স্বৈরতন্ত্র রুখতে এখনই সর্বাত্মক আন্দোলন চাই

 

যা খুশি করতে দেব না

দেবাশিস চক্রবর্তী

    এখনও একশ’ দিন হয়নি। রাজ্যে নতুন সরকার তাদের নীতি মোতাবেক কাজ করবে, কেউ আপত্তি করবে না। পছন্দ না হলেও বুঝে নিতে হবে এই সরকারকে যে কোনো কারণেই হোক মানুষ ভোট দিয়ে নির্বাচিত করেছে। সরকারের কাজকর্মের অভিমুখ কোন্‌ দিকে, কাজের ধারাই বা কেমন— তা দেখেশুনে বুঝে নেবার সময় এটি। কোথাও বিরোধিতা থাকলে তা বলা হবে, সুস্থ স্বাভাবিক পদ্ধতিতেই বলা হবে।

    এই পর্যন্ত ঠিকই আছে। মুখ্যমন্ত্রীও স্বাভাবিকের তুলনায় একশ’ গুণ বেশি ‘ফ্রি হ্যান্ড’ নিয়ে চলছেন। একে তাঁর দলে তিনিই এক এবং একমাত্র নেত্রী, তার ওপর কার্যকারণে এখন দেবীবন্দনার পালা চলছে। এখনও তাঁর ইচ্ছাই সরকারের নীতি, তাঁর মনোবাসনাই সরকারের পদক্ষেপ। সুতরাং কেউ কোথাও তাঁকে ‘না’ বলছে না।

    ধরে নেওয়া যাক, এই বাংলায় এই ঋতুতে এ পর্যন্তও ঠিক আছে।

   কিন্তু, যাদের ঘরে আগুন জ্বলছে, যাদের ভিটে এখন নিষিদ্ধ দেশ, যাদের উঠোনে রক্ত ধুয়ে যায়নি বর্ষাতেও, যাদের শস্যের মাঠে প্রেতচ্ছায়া, যাদের ঘটিবাটি বন্ধক গেছে মহাকরণে সরকার বদলছে বলে, যাদের শ্বাসপ্রশ্বাস নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে তিলক-কাটা সর্দারদের ফরমানে, তাদের কী হবে?

    এমন হচ্ছে নাকি? মুখ্যমন্ত্রী বলেছেন, দূরবীন দিয়েও এমন কোনো দৃশ্য তাঁর চেখে পড়ছে না। তাঁর চোখে পড়বে না কেননা যে রাজনীতি তাঁকে মুখ্যমন্ত্রী করেছে, যে রাজনীতি তাঁকে মুখ্যমন্ত্রী করে রাখতে চায়, সেই রাজনীতিই বাংলার গ্রামে-গঞ্জে তাঁরই পূজার মঞ্চ তৈরি করছে। রক্ত সেই আয়োজনের অনিবার্য উপচার।

    স্বভাবসজ্জনদের অনেকের কাছেও এমন কোনো খবর নেই। তাঁদের কারো কারো ততক্ষণ কোনো দৃশ্য দেখার সাহস হবে না, যতক্ষণ নতুন মুখ্যমন্ত্রী তা না দেখতে বলছেন। কারো কারো ফের শুদ্ধ শিল্পচর্চার সময় এসে গেছে। আরো কেউ হয়তো এটুকু ভেবেই আত্মপ্রসন্ন যে তাঁর শরীরে এসব অস্বস্তিকর খবরের কোনো আঁচ লাগছে না। আরো একটা কারণ হতে পারে সত্তর দশকের পরিচিত অন্ধকারের সঙ্গে এবারের আঁধারের কিছু পার্থক্য আছে। নতুন ধরনের সন্ত্রাসও দেখছে এই প্রায়-একশ’ দিন।

    গত আড়াই মাসে রাজনৈতিক কারণে খুন হয়েছেন ৩০জন বামপন্থী কর্মী। এই তিরিশ শুধু সংখ্যা নয়। এঁদের ১০জন সংখ্যালঘু, ৩জন আদিবাসী, ১১জন তফসিলী জাতিভুক্ত, ৩জন মহিলা। রয়েছেন খেতমজুর, গরিব কৃষক, দিনমজুরি করে খাওয়া মানুষ। কেউ কেউ বামপন্থী আন্দোলনের সামনের সারির সংগঠক, যেমন গড়বেতার জিতেন নন্দী, যাঁকে পিটিয়ে মারা হয়েছে। আবার কেউ অতি সাধারণ বামপন্থী সমর্থক, যেমন মাড়গ্রামের মহম্মদ খোদারাখা, যে প্রবীণ মানুষ পার্টিনেতাদের আক্রমণের হাত থেকে বাঁচাতে মাঝখানে দাঁড়িয়ে গিয়েছিলেন বুক চিতিয়ে।

    হত্যা সন্ত্রাসের চেনা চেহারা। বেঁচে আছেন কিন্তু নিজের ঘরে নেই এমন সংখ্যা প্রায় ১৪হাজার। পশ্চিম মেদিনীপুর থেকে হুগলী, হাওড়া থেকে উত্তর ২৪পরগনা। এদের কয়েকশ’র ঘর লুট হয়েছে, আগুনে পুড়েছে। বাকিদের স্রেফ বেঁচে থাকার জন্য গ্রাম, শহরেরও নির্দিষ্ট এলাকা থেকে পালিয়ে আসতে হয়েছে। এই ঘরছাড়ারা অনেকেই পরিবারশুদ্ধু গ্রাম ছেড়েছেন, কোথাও আত্মীয় বাড়িতে, কোথাও কোনো আশ্রয়ে আছেন। এমনও নয় যে সকলেই একেবারে সামনের সারির বামপন্থী কর্মী, গোটা গ্রামজুড়ে তাণ্ডবের পরিণতিতে তাঁরা আর নিজের ভিটেয় ফিরতে পারেন না। এঁদের ঘরের শিশুরা ২২শে শ্রাবণের মিছিলে হাঁটতে পারেনি রবিঠাকুরের গান গেয়ে। কেননা তারা আর ইস্কুলেই যায় না।

    নতুন আতঙ্ক ‘জরিমানা’। গ্রামবাংলায় মুখে মুখে ফিরছে ‘ফাইন’ শব্দটি। আসলে বিশুদ্ধ তোলা আদায়। শুরু হয়েছিল বামপন্থী আন্দোলনের নেতা-কর্মীদের দিয়ে। এখন আর সেখানে সীমাবদ্ধ নেই। তৃণমূলের কর্মীরা ‘জরিমানা’ ধার্য করছে, কোথাও কোথাও চিঠি লিখেও ফতোয়া দিচ্ছে। হাজার টাকা থেকে দু’লাখ-পাঁচ লাখ পর্যন্ত। এই টাকা দিলে গ্রামে-গঞ্জে থাকার ন্যূনতম অধিকার, না হলে একদিন আক্রমণ এবং প্রাণ হাতে নিয়ে পালাতে হবে। গণশক্তির নিয়মিত পাঠকরা জানেন, একবিংশ শতাব্দীর জিজিয়া করের এমন অনেক প্রতিবেদন গণশক্তিতে প্রকাশিত হয়েছে। তবে সামান্যই প্রকাশিত হচ্ছে। পুলিসের কাছে অভিযোগের সংখ্যা খুবই কম, প্রকাশ্যে এই তোলার কথা জানানোর ঝুঁকি প্রায় কেউই নিচ্ছেন না। এর মধ্যেও হিসেব করে দেখা গেছে, রাজ্যের ১২জেলাতেই অন্তত ১১কোটি টাকা ‘জরিমানার’ নামে আদায় করেছে তৃণমূল। গরিব কৃষককে ঘটিবাটি বেচে এই তোলা দিতে হয়েছে।

    সন্ত্রাসের নতুন চেহারা পার্টি অফিস দখল ও মিথ্যা মামলার সাঁড়াশি অভিযান। গণতন্ত্রে ভোটে হারলে কোনো রাজনৈতিক দল আর স্বাভাবিক কাজকর্ম করতে পারবে না, এমন নিয়ম কোন্‌ সংবিধানে চালু? রাজ্যের বিভিন্ন জেলায় ৭০০-র বেশি সি পি আই (এম) অফিস হয় ভেঙে দেওয়া হয়েছে, নয় দখল করা হয়েছে। তৃণমূলের ঝাণ্ডা উড়ছে অথবা তালা বন্দী করে দেওয়া হয়েছে অসংখ্য ছোট-বড় অফিস। সি পি আই (এম)-র কথা বলা ঘোষিত অপরাধ। মুখ্যমন্ত্রী ও তাঁর দলের নেতারা বিলক্ষণ জানেন এতে শেষ পর্যন্ত সি পি আই (এম)-কে আটকানো যাবে না। চেষ্টা হচ্ছে দলের প্রথম সারির সংগঠক, ছোট এলাকার কর্মীদের মিথ্যা মামলায় জড়িয়ে দেওয়ায়। যে কোনো রকম অভিযোগ, অকল্পনীয় চরিত্রের অভিযোগ দায়ের করে শত শত মামলায় ইতোমধ্যেই জড়িয়ে দেওয়া হয়েছে পার্টির নেতা-কর্মীদের। সরাসরি বলা ভালো, বামপন্থী আন্দোলনকে গলা টিপে মারার চেষ্টা হচ্ছে।

    সন্ত্রাসের নতুন চেহারা মহিলাদের ওপর আক্রমণ। হাড়োয়া, আরামবাগ, পশ্চিম ও পূর্ব মেদিনীপুরের একাধিক জায়গার সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। ধর্ষণ, শ্লীলতাহানি ছাড়াও অন্যান্য ধরনের শারীরিক-মানসিক আক্রমণ চালানো হচ্ছে। গ্রামের অখ্যাত মহিলারাই শুধু নন, বিধানসভা নির্বাচনে বামফ্রন্টের প্রার্থীকেও প্রকাশ্য রাস্তায় শারীরিক ভাবে জঘন্য লাঞ্ছনার ঘটনা ঘটেছে। বিচ্ছিন্ন দুষ্কৃতীদের কাজ নয়, মহিলাদের ওপর পরিকল্পিত আক্রমণের মাধ্যমে সন্ত্রাসকে অনেক গভীরে ছড়িয়ে দেওয়া যায়। অন্যান্য ফলাফল ছাড়াও গত কয়েক বছরে প্রাণের আনন্দে যেভাবে পশ্চিমবঙ্গের গ্রাম-গঞ্জের মহিলারা স্বনির্ভরতাসহ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হচ্ছিলেন, তার বারোটা বাজতে শুরু করেছে। আতঙ্ক মেয়েদের আবার ঘরে ঢোকাতে শুরু করেছে।

    সন্ত্রাসের নতুন লক্ষ্য জমি। এ কেবল আজ আর কালের কথা নয়। সামন্তবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের দীর্ঘ ঐতিহ্যে, বহু জানকবুল লড়াইয়ের ফসল হিসেবে এ রাজ্যে ভূমিবিন্যাসের নিজস্ব বৈশিষ্ট্য আছে। সারা দেশে যত ভূমিসংস্কার হয়েছে তার কুড়ি শতাংশের বেশি হয়েছে এ রাজ্যেই। প্রায় ৯০শতাংশ কৃষিজমির কার্যকরী মালিকানা, ফসলের বৈধ অধিকার ছোট, গরিব, প্রান্তিক, মাঝারি কৃষকের হাতে। এখন এই বিন্যাস আক্রান্ত। কৃষকসভার সংযমী হিসেবে গত আড়াই মাসে ৫২৭জন কৃষকের ১হাজার একর রায়ত জমি কেড়ে নেওয়া হয়েছে। ৪৭০০পাট্টাপ্রাপককে ২৭০০একর জমি থেকে উচ্ছেদ করা হয়েছে, ৩৭১০জন বর্গাদারকে ১৫৮৭একর জমি থেকে উচ্ছেদ করা হয়েছে, ১৪০২৫জনকে ৩৪৯০একর বৈধ দখলী জমি থেকে উচ্ছেদ করা হয়েছে। অর্থাৎ, সব রকমের জমির ওপরেই আক্রমণ চলছে। প্রথম বর্ষায় রোওয়া বীজ নষ্ট করে দেওয়া হয়েছে ট্রাক্টর চালিয়ে; পুলিসকে সঙ্গে নিয়ে দখল করা হয়েছে ভূমিসংস্কারে পাওয়া জমি। সাত পুরুষের জমিচোরের কিছু বংশধর তৃণমূলের ঝাণ্ডা নিয়ে আবার মাঠে মাঠে শকুন-দৃষ্টি নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। এমন এক বাস্তবতা যা তিন দশক ধরে বাংলার গ্রাম দেখেনি।

    সন্ত্রাসের নতুন লক্ষ্য পঞ্চায়েত। সত্তরের দশকে জীবন্ত পঞ্চায়েত ছিলো না। তিন দশকে যাবতীয় দুর্বলতা সত্ত্বেও এই পঞ্চায়েত এমন এক প্রতিষ্ঠান যেখানে গ্রামের মানুষের অধিকার আছে। ওপর থেকে ছুঁড়ে দেওয়া অধিকার না, পরিকল্পনা থেকে রূপায়ণ— সামগ্রিক অধিকার। ২০০৮-র পঞ্চায়েত ভোটে অনেক জায়গাতেই বামফ্রন্টের পরাজয় ঘটেছিল। আবার তিন স্তরের অধিকাংশ পঞ্চায়েতে বামপন্থীরা জিতেছিলেন। জেতা-হারা নির্বিশেষে পঞ্চায়েত নিজের অধিকারেই কাজ করেছে, গণতন্ত্রকে আরো প্রসারিত করতে গ্রামোন্নয়ন সমিতি গড়ে তোলা হয়েছিল জয়ী-পরাস্ত উভয় অংশকেই নিয়ে। ভয়াবহ আক্রমণ নেমে এসেছে গোটা পঞ্চায়েত ব্যবস্থার ওপরেই। নির্বাচিত সদস্যদের কাজ করতে দেওয়া হচ্ছে না। বহু জায়গায় পঞ্চায়েত অফিস বন্ধ। জোর করে কোথাও ইস্তফা লিখে নেওয়া হয়েছে। আরো মারাত্মক, কোথাও কোথাও বামপন্থী সদস্যকে বলা হচ্ছে ইস্তফা দেওয়া চলবে না, তৃণমূলের নেতারা যেমন বলবে তেমন কাজ করতে বাধ্য করা হচ্ছে। তথাকথিত উপদেষ্টা কমিটি গড়েছে তৃণমূল, সম্পূর্ণ বেআইনী, তাদের কথাতেই পঞ্চায়েত চালানোর ফতোয়া জারি হয়েছে। প্রশাসন নির্বিকার, এমনকি আত্মসমর্পণ করে বসে আছে। অবৈধ কাজের তাণ্ডব চলছে। এই সন্ত্রাস শেষ পর্যন্ত দলমতনির্বিশেষে গ্রামের সব গরিবদের স্থায়ী ক্ষতি করে দেবে। বস্তুত, তাঁদের মেরুদণ্ড ভেঙে দিতেই পঞ্চায়েতের ওপর এই আক্রমণ।

    সন্ত্রাসের বিশেষ লক্ষ্য শিক্ষার অঙ্গন। প্রেসিডেন্সির জন্য মেন্টর গ্রুপ, অন্য কলেজের জন্য তৃণমূলের ঝটিকা বাহিনী। শিক্ষাঙ্গনে রাজনীতি নয় বলে ধুয়ো তুলে ৬২টি কলেজে নির্বাচিত ছাত্র সংসদ দখল করা হয়েছে। এস এফ আই বলে নিজের পরিচয় দিতে হলে এখন বড় বিপদের ঝুঁকি নিতে হবে। অনেক কলেজেই বামপন্থী ছাত্রদের প্রবেশ নিষেধ, পরীক্ষার অ্যাডমিট কার্ড নিতেও বাধা দেওয়া হয়েছে বহু জায়গায়। বাসস্থানের এলাকায় গিয়ে খুঁজে খুঁজে বাম ছাত্রকর্মীদের আক্রমণ করছে তৃণমূলের বাহিনী। আবার, বাইরের মস্তানদের লীলাক্ষেত্র হয়ে উঠছে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়। নকল করা আটকেছিলেন বলে শহরতলির ট্রেনে উঠে শিক্ষককে মারা হয়েছে। গ্রামাঞ্চলের বহু স্কুলে কোন্‌ শিক্ষক ঢুকবেন, কে ঢুকবেন না তা নিয়ন্ত্রণ করছে তৃণমূলের নেতারা। এই পর্যায়ে যথেষ্ট মিলও আছে সত্তরের সন্ত্রাসের সঙ্গে। ধাপে ধাপে এগোচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুষ্ঠানে মার্কসের নাম নেওয়ায় মঞ্চে উঠেই বাধা দেওয়া হয়েছে অধ্যাপককে। আসলে চরম সতর্কতা, কার নাম নেবে, তা মমতা ব্যানার্জির নামাবলী গায়ে চড়ানোদের কাছ থেকে জেনে নাও।

    এই সবের প্রতিবাদে বিধানসভার সামনে অবস্থান হলে হয়তো মুখ্যমন্ত্রী বলবেন, ‘এত ব্যস্ততা কীসের?’

    একশ’ দিনও হয়নি। কিন্তু এখনই যদি বাধা দেওয়া না যায়, তাহলে দু’শ, তিনশ’ দিনে এই জমানা পুরোদস্তুর স্বৈরশাহীতে পরিণত হবে। তা হতে দেওয়া যায় না।

    তা হতে দেওয়া যায় না বলেই এখনই বলতে হবে: যা খুশি করতে পারো না তুমি! যা খুশি করতে দেব না আমরা।

Advertisements

Tags: , , , ,

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s


%d bloggers like this: