Mamata’s Hidden Agenda… মুখোশের অন্তরালে মমতা…

 

মুখোশ ছেড়ে বেরিয়ে এলো মুখ,

ইউনিয়ন ভাঙা, বন্‌ধ নিষিদ্ধ করার হুমকি দিলেন মমতা

    কলকাতা, ২৫শে এপ্রিল — মুখোশ খুলে গেল। পয়লা মে’র বাকি যখন আর পাঁচদিন, কাকতালীয় হোক বা না-হোক, তৃণমূল নেত্রী মমতা ব্যানার্জির স্বরূপ বেরিয়ে পড়লো। রবিবার তৃণমূলের চ্যানেল স্টার আনন্দে বসে মমতা ব্যানার্জি বলে দিয়েছেন, এরাজ্যে ক্ষমতায় এলে তিনি বন্‌ধ-সভা নিষিদ্ধ করে দেবেন। কাজের ক্ষেত্রে তিনি যে শ্রমিক-কর্মচারীদের ইউনিয়নের প্রস্তাবও মানবেন না, তা জানিয়ে মমতা ব্যানার্জি বলে দিয়েছেন, ‘ইউনিয়ন আসে-যায়। ওসব ইউনিয়ন আমি অনেক দেখেছি। …একদিনে ইউনিয়ন ভেঙে যাবে . .।’

    তৃণমূল নেত্রীর এই কথা যে দেশের বড়লোক কর্পোরেট কর্তা মালিকদেরই কথা, তাতে কোনও সন্দেহ নেই। বস্তুত, মমতা ব্যানার্জির এমন মন্তব্যে স্পষ্ট হয়ে গেল, কেন সংসদে কেন্দ্রের কংগ্রেস-তৃণমূল জোট সরকার ব্যাঙ্ক-বীমার মতো গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাকে বেসরকারী হাতে বেচে দেওয়া কিংবা শ্রমিক-কর্মচারীদের পেনশনের টাকা শেয়ার বাজারে ফাটকা খেলার জন্য ব্যবহারের বিল আনলেও তৃণমূল কোনও প্রতিবাদ করেনি। বরং সংসদে উপস্থিত তৃণমূল সাংসদরা শ্রমিক-কর্মচারী তথা দেশের সাধারণ মানুষের স্বার্থবিরোধী ওইসব ব্যবস্থাপনার সমর্থনেই ভোট দিয়েছেন কংগ্রেস এবং বি জে পি-র সঙ্গে মিলেমিশে।

    আরো বোঝা গেল, দেশের কর্পোরেট লবিকে কোটি কোটি টাকা কর ছাড় দিলেও কেন্দ্রীয় সরকার সাধারণ মানুষের রেশন ব্যবস্থায় ভরতুকির জন্য সামান্য টাকা বরাদ্দ না করলেও তৃণমূল কেন চুপ করে থাকে। ঘটনা হলো, কেন্দ্রের শাসকগোষ্ঠী যেভাবে চায়, সেই ভয়ঙ্কর সর্বনাশা আর্থিক নীতি এরাজ্যে বামফ্রন্ট সরকার থাকায় কার্যকর করা যাচ্ছে না, তাই বামফ্রন্টকে সরিয়ে তৃণমূলকে ক্ষমতায় আনতে চায় দে‍‌শের শাসকগোষ্ঠী। তৃণমূল নেত্রী এবার যেভাবে বন্‌ধ বা সভাকে নিষিদ্ধ করার কথা ঘোষণা করলেন, তাতে দেশের শাসকগোষ্ঠীর সেই চাহিদাই আরো জোর পেল বলে মনে করা হচ্ছে।

    তৃণমূল যে নির্বাচনী ইশ্‌তেহার পেশ করেছে, তাতে কিন্তু কোথাও ক্ষমতায় এলে বন্‌ধ বা সভা নিষিদ্ধ করার কোনও প্রস্তাব তারা লেখেনি। কিন্তু যেভাবে মমতা ব্যানার্জি তৃণমূলী টিভি চ্যানেলেই বসে বন্‌ধ ও সভা নিষিদ্ধ করার কথা খোলাখুলি ঘোষণা করেছেন রবিবার, তাতে মুখে মা-মাটি-মানুষের কথা বলা তৃণমূলের কাজে ‘হিডেন অ্যাজেন্ডা’ই এবার প্রকাশিত হয়ে পড়ল।

    নিজে অযৌক্তিকভাবে যখন তখন বন্‌ধ বা ধর্মঘট করলেও, রাস্তা বন্ধ করে কখনও ধর্মতলায়, কখনও মেয়ো রোড, কখনও শ্যামবাজার মোড় অবরোধ ক‍‌রে সভা করলেও, মমতা ব্যানার্জি রবিবার বলেছেন, তিনি ক্ষমতায় এলে সভা করা যাবে শুধু শহীদ মিনারের ময়দানে। ১৫ দিন আগে নাকি আবেদন করতে হবে। আগে এলে আগে পাবেন ভিত্তিতে নাকি অনুমোদন দেওয়া হবে। যে টিভি চ্যানেলে তিনি সভা-সমাবেশের প্রশ্নে এমন বিধিনিষেধের শর্ত চাপাবেন বলে শুনিয়েছেন, সেই চ্যানেলেই একই সময়ে তিনি বলেছেন, ক্ষমতায় এলে তার সরকার নাকি শপথ গ্রহণ করবে ব্রিগেড ময়দানে। কিন্তু এর চেয়েও তার মুখে যে তাৎপর্যপূর্ণ কথা দেশের মালিক-কর্পোরেট কর্তাদের খুশি করবে, তা হলো, মমতা বলেছেন, ‘আন্দোলন কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হয় আমি জানি।’

    তৃণমূল নেত্রী অবশ্য আজ নয়, বরাবরই শ্রমিক-কর্মচারীদের আন্দোলন সংগ্রামের যে বিরোধী, তার নজির অতীতেও রেখেছেন।

    এবারের বিধানসভা নির্বাচনের আগে রবিবার যে কথাটা তিনি তৃণমূলী চ্যানেলে বসে বললেন, ঠিক সেই কথাই এর আগে ২০০১ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগেও মমতা ব্যানার্জি বলেছিলেন। সেবারও কংগ্রেসের সঙ্গে জোট করে তৃণমূল বিধানসভায় ভোটে লড়াই করেছিল। মমতা সেবার কোনও টিভি চ্যানেলে নয়, কলকাতার বড়বাজারে ২রা মে ’০১ তারিখে, বিধানসভার ভোটের ৮ দিন আগে, তার নির্বাচনী জনসভায় প্রকাশ্যে বলেছিলেন, ‘তৃণমূল দল ক্ষমতায় এলে এরাজ্যে ধর্মঘট ও বন্‌ধ নিষিদ্ধ করবে।’ আর, সেইবার দলের নির্বাচনী ইশ্‌তেহারে মমতা ব্যানার্জি রাজ্যে সভা সমাবেশের প্রশ্নে একগুচ্ছ বিধিনিষেধ আরোপের যে কথা লিখেছিলেন, তা-ও ছিলো আজকের মমতারই কথা। ২০০১ সালের নির্বাচনী ইশ্‌তেহারে মমতা ব্যানার্জি রীতিমত একটি পৃথক অধ্যায়ে তাঁর ঘোষণা হিসাবে লিখেছিলেন, (১) ছুটির দিন ছাড়া কোনও মিছিল-সমাবেশ করা যাবে না। (২) সরকার নির্ধারিত স্থানে ও রাস্তাতেই কেবল সমাবেশ-জমায়েত ও মিছিল করা যাবে। (৩) মিছিল-সমাবেশ করার জন্য অনুমতি নিতে হবে। (৪) সরকারের ঠিক করে দেওয়া হোর্ডিং-এ কেবল পোস্টার লাগানো যাবে।

    এভাবেই মমতা ব্যানার্জির ঘোষণা ছিলো সেবারও নির্বাচনী ইশ্‌তেহারে, সভা-মিছিল আন্দোলন যেমন করতে হলে তিথিনক্ষত্র মেনে সরকারের অনুমতি নিয়ে! এবারের ইশ্‌তেহারে মমতা ব্যানার্জি তার দলের এই ‘বাঘ নখ’ উল্লেখ করেননি কিন্তু আসলে সেই বাঘ নখ কেমন হবে, তা মুখে বলে দিয়েছেন রবিবার স্টার আনন্দে বসে। মমতা ব্যানার্জি যা বলেছেন, তা আসলে দেশের একচেটিয়া পুঁজি মালিকদেরই উৎফুল্ল করতে। কেননা তারাও চায় কোনও বন্‌ধ ধর্মঘট সভা-মিছিল যেন না হয়। কেননা শ্রমজীবী মানুষের আন্দোলন সংগ্রামের এই হাতিয়ারগুলি মূলত ব্যবহার হয় পুঁজির মালিকদের শ্রমজীবী-বিরোধী নীতির বিরুদ্ধেই, যে নীতির পৃষ্ঠপোষকতা করে দেশের কেন্দ্রীয় সরকার। ২০০১ সালের সেই নির্বাচনের সময়ও ৯মাস আগে মমতা ব্যানার্জি দেশের একচেটিয়া পুঁজি মালিকদের সংগঠন সি আই আই-র সভায় গিয়ে প্রকাশ্যে বলেছিলেন বন্‌ধ ধর্মঘট নিষিদ্ধ করার কথা। এরপরেই তাঁকে সেবারও পুঁজির মালিকদের প্রতিনিধিরা রাজ্যের ‘হবু মুখ্যমন্ত্রী’ বলে আখ্যা দিতে শুরু করেছিল।

    আজকের সময়ে, যখন কেন্দ্রের জনবিরোধী আর্থিক নীতির আক্রমণে বিপর্যস্ত গরিব ও মধ্যবিত্ত সাধারণ মানুষ, যখন বামফ্রন্ট এদেরই রক্ষা করতে অগ্রাধিকার ঘোষণা করে অষ্টম বামফ্রন্ট সরকার গঠনের লড়াইয়ে নেমেছে, তখন কার্যত পুঁজির মালিকদের হয়ে, কেন্দ্রে আর্থিক নীতির পাহারাদার হয়েই যেন মমতা ব্যানার্জি বলে দিলেন বন্‌ধ নিষিদ্ধ করার কথা, সভায় বিধিনিষেধের কথা, আন্দোলন নিয়ন্ত্রণ করার কথা।

Advertisements

Tags: , ,

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s


%d bloggers like this: