Coalgate Scandal

বেসরকারীকরণের মাসুল হলো কয়লা কেলেঙ্কারি

প্রকাশ কারাত

    কয়লা খাদান বণ্টন নিয়ে সি এ জি রিপোর্ট আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে কিভাবে দেশের কয়লা সম্পদ বেসরকারী কোম্পানিগুলির হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে, যাতে তারা সহজেই মুনাফার পাহাড় বানাতে পারে। সি এ জি-র রিপোর্ট অনুসারে, বেসরকারী কোম্পানিগুলিকে এইভাবে নিজস্ব কয়লা খাদান বরাদ্দ করার ফলে ঐ কোম্পানিগুলির পক্ষে ১.৮৬ লক্ষ কোটি টাকার মুনাফা করা সম্ভব।

    নিজস্ব কয়লা খাদান বরাদ্দ করার বিষয়টি হলো ইউ পি এ সরকারের সেই নীতির একটি অঙ্গ যে নীতির লক্ষ্য হলো বৃহৎ পুঁজিপতি ও কর্পোরেটরা যাতে সহ‍‌জে প্রাকৃতিক সম্পদ লুট করতে পারে। প্রাকৃতিক গ্যাস, জমি ও স্পেকট্রাম বরাদ্দ নিয়ে একই ঘটনা ঘটেছে।

    সি এ জি রিপোর্টে অবশ্য ১৯৯১ সাল থেকে কেন্দ্রে অধিষ্ঠিত সরকারগুলির কয়লার মতো প্রাকৃতিক সম্পদসমূহের বেসরকারীকরণের সামগ্রিক অভিমুখ সম্পর্কে কিছু বলা হয়নি। সি এ জি যা করেছে তা হলো ২০০৬-০৭ থেকে ২০১০-১১ সাল পর্যন্ত পারফরম্যান্স অডিট পরিচালনা করা। এই অডিটের আওতায় পড়েছিল ২০০৪ সালের পর থেকে কয়লামন্ত্রক কর্তৃক কয়লা খাদান বরাদ্দ।

    কয়লার ক্ষেত্রে এন ডি এ এবং ইউ পি এ সরকার উভয়েই একটি প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়েছিল। ১৯৭২-৭৩ সালে কয়লাখনিগুলির জাতীয়করণ হয়। কয়লা খনি (জাতীয়করণ) আইন গৃহীত হয় ১৯৭৩ সালে। কংগ্রেস এবং বি জে পি নেতৃত্বাধীন সরকারগুলি যথাসাধ্য চেষ্টা করা সত্ত্বেও তারা ঐ আইনকে সংশোধন করে কয়লা উত্তোলনের ক্ষেত্রে বেসরকারী প্রতিষ্ঠানগুলিকে প্রবেশ করাতে ব্যর্থ হয়। বেসরকারী ক্ষেত্রকে প্রবেশের সুযোগ করে দেবার জন্য কয়লা জাতীয়করণ সং‍‌শোধনী বিল এন ডি এ সরকার ২০০০ সালে পেশ করে। কিন্তু তা আজ পর্যন্ত পাশ করা যায়নি। সে সময় কয়লা খনিগুলির আবার বেসরকারীকরণের বিরুদ্ধে দৃঢ় প্রতিবাদ জানি‌য়েছিল কয়লাখনি শ্রমিকদের ইউনিয়নগুলি এবং দেশের সমগ্র ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলন। বেসরকারীকরণের উদ্যোগের বিরুদ্ধে কয়লাখনির শ্রমিকেরা দফায় দফায় ধর্মঘটে শামিল হয়েছিলেন।

    এই অসুবিধা অতিক্রম করার জন্য ‘নিজস্ব খনি’ বরাদ্দের পথ বের করা হয়েছে। ১৯৯৩ সালে এবং ১৯৯৬ সালে মূল আইনের সংশোধনীগুলিতে ‘নিজস্ব খনি’ পাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং সিমেন্ট উৎপাদন কোম্পানিগুলিকে। এর আগে ১৯৭৬ সালে নিজস্ব খাদান রাখার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল লোহা ও ইস্পাত উৎপাদকদের। এখন আবার নতুন করে যোগ করা হলো বিদ্যুৎ ও সিমেন্ট উৎপাদক সংস্থাগুলিকে।

    ‘নিজস্ব খাদান’ বরাদ্দের ক্ষেত্রে নির্দেশিকায় বলা হয়েছে, যারা চূড়ান্ত পর্যায় পর্যন্ত উৎপাদন করবে, অর্থাৎ যেমন ইস্পাত বা বিদ্যুৎ উৎপাদকরা তারাই ঐ বরাদ্দ পাওয়ার অধিকারী। কিন্তু ২০০৬ সালে একে লঘু করা হয়। এখন একটি মাইনিং কোম্পানির যদি ইস্পাত বা বিদ্যুৎ উৎপাদনকারীদের কয়লা সরবরাহ করার কন্ট্রাক্ট থাকে, তা হলে সেই মাইনিং কোম্পানিকে কয়লা খাদান দেওয়া যেতে পারে।

    এই পথেই মন্ত্রক নিযুক্ত স্ক্রিনিং কমিটি কয়লা ব্লক এমন অনেকে সংস্থাকে দিয়েছে, যারা ঐ ব্লক থেকে কয়লা তোলেনি, অথবা অন্য কোনো সংস্থাকে বিক্রি করে দিয়েছে। ইতোমধ্যে সি বি আই কয়েকটি বরাদ্দ নিয়ে তদন্ত করছে এবং আশা করা যাচ্ছে প্রতারণা ও অন্যান্য অপরাধমূলক কাজকর্মের অভিযোগ রুজু করা হবে।

    নিজস্ব খাদান বণ্টন গতিলাভ করে ২০০০ সালের পরে। এর পিছনে মূল যুক্তি ছিলো, কোল ইন্ডিয়া লিমিটেড (সি আই এল) ও তার সহযোগী সংস্থাগুলি বিদ্যুৎ উৎপাদন ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলির জন্য কয়লার ক্রমবর্ধমান চাহিদা মেটাতে পারছে না। কয়লা উৎপাদনে লক্ষ্যমাত্রা পূরণে ব্যর্থতার জন্য ইস্পাত, সিমেন্ট ও অন্যান্য সহযোগী শিল্পগুলির উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। আসলে এসব অনুমতি ব্যবহার করা হয়েছে সুপরিকল্পিতভাবে রাষ্ট্রায়ত্ত কয়লা শিল্পকে বানচাল ও অপদস্থ করার লক্ষ্য নিয়ে। সি আই এল-কে পুনর্বিন্যস্ত করার লক্ষ্যে পদক্ষেপ গ্রহণ এবং কয়লা ক্ষেত্রের দুর্নীতি ও অপচয় দূর করার বদ‍‌লে ইউ পি এ এবং এন ডি এ সরকার উভয়েই এমন এক পরিস্থিতি তৈরির চেষ্টা করেছে যেখানে বেসরকারী ক্ষেত্র আবার কয়লা ক্ষেত্রে প্রবেশ করে আধিপত্য সৃষ্টিতে সক্ষম হবে।

    নিজস্ব খাদান বেসরকারীকরণ রুটের পক্ষে সরকারের বিভ্রান্তিমূলক যুক্তিগুলি উদঘাটিত হয়েছে সি এ জি রিপোর্টে। সি এ জি রিপোর্ট অনুসারে, একাদশ যোজনা সময়কালে (২০১০-১১ পর্যন্ত) ৭৩টি কয়লা ব্লক চিহ্নিত করা হয়েছিল, যেখান থেকে ৭ কোটি ৩০ লক্ষ টন কয়লা উত্তোলনের কথা ছিল। শেষ পর্যন্ত মাত্র ২৮টি ব্লকে (তার মধ্যে মাত্র ১৫টি ব্লক দেওয়া হয়েছিল বেসরকারী হাতে) ২০১০-১১ সালে উত্তোলিত হয়েছিল মাত্র ৩.৪৬৪ কোটি টন কয়লা। নিজস্ব খনি ব্লকগুলিতে এইভাবে কয়লা উৎপাদনের ক্ষেত্রে ঘাটতি পড়েছিল ৫২.৫৫ শতাংশ। এখনও পর্যন্ত ৬৮টি ব্লকে কয়লা উত্তোলন শুরুই হয়নি।

    নিজস্ব খনি নীতিকে কয়লামন্ত্রক সক্রিয়ভাবে কাজে লাগানোর চেষ্টা করে যাচ্ছে। উদ্দেশ্য হলো, কোল ইন্ডিয়া লিমিটেড ‍‌(‍‌সি আই এল)-কে দুর্বল করা এবং রাষ্ট্রায়ত্ত কয়লাখনি ক্ষেত্রের প্রসার রোধ করা। সি আই এল-র আপত্তি সত্ত্বেও মন্ত্রক সি আই এল-র আওতা থেকে কয়লা ব্লক সংরক্ষণ করার ক্ষমতা প্রত্যাহার করে নেয়। তাছাড়া কয়লামন্ত্রকের কাছে সি আই এল তার নিজের জন্য কয়লার ১১৬টি ব্লক (৪.৯৭৯০ কোটি টন কয়লা আছে) সংরক্ষিত রাখার যে আবেদন জানিয়েছিল, তা আজ পর্যন্ত ছাড়পত্র পায়নি। সি এ জি রিপোর্ট উল্লেখ করেছে, এর ফলে সি আই এল-র উৎপাদন পরিকল্পনা মার খাবে।

    সংসদে এই প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী যে বিবৃতি দিয়েছেন তা সমর্থনযোগ্য নয় এমন এক নীতির পক্ষে নির্লজ্জ সওয়াল। প্রধানমন্ত্রী এবং কয়লামন্ত্রকের দুই রাষ্ট্রমন্ত্রীর তত্ত্বাবধানে কয়লা খাদান বণ্টনের মতো ঘৃণ্য ব্যবস্থাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা হয়েছে। ২০১০ সালে কয়লামন্ত্রকের একটি নির্দেশ বানচাল করা হ‌য়ে‍‌ছিল। কয়লামন্ত্রকের ঐ নির্দেশে বলা হয়েছিল, নিজস্ব কয়লা খাদানগুলি যেন তাদের জন্য নির্দিষ্ট কয়লার চেয়ে বেশি উত্তোলন না করে। ঐ নির্দেশে উল্লেখ করা হয়েছিল, অতিরিক্ত উত্তোলিত কয়লা যেন কোল ইন্ডিয়া লিমিটেডকে হস্তান্তরিত করা হয়। প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর উলটে মদত দিয়েছে সেই সব কোম্পানিকে যারা অতিরিক্ত উৎপাদনকে কাজে লাগাতে চেয়েছিল। (‍‌‍‌সি এ জি-র আরেকটি রিপোর্টে সাসান বিদ্যুৎ প্রকল্পের জন্য নির্দিষ্ট কয়লা খাদানগুলি থেকে উত্তোলিত অতিরিক্ত কয়লা ব্যবহারের জন্য রিলায়েন্স পাওয়ার লিমিটেডকে অনুমতি দেওয়ায় সরকারকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। শীর্ষস্তরে এই সাম্প্রতিক দুর্নীতি সম্পর্কে ইউ পি এ সরকার এবং কংগ্রেস-নেতৃত্ব দায়িত্ব এড়াতে পারে না।

    প্রধানমন্ত্রীর ইস্তফা চেয়ে বি জে পি যেভাবে সংসদের অধিবেশন বানচাল করার চেষ্টা করেছে, তাতে তাদের আশ্চর্যজনক ভণ্ডামি প্রকট হয়ে দেখা দিয়েছে। ‘নিজস্ব কয়লা খাদান’ পদ্ধতির অগ্রদূত বি জে পি। এরাই সংসদে কয়লা বেসরকারীকরণ বিল নিয়ে এসেছে। এন ডি এ সরকার ক‌য়লার দাম বিনিয়ন্ত্রণ করেছিল। তাছাড়া ঐ আমলেই সি আই এল-কে দুর্বল করার জন্য গুরুতর ধরনের বেশ কিছু সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। প্রতারণাকারী কোম্পানিগুলির হাতে কয়লা খাদান তুলে দিতে গিয়ে মধ্য প্রদেশ এবং ছত্তিশগড়ে বি জে পি সরকারগুলি একই পথ অনুসরণ করেছিল। প্রাকৃতিক সম্পদ লুট করার জন্য বৃহৎ বাণিজ্যিক গোষ্ঠীগুলিকে অনুমতি দেওয়ার ক্ষেত্রে কংগ্রেস এবং বি জে পি উভয়েই তাদের ভূমিকা পালন করেছে।

    এটা এখন স্পষ্ট যে, বেসরকারীকরণের যে ‘নিজস্ব খাদান’ রুট তাতে ঐ খাদানগুলি বরাদ্দ করা হয়েছে বাছাই করে, লঙ্ঘন করা হয়েছে খোদ কয়লামন্ত্রকের নিয়মবিধি, দ্রুত লাভের জন্য নিজস্ব খাদানগুলি অন্যদের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে।

    সি এ ‍‌জি রিপোর্টের ফলে যে শোরগোল শুরু হয়েছে, তাতে কয়লা খাদানগুলি প্রতিযোগিতামূলক নিলামের মধ্য দিয়ে বিলি করার পদ্ধতির প্রয়োজনীয়তা গুরুত্ব পেয়েছে। যদি দুর্নীতিমূলক আচরণ বন্ধ করা এবং বেসরকারী হাতে কয়লা বরাদ্দের ব্যাপারে অনুগ্রহ দেখানোর প্রশ্ন ওঠে, তাহলে প্রতিযোগিতামূলক নিলাম বর্তমান ব্যবস্থার তুলনায় ভালো বলেই গণ্য হবে। তবে মূল ইস্যু হলো কয়লাশিল্পের বেসরকারীকরণ হবে কি হবে না? সি পি আই (এম) ক‌য়লাশিল্প বেসরকারীকরণের তীব্র বিরোধী। সে কারণেই পার্টি কয়লা ক্ষেত্রে বেসরকারী কোম্পানিগুলিকে আনার লক্ষ্যে পথ হিসাবে ‘নিজস্ব খাদান’ (Captive Coal Block) পদ্ধতির ব্যবহারের বিরোধিতা করে আসছে।

    কয়লা হলো ফসিল জ্বালানি এবং এমন এক প্রাকৃতিক সম্পদ যা পুনর্নবীকরণ‍‌যোগ্য নয়। লক্ষ লক্ষ পরিবারে কয়লা ব্যবহার করা হয়। হাজার হাজার ছোটবড় শিল্প তাদের বিদ্যুৎ ও শক্তির মূল উৎস হিসাবে কয়লার উপরে নির্ভরশীল। সে কারণেই কয়লার ব্যবহার হওয়া উচিত সুপরিকল্পিত পদ্ধতির ভিত্তিতে। তাতে বিকাশ, স্থায়ী উন্নয়ন ও সমতা সুনিশ্চিত হবে।

    জনগণের তর‍‌ফে রাষ্ট্র এই মূল্যবান প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষা করছে। বেসরকারী সংস্থাগুলির অতি মুনাফার জন্য এই প্রাকৃতিক সম্পদ নয়।

    সে কারণেই কয়লা উত্তোলনের ভার রাষ্ট্রায়ত্ত ক্ষেত্রের উপরেই থাকা উচিত। যদি বেসরকারী বিদ্যুৎ ও ইস্পাত কারখানাগুলির ক‌য়লা প্রয়োজন হয়, তা হলে সেই কয়লার বরাদ্দ হওয়া উচিত নোডাল এজেন্সি অর্থাৎ সি আই এল মারফত। এইসব সংস্থার ক্ষেত্রে কয়লার ব্লক নি‍র্দিষ্ট করা যেতে পারে। কিন্তু সেগুলি থেকে কয়লা তুলবে সি আই এল এবং তার সহযোগী সংস্থাগুলি। রাজ্যগুলিতে এই প্রক্রিয়ায় রাজ্য সরকার পরিচালিত মাইনিং কর্পোরেশনগুলিতে যুক্ত করা যেতে পারে। বেসরকারী ক্ষেত্র, ইস্পাত উৎপাদন ইত্যাদি ক্ষেত্রে বিদ্যুৎ উৎপাদনের চাহিদাও মেটাতে হবে।

    বিশ্বের মধ্যে ভারতে ভূগর্ভে কয়লা সঞ্চ‌য়ের পরিমাণ চতুর্থ বৃহত্তম। বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতার প্রায় ৫৫ শতাংশের উৎস হলো তাপ বিদ্যুৎ প্রকল্প। অর্থনীতিতে কয়লার চাহিদা ক্রমশই বাড়ছে। বিভিন্ন কারণে কয়লা উৎপাদন এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হয়নি। এই অবস্থায় কয়লা শিল্পের বেসরকারীকরণের জন্য উন্মুখ হওয়ার পরিবর্তে সরকারের উচিত রাষ্ট্রায়ত্ত কয়লা সংস্থাগুলিকে শক্তিশালী করা, প্রযুক্তিকে উন্নত করা এবং আরো কয়লা ধৌতাগার (Coal Washeries) স্থাপন করা।

    প্রতিযোগিতামূলক নিলাম অথবা কয়লা ক্ষেত্রের জন্য নিলামের পথ গুরুতর ধরনের অসুবিধা তৈ‍‌রি করতে পারে। প্রতিযোগিতামূলক নিলামে বৃহৎ বেসরকারী সংস্থাগুলি বিশেষ সুবিধা পেতে পা‍‌রে। তাতে বেসরকারী একচেটিয়া ব্যবস্থা ও কার্টেল তৈরি হবে। রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা ও রাজ্য সরকারগুলি পরিচালিত সংস্থাগুলি প্রতিযোগিতায় দাঁড়াতে পারবে না। অধিকন্তু কয়লা খাদান বরাদ্দ করার অভিজ্ঞতা থেকে বোঝা যাচ্ছে, চূড়ান্ত উৎপাদনকারীরা যে এই কয়লা পাবে, তা সুনিশ্চিত করা যাচ্ছে না। প্রতিযোগিতামূলক নিলামের (Competitive Bidding) আরেকটি দিক হলো, এর ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যয় বাড়বে এবং তার ফলে বিদ্যুৎ ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রিত শুল্কের উপরে তার চাপ পড়বে।

    যে সব রাজ্যে কয়লা উৎপাদিত হয় তারা সঙ্গত কারণ দেখিয়ে বলেছে, রাজ্যগুলির শিল্পউন্নয়ন এবং শক্তির চাহিদা মিটতে পারে যদি রাজ্যগুলির মধ্যে থাকা কয়লা খাদানগুলি বিলির ব্যাপারে রাজ্যগুলির বক্তব্য উপযুক্ত গুরুত্ব পায়।

    দেড় দশকেরও বেশি সম‌য়কাল ধরে পশ্চিমবঙ্গে বামফ্রন্ট সরকার নিজস্ব কয়লা খাদান বিলির ব্যাপারে যে অবস্থান নিয়েছিল তার উপাদানগুলি নিচে উল্লেখ করা হলো। প্রথমত, বরাদ্দের ব্যাপারে রাজ্য সরকারকে যুক্ত করা উচিত। দ্বিতীয়ত, রাজ্যের মতামত ছাড়া কোনো বেসরকারী সংস্থাকে সরাসরি কয়লা খাদান বিলি করা যাবে না। তৃতীয়ত, যেখানে কয়লা খাদানগুলি রাজ্য সরকারের ব্যবস্থা মারফত বিলি হয়েছে, সেখানে কয়লা উত্তোলন ও তার বণ্টনের জন্য রাজ্য মাইনিং কর্পোরেশন সংশ্লিষ্ট ইস্পাত বা বিদ্যুৎ কোম্পানির সঙ্গে‍ যৌথ উদ্যোগে আবদ্ধ হতো।

    সরাসরি প্রতিযোগিতামূলক নিলাম পদ্ধতিতে যাওয়ার ব্যাপারে বামফ্রন্ট সরকারের যে আপত্তি ছিলো তাকে বিকৃত করেছে দক্ষিণপন্থী ক‍‍‌র্পোরেট মিডিয়া। তাছাড়া বিকৃতি ঘটিয়েছেন অরবিন্দ কেজরিওয়াল এবং ইন্ডিয়া অ্যাগেইন্সট করাপশন গ্রুপের লোকজন। এইসব শক্তিগুলি জেনে হোক অথবা না জেনেই হোক, যা চাইছে তা হলো দেশের কয়লা সম্পদকে প্রতিযোগিতামূলক নিলাম মারফত বেচে দেওয়া এবং কয়লা শিল্পের বেসরকারীকরণের পথ প্রশস্ত করা। কোল ব্লক কেলেঙ্কারি মনমোহন সিং সরকারকে আরো কলঙ্কিত করেছে। এখন শুধু যে ‘সম্পদ লুট করো’ নীতির প্রণেতাদের চিহ্নিত করার সুযোগ এসেছে তাই নয়, এখন প্রাকৃতিক ও খনিজ সম্পদ বেসরকারীকরণের নীতি পরিবর্তনের দাবিও তুলতে হবে।

    কয়লা খাদান নীতির ব্যাপারে বেনিয়ম ও দুর্নীতিতে জড়িতদের দায়িত্ব চিহ্নিত করার জন্য উচ্চপর্যায়ের তদন্ত জরুরী। যারা দোষী বলে চিহ্নিত হবে, তাদের বিচারের ব্যবস্থা করতে হবে। যে সব বরাদ্দ নিয়ম মেনে করা হয়নি, সেগুলি বাতিল করতে হবে। যেখানে অতি অল্প সময়ে অতি মুনাফা হয়েছে, সেখানে সরকারের যে ক্ষতি হয়েছে তা উদ্ধারের জন্য ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

    উপরের কাজগুলি করার পাশাপাশি সি পি আই (এম) এবং যারা প্রাকৃতিক সম্পদের লুটের অবসান চায়, তারা দাবি জানাবে যাতে কয়লার বরাদ্দ ও উত্তোলন ভবিষ্যতে রাষ্ট্রায়ত্ত ক্ষেত্র মারফত হয়।

Advertisements

Tags: , , , , , , , , ,

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s


%d bloggers like this: