Left Front’s 34 Years is Haunting Mamata…

৩৪ বছর মমতাকে তাড়া করে বেড়াচ্ছে

শেখ ইসরাইল

পঞ্চায়েত নির্বাচন উপলক্ষে কংগ্রেস ও তৃণমূল কংগ্রেস প্রচারে নামছে। তাদের প্রচারের অন্যতম একটি বিষয় হচ্ছে এরাজ্যে বাম আমলের ৩৪ বছরের শাসনের সাফল্যকে নস্যাৎ করে জনসমক্ষে উপস্থাপিত করা।বাম আমলের একটানা ৩৪ বছর শাসনের সময়কালকে যতই দুঃস্বপ্নের কাল বলে কংগ্রেস, তৃণমূল কংগ্রেস চিহ্নিত করার চেষ্টা করুক না কেন, যতই সি পি আই (এম) তথা বামপন্থীদের মুছে ফেলার চেষ্টা হোক না কেন তা কোনোদিন সফল হবে না। ধারাবাহিকভাবে দুনিয়াজুড়ে সাম্রাজ্যবাদ পুঁজিবাদের সেবকরা কমিউনিস্টদের মুছে ফেলার চক্রান্ত করে এসেছে, সফল হয়নি।

তৃণমূল কংগ্রেসের একমাত্র কর্মসূচীই হলো — সি পি আই (এম) তথা বামপন্থীদের নিশ্চিহ্ন করা, ৩৪ বছরের বাম শাসনের উন্নয়নকে অস্বীকার করে নতুন প্রজন্মকে ভুল পথে চালিত করা।এ রাজ্যে সি পি আই (এম) নেতৃত্বাধীন বামফ্রন্ট সরকারকে ক্ষমতা থেকে অপসারণের লক্ষ্যে কংগ্রেস-তৃণমূল কংগ্রেস জোট হয়েছিল। কেন্দ্রে রাজ্যে ক্ষমতা ভাগাভাগিও করে নিয়েছিল। তারপর কংগ্রেস দল তৃণমূল কংগ্রেসকে নিয়ে চলতে পারল না। মধুচন্দ্রিমা অচিরেই শেষ হয়ে গেল। ছাড়াছাড়ি হয়ে গেল। কেন্দ্রে ও রাজ্যে মন্ত্রিত্বেও ছেদ পড়ে গেল।

অন্যদিকে, মমতা ব্যানার্জির নেতৃত্বাধীন তৃণমূল সরকার শাসন পরিচালনার ক্ষেত্রে ব্যর্থতার চূড়ান্ত রূপ পরিগ্রহ করেছে। দিনের পর দিন মিথ্যে কথা প্রচার করা, বিভ্রান্ত করার জন্য উন্নয়নের ঘোষণা করা, শিলান্যাস করা, মমতা ব্যানার্জি তাঁর নিজের ছবির প্রচার করা, রঙ-বেরঙের উৎসব নিয়ে মেতে থাকা — এসবের মধ্য দিয়ে কোটি কোটি টাকা খরচ করে চলেছেন। বাম আমলের ৩৪ বছরের ঋণের জন্য কেন্দ্রকে সুদ দিতে হচ্ছে, উন্নয়ন করা যাচ্ছে না, বেতন ভাতা বাড়ানো যাচ্ছে না বলে মিথ্যে কথা বলছেন। দিনের পর দিন শাসন পরিচালনায় অযোগ্যতার পরিচয় দিয়ে চলেছেন।

নিজেদের ব্যর্থতার দোহাই দিতে ৩৪ বছরের জের হিসাবে উল্লেখ করে নিজেদেরকে আড়াল করার চেষ্টা করছে তৃণমূল। কিন্তু, মানুষ ক্রমেই উপলব্ধি করছেন। হাত দিয়ে সূর্যকে ঢাকা যায় না।

ভয়ঙ্কর বিপজ্জনক স্বৈরতান্ত্রিক সরকার এসেছে রাজ্যে। এই দু’বছরে এ রাজ্যের জনগণ হাড়ে হা‍‌ড়ে টের পাচ্ছেন। ধারাবাহিকভাবে ভীতি প্রদর্শন, দৈহিক আক্রমণ, খুন, শ্লীলতাহানি, ধর্ষণ, তোলাবাজি নিত্যকার ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফসলের দাম না পেয়ে, মূল্যবৃদ্ধির চাপে ন্যূব্জ কৃষক এ পর্যন্ত ৮৭জন আত্মহত্যা করতে বাধ্য হয়েছেন। দু’বছরে তৃণমূল বাহিনীর হাতে ৯০জন বামপন্থী নেতা-কর্মী খুন হয়েছেন। সি পি আই (এমন)-এর বহু পার্টি অফিস ভাঙচুর করা হয়েছে। হামলা হয়েছে। বহু ট্রেড ইউনিয়ন অফিসে হামলা, ভাঙচুর, দখল হয়েছে।

ঘরছাড়া হয়েছেন, বেধড়ক মারধর খেয়ে হাত-পা ভাঙা, বিছানায় পড়ে থাকা আক্রান্ত মানুষও অনেক। মিথ্যা মামলার কোনো পরিসীমা নেই। খোদ বিধানসভায় মারধর, গুণ্ডামি করা হয় বামপন্থী বিধায়কদের উপর। বিরোধী দলের মহিলা বিধায়কও গুরুতর জখম হন। গত ১১ই ডিসেম্বর ’১২ তৃণমূল কংগ্রেস যে কলঙ্কজনক অধ্যায়ের সূচনা করলো তা, পশ্চিমবঙ্গের প‍‌রিষদীয় ইতিহাসে কালো দিন হিসাবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। ৭০বছর বয়সী, নিরবিচ্ছিন্ন ৪০ বছরের বিধায়ককেও মারধর করতে বিন্দুমাত্র দ্বিধাবোধ করেনি মমতার আশীর্বাদপুষ্টরা।

এই আক্রমণ কেবল সি পি আই (এম) তথা বামপন্থীদের নিশ্চিহ্ন করার জন্যই হচ্ছে না, একসময়কার জোটসঙ্গী কংগ্রেসের উপরও হচ্ছে। ওদের গোষ্ঠীদ্বন্দ্বের কারণে এক গোষ্ঠী অন্য গোষ্ঠীকে আক্রমণ করছে, খুন করছে। অর্থাৎ কোনোরকম বিরোধিতা চলবে না। ভারতবর্ষের আর কোথাও ডাকাত-ধর্ষক-গুণ্ডা-তোলাবাজ-বদমাইশরা এতো নিশ্চিন্তে নিজেদের ভয়ঙ্কর অপকর্মটি করতে পারে না। চোর-ডাকাত, ধর্ষকরা বুঝে গেছে যে তাদেরই সরকার এসেছে রাজ্যে। এখানে কোনো আমলা নিজেদের বিবেক অনুযায়ী কাজ করতে পারবে না।

এ রাজ্যে ধর্ষক দমন করতে গিয়ে মহাকরণের নির্দেশে দময়ন্তী সেন অপমানিত ও দমিত হয়েছেন। কোনো আমলা নিজের বিবেক অনুযায়ী কাজ করলে তাকে দময়ন্তী সেনের মতো অবস্থায় পড়তে হবে। এ রাজ্যে আইনশৃঙ্খলা বলে কিছু নেই। নিরাপদ নয় নারীরাও। নারী নির্যাতনের শীর্ষে পশ্চিমবঙ্গ ২৯,১৩৩, দ্বিতীয় অন্ধ্র প্রদেশ ২৮,২৪৩, তৃতীয় উত্তরপ্রদেশ ২২,৬৩৯। এ লজ্জা আমরা ঢাকবো কি করে! মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির কাছে এসব ‘ছোট ঘটনা’ আর ‘রটনা’ ছাড়া কিছু নয়। মা আজ লজ্জায় মুখ ঢেকেছেন, মাটি উৎসবে সীমাবদ্ধ, মানুষ হারিয়ে গেছেন।

মুখ্যমন্ত্রীই সব। তিনি কখনো ভুল করতে পারেন না, ভুল বলতেও পারেন না। তিনি সকলের সব পরামর্শকে অগ্রাহ্য করে চলেন। তিনি ‘ইয়েসম্যান’দের পছন্দ করেন। কোনো সমালোচনা সহ্য করেন না। তাকে কোনো প্রশ্নও করা যাবে না। তা‍‌কে নিয়ে কার্টুন আঁকাও চলবে না। তাহলে অম্বিকেশ মহাপাত্রের মতো জেলে যেতে হবে। প্রশ্ন করলে বাঁশপাহাড়ির শিলাদিত্য চৌধুরীর দশা হবে। জেলে যে‍‌তে হবে। মমতা সমালোচকদের ফুৎকারে উড়িয়ে দিয়ে নিজের সাফাই গাইতে গিয়ে বলেছেন, ‘রাজা চলে বাজার, কুত্তা ভোকে হাজার’।

আজকাল মুখ্যমন্ত্রীসহ অন্য মন্ত্রীদেরও মুখের ভাষার সংযম থাকে না। বিচারপতিদের উপর আক্রমণাত্মক ভাষা প্রয়োগের জন্য কলকাতা হাইকোর্ট তাঁকে সংযত হওয়ার পরামর্শ দিলেও সংযত হননি। মুখ্যমন্ত্রীর জন্যই রাজ্যে আতঙ্কের পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। পার্ক স্ট্রিট কাণ্ডে রাজ্য সরকার সুপ্রিম কোর্ট কর্তৃক তিরস্কৃত হলো। এদের মন্ত্রী রাজ্যপালকে ‘হলুদ’ কার্ড দেখিয়েছেন। রাজ্যপালের কঠোর মন্তব্য, ‘রাজ্যে গুণ্ডাগিরি চলছে’। কলকাতা হাইকোর্ট সমবায় সম্পর্কিত একটি মামলা প্রসঙ্গে মন্তব্য করেছে, ‘রাজ্য নৈরাজ্য চলছে’। সমাজের নানা বিশিষ্টজন মমতা ব্যানার্জি ও তার সরকারের সমালোচনা করলেও এতটুকু শিক্ষা নেননি। সাংবিধানিক দায়িত্ব পালন করছেন যারা তাদের সরকার আঘাত করছেন। কার্যত, সংবিধানকেই মান্যতা দিচ্ছেন না।

এতদিনে একথা স্পষ্ট হয়েছে যে মমতা ব্যানার্জি এ রাজ্যে ‘তৃণমূলের মুখ্যমন্ত্রী’ হয়েছেন, জনগণের মুখ্যমন্ত্রী হতে পারলেন না। তিনি ঘোরতর সি পি আই (এম) তথা বামবিরোধী। তিনি তার বিরোধীদের বিরোধিতার মাত্রা বাড়িয়ে চলেন।

বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ, মাধ্যমিক, এমনকি প্রাথমিক স্তরেও দীর্ঘদিনের প্রচলন ব্যবস্থা ভেঙে নিয়ে, প্রতিষ্ঠানসমূহের কাঠামো ভেঙে দিয়ে শিক্ষায় দলতন্ত্র কায়েম করা হচ্ছে। তৃণমূল সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে এমন একটা দিনও যায়নি, যেদিন শিক্ষক, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের উপর হামলা হয়নি। বিগত বিধানসভা নির্বাচনের ফল ঘোষণার পরে ২৪ ঘণ্টাও কাট‍‌লো না ১৪ই মে ২০১১ পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার গড়বেতায় পিটিয়ে খুন করলো প্রাথমিক শিক্ষক জিতেন নন্দীকে (৫৭)। পরবর্তীকালে আর একজন শিক্ষক বরুণ বিশ্বাস সমাজবিরোধীদের দ্বারা খুন হন।

১৪ই মে ২০১১ থেকে ৩০শে আগস্ট ২০১২ — প্রায় এই ১৬ মাসের তথ্য থেকে দেখা যায়, দৈহিকভাবে আক্রান্ত হন ৩৯, অধ্যক্ষ, অধ্যাপক, শিক্ষক, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে হামলার ঘটনা ৫১, এস এফ আই-কে মনোনয়নপত্র তুলতে না দেওয়াসহ হাঙ্গামার ঘটনা ৭০টি। এটি ১৬ মাসের হিসেব। এ পর্যন্ত আরও অনেক বেড়ে গেছে।

শিক্ষার হালহকিকত বোঝার জন্য একটি সংবাদের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করা হচ্ছে। স্কুলে ঢুকে এক প্রতিবন্ধী শিক্ষককে চড় মারলেন জেলা প্রাথমিক শিক্ষা সংসদের সভানেত্রী। ঘটনাটি ৪ঠা ফেব্রুয়ারি, ২০১৩-র। খবরে প্রকাশ, সকালে কালীতলায় বাঁকুড়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অতর্কিতে হানা দিয়ে শিক্ষক, শিক্ষিকা, পড়ুয়া ও অভিভাবকদের সামনেই স্কুলের শিক্ষক স্বরূপ কর্মকারকে সপাটে চড় মারেন বাঁকুড়া জেলা প্রাথমিক শিক্ষা সংসদের সভানেত্রী রিঙ্কু ব্যানার্জি। আকস্মিক আক্রমণ সামলাতে না পেরে ঐ প্রতিবন্ধী শিক্ষক উলটে চেয়ারে পড়ে যান।

এখানেই শেষ নয়। ঐ শিক্ষককে চড় মেরে সংসদ সভানেত্রী উপস্থিত অভিভাবকদের ডেকে গর্বিত কণ্ঠে বলেন, ‘‘দেখুন, একজন শিক্ষককে কিভাবে শায়েস্তা করতে হয়।’’ ৭ বছর পেরিয়ে যাওয়া একটি মেয়েকে প্রথম শ্রেণীতে ভর্তি না করে শিশুশিক্ষা অধিকার আইনের উল্লেখ করেছিলেন এবং মেয়ে‍‌টিকে দ্বিতীয় শ্রেণীতে ভর্তি করতে বলেন। এই ছিল শিক্ষকের অপরাধ। ঐ শিক্ষকের গালে চড় মে‍রে বলেন, ‘‘আমি স্কুল কাউন্সিলের চেয়ারপারসন, আমার কথাই আইন। এবার চড় মারলাম, পরের বার হাত-পা ভেঙে দেব।’’

৮ই ফেব্রুয়ারি (২০১৩) শুক্রবার স্কুল চলাকালীন স্কুলের মধ্যেই তৃণমূলীদের হাতে আক্রান্ত হলেন ক্যানিং ডেভিড শেষন হাই স্কুলের প্রধান শিক্ষক। স্কুল চলাকালীন প্রধান শিক্ষকের ঘরে ঢুকে তাঁকে মারধর করা হয়। তাঁকে উচিত শিক্ষা দিতেই নাকি তৃণমূলীরা মারধর করেন। ওরা কাকে কখন কোন্‌ শিক্ষা দিতে চান তা বোঝার আগেই আক্রমণ হয়ে যায়।

পশ্চিমবাংলার মুখ্যমন্ত্রী তাঁর দেহরক্ষী পুলিস আধিকারিকদের ‘চাবকানোর’ কথা বলে আস্ফালন করেন, সাংবাদিকদের ‘চড় মারার’ হুমকি দেন।

আমরা সকলেই জানি, পেটে ভাত থাকলে তবে লেখাপড়া বা শিক্ষার দিকে নজর পড়ে। তা না হলে পেটের জ্বালায় মজুরখাটা, চাকর, বাগাল প্রভৃতির কাজ করতে গিয়ে শৈশব হারিয়ে যায়। সুদূর অতীত থেকে যে কৃষক আন্দোলনের ধারা এ রাজ্যে গড়ে উঠেছিল তার তাৎপর্য না বুঝলে আজকের পরিস্থিতি বোঝা যাবে না।

বামফ্রন্ট সরকার একদিনে একটা ভোটের মধ্য দিয়েই তৈরি হয়নি। তেভাগা আন্দোলন, খাদ্য আন্দোলন, জোতদার, জমিদারদের বিরুদ্ধে আন্দোলন, ১৯৬৭ সাল ও ১৯৬৯ সালের গড়ে ওঠা যুক্তফ্রন্ট সরকার ও কৃষক আন্দোলন — এ সবের মধ্য দিয়ে নানা ঘাত-প্রতিঘাত পেরিয়ে অনেক ত্যাগের মধ্য দিয়ে এসেছে ১৯৭৭ সাল। বামফ্রন্ট সরকার।

তাই, ভূমিসংস্কারের ক্ষেত্রে সমগ্র দেশে সর্বাধিক সাফল্য এ রাজ্যে। ৩০ লক্ষাধিক কৃষক ১১ লক্ষ ২৭ হাজার একরের বেশি জমি বিনামূল্যে পেয়েছেন। এদের মধ্যে ৩৭ শতাংশ তফসিলী জাতিভুক্ত, প্রায় ১৮ শতাংশ আদিবাসী। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষরা পেয়েছেন ১৮ শতাংশ জমির পাট্টা। সারা দেশে জমির মাত্র ৩ ভাগ পশ্চিমবঙ্গে। ভূমিসংস্কারের মাধ্যমে যত জমি সমগ্র দেশে বণ্টিত হয়েছে, তার ২২ ভাগ পশ্চিমবঙ্গেই। এর সঙ্গে সেচের ব্যবস্থার উন্নতির ফলে শস্য চাষের নিবিড়তা বেড়েছে এ রাজ্যে ১৯২ শতাংশ, খাদ্যশস্য উৎপাদনে পরিমাণ হয়েছিল ১৭০ লক্ষ টন।

খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ শিল্পে পশ্চিমবঙ্গে অগ্রগতি হয়েছিল চমকপ্রদ। ২০০৬-২০০৭ থেকে ২০০৯-২০১০ অর্থবর্ষে এরাজ্যে ১৪২৬ খাদ্যপ্রক্রিয়াকরণ শিল্পে ৩৩০৫ কোটি ১৩ লক্ষ টাকা বিনিয়োগ হয়েছে। এতে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কর্মসংস্থান হয়েছে ১ লক্ষ ১৭ হাজারের বেশি লোকের। কৃষির উপর ভিত্তি করে শিল্পের সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হয়েছে। রাজ্যের মধ্যেই ৫০ হাজার কোটি টাকার বাজার সৃষ্টি হয়েছে। মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বেড়েছে।

এইসব অগ্রগতির পশ্চাদভূমিতে রয়েছে ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণ। ত্রিস্তর পঞ্চায়েতের মধ্য দিয়ে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ — জনগণের হাতে ক্ষমতাকে সঞ্চারিত করা। বামফ্রন্ট সরকার প্রথম শপথ গ্রহণকালেই ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণের ঘোষণা করা হয়েছিল এবং তা পরবর্তীকালে আইনসঙ্গতভাবে চালু করা হয়েছিল। সব কিছু মিলে এই রাজ্যে ব্যাপক উদ্যোগ-আ‍‌লোড়ন সৃষ্টি করতে পেরেছিল। এখন মমতা ব্যানার্জির সরকার পঞ্চায়েতের মূলে কুঠারাঘাত করেছে। ক্ষমতা আমলাদের হাতে।

কৃষির উপর ভিত্তি করে শিল্প গড়ে তোলার ভিত্তি প্রস্তুত হয়েছিল। অন্যদিকে বিনিয়োগের হার ছিল ঊর্ধ্বমুখী। শুধুমাত্র ২০০৯ সালে এ রাজ্যে বিনিয়োগ হয়েছে ৮ হাজার ৪০০ কোটি টাকার বেশি। পেট্রোলিয়াম কেমিক্যাল, পেট্রো-কেমিক্যাল ইনভেস্টমেন্ট রিজিয়ন স্থাপন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল রাজ্য সরকার ২০০৯ সালে, তথ্য প্রযুক্তি ক্ষেত্রে পশ্চিমবঙ্গে যেমন বহুগুণ বিনিয়োগ ঘটেছে, তেমনি কাজের সুযোগ বেড়েছে। ১ লক্ষের বেশি ছেলেমেয়ে কলকাতায় তথ্য প্রযুক্তি ক্ষেত্রে কাজ করছে। ভূমিসংস্কার, কৃষি বিকাশ, ত্রিস্তর পঞ্চায়েত, শিল্পোদ্যোগ, খাদ্য সমস্যা মিটিয়ে দিতে সাহায্য করেছে। রাজ্যে ৫০ হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ বাড়ানোর চেষ্টা হয়েছিল। এরা ক্ষমতায় এসে উলটো পথে হাঁটছে। তৃণমূলীরা রক্তাক্ত হামলা চা‍‌লিয়ে ২৬,৮৩৮জন পাট্টাদার ও বর্গাদারকে উচ্ছেদ করেছে। জমির পরিমাণ ৯,৪০৪.১৩ একর।

শিক্ষাক্ষেত্রে বাম আমলের বিগত ৩৪ বছরে এ রাজ্যের উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি ঘটেছে। রাজ্যের ৯৯.২৫% শিশুই প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যায়। ১০০ শতাংশ করার প্রয়াস চলছিল। ভোকেশনাল ট্রেনিং সেন্টার বিদ্যালয় স্তর থেকেই গড়ে উঠেছে। বিগত ৩৪ বছরে রাজ্যে প্রাথমিক বিদ্যালয় ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। অনেকগুলি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। রাজ্যের ছেলে‍‌মেয়েদের স্বার্থে অনেকগুলি ইঞ্জিনিয়ারিং ও টেকনোলজি কলেজ স্থাপিত হয়েছে এ রাজ্যে। বৃদ্ধি পেয়েছে মেডিক্যাল কলেজের সংখ্যা। ১৯৭৭ সালের মাধ্যমিক পরীক্ষার্থী ছিল ২ লক্ষ, ২০১০ সালে উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার্থী ১০ লক্ষের বেশি। জনসংখ্যা বেড়েছে ১.৬গুণ। পরীক্ষার্থী ও ছাত্র বেড়েছে ৫ গুণেরও বেশি। গরিব, নিম্নবিত্ত, নতুন পরিবার থেকে শিক্ষার অঙ্গনে এসেছে। মাদ্রাসা শিক্ষায় ব্যাপক অগ্রগতি ঘটেছে। অর্থ বরাদ্দ বেড়েছে বহুগুণ। শিক্ষা ও শিক্ষকের মর্যাদা বেড়েছে অকল্পনীয়। এরা পরিবর্তনের পরিবর্তন করতে চায়, জাগ্রত জনগণ বাধা দেবেই।

এখন মসজিদের ‘ইমাম’দের কিছু ভাতা পাইয়ে ‘মুসলিম প্রেমের’ ভণ্ডামি করা হচ্ছে। ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রে মমতা ব্যানার্জি বিপজ্জনক খেলায় মেতেছে। মমতা ব্যানার্জি নানা সময়ে অসত্য ঘোষণা করে বসেন। ঘোষণার সঙ্গে পরিকাঠামো ও রূপায়ণ নিয়ে আলোচনা করলেই ফানুস চুপসে যাবে। যেমন, মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির এ রাজ্যে ১০ লক্ষ বেকারের চাকরি দেওয়ার দাবির মানে হলো বাস্তবে ১৮৯৯জনের চাকরি। ঘোষণা, দাবি ও বাস্তবের সঙ্গে এতোটাই ফারাক। এই সরকার এসে অনুমোদিত ৪০টি মাদ্রাসা বাতিল করে দিয়েছে। সংখ্যালঘু সংরক্ষণ (ও বি সি) কথার কথা রয়ে গেছে।

মমতা ব্যানার্জির জমি নীতির কারণে শিল্পায়ন লাটে উঠে গেছে। এখন যা আছে, তাও পালাচ্ছে। এখন যা অবস্থা কোনো উন্নয়ন হবে না, রেল হবে না, সড়ক হবে না। বেকারদের কাজ হবে না। শ্রমদিবস কমে ৪৪ দিনের জায়গায় ২৫/২৬ দিনে নেমেছে জঙ্গলমহলে। অন্যত্র ৯০% থেকে ২৬.৪৭%-এ নেমেছে। জঙ্গল হাসছে না, পাহাড়ও হাসছে না। অশান্তি হচ্ছে। কাঁদছে। এ রাজ্যের সি পি আই (এম)সহ বামপন্থীদের ৩৪ বছর মমতা ব্যানা‍‌র্জিকে তাড়া করে বেড়াচ্ছে। ভূমিসংস্কারকে চেষ্টা করেও ধ্বংস করতে পারছে না। তবে, কৃষকদের আত্মহত্যার মিছিলের পরিবেশ তৈরি করতে পেরেছে।

এখন চলছে শিক্ষায় মমতায়‌ন। শিক্ষার সমস্ত স্তরকে মমতাময়ী করার জন্য তাদের ছেলেদের লেলিয়ে দিয়েছে ও দিচ্ছে। অধ্যক্ষ, অধ্যাপক, অধ্যাপিকা, শিক্ষক-শিক্ষিকাদের তাদের বশীভূত করতে হবে। না হলে রায়গঞ্জ কলেজের অধ্যক্ষকে যেভাবে তৃণমূলের হাতে আক্রান্ত, হেনস্তা হতে হয়েছে, তেমন হবে কিংবা ভাঙড়ের অধ্যাপিকাকে যেমন মস্তান আরাবুল ইসলাম জলের জগ ছুঁড়ে মেরেছিল, তেমন করে মারা হবে। কিংবা চাবি দিয়ে আটকে রাখা হবে। যারা এ কাজ করছে, তারা মমতা ব্যানার্জির স্নেহধন্য তো বটে, বিশেষ ‘এনারজেটিক’ বলে প্রশস্তি হচ্ছে। ফেল করলেও পাস করিয়ে দেওয়ার অদ্ভুত দাবি থেকে নানা ধরনের দাবি ওদের কণ্ঠে ধ্বনিত হচ্ছে। পরীক্ষার হলে গণটোকাটুকির প্রতিযোগিতা চলছে।

বর্তমানে প্রাথমিক শিক্ষাকে নিয়ে ছেলেখেলা করছে। রাজ্য সরকার প্রাথমিকে বই দিচ্ছে। ‘মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির নির্দেশে গঠিত কমিটি’ বইগুলি প্রস্তুত করেছেন বিজ্ঞাপিত করা হয়েছে। অথচ, এটা উল্লেখের কোনো প্রয়োজন ছিল না। বিষয়বস্তুর মধ্যে ভুল, অবৈজ্ঞানিক ও অসংগত বিষয়ের অবতারণা করা হয়েছে। শিক্ষক, শিক্ষার অঙ্গন, কাঠামো, শিক্ষার বিষয়কেও ক্ষতবিক্ষত করার জন্য সচেষ্ট। এভাবেই শিক্ষায় মমতায়ন চলছে। শিক্ষাঙ্গনে দুর্বৃত্তায়ন কোন্‌ স্তরে গেছে যে, গার্ডেনরিচের হরিমোহন ঘোষ কলেজের ঘটনায় একজন কর্তব্যরত পুলিস অফিসারকে দুর্বৃত্তদের গুলিতে প্রাণ দিতে হলো? অসময়ে এ কোন অন্ধকার নামিয়ে আনা হচ্ছে? বড়ই দুঃসময় এখন। সমাজবিরোধীদের দাপাদাপি চলছে। রক্তাক্ত সমাজ, ক্ষতবিক্ষত শিক্ষাঙ্গন, পরিবেশ কলুষিত। এ রাজ্যে নারীরা আদৌ নিরাপদ নয়।

শিক্ষায় মমতায়নের নামে অধ্যাপক, শিক্ষক, ছাত্রদের খুন, সন্ত্রাস চলছে। এর পাশাপাশি এই সরকারের আমলে চিট ফান্ড কেলেঙ্কারির মতো কলঙ্কজনক ঘটনা ঘটেছে। পশ্চিমবাংলার আকাশে আজ যেন নেমে এসেছে দুর্যোগের ঘনঘটা। এই কঠিন পরিস্থিতি মোকাবিলা করেই এগোতে হবে। এগোনো সম্ভব।

Advertisements

Tags: , , , , , , , , , , , , ,

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s


%d bloggers like this: