Retail Giant Walmart

কাজ খাবে,মজুরি কমাবে ওয়ালমার্ট

 নিজস্ব প্রতিনিধি

     নয়াদিল্লি, ২২শে সেপ্টেম্বর— এক বছর, বড়জোর দেড় বছরের মধ্যে ভারতে নিজেদের খুচরো বিক্রির দোকান খুলবে ওয়ালমার্ট। বিশ্বের বৃহত্তম খুচরো ব্যবসার সংস্থা ওয়ালমার্ট রীতিমতো প্রস্তুত হয়েই আছে। ভারতে ইতোমধ্যেই ভারতীর সঙ্গে তাদের যৌথ ব্যবসা রয়েছে। পাইকারি বিক্রির সেই ব্যবসায়ে ওয়ালমার্টের অংশীদারিত্ব ৫০শতাংশ। এই অভিযোগও আছে যে ঘুরপথে ভারতী-ওয়ালমার্ট খুচরোর ব্যবসাও চালাচ্ছে। কেন্দ্রের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তের পরে ওয়ালমার্টের দোকান খোলার পথে কোনো বাধা নেই। সম্ভবত ভারতীর সঙ্গে যৌথভাবেই ওয়ালমার্ট এই ব্যবসা খুলবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

    কোনো সন্দেহ নেই খুচরো বাণিজ্যে ৫১শতাংশ বিদেশী বিনিয়োগের অনুমতি দেবার সিদ্ধান্তে সবচেয়ে লাভবান হচ্ছে ওয়ালমার্টই। কেন্দ্রের মন্ত্রীদের ভাষণে এবং সংবাদপত্রে কেন্দ্রীয় সরকারের বিজ্ঞাপনে বিদেশী বিনিয়োগের পক্ষে যে যে যুক্তি দেখানো হচ্ছে তা সবই ওয়ালমার্টের কথা মাথায় রেখে।

    ওয়ালমার্ট এলে লাভ-ক্ষতি কী হবে, সেই আলোচনায় নতুন মাত্রা জুড়েছে একটি সাম্প্রতিক বিশ্বব্যাপী সমীক্ষা। পরিষেবা ক্ষেত্রের কর্মীদের আন্তর্জাতিক ইউনিয়ন ইউ এন আই গ্লোবাল ইউনিয়ন এই সমীক্ষা করেছে ভারতে সম্ভাব্য প্রভাবের কথা মাথায় রেখেই। ‘ওয়ালমার্টস গ্লোবাল ট্র্যাক রেকর্ড অ্যান্ড ইমপ্লিকেশনস ফর এফ ডি আই ইন মাল্টি ব্র্যান্ড রিটেল ইন ইন্ডিয়া’ শীর্ষক এই সমীক্ষা প্রকাশিত হয়েছে ২০১২-র মার্চে। সমীক্ষাটি যে গভীরে গিয়ে করা হয়েছে এবং তার গুরুত্ব রয়েছে সে কথা স্বীকার করেই এই সমীক্ষার কথা গত ২২শে আগস্ট রাজ্যসভায় জানিয়েছিলেন কেন্দ্রের বাণিজ্য দপ্তরের রাষ্ট্রমন্ত্রী জ্যোতিরাদিত্য সিন্ধিয়া নিজেও।

সেই সমীক্ষায় বলা হয়েছে :

    খুচরো ব্যবসায়ে নিযুক্ত শ্রমিক-কর্মীদের মজুরির ওপরে ওয়ালমার্টের প্রভাব হবে খুবই খারাপ। ওয়ালমার্ট খরচ কমানোর জন্য মজুরি কমানোর ধারাবাহিক প্রক্রিয়া চালায়। ওয়ালমার্টের নিজের কর্মীরা সাধারণভাবে খুচরো ক্ষেত্র কর্মরতদের থেকে ১২শতাংশ মজুরি কম পান। উপরন্তু তারা চারপাশের মজুরির হারে চাপ তৈরি করে ক্রমশ মজুরি কমিয়ে দেয়। আমেরিকাতেই তারা খুচরো ক্ষেত্রে মজুরির হার ১০শতাংশ কমিয়ে দিয়েছে। ভারতে অর্থনৈতিক বৃদ্ধির যে কথা বলা হচ্ছে, ওয়ালমার্টের মতো সংস্থা ঢুকলে খুচরো ক্ষেত্রে কর্মরতরা তার সুফল পাবেন না। কম মজুরির কর্মসংস্থান হবে, সামগ্রিক কর্মসংস্থানে তার নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।

– বিদেশী বিনিয়োগ ঢুকলে ভারতে সংগঠিত খুচরো ব্যবসার বিক্রি বাড়বে। এই সংস্থাগুলি ভারতের সংগঠিত খুচরো এবং অসংগঠিত খুচরো, যেমন ছোট দোকান, কিরানা এবং হকারদের সঙ্গেও প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নামবে। সংগঠিত ক্ষেত্রে ব্যবসা বাড়বে, অসংগঠিত ক্ষেত্রে কমবে। তার ফলে কম পুঁজির মালিক ব্যবসায়ীরাই আগে হটতে থাকবেন। বিপুল অংশ ব্যবসা থেকে ছিটকে যাবে। শুধু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেই এই ঘটনা ঘটেনি, অন্য দেশেও ঘটেছে। মেক্সিকোতে কীভাবে প্রথম ধাক্কাতেই ১৫হাজার ব্যবসা বন্ধ হয়েছে, চিলিতে কীভাবে মুদির দোকানে প্রাপ্য পণ্যের ব্যবসার ৩৩শতাংশ ওয়ালমার্টের দখলে, তার নির্দিষ্ট উদাহরণ দেওয়া হয়েছে সমীক্ষায়।

-সরবরাহ ব্যবস্থায় এখন নিযুক্ত পাইকারি, সরবরাহকারী কোম্পানি, মধ্যস্থতাকারীরা ব্যাপক হারে ছিটকে যাবেন। আপাতভাবে এর ফলে পণ্যের দাম কিছু কমতে পারে। কিন্তু সরবরাহ ক্ষেত্রে যুক্ত কর্মীদের বিপুল কর্মচ্যুতির ঘটনা ঘটবে। ‘ভারতের সরকার বিপুল কর্মচ্যুতির সমস্যা মোকাবিলা করার জন্য যেন তৈরি থাকে’- মন্তব্য করা হয়েছে সমীক্ষায়।

– মেক্সিকোর উদাহরণ দিয়ে দেখানো হয়েছে ওয়ালমার্টের বাজারে দখল যত বেড়েছে পাইকার বাজারগুলির বিক্রি তত কমেছে। সেইসঙ্গে ‘অত্যন্ত শক্তিশালী এক ধরনের মধ্যস্থের উদয় হয়েছে’ যারা উৎপাদকদের ওপরে বিপুল চাপ তৈরি করতে পারে। সরবরাহকারীদের চাপে রাখার মতো বিপুল অর্থবল বহুজাতিকদের থাকে বলে তারা শেষ পর্যন্ত সাধারণ ফড়েদের তুলনায় উৎপাদকদের পক্ষে অনেক বেশি বিপজ্জনক হয়ে ওঠে।

-ওয়ালমার্টের মতো বহুজাতিকদের বিশ্বব্যাপী সরবরাহের ব্যবস্থা আছে। এরা ব্যবসায় ঢুকে বিপুল পরিমাণে বিদেশী পণ্য আমদানি করবে। অন্তত কারখানায় উৎপাদিত পণ্যের ক্ষেত্রে তো বটেই। কাজেই ভারতের খুচরো বাজার এক বিপুল প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্যে পড়বে।

-ওয়ালমার্ট ক্রমশ কম দামে জিনিস কিনবে বলে উৎপাদক সংস্থা উৎপাদন ব্যয় কমাতে বাধ্য হবে। প্রথম ধাক্কা পড়বে মজুরিতে। ইতোমধ্যেই ভারতে মজুরির হার কম, তা আরো কমবে। যে ছোট ও মাঝারি সংস্থা থেকে ওয়ালমার্ট পণ্য কিনবে তারাও এই প্রক্রিয়ার শরিক হবে, অন্য ছোট-মাঝারি সংস্থাকেও প্রতিযোগিতায় থাকতে গেলে মজুরির হার কমাতে হবে। তাতেও বিশ্বব্যাপী সরবরাহ ব্যবস্থা থাকা সংস্থার চাহিদা পূরণ করা অসম্ভব হয়ে উঠে ছোট-মাঝারি কোম্পানিই বন্ধ হয়ে যাবার বিপদের মুখে পড়বে।

একইভাবে কৃষিপণ্যের দাম ক্রমশ কমবে। নিকারাগুয়ার একটি সমীক্ষা উল্লেখ করে দেখানো হয়েছে ওয়ালমার্ট কৃষকদের যে-দাম দিচ্ছে তা দীর্ঘদিন ধরে তাঁরা যে-দাম পেতেন তার থেকে কম। দামের ওঠাপড়া কমে গেছে কিন্তু ফসলের দামও কমে গেছে। বাজার দখলে চলে যাওয়ায় চিরাচরিত পদ্ধতিতে বিক্রি করাও কঠিন হয়ে পড়েছে। এই সমীক্ষা ২০০৭-০৮সালের।

    গ্লোবাল ইউনিয়ন বামপন্থী কোনো ট্রেড ইউনিয়ন নয়। কিন্তু ভারত সরকারকে সাবধান করেই বিশ্বব্যাপী বহু ঘটনা ও সমীক্ষার তথ্য তারা তুলে ধরেছে। কেন্দ্রীয় সরকারের কাছেও এই সমীক্ষা ছিল, সংসদে মন্ত্রীর উত্তরেও তা স্পষ্ট।

    কিন্তু কোনো যুক্তিই নিরস্ত করতে পারেনি মনমোহন সরকারকে।


    ফুটনোটঃ ওয়ালমার্টের মালিক ওয়ালটন পরিবার। সাম্প্রতিক সমীক্ষায় প্রকাশ, ওয়ালমার্ট উত্তরাধিকারীদের সম্পদের মুল্য আমেরিকার নীচের দিকের শতকরা ৪০ ভাগ মানুষের মোট আয়ের সমান। এই তথ্য থেকে ওয়ালমার্ট নামক দৈত্যের আকার সম্বন্ধে একটা আন্দাজ করে ফেলুন, প্রিয় পাঠক।

Advertisements

Tags: , , , , , , ,

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s


%d bloggers like this: