Series – Mamata Govt’s One Year…(1)

 

কেমন আছে জঙ্গলমহল?

সুচিত্রা মাহাতো সমীপেষু,

    এক বছর হয়ে গেল সরকার বদল হয়েছে পশ্চিমবঙ্গে। শরিক কংগ্রেসকে পাশে নিয়েই তৃণমূল কংগ্রেস সরকার গড়েছে এরাজ্যে। শাল-মহুলের প্রান্তর জঙ্গলমহল কেমন আছে এখন? কেমন আছেন জঙ্গলমহলের মানুষজন? মাওবাদীরা কোথায়? কোথায় গেল জনসাধারণের কমিটি? জঙ্গলমহলের মাটিতে পা রেখে ‘পরিবর্তন’-র জমানার সেই বাস্তবতাকেই তুলে ধরেছেন চন্দন দাস।
Image

    কিষানজী বেঁচে নেই। তিনি থাক‍‌লে এই চিঠি তাঁর উদ্দেশ্যেই লিখতাম। ‘আকাশের ঠিকানায়’ চিঠি লিখে জীবন্তের প্রশ্নের যন্ত্রণা লাঘবের সামান্য অবকাশও নেই। এই চিঠি তাই আপনার‍‌ই উদ্দেশে।

    এই চিঠি তথাকথিত ‘পরিবর্তন’ সংক্রান্ত। বিশেষত আপনার পরিচিত জঙ্গলমহলে গত এক বছরের অদলবদলই চিঠির মুখ্য বিষয়। আর কে না জানে জঙ্গলমহলে পরিবর্তনে এই মুহূর্তে শাসকের সবচেয়ে সহায়ক, নজরকাড়া বিজ্ঞাপন আর কিছু নয়— তা আপনিই। আপনি অস্ত্র ছেড়েছেন। জঙ্গলের জীবন ছেড়েছেন। অন্যকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার পথ ছেড়েছেন বলে ঘোষণা করেছেন।

    শশধর মাহাতো ওরফে কিরণ নামে‍‌ সেই মাওবাদী স্কোয়াড লিডার এখন আবছা। সাইকেলে চড়ে শালবনী আর জাম্বনীর গ্রামে গ্রামে আপনাদের দু’জনের সেই স্কোয়াড সদস্য খুঁজে বের করার দিনগুলি এখন অতীত। মনে পড়ে শালবনীর জনপ্রিয় শিক্ষক অনিল মাহাতোকে? স্কুলে ঢুকে ছাত্রদের সামনে তাঁকে খুন করেছিল আপনাদের দু’জনের নির্বাচিত দল। ২০০১সালের সেই ঘটনার সাত বছর পর ওই স্কুল লাগোয়া লক্ষ্মণপুরেই হয়েছিল কিষানজীর মূল ঘাঁটি। আপনি কোতুলপুরের তৃণমূল নেতার ঘরণি এখন। কিন্তু লক্ষ্মণপুরের জঙ্গলঘেরা রামেশ্বরপুরে আপনাদের তৈরি চাঁদমারি আর নির্মীয়মাণ ইট, সিমেন্টের ‘শেল্টার’ এখনও আছে।

    বড়দি (আপনি তো এই নামেই পরিচিত ছিলেন দলে), গত এক বছরকে বিচার করতে বসে কিছুটা পিছনে হেঁটে আসা মন্দ নয়। এখন চলুন, গিয়ে দাঁড়াই লালগড়ে। গ্রামের নাম বীরকাঁড়- আপনার পরিচিত গ্রাম। সেই গ্রামের যুবক মনোজ মাহাতো। ২০০৮সালের নভেম্বরে আপনারা ‘পুলিসী সন্ত্রাস বিরোধী জনসাধারণের কমিটি’ তৈরি করলেন। মনোজ গোড়া থেকেই সেই কমিটির নেতা। ২০০৯সালের সেপ্টেম্বরে ওই বীরকাঁড়েই ধরা পড়ে গেলেন কমিটির মুখপাত্র ছত্রধর মাহাতো। ছত্রধর মাহাতোর পর অসিত মাহাতো মুখপাত্র হলেন। জ্ঞানেশ্বরী এক্সপ্রেসে নাশকতার ঘটনায় অসিত মাহাতো গ্রেপ্তার হন। তারপর মনোজই হন জনসাধারণের কমিটির মুখপাত্র। সেই কমিটি এখন লুপ্তপ্রায়। কিন্তু মনোজ বিলক্ষণ আছেন। একাধিক নাশকতা, খুন, লুট, অগ্নিসংযোগের অভিযোগ রয়েছে মনোজ মাহাতোর বিরুদ্ধে। কট্টর সি পি আই (এম) বিদ্বেষী মনোজ ‘পরিবর্তন’ নিয়ে কী ভাবছেন? শুনুন তাঁর মুখে— মনোজ বললেন, ‘‘কী আবার পরিবর্তন? আগে সি পি এম ছিল। এখন তৃণমূল। ২টাকা কেজি চাল আগেও ছিল। এখনও আছে। কিন্তু চাকরি কোথায়? চাকরির প্রতিশ্রুতি তো অনেক ছিল। যা শুনেছিলাম মুখ্যমন্ত্রীর মুখে, তার কিছুই দেখছি না। সবচেয়ে বড় কথা বন্দী মুক্তির তো কিছুই হলো না।’’ মনোজ মানছেন না কিছু বদলেছে। অস্ফুটে! মনোজ তো আপনাদেরই ঘনিষ্ঠ ছিল!

    চলুন আর একজনের মুখোমুখি দাঁড়াই। প্রবীণ মানুষটি নিজেকে ‘লালগড় আন্দোলনের জনক’ বলে দাবি করেন। এমনকি মমতা ব্যানার্জিও একসময় বলেছিলেন— ‘‘আমাদের ক্ষমাবাবু না থাকলে লালগড় আন্দোলন হতো নাকি?’’ হ‌্যাঁ, সেই ‘ক্ষমাবাবু’কে তো আপনি, সুচিত্রা মাহাতো ভা‍‌লোই চেনেন। সেই মানুষটি, তৃণমূল নেতা ক্ষমানন্দ মাহাতো ‘পরিবর্তন’ সম্পর্কে কী বললেন? কী তাঁর প্রতিক্রিয়া— ‘‘দলে পরিবর্তন হয়েছে। উটকো সব নতুন লোক, ঠিকাদারের দালালরা দলের নেতা হচ্ছে। লালগড়ের কিছুই হয়নি। নেতাইয়ের রাস্তাটাই হয়নি। দিদি বলে যাওয়ার পরেও নয়। কী আর বলবো? বলতে ভয় হয়!’’

    নিজের দলের সমালোচনা করতে সেই ক্ষমানন্দ মাহাতোর ভয় হওয়াটাই পরিবর্তন জঙ্গলমহলে। এই পরিবর্তনের অনুঘটক এবং বিজ্ঞাপন হলেন আপনি—গেরিলা সুচিত্রা!

    এত গেল গণতন্ত্রের কথা। আরো কিছু সত্য আপনার সামনে ছুঁড়ে দেওয়ার আগে প্রশ্ন আছে কয়েকটি। কিষানজী নেই। শশধর নেই। উমাকান্ত নেই। কিন্তু আপনাদের অস্ত্রগুলি কোথায় গেল? কার জিম্মায় রেখে এসেছেন? গোপীবল্লভপুরের এক স্কুল শিক্ষকের কথায়— ‘‘পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে মাওবাদীরা মিলিয়ে গেলেও, তাদের অস্ত্রগুলি শাসক দলের কবজায় গেছে। জঙ্গলমহলের অপরাধীকরণ শেষ হতে আরো অনেকদিন লাগবে। কারণ ওই বন্দুকগুলি।’’ আপনি অস্বীকার করতে পারেন? আপনাদেরই অস্ত্র আগামী পঞ্চায়েত নির্বাচনে তৃণমূলের এলাকা দখলে কাজে লাগবে— আপনি নিশ্চয়ই অনুমান করতে পারেন।

    দ্বিতীয় প্রশ্ন, জনসাধারণের কমিটি কোথায় গেল? এও এক পরিবর্তন। মমতা ব্যানার্জি মুখ্যমন্ত্রী হলেন ২০১১সালের মে মাসে। আর সেপ্টেম্বর থেকেই লুপ্তপ্রায়ের পর্যায়ে চলে গেল আপনাদের সেই কমিটি। সেই কমিটির সদস্যরা কোথায় গেলেন? আপনি আত্মসমর্পণ করে সুখী গৃহকোণে পা বাড়ালেন। আর সেই কমিটির সদস্যরা, যাঁরা আপনাদেরই নির্দেশে হামলা করেছে, আগুন লাগিয়েছে, ‘গণআদালত’-র আয়োজন করেছে, তাদের কী হলো? তাঁদের অনেকেই আজ হতাশ, দীর্ণ, হত্যোদম। গত এক বছর এঁরা তলিয়েছেন— এটিও জঙ্গলমহলের এক বদল।

    আর কী লিখবো উন্নয়ন নিয়ে? আপনি আত্মসমর্পণের পর দু’দুবার একান্তে মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির সঙ্গে দেখা করেছেন মহাকরণে। আপনার কিছুই অজানা নয়। তবুও একবার মিলিয়ে নিন আপনার অভিজ্ঞতার সঙ্গে। গ্রামের গরিব পরিবারগুলির আয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম একশো দিনের কাজের প্রকল্প। জঙ্গলমহলের ২৮টি থানা এলাকায় ২৩টি পঞ্চায়েত সমিতি। তার মধ্যে ৪টি বাঁকুড়ায়, ৮টি রয়েছে পুরুলিয়ায়। বাকি ১১টি পঞ্চায়েত সমিতি রয়েছে পশ্চিম মেদিনীপুরের জঙ্গলমহলে। একশো দিনের কাজের প্রকল্পে তথাকথিত পরিবর্তনের আগে এবং পরের সময়কা‍লের কাজের একটি পর্যালোচনায় চোখ রাখা যাক। ওই ২৩টি পঞ্চায়েত সমিতি এলাকায় ২০১০-’১১সালে কাজ পেয়েছিলেন ৫লক্ষ ৫৯হাজার ৩৬৬জন। ভুলে যাওয়ার নয়, ২০১০-’১১সালে জঙ্গলমহলে মাওবাদীদের দৌরাত্ম্য ছিল অব্যাহত। রাজ্যে ছিল বামফ্রন্ট সরকার। আর গত একবছর, ২০১১-’১২সাল— এই সময়ে জনসাধারণের কমিটি উধাও হয়ে গেছে। মাওবাদীদের ‘গেরিলা-যুদ্ধ’ অন্তর্হিত। অথচ সেই সময়ে জঙ্গলমহলের ওই ২৩টি ব্লকে প্রায় ২৩হাজার মানুষ কম কাজ পেয়েছেন। ঝালদা ২নং, সারেঙ্গা, সাঁকরাইল, শালবনী, মেদিনীপুর সদর, গোয়ালতোড় এবং বিনপুর ১নং— এই সাতটি পঞ্চায়ে‌ত সমিতিতেই শুধু গত একবছরে ২০১০-’১১সালের থেকে বেশি লোক কাজ পেয়েছেন। কত কাজ হলো গত এক বছরে? কত নতুন সম্পদ সৃষ্টি হলো? রাজ্য সরকারের নথি জানাচ্ছে, ‘পরিবর্তনের’ এক বছরে জঙ্গলমহলের ২৩টি ব্লকে রেগা প্রকল্পে কাজ শেষ হয়েছে ১০হাজার ১৮১টি। তার মধ্যে বারো মাসে আড়শা ব্লকে কাজ শেষ হয়েছে মাত্র ৩৪টি প্রকল্পের। এ তবে কিসের পরিবর্তন? অথচ ২০১০-’১১সালে প্রবল নৈরাজ্যের মধ্যেও জঙ্গলমহলে ১১হাজার ২৫৭টি প্রকল্পের কাজ শেষ হয়েছিল।

    জঙ্গলম‍‌হলের কৃষকরা কেমন আছেন? গত জুলাইয়ে মুখ্যমন্ত্রী গিয়েছিলেন জঙ্গলমহলে কিষাণ ক্রেডিট কার্ড (কে সি সি)-র উদ্বোধন করতে। তারপর প্রায় এক বছর পেরিয়ে গেছে। শুনুন, এ‍‌ই প্রশ্নে গোপীবল্লভপুর ২নং ব্লকের কৃষি আধিকারিক অসীম মাণ্ডি কী বলছেন? মাণ্ডির কথায়, ‘‘আমরা ২৭২টি কিষাণ ক্রেডিট কার্ডের আবেদন পাঠিয়েছিলাম ব্যাঙ্কে। এখনও একটিরও অনুমোদন মেলেনি।’’ শুধু গোপীবল্লভপুরই নয়, জঙ্গলমহলের প্রতিটি ব্লক এলাকাতেই কিষাণ ক্রেডিট কার্ড প্রকল্পের বেহাল দশা।

    বড়দি! লক্ষ্মণপুর, রামেশ্বরপুরের কথা তো আপনার নিশ্চয়ই মনে আছে। আপনাদের সবচেয়ে মজবুত সশস্ত্র ঘাঁটি। এখন সে সব কিছুই নেই। অর্ণব দাস, অভিষেকরা পিঠে এ কে ৪৭ ঝুলিয়ে এখানেই মোটরবাইকে চড়ে টহল দিতো দিনরাত। এখানেই পাঁচজন সি পি আই (এম) কর্মীকে ভোরের আলো ফোটার মুহূর্তে গুলিতে গুলিতে ঝাঁঝরা করে দিয়েছিল আপনাদের বাহিনী। এখন সেখানে তৃণমূলের দাপট। সেখানেই এক নিদাঘ দুপুরে দেখা সবিতা দলুইয়ের সঙ্গে। এখনও প্রকাশ্যে অতীতের সেই সব আতঙ্কিত দিনরাতের কথা মুখে আনেন না তাঁরা। কিন্তু বর্তমান? সে বড় নির্মম। নতুন রেশন কার্ড হওয়ার কথা। হয়েছে? আপাত নিরীহ প্রশ্নের জবাবে রূঢ় বাস্তব চিনিয়ে দিলেন মহিলা। বললেন, ‘‘পুরানো কার্ডই আছে। আর সেই কার্ডেই চাল পাচ্ছি না ঠিকমতো। কাকে বলবো? পঞ্চায়েতের কেউ এদিকে আসেই না। আর ডিলার বলে এ‍ই সপ্তাহে পাবে। সব চাল আসেনি।’’ বৃদ্ধ সনাতন হাঁসদার অভিজ্ঞতা— ‘‘কেরোসিন ছাড়া চলে না আমাদের। আর সেই কেরোসিনই ঠিক মতো আসছে না। কোনো সপ্তাহে পাই। কখনও পাই না।’’

    ‘পরিবর্তন’ কেমন হয়েছে, তার মোক্ষম উদাহরণ হয়ে উঠেছে ওড়িশা সীমান্ত। ব্লকের নাম গোপীবল্লভপুর ২নং পঞ্চায়েত সমিতি। ২০১০-’১১আর্থিক বছরে জেলার মধ্যে ২নম্বর হয়েছিল এই পঞ্চায়েত সমিতি। একশো দিনের কাজের প্রকল্প, ইন্দিরা আবাস যোজনাসহ গ্রামোন্নয়নের প্রতিটি প্রক‍‌ল্পে এই ব্লক ছিল পশ্চিম মেদিনীপুরের সামনের সারিতে। এমনকি প্রবল নৈরাজ্যেও গরিব গ্রামবাসীর কাজের অভাব হয়নি। অথচ এবার? এই পরিবর্তিত রাজ্যে গোপীবল্লভপুর ২নং কাজের নিরিখে নেমে গেছে ২৯নম্বরে। কেন? কারণ, পালটে গেছে পঞ্চায়েত সমিতির পরিচালকরা। বিধানসভা নির্বাচনের পর ভয় দেখিয়ে নির্বাচিত সদস্যদের পদত্যাগ করিয়ে পঞ্চায়েত সমিতির দখল নিয়েছে তৃণমূল। এমন ঘটনা আরো কিছু পঞ্চায়েত এলাকাতেও হয়েছে।

    আর কৃষকদের অবস্থা কী? শুনুন চূড়ামণি মাহাতোর কথা। গোপীবল্লভপুরের বিধায়ক পদে এই তৃণমূল নেতাকে জেতানোর জন্য মাওবাদী এবং তাদের প্রকাশ্য মঞ্চ জনসাধারণের কমিটির উল্লেখযোগ্য সক্রিয়তা ছিল। সেই চূড়ামণি মাহাতো শুক্রবার বললেন— ‘‘কৃষকের ধান বিক্রি হয়নি। সরকার সরাসরি ধান কেনার শিবির করবে বলেছিল। তাও হয়নি। আমি তো বারবার বি ডি ও-কে বলেছি বিষয়টার দিকে নজর দিতে। কিছুই তো হয়নি।’’

    সরকারী দলের বিধায়কই যখন এত নিরাশ, তখন মানুষের অবস্থা কতটা খারাপ, তা বোঝাই যায়।‍ ঘোষিত সহায়ক মূল্য ১০৮০টাকা হলেও, জঙ্গলমহলের কৃষক কুইন্টাল প্রতি ৭০০টাকাতেও ধান বেচতে বাধ্য হচ্ছেন— এমন উদাহরণ অনেক।

    তাই, খারাপের দিকেই এগোচ্ছে জঙ্গলমহল। সুচিত্রা মাহাতো শুনুন, ‘পরিবর্তন’-এর কিছুটা সুবিধা আপনি পেয়ে থাকতে পারেন, কিন্তু জঙ্গলমহলকে আরো বিপদেই ঠেলে দিয়ে গেছেন আপনারা। এখন মনে হবে থমকেই আছে শালমহল। কিন্তু তা আসলে জেগে ওঠার পূর্বশর্ত। মনে রাখবেন।

Advertisements

Tags: , , , , , , ,

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s


%d bloggers like this: