‘Trinamool Has Built Arms Depot & Armed Cadres (Bhairab-Bahini) in whole of West Bengal’ – Akash

 

তৃণমূলের হাতে অস্ত্রভান্ডার, দুষ্কৃতী বাহিনী…
মাওবাদী নেতার বিবৃতিতেই ফাঁস

নিজস্ব প্রতিনিধি

    কলকাতা, ২৯শে অক্টোবর— নন্দীগ্রাম নিছকই ‘জমি আন্দোলন’ ছিল না। তা ছিল সশস্ত্র আন্দোলন। নন্দীগ্রামকে ব্যবহার করে ক্ষমতায় আসা মমতা ব্যানার্জিরা এখন ফের ‘ভৈরববাহিনী’ তৈরি করেছে। ‘অস্ত্র ভাণ্ডার’ মজুত করে রাজ্যজুড়ে ‘হিংসা’ চালানোই তাদের উদ্দেশ্য। শান্তি আলোচনার প্রক্রিয়া ভেস্তে দেওয়ার জন্য মমতা ব্যানার্জি ও মধ্যস্থতাকারী দু’পক্ষকেই কাঠগড়ায় তুলে মাওবাদী দলের রাজ্য সম্পাদক যে খোলা চিঠি দিয়েছেন তাতেই উল্লেখ রয়েছে নন্দীগ্রাম, কেশপুর-গড়বেতা ‘লাইনের’ সেই দিনের কথাও। উল্লেখ করা হয়েছে কীভাবে সি পি আই (এম)-কে নিকেশ করতে তৃণমূলের সঙ্গে মিশেই অস্ত্র ভাণ্ডার তৈরি করেছিল তারা।

    সরকারের আসার পর তৃণমূল যেভাবে দক্ষিণবঙ্গে কার্যত সন্ত্রাসের রাজত্ব তৈরি করেছে সে কথা স্পষ্ট ভাষায় উল্লেখ করে শান্তি প্রক্রিয়া ভেস্তে যাওয়ায় মাওবাদী রাজ্য সম্পাদক আকাশের নামে প্রকাশিত খোলা চিঠিতে প্রশ্ন তোলা হয়েছে, ‘একবার ভেবে দেখুন তো নানুর থেকে রায়না, মঙ্গলকোট থেকে শাসন, কেশপুর থেকে কেতুগ্রাম—পালাবদলের পর মমতার পার্টি এরাজ্যে কত হিংসা করেছে? সি পি এম-এর কোল মাফিয়াকে হত্যা করে তৃণমূলের কোল মাফিয়াদের কারা প্রতিষ্ঠা করেছে? শুভেন্দু অধিকারী, মুকুল রায়দের আস্তিনে কত গুণ্ডা-মাফিয়া-আগ্নেয়াস্ত্র লুকানো আছে, তা কি আজ ক্রমশ প্রকাশ্য হয়ে পড়ছে না?’। তথাকথিত নন্দীগ্রাম আন্দোলনের সময় এই শুভেন্দু অধিকারীকেই মাওবাদীরা নিজেদের দলিলে ‘যুব সেনাপতি’ বলে সম্বোধন করেছিল।

    মাওবাদী রাজ্য সম্পাদক হিসাবে দাবি করা আকাশের লেখা ৬পাতার চিঠির ছত্রে ছত্রে রয়েছে ঘনিষ্ঠতার পর্ব কাটিয়ে দুই দলের মধ্যে মান অভিমানের অনুযোগের সুর। তাই গত দু’বছরে জঙ্গলমহলে ১৭০জনেরও বেশি সি পি আই (এম) কর্মী, সমর্থকদের খুন করার পরে একবারের জন্যও কোনো বিবৃতি না দিলেও দুই তৃণমূল নেতার খুনের ঘটনায় কিছুটা ‘ব্যাখ্যা’ দেওয়ার চেষ্টা করেই মাওবাদীরা এই চিঠিতে জানিয়েছে, ‘…টি এম সি করার কারণে, আমাদের হাতে মমতার কোনো কর্মী নিহত হবে না, এই নিশ্চয়তা আমরা দিচ্ছি’। সেই কারণেই কিছুদিন আগে এক সাংবাদিক বৈঠকে সাম্প্রতিক মাওবাদী ও মমতা ব্যানার্জির সরকারের মধ্যে চাপান-উতোরের বিষয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে রাজ্যের বিরোধী দলনেতা সূর্যকান্ত মিশ্র বলেছিলেন, ‘কে কাকে কী কথা দিয়েছিল, সেই কথা রাখা, না-রাখা নিয়ে এখন মান-অভিমানের পালা চলছে’।

    জঙ্গলমহলের বর্তমান অশান্ত পরিবেশের জন্য সরকার ও মধ্যস্থতাকারীদের ধোঁয়াশা মেশানো ভূমিকার তীব্র সমালোচনা করতে গিয়েই মাওবাদী নেতা আকাশ ঐ খোলা চিঠিতে নন্দীগ্রাম, কেশপুর-গড়বেতার সময় তৃণমূলের অস্ত্র ভাণ্ডার, তৃণমূলের সশস্ত্র আন্দোলনের কথাকে সামনে টেনে এনেছেন। নন্দীগ্রামে হাতে হাত মিলিয়ে মাওবাদীদের সঙ্গে তৃণমূলীরা চলেছে, একথা ইতোমধ্যেই একাধিকবার মাওবাদীদের বিভিন্ন দলিলেও উল্লেখ করা হয়েছে। উল্লেখ্য, এই নন্দীগ্রামে অরাজকতার আন্দোলনের সময়ে ২৯জন সি পি আই (এম) কর্মী, সমর্থক খুন হয়েছিলেন তৃণমূল-মাওবাদীবাহিনীর হাতে। নতুন সরকার আসার পরে সেই সময়কার কথা এই প্রথম নিজেদের বিবৃতিতে উল্লেখ করলো মাওবাদীরা। ‘…আস্তিনে অস্ত্র লুকিয়ে রেখে শান্তির কথা বলে গেছে বারবার। সি পি এম-টি এম সি’র রক্তাক্ত সংঘর্ষে কার রক্ত ঝরলো, কত পরিবার অনাথ হলো, তার দায় ওরা কখন নেয়নি। নেবেও না। গড়বেতা, কেশপুর সংঘর্ষে তৃণমূলের হাতে কত সশস্ত্র দল ছিল, কত অস্ত্র মজুত ছিল, তা কি জনগণ ভুলে গেছে? নন্দীগ্রামে সি পি এমের হার্মাদদের প্রতিরোধ করার ক্ষেত্রে টি এম সি’র লোকজন কি গোলাপ ফুল ব্যবহার করেছিল, না বন্দুক ব্যবহার করেছিল? তাদের অস্ত্র প্রদর্শন কি প্রকাশ্যে আসেনি? নন্দীগ্রামে আমাদের দুই নেতা কমরেড দীপক ও সুদীপ চোঙদার সরাসরি ময়দানে নেতৃত্ব দিলো। তৃণমূলের লোকেরাও অস্ত্রে সজ্জিত ছিল’। মমতা ব্যানার্জি নন্দীগ্রাম পর্বের পরে বারে বারে অস্বস্তি এড়াতে পাশ কাটিয়ে গেছেন মাওবাদীদের প্রসঙ্গ। এমনকি কেন বামফ্রন্ট সরকারের পুলিস কোনো মাওবাদী ধরতে পারলো না নন্দীগ্রাম কাণ্ডের সময়, সে প্রশ্নও তুলেছেন প্রকাশ্যে, যাকে ইতোমধ্যেই বিশ্বাসঘাতকতা বলেই মনে করেছে মাওবাদীরা।

    আকাশের এই চিঠি ফের স্পষ্ট করেছে মাওবাদী নেতা দীপক এবং সুদীপ চোঙদার ওরফে কাঞ্চন (এখন জেলে) এই আন্দোলনে মাওবাদীদের তরফে নেতৃত্ব দিয়েছিল। প্রসঙ্গত, ২০০৮সালে ফেব্রুয়ারিতে মাওবাদীদের রাজ্য কমিটির এক বর্ধিত বৈঠকে চূড়ান্ত হয় ‘সেজ বিরোধী ঐতিহাসিক নন্দীগ্রাম সংগ্রামের মূল্যায়ন ’ শীর্ষক একটি দলিল। সেই সময় দলের রাজ্য সম্পাদক ছিল এই সুদীপ চোঙদার ওরফে কাঞ্চন। ঐ দলিলের ৫নং পাতায় বলা হয়েছিল, ‘নন্দীগ্রামে ভূমি উচ্ছেদ প্রতিরোধ কমিটির সঙ্গে আমাদের ভালো সম্পর্ক ছিল…বেশিরভাগ সময় টি এম সি’র সাথে আলোচনা করে জনসভা, মিছিল, ঘেরাও, ট্রেনিং বিশেষ করে প্রতিরোধের কর্মসূচী নেওয়া হয়েছে’। এই প্রতিরোধ মানে যে সি পি আই (এম) কর্মীদের ‘নিকেশ’ করা— তা তো দিনের আলোর মত স্পষ্ট হয়ে গেছে এতদিনে। কিন্তু আকাশের এই চিঠি স্পষ্ট করলো, শুধু জনসভা, মিছিল, ঘেরাও নয়— মাওবাদীদের পাশাপাশি তৃণমূলীরা নিজেরাও ‘অস্ত্র ভাণ্ডার’ গড়ে তুলেছিল নন্দীগ্রামে। ১৯৯৮থেকে ২০০০সাল পর্যন্ত কেশপুর, গড়বেতায় যে ভয়ঙ্কর সন্ত্রাস নামিয়ে আনা হয়েছিল তাতেও যে তৃণমূলের সঙ্গে সঙ্গে যোগ দিয়েছিল তারা তাও স্পষ্ট করেছে এই বয়ান।

    এদিকে, শান্তি আলোচনার প্রক্রিয়া ভেস্তে দেওয়ার জন্য মমতা ব্যানার্জিকেই দায়ী করে মধ্যস্থতাকারীদের কাছে নিজের ক্ষোভ খোলা চিঠির মাধ্যমেই জানালো মাওবাদীরা। ইতোমধ্যে সুজাত ভদ্রসহ মধ্যস্থতাকারীদের ভূমিকায় বিরক্ত মুখ্যমন্ত্রী। ঘটনাক্রম স্পষ্ট করেছে, দু’পক্ষের মধ্যে শান্তি প্রক্রিয়া কার্যত ভেস্তে গেছে। ‘সমাধান’ তো দূরের কথা উলটে তৃণমূল জোট সরকারের কাণ্ডকারখানায় ফের জঙ্গলমহলে অশান্তির আগুন ছড়িয়ে পড়তে চলেছে। সংবাদমাধ্যমে বিতরণ করা এই বিবৃতিতে জঙ্গলমহলে আগুন ছড়ানোর জন্য তৃণমূল জোট সরকারকেই দায়ী করে বলা হয়েছে, ‘ভৈরববাহিনীকে উন্নত অস্ত্রে সজ্জিত করা ও যৌথবাহিনীর নিরাপত্তা বলয়ে রেখে পরিপুষ্ট করার কাজে কে প্রধান মদতদাতা? মুকুল রায় এই বাহিনীকে কিভাবে উসকাচ্ছে… মমতা জানেন না? এদের মাথার ওপরে মমতার আশীর্বাদ নেই?’ মুকুল রায়কে যে বিশেষণ দিয়েছে মাওবাদীরা সেই ‘মহেন্দ্র কর্মা’ মাওবাদীদের দলিলে আদিবাসী হত্যাকারী ছত্তিশড়ের এক কংগ্রেসী নেতা যিনি শুধু টাকার জন্য রাজনীতি করেন। মমতা ব্যানার্জির নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি খেলাপের জন্যই যে জঙ্গলমহলে ফের উত্তেজনা ছড়াচ্ছে সে দাবি করেই মাওবাদী নেতা আকাশ বলেছেন, ‘উনি নির্বাচনের আগে প্রতিশ্রুতিগুলি নিয়ে জনগণের সাথে প্রতারণা করছেন’।

    এর আগে তারা মধ্যস্থতাকারীদের সঙ্গে যৌথ বিবৃতি দিয়ে এক মাসের জন্য সন্ত্রাস বন্ধ রাখার কথা জানিয়েছিল তারপরেও কেন যৌথ বাহিনীর অভিযান বন্ধ হয়নি সে প্রশ্নও তোলা হয়েছে। ‘দু-দুবার আলোচনা এবং সরকারী পদক্ষেপ দেখে আমাদের অনুভূতি হলো কেন্দ্র ও রাজ্য সরকার বড় ধরনের আক্রমণের প্রস্তুতি চালাচ্ছে’। পাশাপাশি গত ১৫ই অক্টোবর ঝাড়গ্রামে মমতা ব্যানার্জির সভার পরই যে স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল তিনি শান্তি আলোচনা চাইছেন না, সেই দাবি করে মাওবাদী নেতা জানিয়েছেন ‘…১৫ই অক্টোবর মমতা যে ভাষায় প্রত্যুত্তর দিলেন, তারপর তিনি শান্তি আলোচনায় আদৌ আন্তরিক বলে মনে হচ্ছে না …আক্রমণ ও শান্তি একসাথে চলতে পারে না। আলোচনার নামে মমতার প্রতারণাও চলবে না’।

Advertisements

Tags: , , , , , , , ,

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s


%d bloggers like this: