WikiLeaks Unearth The Scam Behind Confidence Vote in 2008… আস্থা ভোটের কেলেঙ্কারি ফাঁস

 

astha-vote

আস্থা ভোটের কেলেঙ্কারি ফাঁস

নিজস্ব প্রতিনিধি
টাকা দিয়েই জিতেছিলেন মনমোহন

    নয়াদিল্লি, ১৭ই মার্চ – সরকার বাঁচাতে টাকা দিয়ে ভোট কিনেছিল কংগ্রেস। ২০০৮সালের আস্থা ভোটের ঠিক আগে দিল্লির মার্কিন দূতাবাসে টাকা লেনদেন নিয়ে আলোচনাও হয়েছিল। দূতাবাসের আধিকারিকদের গোপন নোটে উল্লেখও ছিল মারাত্মক সেই তথ্যের। ‘উইকিলিকস’-এ ফাঁস হওয়া নথিতেই তা ধরা পড়ে গিয়েছে। বৃহস্পতিবার, এই ঘটনায় তোলপাড় হয়ে অচল হয়ে গিয়েছে সংসদ।

    ২০০৮-এ বামপন্থীরা ইউ পি এ-১ সরকারের ওপর থেকে সমর্থন তুলে নিয়েছিলেন। কারণ, ভারত-মার্কিন পরমাণু সমঝোতায় দেশের সার্বভৌমত্ব অটুট রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়েও তা পালন করেননি প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং। সেই অবস্থাতেই ওই বছরের ২২শে জুলাই লোকসভায় আস্থা ভোট নিতে হয় সরকারকে। ২১শে জুলাই পেশ হয় আস্থা প্রস্তাব। ওই অধিবেশনেই সরাসরি টাকার বিনিময়ে আস্থা কেনার অভিযোগ ওঠে। বি জে পি’র দুই সাংসদ লোকসভায় টাকাভরা ব্যাগ তুলে ধরে বলেছিলেন, ভোটদান থেকে বিরত থাকার জন্য তিন কোটি টাকা দেওয়া হয় তাঁদের। বস্তুত, অসততার সাক্ষ্য বয়ে আস্থা ভোটে সরকার রেখেছিল ইউ পি এ।

    ‘দ্য হিন্দু’ ধারাবাহিকভাবে ভারতে মার্কিন দূতাবাস থেকে পাঠানো কেব্‌ল, যা ‘উইকিলিকস’-এ ফাঁস হয়েছে, প্রকাশ করতে শুরু করেছে। প্রথম ধাপে সেই কেব্‌ল দেখিয়েছে, মার্কিনী ইশারায় পেট্রোলিয়ামমন্ত্রক কেড়ে নেওয়া হয়েছিল মণিশঙ্কর আইয়ারের হাত থেকে। বৃহস্পতিবার, ফাঁস হওয়া নথিতে ধরা পড়েছে, কংগ্রেসের এক রাজ্যসভার সদস্য মার্কিন দূতাবাসের এক আধিকারিকের সঙ্গে আস্থা ভোটের পাঁচদিন আগে খোলাখুলি সরকারের কৌশল নিয়ে আলোচনা করেছেন। কেবল তা-ই নয়, সাংসদ কিনতে কত টাকা তৈরি, তা আবার বাক্স খুলে মার্কিন আধিকারিককে দেখিয়েছেন ওই কংগ্রেস সাংসদ সতীশ শর্মার এক অনুগামী। সতীশ শর্মা গান্ধী পরিবারের ঘনিষ্ঠ বলেই পরিচিত। সোনিয়া গান্ধী নিজেই যে পরমাণু সমঝোতা চূড়ান্ত করতে প্রবল আন্তরিক, মার্কিন আধিকারিকদের তা বোঝাতে আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়েছেন শর্মা।

    বামপন্থীরা সমর্থন প্রত্যাহারের পর সংখ্যার হিসেবে সরকার টিকে থাকার কথা ছিল না। কিন্তু, সরকার টিকে গিয়েছিল সামান্য ব্যবধানে। বিরোধী দলে থাকা বারোজন সাংসদ সরকারের পক্ষে ভোট দিয়েছিলেন। রহস্যজনকভাবে অনুপস্থিত ছিলেন দশজন সাংসদ। যার অন্যতম তৃণমূল কংগ্রেস প্রধান ও বর্তমান রেলমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি। দেখা যাচ্ছে, আস্থা ভোটে ফলাফল কি হবে তা প্রায় আগাম মিলিয়ে দিয়েছিল মার্কিন দূতাবাস। কংগ্রেসের হাত দেশকে কতটা সুরক্ষা দিয়েছে, তারও প্রমাণ ওই নথি। মার্কিন দূতাবাসের অনুমান ছিলো, ১৯জন সাংসদ ভোট দেবেন না। তার কাছাকাছি, ১০জন সাংসদ ভোট দেননি। অনুমান ছিলো, সরকারের পক্ষে পড়বে ২৭৩ভোট, বিপক্ষে পড়বে ২৫১ ভোট। ফলাফল ছিলো, পক্ষে ২৭৫ভোট, বিপক্ষে ২৫৬ভোট। মার্কিন দূতাবাসের আগাম অনুমানের চরিত্র বুঝিয়ে দিচ্ছে ভারতের সরকার এবং রাজনৈতিক মহলের কর্তাদের সঙ্গে স্ট্র্যাটেজিক সঙ্গীর নিবিড় যোগাযোগও।

    উল্লেখ্য, ‘উইকিলিকস’-এ বিভিন্ন দেশে মার্কিন নীতি সংক্রান্ত তথ্য ফাঁস হচ্ছে বেশ কিছুদিন ধরেই। তার বিরুদ্ধে কড়া প্রতিক্রিয়াও জারি করেছে মার্কিন প্রশাসন। কিন্ত, এই তথ্য বেঠিক, কোনও ক্ষেত্রেই তা বলেনি মার্কিন প্রশাসন। সব ক্ষেত্রেই বিভিন্ন দেশে মার্কিন দূতাবাস থেকে সদর দপ্তরে যে অভ্যন্তরীণ রিপোর্ট পাঠানো হয়েছে, তা-ই ফাঁস করা হয়েছে। বস্তুত, আজও ভারত সরকারের তরফ থেকে প্রকাশিত খবর অসত্য এমন দাবি করা হয়নি। ‘সরকার খবর স্বীকার-অস্বীকার কোনোটাই করছে না’, এই হলো সরকারীভাবে জানানো অবস্থান।

কী বলা হয়েছে ‘উইকিলিকস’-র নথিতে

    সতীশ শর্মা দূতাবাসে গিয়েছিলেন ২০০৮’র ১৬ই জুলাই। সেখানে তিনি জানান, আস্থা ভোটে জিততে কংগ্রেস পার্টি ঝাঁপিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী এবং আরও কয়েকজন সন্ত চাটওয়াল নামে এক অনাবাসী ভারতীয় ব্যবসায়ীর মাধ্যমে অকালি দলের ৮সাংসদকে কেনার চেষ্টা করা হয়েছে। যদিও তা সফল হয়নি। শিবসেনার ১২জন সাংসদকেও ভোটদানে বিরত করার চেষ্টা চলছে। এই সন্ত চাটওয়ালকে ২০১০’র ২৬শে জানুয়ারি পদ্মশ্রী দেয় ইউ পি এ সরকার। কানাডার এই হোটেল ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে অতীতে জালিয়াতির অভিযোগে চার্জশিট দাখিল করেছিল সি বি আই।

    বিরোধী জোট এন ডি এ-তে থাকা ন্যাশানাল কনফারেন্স নেতা ওমর আবদুল্লাকে সমঝোতার পক্ষে আনতে চেষ্টা চালাচ্ছেন কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী।

    সতীশ শর্মার সহযোগী নচিকেতা কাপুরের সঙ্গেও কথা হয় মার্কিন আধিকারিকদের। দূতাবাসে গিয়ে ওই কাপুর টাকাভর্তি দুটি বাক্সও দেখান। মার্কিন কূটনীতিকদের মতে তারমধ্যে ছিল প্রায় ৫০-৬০কোটি টাকা। কাপুর বলেন, আর এল ডি’র চার সাংসদকে কিনতে মাথাপিছু ১০কোটি টাকা দেওয়া হয়েছে। কাপুর মার্কিন আধিকারিকদের আশ্বস্ত করতে বলেন, টাকাটা বড় কথা নয়। টাকা নিয়ে আবার কেউ বিপক্ষে ভোট না দেয় চিন্তা তা নিয়েই।

    কংগ্রেসের আরেক নেতা জানিয়েছিলেন, ঘুষ দিতে নেমেছেন দলের আরেক নেতা ও সেই সময় কেন্দ্রীয় শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রী কমলনাথ। ওই নেতার মন্তব্য, আগে কমলনাথ ঘুষ হিসেবে ছোট বিমান দিতে পারতেন। এখন জেট বিমান পর্যন্ত দিতে প্রস্তুত।

সংসদে টাকার ব্যাগ

    ২২শে জুলাই আস্থা ভোট নিয়ে আলোচনার মাঝে বি জে পি সাংসদ অশোক অর্গল, ফগন সিং কুলস্তে এবং এস ভাগোর টাকা ভর্তি ব্যাগ নিয়ে লোকসভায় ঢুকে পড়েন। ব্যাগ খুলতেই বেরিয়ে পড়ে নোটের তোড়া। অচল হয়ে পড়ে সভা। তিনজন লোকসভায় জানান, আস্থা ভোটে অংশ না নেওয়ার জন্য টাকা পাঠিয়েছে সরকারপক্ষ। সমাজবাদী নেতা অমর সিং এবং কংগ্রেস সভানেত্রীর রাজনৈতিক সচিব আহমেদ প্যাটেল এর কারিগর।

    আস্থা ভোটের আগে সমাজবাদী পার্টির সঙ্গে বোঝাপড়া হয় কংগ্রেসের। টিভি চ্যানেল সি এন এন-আই বি এন গোপন ক্যামেরায় ছবি তোলে টাকা লেনদেনের। অমর সিংয়ের ঘনিষ্ঠ সহযোগী সঞ্জীব সাক্সেনা বি জে পি সাংসদের সঙ্গে দেখা করেন। টাকার ব্যাগ নিয়েছিলেন তাঁর গাড়ির চালক। ওই গাড়িতে সাংসদদের নিয়ে যাওয়া হয় অমর সিংয়ের বাড়িতে। সমাজবাদী পার্টির অপর সাংসদ রেবতীরমণ সিংও ছিলেন আলোচনায়।

    ওই অভিযোগের তদন্তে সংসদীয় কমিটি গড়েন লোকসভা স্পিকার সোমনাথ চ্যাটার্জি। সেই কমিটির চেয়ারম্যান করা হয় কংগ্রেস সাংসদ কিশোর চন্দ্র দেও-কে। টিভি চ্যানেলের সিডিও দেখা হয়। কিন্তু, অন্য কক্ষ (রাজ্যসভা)-র সদস্য বলে সাক্ষ্য গ্রহণে ডাকা হয়নি অমর সিংকে। কমিটি রিপোর্ট দিতে গিয়ে জানায় যে অমর সিং এবং আহমেদ প্যাটেলকে দায়ী করার মতো প্রমাণ মেলেনি। যদিও, সেই বক্তব্যে একমত হননি কমিটির সদস্য সি পি আই (এম) সাংসদ মহম্মদ সেলিম এবং বি জে পি সাংসদ বিজয় মালহোত্রা। সেলিম কমিটি রিপোর্টে অসম্মতি জানিয়ে চিঠিও দেন। কমিটি রিপোর্টটি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রকে পাঠিয়ে দেন অধ্যক্ষ। রিপোর্টটি আজও প্রকাশ করেনি সরকার।

ফৌজদারি তদন্তের কথা ছিলো

    ওই তদন্ত কমিটির প্রধান কিশোর চন্দ্র দেও জানিয়েছেন, রিপোর্টে নিরপেক্ষ সংস্থাকে দিয়ে তদন্ত চালানোর কথা বলা হয়েছিল। জানা গিয়েছে, অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি অপরাধের মামলা দায়ের করার প্রস্তাবও ছিল। দেও বলেছেন, রিপোর্টে বলা হয়েছিল যে তদন্তের প্রয়োজন ফুরিয়ে গিয়েছে তা নয়। টিভি ক্যামেরার টেপে যা পাওয়া গিয়েছিল কেবল তার ভিত্তিতে রিপোর্ট দেওয়া হয়।

    সতীশ শর্মা এদিন বলেন, নচিকেতা কাপুর বলে তাঁর কোনো সঙ্গী নেই। আর কাপুর বলেছেন, মার্কিন দূতাবাসের কোনো আধিকারিকের সঙ্গে তাঁর কোনো বৈঠকই হয়নি। কিন্তু, ‘হিন্দু’ পত্রিকার সাংবাদিক সিদ্ধার্থ বরদারাজন জানাচ্ছেন যে, ২০০৮সালে আস্থা ভোট মিটে যাওয়ার পর মার্কিন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে সেদেশের বিদেশ দপ্তরের সুপারিশে কাপুরকে পর্যবেক্ষক হিসেবে ওই দেশে নিয়ে যাওয়া হয়। কাপুর আবার মন্তব্য করেছিলেন, আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের ডেকে নেওয়া মার্কিন সমাজের উদার ও গণতান্ত্রিক মনোভাবের প্রতিফলন! প্রশ্ন হল, যদি যোগাযোগই না থাকে তা’হলে ‘কেউ চেনে না, কেউ জানে না’ নচিকেতা কাপুর ওই দায়িত্ব পেলেন কীভাবে?

    এদিনের ঘটনায় দুটি বিষয় ফের পরিষ্কার। এক, আস্থা ভোটে নৈতিকতা খোয়ানো ইউ পি এ দ্বিতীয় দফায় সরকার চালাতে গিয়ে একের পর এক কেলেঙ্কারির পথ খুলে দিয়েছে। দুই, বামপন্থীদের তোলা অভিযোগ ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা হলেও তা ফের উঠে আসছেই।

Advertisements

Tags: , ,

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s


%d bloggers like this: