বাংলার তৃণমূল সরকারের নতুন কীর্তি… Economic Ban in Bengal…

 

রাজ্যে আর্থিক নিষেধাজ্ঞা জারি

নিজস্ব প্রতিনিধি

betone-kop1

………………………………………………………
বেতন, অফিসের ফোন-বিদ্যুৎ বাদে সব খরচে কোপ,
মিলবে না মহার্ঘ ভাতা,
দেওয়া হবে না বকেয়াও
……………………………..……………………….

    কলকাতা, ১৬ই আগস্ট — জনজীবনের সাধারণ পরিষেবা থেকে শুরু করে রাজ্যের উন্নয়নমূলক সমস্ত কাজে ব্যয় সঙ্কোচের সিদ্ধান্ত নিয়েছে তৃণমূলের জোট সরকার। মমতা ব্যানার্জির সরকারের অর্থ মন্ত্রক একটি সরকারী সার্কুলার জারি করে জানিয়েছে, প্রশাসন চালাতে আপাতত বেতন (ডি এ এবং বকেয়া পাওনা বাদ দিয়ে) থেকে শুরু করে অফিস চালাতে টেলিফোন-বিদ্যুৎ বিলের খরচই শুধু করা যাবে। এর অর্থ, অন্য সব ক্ষেত্রে জারি হয়ে গেল আর্থিক নিষেধাজ্ঞা। অতএব সাধারণ মানুষের জন্য পরিষেবা ও রা‍‌জ্যের উন্নয়নমূলক কাজে যে বড়মাপের ধাক্কা দিতে চলেছে রাজ্যের নয়া তৃণমূল জোট সরকার, তাতে কোনও সন্দেহ নেই।

    যদিও মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির কথাবার্তায় একদিকে দ্বিচারিতা, অন্যদিকে মিথ্যাচারিতা, কোনটারই ঘাটতি থাকছে না। শুক্রবার মহাকরণ তার সাক্ষী রইল।

    এদিনই মহাকরণে রাজ্য সরকারী কর্মচারীদের বিভিন্ন সংগঠনের সঙ্গে বৈঠকের সময় মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি বললেন, ‘আপনাদের পে কমিশনের তৃতীয় কিস্তির টাকা কিছুটা কীভাবে দেওয়া যায়, দেখছি।’

    অথচ তাঁরই সরকারের অর্থমন্ত্রক পাঁচদিন আগেই সরকারী নির্দেশনামা (নম্বর ৭৯৭২-এফ ওয়াই) জারি করে স্পষ্ট বলে দিয়েছে, চলতি বছরের ৩১শে ডিসেম্বর যে সব রাজ্য সরকারী কর্মচারী অবসর নেবেন, কেবল তাঁদেরই রোপা-’০৯ অনুযায়ী (বেতন কমিশন) প্রাপ্য তৃতীয় কিস্তির টাকা দেওয়া হবে। অন্যদের ব্যাপারে কিছু বলা নেই সার্কুলারে। ধরে নেওয়া যেতে পারে, এখন বা অদূর ভবিষ্যতে দেওয়া হচ্ছে না!

    মহাকরণে বসা নয়া তৃণমূলী জোট সরকারের এটা যদি মিথ্যাচারিতার একটা উদাহরণ হয়, কিংবা দ্বিচারিতার উদাহরণ, তা আছে আরো। ক’দিন আগেই রাজ্যের মন্ত্রীদের বেতন ‘অত্যন্ত কম’ শুনে মুখ্যমন্ত্রী সবার সামনেই রাজ্যের অর্থমন্ত্রী অমিত মিত্রকে বলেছিলেন, ‘সে কি, বেতন কম কেন? এখনই মন্ত্রীদের বেতন বাড়াবার ব্যবস্থা করুন।’ সেই মুখ্যমন্ত্রীই মঙ্গলবার এখনও ১৬ শতাংশ ডি এ বকেয়া যাঁদের, সেই রাজ্য সরকারী কর্মচারীদের সংগঠনগুলির সঙ্গে বৈঠকে বসে বলেছেন, ‘তিন মাসের মধ্যে কোন ডি এ দিতে পারবো না।’ তিন মাস আগে গত ২৩শে মে এই মুখ্যমন্ত্রীই কর্মচারী সংগঠনগুলির সঙ্গে বসে বলেছিলেন, ‘তিন মাসের মধ্যে আপনাদের ডি এ নিয়ে আমাদের ঘোষণা করবো।’

    স্বভাবতই এদিন মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক সেরে বেরিয়ে রাজ্য সরকারী কর্মচারী সংগঠনসমূহের কো-অর্ডিনেশন কমিটির সাধারণ সম্পাদক অনন্ত বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছেন, ‘কোনও সমাধান সূত্র বের হলো না এদিনের বৈঠকে। সবই উনি দেখবেন বলে শুধু বলেছেন।’

    কিন্তু সে‍‌ই দেখার কথাও যে মিথ্যাচারিতা, তা প্রমাণ হয়ে গিয়েছে গত ১১ই আগস্ট রাজ্য সরকারের অর্থ দপ্তরের জারি করা সরকারী নির্দেশনামার ভাষায়। তাতেই প্রমাণ, ৩৪ বছরে বামফ্রন্ট সরকারের আমলে কখনও এমন হয়নি। তৃণমূলের জোট সরকারের আড়াই মাস কাটতে না কাটতেই কোপ পড়লো রাজ্য সরকারী কর্মচারীদের প্রাপ্য বকেয়া টাকার উপর। গত ১১ই আগস্টের সরকারী নির্দেশনামায় রাজ্য অর্থ দপ্তর জানিয়ে দিয়েছে, রোপা-’০৯ অনুযায়ী রাজ্য সরকারী কর্মচারীদের পাওনা তৃতীয় তথা শেষ কিস্তির বকেয়া এখন দেওয়া হবে না। চলতি আগস্ট মাসেই এই পাওনা দেওয়ার কথা ছিলো। তৃণমূলী জোট সরকারের অর্থ দপ্তর জানিয়েছে, চলতি বছরের ৩১শে ডিসেম্বর যে সব রাজ্য সরকারী কর্মী অবসর নেবেন, কেবল তাদেরই ওই পাওনা দেওয়া হবে। উল্লেখ্য, সাধারণভাবে বছরে ২ শতাংশ রাজ্য সরকারী কর্মচারী অবসর নেন।

    রাজ্য সরকারের অর্থমন্ত্রকের বিশেষ সচিব সি সি ভট্টাচার্য গত ১১ই আগস্ট এই সংক্রান্ত যে সরকারী নির্দেশনামা জারি করেছে, তার নম্বর – ৭৯৭২-এফ (ওয়াই)। এই সরকারী নির্দেশনামাটি মূলত রাজ্য সরকারের ব্যয় সঙ্কোচের নির্দেশনামা। ব্যয় সঙ্কোচের নামেই তৃণমূলী সরকার রাজ্যের ৯৮ শতাংশ রাজ্য সরকারী কর্মচারীদের পাওনা টাকার উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। বেতন কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী রোপা-০৯-এ রাজ্য সরকারী কর্মচারীদের যে বাড়তি অর্থ পাওনা হয়েছিল, তা ২০০৯ সালে বামফ্রন্ট সরকারের আমলে সিদ্ধান্ত হয়েছিল তিনটি কিস্তিতে দেওয়া হবে। ২০০৯ সালেই প্রথম কিস্তির অর্থ দিয়েছিল বামফ্রন্ট সরকার। ২০১০ সালে দিয়েছিল দ্বিতীয় কিস্তির টাকাও। তৃতীয় তথা শেষ কিস্তির টাকা আগেই ঠিক ছিল ২০১১-এর আগস্ট মাসে দেওয়া হবে।

    সেই অনুযায়ী, চলতি বছরের গোড়ায় রাজ্যের বিগত বামফ্রন্ট সরকার বিধানসভায় যে ভোট অন অ্যাকাউন্ট পেশ করেছিল, তাতেও সেই কিস্তির অর্থ প্রদানের সংস্থান রেখে দিয়েছিল। যাতে ভোটের পরে আগস্ট মাসে কিস্তির টাকা পেতে রাজ্য সরকারী কর্মচারীদের কোনও অসুবিধা না হয়। শুধু রাজ্য সরকারী কর্মচারী নয়, বামফ্রন্ট সরকার বরাবর দায়িত্ব নিয়ে এসেছে পঞ্চায়েত ও পৌর কর্মচারীদেরও। কিন্তু ভোটের পর এবার নতুন সরকার তৃণমূলের জোট ক্ষমতায় এসে এই আগস্টেই সার্কুলার দিয়ে জানিয়ে দিলো, এখন নয় সেই কিস্তির টাকা। কবে, তারও কোনও হদিস নেই সার্কুলারে।

    কেন্দ্রের সরকারের শত বঞ্চনা ও বাধা সত্ত্বেও ৩৪ বছরের বামফ্রন্ট সরকারের আমলে যা হয়নি, এবার নতুন সরকারের সময়ে আড়াই মাসেই সেই ঘটনা ঘটতে দেখে স্বভাবতই বিস্মিত রাজ্যের কর্মচারী মহল।

    তবে রাজ্য সরকারী কর্মী নন যাঁরা, তাঁদের জন্যও দুঃসংবাদ রয়েছে তৃণমূল জোট সরকারের এই সার্কুলারে। মূলত আর্থিক খরচে নিষেধাজ্ঞা জারি করতে গিয়ে সরকার যা করেছে, তাতে মূলত ক্ষতিগ্রস্ত হবেন অসংখ্য সাধারণ মানুষ, যাঁদের পরিষেবার প্রতি রাজ্য সরকারের দায়বদ্ধতা এতদিন ছিল বামফ্রন্ট আমলে। সার্কুলারে দেখা যাচ্ছে, সাতটি ক্ষেত্র ছাড়া সব ক্ষেত্রেই রাজ্যে আর্থিক খরচে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে মমতা ব্যানার্জির সরকার। সার্কুলারে বলা হয়েছে, বেতন পারিশ্রমিক দেওয়া যাবে, আই সি ডি এস কর্মীদের সাম্মানিক দেওয়া যাবে, ইস্টার্ন-হাউসস্টাফ-পি জি ছাত্র-ট্রেনি নার্সদের ভাতা দেওয়া যাবে, অফিসের টেলিফোন বিল-বিদ্যুৎ মাসুল দেওয়া যাবে, মেডিক্যাল অগ্রিম ও চিকিৎসার খরচাদি দেওয়া যাবে।

    বাকি সব? কোনও কিছু নয়। সার্কুলারের এমন বয়ানেই স্পষ্ট, ধাক্কাটা আসলে অসংখ্য সাধারণ মানুষের পরিষেবার উপরেই।

    এই যখন অবস্থা, তখন মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি এদিন রাজ্য সরকারী কর্মচারীদের বলেছেন, পুজোর বোনাস বাড়ানো যায় কিনা, তা দেখে বিধানসভায় বলবো।

Advertisements

Tags: , , , ,

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s


%d bloggers like this: