Arabul Model — How Arabul Wins Uncontested

বন্দুকের নলেই আরাবুলের ‘জয়’

 নিজস্ব প্রতিনিধি

 কলকাতা, ১২ই জুন – কলকাতার অদূরে ভাঙড়েই মমতা ব্যানার্জির আসল ‘জমি নীতির’ মডেলের সন্ধান মিলেছিল। এবার রাজ্য পুলিস রেখেই কীভাবে পঞ্চায়েতে বিরোধী প্রার্থীদের মনোনয়ন জমা দেওয়া ঠেকাতে হয়, কীভাবে বিরোধী প্রার্থীদের জোর করে মনোনয়ন প্রত্যাহার করে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়ী হতে হয়, সেই মডেলও ‘উপহার’ দিয়েছে ভাঙড়। ‘দাতা’ আরাবুল ইসলাম। শাসক তৃণমূলের ‘গর্ব’, ‘তাজা’ নেতা।

কলকাতা অদূরের ভাঙড়-২ নম্বর ব্লকই এখন শহর লাগোয়া এলাকায় তৃণমূলী সন্ত্রাসের ‘মডেল’ হয়ে উঠেছে। শ্যামবাজারের জনসভায় দাঁড়িয়ে সেদিন মুখ্যমন্ত্রী বলেছিলেন, ‘আরাবুল তো মারধর করেনি, তবুও তো ও জেল খাটলো’। মঞ্চে তখন আরাবুল নিজেই দাঁড়িয়ে। ইঙ্গিত মিলেছিল তখনই।

বিধানসভা নির্বাচনে হেরে যাওয়া সেই আরাবুল ইসলামকেই এরপর ভাঙড়-২ নম্বর পঞ্চায়েত সমিতির প্রার্থী করলো তৃণমূল। এবং পোলেরহাট থেকে পঞ্চায়েত সমিতির তৃণমূলী প্রার্থী হিসাবে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়ী হয়ে শংসাপত্রও নিয়ে ফেললো আরাবুল ইসলাম!

আরাবুলের সেই ‘বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়ী’ হওয়ার কাহিনীর মধ্যেই রয়েছে রাজ্য পুলিসের তত্ত্বাবধানে তৃণমূল সরকারের আমলে যে কোন স্তরে নির্বাচনের আসল চেহারা। ২৯শে মে এরাজ্যে অষ্টম পঞ্চায়েত নির্বাচনের প্রথম দফার ভোটের মনোনয়ন পর্ব শুরু। ভাঙড়-২ নম্বর ব্লকে ২৯মে সকাল থেকে ১০ই জুন দুপুর পর্যন্ত যা ঘটেছে তাই-ই আসলে এরাজ্যের গণতান্ত্রিক পরিবেশের নির্মম বিজ্ঞাপন।

২৯শে মে’র আগের দিন থেকেই ভাঙড় বাজার লাগোয়া বিডিও অফিসে রীতিমতো ক্যাম্প করে পাহারা দেওয়া শুরু করে তৃণমূলের সশস্ত্র বাহিনী। পরিস্থিতির আঁচ পেয়ে তাই প্রথম দিনে নমিনেশন ফি দিতে অল্প কয়েকজন বামফ্রন্ট কর্মীরা যান। কিন্তু সেখানেই তাঁদের ওপর হামলা, বেধড়ক মারধর হয়। পঞ্চায়েত সমিতির প্রার্থী পলাশ গাঙ্গুলিসহ বেশ কয়েক জন গুরুতর জখম হন। আতঙ্ক ছড়ানোর চেষ্টা প্রথম দিনেই। এরপরেও দ্বিতীয় দিনে বামফ্রন্ট কর্মীরা লাইনে দাঁড়িয়ে মনোনয়নপত্র তুলতে গেলে হামলা চালানো হলো। বিডিও অফিসের ভিতরেই প্রায় ৫০-৬০জনের সশস্ত্র তৃণমূলী বাহিনী। যাদেরকে ভাঙড়বাসী চেনেন ‘আরাবুলের টিম’ হিসাবে।

ততক্ষণে সমস্ত অভিযোগ পুলিস সুপার, জেলাশাসক, নির্বাচন কমিশনকে জানানো হয়েছে সি পি আই (এম)-র তরফে। এরপরেই ভাঙড়ের পোলেরহাট, হাতিশালা, ভগবানপুর, পোগালি এলাকায় প্রকাশ্যে চলে তৃণমূলী বাইক বাহিনীর ‘তলোয়ার মিছিল’। বিডিও অফিসে তৃণমূল বাদে যাঁরা মনোনয়ন তোলার লাইনে দাঁড়িয়েছিলেন তাঁদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভাঙচুর, বৃদ্ধ বাবা-মাকে ধরে পেটানো সবই চলেছে। বিডিও অফিসের ১০০ মিটারের মধ্যেই চললো তৃণমূলী মারধর, হুমকি সবই। আরাবুল বাহিনীর তাণ্ডবে শেষমেশ মহকুমা শাসকের দপ্তরে যেতে হলো বামফ্রন্ট প্রার্থীদের।

সেদিন ছিল ১লা জুন। সকাল ১১টার আগে অফিস খুলবে না জেনেও ভোর পাঁচটার মধ্যে অফিস চত্বরে গিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন ভাঙড়-২ ব্লকের গ্রাম পঞ্চায়েতের ১৫৯জন প্রার্থীর মধ্যে ১৪২জন। খাস আরাবুলের পাড়া থেকেও লোকজন ভোররাতে বেরিয়ে চলে এসেছে । অদম্য জেদ নিয়েই। ২রা জুনের মধ্যেই ভাঙড়- ২ পঞ্চায়েত সমিতির ৩০টি আসনে, জেলা পরিষদের দুটি আসনে এবং পঞ্চায়েতের ১৫৯টি আসনেই প্রার্থী দেয় বামফ্রন্ট। প্রার্থী দেওয়া হয় আরাবুল ইসলামের বিরুদ্ধেও।

১লা জুন রাত থেকেই এরপর শুরু হলো দ্বিতীয় দফার আক্রমণ। পঞ্চায়েত সমিতির বামফ্রন্ট প্রার্থী হাসান নস্কর-সহ বামফ্রন্টের প্রায় সাতজন প্রার্থী সেদিন রাতে বাড়ি ফিরছিলেন। সন্ধ্যায় বাড়ি আক্রমণ হতে পারে এই আশঙ্কা থেকে মনোনয়ন জমা দেওয়ার পরে গভীর রাতেই তাঁরা বাড়ি ফিরছিলেন। বাসন্তী মেইন রোড সে সময় রাস্তা বন্ধ থাকায় তাঁরা গাড়ি ঘুরিয়ে গাজীপুকুর অর্থাৎ আরাবুলের পাড়ার ওপর দিয়েই যাচ্ছিলেন। সেই সময়েই আরাবুল ইসলামের বাড়ির সামনেই জড়ো থাকা প্রায় ১৫জনের সশস্ত্র বাহিনী গাড়িতে বামফ্রন্ট প্রার্থীদের দেখেই ‘ডাকাত ডাকাত’ চিৎকার করে তাড়া করতে শুরু করে। গাড়ি ছেড়ে জীবন বাঁচাতে বামফ্রন্ট প্রার্থীরা অন্ধকারের মধ্যে কোনক্রমে পালান। কেউ পুকুরের মধ্যে ঝাঁপ দিয়ে নাক বাইরে রেখে ডুব দিয়ে রয়েছেন, কেউ কাদার মধ্যে শুয়ে, কেউবা ঝোপের পোকামাকড়ের মধ্যেই কোনমতে গা ঢাকা দেন। রাতভর সেই অবস্থায় থাকতে হয়েছে।

এদিকে ততক্ষণে ঐ পঞ্চায়েতে সমিতির প্রার্থীর বাড়িতে বোমা ছোঁড়া, গুলি চালিয়ে ভয় দেখানো সবই চলছে। আরাবুলের ইসলামের বিরুদ্ধে প্রথমে যাঁকে প্রার্থী করা হয়েছিল বামফ্রন্টের তরফে, তাঁর বাড়িতে গিয়ে মহিলা সদস্যের সঙ্গে অভ্যবতা করা, বাড়ির লোকজনকে মারধর করাও শুরু হয়ে যায়। প্রাণভয়ে তিনি পালিয়ে যান। সেই রাতেই কাশীপুর থানার ৫০মিটারের মধ্যে সাতটি বাড়ি ভাঙচুর, ভগবানপুরে বামফ্রন্ট প্রার্থীর বাবা-মাকে মারধর করা হয়।

এরপরেও খোদ আরাবুলের পাড়ারই এক বাসিন্দা এবার নিজেই প্রার্থী হওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেন এবং মনোনয়ন জমা দেন। একেবারে দিনমজুর পরিবারের যুবক। বিডিও অফিস থেকে সেই খবর পেয়ে যায় আরাবুলের টিম। জানতে পারে প্রস্তাবক কে। ৪তারিখ রাতে শুরু হয়ে আবার আক্রমণ। ভাঙড়ের মাছিভাঙা গ্রামের কুড়ি জন সি পি আই( এম) কর্মীকে সে রাতে তুলে নিয়ে আসা হয় আরাবুলের বাড়িতে। চলে বিচারসভা। সেখান থেকে তিনজনকে নিয়ে ওই রাতেই যাওয়া হয় উত্তর ২৪পরগনার আটঘরা এলাকায়, ওখানেই কাজ করতেন আরাবুলের বিরুদ্ধে বামফ্রন্ট প্রার্থী হিসাবে দাঁড়ানো সেই যুবক। চলে তল্লাশি। খোঁজ মেলেনি।

পরের দিন সেই যুবকের দুই ভাইকে তুলে এনে চলে মারধর, যেন তেন ভাবে মনোনয়ন প্রত্যাহার করতেই হবে। স্ত্রীও বাড়ি ছাড়া হয়ে যান। বাবা-মা-স্ত্রী-দাদার ওপর এই অত্যাচার, পরিবারের সদস্যদের খুনের হুমকি দেওয়ার পর আর পারেননি সহ্য করতে। এরপর অজানা আশ্রয় থেকে বেরিয়ে এসে ১০ই জুন বেলা বারোটায় নিজের মনোনয়ন প্রত্যাহার করে নেন সেই যুবক।

বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অবশেষে ‘জয়ী’ হলেন আরাবুল ইসলাম। মঙ্গলবার বিডিও অফিস থেকে শংসাপত্রও গ্রহণ করলেন। তৃণমূলীরা মেতে উঠলো উল্লাসে। বন্দুকের নল, স্ত্রী-ছেলে মেয়ের প্রাণনাশের হুমকির মুখে প্রার্থীপদ প্রত্যাহার করতে বাধ্য হলেন আরও অনেকে। গোটা ঘটনায় পুলিসের ভূমিকার কোন নজির মেলেনি। তাই পুলিসের ভূমিকার কথা উল্লেখও করা গেলো না।

Advertisements

Tags: , , , , , , , , , , ,

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s


%d bloggers like this: