Politics of God Particle… ঈশ্বর-কণার রাজনীতি

Politics of God Particle… ঈশ্বর-কণার রাজনীতি

অমিতকুমার নন্দী

     সংবাদ মাধ্যমে ঈশ্বর-কণা বলে ডাকা হচ্ছে মহাবিশ্বে ছড়িয়ে থাকা অদৃশ্য হিগ্‌স-বোসন কণাকে। কিন্তু এই নামকরণে আপত্তি রয়েছে বিজ্ঞানীদের। এক মার্কিন বিজ্ঞানীকে তথাকথিত ঈশ্বর-কণা নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি সবিনয়ে বলেন, ‘আমরা কিন্তু ঈশ্বর-কণা বলছি না। বলছেন আপনারা, মানে মিডিয়া। আপনারা এভাবে বলছেন বলে অন্যরা বলছেন। কিন্তু এটা সেরকম ব্যাপারই নয়।’ সার্নের ‘অ্যাটলার্স’ ডিটেক্টর দলের সঙ্গে যুক্ত কানাডীয় বিজ্ঞানী পাউলিন গ্যাগনন যেমন বললেন, ‘আমরা তো এটাকে ঈশ্বর-কণার সন্ধান বলছিই না। আমরা বলছি ‘হিগ্‌স হাণ্টার’, মানে যা হিগ্‌স কণাকে খুঁজছে।’ তাঁর আরও বক্তব্য, ‘ঈশ্বর এলেই ব্যাপারটি ধর্মবিশ্বাসের সঙ্গে জুড়ে যায়। কিন্তু হিগ্‌স কণার অনুসন্ধানের সঙ্গে সে ধরণের কোনও অনুষঙ্গ নেই।’ তারপর তিনি যোগ করেন, ‘হিগ্‌স কণাকে ঈশ্বর-কণা বলার কোনও যৌক্তিকতাই নেই। দার্শনিকভাবেও এটা আদৌ ঈশ্বরের সমতুল নয়। এই ধরণের তুলনা স্রেফ হাস্যকর বৈ অন্য কিছু নয়।’ সি এম এস ডিটেক্টর দলের সঙ্গে যুক্ত অলিভার বাখমুলারের গলাতেও একই সুর। এই জার্মান পদার্থবিদ বলছেন, ‘হিগ্‌স-বোসন কণাকে গড পার্টিক্‌ল বলা অর্থহীন। এটা বললে স্যার পিটার হিগ্‌সকে কেবল অসম্মানই করা হয় না, অসম্মান করা হয় হিগ্‌স কণাটিকেও। খুব ছোট করে দেখা হয় মহাবিশ্ব নির্মাণের পিছনে এই কণাটির অবদানকেও। কারণ, মহাবিশ্বের উৎপত্তির নেপথ্যে আর যারই অবদান থেকে থাক, অন্ততঃ ঈশ্বরের নেই।’

    তাহলে ‘ঈশ্বর-কণা’ নামটি এল কোথা থেকে? আর কী কারণেই-বা এল? মহাবিশ্বে সবচেয়ে রহস্যময় জিনিস হল বস্তুর ভর। ‘ভর’ না থাকলে ‘বস্তু’ হয় না। আর বস্তু না হলে অস্তিত্বহীন হয় ‘জগৎ’ বা ‘জীবন’ও। আরও সোজা কথায় বললে, বস্তুর ভর না থাকলে তা ছুটে চলে আলো (light)-র গতিতে। তা কারও সঙ্গে জোটবদ্ধও হয় না। তৈরী হয় না গ্রহ, নীহারিকা, মানুষ, গাছপালা, নদীনালা, জীবজন্তু কিংবা পৃথিবী। অর্থাৎ, সৃষ্টিরহস্যের মূলে রয়েছে বস্তুর ভর। এখন কথা হল, এই ভর আসে কোথা থেকে? এ ব্যাপারে সবচেয়ে যুক্তিগ্রাহ্য ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন বিজ্ঞানী পিটার হিগ্‌স। তাঁর ‘স্ট্যান্ডার্ড মডেল’ অনুসারে, কল্পিত ‘হিগ্‌স-বোসন’ কণাই বিশ্বজগতের সমস্ত বস্তুকে ভর জোগায়। ‘হিগ্‌স-বোসন’ কণাই হল এই মহাবিশ্বের ‘বিল্ডিং ব্লক’। মহাবিশ্ব যদি একটা বিশাল অট্টালিকা হয়, তবে হিগ্‌স-বোসন কণা হল তার একেকটি ‘ইঁট’। এ কারণে ১৯৯৩ সালে নোবেলজয়ী বিজ্ঞানী লিও লেডারম্যান একটি বই লেখেন। সহযোগী লেখক ছিলেন ডিক টেরেসি। বইটির নাম – ‘দ্য গড পার্টিক্‌ল : ইফ দ্য ইউনিভার্স ইজ দ্য আন্সার, হোয়াট ইজ দ্য কোয়েশ্চেন।’ বই প্রকাশের আগে গণ্ডগোল বাধে বইয়ের নামকরণ নিয়ে। বই প্রকাশের আগে তিনি ‘গড পার্টিক্‌ল’-এর জায়গায় ‘গড্ড্যাম পার্টিক্‌ল’ নাম দেন। যার অর্থ হল, ‘নোবডি কুড ফাইন্ড দ্য থিং’, অর্থাৎ ‘কেউই জিনিস্টাকে প্রত্যক্ষ করেনি’। কিন্তু বইটির সম্পাদক তাতে প্রবল আপত্তি তোলেন। তখন নামটি বদলে দেওয়া হয়। সংবাদ মাধ্যম লার্জ হ্যাড্রন কোলাইডার এবং হিগ্‌স-বোসন কণার সন্ধানের সঙ্গে জুড়ে দেয় লেডারম্যানের বইটির নামটিকে। যে নামে কেবল বইয়ের লেখক নন, চরম অসন্তুষ্ট স্ট্যন্ডার্ড মডেলের উদ্ভাবক স্বয়ং পদার্থবিদ পিটার হিগ্‌সও। কারণ, দার্শনিক বিশ্বাসের জায়গা থেকে তিনিও নিরীশ্বরবাদী। এখন বই প্রকাশের ১৯ বছর বাদে যখন সত্যি সত্যিই বিশ্বসৃষ্টির আদি কণার সন্ধান পাওয়া গেল, তখন খুব স্বাভাবিক কারণেই সংবাদের শিরোণামে চলে এল ‘ঈশ্বর-কণা’। কেউ লিখল, ‘বিজ্ঞানের ঈশ্বর দর্শন’, কেউ ‘বিজ্ঞান মিলায় ঈশ্বর-কণা’, কেউ-বা আবার ‘ঈশ্বর খুঁজে পেল বিজ্ঞান’। ঈশ্বরের সত্যিই কোন দরকার ছিল না। কিন্তু তা সত্বেও টেনে আনা হল। না থেকেও তিনি চলে এলেন বিজ্ঞানচর্চায়। এই সমস্ত কিছুই যে খুব সচেতনভাবে ঘটে গেল, তা কিন্তু নয়। কিন্তু ঘটল। কেন?

    নাস্তিক বিজ্ঞানীমহল মনে করছে, হিগ্‌স কণাটিকে বস্তুময় বিশ্বজগতের উৎস বলে মনে করা হয়। আর ধর্মবিশ্বাসে এই স্থানটি দেওয়া হয়েছে অলীক-ঈশ্বরকে। ধর্ম যে বিজ্ঞানের মতোই প্রাসঙ্গিক ও আধুনিক, এটা সবসময় বোঝানোর চেষ্টা হয়। ধর্মের সঙ্গে বিজ্ঞানকে মিলিয়ে ঈশ্বরভাবনাকে আধুনিক করে তোলা এবং এর মাধ্যমে ঈশ্বর-বিশ্বাসকে চিরায়ত করে তোলার একটা চেষ্টা বরাবরই ধর্মপ্রচারকেরা করে এসেছেন। হিগ্‌স কণা সংক্রান্ত গবেষণা ও তার নামকরণের ক্ষেত্রেও সেই একই উদ্দেশ্য প্রতিফলিত হয়েছে। উদ্দেশ্যটি ধরা পড়েছে মিডিয়ায়। তবে এটা নতুন কিছু নয়। বিজ্ঞানকে নেব, প্রযুক্তিকে নেব, কিন্তু বৈজ্ঞানিক মূল্যবোধটুকু বাদ দিয়ে। চিন্তায়-চেতনায় থাকবে শুধু অবিজ্ঞান, কুসংস্কার আর ঈশ্বর। এটাই হল ঈশ্বর-কণার রাজনীতি অথবা রাজনীতির ঈশ্বর-কণা। মোদ্দা কথা, বিজ্ঞানচর্চা করেও অবিজ্ঞানকে শ্বাসপ্রশ্বাসে ঢুকিয়ে দেওয়ার জন্যই আমদানী ঈশ্বরের। হিগ্‌স-বোসনও তার থেকে রেহাই পেল না।

Advertisements

Tags: , , , , , , , , ,

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s


%d bloggers like this: