‘Moyna Tadanta’ Writer Aniket Chakraborty is No More

সমাজকে ধাক্কা দিত কমরেড অনিকেতের লেখনী

 নারায়ণ দত্ত

    একটা কঠিন ঝোড়ো পরিস্থিতির মধ্যে আমরা গণশক্তির একজন দক্ষ পরিশ্রমী নিষ্ঠাবান সাংবাদিককে হারালাম। গত ১০ই আগস্ট দুপুরে গণশক্তির সাংবাদিক এবং সম্পাদকমন্ডলীর সদস্য কমরেড অনিকেত চক্রবর্তী আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন। অনিকেতের প্রকৃত নাম অনিরুদ্ধ চক্রবর্তী। কিন্তু গণশক্তিতে এবং গণশক্তির অগণিত পাঠকদের কাছে তিনি অনিকেত চক্রবর্তী নামেই পরিচিত ছিলেন। বলা ভালো, জনপ্রিয় ছিলেন। সাংবাদিকতার মাধ্যমে মানুষের ভালোবাসা ও জনপ্রিয়তা অর্জন করায় তিনি দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবেন।

ভারাক্রান্ত হৃদয়ে তাঁর স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে এখন আমাদের অনেক কথাই মনে পড়ছে। ২১ বছর একই প্রতিষ্ঠানে কাজ করা এক সহকর্মীকে হারানোর বেদনার সঙ্গে সঙ্গে আমরা সকলেই অনুভব করছি একটি বড় লড়াইয়ের শক্তিশালী সহযোদ্ধাকে হারানোর বেদনা, আর প্রতি মুহূর্তে অনুভব করছি এক বিপুল ক্ষতির পরিমাণ। বয়সকালে প্রাকৃতিক নিয়মে অনেক প্রিয় কমরেডকেই আমাদের চিরবিদায় জানাতে হয়েছে। মন মানুক না মানুক, অনেক কিছু মানতেই হয়। কিন্তু মাত্র ৪৫ বছর বয়সে আত্মঘাতী হয়ে চলে যাওয়া এক কমরেডকে বিদায় জানানোর কষ্ট মেনে নেওয়ার কি আর কোনো সহজ উপায় হয়!

তবু অনিকেতের জীবন তো কোনো সাধারণ বয়ে যাওয়া জীবন ছিলো না, ছিলো এমন কোনো এক বহমান সংগ্রামের জীবন যার প্রতিটি স্মৃতিচারণ আমাদের অন্যভাবেও ভাবতে শেখায়। যে অকস্মাৎ জীবন থেকে সরে দাঁড়ালো, তাঁরই জীবনের বিগত দিনগুলি আমাদের অন্য কোনো মানে খুঁজতে সাহায্য করে। কমরেড অনিকেত চক্রবর্তীর জীবন মানে দিনের পর দিন শ্রমজীবী গরিব মানুষের জন্য প্রবল পরিশ্রম করে তথ্যের পর তথ্য সংগ্রহ করে সংগ্রামের বারুদভরা সংবাদ তৈরি করা। অনিকেত নিজে হাতে দেখিয়ে দিয়ে গেছেন, অসির চেয়ে মসির জোর কতটা বেশি হতে পারে। গণশক্তি পত্রিকা তাঁর লিখিত সংবাদ ও নিবন্ধে দিনের পর দিন ঋদ্ধ হয়েছে।

আজ যখন আমাদের রাজ্যের সামগ্রিক পরিস্থিতি এক গভীর সঙ্কটের মধ্য দিয়ে অতিবাহিত হচ্ছে, সংবাদমাধ্যম সম্পর্কে নানা প্রশ্ন নানা দিক উঠে আসছে ঠিক তখনই সাংবাদিক অনিকেত আমাদের মধ্যে আর নেই। কিন্তু সাংবাদিক ও সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতারক্ষার লড়াই, এবং সংবাদমাধ্যমকে মুনাফার বদলে জনস্বার্থের পথে রাখার লড়াইকে অনিকেত তাঁর লেখনীর মাধ্যমে বরাবর গুরুত্ব দিয়ে এসেছেন।

বিগত কয়েকবছর ধরে পশ্চিমবঙ্গের সামগ্রিক রাজনৈতিক পটভূমিতে সংবাদমাধ্যমের ভূমিকা নিঃসন্দেহে ভবিষ্যতের গবেষণার বিষয় হয়ে থাকবে। সংবাদমাধ্যমের এই চলতি সময়ের ভূমিকা দেখিয়ে দিচ্ছে, বাজারের মুনাফা সন্ধানী ব্যবসায়িক চরিত্রের সংবাদমাধ্যম কোনো মতেই সত্যনিষ্ঠা এবং জনস্বার্থরক্ষায় কাজ করে না। সংবাদমাধ্যমের এই চরিত্রকে রীতিমতো তথ্যের আলোকে বিশ্লেষণ করে, সংবাদপত্র ঘেঁটে তাদেরই প্রকাশিত তথ্যের ভিতরকার পরস্পর বিরোধিতা, অসত্যতা এবং কখনো কখনো বিচ্ছিন্নভাবে প্রকাশিত হয়ে যাওয়া নির্মম সত্যকে শৈল্পিক দক্ষতায় তুলে ধরেছিলেন অনিকেত। গণশক্তি পত্রিকার উত্তরসম্পাদকীয় বিভাগে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয় এই সংক্রান্ত কলাম ‘ময়নাতদন্ত’। অনীক চক্রবর্তী ছদ্মনামে এই ‘ময়নাতদন্ত’ লিখতেন অনিকেত চক্রবর্তীই। তাঁর লেখা ‘ময়নাতদন্ত’ পাঠক মহলে এত জনপ্রিয় হয়েছিলো যে এই লেখাটি পড়ার জন্য নির্দিষ্ট দিনে অনেকেই অপেক্ষা করে থাকতেন।

ধারাবাহিক ‘ময়নাতদন্ত’ -এর লেখাগুলি একটি সময়কালের সংবাদমাধ্যমের ইতিহাসের চিত্র হয়ে থাকবে। ভবিষ্যতেও সংবাদমাধ্যম সংক্রান্ত গবেষণায় এই লেখাগুলি তথ্যনিষ্ঠ উপাদানের ভূমিকা পালন করবে। শুধু সংবাদমাধ্যমের কাজের মূল্যায়নেই নয়, বর্তমান সময়কালে এরাজ্যের রাজনৈতিক ঘটনাবলীরও একটি প্রাঞ্জল বিবরণ তুলে ধরে এই ‘ময়নাতদন্ত’। বর্তমান রাজনীতিকে বুঝতে এই লেখাগুলি অত্যন্ত সহায়ক। এই কারণে গণশক্তির পক্ষ থেকে অনিকেতের লেখা ‘ময়নাতদন্ত’-এর দুটি সংকলন প্রকাশ করা হয়েছে যাও পাঠকমহলে অত্যন্ত সমাদৃত হয়েছে।

ভারতে সাংবাদিকতার উৎপত্তি ও বিকাশের সঙ্গে গণসংগ্রামের হাত ধরাধরি করা সম্পর্ক। পরাধীন ভারতে জাতীয় মুক্তি আন্দোলনের পরিপূরক হিসাবে কাজ করেছে ভারতের সাংবাদিকতা এবং সেখান থেকেই তার আধুনিকতা। পৃথিবীর বহু দেশের মতো ভারতেও সাংবাদিকতার বিকাশের সঙ্গে তার অ্যাক্টিভিস্ট বা মিশনারি ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু স্বাধীন ভারতে পুঁজিবাদের বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে সংবাদমাধ্যম এবং সাংবাদিকতায় বাণিজ্যিকতার ছোঁয়া লেগেছে, এবং পরবর্তীতে বাণিজ্যিকতাই সাংবাদিকতাকে গ্রাস করতে লেগেছে। এই বাণিজ্যিকতার স্রোতের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে সাংবাদিকতাকে তার প্রকৃত আদর্শে ধরে রাখার জন্য যে সংগ্রাম অবিরত চলছে অনিকেত ছিলেন তার একনিষ্ঠ সৈনিক।

মিডিয়া গবেষণায় লব্ধ জ্ঞান থেকে অনিকেত এই পথে আসেননি, অনিকেত তাঁর রাজনৈতিক জীবনের সংগ্রামের অভিজ্ঞতা থেকে মিডিয়া জগতের এই সংগ্রামের পথে এসেছিলেন। ছাত্র অবস্থাতেই শ্রমজীবী মানুষের মুক্তির সংগ্রাম তাঁকে হাতছানি দিয়েছিলো। তাই হাওড়ার নরসিংহ দত্ত কলেজে পড়াকালীন সক্রিয়ভাবে তিনি এস এফ আই-র কাজে যোগ দেন। পরে মহেশ ভট্টাচার্য হোমিওপ্যাথিক মেডিক্যাল কলেজে পড়ার সময় হাওড়া জেলায় ছাত্র আন্দোলনের একজন গুরুত্বপূর্ণ সংগঠক হয়ে ওঠেন। ১৯৮৮ সালে তিনি এস এফ আই-এর হাওড়া জেলার সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য হন। এই সময়েই তিনি এস এফ আই-এর পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটির মুখপত্র ‘ছাত্র সংগ্রাম’-এর সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য হন। ১৯৮৪ সালে তিনি সি পি আই (এম)-র সদস্যপদ লাভ করেন। কমিউনিস্ট রাজনৈতিক সংগ্রামই তাঁকে বুঝিয়ে দিয়েছিলো, লেনিনের বর্ণিত রাজনৈতিক সংগ্রাম ও সংগঠনের সংগঠক হিসাবে সংবাদপত্রের ভূমিকা। তাই ১৯৯১সালে তিনি পার্টির সর্বক্ষণের কর্মী হিসাবে যোগ দেন গণশক্তি পত্রিকার সাংবাদিকতার কাজে।

সাংবাদিকতার কাজকে তিনি রাজনৈতিক মতাদর্শের অঙ্গ হিসাবেই দেখতেন। তাই দুই-তিন বছর আগে বিরোধী দলে থাকা তৃণমূল কংগ্রেসের নৈরাজ্যের রাজনীতিতে যখন ছাত্র খুন হয়েছে, এক ছাত্রের চোখ নষ্ট হয়ে গেছে, তখন কোনোরকম ভনিতার সাংবাদিকতার বদলে দৃঢ় কলমে তিনি ‘ময়নাতদন্ত’-এ লিখেছিলেন ‘চোখ নষ্টের প্রতিবাদ যদি রাজনীতি হয় তো হোক’। আবার রাজ্যে নতুন সরকার আসার পরে একের পর এক আক্রমণে সংবাদমাধ্যমকে কাজে বাধা দেওয়ার সময় তিনিই প্রতিবাদে লিখেছেন, ‘কইতে কথা বাধবে না, সবাই চুপ থাকবে না’।

দশবারো বছর আগে কেশপুর গড়বেতায় সন্ত্রাসের সময় অনিকেত সেখানে গিয়ে অত্যন্ত ঝুঁকির সঙ্গে এবং দিনরাত প্রবল পরিশ্রম করে তথ্য সংগ্রহ করেছেন। দিনের পর দিন সেখানকার অত্যাচারিত মানুষের সঙ্গে কথা বলেছেন, তাঁদের সঙ্গে থেকেছেন, খেয়েছেন এবং দিন কাটিয়েছেন এবং তারপর রিপোর্টাজে সেই সবের নির্মম বিবরণ তুলে ধরেছেন। গণশক্তির অন্যান্য সাংবাদিকদের সঙ্গে যৌথভাবে তিনি তুলে ধরেছিলেন সেখানকার মানুষের সংগ্রামের চিত্রও। পরবর্তীতে সিঙ্গুরে শিল্প উৎখাত করতে তৃণমূল কংগ্রেসের নৈরাজ্যের আন্দোলনের সময়েও তিনি দীর্ঘদিন সেখানকার সংবাদ লিখেছেন। সিঙ্গুরে তাপসী মালিকের মৃত্যু নিয়ে মামলা ও চক্রান্তের সময়েও তিনি ধারাবাহিকভাবে সেই আইনী লড়াইয়ের বর্ণনা দিয়েছেন।

মূলত: রাজনৈতিক বিষয়ক সাংবাদিক হিসাবে কাজ করলেও অনিকেতের দৃষ্টিতেই থাকতো গরিব ও শ্রমজীবী মানুষের স্বার্থবাহী কষ্ঠিপাথর। তাই সাধারণভাবে অরাজনৈতিক খবরের মধ্যেও গরিব শ্রমজীবী মানুষের কথা কীভাবে তুলে ধরা যায় সেদিকে তাঁর দৃষ্টি থাকতো সজাগ। দুর্ঘটনা বা প্রাকৃতিক দুর্যোগের খবরেও যেখানে গরিব মানুষের স্বার্থ জড়িত সেখানেও অনিকেত থাকতেন প্রবল যত্নবান। শ্রমজীবী গরিব মানুষের প্রশ্নে সমাজকে ধাক্কা দিতে খবরকে সেনসেসনাইলজড্‌ করাকে কর্তব্য মনে করলেও নিছক খবরকে আকর্ষণীয় করার স্বার্থে তিনি এই পথকে গুরুত্ব দিতেন না। এই সব বিষয়ে তিনি শুধু একজন কমিউনিস্ট হিসাবেই নয়, প্রগতিশীল সাংবাদিক হিসাবেও চিহ্নিত হয়ে থাকবেন। অনিকেত বহু লিটল ম্যাগাজিনে গল্পও লিখেছেন। অত্যন্ত লক্ষ্মণীয়, তাঁর গল্পগুলিতেও ছিলো সেই শ্রমজীবী মানুষের সুখ দুঃখের কথারই প্রাধান্য, যা তাঁর চোখে ধরা পড়েছে সাংবাদিকতার পথের আনাচে কানাচে।

গণশক্তির একজন কর্মী হিসাবে অনিকেত ছিলেন অত্যন্ত পরিশ্রমী, দক্ষ এবং নিজের আদর্শের প্রতি সৎ। নিজের কাজ ও আদর্শের প্রতি দৃঢ় বিশ্বাসের কারণেই তিনি কোনো প্রতিদানের আশা ছাড়াই নিরলস পরিশ্রম করতে পারতেন। কমিউনিস্ট পার্টির একজন সর্বক্ষণের কর্মী হিসাবেও তিনি ছিলেন দৃষ্টান্তস্বরূপ। যা তিনি সঠিক নয় বলে মনে করতেন তা উচ্চারণে তিনি ছিলেন দ্বিধাহীন। কিন্তু সহকর্মীদের প্রতি ভালোবাসা এবং প্রয়োজনে তাঁদের পাশে দাড়ানোয় তাঁর মনটা ছিল সুবিশাল। গণশক্তির একতলা থেকে পাঁচতলার সব কর্মীরাই তাই ভালোবাসতেন হাসিখুশি মিশুকে অনিকেতকে। শুধু গণশক্তি নয়, কলকাতার বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের সাংবাদিকদের সঙ্গেও নিবিড় ভালোবাসার সম্পর্ক ছিলো অনিকেতের। সাম্প্রতিক সময়ে পার্টি এবং গণশক্তি যখন নানাদিক থেকে আক্রান্ত তখনো তিনি ভীত না হয়ে অসীম সাহসের সঙ্গে লড়াইয়ের ময়দানে ছিলেন। অনিকেতকে এই সংগ্রামী জীবনের থেকে কেউ কখনো তাঁকে সরে যেতে দেখেনি। সব হিসেব এলোমেলো করে শুধু একবার অন্যরকম কিছু ঘটে গেলো গত ১০ই আগস্ট। কবিতাপ্রিয় অনিকেতের অন্যতম প্রিয় কবি ছিলেন জীবনানন্দ দাশ।

কে জানে চেনাজানা পরিচিত অনিকেতের বুকের ভিতরেও খেলা ছিলো কোনো এক বিপন্ন বিস্ময়ের!

Advertisements

Tags: , , , , , , , , ,

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s


%d bloggers like this: