যন্ত ২৫টি স্টেশন ‘জেনারেল স্পেশালিটি হাসপাতাল’ ১৬টি স্টেশনে ‘মালটি স্পেশালিটি হাসপাতাল’ গড়ার ঘোষণা ছিলো। এবারের বাজেটে সেইসব কাজ কোথায় কী এগোলো, তার কোনও উল্লেখ নেই। আদতে কিছুই হয়নি। ২০১০ সালেই সাঁকরাইলে ডি এম ইউ কারখানা থেকে শুরু করে নিউ জলপাইগুড়িতে এক্সেল কারখানা, ৭টি কারখানার ঘোষণা ছিলো ‘বাংলার জন্য’! শুধুই শিলা পুঁতেছেন রেলমন্ত্রী। আর সাঁকরাইলে তো তাঁর দল তৃণমূলীরাই কারখানা করতে দেয়নি। কেন না জমির বিনিময়ে রেলে চাকরি দেওয়ার মৌখিক প্রতিশ্রুতিকে সরকারী ঘোষণা করেনি রেল! মেট্রো রেল যে নিউ টাউনের উপর দিয়ে যাবে, তার শিলা পোঁতা হলে কী হবে, হিডকো কর্তৃপক্ষ ডিটেলস প্রোজেক্ট রিপোর্ট চেয়েছিলো, তা হয়নি বলে আজও দিতে পারেনি রেল! ফ্রেট করিডরের পূর্ব প্রান্তে শুধু শিলা পোঁতা ডানকুনিতে!

        তাহলে সব মিলিয়ে গত দু’বারের রেল বাজেট থেকে পুরানো কামরা আর ইঞ্জিন লাগিয়ে নতুন ট্রেন ছাড়া পশ্চিমবঙ্গে প্রাপ্তি এই দু’বছরে কী?

        শুধুই পি পি পি অর্থাৎ পাথর পোঁতা পার্টি।

Advertisements

Tags: , , , , ,

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s


%d bloggers like this: