Lalgarh Today

সেদিনের মাওবাদী, আজকের তৃণমূলীরাই দাপিয়ে বেড়াচ্ছে
তবুও আতঙ্ক অগ্রাহ্য করেই মনোনয়ন পেশ জঙ্গলখণ্ডে

সুদীপ্ত বসু

লালগড় ৪ঠা জুন– জনসাধারণের কমিটির লোকজন পঞ্চায়েতে তৃণমূলের প্রার্থী হচ্ছে, এটা অন্তত জঙ্গলমহলের বাসিন্দাদের নতুন করে ‘বিস্মিত’ করছে না।তবে দুই শতাধিক শহীদের তালিকা সঙ্গে নিয়েও অদম্য জেদে সি পি আই (এম)-র প্রার্থীদের মনোনয়ন জমা দেওয়া আটকাতে তৃণমূলের হয়ে আজও ‘পরিশ্রম’ করছে একদা মাওবাদী, জনসাধারণের কমিটির নেতারা– এই চমৎকার দৃশ্যে কিছুটা আশ্চর্য বটে জঙ্গলখণ্ড।দুবছরের তৃণমূলী শাসন, কর্পূরের মত হাজারো প্রতিশ্রুতির উবে যাওয়া সবই দেখেছে জঙ্গলমহল। প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের ক্ষোভে অনেক বদলে গেছে জঙ্গলমহল। বদলায়নি শুধু সেই পুরানো সমীকরণ। প্রথম দফা নির্বাচনের মনোনয়ন পর্বের শেষ হতে আর মাত্র একদিন। মঙ্গলবার দিনভর আগুইবনী থেকে লালগড়, দেখা মিললো সেই দৃশ্যের।

রাজ্যের অন্য প্রান্তের মতই মঙ্গলবার লালগড়, কাঁটাপাহাড়ি, রামগড়, ধরমপুরের বামফ্রন্ট প্রার্থীরা পঞ্চায়েতে মনোনয়ন পত্র পেশ করেছেন। লালগড়ে লাল পতকার মিছিল করেছেন মনোনয়ন পত্র জমা দিতে যাওয়া প্রার্থীরা। বেশ কিছুদিন পরে ফের লালগড় বাজার এলাকায় সি পি আই(এম) ‘র মিছিল, স্লোগানে রাস্তার দু’ধারে মানুষজন দাঁড়িয়ে গেছে। মাওবাদী-তৃণমূলী বাহিনীর হাতে এক সময়ে কার্যত ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া পার্টি অফিসের সামনে দাঁড়িয়ে সে দৃশ্য দেখেছে যৌথ বাহিনীও।

লালগড় বাজারে যৌথ বাহিনী রয়েছে। অদূরে লালগড় বিডিও অফিসের সামনে রাজ্য পুলিসের বাহিনী রয়েছে। আপাতভাবে কড়া নিরাপত্তা রয়েছে। অন্তত এমনটাই ধারণা দেখেশুনে। এতটাই নাকি নিরাপত্তা যে বিডিও অফিসের প্রায় দুশো মিটার আগে থেকেই ঘুরিয়ে দেওয়া হচ্ছে গাড়ি। যেতে হবে হেঁটেই। হেঁটেই লালগড় বিডিও অফিসের সামনে গিয়ে দেখা গেলো এ আসলে ‘ভুলভুলাইয়া’।

আদালতের নির্দেশ, কমিশনের সুপারিশ –সব কিছুই এখানে যেন অবান্তর। নিশ্চিন্তে যৌথ বাহিনী ও রাজ্য পুলিসের বাহিনীর উপস্থিতিতেই বিডিও অফিসের সামনে জমায়েত করে রয়েছে দিলীপ মাহাতো, রাজু আদক, শৈলেন আচার্য, অসিত মাহাতো, সন্তোষ মাহাতো সহ বিরাট বাহিনী। এদের বর্তমান পরিচয় ‘তৃণমূল নেতা’। মাত্র দু’বছরের অতীতের পরিচয়, প্রত্যেকে মাওবাদী নাশকতার সঙ্গে যুক্ত, জনসাধারণের কমিটির সামনের সারির নেতা।

কিন্তু তখনও আশ্চর্য হওয়া বাকি ছিল। তখন দুপুর প্রায় ১টা। সি পি আই(এম) প্রার্থীরা একে একে মনোনয়ন জমা দিচ্ছেন। কিন্তু পুলিস, যৌথ বাহিনীর সামনেই সরাসরি বামফ্রন্ট প্রার্থীদের হুমকি, ব্যারিকেড করে বিডিও অফিসে ঢুকতে বাধা দেওয়া, শাসানি সবই চলছে। গত এক সপ্তাহ ধরে হুমকি, গ্রামে গ্রামে রাতে চড়াও হয়ে প্রার্থীদের ভয় দেখানো, এমনকি যে গাড়ি ভাড়া করে প্রার্থীরা লালগড়ে আসছেন, সেই গাড়ির মালিকদের হুমকি দেওয়া সত্ত্বেও বামফ্রন্ট প্রার্থীদের আসা আটকানো যায়নি।

মরিয়া তৃণমূলের হয়ে তাই লালগড়ে বিডিও অফিস চত্বরে সরাসরি জমায়েত করে বামফ্রন্ট আটকানোর চেষ্টা দিনভর চালিয়ে গেলো জনসাধারণের কমিটির নেতারা। এবং তা প্রশাসনের সামনেই।

তবুও বেলপাহাড়ির মত লালগড়কেও আটকাতে পারেনি তৃণমূল। কিন্তু কীভাবে আদালত, কমিশন উপেক্ষা করেই এভাবে লালগড় থেকে বেলিয়াবেড়া সর্বত্র অবৈধ জমায়েত করা হল? দিলীপ মাহাতো একদা মাওবাদীদের স্কোয়াড সদস্য,অসিত মাহাতো,রাজু আদকের বিরুদ্ধে শুধু ধরমপুর এলাকাতেই চারজন সি পি আই(এম) কর্মী খুনের অভিযোগ। ২০০৯ থেকে ২০১১- এই সময়কালে লালগড়ে নৈরাজ্যের চেনা মুখের ভিড় এখন তৃণমূলের হয়ে সি পি আই(এম) প্রার্থীদের মনোনয়ন ঠেকাতে! দিলীপ মাহাতো, অসিত মাহাতোর স্ত্রী আবার তৃণমূলের প্রার্থী হচ্ছেন!

একই চেহারা ঝাড়গ্রাম গ্রামীণের আগুইবনী। নৈরাজ্যের সময়কালে অন্যতম সন্ত্রাস কবলিত এলাকা ছিল। সি পি আই(এম)-কে মনোনয়ন পর্বে ঠেকাতে এখানেও মরিয়া তৃণমূল। এখানেও সি পি আই(এম)-কে মনোনয়ন পত্র পেশে বাধা দেওয়ার তৃণমূলী হাতিয়ার সেই মাওবাদীদের প্রকাশ্য মঞ্চ জনসাধারণের কমিটি। আগুইবনীর খারবান্দিতে এদিন সি পি আই (এম) প্রার্থী মনোনয়ন জমা দেওয়ার কথা ছিল। সেই মতো সকালবেলায় প্রার্থীরা গ্রাম থেকে বেলিয়াবেড়া ব্লক অফিসের উদ্দেশ্যে রওনা দেওয়ার সময়তেই তৃণমূলী বাইকবাহিনী চড়াও হয়। একেবারে সশস্ত্র অবস্থাতেই হুমকি দেয় গ্রাম ছেড়ে বেরোলে ফল ভাল হবে না। খবর পৌঁছায় পুলিসের কাছে। বেলিয়াবেড়া থানা থেকে আসে পুলিস বাহিনী। গ্রামে ঢুকেই পঞ্চায়েতে সমিতিতে বামফ্রন্টের প্রার্থী সিরাজুল মিঞাকে গ্রেপ্তার করে চলে যায় পুলিস! পুলিসের এই ভূমিকায় আরও উৎসাহিত হয় হামলকারীরা। শেষমেষ মনোনয়ন পত্র পেশ করতে গ্রাম থেকে বেরোতেই দেওয়া হয়নি বামপন্থী প্রার্থীদের।

আর এখানেও তৃণমূলের পতাকা হাতে হামলাকারী দলের নেতৃত্বে দুলাল মান্ডি। কে এই ব্যক্তি? শুধুমাত্র আগুইবনী, সরডিহা এলাকাতেই একাধিক সি পি আই(এম) কর্মী সহ এক পুলিস কর্মীকে খুন করে পুঁতে দেওয়ার ঘটনায় অন্যতম অভিযুক্ত, মাওবাদীদের একসময়ের সক্রিয় স্কোয়াড সদস্য। এই দুলাল মান্ডি আবার এখন তৃণমূলের প্রার্থী। ওয়াজেদ আলি, প্রবীর জানা,দীনেশ মাহাতো, জগদীশ মাহাতো, স্বপন পইড়া। সবাই জনসাধারণের কমিটির, সবাই আজ তৃণমূলের প্রার্থী।

অনেক কিছু দেখা জঙ্গলমহলে আজ এটিও এক নতুন অভিজ্ঞতা । সরকার বদলেছে, সি পি আই(এম) বিরোধী ‘ঘৃণা’ আজও একই সুরে। বেলপাহাড়ির এড়গোদার বিকাশ মাহাতো, হাড়দার রবি মান্ডি, কাঁকোর লেদাশালের লক্ষ্মী মাহাতো, বুলেট,শঙ্কর থেকে ধরমপুরের দিলীপ মাহাতো, আগুইবনীর দুলাল মান্ডি- পুরানো মাওবাদী থেকে নব্য তৃণমূলীদের এরকম হাজারো নাম জঙ্গলমহল ঘুরলেই মিলবে।

দুপুরে লালগড় বিডিও অফিসের সামনেই দেখা দেবরাজ মান্নার সঙ্গে। দেবরাজ জঙ্গলমহলের যুবক। দেবরাজ এক রাতে বাবা ও কাকার ছেলে মাওবাদীদের হাতে খুন হতে দেখেছিল। ধরমপুরের সেই বীভৎস রাত এখনও জঙ্গলমহলের স্মৃতিতে টাটকা। সেই দেবরাজ আজ বিনপুর-১নম্বর ব্লক থেকে বামফ্রন্টের জেলা পরিষদের সদস্য। অসহ্য যন্ত্রণা কোথাও কি অদম্য জেদেরও জন্ম দেয়, প্রশ্ন ছুঁড়ছে বদলে যাওয়া এই জনপদ।

জঙ্গলমহলের ২৩টি সার গ্রাম, মিনিকিট সেন্টার, কৃষি উৎপাদন সামগ্রী বিক্রয় কেন্দ্র, ১৫টি ক্ষুদ্র সেচ প্রকল্প,লালগড় পলিটেকনিক, আদিবাসী বৃদ্ধ পেনশন প্রাপকের সংখ্যা ৭৫০০০-এ নিয়ে যাওয়ার প্রতিশ্রুতি রুপায়ণের নিদারুণ ব্যর্থতা, মিথ্যাচার দেবরাজদের জেদ বহুগুণ বাড়িয়েছে।

মিথ্যাচার, স্বপ্নভঙ্গ এই মাটিতে ক্ষোভ বাড়িয়েছে, জেদও। এরই মধ্যেই ফের সি পি আই(এম)-কে মোকাবিলার চেষ্টায় সেই রক্তলাগা হাতগুলির সঙ্গে শাসক দলের হাত মিশে যাওয়ায় জঙ্গলমহলে নতুন উদ্বেগ। জঙ্গলমহল বদলাচ্ছে,আবার এবং তা দ্রুতই।

Advertisements

Tags: , , , , , , , ,

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s


%d bloggers like this: