Haroa – Day 4…

 

আক্রান্ত মানুষের পাশে বামফ্রন্ট নেতৃবৃন্দ
হাড়োয়ার সব হারানো কৃষকরা সাহস পেলেন সমাবেশ থেকে

সুদীপ্ত বসু

suryakanta at haroa

 

    হাড়োয়া, ৮ই জুলাই- গরিব কৃষকের জমি দখলের তৃণমূলী অভিযান থেকে রেহাই পায়নি সাত বছরের জাহেদুল গাজিও। জমি দখলের নেশায় মত্ত তৃণমূলীরা গোটা বাড়ি তছনছ করে এই পিতৃহারা বালককেও মারধর করার পর মাটিতে ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছিলো। জাহিদুলের বাবা ইতোমধ্যেই মারা গেছেন। অসহায় বিধবা জননী পারুল বিবির সাহস হয়নি তৃণমূলীদের হুমকি উপেক্ষা করে এমনকি থানাতে অভিযোগ পর্যন্ত দায়ের করতে। কারণ হুমকি ছিলো, থানাতে গেলে মুখে অ্যাসিড ঢেলে দেওয়া হবে।

    মাত্র ৭২ঘণ্টা কেটেছে। পারুল বিবি নিজে আসতে পারেননি তবুও সাত বছরের ছেলেকে তাঁর বোন ও মা’র সঙ্গে পাঠিয়েছিলেন মুন্সি ঘেরী মৌজার ছওয়ানি বাজারে। যেখানে শুক্রবার দুপুরে বিরোধী দলনেতা সূর্যকান্ত মিশ্রের নেতৃত্ব বামফ্রন্টের প্রতিনিধি দল আসে। ছওয়ানি বাজারেই হাড়োয়ার দুটি পঞ্চায়েত এলাকা জুড়ে তৃণমূলীদের সশস্ত্র হামলায় উচ্ছেদ হওয়া, আক্রান্ত হওয়া গরিব কৃষক, পাট্টাদার, বর্গাদারদের এক সমাবেশে বক্তব্যও রাখলেন বামফ্রন্ট নেতৃত্ব।

    পারুল বিবির বোন আসমাতারা বিবি, মা সোনা বিবিকে সমাবেশ চলাকালীনই মঞ্চে ডেকে নিয়ে আশ্বস্ত করলেন সূর্যকান্ত মিশ্র। বললেন, ভয় পাবেন না, অভিযোগ থানায় জমা দেবেন। আপনাদের সঙ্গে আমরা সকলেই আছি। তৃণমূলের এত শক্তি নেই।

    সাক্ষী রইলো ছওয়ানি বাজারের মাঠে গোটা ঐ সমাবেশ। মঞ্চ থেকে নেমেই পার্টিনেতাদের কাছ থেকে সাদা কাগজ নিয়ে কীভাবে তৃণমূল-পুলিস মিলে তাঁদের জমি থেকে উচ্ছেদ করেছে, মারধর করেছে তা লিখে ফেললেন। আতঙ্ক কাটিয়ে চোখেমুখে দৃপ্ত প্রত্যয়, ‘শুনুন, গত মঙ্গলবার রাতে আমাদের উপর যেভাবে ওরা হামলা চালিয়েছে তা বলে বোঝাতে পারবো না। আমার স্বামী সি পি এম করে, সে এখনও ঘরছাড়া। আমাকে মারধর করে গোটা বাড়িতে তছনছ করে দিয়ে আমাদের যে একবিঘা জমির পাট্টা রয়েছে তার কাগজপত্রও কেড়ে নিয়ে চলে যায়। সি পি এম করলে জমিতে চাষ করতে দেবে না, হুমকি দেওয়ার পরে ওরা আমার দিদির ঐ সাত বছরের ছেলেকে শূন্যে তুলে দিয়ে মাটিতে আছড়ে ফেলে। তবুও কিন্তু আমরা ওদের কাছে সারেন্ডার করিনি’।

    আতঙ্কিত হাড়োয়া, নৃশংস সন্ত্রাসে শিউরে ওঠা হাড়োয়ায় গত ৭২ঘণ্টার নিদারুণ যন্ত্রণার মাঝেও আলোর রেখা। পুলিস-তৃণমূলের যৌথ সন্ত্রাসের কাছে এত সহজেই হার না মানা প্রত্যয়।

    সেই প্রত্যয়ই ছড়ালো বামফ্রন্টের প্রতিনিধিদলের এই সফরে। এদিন দুপুরে হাড়োয়ার গোপালপুর-১নম্বর গ্রাম পঞ্চায়েতের মুন্সি ঘেরীতে আসে এই প্রতিনিধি দল। সূর্যকান্ত মিশ্রের নেতৃত্বে এই প্রতিনিধিদলে ছিলেন বিধানসভায় বামফ্রন্টের সহকারী দলনেতা সুভাষ নস্কর, মুখ্য সচেতক বিশ্বনাথ কারক, সি পি আই নেতা স্বপন ব্যানার্জি, ফরওয়ার্ড ব্লক নেতা রঞ্জিত চৌধুরী, সি পি আই (এম) রাজ্য কমিটির সদস্য অমিতাভ নন্দী, জেলা কৃষকসভার সম্পাদক নারায়ণ মণ্ডল, সি আই টি ইউ নেতা সুভাষ মূখার্জি।

    আক্রান্ত মানুষের সমাবেশেই সূর্যকান্ত মিশ্র বলেন, ৩৪বছর সরকার পরিচালনা করেছি, আর তৃণমূল তো সবেমাত্র ৩৪দিন পেরিয়েছে। তার মধ্যেই গরিব মানুষ টের পাচ্ছেন ওদের চেহারা। দু’মাসও হয়নি, এর মধ্যেই হাড়োয়াসহ গোটা রাজ্যজুড়ে বর্গাদার, পাট্টাদারদের উচ্ছেদ অভিযান শুরু করে দিয়েছে। যে লাল ঝাণ্ডা গরিব মানুষের জমির উপর অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে নেতৃত্ব দিয়েছে সেই লাল ঝাণ্ডারই ক্ষমতা আছে জমির অধিকার রক্ষায় আক্রান্ত কৃষকের হয়ে সংগ্রাম গড়ে তোলার। আমরা সে পথেই হাঁটবো। সে পথ সন্ত্রাসের পথ নয়, আন্দোলনের পাশাপাশি আইনী লড়াইও চলবে। একতরফা আক্রমণের মোকাবিলায় আত্মরক্ষার অধিকারও গরিব মানুষের আছে।

    গোটা রাজ্যের সংগ্রামী মানুষের সহমর্মিতা এবং সমর্থনও যে আছে হাড়োয়ার মানুষের পাশে, সে কথা উল্লেখ করেই মিশ্র বলেন, ভয় পাবেন না ওদের। আপনারাই তো বলেছেন পুলিস যদি তৃণমূলের সঙ্গে না থাকতো তবে জমি কাড়তে পারতো না। আপনারা ঐক্যবদ্ধ থাকুন। এত সহজ নয়, জমি আমরা ওদের কবল থেকে ফের ফিরিয়ে আনবো গরিব কৃষক, পাট্টাদারদের কাছেই। তিনি বলেন, বিধানসভা নির্বাচনের পর থেকেই ২৪জন বামপন্থী কর্মী খুন হয়ে গেলেন। মুখ্যমন্ত্রী তবুও নাকি অশান্তি খুঁজে পাচ্ছেন না। তালিকা চাইছেন আমাদের কাছে, দিয়েছি। কিন্তু কিছুই হয়নি। সব চাইছেন আমাদের কাছে, সরকারের কাজ কী? তাঁদের কাছে তথ্য নেই মানুষ খুন হচ্ছে? কী আর করবে, পাহাড় থেকে জঙ্গলমহল ,সর্বত্রই তো ফ্র্যাঙ্কেস্টাইন তৈরি করেছে, তার ফল ভোগ করতেই হবে।

   গোপালপুর-১নম্বর ব্লকে যে ছওয়ানিতে এদিন সমাবেশ হয়েছে সেখানে বারে বারে পুলিসকে সঙ্গে নিয়েও হামলা চালিয়েও ৩৪০বিঘা খাস হওয়া জমি থেকে গরিব মানুষ, বর্গাদারদের উচ্ছেদ করতে পারেনি তৃণমূলীরা। উচ্ছেদ হওয়া পাট্টাদার, আইনী অনুমতিতে দীর্ঘদিন ধরে জমির দখল রাখা গরিব কৃষকদের এই সমাবেশ বানচাল করতে দুপুরেও বোলমিরটবে বোমাবাজি করা হয়েছে। মাত্র তিন কিলোমিটার দুরে গোপালপুর নেবুতলা থেকে একজন গ্রামবাসীকেও এদিন সমাবেশে আসতে দেওয়া হয়নি। তাতেও কি! আটকানো যায়নি সমাবেশ ও তার মেজাজকে।

    হাড়োয়ার গোপালপুর-১ ও ২ নম্বর পঞ্চায়েত এলাকা, গোবেরিয়া সহ বিস্তীর্ণ এলাকায় লোনা জল ঢুকিয়ে হাজার হাজার বিঘা জমি দখল করেছিলো জোতদার, জমিদাররা। সেই ষাটের দশক থেকে কৃষকসভার নেতৃত্ব বেনামী ও খাস জমি দখলের সাহসী লড়াইয়ে অবিচল ছিলো হাড়োয়া। শহীদ হয়েছেন পাঁচ জন। কৃষক নেতা সুধাংশু দত্তের গলা কেটে বিদ্যাধরী নদীর চরে ভাসিয়ে দিয়েছিল জোতদারদের দল। তবুও পারেনি। দীর্ঘ লড়াই আন্দোলনের মধ্য দিয়ে তেঁতুলিয়া মৌজার ১২৬৩বিঘা জমির মধ্যে ৫০৮বিঘা খাস জমিতে ১২০৫জনের মধ্যে পাট্টা বিলি করা হয়েছে। বাকি ৭৫৫বিঘা জমিতে আইনী অনুমতিতেই ২০০০কৃষক জমির দখলদারি নিয়েছেন। বাতাগাছি মৌজায় ৮০০বিঘার মধ্যে ৩০০বিঘা জমি ১হাজার মানুষের মধ্যে পাট্টা বিলি করা হয়েছে। বাকি ৫০০বিঘা জমির দখল রয়েছে ১৫০০জন কৃষকের হাতে। নেবুতলা আবাদ মৌজায় ২৮০০বিঘার মধ্যে ২১৮০বিঘা খাস হয়েছে এবং তা কৃষকের দখলে আছে। সুপ্রিম কোর্টের রায়ও রয়েছে এর পক্ষে। মুন্সী ঘেরী মৌজায় ১২০০বিঘা খাস জমির মধ্যে ৫৭০বিঘা জমিতে ১১০৪জন পাট্টাদার রয়েছেন। বাকি ১৩০০বিঘা জমিতে ২৪০০জন নথিভুক্ত বর্গাদার রয়েছেন যাদের মধ্যে অধিকাংশই আদিবাসী।

    লড়াইয়ের ফসলই পুলিসকে সঙ্গে নিয়ে গত সোম থেকে বুধবার দুপুরের মধ্যে বারে বারে সশস্ত্র হামলা চালিয়ে দখল করেছে তৃণমূলীরা। পাট্টাদার, বর্গাদার কিংবা আইনী অনুমতিতে দখলদারিতে থাকা ১০হাজার মানুষকে ৭৬৬৩বিঘা জমি থেকে উচ্ছেদ করা হয়েছে।

    মরণপণ প্রতিবাদ এরই বিরুদ্ধে। বিদ্যাধরী নদীর তীরে মোহনপুর অঞ্চলের রামজায়ঘেরীর বাসিন্দা আদিবাসী মহিলা রীতা সর্দার এদিন নিজে নিজেই এসেছিলেন আট কিলোমিটার দূরে এই সমাবেশে। কেন? ‘আমার স্বামী অনেকদিন মারা গেছে, লাল পার্টি করতো। মাত্র ১বিঘা জমি আছে, বছরের এই সময়ে ধান চাষ করি, বাকি সময় মাছ চাষের জন্য ভাড়া দিই। জানেন, তিন ছেলেই বাইরে থাকে। সেদিন রাতে ওরা গোটা বাড়ি ভেঙেচুরে ঐ পাট্টার কাগজটুকুও নিয়ে গেছে, বলেছে যদি তৃণমূল করি তবে জমিতে চাষ করতে দেবে, এই পড়ে থাকা শাড়িটা ছাড়া আর কিছু নেই, সব কিছই ভেঙে লুঠপাট করেছে, বাসনপত্রও নেই’।

    নিদারুণ সেই যন্ত্রণাবিদ্ধ মানুষজনকে কিছুটা আশ্বস্ত করতেই এদিন বামফ্রন্ট প্রতিনিধিদলের এই সফর। এদিনের এই সমাবেশে সুভাষ নস্কর বলেন, মুখে মা-মাটি-মানুষের কথা বললেও এই সরকার আসলে গরিব বিরোধী কাজকর্মই করছে, গরিবের কাছ থেকে জমি কাড়ছে আর মুখে বলছে তাঁরা কৃষক প্রেমী। আমরা বিধানসভাতেও এই বিষয়টা তুলব, গরিবের পাশে বামফ্রন্ট সর্বশক্তি নিয়ে থাকবে। সমাবেশে বিশ্বনাথ কারক বলেন, হুগলী জেলার গোঘাটে ছোটবেলায় বাবা কাকাদের দেখেছিলাম জমিদারদের বিরুদ্ধে লড়তে। আবার সেই হায়নার দল মাথা তুলছে। আন্দোলনকে তীব্র করে এই ষড়যন্ত্রকে রুখবোই। সমাবেশে গোটা হাড়োয়া ব্লক জুড়ে নির্বাচনের পর থেকে তৃণমূলী সন্ত্রাসের খতিয়ান তুলে ধরে অমিতাভ নন্দী বলেন, কৃষক, বর্গাদারদের সংগঠিত করেই প্রতিরোধ আন্দোলন গড়ে তুলবো আমরা। সন্ত্রাসকে গণ-জমায়েত করেই রুখবে গরিব মানুষ, পাশে থাকবে লাল পতাকা। সমাবেশ সভাপতিত্ব করেন কৃষক নেতা নারায়ণ মণ্ডল। এছাড়াও বক্তব্য রাখেন কৃষক নেতা আলি হোসেন, ফরওয়ার্ড ব্লকের তরফে রঞ্জিত চৌধুরী, সি পি আই-র তরফে স্বপন ব্যানার্জি।

Advertisements

Tags: , ,

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s


%d bloggers like this: