‘Conscience’ Or Story of Ostrich

‘বিবেক’ অথবা উটপাখির উপাখ্যান

         নীলোৎপল বসু

    মাথার মধ্যে অনেকদিন ধরেই প্রশ্নটা ঘুরপাক খাচ্ছিল। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের খানিকটা অপ্রত্যাশিত মৃত্যুর পর পশ্চিমবঙ্গে যে প্রতিক্রিয়া — এবং‍‌ বেশ কিছু কুনাট্য — তারপর ঐ প্রশ্নটা আরো খানিকটা নির্দিষ্ট চেহারা পেল। পশ্চিমবাংলার রাজনীতিতে — এবং আরো অনেক বেশি করে সংস্কৃতিতে — ‘বিবেকে’র সরব আবির্ভাবে।

    এতো গৌরচন্দ্রিকারই বা প্রয়োজন কী। পশ্চিমবাংলায় ‘বিবেকে’র তত্ত্বগত ধারণার একটি সুদীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। নিঃসন্দেহে বলা যায় আমাদের সংস্কৃতিতে যাত্রার ঐতিহ্য এবং তার প্রভাব অপরিসীম। এবং ‘বিবেকে’র ভূমিকার সংজ্ঞায়িত ধারণা যাত্রার ঐতিহ্যের মধ্যেই বিকশিত হয়েছে এবং প্রতিষ্ঠিতও।

    বিবেক কে? বিবেক সত্যদ্রষ্টা। বিবেক‍ নৈর্ব্যক্তিক। বিবেক সমাজের ঘটনাস্রোতের একটি ধারাবিবরণীকার। কিন্তু ‘বিবেকে’র অবশ্যই একটি দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে। ভালোমন্দের মধ্যেও কোনটি ভালো কোনটি গ্রহণযোগ্য সে সম্পর্কে ‘বিবেকে’র মন্তব্য — একটি সময়ের নিরিখে দর্শকশ্রোতাদের একটি ইতিবাচক পরিণতির দিকে দিকনির্দেশ করে।

    তবে বিবেকের এই ধারণা একটি স্বয়ংসিদ্ধ ধারণা নয় এবং বাংলার যাত্রার ঐতিহ্য এই বিবেকের ধারণাটিকে পুষ্ট করলেও — এই ধারণার আরো প্রাচীন ঐতিহ্য রয়েছে। যেমন, মহাভারতের সঞ্জয়ের চরিত্র। অন্ধ ধৃতরাষ্ট্রের পুরো ভূমিকাটাই গড়ে উঠেছে সঞ্জয়ের ধারাবিবরণীর ভিত্তিতে। এবং সঞ্জয় স্বচক্ষে দেখে যেভাবে বাস্তব ঘটনাগুলির বিবরণ দিয়েছে — তারই প্রতিক্রিয়ায় ধৃতরাষ্ট্র ঘটনাবলী সম্পর্কে তাঁর নিজস্ব বিচার-বুদ্ধি-বিবেচনার প্রকাশ ঘটিয়েছেন। এক্ষেত্রে সঞ্জয়ের নৈর্ব্যক্তিক পক্ষপাতহীন বিবরণের একট ভূমিকা অন্তর্লীন হয়ে রয়েছে গোটা মহাভারতের উপাখ্যানে এবং তারপরেও ধৃতরাষ্ট্র এবং সঞ্জয়ের কথোপকথনে সমকালীন ঘটনাগুলি সম্পর্কে ধৃতরাষ্ট্রের ন্যায়-অন্যায়বোধ এবং মহাভারতের উপাখ্যানের মধ্যে ঔচিত্য এবং অ‍‌নৈচিত্যের প্রশ্নটি তীক্ষ্ণভাবে প্রকাশিত হয়েছে।

                                         (১)

    কবি সুনীলের মৃত্যুতে নানাপক্ষের — প্রতিপক্ষের ভূ‍মিকাও সামনে এসেছে। পশ্চিমবঙ্গ সরকারের এবং অবশ্যই বর্তমান মুখ্যমন্ত্রীর। কিন্তু সেটা এতোই রুচিহীন এবং এতোটাই সর্বজনীন ধিক্কারের পাত্র হয়েছে — যে সেটা নিয়ে খুব বেশি আলোচনা করার প্রয়োজন বোধহয় নেই।

    কিন্তু নিঃসন্দেহে এই প্রশ্নগুলিকে কেন্দ্র করে পশ্চিমবাংলার একটি শক্তিশালী প্রচারমাধ্যম এবং তার ভূমিকা এমনভাবে সামনে এসেছে যে তা নিয়ে খানিকটা সিরিয়াস চর্চা করা জরুরী। এই সংবাদমাধ্যমটি — বা সংবাদব্যবসার গোষ্ঠীটির প্রভাব পশ্চিমবাংলার রাজনীতিতে এবং সংস্কৃতিতেও প্রবল। তারা খানিকটা পশ্চিমবঙ্গের ‘বিবেক’ — বা এভাবেই তারা নিজেদের ভূমিকাকে ভাবতে পছন্দ করে। ভাষা-সংস্কৃতি তো বটেই, বাংলার রাজনীতির অভিমুখ স্থির করার ব্যাপারেও তারা নিরলসভাবে কাজ করে চলেছে।

    অনেকদিন থেকেই এই কাজ তারা করে। কিন্তু সাম্প্রতিককালে এই ‘বিবেকে’র ভূমিকা আরো তীক্ষ্ণ চেহারা নিয়েছে রাজনীতি-মতাদর্শকে একটি সুনির্দিষ্ট অভিমুখে পরিচালিত করার প্রশ্নে। আমরা জানি, যে সমসাময়িক পুঁজিবাদ এবং বিশেষ করে নয়ের দশকের শুরুর থেকে বিশ্বায়নের প্রক্রিয়া কর্পোরেট জগতের নিয়ন্ত্রণ অর্থনীতি রাজনীতি—সংস্কৃতি এবং জনমাধ্যম — এই সমস্ত ক্ষেত্রেই যুগান্তকারী পরিবর্তন ঘটিয়েছে। জনমাধ্যম সামগ্রিকভাবে আন্তর্জাতিক লগ্নিপুঁজির নিয়ন্ত্রণের মূল লক্ষ্য অর্জনের পরিপূরক হিসেবে মতাদর্শ প্রচারেরও একটি প্রধান অস্ত্রের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে।

    এই অভিমুখটি বাজারের — এবং আজকের সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে লগ্নি বাজারের সর্বব্যাপী এবং সর্বত্রগামী প্রবল ভূমিকার প্রতি অনুগত। আসলে বাজার একটি উপলক্ষ — প্রকৃতপক্ষে এই অভিমুখটি সমাজে বৈষম্যকে তীক্ষ্ণভাবে বাড়িয়ে তুলছে সরকারের — রাষ্ট্রের জনকল্যাণমুখী দায়িত্ব এবং ভূমিকার অবসান ঘটাবার লক্ষ্যে। এই নতুন পর্যায়ে সরকারের ভূমিকা ভালো না খারাপ—এটি স্থির করার প্রশ্নে একটি নতুন মূল্যবোধের নির্মাণ—এই প্রকল্পের লক্ষ্যবস্তু। অর্থাৎ রাজনীতিতে, সংস্কৃতিতে যা চলছে তার ভালোমন্দ ঠিক হবে সেটি বাজারের নিরঙ্কুশ ভূমিকার পক্ষে না বিপক্ষে এই প্রশ্নের উপর।

    সুতরাং, এটা কোনো আশ্চর্যের বিষয় নয় যে, নয়ের দশকের শুরুর থেকে এই সংবাদজগতের ব্যবসায়িক গোষ্ঠীটি খোলাখুলি আমাদের দেশের নয়া উদারবাদী সংস্কার প্রক্রিয়াটির প্রবল সমর্থক এবং প্রচারক। এবং অনেকটা সংগঠক। এরা নয়ের দশকের শুরুতে সংস্কার প্রক্রিয়ার প্রায় উষালগ্নে—সংস্কার প্রক্রিয়ার প্রধান ভগীরথ নরসিমা রাওকে কলকাতায় আমন্ত্রণ জানিয়ে সংবর্ধনা দিয়েছিল এবং প্রায় প্রকাশ্যেই এই সংস্কার প্রক্রিয়ার প্রতি নিজেদের আনুগত্য জাহির করেছিল।

    এটাও খুবই স্বাভাবিক ঘটনা — যে এই ভূমিকা মূলত বামপন্থার বিরোধিতায় বর্শাফলক হিসেবে কাজ করবে। কারণ যে মূল দর্শন এবং মতাদর্শের প্রতি এই প্রক্রিয়া এবং এই গোষ্ঠীটি অনুগত তাদের প্রধান বিরোধিতা বামপন্থীদেরই। বামপন্থীদের দুর্বল করা এবং নিঃশেষ করা যদি এদের মূল ইতিকর্তব্য না হতো — তবে সেটাই হতো বিস্ময় — এবং কিছুটা ভয়েরও।

                                    (২)

    ২০০৭ সাল থেকে পশ্চিমবাংলায় যে তীব্র প্রয়াস শুরু হয়েছিল পশ্চিমবাংলার সরকার থেকে বামপন্থীদের অপসারিত করতে তার রাজনৈতিক মতাদর্শগত কাঠামোটিও নির্মাণ করার প্রশ্নে এই জনমাধ্যম গোষ্ঠীটির একটি প্রবল ভূমিকা ছিল। এটাই স্বাভাবিক। কারণ তৃণমূল কংগ্রেস নামক রাজনৈতিক দলটি বা তার সর্বময় কর্ত্রীর রাজনৈতিক এবং বুদ্ধিজৈবিক পারদর্শিতা সম্পর্কে সবারই একটি সম্যক ধারণা আছে; এবং ক্ষমতাসীন হওয়ার পর এদের আচরণ এদের সমর্থকদের মধ্যেও খুব বেশি একটা ভরসা জোগাতে পারছে এটা কেউ জোর দিয়ে বলতে পারবেন না। এটা কেউই দাবি করবেন না — এবং আমরা তো করছিই না যে, বামপন্থী সরকারের সমস্ত কাজকর্ম নিখুঁত এবং ত্রুটিমুক্ত ছিল। কিন্তু একথা নিশ্চয়ই জোর দিয়ে বলা যায় যে নয়া উদারবাদী প্রকল্পের একটি মৌলিক বিকল্প নীতিকেই তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন বামপন্থীরা। সরকার পরিচালনায় এবং তার বাইরেও। প্রয়োগে ভুল হয়েছে কোথাও কোথাও — এনিয়ে সন্দেহ নেই।

    কিন্তু আমাদের বিরুদ্ধে মূল অভিযোগ যা প্রতি মুহূর্তে তিল তিল করে একটি সুস্পষ্ট তত্ত্বের আকারে নির্মাণ করা হলো — তা এই যে আমরা গণতন্ত্রকে নির্বাসন দিয়ে ‘দলতন্ত্র’ স্থাপিত করেছি। কিন্তু এই ধারণাটিকে প্রমাণ করার জন্য যে আইন-কানুন দেশের তার লঙ্ঘন কোথায় হয়েছে—সেটা প্রমাণ করার দায় তারা নেননি। আর যারা প্রশাসনের সঙ্গে যুক্ত তারা সবাই — ‘দলদাস’।

    এটা জানা নেই — যে ভারতবর্ষে বা পৃথিবীতে কোনো দল আছে কিনা যারা বহুদলীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থায়—জনগণের অধিকাংশের সমর্থনে সরকারে এলে অন্য দলের নীতির ভিত্তিতে সরকার পরিচালনা করে কি না। কিন্তু নয়া উদারবাদের ঘোর সমর্থকরা তাই চেয়েছিলেন। সরকারের নীতি এবং পরিচালনার সঙ্গে — দলের পরিচালনায় একটি সুস্পষ্ট ভেদরেখা থাকতেই হবে; এবং সরকারকে অবশ্যই দেশের সংবিধান এবং আইন-কানুনের প্রতি দায়বদ্ধ থাকতে হবে। কিন্তু দলের নীতি এবং আরো বেশি করে যদি সেই নীতি সমাজে অর্থনীতিতে বৈষম্যের শিকার যারা তাদের প্রতি পক্ষপাতদুষ্ট হয় — এবং সরকার যদি সেই নীতি কার্যকরী করে তাহলে তাকে কীভাবে দলতন্ত্র বলা যাবে?

    কিন্তু ঠিক সেটাই বলা হয়েছে কারণ বামপন্থীদের এই নীতি নয়া উদারবাদের সমর্থকদের সমর্থন পায়নি। এর মধ্যেও কিছু আশ্চর্যের নেই। কারণ এটাই তো হয় — এরকমটাই তো হয়ে এসেছে আমাদের দেশে, অন্য দেশে, দেশান্তরে।

    তাই ‘দলতন্ত্রে’র অভিযোগ — আর বামপন্থীদের হটিয়ে দলতন্ত্রহীন নতুন মুক্ত বাতাস বইয়ে দেবার রণধ্বনি। কিন্তু ভোটে বামপন্থীরা হটে গেলেও — যে ‘পরিবর্তন’ এলো তাতে যে ঘটনা ঘটছে তার প্রতিদিনকার সাক্ষী পশ্চিমবাংলার মানুষ। দলতন্ত্রের কদর্যতম বহিঃপ্রকাশ। আর দল বললে অনেক তৃণমূল কংগ্রেস অনুগামীও লজ্জিত হবেন—একব্যক্তিতন্ত্র।

    সুতরাং, ‘বিবেকে’র বিড়ম্বনা। রাজনীতিতে যে ‘বিবেক’বোধের প্রচার হয়েছিল পরিবর্তনের সমাগত আনন্দ আয়োজনে — সেটা একেবারেই মাঠে মারা গেছে আইনের নির্লজ্জ লঙ্ঘনে — মহিলাদের উপর অবর্ণনীয় অত্যাচারের প্রাদুর্ভাবেআইনশৃঙ্খলার অভূতপূর্ব অধোগতিতে — পুলিস প্রশাসনের নির্লজ্জ পক্ষপাতে বাধ্যতা নিয়ে আসায় — অর্থনীতিতে শিল্পে কৃষিতে শিক্ষায়। তাহলে ‘বিবেক’ করেটা কী? রাজনীতির ক্ষেত্রে ‘বিবেকে’র ভূমিকায় তো ব্যর্থতা। কিন্তু সংবাদমাধ্যমের একটা বড় সুবিধা — রাজনৈতিক দল যদি ভুল করে নির্বাচনে জনগণ তাদের নির্বাসিত করেন; কিন্তু ভুল করলেও সেই দায়বদ্ধতার কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা তো জনমাধ্যমের ক্ষেত্রে নেই। সুতরাং, নতুন ক্ষেত্র বেছে নিতে হবে। ‘পরিবর্তনে’র রাজনৈতিক দায়ভার নেবার বাধ্যতা দেখাতে গেলে তো আমও যাবে ছালাও যাবে। কারণ এই পরিবর্তন রাজনৈতিকভাবে পশ্চিমবাংলার মানুষের পক্ষে শুভ হয়েছে — এ ধরনের আজগুবি দাবি যদি সম্পাদকীয় দৃষ্টিভঙ্গি হতো — তবে তো ব্যবসা মার খেত। কারণ নিজের ভালো সবাই বোঝে। পাঠক-দর্শকদের দৈনন্দিন অভিজ্ঞতার উলটো কথাটা পরিবেশন করে আর যাই হোক ব্যবসা করা যায় না।

                                (৩)

    অতঃকিম্‌? রাজনীতিতে যেটা হলো না সংস্কৃতিতে সেটাই লক্ষ্য। আর সুযোগও এলো সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের অপ্রত্যাশিত প্রয়াণে। কারণ আর যাইহোক সাহিত্য সংক্রান্ত কোনো সরকারী আকাদেমিতে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের পরিবর্তে অর্পিতা ঘোষের নিয়োগ — ‘বিবেকে’র পক্ষেও সর্বজনগ্রহণীয় করে তোলাটা অসম্ভব। তা‍‌ই সরকার দলতন্ত্র চালাচ্ছে এটা স্বীকার করেই নতুন রণকৌশল প্রস্তুত করতে হবে!

    আর সেই জন্যই রাজনীতি থেকে সরে এসে নজর পড়লো সংস্কৃতিতে। সংস্কৃতিকে রাজনীতি বর্জিত করতে হবে। বামপন্থীদের সংস্কৃতি সম্পর্কেও একটি দৃষ্টিভঙ্গি নিশ্চয়ই আছে। কৃষ্টি সভ্যতা সংস্কৃতি যখন সমাজের অধিকাংশের স্বার্থের বিপরীত অভিমুখে পরিচালিত করবার চেষ্টা হয় — বামপন্থীরা নিশ্চয়ই অধিকাংশের স্বরকে এই ক্ষেত্রগুলিতেও তথ্য যুক্তি বিশ্লেষণ সৃজনশীলতায় হাজির করার চেষ্টা করেন। কারণ সমাজের এই উপরিকাঠামোর ক্ষেত্রে নীরব থেকে তো সমাজের বুনিয়াদটাকে পালটানো যায় না। কিন্তু শুধুমাত্র বামপন্থী বা দলীয় আনুগত্য আছে এই যুক্তিতে সরকারী সাংস্কৃতিক কার্যকলাপেও কর্ণধার করা যায় না কাউকেই। এটাই বামপন্থীদের দৃষ্টিভঙ্গি।

    তাই বামপন্থী সরকারের সময়কালে বিভিন্ন সরকারী কর্মকাণ্ডে যারা বিভিন্ন সংস্থা, আকাদেমির শীর্ষে ছিলেন তারা প্রত্যেকেই ছিলেন স্ব স্ব ক্ষেত্রের গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা মানুষ। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ভূমিকাও ছিল তাই। আজকে যেহেতু সেটা হচ্ছে না — এবং তার থেকেও বড় কথা যে সেটা যেহেতু আর প্রচ্ছন্ন থাকছে না — তখন ‘বিবেক’ কী করে?

    সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের মৃত্যুর পর সরকারের বাহ্যত অস্বস্তি এবং তারপর কবির জনপ্রিয়তাকে আত্মসাৎ করার নির্লজ্জ প্রয়াস মানুষ গ্রহণ করতে পারবেন না। সুতরাং আওয়াজ — রাজনীতি চলবে না। বামপন্থীদের কণ্ঠস্বরকে বৈধতাহীন করার জন্য দাবি—কবির স্মরণ অনুষ্ঠানকে রাজনীতি বিবর্জিত রাখতে হবে। রাজনৈতিক দলের দখলদারি আটকানোটা একটি ব্যাপার আর কবির স্মরণ অনুষ্ঠানকে রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের ছোঁয়াচমুক্ত রাখাটা অন্য।

    সমাজে রাজনীতি অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে রয়েছে। প্রশ্ন এটাই কোন রাজনীতিটা সমাজের বেশিরভাগ মানুষের পক্ষে ভালো — আর কোনটা খারাপ। সমাজের অধিকাংশ মানুষের স্বার্থবিরোধী লগ্নিপুঁজির স্বার্থ নির্দেশিত নয়া উদারবাদী রাজনীতি, মতাদর্শ সংস্কৃতি সাহিত্য প্রচারমাধ্যম শেষ বিচারে বেশিরভাগের স্বার্থবিরোধী। সুতরাং, তার বিরোধিতা বামপন্থীরা করবেই আর মানুষও তাদের দৈনন্দিন অভিজ্ঞতায় সেই সমালোচনার সঙ্গে সহমত হবেন। এটাই স্বাভাবিক। আর ‘বিবেক’ও এটা বোঝে। তাই ‘বিবেক’ রাজনীতির ভালোমন্দের ফারাকটা যাতে স্পষ্ট না হয় — সেই লক্ষ্যেই সাহিত্য সংস্কৃতিকে রাজনীতি মুক্ত রাখার স্লোগান তোলে। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের কবিতায় রাজনীতি ছিল না এমন কথা কেউ বলবে না। কবির কবিতা বা উপন্যাস বা গল্প যদি সমাজের ইতিহাসের দর্পণ না হয় তবে সেই সৃষ্টি কালোত্তীর্ণ হতে পারে না। তাই কোনো কবিকে যদি বলা হয় যে তার কবিতায় রাজনীতির ছায়া পড়েনি — তবে সেটা কবি কখনোই স্বীকার করবেন না। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ও করতেন না — এটাই বাস্তব।

                                  (৪)

    ইতিহাসের, বাস্তবতার আগামী অভিমুখকে অবশ্যই শেষ বিচারে অধিকাংশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট হতে হয় — অধিকাংশের সমর্থনপুষ্ট হতে হয়। যারা এই সত্যটা বোঝে না তারা ‘বিবেকে’র ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে একটি আপাত নিরপেক্ষ ভঙ্গিতে মানুষের করণীয় সম্পর্কে কিছু গাম্ভীর্যপূর্ণ পরামর্শ দিতে পারে — কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা ইতিহাসের গতিমুখকে বদলাতে পারে না। সাময়িক বিভ্রান্তি আসতেই পারে। কিন্তু ইতিহাসের গতি শেষ বিচারে অধিকাংশের সমর্থন অর্জন করার উপাদানে পুষ্ট না হলে, তার কোনো ভবিষ্যৎ নেই। সুতরাং, ‘বিবেক’কেই এই সিদ্ধান্ত নিতে হবে যে সে ‘বিবেক’ না উটপাখি? আর মতাদর্শের ক্ষেত্রটা এতোই ব্যাপক যে, বামপন্থীরা এই রণাঙ্গনের লড়াইতে বিনা যুদ্ধে এক ইঞ্চি জমিও ছেড়ে দিতে পারে না।

Advertisements

Tags: , , , , , , , , , , , , , ,

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s


%d bloggers like this: