পিঙ্কি প্রামাণিক কেস : কিছু প্রশ্ন ও মন্তব্য

পিঙ্কি প্রামাণিক কেস : কিছু প্রশ্ন ও মন্তব্য

বিশেষ প্রতিনিধি

ঘটনা

    ১৩ই জুন রাতে ২০০৬ দোহা এশিয়াডে সোনাজয়ী অ্যাথলিট পিঙ্কি প্রামাণিকের বিরুদ্ধে ভারতীয় দন্ডবিধির ৪১৭, ৩৭৬, ৩২৫, ৫০৬ ধারায় অভিযোগ করে জনৈক অনামিকা আচার্য। অভিযোগ – পিঙ্কি পুরুষ এবং বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে তার সঙ্গে সহবাস করেছে তিন বছর যাবৎ।  অভিযোগ পেয়ে রাতেই পুলিশ  থানায় নিয়ে আসে পিঙ্কিকে জিজ্ঞাসা করার জন্য। তারপর উমা নার্সিং হোম। সেখানে পরীক্ষা করে নার্সিং হোম জানায়, পিঙ্কি পুরুষ। পিঙ্কি ঐ রাতে নার্সিং হোমেই থাকে। পর দিন পুলিশ তাকে জেলা আদালতে নিয়ে যায়। সেখান থেকে বারাসাত সদর হাসপাতাল। কিন্তু পিঙ্কি পরীক্ষায় রাজি না হওয়ায় তাকে নিয়ে আসা হয় বাগুইআটি থানায়। ওই দিনই রাতে তাকে গ্রেফতার করা হয়। পরদিন আদালতে তোলা হলে বিচারক ঈশানী চক্রবর্তী  এফ-আই-আর এর সারবত্তা খতিয়ে না দেখেই পিঙ্কির চৌদ্দ দিনের জেল হেফাজতের আদেশ দিয়ে দেন। ৩০ জুন আদালত আরও চৌদ্দ দিনের জেল হেফাজত দিয়ে দেয়। পরে ১০ই জুলাই পিঙ্কির জামিন হয় এবং ১১ই জুলাই জেলে আদালতের কাগজ পৌঁছলে জেল থেকে ছাড়া পায় পিঙ্কি।

প্রশ্ন

    ১) জেলফেরৎ পিঙ্কির কথামত – ১৩ই জুন রাতে কিছু সাদা পোষাকের পুলিশ পিঙ্কিকে তার বাড়ি বাগুইআটি থেকে জোর করে ধরে নিয়ে যায় থানায়। স্পষ্টতঃই তার কাজের মেয়ে অনামিকার যোগসাজসে। তারপর অন্যায় ও বেআইনী ভাবে তাকে ঐ রাতে “উমা মেডিক্যাল রিসার্চ সেন্টার” নামে এক প্রাইভেট নার্সিং হোমে নিয়ে গিয়ে জন্তুর মত হাত পা বেঁধে ঘুমের ইঞ্জেকশন দিয়ে অজ্ঞান করে সম্পূর্ণ নগ্ন ক’রে মেডিক্যাল টেস্ট করে এবং ঐ সময়ই তার মোবাইলে ভিডিও তোলে।
    ২) পুলিশ বলছে, তারা ১৩ই জুন পিঙ্কিকে ধরে নার্সিং হোমে নেয়, কারণ সে অচৈতন্য ছিল। পিঙ্কি বলছে, তাকে নার্সিং হোমে নিয়ে গিয়ে অজ্ঞান করা হয়েছে। কে ঠিক বলছে? আর, পুলিশ ১৩ই রাতে তাকে ধরে, প্রাইভেট নার্সিং হোমে মেডিক্যাল টেস্ট করাল কার নির্দেশে। তখনও তো তাকে কোর্টে তোলা হয়নি। এবং কেন প্রাইভেট নার্সিং হোম? পুলিশের সামনেই এমএমএস তোলা হল কী করে? কারা, কীভাবেই বা তা ইন্টারনেটে প্রচার করল? কে দায়ী? তার বিচার হবে না?
    ৩) আইন বলছে, ধর্ষণের অভিযোগ হলে ধর্ষণকারীকে অ্যারেস্ট করতে হবে। হয়েছে। আইন এ-ও বলছে – ধর্ষিতার মেডিক্যাল টেস্ট করতে হবে তৎক্ষণাৎ। পরম আশ্চর্যের বিষয় হল, তা না করে, ধর্ষণকারীর মেডিক্যাল টেস্ট নিয়ে চার সপ্তাহ ধরে নাটক চলতে থাকল।
    ৪) ১০ই জুলাই বারাসত আদালত জানিয়ে দিল, ডাক্তারি রিপোর্ট মতে পিঙ্কির পক্ষে ধর্ষণ করা সম্ভব নয়। তাই জামিনে মুক্তি দেওয়া হল। কিন্তু প্রশ্ন হল – যে ডাক্তারি রিপোর্টের কথা মাননীয় বিচারক উল্লেখ করেছেন, সেই রিপোর্ট তাঁর কাছে প্রথম থেকেই ছিল। তাহলে কেন পিঙ্কির আগে জামিন হল না?
    ৫) যাঁর পক্ষে ধর্ষণ করাই সম্ভবপর নয়, তাঁর বিরুদ্ধে ধর্ষণের মিথ্যা অভিযোগ করার জন্য কেন অনামিকা আচার্যকে রায়দানের দিনই গ্রেফতার করা হল না?
    ৬) যাঁকে গোটা বিশ্ব জানে মেয়ে হিসেবে, তাঁর বিরুদ্ধে একজন চারশ’ বিশ অভিযোগ করল যে, সে পুরুষ; আর তৎক্ষনাৎ সে পুরুষ হয়ে গেল? নইলে তাঁকে আদালতে ও জেলখানায় পুরুষদের সাথে থাকতে বাধ্য করা হল কেন? কেন দু’জন পুরুষ পুলিশ তাঁকে বগলদাবা করে ভ্যান থেকে নামিয়ে আদালতে নিয়ে গেছে এবং আবার ভ্যানে তুলেছে? (টি-ভি ফুটেজে স্পষ্ট দেখা গেছে)।
    ৭) সবচেয়ে বড় কথা – ১৩ই জুন থেকে ১০ই জুলাই এই ২৮ দিন সোনার মেয়ে পিঙ্কিকে যে অবর্ণনীয় গ্লানি ও দুঃখের মধ্য দিয়ে কালাতিপাত করতে হল – দেশকে সোনা এনে দেওয়ার জন্য এই  পুরষ্কারই কি প্রাপ্য ছিল দেশবাসীর কাছে? এই গ্লানি দুঃখ অসম্মানের ক্ষতিপূরণ হবে কীভাবে? আমরা কি ওর সামাজিক সম্মান ফিরিয়ে দিতে পারব?
    ৮) অত্যন্ত সন্দেহজনক রাজ্য সরকারের ভূমিকা। ক্রীড়াক্ষেত্রে হরির লুটের মত সংবর্ধনা বিলি হচ্ছে। খারাপ হচ্ছে তা বলছি না। কিন্তু বাংলার প্রত্যন্ত গ্রামের একটি মেয়ে খালি পায়ে দৌড়ে সোনার পদক নিয়ে এল দেশের জন্য। তাঁকে নিয়ে একমাস ধরে সারা দেশে হৈ-চৈ ফেলে দেওয়া খবর হচ্ছে কাগজে টিভি-তে। ক্রীড়ামন্ত্রীর একটা বিবৃতি থাকবে না? সরকারের কোন মুখপাত্র বলবেন না যে, যা হচ্ছে তা ভাল হচ্ছে না? উল্টে ক্রীড়ামন্ত্রী মিথ্যা অভিযোগ তুলে ফেললেন এই বলে যে, পিঙ্কি সরকারী জমি বিক্রি করে দিয়েছেন অবতার সিং-কে। যা পিঙ্কির মতে সর্বৈব মিথ্যা। একজন মহিলা মুখ্যমন্ত্রীর কাছ থেকে মানুষ আরও একটু সংবেদনশীলতা আশা করেন।
    ৯) যেখানে মূল অভিযোগ ধর্ষণের, সেখানে একজন সরকারী মহিলা ডাক্তার তাঁকে একবার দেখলেই তো বলে দিতে পারতেন যে, পিঙ্কির দ্বারা ধর্ষণ সম্ভব নয়। তাহলে তাঁর প্রথম দিনেই জামিন পাওয়ার আর কোন সমস্যা থাকত না এবং যেখানে অভিযোগই মিথ্যা, সেখানে কেস ডিসমিস্‌ হয়ে যেত। তা না করে আদালত নির্দেশ দিল, পিঙ্কি পুরুষ কি না পরীক্ষা করে বলতে। আর তা করতে গিয়ে দেশের তাবড় হাসপাতাল, মেডিক্যাল কলেজ ও ডাক্তারদের কালঘাম ছুটে গেল। শেষে ব্যাঙ্গালোর থেকে ক্রোমোজোমের বিশেষ পরীক্ষা (কেরিওটাইপিং) করিয়ে রিপোর্ট আনা হল। কিন্তু সে রিপোর্ট জজসাহেবের টেবিলে আসার আগেই পিঙ্কির মুক্তি হয়ে গেল, বারাসাতের সরকারী ডাক্তারদের প্রাথমিক রিপোর্ট দেখেই। তবে কি সমাজজীবনে তীব্র আলোড়ন এবং পিঙ্কির সমর্থনে সমগ্র ক্রীড়ামহল ও অসংখ্য সাধারণ মানুষের  দাঁড়িয়ে পড়াতেই আদালত প্রভাবিত হয়ে পড়েছিল?
১০) এখন দেখার – পরিবর্তনের সরকার…মা-মাটি-মানুষের সরকার…মহিলা মুখ্যমন্ত্রীর সরকার কী শাস্তির ব্যবস্থা করে এই ব্যক্তিদের বিরুদ্ধেঃ
     ক) বাগুইআটি থানার পুলিশ, যারা একজন সন্দেহজনক মহিলার প্রায় অবিশ্বাস্য একটা এফআইআর-কে গুরুত্ব দিয়ে ১৩ই জুন রাত থেকে একের পর এক বে-আইনী কার্যকলাপ চালিয়ে গেছে;
    খ) যে বা যারা এমএমএস কাণ্ডের সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত;
    গ) বাগুইআটির উমা নার্সিং হোম, যারা পিঙ্কির ডিসচার্জের কাগজে “পুরুষ” লিখে দিয়েছিল;
    ঘ) যে পুরুষ পুলিশকে দেখা গেছে মহিলা পিঙ্কিকে বগলদাবা করে আদালতে তুলতে ও নামাতে এবং আদালতের লক-আপে পুরুষদের সঙ্গে তাকে রাখতে;
    ঙ) সবশেষে সেই সন্দেহভাজন মহিলা অনামিকা আচার্য, যে পিঙ্কির কথামত তাঁর বাড়িতে কাজের লোক হিসেবে নিয়োজিত ছিল এবং যে তার দাবীমত তিন লক্ষ টাকা পায়নি বলে এই ঘৃণ্য ও নোংরা ষড়যন্ত্র রচনা করেছিল বাগুইআটি থানার পুলিশের একাংশকে হাত করে।

মন্তব্য

    পিঙ্কি কাণ্ড আরেকবার চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে গেল, আমরা সভ্যতার বড়াই করলেও এখনও যথার্থ সভ্য হয়ে উঠতে পারিনি। ২০০২ সালে পুরুলিয়ার বাঘমুণ্ডি থেকে রাজ্য অ্যাথলেটিক্সে দৌড়তে এল একটি মেয়ে। খালি পায়ে দৌড়ে জিতে নিল তিনটি সোনা। কেউ বলেনি, ও মেয়ে তো? তারপর এশিয়ান গেমস্‌, সাফ গেমসে সোনা। রেলে চাকরী। বার বার দেশে বিদেশে পরীক্ষা হয়েছে। কেউ বলেনি, ও মেয়ে নয়। কিন্তু ১৩ই জুন ‘ও মেয়ে নয়, পুরুষ…আমাকে ধর্ষণ করেছে’ এই মিথ্যা অভিযোগের পর থেকে, রসালো আলোচনা হয়েছে টিভিতে, কাগজে। প্রতিদিন ধর্ষিত হয়েছে পিঙ্কির সম্মান। ক্রোমোজোম পরীক্ষা শেষ পর্যন্ত কী বলবে জানা নেই। পরবর্তী কালে শারীরিক পরিবর্তন যদি ঘটেও থাকে, তা কি শাস্তিযোগ্য অপরাধ?

    পিঙ্কির অপমান তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করেছি আমরা। জেনে বা না জেনে, কুৎসিত চর্চা থেকে নিজেদের সরাতে পারিনি। যেন, যাক্‌, একটা বিষয় পাওয়া গেছে। আদালতে, হাসপাতালে পিঙ্কিকে আনা হচ্ছে, ছবি চ্যানেলে চ্যানেলে, কাগজে কাগজে। দেখি তো, মুখটা কেমন লাগছে! পুরুষ পুলিশকর্মীরা ওর কাঁধে ও গায়ে হাত দিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। কে জানে, হয়ত ওঁরাও বেশ মজা পেয়েছেন।

    যদি শারীরিক পরিবর্তন ঘটেই থাকে, তা নিশ্চয় শাস্তিযোগ্য অপরাধ নয়। নারী হিসেবেই রেলে চাকরী পেয়েছিল পিঙ্কি, যথাবিহিত শারীরিক পরীক্ষার পর। সেই চাকরী কেড়ে নেওয়াও অন্যায়। যদি ক্রমশঃ “উভলিঙ্গ” হয়ে গিয়েছে বলে রায়ও দেয় সর্বোচ্চ স্তরের পরীক্ষা, তাতে কী হল? এই অস্বাভাবিকত্ব কি সমাজে দণ্ডনীয় অপরাধ? একজন মানুষ। হিউম্যান বিইং। একটি মামলার সূত্রে ওঁকে এভাবে অপমান করে আমরা কি অনেক বড় অপরাধ করছি না? ওঁর সামাজিক সম্মান আমরা কেড়ে নিচ্ছি, কিন্তু ফেরৎ দিতে পারব না। এর পর কীভাবে জীবন কাটাবে মেয়েটি? পিঙ্কি, জবাব দেওয়ার সাধ্য আমাদের নেই। বলতে পারি খুব খারাপ লাগছে। ‘পিঙ্কি ভাল থেকো’ – এ কথা বলার অধিকার আমরা হারিয়েছি। শাস্তি? হ্যাঁ, শাস্তি প্রাপ্য আমাদেরই।

সংযোজন

    যেহেতু প্রাক্তন সিপিআইএম সাংসদ ও প্রখ্যাত অ্যাথলিট জ্যোতির্ময়ী শিকদার পিঙ্কির হয়ে আওয়াজ তুলেছিলেন এবং পিঙ্কির সম্মান রক্ষার এ আন্দোলনে খেলোয়াড়দের সমবেত করায় নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, তাই তাঁর স্বামী অ্যাথলিট অবতার সিং কে জড়িয়ে একের পর এক মিথ্যা অভিযোগ তুলে যাচ্ছেন বাংলার ক্রীড়ামন্ত্রী মদন বাবু। সচেতন পাঠক এতেই বুঝে নিন, পিঙ্কি কাণ্ডে রাজ্য সরকারের কী ভূমিকা!

Advertisements

Tags: , , , , , , , , , , , , , ,

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s


%d bloggers like this: