আশার ছলনে ভুলি কী ফল লভিনু হায়!

image_1309_325735

অমিত বসু

    নির্বাচনী প্রচারে সব দলই বলে আমরা ভালো, ওরা খারাপ। বিশ্বাস করা না করা পাবলিকের ব্যাপার। তারা যে স্পটে দাঁড়িয়ে রিঅ্যাক্ট করে তাও নয়। সব শুনে ভেবেচিন্তে মতামতটা জানায় ভোটিং মেশিনে। সমাবেশে যার যার দলের লোকেরা থাকে, তারা উল্লাস প্রকাশ করে মনের জোর বাড়াতে। সাধারণের প্রতিক্রিয়া সেটা নয়। জনসভায় বিশাল ভিড় মানেই জিত নিশ্চিত, বলা যায় না। শেকসপিয়র অনেক চেষ্টা করেও ‘মব ক্যারেক্টার’ বা জনচরিত্রের হদিস দিতে পারেননি। মানুষের মন বড় চঞ্চল। ক্ষণে ক্ষণে পাল্টায়। হিটলারের সঙ্গী গোয়েবলস অবশ্য সেটা বিশ্বাস করতেন না। তিনি বলতেন, মানুষকে কন্ট্রোল করাটা এমন কিছু বড় ব্যাপার নয়। কায়দা জানলেই হলো। নেতার ভাষণে দাপট দরকার। গলার জোরে ডাহা মিথ্যাও সত্যি হয়ে যায়। গোয়েবলসের সুবিধা ছিল, তিনি গণতন্ত্রের ধার ধারতেন না। গায়ের জোরে স্বেচ্ছাচারে সবকিছু দখল করতে চাইতেন। গৃহপালিত পশুর মতো মানুষ পুষতেন। সার্কাসের পোষা বাঘ বেগরবাঁই করলে বৈদ্যুতিক চাবুক মারা হয়, তিনিও মানুষকে তার চেয়ে কড়া শাস্তি দিতেন। নিগ্রহে মৃত্যুও ছুঁয়ে যেত সময়ে সময়ে। কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে একশ’র জায়গায় পাঁচশ’ জনকে ভরে দম বন্ধ করে মারতেন। তাদের জমানায় মাথা উঁচু করে চলা নিষিদ্ধ ছিল।

হিটলার-গোয়েবলস কবে চলে গেছে। তার ছায়া কিন্তু থেকে গেছে। সেই অতীত গোপনে গোপনে গণতন্ত্রের মধ্যেও কাজ করে। গণতন্ত্রের শরীরেও জেগে ওঠে স্বৈরতন্ত্রের কঙ্কাল। দেহের ভেতর থাকে বলে সেটা দেখা যায় না। টের পাওয়া যায় আঘাতের পর।

সব গণতান্ত্রিক দেশে সময়ে-অসময়ে আত্মপ্রকাশ করে সেই ভয়ঙ্কর রূপ। মানুষ তখন ভয়ে অবশ হয়ে যায়। শেষমেশ যখন দেয়ালে পিঠ ঠেকে, রুখে দাঁড়ায়। প্রবল বিক্রমে ঝাঁপিয়ে পড়ে পেশিশক্তির বিরুদ্ধে। জনশক্তির চাপে গুঁড়িয়ে যায় অপশক্তি। ১৯৮৫ সালে ফিলিপাইনে দেখেছিলাম সেই লড়াই। স্বৈরাচারী প্রেসিডেন্ট ফার্দিনান্দ মার্কোসের পতন ঘটেছিল মানুষের চাপে। তাকে দেশ ছেড়ে পালাতে হয়েছিল। হরিণের মতো নিরীহ মানুষ যে রাতারাতি বাঘ হয়ে উঠতে পারে সেই প্রথম দেখা। এটা ঠিক, শাসকরা যতই যা করুন, মানুষকে ভয় পান। তারা জানেন, মানুষকে শিকল পরালে তারা সেটা ছিঁড়বেই। তবু ক্ষমতার লোভে অজ্ঞান হয়ে থাকেন। জ্ঞান ফিরলে আর করার কিছু থাকে না। রণে ভঙ্গ দিয়ে আত্মসমর্পণ করেন কিংবা আত্মঘাতী হন। হিটলার মুক্তি পেতে শেষ পর্যন্ত মৃত্যুকেই সঙ্গী করেছিলেন।

কলকাতায় চলছে নব্য স্বৈরতন্ত্রের পরীক্ষা। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ক্রমেই স্বেচ্ছাচারী। তিনি যা বলবেন, তাই হবে। তার কথাই শেষ কথা। ট্যাঁ-ফুঁ করলে গলা টিপে ধরবেন। সাংবাদিকরা তার বিরুদ্ধে লিখলে রক্ষে নেই। প্রশাসনিক কর্তারা ভালো পরামর্শ দিলে কড়া শাস্তি। মন্ত্রীরা দাসানুদাস। মুখ ফসকে বিরোধিতা করলে সর্বনাশ। পুলিশ শান্তি রক্ষার চেষ্টা করলে শাস্তি। গুণ্ডারা দাপিয়ে বেড়াবে। গায়ে আঁচ লাগলে কেলেঙ্কারি। নারী ধর্ষিত হলে ধর্ষণকারীকে ধরা চলবে না। বলতে হবে সাজানো ব্যাপার। প্রবীণ সিপিএম মন্ত্রী রেজ্জাক মোল্লাকে দিবালোকে গাড়ি থেকে নামিয়ে পেটাল তৃণমূলের সাবেক বিধায়ক আরাবুল ইসলাম। শিরদাঁড়ার হাড়ে চিড়, দাঁত ভেঙে, ঠোঁট ফেটে রক্তারক্তি। পুলিশ আরাবুলকে গ্রেফতার করতে যেতেই কড়া হুশিয়ারি, খবরদার, আরাবুলের গায়ে যেন আঁচ না লাগে।

অ্যাকশন করে হাসপাতালে ভর্তি হওয়াটা তৃণমূল নেতাকর্মীদের নিয়ম। যাতে প্রমাণ হয়, তিনি করেননি। বিরোধীরাই তার ওপর হামলা চালিয়েছে। আরাবুলও তাই করেছেন। হাসপাতালের ডাক্তাররা তাকে রাখতে চাননি। বলেছেন, আপনার কিছু হয়নি। বাড়ি যান। আরাবুল ক্ষিপ্ত। বলেছেন, সময় এলে ডাক্তারদের দেখে নেবেন। ১১ দিন পর গ্রেফতার হয়েও তেজ এতটুকু কমেনি। তৃণমূল সাংসদ সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়ের অভিনেত্রী স্ত্রী নয়না বিধানসভায় ভাংচুর চালানোয় অংশগ্রহণ করেছিলেন। ঘটনার পর যখন বাড়ি ফিরছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কড়া নির্দেশ, বাড়ি নয়, হাসপাতালে যাও। নয়নার পাল্টা প্রশ্ন, আমার তো কিছু হয়নি। শুধু শুধু হাসপাতালে যাব কেন? মুখ্যমন্ত্রীর কড়া জবাব, মুখে মুখে তর্ক করো না। হাসপাতালে না গেলে পাবলিক সিমপ্যাথি পাবে কী করে? কিছু না বুঝে রাজনীতি করতে আসতে লজ্জা করে না।

বামফ্রন্টকে শায়েস্তা করতে নির্বাচনের আগে যখন এসপ্ল্যানেডে অনশন শুরু করেন মমতা, তখন তৃণমূলের নেতারা প্রচার শুরু করেন মমতা গান্ধীজিকেও ছাপিয়ে গেছেন। মমতার মতো টানা ২৬ দিন অনশন করতে গান্ধীজিও পারেননি। হাটে হাঁড়ি ভাঙেন তৃণমূলের সাবেক বিধায়ক। তিনি অভিযোগ করেন, মমতা অনশনে না খেয়ে থাকেননি। ডালডাউসি ক্লাব থেকে আসা সুইস চকোলেট আর চিকেন স্যান্ডউইচ খেতেন। মমতা ক্ষোভে জ্বলে উঠলেও কিছু বলেননি। বললে গোলমাল বাড়বে বলে চুপ করেছিলেন।

নির্বাচনের আগে মমতা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, দলতন্ত্র নয়, গণতন্ত্রই তার লক্ষ্য। মুখ্যমন্ত্রী হয়েই ভোল পাল্টান। শিক্ষা, স্বাস্থ্য থেকে শুরু করে সর্বস্তরে দলের জাল বিস্তার করেন। সংবাদমাধ্যমকে হুমকি, সরকারের বিরুদ্ধে গেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কেন্দ্রে ইউপিএ সরকারের শরিক হয়েও তীব্র বিরোধিতা শুরু করেন। প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের সব কথাতেই না বলাটা অভ্যাসে দাঁড়িয়ে যায়। শেষমেশ সরকার থেকে বেরিয়ে এসে মনমোহনের পতন অনিবার্য করে তোলেন। এই মুহূর্তে সরকার ভাঙলে জাতীয় বিপর্যয় অবশ্যম্ভাবী ছিল। তিনি সেটাই চেয়েছিলেন। তার ধারণা ছিল, সার্বিক বিপর্যয়ের মধ্যে নিজের দর বাড়াবেন। সংসদে ৫৪৩টি আসনের মধ্যে মাত্র ১৯টি আসন নিয়ে আরও অহঙ্কারী হতে পারবেন। তা হয়নি। বরং পশ্চিমবঙ্গে নিজের রাজ্যে জনপ্রিয়তা হারিয়েছেন। তাকে বিশ্বাস করা যে অসম্ভব বুঝতে পেরে তার দিক থেকে মানুষ মুখ ঘোরাচ্ছে, শিল্পপতিরা দূরে সরছেন, শ্রমিক-কৃষক দীর্ঘশ্বাস ফেলছে।

মমতাকে ঘিরে পরিবর্তনের স্বপ্ন ধূলিসাৎ। হলদিয়ার শিল্প সম্মেলনে তিনি শিল্পপতিদের ডেকেছিলেন। বৃহৎ শিল্পপতিরা কেউ সাড়া দেননি। তার বিরোধিতায় সিঙ্গুরে টাটা কোম্পানি গাড়ি কারখানা করতে না পারায় ক্ষুব্ধ। টাটার নতুন কর্ণধার সাইরাস মিস্ত্রি পশ্চিমবঙ্গের দিকে ফিরেও চাইছেন না। টাটাকে দেখে অন্যরাও মমতাকে টা টা বাই বাই করছেন।

মমতার জমিনীতি তৈরি হয়নি। শিল্পের জন্য জমি কীভাবে নেওয়া হবে জানাননি। মা-মাটি-মানুষের স্লোগান অব্যাহত রেখে শিল্পায়নের দরজা বন্ধ করে রেখেছেন। যেখানে শিল্পের জন্য জমি নেই, সেখানে শিল্পভাবনার আর কোনো জায়গা থাকে না। তিনি ডাকলেও শিল্পপতিরা এসে কী করবেন। তারা জানেন, সোনার পাথরবাটি গড়া সম্ভব নয়।

রাজনৈতিক সমস্যা পুরোটা মেটাতেও তিনি নারাজ। পররাষ্ট্রমন্ত্রী সালমান খুরশিদ আপ্রাণ চেষ্টা করেছিলেন তিস্তা চুক্তি সম্পাদনে মমতার মত আদায় করতে। হাজার চেষ্টা করেও পারেননি। মমতা আগের মতোই বাগড়া দিয়ে যাচ্ছেন। তিনি মনে করছেন, চুক্তিতে মনমোহনের সুবিধা, তার নয়। চুক্তির ক্রেডিট তার ভাগ্যেই জুটবে। যেমনটা জুটেছিল জ্যোতি বসুর ক্ষেত্রে গঙ্গা চুক্তি সম্পাদনের সময়। কোনো কিছু সম্পন্ন করা মমতার কাজ নয়। মানুষকে বিপন্ন করে নৈরাজ্যের রাজনীতিতেই তিনি অভ্যস্ত।

Courtesy: http://www.shamokal.com

Advertisements

Tags: , , , , , , , ,

One Response to “আশার ছলনে ভুলি কী ফল লভিনু হায়!”

  1. ashok chaudhury Says:

    I agree fully with the contents of the above article.What Hitler could not do,how DIDI dares to undertake.No doubt, the same fate is awaiting for her if she does not restrain herself.

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s


%d bloggers like this: