‘Assault on Democracy’ – Suryakanta Mishra

 

দিল্লিতে বিশদ তথ্য তুলে ধরলেন সূর্য মিশ্র
গণতন্ত্রের ওপর সর্বাত্মক আক্রমণ চলছে রাজ্যে

নিজস্ব প্রতিনিধি

    নয়াদিল্লি, ১১ই নভেম্বর— পশ্চিমবঙ্গে রাজনৈতিক পালাবদলের পর গণতন্ত্রের ওপর কীভাবে সর্বাত্মক আক্রমণ নেমে এসেছে, তা শুক্রবার নয়াদিল্লির সাংবাদিক সম্মেলনে তথ্যসহ তুলে ধরলেন সি পি আই (এম) নেতা ও রাজ্যের বিরোধী দলনেতা সূর্যকান্ত মিশ্র। suryakanta-mishra1রাজ্যে তৃণমূল-কংগ্রেস জোট ক্ষমতায় আসার পর বেড়েছে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার ঘটনা। এই সময়ে খুন হয়েছেন ৪৩ জন বামপন্থী কর্মী। তৃণমূল কংগ্রেসের অত্যাচারে আত্মঘাতী হয়েছেন ১০ জন। পঞ্চায়েত জোর করে দখল করে নেওয়া হয়েছে। দখল হয়েছে ইউনিয়ন অফিস। মিশ্র এসব ঘটনা উল্লেখ করে বলেন, এ নিয়ে মুখ্যমন্ত্রীকে বহুবার চিঠি দেওয়া হয়েছে। মাত্র একটি চিঠিতে এক লাইনে বিস্তারিত তথ্য জানানোর কথা বলা হয়েছিল। যদিও সব চিঠিতে বিস্তারিত তথ্য ছিল। কিন্তু আর একটাও চিঠির কোনো জবাব মেলেনি। অবস্থা কিছুই পালটায়নি। তিনি বলেন পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে। গতকাল দেখা গেলো, রাজনৈতিক সম্মেলনও পুলিসকে দিয়ে বন্ধ করানো হলো। জরুরী অবস্থার সময়েও এরকম ঘটনা হয়নি। তিনি বলেন সেই সময়ে সংবিধান সংশোধনী-বিরোধী কনভেনশন হয়েছিল জরুরী অবস্থার বিরুদ্ধে। কমরেড জ্যোতি বসু ছিলেন কনভেনশনে। জরুরী অবস্থা জারি হলেও ঐ কনভেনশন কিন্তু বন্ধ করা হয়নি। এবারে পালাবদলে দেখা গেলো পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক সম্মেলন—তাও পুলিস পাঠিয়ে বন্ধ করে দেওয়া হলো। যা নজিরবিহীন ঘটনা।

    তৃণমূল জোট রাজ্যে ক্ষমতাসীন হওয়ার পর সন্ত্রাসের রাজ কায়েম হয়েছে। ১৫ পাতার পুস্তিকাতে এই সময়কালের ঘটনাবলী বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হয়েছে। সাংবাদিক সম্মেলনে ঐ তথ্যসংবলিত পুস্তিকা বিলি করা হয়েছে। তৃণমূলীদের বামপন্থী আমলে গণতন্ত্রের ওপর আক্রমণ নিয়ে অভিযোগ এবং বর্তমানে বামপন্থীদের গণতন্ত্রের ওপর আক্রমণ নিয়ে তথাকথিত অভিযোগে যে বিস্তর ফারাক আছে, তা এক প্রশ্নের জবাবে জানিয়ে দিলেন মিশ্র। তিনি বলেন, তৃণমূলীরা মুখে অভিযোগ করে গেছে কিন্তু এভাবে তথ্য পেশ করেনি। আমরা প্রতিটি খুন, অত্যাচার, আত্মহত্যার ঘটনা নাম ঠিকানাসহ উল্লেখ করেছি। যা যে-কেউ যাচাই করে দেখে নিতে পারেন। এই সন্ত্রাস, আক্রমণের বিরুদ্ধে প্রতিদিন লড়াই-সংগ্রাম চলছে। বামফ্রন্টের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রী, মুখ্যমন্ত্রী রাজ্যপালকে ডেপুটেশন দেওয়া হয়েছে। কয়েকদিন আগেই দেখলাম, আমাদের মুখ্যমন্ত্রী স্বয়ং থানা থেকে অভিযুক্তকে ছাড়িয়ে আনছেন। নির্বাচন ঘোষণার পর, তার কেন্দ্রে স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রীর এই কাজ নির্বাচন রীতি-বিরোধী। এভাবেই চলছে। আমরা রাজ্যে শান্তি, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার দাবি জানাচ্ছি। আমরা চাই, রাজ্যে শান্তি। সাধারণ মানুষের শান্তি। সরকার শান্তি প্রতিষ্ঠায় উদ্যোগী হোক। তৃণমূল জোট আজ ক্ষমতায় এসেছে। তারা থাকবে পাঁচ বছর। রাজ্যে আইন-শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করুক। শান্তি বজায় রাখুক—এটা আমাদের দাবি।

    সন্ত্রাসের সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গে এখন চলছে তোলাবাজদের রাজত্ব। তৃণমূলীদের তোলা দিয়ে তবেই এলাকায় থাকতে হচ্ছে। কমপক্ষে এসময় ৪০ হাজার মানুষকে তোলা দিয়ে এলাকায় বাস করার অনুমতি নিতে হয়েছে। মিশ্র বলেন, আনুমানিক তৃণমূলী শান্তি-নজরানায় এই পরিমাণ হবে ৫০ কোটি টাকারও বেশি। আক্রমণ চলছে শুধু নয়, আক্রান্তদের হাসপাতালে ভর্তি করতে দেওয়া হচ্ছে না। পাত্রসায়রে এই ঘটনা ঘটেছে। তৃণমূলীদের আক্রমণে ১৭ জন বামপন্থী কর্মী আহত হলে, তাঁদের হাসপাতালে ভর্তি করতে দেওয়া হয়নি। এখন চলছে বামপন্থীদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলায় জড়িয়ে পুলিসী হয়রানির ঘটনা। প্রতিদিন এতে গ্রেপ্তার করা হচ্ছে নেতা-কর্মী-সমর্থকদের। উচ্ছেদ করা হচ্ছে জমি থেকে পাট্টাদার-বর্গাদারদের। ইউনিয়ন অফিস, পার্টি অফিস দখল করা হয়েছে। পঞ্চায়েত ব্যবস্থা আজ বিপন্ন। মিশ্র বলেন, রাজ্যে এখনও ৫০ শতাংশ পঞ্চায়েতে ক্ষমতায় আছেন বামপন্থীরা। কিন্তু তাদের অধিকার খর্ব করা হচ্ছে। কোথাও বামপন্থীদের জোর করে ইস্তফা দিতে বাধ্য করে পঞ্চায়েত দখল হচ্ছে। নির্বাচিত বামপন্থীদের কোথাও দল ছাড়তে বাধ্য করা হচ্ছে, আবার কোথাও জোর করে অন্যায় কাজে বাধ্য করানো হচ্ছে। পঞ্চায়েতের মাধ্যমে তৃণমূলে ‘গণতন্ত্র’ যা প্রসারিত হয়েছিল, তা এভাবে খর্ব করা হয়েছে।

    রাজ্যে আইন-শৃঙ্খলা, গণতন্ত্র বিপন্ন হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে রাজনৈতিক পরিস্থিতিও জটিল হচ্ছে। মাওবাদী তৎপরতা বৃদ্ধি পেয়েছে। তৃণমূল নেত্রী তথা রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী আগে বলতেন, মাওবাদী বলে কিছু নেই। আজ তিনি মাওবাদী নিয়ে বলছেন। আসলে তৃণমূল মাওবাদীদের সঙ্গে যে রফা করেছিল, তা আজ স্পষ্ট হয়ে গেছে। তাদের একটাই কর্মসূচী ছিল, সি পি আই (এম)-বিরোধী অভিযান। এখন তৃণমূল মাওবাদীরা পরস্পর পরস্পরের বিরুদ্ধে বলছে। এগুলি চোখে ধুলো দেওয়ার জন্য।

    রাজ্যে শিল্পক্ষেত্রেও এই সময়ে কোনো অগ্রগতি ঘটেনি। রাজ্য সরকার যে জমি-নীতি গ্রহণ করেছে, তা আসলে জমি মাফিয়াকে উৎসাহিত করবে। শিক্ষাক্ষেত্রেও চলছে গণতান্ত্রিক অধিকার সংকোচনের অভিযান। অন্যদিকে রাজ্যে কৃষিতে সঙ্কট নেমে আসছে। বামফ্রন্টের আমলে কৃষিতে ফসলের যে দাম কৃষকরা পেতেন, তা আজ পাচ্ছেন না। রেগায় কর্মসংস্থানে প্রথম চার রাজ্যে ছিল পশ্চিমবঙ্গ। আজ তা শেষ চারে নেমে এসেছে। কৃষি-সঙ্কট তীব্র আকার নিচ্ছে। রাজ্যের সমস্যা নিয়ে কেন্দ্রের কাছে বামফ্রন্টের তরফে যে ডেপুটেশন দেওয়া হয়েছে, তা উল্লেখ করেন মিশ্র। তিনি বলেন, রাজ্যের মানুষের উন্নতির স্বার্থে আমরা কেন্দ্রের কাছেও বামফ্রন্টের তরফে দাবিসনদ পেশ করেছি।

    হাসপাতালে শিশু-মৃত্যুর ঘটনা নিয়ে মিশ্র বলেন, শিশু-মৃত্যুর ঘটনা বামফ্রন্টের আমলে অনেকটা কমে এসেছিল। দেশের মধ্যে পশ্চিমবঙ্গে শিশু-মৃত্যুর হার কম, তা কেন্দ্রীয় তথ্যতেই স্পষ্ট। শিশুর চিকিৎসার পরিষেবা সেই সময় সম্প্রসারিত হয়। কিন্তু বর্তমানে হাসপাতালে কি হচ্ছে, তা খতিয়ে দেখা দরকার। সেটা দেখা হচ্ছে না। তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হলেও, কী হলো তদন্তের, তা কেউ জানেন না। এ প্রসঙ্গে তিনি বামফ্রন্টের আমলে বি সি রায় হাসপাতালে বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী ও তাঁর দলবলের হামলার কথা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, আমরা কিন্তু এনিয়ে এভাবে রাজনীতি করতে চাই না। মিশ্র বলেন, হাসপাতালের সমস্যা দেখতে আলাদা স্বাস্থ্যমন্ত্রী থাকা উচিত। সরকারে যারা ক্ষমতায় রয়েছে, তাদের অনেকে ভালো চিকিৎসক। তাদের কাউকে স্বাস্থ্যমন্ত্রী করে স্বাস্থ্যে গুরুত্ব দেওয়া উচিত। মুখ্যমন্ত্রী নানা দপ্তরের সঙ্গে স্বাস্থ্যমন্ত্রকও দেখছেন। আবার কেন্দ্রের রেলমন্ত্রকও শুনছি, তাঁর নির্দেশে চলে। এ কারণে হয়তো স্বাস্থ্যমন্ত্রক ঠিক মতো দেখা হচ্ছে না। তাই মুখ্যমন্ত্রীর উচিত, স্বাস্থ্যমন্ত্রকের আলাদা কাউকে দায়িত্বে আনা। রাজ্যে বর্তমানে হাসপাতালের চিকিৎসকদের ধর্মঘট নিয়ে তিনি বলেন, হাসপাতালে ধর্মঘট করা উচিত নয়। কংগ্রেস-তৃণমূলের বিরোধ নিয়ে তিনি বলেন, কেন্দ্রে দু’বছর আগে ক্ষমতায় এসেছে।  বারো মাসে ১১ বার পেট্রোলের দাম বেড়েছে, কিন্তু কিছু শোনা যায়নি—আজ হঠাৎ এসব শোনা যাচ্ছে। আমাদের দাবি, রাজ্যে শান্তি বজায় রাখা। আমরা সেই দাবিই জানাচ্ছি।

Advertisements

Tags: , , ,

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s


%d bloggers like this: