ভারতে ‘জরুরী অবস্থা’ জারির ৩৬ বর্ষপূর্তি… 36 Years of Clamping Emergency in India…

 

জরুরী অবস্থা জারির পটভূমি ও তার পরিণতি

প্রণব চট্টোপাধ্যায়

JP called for Sampurna Kranti – total revolution – at a historic rally of students at Patna‘s Gandhi Maidan on the 5th of June, 1975

    ভারতবর্ষের সংসদীয় গণতন্ত্রের ইতিহাসে ১৯৭৫ সালের ২৫শে জুন এক কলঙ্কিত দিন হিসাবে চিহ্নিত হয়ে রয়েছে। ঐদিন মধ্যরাতে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী অভ্যন্তরীণ জরুরী অবস্থা জারি করেছিলেন। এর মধ্যদিয়ে সংসদীয় গণতন্ত্রকে পদদলিত করে সারা দেশে কায়েম করা হয়েছিলো এক চরম স্বৈরাচারী ব্যবস্থা। উনিশ মাসের এই জরুরী অবস্থায় সংবিধানকে অগ্রাহ্য করে জনগণের মৌলিক অধিকারসমূহকে কেড়ে নেওয়া হয়েছিলো। জরুরী অবস্থা জারির সাড়ে তিন দশক পরে এই ঘটনাকে পটভূমিতে রেখে বর্তমান সময়ে গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক অধিকার, জীবন ও জীবিকার সংগ্রামের তাৎপর্যকে উপলব্ধি করা বিশেষ জরুরী।

    জরুরী অবস্থা জারির আর্থ-রাজনৈতিক পটভূমি ছিলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সি পি আই (এম)-র নবম পার্টি কংগ্রেসের (১৯৭২ সালের ২৭শে জুন—২রা জুলাই) রাজনৈতিক প্রস্তাবে এ সম্পর্কে আশঙ্কা প্রকাশ করে বলা হয়েছিলো : ‘‘শাসক পার্টির পক্ষে যথোপযুক্ত সুযোগ-সুবিধা দ্বারা জনগণের ব্যাপক অংশকে শান্ত করার অক্ষমতা, তাদের উপর আরও বোঝা চাপিয়ে দেবার একান্ত প্রয়োজনীয়তা, দমনযন্ত্রের ব্যবহার এবং সেই সঙ্গে বামপন্থী বিরোধী দলের দুর্বলতা, অপরাপর বুর্জোয়া দলগুলির দুর্বল হওয়া, সমস্তরকম বিরোধীদের প্রতি শাসক পার্টির ধৈর্যের অভাব ও অসহিষ্ণুতা, এই সব কিছু হতে একপার্টি একনায়কতন্ত্রের সম্ভাব্য ঝোঁক ফুটে উঠছে। বর্তমানে শাসকশ্রেণীগুলির সম্মিলিত ইচ্ছার প্রতিনিধিত্ব করছে শাসক পার্টি, এই শাসক পার্টি যে সুবিধানজক অবস্থান অর্জন করেছে, তা সম্ভবত সহজে তারা ছেড়ে দেবে না। এই ঘটনা রাজ্যগুলির অধিকার ও ক্ষমতার উপর আরও আক্রমণ চালাবার ও এগুলিকে ক্ষুণ্ণ করার এবং কেন্দ্রের হাতে আরও কেন্দ্রীকরণের পূর্বাভাষ।’’

    জরুরী অবস্থা জারির কয়েক বছর পূর্ব থেকে দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ব্যাপক সঙ্কটগ্রস্ত হয়ে পড়ে। বিশেষত পরোক্ষ করের ব্যাপক বৃদ্ধি, ১৯৭৩ সালে পেট্রোলিয়ামজাত দ্রব্যসামগ্রীর অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি প্রভৃতি কারণে অতি প্রয়োজনীয় দ্রব্যসামগ্রীর নজিরবিহীন মূল্যবৃদ্ধি ঘটে। এক তথ্যে দেখা যায় যে ১৯৭২-৭৩ সালে মূল্যবৃদ্ধির এই হার ছিলো ২২ শতাংশ।

    এই সঙ্কট শিল্প ক্ষেত্রেও প্রসারিত হয়। বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ১৯৭১ সালে ইন্দিরা গান্ধী ক্ষমতাসীন হন। এর অল্প কয়েক মাস পর ১৯৭২ সালে সারা দেশে তিন হাজার ইঞ্জিনিয়ারিং ও সুতাকল বন্ধ হয়ে যায়। চটশিল্প, ওয়াগন শিল্প, অটোমোবাইল প্রভৃতি শিল্প ব্যাপক মন্দায় আক্রান্ত হয়ে পড়ে। জরুরী অবস্থা জারির দু’সপ্তাহ পূর্বে সি পি আই (এম)-র পলিট ব্যুরোর কলকাতা বৈঠকে (১০-১২ই জুন) গৃহীত প্রস্তাবে বলা হয় : ‘‘অর্থনীতি ভেঙে পড়ার অবস্থায় রয়েছে। বিশ্ব অর্থনৈতিক সঙ্কটে পরিস্থিতি আরও তীব্র আকার নিচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী এবং অর্থমন্ত্রী জনগণকে আশ্বস্ত করছেন কোনো মন্দা নেই অথচ শিল্পগুলি থেকে হাজার হাজার শ্রমিক-কর্মচারী ছাঁটাই হচ্ছেন, বেকারী তীব্র হচ্ছে এবং ইতোমধ্যেই অস্বাভাবিক চেহারা নিয়েছে।….বিপুল সংখ্যায় লে-অফ্, ছাঁটাই, অস্থায়ী ও বদলি, শ্রমিকদের ব্যাপকহারে বরখাস্ত দেশব্যাপী ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে।… ছোটো ও অসংগঠিত শিল্পের ক্ষেত্রেও এই কর্মচ্যুতি ঘটছে। হাজার হাজার ছোটো সংস্থা, সহযোগী শিল্প ও ওয়ার্কশপ, মেরামতির দোকান হয় বন্ধ হয়ে গেছে নয় কাজ পাচ্ছে না।…শিক্ষিত বেকারের পরিমাণ গত দু’বছরে লাফিয়ে বেড়েছে।… শ্রমিক-কর্মচারী, আইনজীবী, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, কৃষক, খেতমজুর, দোকানদার, ছোট উৎপাদক, ছোটো শিল্পের মালিক সকলেই বিপুল বোঝা বহন করতে বাধ্য হচ্ছেন যাতে একচেটিয়া, পুঁজিপতি ও জমিদার-জোতদারদের লুঠের রাজত্ব নিশ্চিত হয়।’’

    জরুরী অবস্থার পূর্বেকার এই পরিস্থিতি অর্থাৎ সঙ্কটের বোঝা সাধারণ মানুষের কাঁধে চাপিয়ে দেওয়ার শাসকশ্রেণীর এই কৌশলকে সংগ্রামী জনগণ মাথা পেতে মেনে নেননি। এর বিরুদ্ধে দেশব্যাপী গড়ে উঠেছিলো ব্যাপক প্রতিরোধ আন্দোলন। এই সময়ের মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সংগ্রামটি ছিলো ১৯৭৪ সালের ৯ই এপ্রিল সারা ভারত রাজ্য সরকারী কর্মচারী ফেডারেশনের ডাকে দেশব্যাপী এক‍‌দিনের প্রতীক ধর্মঘট। এই ধর্মঘটে অংশগ্রহণ করার অপরাধে রাজ্যে রাজ্যে কর্মচারী সমাজের ওপর নেমে আসে ব্যাপক দমনপীড়ন। তবে এই সময়কার সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ সংগ্রাম ছিলো ১৯৭৪ সালের ৮ই মে থেকে শুরু হওয়া ঐতিহাসিক রেল ধর্মঘট। ধর্মঘটকে ভাঙবার জন্য পূর্বেই সারা দেশে তিন হাজারের বেশি রেল কর্মচারী‍‌কে গ্রেপ্তার করা হয়। ধর্মঘটকে বেআইনী ঘোষণা করে জারি করা হয় অর্ডিন্যান্স। এমনকি মিলিটারিকে পর্যন্ত সতর্ক করে রাখা হয়। রেল কলোনিগুলির উপর পুলিস, সি আর পি এবং কংগ্রেস আশ্রিত সমাজবিরোধীরা ঝাঁপিয়ে পড়ে। এদের অত্যাচারের হাত থেকে মহিলারা পর্যন্ত রেহাই পাননি।

    ১০ই মে থেকে শুরু হয় দেশব্যাপী কেন্দ্রীয় সরকারী কর্মচারীদের ধর্মঘট, এই উভয় ধর্মঘটের সমর্থনে সারা দেশে গণ-আন্দোলন এক গুরুত্বপূর্ণ মাত্রা অর্জন করে। রেল ধর্মঘটের সমর্থনে কংগ্রেস-বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলি কেন্দ্রীয় ট্রেড ইউনিয়নসমূহের আহ্বানে ১৫ই মে দেশব্যাপী হরতাল পালিত হয়। এর পাশাপাশি কেন্দ্রীয় সরকারের দুর্নীতি ও অপশাসনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন রাজ্যে গণ-আন্দোলন গড়ে ওঠে। ১৯৭৪ সালের ৯ই এপ্রিল থেকে বিহারে কংগ্রেস-বিরোধী দলগুলি ‘সরকার অচল কর’ আন্দোলন শুরু করে। এর চতুর্থ দিনে গয়ায় আন্দোলনকারীদের উপর পুলিসের গুলি চালনায় ৫ জন নিহত হন। এই আন্দোলন দ্রুত সারা দেশে ছড়ি‍‌য়ে পড়ে। ১৯৭৫ সালের ৬ই মার্চ দিল্লিতে জয়প্রকাশ নারায়ণের নেতৃত্বে মিসা, ডি আই আর প্রত্যাহার, দুর্নীতির অবসান, বেকারী দূর করা প্রভৃতি দাবিতে লক্ষ লক্ষ মানুষ মিছিল করে সংসদ অভিযানে অংশগ্রহণ করেন।

    ১৯৭৫ সালের ২রা এপ্রিল কলকাতার ইউনিভার্সিটি ইনস্টিটিউটে এক সভায় যোগ দিতে এলে ছাত্র পরিষদের গুণ্ডারা তাঁর গাড়ি ঘিরে গালাগালি, হই-চই শুরু করে দেয়। ছাত্র পরিষদের এক ১৮/১৯ বছরের যুবতী (মমতা ব্যানার্জী) জয়প্রকাশ নারায়ণের গাড়ির বনেটে চেপে অশ্লীল অঙ্গভঙ্গিসহকারে উদ্দাম নৃত্য শুরু করে। এই পরিস্থিতিতে সভা করা সম্ভব হয়নি।

    জরুরী অবস্থা ঘোষণার পটভূমিতে দুটি গুরুত্বপূর্ণ প্রসঙ্গের অবশ্যই উল্লেখ করা প্রয়োজন। ১৯৭৫-এর ১২ই জুন গুজরাট বিধানসভা নির্বাচনে কংগ্রেস পরাজিত হয়। এই বিধানসভা নির্বাচনে কংগ্রেসের পক্ষে ইন্দিরা গান্ধী স্বয়ং প্রচারের দায়িত্বে ছিলেন। অন্যদিকে কংগ্রেস-বিরোধী দলগুলি ঐক্যবদ্ধভাবে এই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে।

    দ্বিতীয় প্রসঙ্গটি হলো ১৯৭১ সালে ইন্দিরা গান্ধীর নির্বাচনকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে এলাহাবাদ হাইকোর্টে রাজনারায়ণ ৭টি নির্দিষ্ট অভিযোগে মামলা করেছিলেন।১৯৭৫-এর ১২ই জুন আদালত এক রায়ে এর তিনটি অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করে আদালত ইন্দিরা গান্ধীর নির্বাচন খারিজ করে এবং ছয় বছর নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা নিষিদ্ধ করে দেয়।

    এই ঘটনা শাসক কংগ্রেসের মধ্যে অস্থিরতা সৃষ্টি করে। বিরোধীরা তো বটেই কংগ্রেসের এক উল্লেখযোগ্য সংখ্যক সাংসদও ইন্দিরা গান্ধীর পদত্যাগ দাবি করার প্রস্তুতি নেয়। এই পরিস্থিতিকে মোকাবিলা করতে পদত্যাগের পরিবর্তে জরুরী অবস্থা জারি করেন ইন্দিরা গান্ধী। (প্রধান উপদেষ্টা ছিলেন এ রাজ্যের সিদ্ধার্থশঙ্কর রায়)। জরুরী অবস্থা জারির যুক্তি হিসাবে তিনি গোটা বিশ্বকে বোঝানোর চেষ্টা করেন যে, ‘‘ফ্যাসিস্ত দক্ষিণপন্থী প্রতিক্রিয়াশীল শক্তি’’ এবং অতি বামপন্থার আক্রমণ থেকে দেশকে রক্ষার স্বার্থেই জরুরী অবস্থা জারি করা হয়েছে। কিন্তু এই যুক্তি ছিলো একেবারেই ভিত্তিহীন। ১৯৭৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে সি পি আই (এম)-র কেন্দ্রীয় কমিটির গৃহীত প্রস্তাবে এ সম্পর্কে বলা হয়েছিলো ‘‘এ সম্বন্ধে কোনোও সন্দেহই নেই যে, জরুরী অবস্থা চালু করার আশু কারণ হলো ভিন্ন মতাবলম্বী কিছু কংগ্রেস নেতা ও কংগ্রেসের একাংশের সহযোগিতায় বিরোধী দলগুলি কর্তৃক ইন্দিরা গান্ধীকে অপসারণের বিপদ ও আশঙ্কা।…. পার্লামেন্টের কংগ্রেসী সদস্যদের সন্ত্রস্ত করা, পার্লামেন্টের বিরোধী দলগুলির সদস্যদের জেলে পোরা এবং কংগ্রেসের বিরুদ্ধে ঘনায়মান গণ-অসন্তোষকে সম্পূর্ণরূপে দমানো ছাড়া এই ঘটনাকে বাধা দেবার অন্য কোনো কায়দা ছিলো না।’’

    সারা দেশে ১৯৭৫ সালে জরুরী অবস্থা জারি হলেও, এই রাজ্যে সাতের দশকের শুরু থেকে বিশেষত দ্বিতীয় যুক্তফ্রন্ট সরকারের পতনের পরই গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক অধিকারের উপর ব্যাপক আক্রমণ নেমে আসে। ১৯৭২ সালের জাল-জুয়াচুরি নির্বাচনের পর কংগ্রেস দল ক্ষমতাসীন হয় এবং সিদ্ধার্থশঙ্কর রায়ের মুখ্যমন্ত্রিত্বকালে রাজ্যে আধা-ফ্যাসিস্ত সন্ত্রাস কায়েম হয়। ১৯৭২ সালের ২রা আগস্ট লোকসভায় স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী জানান যে, ঐ বছরের মে মাস পর্যন্ত ৪১০৯ জন ব্যক্তিকে মিসায় আটক করা হয়। সি পি আই (এম)-র ১২০০ কর্মী খুন হন। ১৪ হাজারের বেশি কর্মী এলাকাচ্যুত হন। ৩৫০-এর বেশি ট্রেড ইউনিয়ন দখল করে নেওয়া হয়। আত্মপক্ষ সমর্থনের কোনোও সুযোগ না দিয়ে ১৯৭১ সালের ১৩ই সেপ্টেম্বর রাজ্য সরকারী কর্মচারী আন্দোলনের ১৩ জন নেতৃস্থানীয় সংগঠককে রাজ্যপালের বিশেষ ক্ষমতাবলে বরখাস্ত করা হয়।

    ১৯৭৩ সালের ৯ই জানুয়ারি সিদ্ধার্থ মন্ত্রিসভা দমনপীড়ন চালানোর হাতিয়ার হিসাবে রাষ্ট্রপতির কাছে চারটি অর্ডিন্যান্সে আইনী অনুমোদন চায়। এগুলি হলো (১) শিল্প প্রতিষ্ঠানে লক-আউট ও ধর্মঘট নিষিদ্ধ করার ব্যাপক অধিকার, (২) ট্রেড ইউনিয়ন গঠনের প্রচলিত বিধিব্যবস্থাকে আরও কঠোর করা; (৩) কলকারখানায় ছাঁটাই করার অধিকারকে বিস্তৃত করা; (৪) ট্রেড ইউনিয়নকে স্বীকৃতি দেওয়ার বিষয়ে আরও কড়াকড়ি। এককথায় বলা চলে যে, সাতের দশকের শুরু থেকে পশ্চিমবাংলায় যে আক্রমণ শুরু হয়েছিলো, জরুরী অবস্থার মধ্যদিয়ে ভারতীয় সমাজের ব্যাপকতম মানুষ এবং মত ও পতাকা নির্বিশেষে সরকার-বিরোধী সমগ্র রাজনৈতিক দলের উপরই সেই আক্রমণ নামিয়ে আনা হয়।

    জরুরী অবস্থার সময় গণতান্ত্রিক অধিকারের উপর আক্রমণের প্রধান প্রধান দিকগুলির মধ্যে ছিলো সংসদের অধিকার কেড়ে নেওয়া। সেন্সারশিপের নামে সাংসদদের বক্তৃতা প্রকাশ করা হতো না। প্রেস সেন্সরশিপের নামে বাক্‌ স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়া হয়। এই রাজ্যে ১৩টি রবীন্দ্রসঙ্গ‍ীতের প্রচার নিষিদ্ধ করা হয়েছিলো। ২৫শে জুন ১৯৭৫ থেকে ২৬শে জানুয়ারির মধ্যে সারাদেশে ২০৮টি দৈনিক পত্রিকা, ১৪৩৪টি সাপ্তাহিক পত্রিকা বন্ধ করে দেওয়া হয়। এমনকি গান্ধীজী, নেহরুর কোনো কোনো বক্তৃতার উদ্ধৃতি পর্যন্ত ছাপা যেতো না। বিনা বিচারে ৩০ হাজারের বেশি রাজনৈতিক কর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়। এর মধ্যে ৩৯ জন সাংসদ ছিলেন। ১৫ জন সাংসদের বিদেশ যাত্রা নিষিদ্ধ করা হয় যার মধ্যে ১৩ জন ছিলেন সি পি আই (এম)-র সাংসদ। বিচার বিভাগ আক্রান্ত হয়। সরকারের বিরুদ্ধে রায় দিলে বিচারকদের শাস্তি ছিলো গণহারে বদলি।

    ট্রেড ইউনিয়ন ভাঙার জন্য পরিকল্পিত আক্রমণ নেমে আসে। ১৪ জন রাজ্য সরকারী কর্মচারী আন্দোলনের নেতাকে গ্রেপ্তার করে জেলের অভ্যন্তরে ৩১১(২)(গ) ধারায় বরখাস্ত করা হয়। বেশ কয়েকজন কেন্দ্রীয় সরকারী কর্মচারীকেও গ্রেপ্তার করা হয় এবং রাষ্ট্রপতির বিশেষ ক্ষমতাবলে তাদের বরখাস্ত করা হয়। জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের (নাসবন্দি) নামে নেমে আসে ব্যাপক অত্যাচার। সংবিধানের ৪২তম সংশোধনীর মধ্য দিয়ে মৌলিক অধিকারকেই স্থায়ীভাবে অবলুপ্তি ঘটানোর প্রয়াস নেওয়া হয়। জরুরী অবস্থার সুযোগ নিয়ে সরকারী দমনপীড়নের বাইরেও শাসক কংগ্রেস দলের চামুণ্ডাবাহিনী যুব কংগ্রেস দেশব্যাপী আতঙ্কের পরিবেশ সৃষ্টি করেছিলো। বিশেষত ইন্দিরা তনয় সঞ্জয় গান্ধী হয়ে উঠেছিলেন সংবিধান বহির্ভূত ক্ষমতার কেন্দ্র।

    জরুরী অবস্থার বিরুদ্ধে সি পি আই (এম) তীব্র প্রতিবাদ ধ্বনিত করেছিলো। কেরালা ও তামিলনাডুতে এর বিরুদ্ধে পালিত হয়েছিলো সাধারণ ধর্মঘট। জে এন ইউ-তে এস এফ আই-র নেতৃত্বে ছাত্র ধর্মঘট সংগঠিত হয়। দেশে-বিদেশে এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ধ্বনিত হয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রখ্যাত সাংবাদিক জ্যাক এন্ডারসন তাঁর বিখ্যাত প্রবন্ধ ‘দি ট্রু ফেস অব ইন্দিরা গান্ধী’-তে লেখেন ‘‘ইন্দিরা গান্ধী ভারতের উপর একনায়কত্ব চাপিয়ে দেওয়া ছাড়াও বৃহত্তর ও সর্বাপেক্ষা চ্যালেঞ্জধর্মী পথে গণতন্ত্রকে নিভিয়ে দেবার যে ব্যবস্থা করেছে, তার মধ্যেও এই অন্ধকার দেশে গণতান্ত্রিক স্ফুলিঙ্গ এখনও বিচ্ছুরিত হচ্ছে।’’ সব থেকে কঠোর ভাষায় জরুরী অবস্থার সমালোচনা করেছিলেন বিশিষ্ট ব্রিটিশ বুদ্ধিজীবী, অক্সফোর্ডের অধ্যাপক ডেভিড সেলবোর্ন। তিনি বলেন, ‘‘ভারতীয় শাসক কর্তৃপক্ষের ভয়ঙ্কর দানবীয় বুটের শব্দের অন্তরালে আমি শুনতে পাচ্ছি জনগণের ক্রোধের এবং অগ্রগতির পদধ্বনি।’’

    জরুরী অবস্থার কঠোর সমালোচনা করে সংসদে ভাষণ দিয়েছিলেন পলিট ব্যুরোর অন্যতম সদস্য কমরেড এ কে গোপালন। তাঁর বক্তৃতা তখন সংবাদপত্রে প্রকাশ করা সম্ভব হয়নি। তিনি বলেছিলেন, ‘‘জনগণ যে গভীর বিপদের সম্মুখীন হয়েছেন তার বিরুদ্ধে এবং জরুরী অবস্থা প্রত্যাহার করা এবং অসংখ্য সংগ্রামে ও অবর্ণনীয় আত্মত্যাগের পরে তাঁরা যা কিছু গণতান্ত্রিক অধিকার আদায় করে নিয়েছিলেন তার পুনরুদ্ধারের জন্য এবং প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধীকে পদত্যাগ করানো এবং সমস্ত রাজনৈতিক বন্দীদের মুক্তির জন্য সংগ্রামে জনগণকে জাগরিত ও সংগঠিত করে তাঁদের শামিল করাকে আমাদের পার্টি প্রধান করণীয় কাজ বলে মনে করে।… আমরা শাসকশ্রেণীসমূহের নিকট কখনও আত্মসমর্পণ করবো না, আমাদের দেশের‍‌ মেহনতী জনগণ এবং গণতান্ত্রিক শক্তিসমূহের প্রতি আমরা কখনও আত্মসমর্পণ করবো না, আমাদের দে‍‌শের মেহনতী জনগণ এবং গণতান্ত্রিক শক্তিসমূহের প্রতি আমরা কখনও বিশ্বাসঘাতকতা করবো না। ইতিহাস আমাদের নীতির ন্যায্যতা সমর্থন করবে।’’

    কমরেড গোপালনের বক্তব্য প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৭৭ সালের মার্চ মাসে অনুষ্ঠিত ষষ্ঠ লোকসভা নির্বাচনের মধ্য দিয়ে কংগ্রেসের পরাজয় ঘটে। কেন্দ্রে প্রথম গঠিত হয় অ-কংগ্রেসী সরকার। এই রাজ্যেও আধা-ফ্যাসিস্ত সন্ত্রাসের কালো দিনগুলির অবসান ঘটে।

    একথা স্মরণে রাখা প্রয়োজন যে জরুরী অবস্থার বিরুদ্ধে নির্বাচনে জয়ের মধ্য দিয়ে শ্রেণীশক্তিসমূহের পারস্পরিক ভারসাম্যের বড় রকমের কোনো পরিবর্তন হয়নি। তাছাড়া একচেটিয়া পুঁজিপতি, জমিদারদের আধিপত্য এবং সাম্রাজ্যবাদী লগ্নীপুঁজির ক্রমবর্ধমান প্রভাবের মধ্যেই স্বৈরতন্ত্রের বিপদ নিহিত থাকে।

    বর্তমান সময়েও তাই এই বিপদ রয়েই গেছে। কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন দ্বিতীয় ইউ পি এ সরকার দুর্নীতিতে আকণ্ঠ নিমজ্জিত। নয়া উদার আর্থিক নীতির পরিণতিতে ব্যাপক মূল্যবৃদ্ধি ঘটছে এবং দেশের অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্ব বিপদের সম্মুখীন। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের সাথে স্ট্র্যাটেজিক জোট বন্ধনের ফলে দেশের স্বাধীন বিদেশনীতি বিপর্যস্ত। এর বিরুদ্ধে দেশব্যাপী গড়ে উঠেছে ব্যাপক গণ-আন্দোলন। পশ্চিমবাংলায় বামফ্রন্টের নির্বাচনী পরাজয়ের পর বামপন্থীদের বিরুদ্ধে শুরু হয়েছে ব্যাপক হিংসাত্মক আক্রমণ। ইতোমধ্যেই ১৬ জন কর্মী খুন হয়েছেন। অন্যদিকে বামপন্থার প্রাসঙ্গিকতাকে চ্যালেঞ্জ করে শুরু হয়েছে মতাদর্শগত আক্রমণ। এই পটভূমিতে জরুরী অবস্থার অভিজ্ঞতাকে স্মরণে রেখে আগামী দিন দেশব্যাপী গণ-আন্দোলনকে আরো শক্তিশালী করা প্রয়োজন।

Advertisements

Tags: , , , ,

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s


%d bloggers like this: