Journalism in Mamata’s Regime… মমতা’র জমানায় সাংবাদিকতা…

 

ajitha-menon-web

মমতার রাজ্যে সাংবাদিকতা

অজিতা মেনন

 

রাজ্যে নতুন সরকার। তৃণমূল আর কংগ্রেস জোটের। মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি। সংবাদমাধ্যমকে কীভাবে তিনি ও তাঁর দল ব্যবহার করছেন? সংবাদমাধ্যমই বা কীভাবে তাঁকে ব্যবহার করছে? রাজ্যে পরিবর্তনের জমানায় সরকার ও সংবাদমাধ্যমের মধ্যে সম্পর্কে উদ্বেগজনক এক সংস্কৃতির জন্ম হয়েছে। যা এর আগে ছিলো না। বিশিষ্ট সাংবাদিক তাঁর অভিজ্ঞতা লিপিবদ্ধ করেছেন নিজের কলমেই।

    পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি খুব সম্প্রতি সংবাদমাধ্যম ও রাজ্য সরকারের মধ্যে সম্পর্কের প্রশ্নে নতুন একটা অধ্যায়ের সূচনা করেছেন! তিনি সবার সামনেই ঘোষণা করেছেন, যদি কোনও সংবাদ চ্যানেল কোনও খবর মিস করে, তাহলে সেই চ্যানেলকে তিনি অন্য একটি খবর দিয়ে পুষিয়ে দেবেন! পশ্চিমবঙ্গে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার ফলাফল আনুষ্ঠানিক ঘোষণা করার আগেই সংশ্লিষ্ট সরকারী বিভাগ থেকে কীভাবে তৃণমূল কংগ্রেসের ঘনিষ্ঠ একটি খবরের চ্যানেল স্টার আনন্দে ফাঁস হয়ে গেল, সেই প্রশ্নই রাখা হয়েছিল মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির কাছে। তখনই তিনি তাঁর ভাষ্যে এবিষয়ে তদন্তের দাবি উড়িয়ে দিয়ে, খবর মিস করা অন্য খবরের চ্যানেলকে পরে কোনও একটি খবর সরবরাহ করে পুষিয়ে দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন সবার সামনে।

    ফল ফাঁসের ঘটনাটি পরীক্ষা নিয়ামক সংস্থা তথা সংশ্লিষ্ট সরকারী দপ্তরের বিশ্বাসযোগ্যতার প্রশ্নে বড় ফাটল, তাতে সন্দেহ নেই। এবং এই ফাটল বা ছিদ্রটি প্রাতিষ্ঠানিক। অথচ এমন বিশ্বাসভঙ্গের বিনিময়েই খোদ সরকার পরীক্ষার ফলের মতো সরকারী একটি সংবেদনশীল বিষয় নিয়ে সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে পক্ষপাতদুষ্ট আচরণ দেখিয়েছে। ঘটনার এই গুরুতর দিকটিকে তেমন গুরুত্ব না দিয়েই সেদিন মুখ্যমন্ত্রীর ওই ভাষ্য শোনার পর মহাকরণে উপস্থিত সাংবাদিকরা রীতিমত হাসাহাসি করছিলেন। গোটা বিষয়টা দাঁড়ালো এমন যে, এভাবে কোনও সংবাদমাধ্যমে সরকারের কোনও খবর ফাঁস হওয়ার ঘটনার কেউ প্রতিবাদ করলে, তাকে বলা হবে, তোমাকেও অন্যদিন অন্য একটা খবর দিয়ে পুষিয়ে দেব। প্রথমে এদের পালা, তারপর ওদের পালা… এভাবেই যেন সরকারের কাছ থেকে খবরের জন্য অপেক্ষা করে থাকতে হবে। যেমন বিবৃতির জন্য থাকতে হয়।

 
    আরো গুরুতর বিষয় হলো, লক্ষ লক্ষ পরীক্ষার্থী, তাদের শিক্ষক-শিক্ষিকা এবং তাদের অভিভাবকদের নিশ্চিন্ত আস্থা ও ভরসার প্রতি মর্যাদা দিয়ে যে সংস্থার উপর দায়িত্ব থাকে কোনরকম পক্ষপাতিত্ব না দেখিয়ে গোটা পরীক্ষা পরিচালনা করা, সেই সংস্থার বিশ্বাসযোগ্যতাই প্রশ্নের মুখে পড়ল। কিন্তু এই প্রশ্নটা প্রায় সব সংবাদমাধ্যমে কার্যত উপেক্ষিতই থাকলো। খবরের সূত্র যদি বিশ্বাসযোগ্য হয় এবং ঘটনা যদি যাচাই করে নেওয়ার উপযুক্ত হয়, তাহলে তা ‘এক্সক্লুসিভ’ খবর হিসাবেই প্রচারিত হোক, এটা যেকোনও পেশাদার সাংবাদিকই চাইবেন। অতএব কোনও চ্যানেল তার প্রতিদ্বন্দ্বী চ্যানেলকে টেক্কা দিতে যদি ঘোষণার নির্দিষ্ট সময়ের আগেই পরীক্ষার ফলাফল প্রচার করে দেয়, তাহলে সেই চ্যানেলকে খুব বেশি দায়ী করা যায় না। বরং ফল ফাঁস হওয়ার দায় নিতে হবে সরকারী সেই সংস্থাকেই, যারা এই পরীক্ষা ব্যবস্থার পরিচালনায় দায়িত্বপ্রাপ্ত। এক্ষেত্রে দায় রাজ্যের উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা সংসদের। দায় নির্দিষ্ট করা দরকার এজন্য নয় যে, নির্দিষ্ট সময়ের আগেই পরীক্ষার ফলাফল কারো হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে। দায় বেশি করে নিতে হবে এজন্য যে, পরীক্ষা নেওয়া, উত্তরপত্রের মূল্যায়ণ, নম্বর প্রাপ্তি, মেধাতালিকা তৈরি ও ফলাফল প্রকাশ—গোটা পরীক্ষা ব্যবস্থার আবশ্যিক অঙ্গ যে নিরাপত্তা সতর্কতা বা গোপনীয়তা, তার মধ্যেই একটা ছিদ্র ধরা পড়ল এই ঘটনায়।

    লক্ষ্যণীয়, উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষাসংসদের সভাপতি ওঙ্কারসাধন অধিকারী সংবাদমাধ্যমের প্রশ্নের মুখে পড়ে কার্যত দেয়ালে পিঠ ঠেকা অবস্থায় স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছেন, সব কিছুই করা হয়েছে রাজ্য সরকারের নির্দেশ অনুযায়ী। কিন্তু ফল আগেই এভাবে ফাঁস করার নির্দেশ সরকারের তরফে কে দিলো, তা নিয়ে তিনি চুপ থেকেছেন।

    এই ঘটনায় বিশ্বাসভঙ্গের যে ছিদ্র বেরিয়ে পড়লো, তাতে প্রশ্ন উঠতে বাধ্য, তাহলে প্রভাব খাটিয়ে কারো প্রাপ্ত নম্বর বাড়িয়ে বা কমিয়ে, এমন কি মেধা তালিকাও রদবদল করে দেওয়া খুব অসম্ভব হবে? বিশ্বাসভঙ্গের যে ছিদ্রটা বেরিয়ে পড়েছে, সেটা না হয় এক্ষেত্রে কোনও সংবাদমাধ্যম বা কোনও রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ ব্যবহার করে নিজেদের স্বার্থসিদ্ধি করেছে। কিন্তু এই ছিদ্রই যদি আরো বড় কোনো অঘটনের প্রস্তুতির জন্য ব্যবহার করে কেউ? দেখা যাচ্ছে, খোদ মুখ্যমন্ত্রী নিজেই ছিদ্রটাকে বৈধতা দিয়ে ‍‌দিয়েছেন এব্যাপারে কোনও তদন্ত করার দাবি প্রত্যাখ্যান করে!

    বামঘেঁষা বাংলা সংবাদ চ্যানেল ২৪ ঘণ্টা এই ইস্যুটিকে তোলার পর মুখ্যমন্ত্রী তাদের সমালোচনা করে বলেছেন, ‘কোনও সংবাদমাধ্যম যদি কিছু খবর পেয়ে যায়, তাহলে আমি কী করতে পারি? কোন্‌ চ্যানেল কী করছে, তা নিয়ে আমি কোনও তদন্ত করতে পারি না। ২৪ ঘণ্টা সি পি এমের চ্যানেল। ওরা সবসময় আমার সম্পর্কে বাজে কথা বলে। খবরটা মিস করায় তারা দুঃখ পেতে পারে। কিন্তু আক্ষেপ যেন না করে। আমি তাদের অন্য একটি খবর দিয়ে পুষিয়ে দেব।’

    এটা কি সংবাদমাধ্যমকে ঘুষ দিতে চাওয়ার মত উদাহরণ নয়? গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভকে পশ্চিমবঙ্গে এইভাবেই একেবারে বশীভূত করা হচ্ছে বলে মনে হচ্ছে এই ঘটনায়। ‘দি বেঙ্গল পোস্ট’ পত্রিকা এই ঘটনায় ‘চ্যানেল ফল ফাঁস কর‍‌লো, উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা সংসদ ব্যর্থ’ বলে শিরোনামে খবরে তবুও একটু লিখেছে। ‘দি হিন্দু’র কলকাতা সংরক্ষণে এই ঘটনার ছোট্ট অনুচ্ছেদের খবর হয়েছে। সি পি আই (এম)-র মুখপত্র ‘গণশক্তি’ অবশ্যই বড় করেই খবর করেছে। ‘বর্তমান’ পত্রিকাও খবর করেছে ফল ফাঁসে তদন্তের দাবি মুখ্যমন্ত্রী প্রত্যাখ্যান করেছেন জানিয়ে।

    মনে রাখা দরকার, ২০০৭ সালে মাধ্যমিক পরীক্ষার ফল বেরোবার আগেই ফাঁসের অভিযোগ উঠেছিল এবং সেই ঘটনায় তৎকালীন সরকার তদন্তের নির্দেশ দিয়েছিল। তাতে মধ্যশিক্ষা পর্ষদের তৎকালীন সভাপতি উজ্জ্বল বসুকে সরতে হয়েছিল পদ থেকে।

    রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচনের পর যেটা দেখা যাচ্ছে, পুরো সংবাদ মাধ্যমই নতুন সরকারের মুখ্যমন্ত্রী ও তাঁর মন্ত্রীবর্গকে প্রণম্য বলে জ্ঞান করছে। এই নতুন অধ্যায়টি নিয়ে মূলস্রোতের সংবাদমাধ্যমগুলি কার্যত চুপচাপ। মমতা ব্যানার্জি তাঁর পছন্দের সাংবাদিকদের একটি গোষ্ঠী তৈরি করেছেন। ভারতে অবশ্য এটা খুব সাধারণ এবং গ্রহণযোগ্য ঘটনা। বেশিরভাগ রাজনীতিক তাদের লক্ষ্যপথে পৌঁছানোর জন্য সহায়তা করবে, এমন উপযুক্ত সাংবাদিকদের গোষ্ঠী তৈরি করে নেন। সেক্ষেত্রে পেইড নিউজেরও ভূমিকা রয়েছে। কিন্তু গণতন্ত্রের পক্ষে যেটা বিপজ্জনক, তা হলো, যে গোষ্ঠী বানানো হয়েছে, তার বাইরে থাকা কোনও সাংবাদিক এমনকি কোনও প্রশ্ন করতেও অনুমতি পাবেন না। এমনকি গণতান্ত্রিক প্রথায় নির্বাচিত মুখ্যমন্ত্রীকেও প্রশ্ন করা যাবে না।

    গোর্খা জনমুক্তি মোর্চার নেতা বিমল গুরুঙের সঙ্গে নতুন মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে মমতা ব্যানার্জির প্রথম বৈঠকের পর সংবাদসংস্থার এক তরুণ সাংবাদিক বিমল গুরুঙকে একটি ‘হঠকারী’ প্রশ্ন করে ফেলেছিলেন। তিনি বিমল গুরুঙকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, আলাদা রাজ্য গোর্খাল্যান্ডের দাবি কি আপনারা ছেড়ে দিয়েছেন? মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি গুরুঙকে সেই উত্তর দিতে না দিয়ে বলে উঠেছিলেন, ‘এভাবে প্রশ্ন করবেন না। তাতে পরিস্থিতির অবনতি ঘটতে পারে।’ এই অবধি না হয় তবুও সহ্য করা যায়। কিন্তু তারপরেই হলো কী, প্রবীণ তিন সাংবাদিক প্রশ্নকর্তা ওই তরুণ সাংবাদিককে বলে বসলেন, ‘কেন তুমি এমন প্রশ্ন করলে? দিদি অসন্তুষ্ট হলেন!’ এর অর্থ, অস্বস্তিকর প্রশ্ন করা যাবে না। শুধুমাত্র সেই প্রশ্নগুলিই করো, যেগুলি ‘দিদি’ শুনতে পছন্দ করেন। তাঁকে ও তাঁর মন্ত্রীদের খুশি রাখতে হবে যে কোনও মূল্যে। ‘দিদি’কে কিছুতেই চটাতে চায় না সংবাদমাধ্যম।

    এটা অবশ্য স্পষ্ট নয় যে, ‘দিদি’, যিনি কীনা নিজেকে গণতন্ত্রের মূর্ত প্রতীক হিসাবে দেখান, তিনি সংবাদমাধ্যমের এই আচরণকে অনুমোদন দেন, না কি কলকাতায় রিপোর্টারদের কাছে এটাই আবশ্যিক হয়ে গিয়েছে যে মিডিয়া থাকবে নতজানু হয়ে! লক্ষণীয়, জুনের ৭ তারিখে মমতা ব্যানার্জি যেদিন গোর্খা জনমু‍ক্তি মোর্চার সঙ্গে চুক্তির কথা ঘোষণা করলেন, সেদিন তিনি বারবার বললেন, দার্জিলিঙ সমস্যার সমাধান হয়ে গেল। সংবাদমাধ্যম তাতে খুবই কৃতজ্ঞবোধ করলো এবং গোর্খাল্যান্ড শব্দটি এমনকি চুপিচুপিও তাদের মধ্যে উচ্চারণ হলো না। জনমুক্তি মোর্চার নেতাদেরও তাদের আলাদা রাজ্য গড়ার দাবি সম্পর্কে কেউ জিজ্ঞাসা করলেন না। যেন এমন কোনও দাবির অস্তিত্বই কোনওদিন ছিল না বা নেই!

    নতুন শিল্পমন্ত্রী পার্থ চ্যাটার্জি বিধানসভায় সাক্ষাৎকার দেওয়ার সময় দেখা গেল ই টি ভি-র ক্যামেরাম্যানকে নির্দেশ দিচ্ছেন, ‘আমাদের দু’জনকেই ফ্রেমে রাখুন।’ অর্থাৎ তাঁকে ও পাশে বসা বিধানসভার নবনির্বাচিত অধ্যক্ষ বিমান ব্যানার্জিকে যেন ক্যামেরায় একসঙ্গে একই ফ্রেমে রাখা হয়। যখন পার্থ চ্যাটার্জি দেখলেন, তাঁর নির্দেশ ঠিকমত পালিত হচ্ছে না, ক্যামেরা জুম করে শুধু তাঁর মুখটাই ফ্রেমে ধরছে, কার্যত হুমকি দিয়েই তিনি তখন ই টি ভি-র ক্যামেরাম্যানকে বললেন, ‘আপনি ভাবছেন আপনার হাতে ক্যামেরা রয়েছে। আপনার তো এটা চাকরিও, না কি? আপনি কি ভাবছেন হায়দরাবাদ খুব দূরে? এমনটা ভাববেন না। হায়দরাবাদ কিন্তু দূরে নয়।’ উল্লেখ্য, ই টি ভি-র পরিচালক শীর্ষকর্তাদের অফিস কিন্তু হায়দরাবাদেই।

    আরেকটি উদাহরণ দিই। এন ই বাংলা চ্যানেলের এক সাংবাদিক রাজ্যে নতুন সরকার আসার কিছুদিন বাদেই সুভাষ সরোবরের দুরবস্থা নিয়ে সমালোচনার সময় কলকাতার মেয়র শোভন চ্যাটার্জিকে প্রশ্ন করে মেয়রের রোষের মুখে পড়েছিলেন। তিনি মেয়রকে প্রশ্ন করেছিলেন, ‘এই সরোবরটা দেখভালের জন্য কলকাতা কর্পোরেশনের তৃণমূল পৌরবোর্ড ক্ষমতা পেয়েছে প্রায় দু’বছর হয়ে গেল। কিন্তু কিছুই করা হয়নি কেন?’ প্রশ্ন শুনে মেয়র কোনও উত্তর না দিয়ে হাঁটা দিয়েছিলেন সেই সাংবাদিককে এড়াতে। এরপরই আর প্লাস চ্যানেল ও মহুয়া টি ভি চ্যানেলের দুই সাংবাদিক ক্ষুব্ধ হয়ে প্রশ্নকর্তা এন ই বাংলার সাংবাদিককে বলেছিলেন, ‘কেন তুমি এমন প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করলে মেয়রকে? তুমি মেয়রকে রাগিয়ে দিলে আর আমরা প্রশ্ন করার সুযোগ পেলাম না! তোমার জন্যই আমাদের আর প্রশ্ন করা হলো না।’ পরে সেই সাংবাদিকটি বলছিলেন, ‘‘ওদের প্রশ্ন কী ছিলো জানেন? ওদের কাছে সেই প্রশ্নের গুরুত্ব বোধহয় আছে ঠিকই, ওরা মেয়রের কাছে জানতে চাইতো, সরোবরকে ঘিরে কটা আলো লাগানো হবে এবং এরপর মেয়র কোন্‌ সরোবর পরিদর্শন করতে যাবেন? কলকাতায় সাংবাদিকতা এখন এমন জায়গাতেই পৌঁছেছে!’’

    যেদিন বিধানসভা নির্বাচনের ফল বের হলো, সেদিন গোটা দেশের দর্শকরা দেখলেন ফলাফল প্রকাশ হওয়ার সময় এন ডি টিভি-র খ্যাতনামা সাংবাদিক বরখা দত্ত সাক্ষাৎকার নিচ্ছেন মমতা ব্যানার্জির। সেইসময় মমতা ব্যানার্জির পিছনে সারাক্ষণ রইলেন মমতা ব্যানার্জির তৈরি সাংবাদিক গোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত একটি বাংলা টি ভি চ্যানেলের পরিচিত উপস্থাপক। তাঁকেও ছবির ফ্রেমে একই সঙ্গে রাখা হলো। বরখা দত্তের মতো সাংবাদিকেরও সাহস হয়নি ছবির ফ্রেম থেকে সেই উপস্থাপককে সরে যেতে বলার!

    তৃণমূলের ঘনিষ্ঠ চ্যানেল টেন-এর সাংবাদিকদের অবস্থা কেমন, তার একটি উদাহরণ দিচ্ছি। তাঁদেরই একজন কলকাতার মেয়রকে এমন একটি প্রশ্ন করেছিলেন, যা পছন্দ হয়নি মেয়রের। মেয়র সঙ্গে সঙ্গে ফোন তুলে সেই চ্যানেলের সম্পাদককে রীতিমতো অভিযোগ করলেন সেই সাংবাদিকের প্রশ্নটি নিয়ে। সাংবাদিকটির অফিসের বস তখন সেই সাংবাদিককে সঙ্গে সঙ্গেই বুঝিয়ে দিলেন তৃণমূলের নেতা-মন্ত্রীদের কিছুতেই অপ্রীতিকর বা অস্বস্তিকর প্রশ্ন করা চলবে না। বস তাঁকে বলেছিলেন, ‘‘ওদেরকে খেপিও না। তুমি যে খবর করতে চাইছ, তা আমাদের চ্যানেলে তো দেখাবেই না, উপরন্তু তোমার চাকরিটাও যাবে!’ এই চ্যানেলের বেশিরভাগ সাংবাদিক রীতিমতো আতঙ্কে রয়েছেন এই বুঝি কোনও তৃণমূল নেতা এডিটরকে অভিযোগ ক‍‌রে বসলেন আর তাঁর ‘চাকরি নট’ হয়ে গেল!

    মমতা ব্যানার্জির গোষ্ঠীতে রয়েছেন, স্টার আনন্দ-টেলিগ্রাফ-এর মতো পত্রিকার এমন কিছু সাংবাদিক যাঁরা মমতা ব্যানার্জি ও অন্যান্য সাংবাদিকদের মধ্যে যোগসূত্র হিসাবে কাজ করছেন এখন। কেরালার ইন্ডিয়াভিশন চ্যানেলের এক সাংবাদিক মমতার বাড়ির বাইরে দাঁড়িয়ে তাঁর একটা অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন। তিনি বলছিলেন, ‘‘ওনার ভাষ্য-সহ একটা ছবি তুলবো বলে ৬ ঘণ্টা ধরে অপেক্ষা করছিলাম। উনি একসময় বাইরে এসে এক সাংবাদিককে ঘরের ভিতর ডেকে নিলেন। সেই সাংবাদিক কিছুক্ষণ বাদে বাইরে এসে অপেক্ষামান অন্য সাংবাদিকদের সবাইকে তাঁর মোবাইলে মমতার লেখা একটি এস এম এস দেখালেন। তাতে মমতা বলেছেন, ‘আমি আজ কোনও সাংবাদিকের সঙ্গে কথা বলবো না। সবা‍‌ইকে আজ চলে যেতে বলে দাও।’ যেদিন নির্বাচনী ফল বের হলো, সাহারা টিভি-র এক সাংবাদিক নাছোড় হয়ে চেষ্টা করছিলেন মমতা ব্যানার্জির একটি একান্ত সাক্ষাৎকার নেওয়ার জন্য। তিনি প্রত্যাখাত হয়েছিলেন। স্টার আনন্দের এক রিপোর্টার তাঁকে বলেছিলেন, ‘তুমি আমার সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারতে। আমিই তোমাকে ওনার সঙ্গে দেখা করিয়ে বসাতে পারতাম।’

    কী মনে হচ্ছে? দালালি? ইন্ডিয়াভিশন চ্যানেলের সাংবাদিকটি বিধানসভা ভোটের আগে তাঁর আরো একটি অভিজ্ঞতার কথা শুনিয়েছেন। তিনি বলছিলেন, মমতা ব্যানার্জি যখন মেদিনীপুরে গিয়েছিলেন, আমি তাঁর একটা সাক্ষাৎকার চেয়ে তাঁর নিরাপত্তাকর্মী ও তৃণমূল নেতাদের মারফত বার্তা পাঠাচ্ছিলাম। উনি আমাদের সঙ্গে কথা বলতে চাইছিলেন না। অথচ ওই সময়েই স্টার আনন্দ ও কিছু বাংলা কাগজের সাংবাদিকরা আগাগোড়া সবসময় তাঁর সঙ্গেই রয়েছেন! কোনও রাজনীতিক কীভাবে এমন পছন্দমাফিক সাংবাদিক মহলকে বেছে নিতে পারেন? আমরা কি গণতন্ত্রের অংশ নই? এখনই যদি এমন হয়, আমার তো অবাক লাগছে উনি ক্ষমতায় এসে মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পর কী হবে!

    এখন মমতা ব্যানার্জি মুখ্যমন্ত্রী। রাজ্যে নতুন সরকার তাঁর দলের। এখন পশ্চিমবঙ্গে সাংবাদিকদের অবাধ ও স্বাধীন দায়িত্বপালনের কাজে হস্তক্ষেপ করার ঘটনা ছাড়াও আরো কিছু উদাহরণ দেখা যাচ্ছে। সাংবাদিকের ব্যক্তিগত গাড়ির জন্য পেট্রোল বা ডিজেল ভরে দেওয়া, তাদের জন্য পার্টি দেওয়া, এমনকি তাদের ফ্ল্যাটের ই এম আই পেমেন্ট করে দেওয়ার নজিরও তৈরি হচ্ছে। অনেক সাংবাদিক এখন মাত্র একটা টেলিফোন করে কাউকে ট্রাফিক জরিমানা থেকে রেহাই দেওয়া, শেষমুহূর্তে রেলের টিকিটের সংরক্ষণ করে দেওয়া, স্কুল বা কলেজে ভর্তির ব্যবস্থা করে দেওয়া, নতুন বাড়ির প্ল্যান অনুমোদন করিয়ে দেওয়া, রেল বা সরকারী চাকরি করে দেওয়া, পছন্দের জায়গায় কাউকে পোস্টিং করিয়ে দেওয়া, কোনও কমিটিতে কাউকে সদস্য করে দেওয়ার মত বিবিধ কাজ করিয়ে তাঁদের ক্ষমতা বুঝিয়ে দিচ্ছেন। দেখাচ্ছেন, তাঁরা মন্ত্রীদের কতখানি কাছাকাছি থাকা মানুষ!

    প‍‌শ্চিমবঙ্গে এ‍‌ই সংস্কৃতিটা নতুন। এইসব উদাহরণ কি গণতন্ত্রের বিনিময়ে সাংবাদিকদের আরো ক্ষমতা দেওয়া?

লেখিকা এশিয়ান নিউজ ইন্টারন্যাশনাল (এ এন আই)-র পশ্চিমবঙ্গের ব্যুরো চিফ। তাঁর এই লেখাটি প্রকাশিত হয়েছিলো ‘দি হুট’ ওয়েবসাইটে গত ৮ই জুন ’১১ তারিখে।

Advertisements

Tags: , , , ,

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s


%d bloggers like this: