Haroa-Day 6… Statement of the Victims… New Onslaught…

 

সরাসরি কৃষকদের লক্ষ্য করেই গুলি চালিয়েছে পুলিস

নিজস্ব সংবাদদাতা

haroa victims1

    হাড়োয়া, ১০ই জুলাই— ‘তখন মাত্র ২০০ফুট দূরত্বে পুলিস ও তৃণমূলের সশস্ত্র যৌথবাহিনী। হঠাৎই তৃণমূলীদের পিছন দিকে চলে যেতে বলে একেবার সামনের দিকে বন্দুক উঁচিয়েই এগিয়ে আসতে শুরু করে পুলিস। প্রথমেই শূন্যে দু রাউন্ড গুলি ছুঁড়লো। তৃণমূলের লোকজন তখন পেছনে। আমরাও সংখ্যা প্রায় হাজারখানেক কৃষক। প্রতিবাদ করলাম। কিন্তু কোন কিছু না শুনেই এতবড় জমায়েতকে লক্ষ্য করেই গুলি চালাতে শুরু করলো পুলিস। প্রচুর মানুষ মারা যেতো, না পালাতে পারলে…’।

    শনিবার পুলিস-তৃণমূল যৌথভাবে আদিবাসী, গরিব কৃষকদের ওপর যে বর্বরতা চালিয়েছিলেন তাঁরই নিদারুণ বর্ণনা এদিন দিয়েছেন পুলিসের গুলিতে জখম হওয়া গরিব কৃষকেরাই। শিউরে ওঠার মত সে অভিজ্ঞতা।

    শনিবার গাজীতলায় পুলিসের গুলিতে জখম চার গরিব আদিবাসী কৃষকের চিকিৎসা এদিন শুরু হয়েছে। শনিবার সকালের ঐ তাণ্ডবের পর দিনভর চিকিৎসার কোন সুযোগও পাননি তাঁরা। গোটা এলাকা অবরুদ্ধ করে রেখেছিলো সশস্ত্র তৃণমূলী ও পুলিস বাহিনী। এদিন সি পি আই (এম) কর্মীরাই উদ্ধার করে আহত ঐ চারজন আদিবাসী পাট্টাদার ও কৃষককে হাসপাতালে ভর্তি করেন। আহতদের মধ্যে মন্টু সর্দারকে সরকারী হাসপাতালে ও বাকি তিনজনকে একটি নার্সিংহোমে ভর্তি করা হয়েছে। চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, আঘাতের মাত্রা গুরুতর হলেও সকলেই মোটামুটি বিপদমুক্ত। এদিন সাহারাব সর্দার ও কানাই সর্দার শোনাচ্ছিলেন শনিবার সেই ভয়ঙ্কর তাণ্ডবের বিবরণ। তাঁদের কথায়, পুলিসের এই মূর্তি কখনো দেখিনি, প্রকাশ্যে তৃণমূলকে সঙ্গে নিয়েই ওরা যেভাবে আমাদের ঝাঁপিয়ে পড়লো তা ভাবা যায় না’।

    গোটা ঘটনার বিবরণ দিতে গিয়ে তাঁরা দুজন একযোগেই জানালেন,‘শনিবার সকাল ন’টা নাগাদ আমরা হাজার খানেক পাট্টা প্রাপক ও কৃষক মিছিল করেই তেঁতুলিয়া আবাদের গাজীতলা ঘেরিতে গিয়েছিলাম। গত মঙ্গলবার হামলা চালিয়ে সেখান থেকে আমাদের সকলকেই উচ্ছেদ করে দেওয়া হয়েছে,পাট্টার কাগজ থাকলেও নিজেদের জমিতে চাষের জন্য নামতে পারছিলাম না আমরা।’ সাহারাব সর্দার ও কানাই সর্দারের ঐ ঘেরিতে ১৬শতক করে পাট্টার জমি রয়েছে। কীভাবে পরিকল্পিত হামলা হয়েছে তার বিবরণ দিতে গিয়ে বলছিলেন, ‘বাঁধের ওপর চারদিক থেকে মিছিল আসায় আগেই থেকেই ঘেরিতে জড়ো হওয়া তৃণমূলীরা প্রথমে বোমা ছুঁড়তে শুরু করে। কিন্তু তবুও ভয় না পেয়ে আমরা সবাই মিলে এগোতে শুরু করি। আমাদের দেখে তৃণমূলীরাই পিছু হটতে শুরু করে। এরপর মাছরাঙার কাছে বিদ্যাধরী সাঁকোর সামনে আমরা থেমে যাই।’

    এরপরেই সেই পুলিসী তাণ্ডবের সেই ভয়ঙ্কর দৃশ্য। জখম আদিবাসী কৃষকদের কথাতেই, ঠিক সকাল ১০টা নাগাদ এরপর তৃণমূলীরা ফের হামলা চালাতে আসে। উত্তর পূর্ব কোণ আমতা খাটরার দিক থেকেই সশস্ত্র তৃণমূলীরা হামলা চালায়। কিন্তু সংখ্যায় কৃষকরাই বেশি থাকায় তৃণমূলীরা তেমন সুবিধা করতে পারেনি। তৃণমূলকে পিছু হটতে দেখে ঘটনাস্থলে আসে প্রায় ১০০পুলিস কর্মী। পুলিসকে সঙ্গেই নিয়েই আবার সেখানে আসে তৃণমূলীরাও। চলে যৌথ আক্রমণ। কৃষকদের সন্ত্রস্ত করতে শূন্যে দু’রাউন্ড গুলিও ছোঁড়ে পুলিস। পুলিস ও তৃণমূলী বাহিনীর এবং কৃষকদের জমায়েতের মধ্যে মাত্র ২০০ফুটের দূরত্ব ছিলো সেসময়। উন্মত্ত তৃণমূলীদের পিছন দিকে সরিয়ে দিয়ে পুলিস বন্দুক উঁচিয়েই এরপর এগোতে থাকে জমায়েতের দিকে। অস্ত্র থাকা সত্ত্বেও কেন তৃণমূলীদের গ্রেপ্তার করা হলো না, সে প্রশ্ন তুলে গরিব কৃষকরা সেসময় প্রতিবাদ জানাতে শুরু করেন। এতেই পুলিস উত্তেজিত হয়ে পড়ে। তখন মুখোমুখি কৃষক আর পুলিস।

    সাহারাব সর্দারের কথায়, ‘বেলা প্রায় তিনটে নাগাদ আরো ১০গাড়ি পুলিস আসে। আমাদের দিকে বন্দুক তাক করে পালাতে বলে। পুলিসের সামনেই সে সময় চার-পাঁচটা আলাঘরে আগুন লাগিয়ে দেয় তৃণমূলীরা। বিকাশ বেড়া নামে একজন গ্রামবাসীকে বেধড়ক মারধর করাও হয়। তাঁর নাক দিয়ে রক্ত বেরোতে থাকে। এমনকি ঐ বিকাশ বেড়াকেই পুলিস তৃণমূলের নির্দেশে গ্রেপ্তার করে। এমন সময়েই কিছু না বলে হঠাৎ করে গুলি ছুঁড়তে শুরু করে পুলিস। একদিকে পুলিস অন্যদিকে ছোটন মুন্সীর নেতৃত্বে তৃণমূলীরা গুলি ছোঁড়ে। পালাতে থাকি আমরা। এই সময়েই পায়ে ও পিঠে গুলি লাগে আমাদের কয়েকজনের। গুলিবিদ্ধ অবস্থাতেই আমাদের গ্রেপ্তার করতে চেয়েছিলো পুলিস। আমরা মল্লিক ঘেরীতে লুকিয়ে পড়ি। কোনমতে রাতে সেখান থেকে বেরিয়ে কলকাতার দিকে রওনা দিই’।

    এমন এক তাণ্ডবের পর যদিও এখনো পর্যন্ত পুলিসের তরফে কোন বিবৃতি দেওয়া হয়নি। ‘মা-মাটি-মানুষের’ কথা বলা রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর কাছ থেকে মেলেনি গরিব কৃষকদের পক্ষে একটি বিবৃতিও। উলটে মমতা ব্যানার্জির পুলিস প্রশাসনের তরফে এই ঘটনায় একজন সি পি আই (এম) কর্মীসহ পাঁচজন নিরাপরাধ স্থানীয় গ্রামবাসীকেই গ্রেপ্তার করা হয়েছে। (এর বিপরীতে স্মরণ করুন – আসানসোলে একজন মাফিয়ার মৃত্যুর পর একঘন্টার মধ্যে বিবৃতি প্রদান ও সঙ্গে সঙ্গে ক্ষতিপূরণের অঙ্ক ঘোষণা)।

    এদিকে গরিব কৃষক, পাট্টাদারদের উচ্ছেদ করে পুলিসি সহায়তায় তৃণমূলী তাণ্ডব এদিনও অব্যাহত ছিলো হাড়োয়ায়। মাত্র ২৪ঘণ্টা আগে এই ব্লকের তেঁতুলিয়া আবাদ মৌজার যেখানে পাট্টাদার, কৃষকদের ওপর গুলি চালিয়েছিলো পুলিস সেই গাজীতলায় ঘেরি দখল লুঠপাট চালালো সশস্ত্র তৃণমূলীরা। পাহারা দিল পুলিস।

    জমি বেহাত হয়ে গিয়েছিলো আগেই। এতদিন ধরে কোনমতে টাকা খাটিয়ে যে মাছ চাষ করেছিলেন গরিব মৎসজীবী, পাট্টাদারেরা— তাও এবার লুট করে নিলো তৃণমূলীরা। গোটা তেঁতুলিয়া আবাদ মৌজায় রবিবার সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত প্রায় কোটি টাকার মাছ লুট করেছে তৃণমূলীরা। নির্বিচারে লুঠপাট চালিয়েছে তৃণমূলীরা, আর গোটা এলাকা ঘিরে পাহারা দিয়েছে হাড়োয়া থানার পুলিসবাহিনী। রবিবারও সকাল থেকেই তৃণমূলী লুঠপাট শুরু হওয়ার আগে গোটা এলাকা ঘিরে রেখেছিলো পুলিসের সশস্ত্র বাহিনী। যে সমস্ত গরিব কৃষক, পাট্টাদার তৃণমূলী সন্ত্রাসের মধ্যেও কোনমতে গ্রামে রয়ে গেছেন, তাঁরা চোখের সামনে দেখলেন, তাঁদেরই ঘেরি নির্বিচার লুট করলো তৃণমূলীরা। পুলিস ও তৃণমূলের সশস্ত্র বাহিনীর সামনে প্রতিবাদটুকু করারও সাহস পায়নি গরিব মানুষগুলো।

    এই তেঁতুলিয়া আবাদের ১২৬৩বিঘা জমির মধ্যে ৫০৮বিঘা জমি খাস করে ১২০৫জনের মধ্যে পাট্টা বিলি করা হয়েছিল। গত সোম ও মঙ্গলবার সশস্ত্র হামলা চালিয়ে ইতোমধ্যেই সেই জমি থেকে পাট্টাদারদের উচ্ছেদ করেছে তৃণমূলীরা। বাকি ৭৫৫বিঘা জমি আইনী অনুমতিতেই ২০০০কৃষক দখলে রেখে চাষ করছিলেন দীর্ঘদিন ধরে। এই জমিতে মামলা থাকার জন্য বামফ্রন্ট সরকার সে সময় পাট্টা বিলিও করতে পারেনি। যদিও এই জমিতে কৃষকের দখলদারির পক্ষে সুপ্রিম কোর্টের স্থিতাবস্থায় রায় আছে। পুলিস সাহায্য নিয়ে তৃণমূলীরা ৭৫৫বিঘা জমি থেকেও ২০০০কৃষককে ইতোমধ্যে উচ্ছেদ করেছে।

  এদিন সেই তেঁতুলিয়া আবাদের গাজীতলা ভেড়িতেই চাষ করা কোটি টাকার মাছ লুট করে নিলো পুলিস-তৃণমূলী যৌথবাহিনী। সর্বস্বান্ত হলেন ৩২০৫জন গরিব কৃষক, পাট্টাদার ও মৎসজীবী।

Advertisements

Tags: , , , ,

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s


%d bloggers like this: