Outrageous Lie… While Hiking Petro-price for the 8th Time in a Year

 

মিথ্যাসাগর

শ্যামল চক্রবর্তী

    shyamalda-web1পেট্রোলের দাম আবার বাড়ল ৩ টাকা। বাড়ল মানে বাড়ানো হলো। এই নিয়ে এক বছরে ৮ বার। কেন্দ্রীয় সরকারের ভাষায় মূল্যবৃদ্ধি অর্থনীতির পক্ষে ভালো। অর্থাৎ তরিতরকারির মূল্যবৃদ্ধি, তেলের মূল্যবৃদ্ধি, তেলের মূল্যবৃদ্ধির ফলে আবার মূল্যবৃদ্ধি, ক্রমাগত আরও অতিরিক্ত ভালো। এই ভালোর কি শেষ আছে নাকি? মনে হচ্ছে অন্তহীন এই আরও ভালোর দিকে যাত্রা।

    সরকার যুক্তি দেখাচ্ছে দাম বাড়িয়েছে তেল কোম্পানি। আমরা কী করব? তেল কোম্পানি তো রাষ্ট্রায়ত্ত। রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পের কোন্‌ কর্তার ঘাড়ে কটা মাথা আছে যে সরকারকে জিজ্ঞাসা না করে দাম বাড়াবে? কোনো নিয়ন্ত্রক সংস্থাও (Regulatory Commission) তো নেই। সরকারের অনুমতি না নিয়েই যদি দাম বাড়িয়ে থাকে, আর সরকারের যদি দাম বাড়ানো ইচ্ছেই না থাকে, তাহলে তেল কর্তাদের ছাঁটাই করলেই হয়, নিদেনপক্ষে বদলি। মানুষকে কতই না বুদ্ধিহীন মনে করে এরা।

    আর পেট্রোলের দাম বাড়ানোর বিষয়টি নিজের হাত থেকে বার করে দিয়ে যথেচ্ছ মূল্যবৃদ্ধির অনুমতিই বা সরকার দিলো কেন? মানুষের কি এত ভুলো মন যে তারা ভুলে যাবেন যে, কেন্দ্রীয় সরকার তেলের মূল্য নিয়ন্ত্রণের অধিকার ছেড়ে দিয়েছে? এবং তাকে আন্তর্জাতিক মূল্যের সঙ্গে সমান করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে? এখন পেট্রোল হয়েছে, এরপরে লাইন দিয়ে আছে ডিজেল, কেরোসিন ও রান্নার গ্যাস। মানুষের অর্থনীতির কতই না সুবিধা হবে। এখন তো সবে কলির সন্ধ্যে। রজনী এখনো বাকি। কতকগুলো প্রশ্নের উত্তর খোঁজা যাক।

প্রশ্ন ১ : সত্যিই কি আন্তর্জাতিক দরের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে আমাদের দেশে তেলের দাম ঠিক হচ্ছে?

উত্তর : এটা একেবারেই ডাহা মিথ্যা। আন্তর্জাতিক বাজারে এখন তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ১১১ ডলার। ১ ব্যারেল মানে ১৬০ লিটার। এখন ১ ডলারের বিনিময় মূল্য ভারতীয় টাকায় ৪৮। তাহলে অঙ্কের হিসাবে এক লিটার তেলের দাম দাঁড়ায় ৩৩ টাকা। ঠিক ৩৩ নয় এর সামান্য কিছু কম। গোদা সংখ্যায় ৩৩ টাকা। এই তেলটা কেনা হয় শোধনাগারের মুখ থেকে অর্থাৎ আমদানির পর পরিশোধিত হয়ে যাওয়ার পর। এবার দেশের অভ্যন্তরে পরিবহন ব্যয় দাঁড়ায় লিটার প্রতি ৬৯ পয়সা। এই তথ্য দিয়েছেন পেট্রোলিয়ামমন্ত্রী নিজেই ১-৪-২০১১-তে সংসদে। ডিলারের কমিশন ৯১ পয়সা। এটা যোগ করলে দাঁড়ায় ৩৫ টাকা ১৫ পয়সা। তাহলে অঙ্কটা কি দাঁড়ালো?

    বিদেশ থেকে তেল কেনা থেকে শুরু করে পেট্রোল পাম্পে তেল ভরা পর্যন্ত মোট খরচ ৩৫ টাকা ১৫ পয়সা। আর এই মুহূর্তে আপনি কিনছেন কত করে? ৭১ টাকা ২৮ পয়সা। তাহলে সরল পাটিগণিতের উত্তর যা দাঁড়ালো তাহলো বিদেশ থেকে কেনা তেল পেট্রোল পাম্প পর্যন্ত মোট খরচ হয় ৩৫ টাকা ১৫ পয়সা। বিক্রি হচ্ছে ৭১ টাকা ২৮ পয়সায়। বাকি ৩৬ টাকা কোথায় গেল? (এই প্রসঙ্গে উল্লেখযোগ্য দেশের প্রয়োজনীয় তেলের শতকরা ২০ ভাগ দেশে উৎপন্ন হয়। তার সঙ্গে আন্তর্জাতিক দরের কোনো সম্পর্কই নেই। কিন্তু তা এখন আমরা হিসাবের মধ্যে আনছি না।)

প্রশ্ন ২ : এই ৩৬ টাকা কোথায় যাচ্ছে?

উত্তর : এই ৩৬ টাকা যাচ্ছে (ব্যয় হচ্ছে) ট্যাক্সের হিসাবে কেন্দ্রীয় সরকার ও রাজ্য সরকারের পকেটে। তেলের মূল দামের ওপর কেন্দ্রীয় সরকার নেয় ৩৮ ভাগ ট্যাক্স। রাজ্য সরকার নেয় শতকরা ১৯ ভাগ ট্যাক্স। অর্থাৎ বিদেশের বাজারে যদি ১ টাকা দাম বাড়ে, আপনাকে দিতে হবে ১ টাকা ৫৭ পয়সা। আপনি ১ লিটার তেল কিনলেন মানে ৫৭ পয়সা আপনি প্রণামী দিলেন। এটা হলো কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকারের চরণে সেবা লাগি।

প্রশ্ন : বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী বিরোধী নেত্রী থাকার সময়ে বলতেন রাজ্য সরকার ট্যাক্স কমিয়ে দিক। এখন তিনি কী বলছেন?

উত্তর : এখন তিনি আর কিছুই বলছেন না। মুখ্যমন্ত্রী সঙ্গীতপ্রিয়। তিনি গান গাইতেই পারেন, ‘আমি রব নীরবে’।

প্রশ্ন : কেন্দ্রীয় সরকার বলছেন তেল কোম্পানিগু‍‌লোর লোকসান হচ্ছে। সত্যিই কি তাই?

উত্তর : ৩৫ টাকার তেল ৭১ টাকায় বিক্রি করে লোকসান কি করে হয়? অথচ একেবারেই ডাহা মিথ্যে বলছে সরকার। এক ধরনের কোম্পানি যারা তেল উৎপাদন করে যেমন ও এন জি সি এবং গেইল (Gail)। তাদের লোকসান হয় না, লাভ হয়। এবং তারা লাভের অংশ ডিভিডেন্ড বাবদ সরকারকে দেয়। আর এক ধরনের কোম্পানি আছে (ভারত পেট্রোলিয়াম, হিন্দুস্থান পেট্রোলিয়াম, ইন্ডিয়ান অয়েল) যারা বাজারে তেল বিক্রি করে। এরা ট্যাক্স দিয়ে তেল কেনে। ফলে তাদের অনেক বেশি দামে তেল কিনতে হয়। এতে তারা কিছু কম পায়। এরজন্য সরকারই দায়ী। কারণ সরকার ট্যাক্স বাবদ ওই ৫৭ শতাংশ অতিরিক্ত টাকা নিয়ে নিয়েছে। ট্যাক্স না দিতে হলে তাদের প্রতি লিটারে ৩৬ টাকা করে লাভ হতো। কেন্দ্রীয় সরকার ট্যাক্স ও ডিভিডেন্ট বাবদ পায় ১ লক্ষ ৩৬ হাজার কোটি টাকা। তার বিনিময়ে সরকার ভরতুকি দিচ্ছে ৫৭ হাজার ৪৪৩ কোটি টাকা। সুতরাং কেন্দ্রীয় সরকার লাভ করে ৭৮ হাজার কোটি টাকা (কেন্দ্রীয় সরকারের বাজেট হিসাব ২০১০-১১)। সুতরাং কেন্দ্রীয় সরকার ট্যাক্স না নিলে এই তথাকথিত ‘ভরতুকি’ দিতে হতো না।

    প্রকৃতপক্ষে কেন্দ্র ও রাজ্য সরকার মিলে মানুষের ওপরে বোঝা বাড়াচ্ছে। সাধারণ মানুষের রক্ত শোষণ করছে। অপরদিকে তেল কোম্পানিগুলিকে রুগ্‌ণ করছে।

প্রশ্ন ৫ : কিন্তু মমতা ব্যানার্জি তো এখন প্রতিবাদ করছেন। সংবাদমাধ্যমে একটা বিবৃতি দেওয়াই কি প্রতিবাদ?

উত্তর : মুখ্যমন্ত্রীর ক্ষমতা আছে আটকে দেওয়ার। দেখা গেছে তিনি তিস্তা নিয়ে আন্তর্জাতিক চুক্তি আটকে দিয়েছিলেন, জমি বিলও আটকে দিয়েছিলেন। আর এই দাম কমানোর জন্য সামান্য কমিটি করতে পারলেন না? উনি যদি সত্যিই দাম বৃদ্ধি না করার ক্ষেত্রে আগ্রহী হতেন তাহলে আগেই মূল্যবৃদ্ধি আটকাতেন। দাম বাড়িয়ে এখন শুধু মুখে বলে কি হবে? সে তো কুমিরের কান্না।

    মূল্যবৃদ্ধি হবে। তরিতরকারির দাম বাড়বে। আরও মূল্যবৃদ্ধি। শাকসবজির দাম আরও বাড়বে। বিদ্যুতের দাম বাড়বে। বাড়বে পরিবহন খরচ। সাধারণ মানুষের চরম কষ্ট।

    বিদ্যুতের দাম নিয়ে শেষ কথা – গ্যাসচালিত বিদ্যুতের দাম কম হয়। কিন্তু দুটো সর্বনাশ কংগ্রেস ও তৃণমূল সরকার করেছে। কৃষ্ণা-গোদাবরী নদীর উপত্যকায় বেআইনীভাবে অতিরিক্ত (আইন বহির্ভূত) সুযোগ দিয়ে রিলায়েন্স কোম্পানিকে অবাধে মুনাফা লোটার সুযোগ তৈরি করে দেওয়া হলো। এরফলে গ্যাসের দাম বাড়বে।

প্রশ্ন ৬ : গ্যাস কি লোকসানে বিক্রি করছে কেন্দ্র?

উত্তর : গ্যাসের দাম ইতোমধ্যেই আন্তর্জাতিক ক্ষেত্র থেকে অনেক বেশি। এরজন্য ট্যাক্স দায়ী। আরও দাম বাড়ানোর কথা হচ্ছে। যদিও আমাদের দেশে এখনই তা অনেক বেশি। যেমন ২০০৮-০৯ সালে এল পি জি গ্যাস সিলিন্ডারে দাম ছিল ১৮৭ টাকা ৭৭ পয়সা। তখন ভারতে দাম ছিল ২৭৯ টাকা ৭০ পয়সা। ২০০৯-১০ সালে আন্তর্জাতিক দাম ছিল ১৭৭ টাকা ৪৪ পয়সা। আর ভারতে বিক্রি হতো ৩১০ টাকা ৩৫ পয়সায়। এটাও সংসদে প্রদত্ত পেট্রোলিয়াম দপ্তরের হিসেব।

    ইরানের সাথে পাইপলাইন বসানোর কথা অনেকদিন ধরে চলছে। কিন্তু আমেরিকার চাপে ভারত এই চুক্তি চূড়ান্ত করছে না। দেশের সরকার ১২০ কোটি মানুষের স্বার্থ জলাঞ্জলি দিয়েছে সাম্রাজ্যবাদীদের পায়ে। যত তড়পানি সব এদেশে বিরোধীদের বেলায়।

প্রশ্ন ৭ : প্রতিবেশী রাজ্যে তেলের (পেট্রোল) দাম কি ভারতের থেকে বেশি?

উত্তর : একেবারেই না। বরঞ্চ উলটো। ভারতের তুলনায় দাম কম। নীচের সারণীটি দেখুন। আমেরিকায় ৪০ টাকা লিটার মানে বুঝতে পারছেন? ওদের দেশের লোকের ক্রয়ক্ষমতা আমাদের দেশের লোকের তুলনায় প্রায় ২০ গুণ। আমাদের তেল কিনতে হচ্ছে তাঁদের দামের দ্বিগুণ দরে, অর্থাৎ প্রকৃত প্রস্তাবে ২x২০= ৪০ গুণ বেশী দরে।

20110917-oped-shyamal chakraborty on petro-price-hike-table

    মিথ্যার ওপরে মিথ্যা। তার ওপরে আরও মিথ্যা। কংগ্রেস তৃণমূল মানেই মিথ্যাসাগর।

    যুক্তিতে সকলকে ছাপিয়ে গেছে কংগ্রেস মুখপাত্র মণীশ তেওয়ারি। একটা অসাধারণ যুক্তি দেখিয়েছেন। আগেরবারের মূল্যবৃদ্ধির সময়ে তিনি সংবাদমাধ্যমে বলেছিলেন, ডিজেল, কেরোসিন এবং এল পি জি-তে দাম বাড়লে লোকে ব্যবহার কম করবে।

    মাননীয় মণীশবাবু, আপনাকে বিনীতভাবে একটি প্রশ্ন করছি—পেট্রোল, ডিজেলের দাম বাড়লে মানুষ কিনবে না। চাল, গমের দাম বাড়লে মানুষ খাবে না। তাহলে জামাকাপড়ের দাম বাড়লে মানুষ কি করবে?

Advertisements

Tags: , , , , , , ,

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s


%d bloggers like this: