A Different Story of a Common Man…

 

মনে হচ্ছিল, যেন পার্টি ক্লাসে বসে শুনছি

অনিকেত চক্রবর্তী

    ডায়েরির সেই পাতাগুলো হাতড়ে বেড়াচ্ছি। কোথায় যে রেখেছি নীল ডট পেনের কালিতে লেখা ছেঁড়া পাতাগুলো! মুঠোর ভাঁজে দলা পাকিয়ে যাওয়া সেই পাতাগুলো হাতে দিয়ে জগন্নাথদা বলেছিলেন, ‘এই নিন। গিয়ে যা দেখলাম, কোনওরকমে লিখে রেখেছিলাম। এবার যেভাবে যা করার করুন। ওখানে একেবারে দম আটকে যাওয়া পরিবেশ…।’

    জগন্নাথদা মানে কমরেড জগন্নাথ ধাড়া। সি পি আই (এম)-র হুগলী জেলা কমিটির কার্যালয়ের সর্বসময়ের পার্টিকর্মী। গোঘাটের নকুণ্ডা গ্রামের মানুষ। পার্টির কাজেই শ্রীরামপুরে পার্টির জেলা অফিস থেকে প্রায়ই আসতেন পার্টির রাজ্য অফিস আলিমুদ্দিন স্ট্রিটে। ঘুরে যেতেন একবার গণশক্তি অফিসেও। কখনও লেখা নিয়ে আসতেন। কখনও এমনিই শুধুই খোঁজখবর নিতে। আমরা সবাই কে কেমন আছি, জানতে। সেই জানতে চাওয়ার মধ্যে কোনও আনুষ্ঠানিকতা থাকতো না। বরং গণশক্তিতে এসে আমাদের জেলা ডেস্ক বিভাগে ঢুকে যখন একগাল হেসে জিজ্ঞাসা করতেন, কী! কেমন আছেন, তাতে মিশে থাকতো দীর্ঘদিনের পরিচিত আপনজনের খোঁজ নেওয়ার অকৃত্রিম আত্মীয়তা!

    সেই জগন্নাথদা গত মে মাসের তৃতীয় সপ্তাহে গণশক্তিতে এসে বলেছিন, ‘গ্রামে যাবো একবার, মা বাড়িতে আছেন, অন্যরা কে কেমন আছেন, একবার গিয়ে দেখে আসা দরকার।’ তাঁকে বলেছিলাম, ‘যাবেন? কীভাবে ঢুকবেন? যা খবর, তাতে গোঘাটেও ওরা দাপিয়ে বেড়াচ্ছে।’

    তখন দিন সাতেক হয়েছে, পরিবর্তনের জমানা শুরু হয়েছে রাজ্যে। গোঘাটের ‘অপরাধ’ তো ভয়ঙ্কর। অনেক জায়গায় লালঝাণ্ডা ভোটের লড়াইয়ে হারলেও গোঘাটের মতো বেশ কিছু এলাকায় জিতেছে লালঝাণ্ডাই। এই ‘অপরাধের’ কী কোনও ক্ষমা হয়? তাই শুরু হয়ে গিয়েছিল তৃণমূ‍‌লের দাপাদাপি। ১৯৯৯-২০০০ সালে পাশকুড়া লাইনে তৃণমূলী সন্ত্রাসের মতই দাপাদাপি। গোঘাট তখনও ক্ষতবিক্ষত হয়েছিল।

    জগন্নাথদা বলেছিলেন, ‘জানি। অবস্থা খারাপ। তবুও যাবো। দেখি, কী হয় গিয়ে।’

    স্বার্থপরের মতো বলেছিলাম, ‘যাবেন যখন, একটা কাজ করবেন? গিয়ে যা দেখবেন, সব নোট করবেন? একদম দিন-সময়-জায়গা ধরে ধরে সব অভিজ্ঞতা?’ জগন্নাথদা বলেছিলেন, ‘যদি সুযোগ পাই, নোট করবো।’ তাঁকে বলেছিলাম, ‘না হলে আমরা কীভাবেই বা জানবো? মানুষকেই বা কীভাবে জানাবো কেমন শুরু হয়েছে পরিবর্তনের ট্যাবলেট খাওয়ার ফল!’ হেসেছিলেন জগন্নাথদা।

    ঠিক তিনদিন বাদে ফের এসেছিলেন জগন্নাথদা। একটু ধ্বস্ত যেন। হাতে দলাপাকানো ডায়েরির ছেড়া পাতা ধরিয়ে দিয়ে বলেছিলেন, ‘যখন যেভাবে পেরেছি, নোট করেছি। এই নিন।…’

    ডায়েরি থেকে ছিঁড়ে নেওয়া পাতায় নীল ডট পেনের লেখা।

    বাসে করে গিয়ে গোঘাটে নেমে নকুণ্ডা গ্রামে ঢোকার মুখে আমাদের পার্টি অফিস। সেখানে গিয়ে কী অভিজ্ঞতা। বাড়ি গিয়ে সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে গ্রামের এই পাড়া – ওই পাড়ার কী চেহারা। কীভাবে তৃণমূলীরা তাঁকে ঘিরে ধরলো। অশ্রাব্য ভাষায় গালমন্দ করে তাঁকে দিয়ে কী করাতে চাইল, তা না করায় কীভাবে তাঁকে অত্যাচার করা হলো। শেষ পর্যন্ত থানায় গিয়ে পরিবর্তনের জমানায় কী দেখলেন, বাধ্য হয়ে রাতে বাস ধরে গোঘাটের গ্রাম ছেড়ে আসার পথে কী অভিজ্ঞতা। সব টুকরো টুকরো করে লেখা। কোনওমতে যেভাবে সুযোগ মিলেছে, নোট করেছেন তিনি, সেই প্রয়াস স্পষ্ট ডায়েরির পাতায়।

    সেই অভিজ্ঞতা আমরা প্রকাশ করলাম গণশক্তিতে। বের হওয়ার পর জগন্নাথদা’র ফোন। ‘ঠিকই বলেছেন আপনারা। অনেক মানুষ জানতে পারলো কী ঘটছে গ্রামের ভিতর। প্রচুর ফোন পাচ্ছি…। আরো কোনও অভিজ্ঞতা হলে আবার লিখবো।’

    তখনও জানি না, জানা তো সম্ভবও নয় যে জগন্নাথদা আর সুযোগ পাবেন না ওইরকমভাবে কোথায় যাওয়ার, ওইরকমভাবে লেখার। কী করে জানবো যে শ্রীরামপুর স্টেশনে ট্রেনের তলায় কাটা পড়ে মর্মান্তিকভাবে চলে যাবে সত্যিকারের অর্থেই মাটির সঙ্গে থাকা পার্টিঅন্ত এই জীবন!

    ডায়েরির সেই পাতাগুলো খুঁজছি এখন। কোথায় যে রেখেছি! ছাপা যা হয়েছে, হয়েছে। কিন্তু জগন্নাথদার হাতে লেখা সেই ডায়েরির পাতা তো মূল্যবান। কত ঝুঁকি নিয়ে তিনি আমাদের জন্য এনেছিলেন মূল্যবান তথ্য!

    জগন্নাথদার সঙ্গে পরিচয় হয়েছিলো ২০০০ সালে।

    খবর সংগ্রহের উদ্দেশ্যেই চমকাইতলা গিয়েছিলাম। জায়গাটা পশ্চিম মেদিনীপুরের উঠোনে। কিন্তু গোঘাটের পিঠোপিঠি। হুগলীর গোঘাট। সেখান দিয়েই ফিরেছিলাম। কামারপুকুরে আমাদের পার্টির জোনাল অফিস। ওখানে পার্টিকর্মী নেতাদের সঙ্গে বসে চা খাওয়ার ফাঁকে হঠাৎই আন্তরিক গলায় প্রশ্ন কানে এসেছিলো, ‘চমকাইতলা গিয়েছিলেন?’

    দেখি, সুতির সাদা ধুতি-পাঞ্জাবি পরনে রোগা চেহারার ক্ষয়াটে একজন মানুষ। কোটরে ঢুকে যাওয়া চোখ। কিন্তু উজ্জ্বল। ঝকঝকে হাসি। অমলিন। আমি তাঁকে চিনতাম না। কিন্তু চমকাইতলায় গিয়েছিলাম কীনা, হেসে এত আন্তরিকভাবে জানতে চাইলেন, যেন কতদিনের চেনা মানুষ।

    সেদিনই পরিচয় হয়েছিল, উনি জগন্নাথ ধাড়া। কৃষক আন্দোলনের কর্মী। তাঁকে বলেছিলাম, হ্যাঁ। চমকাইতলা গিয়েছিলাম। ফেরার পথে এখানে একটু এসেছি। আপনাদের গোঘাটে। গল্প করার জন্য।

    তৃণমূল এবং বি জে পি-র যৌথ সন্ত্রাস থেকে তখন সবে মুক্ত হয়েছিল গড়বেতা-গোঘাটের মতো জায়গাগুলি। সন্ত্রাসমুক্তির সেই দিনগুলির খবর সংগ্রহ করতে ঘনঘন যেতে হতো তখন ওইসব এলাকায়। ১০ বছর আগে সেই সময়েই চা-মুড়ি খেতে খেতে গল্প করার মাঝে জগন্নাথদা সেই সময়ের ঘটনাবলীর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক সম্পর্কে চোখ খুলে দিয়েছিলেন আমার। সেই সময়কার সন্ত্রাসের উৎস খোঁজার কথাবার্তার মধ্যেই জগন্নাথদা শুনিয়েছিলেন গ্রামে গঞ্জে গড়ে ওঠা নব্যধনীর উত্থানের কাহিনী। কেন এবং কীভাবে সন্ত্রাসে এরা মদত দেয়, শুনিয়েছিলেন সেই কথা। গল্পের মতো করে। কিন্তু জীবন্ত। সেই সময়ের সন্ত্রাসেও তৃণমূল পরিবর্তনের স্লোগান দিয়েছিল। সঙ্গী ছিলো বি জে পি। কেননা কেন্দ্রে তখন বি জে পি-র সরকার। তৃণমূলের তাই তখন দরকার ছিলো বি জে পি-কেই।

    আমাদের পার্টির গোঘাট জোনাল অফিসের সামনে ফাঁকা জায়গা অনেকটাই আছে। সেইখানে বসে বলছিলেন সেদিন জগন্নাথ ধাড়া। ‘এই যে ওরা পরিবর্তনের স্লোগান দিচ্ছে, এটা ওরা কাদের কথা ভেবে দিচ্ছে জানেন তো? জোতদার-জমিদারদের কথা ভেবে। জোতদার-জমিদাররাই এই স্লোগানটা বেছে দিয়েছে ওদের।’

    জগন্নাথদা এমন মানুষ, পালটা প্রশ্ন করলে রেগে যান না। বরং একগাল হেসে শিক্ষকের মতো বোঝাতে থাকেন। যদি তিনি মনে করেন যে, শ্রোতা সত্যিই বুঝতে চাইছে। ভীষণ ধীর-স্থির হয়ে কথা বলেন। এই পরিচয় আরো পরে পেয়েছিলাম। চেনাজানা যখন আরো গভীর হয়েছিলা। সেদিন কিছু না জেনেই পালটা প্রশ্ন করেছিলাম, ‘জোতদার-জমিদাররা কই এখন? ওরা তো সব জমিহারা হয়ে গিয়েছে। কী করে ওরা?’

    তখন ষষ্ঠ বামফ্রন্ট সরকারের আমল।

    জগন্নাথদা একগাল হেসে বলেছিলেন, ‘জমি হারালে কী হবে? আপনি ভূমিসংস্কারের কথা বলছেন তো!’ মাথা নেড়ে সম্মতি দিই জগন্নাথদার প্রশ্নে।উনি বলতে থাকেন, ‘‘জমি হারালেও জোতদার-জমিদারদের একটা অংশ তো গ্রামেই রয়ে গিয়েছে। গ্রামেই তারা এখনও কৃষির উপর নির্ভরশীল। তেমন জমি নেই তাদের। কিন্তু জমির উপর টান আছে। হারানো জমির উপর লোভ। মাঝে মাঝে ফোঁস ফোঁস করে। ওই অবধিই। আবার খরা-বন্যায় কিংবা ফসলের দাম না পেলে কাত হয়ে যায়। ওদের আরেকটা অংশ বামফ্রন্ট সরকারের আমলেই জমিজমার মায়া ত্যাগ করেছিলো। ওরা মনে করে গাঁয়ের গরিব মানুষ যারা ওদের খেতে খামারে খাটতো এই সব ছোটলোককে বামফ্রন্ট মাথায় তুলেছে। তাই গ্রামে আর থাকা যাবে না। তাই ওরা জমিজমার মায়া ফেলে, সব কেনা-বেচা করে পুঁজিপাটা গুটিয়ে নিয়ে উঠতি চকচকে গঞ্জ শহরের দিকে চলে গেছে ওরা। এরা কিন্তু দ্রুত বাড়ছে।’’

    বাড়ছে তো কী হয়েছে, গ্রামে তো নেই। ওরা কী করে সন্ত্রাসে মদত দিচ্ছে?

    প্রশ্ন শুনে জগন্নাথদা একটুও বিরক্ত না হয়ে জলের মতো স্বচ্ছ করে দেন সব ধাঁধা। ঠাসবুনোট কৌতূহলে জড়িয়ে নেন শ্রোতাকে। বলতে থাকেন তাঁর যুক্তি এমনভাবে যেন মাটি থেকে উঠে আসা মানুষ কথা বলছেন।

    ‘‘এই যে শহর গঞ্জের দিকে চলে গেল জোতদার জমিদারদের একটা অংশ, এদের হাতেই তো কোল্ড স্টোরেজ, রাইস মিল, কাঠমিল, পেট্রোল পাম্প, ট্রান্সপোর্ট, লেদ, ফসল কেনাবেচার আড়ত। সার, বীজ কীটনাশকেরও ব্যবসা। এই যে আপনি চমকাইতলা থেকে এলেন, দেখছেন তো কত ফসল চমকাইতলার মাঠে। এ ছিল শুকনো মাঠ। বামফ্রন্ট সরকার আর আমাদের কৃষক আন্দোলন কৃষকদের হাতে দিয়েছিল চমকাইতলার শুকনো মাঠ। কৃষক কঠিন শ্রম দিয়েছে। চমকাইতলার শুকনো মাটিতে করলা খেত তৈরি করেছে। পঞ্চায়েত করে দিয়েছে জলের ব্যবস্থা। জমি কৃষকের। করলা কার?’’

    প্রশ্নটা করে থেমে যান জগন্নাথদা। মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনছি তখন তার কথা। উত্তর দিই, কেন, জমি যখন কৃষকের, করলাও তাঁর। তিনিই তো চাষ করেছেন!

    জগন্নাথদা শুনে বলতে থাকেন, ‘‘তাই তো হওয়ার কথা। কিন্তু সমস্যা হচ্ছিল। করলা-চাষের মরসুমে কখনও টাকা ধার করতে, কখনও সার-বীজ কীটনাশক কিনতে, কখনও ডিজেল কিনতে, ফসল উঠলে তা বেচতে কিংবা হিমঘরে রাখতে কৃষককে যেতে হয় কামারপুকুর, জয়রামবাটি, শ্রীনগর, বাঁকা চন্দ্রকোনা, গড়বেতা, আমলাগুড়ির ব্যবসায়ী মহাজনদের কাছে। ওরা সব গ্রামে জমিজমার মায়া ত্যাগ করে সব ফেলে গঞ্জে গিয়েছে বটে। কিন্তু ফেলে আসা জমির ফসলের বারো আনা এখনও এইভাবেই ওদের ঘরে ওঠে।’’

    একটু থামেন জগন্নাথদা। তারপরেই খেয়াল করিয়ে দেন, “আর্থিক দিক থেকে এভাবেই ওরা সবল থাকলেও গ্রামের সামাজিক বিষয়ে কিন্তু ওরা নাক গলাতে পারছিল না। কিন্তু ওদের আগে-পিছে গ্রামের করলা খেত-পান বরোজ-কামারশালা, মফস্বল শহর গঞ্জের ফেরিওয়ালা, রিকশাচালক, টালি, ইটভাটার শ্রমিক মজুরের ঘর থেকে উঠছে একটা নতুন শক্তি। কীরকম?’’

    সহজ সরল ভাষায় একেবারে জীবন্ত সব ছোট ছোট অভিজ্ঞতা দিয়ে বলতে থাকেন জগন্নাথদা। ‘‘এবছর হয়তো উচ্চমাধ্যমিকে রিকশাওয়ালার ছেলেটা খুব ভালো ফল করেছে। গ্রামের মানুষ গর্বিত হয়েছেন। চমকাইতলার করলা খেতের বর্গাদারের ছেলেটি এবছর হয়তো ডাক্তারি পাস করেছে। গ্রামের মানুষের কী আনন্দ। কিন্তু আনন্দ বেশি দিন টেকে না। বছর দুই বাদে দেখা গেল, ওই ছেলে এখন মিল মালিকের জামাই। উপহার পেয়েছে নার্সিংহোম। মিল মালিক শ্বশুরই দিয়েছে। কাঁচি ধরলেই দশ হাজার। সরকারী হাসপাতালের সঙ্গে যুক্ত। সেখা‍নেও মোটা টাকা। কেউ ওদের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়ছে আত্মীয়তার সম্পর্কে। কেউ জড়িয়ে পড়ছে ওদের সঙ্গে ব্যবসা বাণিজ্য মহাজনী কারবারের সঙ্গে। এমনিতেই কর্মক্ষেত্রে এদের উপার্জন ভালো। এর বাইরেও আছে উপরি রোজগারের নানা উৎস। ব্যবসাদারের সঙ্গে যৌথভাবে উকিলবাবু, মাস্টারমশাই, অফিসারবাবুরা এখন ফসল আবাদির কারবার করেন। স্টোরে আলু রাখেন। পথে-বিপথে উপার্জনের এই টাকা আড়ালে-আবডালে খাটছে মহাজনী কারবারে। গ্রামীণ ব্যবসা আর মহাজনী কারবারে এলো নতুন সমীকরণ। আসল ব্যবসায়ীরা এই সমীকরণকেই ঢাল হিসাবে ব্যবহারের সুযোগ পেয়ে গেল। সুযোগ নিলো ওরা।’’

    মনে হচ্ছিল যেন পার্টি ক্লাস করছি। গোঘাট জোনাল পার্টি অফিসের সামনে ফাঁকা মাঠে। শোনাচ্ছেন শ্রদ্ধেয় শিক্ষক। এইমাত্র যাঁর সঙ্গে পরিচয় হয়েছে। বলছেন তিনি টুকরো টুকরো অভিজ্ঞতা। ‘‘জানেন তো, ৯০ সাল পর্যন্ত ওরা গ্রামীণ কোনও সামাজিক বিষয়ে নাক গলানোর সাহস পায়নি। পরে ওরা নতুন বন্ধু পেল বি জে পি-কে। এই যে নতুন শক্তি ওরা সঙ্গে পেল এখানে, তাদের হাত ধরে খুব ধীরে ধীরে লুকিয়ে চুরিয়ে গ্রামের সামাজিক বিষয়ে হস্তক্ষেপ করা শুরু করলো। কীভাবে জানেন? কলেজে পড়া গ্রামের দু’টো ছেলে-মেয়ে হয়তো বাড়ির অমতে অসবর্ণ বিয়ে করেছে। ওরা এসে উসকে দিলো। আমরা বামপন্থী গণআন্দোলনে যারা আছি, তারা হয়তো যথেষ্ট সাহস দেখাতে পারলাম না। তো উসকানিতে দু’টো গরিব পাড়া ভাগ হয়ে গেল।

    ৯৬-৯৭ সাল থেকে ওদের সাহস আরো বাড়লো। এবার আর পিছন থেকে নয়। একেবারে সামনেই। প্রকাশ্যে। আরেক নতুন বন্ধু তৃণমূল এবার ওদের সঙ্গে। এতদিন যারা গ্রামের মাটি মাড়ায়নি, এখন তারাও গ্রামের উৎসবগুলিতে নিয়মিত আসতে শুরু করলো। আগেও বাধা ছিল না। এখনও নেই। উৎসবে আসে ওরা। টাকা ওড়ায়। বাজনাবাদ্যি-পানীয়ের অভাব হয় না। ভোজসভা দেয়। উগ্র পানীয়ে অনেকের গলা ভেজে। গলা ভিজলে পা টলে। টলছেও। পঞ্চায়েত আর কৃষক সংগঠন দেখলো বিপদ। বললো, উৎসব হোক কিন্তু জুয়া খেলা চলবে না। পরের দিন দেখা গেল, পঞ্চায়েত অফিসের সামনে কিংবা পার্টি অফিসের সামনে মাটির দেবদেবীর মূর্তি সব সার সার বসানো। প্রচার শুরু হয়ে গেল, উৎসব করতে দিচ্ছে না সি পি এম। মানুষ কোথাও কোথাও বিভ্রান্ত হলেন। ষড়যন্ত্র কিন্তু এভাবেও হয়েছে…।’’

    বলতে থাকেন জগন্নাথদা। শুনতে থাকি। সন্ধে নামতে থাকে গোঘাটে। কলকাতা ফেরা হবে না আজ। জগন্নাথদাকে বলি, এগুলো লিখবেন না? কত মূল্যবান সব অভিজ্ঞতা! বলেছিলেন, লিখবো। লিখেছিলেন গণশক্তিতে।

    সেই লেখা আজও প্রাসঙ্গিক। মনে রাখবো আমরা। যেমন মনে রাখবো উজ্জ্বল দু’টো চোখ আর ঝকঝকে হাসির রোগা কালো মানুষটিকে। কমরেড জগন্নাথ ধাড়াকে।

Advertisements

Tags: , , , ,

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s


%d bloggers like this: