Fallout of Neo-liberalism

 

নয়া-উদারনীতির একুশে আইনের আনন্দে

মৃদুল দে

    হ্যাটট্রিক। ১৭ই নভেম্বর ইডেনে ভারতের ক্রিকেট দলের জয়, চলচ্চিত্র উৎসবের সমাপ্তি এবং মহাকরণে আত্মসমর্পণকারী মাওবাদী দম্পতির পুত্রকে সম্ভাষণ — তিনটির সঙ্গেই রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী ওতপ্রোতভাবে যুক্ত। সেই জন্যই কয়েকটি সংবাদমাধ্যমের ভাষায় এটি অনেকটা হ্যাটট্রিক; কারোর ভাষায় একদিনে তিন জগৎ। একদিন কেন, প্রতিদিনই এরকম হ্যাটট্রিক চলছে গত ছয় মাস ধরে। রাজ্যের আর্থিক অবস্থা বেহাল, মুখ্যমন্ত্রী ফের দিল্লি যাচ্ছেন আর্থিক সমাধান খুঁজে নিয়ে আসতে। রাজ্যের অর্থমন্ত্রী আর্থিক অবস্থা প্রসঙ্গে ‘মূক ও বধির’ বলে তুলে ধরেছেন।

    দ্বিতীয়, সি পি আই (এ‌ম)-র বিরুদ্ধে অভিন্ন হৃদয়, হিংস্র মোর্চা তৃণমূল-মাওবাদীদের মধ্যে উদ্ধত কলহ, পরস্পর পরস্পরকে দেখে নেওয়ার হুমকি। ক্রিকেট খেলার পাশাপাশি তৃণমূল বাহিনীর তোলাবাজির দৌরাত্ম্য, খুন, ধর্ষণ, আইনমন্ত্রীর নির্দেশে নদীয়ার শান্তিপুরে দোষীসাব্যস্ত খুনীদের বেকসুর খালাস চলছে। পঞ্চায়েতে উন্নয়নের পাঠ চুকিয়ে দেওয়া হচ্ছে, আমলাদের হাতে থাকবে উন্নয়নের অর্থ ও অধিকার। শিক্ষায় নৈরাজ্য সৃষ্টির অর্ডিন্যান্সের বিরুদ্ধে তৃণমূলের ‘শিক্ষাবিদ’ নেতার পদত্যাগ। দাম নাকি কমেছে। দামের আকাশচুম্বী পাহাড়ে একমুঠো মাটি কমেছে। এটাই খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি কমার ইতিহাসে আরেক রঙিন পালক। অবশ্যই হ্যাটট্রিকে যুক্ত হ‍‌তে পারে।

    সু‍‌প্রিম কোর্টের প্রাক্তন বিচারপতি মার্কেণ্ডেয় কাটজু সংবাদমাধ্যমের তীব্র আক্রমণের মুখে পড়েছেন। কারণ, তিনি দুর্দশাগ্রস্ত ভারতের বদলে মুষ্টিমেয় উজ্জ্বল ধনী মুখের দিকে সবসময় আলোকসম্পাত করার জন্য মিডিয়ার সমালোচনা করেছেন। এই অপ্রিয় সত্যকথা বলার জন্য গোঁসা হওয়ারই কথা। সংবাদমাধ্যম তো মেতে থাকবে চলচ্চিত্রের সুখস্বপ্নে, ক্রিকেটীয় উচ্ছ্বাস, ধর্মীয় উন্মাদনায়, ব্যক্তিখুনের কাহিনীতে। তাতে আসবে কর্পোরেট জগতের বিলাসপণ্যের বিজ্ঞাপন সম্ভার, চিটফান্ড কিংবা রক্তচোষা ব্যবসার মনোহর বিজ্ঞাপন। ঘুষকাণ্ড তো লেগেই আছে। নয়া উদারীকরণের সাম্রাজ্যবাদী চাপ দেশের সরকারের ঘাড়ে চেপে বসে আছে। সমাজ-সংস্কৃতি ও মিডিয়া-জগৎ তো বটেই। দুর্নীতি-কেলেঙ্কারির ফোয়ারা স্ফীততর। কংগ্রেস, বি জে পি, ডি এম কে তথা ইউ পি এ এবং এন ডি এ-র বড়-মেজ-সেজ — সব শরিকই এই দুর্নীতি কেলেঙ্কারির সঙ্গে প্রত্যক্ষে-পরোক্ষে যুক্ত। সুপ্রিম কোর্টও সরকারকে প্রকৃত তথ্য আড়াল করার জন্য ভর্ৎসনা করেই চলেছে।

    যাঁরাই অভিযোগের আঙুল তুলেছেন, তাঁদের সকলের বিরুদ্ধেই সি বি আই-কে লেলিয়ে দিয়েছে কংগ্রেস দল ও সরকার। ইউ পি এ-র মন্ত্রী-সাংসদ জেল খাটছেন। মেজ শরিক তৃণমূল কংগ্রেস যেমন মূল্যবৃদ্ধি, কর্মসঙ্কোচন, বেকারত্ব বৃদ্ধি ইত্যাদি সম্পর্কে নীরব, দুর্নীতি-কেলেঙ্কারি সম্পর্কেও চুপ। যে‍হেতু একই নীতির সঙ্গী, বলা যায় তৃণমূল কংগ্রেসও ইউ পি এ-২ সরকারের সব জনবিরোধী কর্মসূচীর অন্ধ সমর্থক। আন্না হাজারে শক্তিশালী লোকপাল বিলের জন্য ক্ষোভ উৎসারিত করেছিলেন। অন্যদিকে বাবা রামদেব বিদেশে গচ্ছিত ভারতীয়দের কালো টাকা নিয়ে উন্নয়নের দাবি তুলেছেন।

    এখন আগেকার মতো উৎপাদনে বিনিয়োগ করে মুনাফার রাস্তায় আন্তর্জাতিক ব্যবসায়ীরা নেই। মুদ্রা ও অর্থের ফাটকা কারবারই এখন মুনাফা সম্পদের একমাত্র উৎস। এই ফাটকা বা ধান্দার অর্থের পরিমাণ গত দু’দশকে জমেছে বিশাল। এক জায়গা থেকে তুলে নিয়ে অন্য জায়গায় বিনিয়োগ করা হচ্ছে। এই নৈরাজ্যের মধ্যে সঙ্কট, আর্থিক বিপর্যয় আমেরিকা সহ সব দেশকে কাঁপিয়ে তুলেছে। যে নয়া উদারনীতির সপক্ষে জোরগলায় প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং, তাঁর দল, মন্ত্রিসভা ও তাঁর শরিকরা প্রচার করে বাহবা নিচ্ছেন, প্রভু আমেরিকাকে কৃতার্থ করছেন, সেই নয়া উদারনীতির একমাত্র ভিত্তি সাম্রাজ্যবাদ ও বৃহৎ ধনীদের নিয়ন্ত্রিত খোলা বাজারের উপরে সরকারের সব কিছু ছেড়ে দেওয়া। সরকারের একমাত্র কাজ হচ্ছে, নয়া উদারনীতি ঠিকঠাক কার্যকর হচ্ছে কিনা, তার পাহারাদারের কাজ করা। কৃতী পাহারাদারের সার্টিফিকেট ই‍‌তিমধ্যেই আমেরিকার কাছ থেকে মনমোহন সিং সরকার পেয়েছে।

    বিদেশের ব্যাঙ্কে গচ্ছিত বিশাল অঙ্কের কালো টাকা (আনুমানিক ৭০ হাজার কোটি টাকা) উদ্ধার করতে গেলে সরকারের বিরাট সাহস ও রাজনৈতিক সদিচ্ছা চাই। লাতিন আমেরিকার কয়েকটি দেশ ছাড়া সাম্রাজ্যবাদকে চটিয়ে এই কাজ করার স্পর্ধা কারোরই হয়নি; নতজানু ভারতের তো নয়ই। কারণ, দুর্নীতি-কেলেঙ্কারি বন্ধ করার অর্থ হচ্ছে খোলা বাজারের উপর নিয়ন্ত্রণ যেটা সাম্রাজ্যবাদী নয়া উদারনীতির সম্পূর্ণ বিরুদ্ধে। বিদেশ থেকে ভারতীয়দের ওই বিপুল পরিমাণ কালো টাকা উদ্ধার করে ভারতে নিয়ে আসার অর্থ নয়া উদারনীতির বিরুদ্ধাচরণ করা। এটাও মনমোহন সিং সরকার বা ইউ পি এ সরকারের পক্ষে একেবারে অসম্ভব। সুপ্রিম কোর্ট যতই ভর্ৎসনা করুক, নাম-কে—ওয়াস্তে প্রদর্শনের জন্য অতি সামান্য কিছু উদ্ধার করলেও ওই পর্বতপ্রমাণ কালো টাকা নিয়ে আসতে হলে সাম্রাজ্যবাদী চাপের কাছে গদি হারাতে হবে মনমোহন সিং-কে। কালো টাকা উদ্ধার করতে গেলে রাষ্ট্র ও তার প্রশাসনের সক্রিয়তা দরকার। এই শক্তি দেখাতে গেলেই মহাপরাক্রমশালী আন্তর্জাতিক লগ্নিপুঁজি সরকারের ঘাড় মটকে দেবে। আন্না হাজারে, রামদেব, বি জে পি কিংবা সমগোত্রীয় নয়া উদারনীতির কীর্তনীয়া দুর্নীতি বন্ধ ও কালো টাকা উদ্ধারের কথা বলে আসল হোতা নয়া উদারনীতিকে আড়াল করছে।

    তা ছাড়া আরো একটা ধারণা তৈরি করার চেষ্টা হচ্ছে, সরকারের হাতে অর্থ নেই বলে উন্নয়ন হচ্ছে না; কালো টাকা বা দুর্নীতি-কেলেঙ্কারির টাকা পাওয়া গেলে তরতরিয়ে উন্নয়ন হবে। কুড়িয়ে-বাড়িয়ে অর্থ জোগাড় করাটাই সরকারের রাজস্ব সংগ্রহের পদ্ধতি নয়। যখন করের মাধ্যমে কেন্দ্রীয় সরকারের ‘অর্থ সংগৃহীত’ হয়, তখন ধরে নেওয়া হয় প্রকৃত রাজস্বটাই সরকার সংগ্রহ করতে পারবে। কিন্তু যারা রাজস্ব দিতে সক্ষম, তারা প্রকৃত মুনাফা সরকারের নজরে আড়াল করে। এটাই কালো টাকার জন্ম দেয়। আবার কেন্দ্রীয় সরকার এদেরই ভরতুকি দেয়। দেশের ব্যবসা বৃদ্ধির নামে। কর ফাঁকি বন্ধ করে, প্রকৃত কর আদায় করে, এই মুষ্টিমেয় রাঘব-বোয়ালদের উপর ভরতুকি কমিয়ে কৃষি এবং খাদ্যশস্য উৎপাদনে সরকারী বিনিয়োগ বিপুলভাবে বাড়িয়ে, সরকারের হাতে যে সম্পদ প্রতি বছর আসতে পারে তাতে সাধারণ মানুষের স্বার্থে উন্নয়নের অর্থের অভাব হয় না।

    পরিবর্তন দরকার নয়া উদারনীতির, সাম্রাজ্যবাদীদের উপর নির্ভরশীলতার, শ্রমিক, কৃষক ও সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়ানোর এবং কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধিতে সরকারী বিনিয়োগ ঘটানোর। এই নয়া উদারনীতির কারণে ব্যাঙ্ক, বীমা, পেনশন, শিল্প, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি এবং খাদ্যশস্যের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলি দেশী-বিদেশী লুটেরাদের জন্য ছেড়ে দেওয়া হয়েছে খোলা বাজারের মহাসঙ্গীত গেয়ে। উন্নয়ন খাতে কেন্দ্রীয় সরকারের বরাদ্দ ও খরচের পথে প্রধান বাধা ‘অর্থ’ নয়, প্রধান বাধা নয়া উদারনীতিবাদ।

    কালোবাজারি-ফাটকাবাজ-করফাঁকিদাতা-মজুতদার কালো টাকার মালিকরা এবং তৎসংশ্লিষ্ট মাফিয়াগোষ্ঠী সমাজের সকলের কাছে ঘৃণিত। কিন্তু নয়া উদারনীতির ধারক-বাহকদের কাছে মহা-আদরণীয়। বেআইনী অর্থ বাজেয়াপ্ত করে অবৈধ খোলা বাজারের ব্যবসায়ীদের কত সাজা দি‍তে পারে সরকার, তার জন্য যেমন চাই কঠোর আইন, তেমনি চাই আইনের প্রয়োগের জন্য নয়া উদারনীতি বাতিল করা এবং আইনভঙ্গকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তি প্রদান। নয়া উদারনীতির বিরুদ্ধে কঠোরভাবে দাঁড়িয়েই একমাত্র সম্পদ সংগ্রহের এই সুষ্ঠু ব্যবস্থা কায়েম করা যায়। আগেকার এন ডি এ সরকারের মতো এখনকার ইউ পি এ-২ সরকারও কোনও রাখঢাক না রেখেই প্রকাশ্যে ঘোষণা করছে, তারা এই ধরনের নয়া উদারনীতি-বিরোধী শাসনের চরম বিরুদ্ধে। শক্তিশালী বণিকসভাগুলিও তাদের বৃহত্তম মাত্রায় ধনসম্পদ বাড়ানোর এই নীতির পক্ষে। কর্পোরেট মিডিয়াগুলিও মনমোহন সিংকে ধন্য ধন্য করছে। এমনকি, সার-পেট্রোল-ডিজেলের দামবৃদ্ধি, পেট্রোপণ্যের বেসরকারীকরণ, রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পের আরো বেসরকারীকরণ, ব্যবসায়ীদের আরো ভরতুকি দানের জন্য দাপটের সঙ্গে প্রচার করে চলেছে।

    কেন্দ্রীয় সরকার মুদ্রাস্ফীতি ও মূল্যবৃদ্ধি ঘটিয়ে তার‍‌ই অজুহাত দিয়ে বহু ব্র্যান্ডের খুচরো বাজারে ৫১ শতাংশ বিদেশী পুঁজির অনুমতি দিয়েছে। ভারতে খুচরো বাজারের নিজস্ব কাঠামো ছিল, তখন দাম ও মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের মধ্যে ছিল। খুচরো বাজারের সঙ্গে যুক্ত কয়েক কোটি পরিবার এর মধ্য দিয়ে ধ্বংস হবে। খুচরো বাজার বৃহৎ ব্যবসায়ীদের কবলিত হলে দামে মার খাবে উৎপাদকরা এবং অত্যধিক দামের আক্রমণ নেমে আসবে ক্রেতাদের উপর। সাধারণ শ্রমজীবী মানুষের উপর ক্রমাগত উপদেশ বর্ষণ করা হচ্ছে যে, সংস্কারের ভবিষ্যৎ সাফল্য এবং নিজেদের উন্নতির সুখস্বপ্নে বিভোর হয়ে থাকো। সেই সংস্কারের স্বার্থে এখন স্বার্থত্যাগ করো। দামবৃদ্ধি মেনে নাও, প্রকৃত মজুরি কমে যাওয়া মেনে নাও, তাতে ভবিষ্যৎ ভালো হবে।

    সাম্রাজ্যবাদীরা ও তাদের আন্তর্জাতিক লগ্নিপুঁজি সরকারের সমস্ত বিভাগে, অর্থনীতিতে, প্রতিরক্ষায়, সংস্কৃতিতে, মিডিয়ায়, শিক্ষা ও চিকিৎসায়, কৃষি ও শিল্পে, এমনকি ধর্মেও ঢুকে পড়েছে। ধীরে ধীরে তারা নিয়ন্ত্রণকর্তা হয়ে উঠছে। হিন্দুকুশ পর্বত বিস্তৃত আফগানিস্তান থেকে ভূমধ্যসাগরে আরব-আফ্রিকান দেশ লিবিয়া পর্যন্ত রক্তক্ষয়ী যুদ্ধর মধ্য দিয়ে অনেকগুলি দেশ দখল করেছে। সিরিয়া-ইরান সহ আরো অনেকগুলি দেশ পদদলিত হওয়ার অপেক্ষায়। মানবিক অধিকার লঙ্ঘনের নামে লিবিয়ার তেলসম্পদ ও ভৌগোলিক অবস্থান দখল করে নৃশংসভাবে গণহত্যা ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটাচ্ছে আমেরিকা ও ইউরোপের ন্যাটোবাহিনী। এবং সেটা সাম্রাজ্যবাদীদের নয়া উদারনীতি চা‍‌পিয়ে তার সম্পদ লুণ্ঠনের জন্য। পুঁজি সঞ্চয়ের এই বর্বরতম দৃষ্টান্ত চোখের সামনে হাজির। আমরা ভারতবাসীরা কী এতে আশঙ্কিত নই?

    নি‍‌শ্চিতভাবে বলা যায়, কংগ্রেস, তৃণমূল, বি জে পি, কর্পোরেট মহল এবং সমগোত্রীয় বুদ্ধিজীবী মহল আদৌ চিন্তিত নয়, বরং খুশি। এই খুশির ঝলক মহাকরণের বর্তমান অলিন্দে নৃত্যগীত, আমোদ-প্রমোদ, বিলাস-ব্যসন, ক্রীড়া জলসায় উপচে উপচে পড়ছে। সঙ্গে ‘উজ্জ্বল ভারত’-র জন্য গর্বিত মহামূল্যবান আগডুম-বাগডুম বক্তব্য, ‘পরিবর্তনে’র কীর্তন। অন্যকূলে ‘দুর্দশার ভারত’-এর বিরাট সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ — ‘একুশ পাক ঘুরিয়ে যাকে একুশ ঘণ্টা ঝুলিয়ে রাখে’ ওই উল্লাসমত্ত নয়া উদারনীতির ধ্বজাধারীরা।

Advertisements

Tags: , , , , ,

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s


%d bloggers like this: