Mamata Govt. Lambasted by Congress…

 

তৃণমূল, জোট সরকারেরই তীব্র সমালোচনা কংগ্রেসের সম্মেলনে; সুর মেলালেন প্রণব, জয়রামও

নিজস্ব প্রতিনিধি

    কলকাতা, ২০শে নভেম্বর — শনিবার কলকাতায় কংগ্রেসের পঞ্চায়েতীরাজ সম্মেলনে রাজ্য সরকারের বিরুদ্ধে অভিযোগের রীতিমতো ঝড় বয়ে গেলো। এরাজ্যে ছ’মাসে তৃণমূল ও কংগ্রেসের জোট সরকারের হাতে পঞ্চায়েতের অবস্থা যে শোচনীয় হয়ে পড়েছে, তা স্পষ্ট করে বুঝিয়ে দিলেন কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী প্রণব মুখার্জি, জয়রাম রমেশসহ প্রদেশ কংগ্রেসের সামনের সারির নেতারা। কংগ্রেসের এই পঞ্চায়েত সম্মেলন যে কার্যত মমতা ব্যানার্জির সরকারকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর জন্য, সেটা আগেই বোঝা গেছিলো। যুব কংগ্রেসের সরকার-বিরোধী মিছিল, মমতার পাল্টা হুমকি সব মিলিয়ে গত কয়েকদিন ধরে সরগরম কংগ্রেস-তৃণমূল জোট রাজনীতি। এদিন তা নতুন মাত্রা নিলো। অধীর চৌধুরী, দীপা দাশমুন্সী, মৌসম নূর, মুর্শিদাবাদ থেকে উত্তর দিনাজপুর পর্যন্ত কংগ্রেসের এই তিন নেতা-নেত্রী এদিন সাফ জানিয়ে দিলেন, তৃণমূলকে রেয়াত করতে তাঁরা রাজি নন। কংগ্রেসের বর্ষীয়ান নেতা কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী প্রণব মুখার্জিও তাঁর বক্তব্যে রাজ্যে বর্তমান সরকার পঞ্চায়েত ব্যবস্থায় মূল লক্ষ্য থেকে সরে আসছে বলে অভিযোগ করেন। তাঁর কথায়, সরকার যা করতে চাইছে তাতে গ্রামসভার আর কোনো অস্তিত্ব থাকবে না। যা কিনা ৭৩তম সংবিধান সংশোধনের মূল উদ্দেশ্যকেই আঘাত করছে।

    প্রসঙ্গত, অতীতে কংগ্রেসই পঞ্চায়েত ব্যবস্থাকে আমলাতন্ত্রে বাঁধার চেষ্টা করেছিলো। কংগ্রেসেরই স্লোগান ছিলো ‘পি এম টু ডি এম’। কিন্তু বামফ্রন্ট সরকারই রাজ্যে ত্রিস্তর পঞ্চায়েত ব্যবস্থা গঠন করে। গ্রামে গ্রামে গড়ে উঠে স্বায়ত্বশাসন, গরিবের সরকার। এদিন অবশ্য প্রণব মুখার্জি প্রকারান্তরে পঞ্চায়েত ব্যবস্থার সেই সাফল্যের দিকগুলিই তৃণমূলকে আর একবার স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। তাঁর কথায়, বিভিন্ন ধর্ম, বিভিন্ন ভাষার মানুষের ঐক্যবদ্ধ সম্মেলনের মধ্যে দিয়ে যদি আমরা একটি শাসনব্যবস্থা কায়েম করতে চাই তাহলে পঞ্চায়েতই শ্রেষ্ঠ ব্যবস্থা। একাজ কয়েকজন সরকারী অফিসার দিয়ে হয় না। গ্রামসভাই হলো তার ভিত্তি। প্রসঙ্গত, সম্প্রতি মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির নির্দেশে পঞ্চায়েতগুলি কাজকর্ম, উন্নয়ন ও তার রূপরেখা সহ যাবতীয় কাজকর্ম দেখভালের জন্য ব্লক এবং মহকুমা স্তরে সরকারী আধিকারিকদের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে। জনপ্রতিনিধিদের ভূমিকাই তুলে দিতে চাইছে এই রাজ্য সরকার। ফলে সঙ্কটে গ্রামসভার বৈশিষ্ট্যও। প্রণব মুখার্জির বক্তব্য, তাহলে দেশ গঠনে, দেশের পরিকল্পনা রূপায়ণে মানুষের অংশগ্রহণ আর রইলো কোথায়?

    এদিন রাজ্য কংগ্রেসের কর্মসূচীতে জনসমাগম ছিলো লক্ষণীয়। নেতাজী ইনডোরের ভিতরটা ছিলো ঠাসা, প্রায় সমান ভিড় বাইরেও। তাই বাইরেও ট্রাকের উপর মঞ্চ করে নেতা-নেত্রীদের ভাষণ দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছিলো। কর্মসূচীর শুরুতেই তৃণমূল বিরোধিতার আবহ তৈরি করে দেন সম্মেলন কমিটির সভাপতি দেবপ্রসাদ রায়। তারপর কেন্দ্রীয় গ্রামোন্নয়নমন্ত্রী জয়রাম রমেশের বক্তব্যে তাতে ঘৃতাহুতি পড়ে। বাকি কাজটি সারেন অধীর চৌধুরী, দীপা দাশমুন্সী এবং মানস ভুঁইঞা। এঁরা তৃণমূল বিরোধিতায় যত সরব হয়েছেন তত হাততালিতে ফেটে পড়েছে স্টেডিয়াম। পঞ্চায়েতের রাজনৈতিক বৈশিষ্ট্যের চেয়ে বরং স্টেডিয়ামে উপস্থিত মানুষের আগ্রহ বেশি ছিলো তৃণমূলের বিরুদ্ধে কী কথা বলা হচ্ছে, তা শোনা নিয়ে। জয়রাম রমেশ বলেন, কংগ্রেস একটি রাজনৈতিক দল। কোনো এন জি ও নয়। রাজনৈতিক দল যেভাবে কাজ করে সেভাবেই আমরা কাজ করবো। আমরা আমাদের সীমা জানি। প্রসঙ্গত, কয়েকদিন আগে কলকাতার হাজরা মোড় থেকে গান্ধী মূর্তির পাদদেশ পর্যন্ত যুব কংগ্রেসের একটি মিছিলকে তীব্র কটাক্ষ করেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি। এমন কি কংগ্রেস সাহায্য করছে সি পি আই (এম)-কে এমন অভিযোগও করেন মুখ্যমন্ত্রী।

    এদিন সম্মেলনে তৃণমূল নেত্রী তথা মুখ্যমন্ত্রীর তীব্র সমালোচনা করেন জয়রাম রমেশ। তাঁর বক্তব্য, ১২৬ বছরের দল কংগ্রেস। কারো উপদেশ আমরা শুনতে চাই না। আমরা আমা‍‌দের সীমা সম্পর্কে যথেষ্ট অবহিত। বরং আমাদের বক্তব্য, কেন্দ্র এবং রাজ্য উভয় জায়গাতেই জোট আছে। তাল মিলিয়ে চললে উভয়েরই লাভ আছে। আমরা আবারও বলছি পশ্চিমবঙ্গকে আমরা সাহায্য করতে প্রস্তুত। কেন্দ্রীয় সরকার গ্রামোন্নয়নে এক লক্ষ কোটি টাকা বরাদ্দ করেছে। তারমধ্যে পশ্চিমবঙ্গের অংশ চার হাজার কোটি টাকা। কিন্তু এরাজ্যে সাড়ে ৯ কোটি জনসংখ্যার হিসাব ধরলে প্রাপ্য হয় নয় হাজার কোটি টাকা। সরকার ঠিকমতো পঞ্চায়েতগুলির বৈশিষ্ট্য বজায় রেখে কাজ করলে, জোটধর্ম বজায় রাখলে পশ্চিমবঙ্গেরই ভালো হবে। কিন্তু মুখ্যমন্ত্রী যদি মনে করেন কংগ্রেসকে মুছে দেবেন তাহলে ঠিক ভাবছেন না। এখানে কংগ্রেস এখনো ভি আর এস নেয়নি। তামিলনাডুতে ৪০ বছর ধরে আমরা ক্ষমতায় নেই। কিন্তু কংগ্রেস সেখানে আছে। আমরা জানি ক্ষমতায় থাকলে কীভাবে ব্যবহার করা উচিত আর ক্ষমতায় না থাকলে কীভাবে চলতে হয়। কারো জ্ঞান বা উপদেশের প্রয়োজন নেই।

    অধীর চৌধুরীর বক্তব্য, একশো দিনের কাজ গরিব মানুষ পাচ্ছেন না। বলতে গেলে বলছে ‘সি পি এম-র দালাল।’ সাধারণ মানুষের স্বার্থ ক্ষুণ্ণ হলে কংগ্রেস আন্দোলন করলে বলছে ‘সি পি এম’র দালাল’। কৃষকরা ধানের দাম পাচ্ছেন না। অথচ কেন্দ্রীয় সরকার তার দেয় টাকা রাজ্যকে দিচ্ছে। এসব বললেই আমরা দালাল। তাহলে তো দালাল হওয়াই ভালো। এতদিন কংগ্রেসকে দেখে নেবো বলতো বামপন্থী পার্টিগুলি। তারা ক্ষমতা থেকে বিদায় নিয়েছে। এবার তৃণমূল হুমকি দেওয়া শুরু করেছে কংগ্রেসকে। তাদেরও হাওয়া হওয়ার সময় এসেছে। দীপা দাশমুন্সীও এদিন ছিলেন রণংদেহী মেজাজে। তাঁর বক্তব্য, ওসব হুমকি-ধমকি দিয়ে কিছু হবে না। কর্মচারীদের বেতন বন্ধ, পেনশন পাচ্ছেন না বহু কর্মী, বার্ধক্যভাতা বন্ধ হয়ে আছে আর মন্ত্রীদের ২০ হাজার টাকা বেতন বাড়িয়ে বসে আছেন। এই নাকি মা মাটি মানুষের সরকার। গোটা উত্তরবঙ্গে পঞ্চায়েতে এক ইঞ্চিও জমি তৃণমূলকে ছাড়া হবে না বলে জানান দীপা দাশমুন্সী।

    পঞ্চায়েত নির্বাচনে এরাজ্যে তৃণমূলের সঙ্গে জোট নিয়ে কংগ্রেসের সংশয়ের কথাও স্পষ্ট করে দেন এ আই সি সি-র সাধারণ সম্পাদক সাকিল আহমেদ। তিনি জানান, পঞ্চায়েতে তৃণমূলের সঙ্গে জোটের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত প্রদেশ কংগ্রেসই নেবে। এ আই সি সি-র কোনো ভূমিকা এখানে নেই। তবে ডি এম কে-র সঙ্গে কেন্দ্রে কংগ্রেসের জোট আছে। কিন্তু তামিলনাডুতে পঞ্চায়েত নির্বাচনে ডি এম কে-র সঙ্গে কংগ্রেসের জোট হয়নি এমন উদাহরণও তিনি দেন। কেন্দ্রে ইউ পি এ-২ সরকারে শরিক এন সি পি। কিন্তু মহারাষ্ট্রে পঞ্চায়েত নির্বাচনে এন সি পি-র সঙ্গে কোনো জোট হয়নি কংগ্রেসের।

    এদিন সম্মেলনে জনসমাগম দেখে একটা সময়ে প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি প্রদীপ ভট্টাচার্য মাইকে বলেই ফেলেন, কত হাজার হাজার মানুষ এখানে জমায়েত হয়েছেন আমরা চাই এখবর তৃণমূলের কাছে যাক। খাওয়া-দাওয়ার আয়োজন নেতাজী ইনডোরেই হয়েছিলো। বেলা ২টোয় এ সংক্রান্ত সাব-কমিটির চেয়ারম্যান প্রদীপ ঘোষ জানালেন, ২২ হাজার মানুষ ইতোমধ্যেই খেয়েছেন। সংখ্যাটা ৩০ হাজারে পৌঁছবে বলে ধরে নিয়েছেন উদ্যোক্তারা।

Advertisements

Tags: , , , , , , ,

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s


%d bloggers like this: