Wayfarer of Gloom

আঁধারের পথযাত্রী

গৌতম দেব

goutam2    ১৯৭৭ সালে প্রথম যখন বামফ্রন্টের সরকার গঠিত হলো তখন যে কয়েকটি ভয়াবহ সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়েছিল তার অন্যতম — লোডশেডিং-এর নির্মম, নিরবচ্ছিন্ন কশাঘাত। গ্রামেগঞ্জে অর্ধেক জায়গায় বিদ্যুৎ যায়নি; ফলে লোডশেডিং-এর যন্ত্রণা ভোগ করার প্রশ্ন ওঠে না। কিন্তু শহর, গঞ্জ এবং গ্রামের যতটুকু এলাকা বিদ্যুতের আওতায় ছিল সেখানে ৪ ঘণ্টা, ৬ ঘণ্টা, ৮ ঘণ্টা এক চালানে অথবা দুই চালানে লোডশেডিং! কখনও কখনও কাগজে বিজ্ঞাপন দিয়ে জানান দেওয়া হতো — অমুক এলাকা কাল নিষ্প্রদীপ থাকবে; পরশু থাকবে তমুক এলাকা। দেওয়ালে দেওয়ালে কংগ্রেসীরা ছড়া কেটে, ব্যঙ্গচিত্র এঁকে জনগণকে খ্যাপাতে লিখতো — জ্যোতি বসু যেখানে লোডশেডিং সেখানে। আর ছবিতে জ্যোতি বসুর হাতে হ্যারিকেন! নীরবে সহ্য করতে হয়েছে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ। আর সাথে সাথে চলেছে বোঝানোর পালা।

    কেন এই অবস্থা? কে দায়ী? সমাধান কোন্‌ পথে? বিদ্যুৎ এমন জিনিস আজ বললে, কাল বানানো সম্ভব না। ৩/৪ বছর ধরে শুধু টাকা ঢেলে যেতে হবে; তারপর প্রথম ফোঁটা বিদ্যুৎ মিলবে। জ্যোতি বসু নীরবে গালমন্দ হজম করে, টাকা ঢেলে গেছেন নতুন নতুন বিদ্যুৎ কেন্দ্র গড়ে তোলবার জন্য। শুধু মানুষের বাড়িতে আলো, পাখা চালাবার জন্য বিদ্যুতের দরকার হয় না; বিদ্যুতের গুরুত্বপূর্ণ ভোক্তা শিল্পকারখানা এবং কৃষি। বিদ্যুৎ ছাড়া সেচ অচল। ১৯৭৭ সালে রাজ্যে যেখানে খাদ্যশস্য উৎপাদন হতো ৭৫ লক্ষ টন; আজ তা ১.৫০ কোটি টনে পৌঁছেছে। দেশে কৃষিতে বাংলা অগ্রগণ্য। এর পিছনে বিদ্যুতের বিরাট ভূমিকা রয়েছে। বামফ্রন্ট সরকারের সুদূরপ্রসারী চিন্তাভাবনার জন্য লোডশেডিং-এর পশ্চিমবাংলা বিদ্যুতের উদ্বৃত্ত রাজ্যে পরিণত হলো ।

    এবারে বিধানসভা ভোটে আমাদের নির্বাচনী ইশ্‌তেহারে বলা হয়েছিল — অষ্টম বামফ্রন্ট সরকার গঠিত হলে তার অন্যতম কাজ হবে রাজ্যের যে-সমস্ত বাড়িতে এখনও বিদ্যুতের সংযোগ হয়নি, তা এই সরকারের সময়কালে সম্পন্ন করা হবে। এ প্রসঙ্গে উল্লেখযোগ্য যে, আগের বিধানসভা ভোটের সময় (২০০৬) আমাদের ঘোষিত কর্মসূচী ছিল সব মৌজায় বিদ্যুৎ নিয়ে যাওয়া। সে কাজে বড় অগ্রগতি ঘটিয়ে আমরা এবার বাড়ি বাড়ি বিদ্যুতের স্লোগান তুলেছিলাম।

    মমতা ব্যানার্জির দল তৃণমূলও তাদের ইশ্‌তেহারে লিখেছে : ‘‘পাঁচ বছরের মধ্যে ১০০ শতাংশ জমিতে সেচ। ১০০ শতাংশ গ্রামে বিদ্যুৎ পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা নিয়ে কাজে এগোতে হবে।’’

    কিন্তু বিদ্যুতে ঘাটতি রাজ্য পশ্চিমবাংলাকে বিদ্যুতে উদ্বৃত্ত বানিয়ে বসে থাকার জো নেই। সময় এগোয়; রাজ্যের সামগ্রিক উন্নয়নের সাথে সাথে বিদ্যুতের চাহিদাও বাড়তে থাকে। একটা হিসাবে ২০০২ সালের পর ফি বছর প্রায় ৪৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুতের চাহিদা বাড়ছে এই রাজ্যে। এই দিকটা নজরে রেখে বিদ্যুৎ উৎপাদনের দিকটা অবহেলা করলে আবার রাজ্যটা ঘাটতি রাজ্যের দলে নাম লেখাবে। দেওয়ালে হ্যারিকেন আঁকতে হবে। রাজ্যে তিনটি ক্ষেত্র — নগরায়ন, কৃষি এবং শিল্পে চাহিদা বেড়েই চলেছে। এই অবস্থায় গত অর্থবর্ষে নতুন তিনটি ইউনিটে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু করে বামফ্রন্ট সরকার! সাগরদিঘি – ৩০০ মেগাওয়াট, বক্রেশ্বর ২১০ মেগাওয়াট; বেসরকারী সংস্থার ২৫০ মেগাওয়াট, ‍‌মোট ৭৬০ মেগাওয়াট যুক্ত হয়। তা সত্ত্বেও, ক্রমবর্ধমান চাহিদা আর সঠিক গুণমানের কয়লা পেতে অসুবিধা হওয়ায় চাহিদা ও জোগানের পার্থক্য বাড়ছে।

    এই অবস্থায় কাটোয়া তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রটির গুরুত্ব খুবই বেশি। দুটি ৮০০ মেগাওয়াটের মিলিত ক্ষমতা হবে ১৬০০ মেগাওয়াট। এটি করার কথা ভারত সরকারের এবং এন টি পি সি’র মাধ্যমে। বামফ্রন্ট সরকার বুঝতে পেরেছিল যে, যুদ্ধকালীন তৎপরতায় নতুন নতুন বেশ কয়েকটা বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রের কাজ শুরু এবং ২/৪ বছরের মধ্যে শেষ করতে না পারলে আমাদের রাজ্য পুনরায় ব্যাপক লোডশেডিং-এর মুখে পড়বে। কৃষক, আদিবাসী, গরিব মুসলমানদের বাড়িতে বিদ্যুতের আলো পৌঁছে দিতে এবং মাঠে মাঠে স্যালো এবং গভীর নলকূপগুলিকে বিদ্যুৎশক্তিতে চালাবার জন্য প্রচুর পরিমাণে বিদ্যুৎ লাগবে। বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলি বানাতে স্বাভাবিকভাবেই খানিকটা জমি লাগবে। একটা হিসাবে প্রতি মেগাওয়াট পিছু জমির প্রয়োজন হয় ০.৬৫ একর। বিদ্যুৎকেন্দ্রে কয়লা মজুত রাখতে, ফ্লাই অ্যাশ পন্ড্‌ নির্মাণ করতে জমির দরকার হয় বেশি।

    বর্ধমানের কাটোয়া প্রকল্পটি ১৬০০ মেগাওয়াটের এবং এরজন্য জমি লাগবে ১০৩৫ একর, যার মধ্যে আমরা সরকারে থাকার সময় ৪৮৫ একর অধিগ্রহণ করেছিলাম। বাকিটাও করা সম্ভব হতো যদি তখনকার বিরোধী তৃণমূল সাহায্য করতো। মমতার নীতি অনুযায়ী সাহায্য করা তো দূরে থাক। জমিতে ঝাণ্ডা পুঁতে তৃণমূলীরা লড়াই শুরু করে ছিল — জমি দেব না, স্লোগান তুলে। ৯০০০ কোটি টাকার প্রকল্পটি মুখ থুবড়ে পড়লো। এখন ওরা সরকারে। এখানে এবং দিল্লিতে। ভারত সরকারের প্রতিষ্ঠান এন টি পি সি ইতোমধ্যে ১৩৫ কোটি টাকা খরচ করে ফেলেছে। বাকি জমিটা দরকার। এ-দরজা ও-দরজায় ঘুরে বেড়াচ্ছে।

    অন্যদিকে মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি বলে দিয়েছেন — কাটোয়ার জন্য আর এক ইঞ্চি জমিও অধিগ্রহণ করা যাবে না। মুখ্যমন্ত্রী এই কথা সাফ সাফ এন টি পি সি চেয়ারম্যানকে বলে দিয়েছেন এবং এন টি পি সি-কে বলেছেন যে, যে ৪৮৫ একর জমি পেয়েছেন তার উপরেই প্রকল্পটি গড়ে তুলুন! অন্যদিকে অফিসার, প্রযুক্তিবিদ্‌দের বক্তব্য হচ্ছে ৪৮৫ একর জমিতে ১৬০০ মেগাওয়াটের প্লান্ট বসানো অসম্ভব এবং অবাস্তব। এছাড়া ৪৮৫ একর জমি সবক্ষেত্রে এক লপ্তেও না। জমি সরাসরি কৃষকদের কাছ থেকে ক্রয় করার প্রশ্নে ভারত সরকারের এই প্রতিষ্ঠানটির বক্তব্য— না, সেটা সম্ভব নয়। যা জমি লাগবে সেটা সরকারকেই জোগাড় করে দিতে হবে।

    অথচ বিদ্যুৎ বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য হচ্ছে আগামী বছর (২০১২) থেকে পিক আওয়ারে এই রাজ্যে ঘাটতি ভালোরকম বাড়বে। ২০১২, ২০১৩, ২০১৪, ২০১৫ সালে এই ঘাটতি ক্রমান্বয়ে বাড়তে থাকবে। শেষের দিকে ঘাটতি ৪০০০ মেগাওয়াট ছাড়িয়ে যেতে পারে। অর্থাৎ বিদ্যুৎ ব্যবস্থাটা ভেঙে পড়বে।

                                  ******      ******

    বর্তমানে ইস্টার্ন মেট্রোপলিটন বাইপাসের অবস্থা দিন-রাতের বেশিরভাগ সময় কলকাতা শহরের ভিতরের আর পাঁচটা মন্থর গতির রাস্তার মতো হয়েছে। প্রধানত, গাড়ির সংখ্যা বৃদ্ধি এর মূল কারণ। এটা বুঝে বামফ্রন্ট সরকার দুটি কাজ হাতে নিয়েছিল। এক, কয়েকটা গুরুত্বপূর্ণ জংশনে লম্বা ফ্লাইওভার; দুই বাইপাসের সমান্তরালভাবে পূর্বদিকে (২/৩ কিলোমিটার দূরে) আর একটা বাইপাস — বারাসত-রায়চক সড়ক নির্মাণ। অনেকটা স্থায়ী সামাধান পরেরটায় আছে। মমতার ভৈরববাহিনী ভাঙড়ের মুসলমান গ্রামে গিয়ে লোক খ্যাপাতে শুরু করলো। সেটা করতে গিয়ে কোনো সীমা পরিসীমা রাখলো না। আমাদের বিরুদ্ধে তর্জনী তুলে অভিযোগ করলেন — সংখ্যালঘু মুসলমানদের জমি কেড়ে নেওয়া হচ্ছে! রুখবো। রক্ত দেবো! ইত্যাদি প্রভৃতি। গেল আটকে। কে গুলি চালিয়ে ‘‘শয়তানের’’ তকমা বয়ে বেড়াবে? আর ‘‘সভ্য দুনিয়া’’ যখন জমি নেওয়ার বিরুদ্ধে! শক্তি প্রয়োগের বিরুদ্ধে!

    কাজটা করতে দিলে এতদিনে কলকাতা-শিলিগুড়ি জাতীয় সড়ক সম্প্রসারণের কাজ শেষ হয়ে যেত। যার অর্থ কলকাতা থেকে ৬/৭ ঘণ্টায় শিলিগুড়ি। একটা রাস্তায় গাড়ি যাবে; আরেকটায় আসবে। শিলিগুড়ির দিকে খানিকটা কাজ হয়ে গেছে। ঐ রাস্তা দেখার পর কলকাতার কাছাকাছি রাস্তাটির কাজ বন্ধ রাখাটা একটা ক্রিমিনাল অফেন্স বলে যে কারোরই মনে হবে।

    উত্তরবাংলার দুই গুরুত্বপূর্ণ জেলা জলপাইগুড়ি এবং কোচবিহার। মাথার উপর ভুটান। সেখানে চুখাসহ অন্যত্র উৎপাদিত হচ্ছে বিপুল পরিমাণে জলবিদ্যুৎ। কোচবিহার, জলপাইগুড়ি সীমান্তে ৪০০ একর জমির উপর গড়ে উঠবে এই পাওয়ার স্টেশন। জমি অধিগ্রহণের প্রক্রিয়া চলছে। এখন সেখানে ‘ভূমি রক্ষা কমিটি’ গঠিত হয়েছে। ভুটানে উৎপাদিত বিদ্যুতের একটা অংশ এই পাওয়ার স্টেশন থেকে দুই জেলায় সরবরাহ করা হবে। প্রায় ৬ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ ধারণ করতে পারে এমন ক্ষমতাসম্পন্ন পাওয়ার স্টেশন। অন্যদিকে দুটি জেলায় প্রয়োজন বছরে ৪ হাজার মেগাওয়াট। ফলে অন্যত্রও পাঠাতে পারবে। প্রকল্পটি করতে খরচ হবে ৪ হাজার কোটি টাকা। ভারত সরকারের পাওয়ার গ্রিড কর্পোরেশন এটা করছে। তারা স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে যে, জমি না পাওয়া গেলে তারা আসাম অথবা বিহারে চলে যাবে। মমতার শেখানো লাইনে ওখানেও জমি-বাঁচাও-এর নেতারা প্রশাসনের ডাকা সভা বয়কট করে চলেছে।

                               ******         ******

    এ প্রসঙ্গে মমতাকে দেবী দশভুজায় পরিণত করার প্রধান কারুকৃৎ একটি অগ্রগণ্য পত্রিকার (আঃ বাঃ পত্রিকা) সম্পাদক মহাশয় তার সম্পাদকীয় স্তম্ভে যা লিখেছেন, তার খানিকটা হুবহু তুলে ধরার লোভ সংবরণ করা গেল না। ‘‘পরিবর্তন চাই’’ শিরোনামের সম্পাদকীয়তে সম্পাদক মহাশয় লিখেছেন :

    ‘‘কৃষি জমি অধিগ্রহণ করা চলিবে না — মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই বহুল প্রচারিত নীতি, নীতিগতভাবেই, উন্নয়নের পরিপন্থী। পশ্চিমবঙ্গের কিছু এলাকা বাদ দিলে কার্যত সব জমিই কৃষি জমি। শিল্প, পরিকাঠামো, নগরায়ন ইত্যাদির জন্য জমি আবশ্যক, সুতরাং কৃষি জমি আবশ্যক। মুখ্যমন্ত্রীর প্রস্তাব মাফিক, যাহার যত জমি প্রয়োজন, সরাসরি কৃষকের নিকট হইতে কিনিয়া লইতে পা‍‌রিলে গোল ছিল না। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে তাহা সম্ভব নহে, কারণ এখানে জমির মালিকানা সাধারণত অতিমাত্রায় খণ্ডিত। সুতরাং সরকারকে অন্তত কিছু জমি অধিগ্রহণ করিতেই হইবে। সেই অধিগ্রহণ যথাসম্ভব মসৃণভাবে, উপযুক্ত ক্ষতিপূরণের ভিত্তিতে হউক তাহাই কাম্য, কিন্তু সর্বক্ষেত্রেই ‘‘ইচ্ছুক’’ কৃষকের জমি পাওয়া যাইবে, এমন আশা অবাস্তব দুরাশা বই কিছু নয়।

    সুতরাং ‘‘অধিগ্রহণ চলিবে না’’ কথাটির অর্থ দাঁড়ায় — উন্নয়ন চলিবে না। কাটোয়ার ঘটনাটি একটি ঘটনামাত্র নহে, এই উন্নয়নবিরোধী নীতিরই প্রতীক। মুখ্যমন্ত্রী অবিলম্বে আপন অবস্থান পুনর্বিবেচনা করুন।’’

   মন্তব্য নিষ্প্রয়োজন।

Advertisements

Tags: , , , , ,

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s


%d bloggers like this: