Left Front Govt.’s Success Story on Rural Development

বামফ্রন্ট সরকারের গ্রামোন্নয়ন ও পঞ্চায়েত ব্যবস্থায় বিকল্প নীতি

ড: অসীম দাশগুপ্ত

প্রথম বামফ্রন্ট সরকারের প্রতিষ্ঠা দিবসে (২১শে জুন) স্মরণ করা প্রাসঙ্গিক, সীমিত ক্ষমতার মধ্যেও উন্নয়নের ক্ষেত্রে, এবং নির্দিষ্টভাবে গ্রামোন্নয়ন ও পঞ্চায়েত ব্যবস্থার ক্ষেত্রে, কি বিকল্প নীতি সামনে রেখে ১৯৭৭ সা‍‌লে যাত্রা শুরু করেছিল বামফ্রন্ট সরকার। উল্লেখ করা প্রয়োজন, বামফ্রন্ট সরকারের প্রথম দু’বছরে, এবং পরবর্তী বছরগুলিতে কি কি সাফল্য অর্জিত হয়েছিল, এবং কোনখানে সমস্যাও দেখা দিয়েছিল। একই সঙ্গে লক্ষ্য করা প্রয়োজন, গত দু’বছরে বর্তমান তৃণমূল কংগ্রেসের নেতৃত্বে রাজ্য সরকারের কার্যকলাপ কোনদিকে চলেছে।স্বল্প পরিসরের কারণে এই আলোচনা প্রধানত গ্রামোন্নয়ন এবং পঞ্চায়েত ব্যবস্থার বিষয়েই নির্দিষ্ট রাখা হয়েছে।

গ্রামোন্নয়ন ও পঞ্চায়েত ব্যবস্থার বিকল্প নীতি

সুদীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামের ভিত্তিতে গঠিত বামফ্রন্ট সরকার ১৯৭৭ সালের ২১শে জুন যখন যাত্রা শুরু করে, তখন উপলব্ধির মধ্যেই ছিল, দেশের জমিদার-বুর্জোয়া নিয়ন্ত্রিত রাষ্ট্র ব্যবস্থার অভ্যন্তরে রাজ্যস্তরে অত্যন্ত সীমিত ক্ষমতার মধ্যে রাজ্য সরকারকে কাজ করতে হবে। তাই প্রথম বছর থেকেই বামফ্রন্ট সরকার কেন্দ্র-রাজ্য সম্পর্কের ক্ষেত্রে বিকেন্দ্রীকরণের সুস্পষ্ট দাবি ধারাবাহিকভাবেই উত্থাপন করে। এ‍‌ই দাবি পরবর্তী সময়ে উন্নীত হয় সর্বভারতীয় স্তরে।

কেন্দ্র-রাজ্য সম্পর্কে বিকেন্দ্রীকরণের দাবি উত্থাপন করার সঙ্গে সঙ্গে সীমিত ক্ষমতার মধ্যে দাঁড়িয়েই, বামফ্রন্ট সরকার উন্নয়নের প্রতিটি ক্ষেত্রে, এবং নির্দিষ্টভাবে, গ্রামোন্নয়নের ক্ষেত্রে, এক বিকল্প নীতি সামনে রেখে অগ্রসর হওয়ার উদ্যোগ গ্রহণ করে। এই বিকল্প নীতিতে উন্নয়নের লক্ষ্য শুধুমাত্র উৎপাদন বৃদ্ধি করা নয়, এমনভাবে উৎপাদন বৃদ্ধি করা যাতে সাধারণ শ্রমজীবী মানুষের কর্মসংস্থান ও আর্থিক অবস্থার উন্নতি হয়, তাঁদের মর্যাদা বৃদ্ধি পায় এবং রাজনৈতিক-সামাজিক শক্তির ভারসাম্য তাঁদের অনুকূলে আসার প্রক্রিয়া শুরু হয়।

যেহেতু সাধারণ শ্রমজীবী মানুষের স্বার্থেই এই উন্নয়ন, তাই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, এই উন্নয়ন প্রক্রিয়াতে যাতে স্থানীয় সাধারণ মানুষ অংশগ্রহণ করতে পারেন গণতান্ত্রিক অধিকারের ভিত্তিতে, তা নিশ্চিত করতে হবে। ১৯৭৭ সালে ২১‍‌শে জুন প্রথম বামফ্রন্ট সরকারের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করার পরেই মহাকরণের অলিন্দ থেকে কমরেড জ্যোতি বসু ঘোষণা করেছিলেন, ‘‘বামফ্রন্ট সরকার মহাকরণ থেকে সরকার চালাবে না, অংশগ্রহণমূলক গণতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা করা হবে গ্রামে এবং শহরে নির্বাচিত স্বায়ত্তশাসনমূলক সংস্থাগুলি গড়ে তুলে।’’ এই নির্বাচিত স্বায়ত্তশাসন সংস্থাগুলিই হলো গ্রামের ক্ষেত্রে নির্বাচিত পঞ্চায়েত (এবং শহরের ক্ষেত্রে নির্বাচিত পৌরসভা)।

গ্রামোন্নয়নে ভূমিসংস্কার

গ্রামোন্নয়নের ক্ষেত্রে, বিশেষ করে কৃষির ক্ষেত্রে, রাজ্যের প্রতিটি জেলার খামার স্তরের পরিচালনার তথ্যাবলী থেকে (উৎস: কৃষি দপ্তর, পশ্চিমবঙ্গ সরকার) বারংবার সুস্পষ্টভাবে দেখা গেছে, একর-প্রতি সর্বোচ্চ ফসল উৎপাদনের পরিমাণ (একাধিক ফসল উৎপাদনের তথ্য সমেত) এবং একর-প্রতি সর্বোচ্চ কর্মসংস্থানেরও পরিমাণ, উভয়ই পাওয়া যায় জমিদার বা বৃহৎ কৃষকের জমি থেকে নয়, তা পাওয়া যায় ক্ষুদ্র শ্রমজীবী কৃষকদের জমি থেকেই (বিশেষ করে যদি সেচ, উন্নত বীজ ইত্যাদির সুবিধা তাঁদের জমিতে পৌঁছে দেওয়া যায়)। তাই রাজ্যের কৃষিতে মোট উৎপাদন এবং কর্মসংস্থান বৃদ্ধির জন্যই (যা পূর্বে উল্লিখিত ‍বিকল্প নীতিতে উন্নয়নের লক্ষ্য) প্রয়োজন ভূমিসংস্কারের মাধ্যমে জমিদার-জোতদারদের কাছ থেকে ঊর্ধ্বসীমা-বহির্ভূত জমি রাজ্য সরকারে ন্যস্ত করে তা গরিব কৃষকদের ম‍‌ধ্যে বণ্টন করা। এবং একই সঙ্গে প্রয়োজন বর্গাদারদের নাম নথিভুক্ত করা, যাতে কাজের ও উৎপন্ন ফসলের ভাগের নিশ্চয়তার ভিত্তিতে, তাঁদের কাজ-করা জমি থেকেও বৃদ্ধি পেতে পারে ফসলের মোট উৎপাদন ও কর্মসংস্থান।

ভূমিসংস্কারে বামফ্রন্ট সরকারের প্রথম দু’বছরে পদ‍‌ক্ষেপ

ভূমিসংস্কারের ক্ষেত্রে এই দুটি প্রধান পদক্ষেপই — কৃষি জমির মালিকানার পুনর্বণ্টন এবং বর্গাদারের নথিভুক্তিকরণ — বিশেষ অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে শুরু করা হয় ১৯৭৭ সালের সেপ্টেম্বর মাস থেকেই। এবং এই পদক্ষেপগুলির সঙ্গে যুক্ত করা হয় কৃষক সংগঠনগুলির মাধ্যমে, এবং পরবর্তীতে পঞ্চায়েত ব্যবস্থারও মাধ্যমে, এলাকার সাধারণ শ্রমজীবী মানুষদের। এই সামগ্রিক উদ্যোগ গ্রহণের ফলে ১৯৭৭ সালের ডিসেম্বর মাসের মধ্যেই প্রায় ২০ হাজার একর ঊর্ধ্বসীমা বহির্ভূত জমি দরিদ্র কৃষকদের মধ্যে বণ্টনের জন্য সরকারে ন্যস্ত করা সম্ভব হয়, ১৯৭৮ সালের ডিসেম্বর মাসের মধ্যে তা বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়ায় ৫০ হাজার একরে, এবং ১৯৭৯ সালের ডিসেম্বর মাসের শেষে তা আরো উন্নীত হয় ৯০ হাজার একরে।

ভূমি ও ভূমিসংস্কার দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, রাজ্য সরকারের হাতে ন্যস্ত হওয়া কৃষি জমির বণ্টন থেকে ৩০শে জুন, ১৯৭৯ পর্যন্ত সময়কালের মধ্যেই, অর্থাৎ প্রথম বামফ্রন্ট সরকারের প্রথম দু’বছরের মধ্যেই উপকৃত হন প্রায় ৪.২৬ লক্ষ দরিদ্র কৃষক পরিবার। এছাড়া, বামফ্রন্ট সরকারের প্রথম ছ’মাসের মধ্যে বর্গাদারদের নাম নথিভুক্তিকরণের সংখ্যাও বৃদ্ধি পায় পাঁচগুণ। এবং ‘অপারেশন বর্গা’ কর্মসূচীর মাধ্যমে আরও নিবিড়ভাবে নথিভুক্তিকরণের পদ্ধতি চালু করে ১৯৭৮ সালে ডিসেম্বর মাসের শেষে নথিভুক্ত বর্গাদারের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে পৌঁছায় প্রায় ৫ লক্ষে, এবং ১৯৭৯ সালের আগস্ট মাসের শেষে এই সংখ্যা লক্ষ্যণীয়ভাবে উন্নত হয়ে দাঁড়ায় ৭.৪১ লক্ষে, যা রাজ্যের মোট অনুমিত বর্গাদারের সংখ্যার প্রায় ৫০ শতাংশ।

পঞ্চায়েত ব্যবস্থায় বামফ্রন্ট সরকারের প্রথম দু’বছরে পদক্ষেপ

ভূমিসংস্কারের ক্ষেত্রে পদক্ষেপগুলি গ্রহণ করার মাধ্যমে রাজ্যের গ্রামাঞ্চলে রাজনৈতিক-সামাজিক শক্তির ভারসাম্য সাধারণ শ্রমজীবী কৃষকদের অনুকূলে আসার প্রক্রিয়া শুরু হয়। এই প্রক্রিয়াকে, সাধারণ কৃষকদের স্বার্থেই, কৃষিতে উৎপাদন ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধির ক্ষেত্রে আর‍‌ও কার্যকর করতে বিশেষ প্রয়োজনীয় হয়ে ওঠে, সাধারণ কৃষকদের জন্য জমি-ছাড়া অন্যান্য উৎপাদন-উপাদানের (সেচ, উন্নত বীজ, সার ইত্যাদির) সুবিধাও পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করা, এবং উৎপন্ন ফসলের ন্যায্য দাম ও কৃষি-ঋণের ক্ষেত্রেও সহায়ক পদক্ষেপ গ্রহণ করা। এই সহায়ক পদক্ষেপগুলি গ্রহণ করার লক্ষ্যেই জরুরী হয় গ্রামাঞ্চলে বিকেন্দ্রীকৃত একটি সংগঠন স্থাপন করা, যে সংগঠনটি হবে গণতান্ত্রিক ও নির্বাচিত সংস্থা এবং যা রাজ্যের গ্রামাঞ্চলে সাধারণ মানুষের প্রতিনিধিত্ব করবে।

প্রথম বামফ্রন্ট সরকারের প্রথম বছরেই তাই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, নির্বাচিত ত্রি-স্তর পঞ্চায়েতই হবে এই উপযুক্ত সংগঠন এবং বামফ্রন্ট সরকার গঠিত হওয়ার এক বছরের মধ্যেই (৪ঠা জুন, ১৯৭৮) রাজ্যে নতুনভাবে ত্রি-স্তর পঞ্চায়েতে মোট প্রায় ৫৬ হাজার (তখনকার হিসেবে) প্রতিনিধিদের জন্য অনুষ্ঠিত হয় গণতান্ত্রিকভাবে এক বিশাল নির্বাচন প্রক্রিয়া। এই পঞ্চায়েত নির্বাচনের পরেই ভারত সরকারের একটি খ্যাতনামা সংস্থা (নাম, জাতীয় গ্রামোন্নয়ন সংস্থা) এই নির্বাচন প্রক্রিয়ার উপর সমীক্ষা করে তাদের রিপোর্টে বলে যে, এই নির্বাচন হয়েছে নিরপেক্ষ এবং শান্তিপূর্ণভাবে, এবং ধর্ম ও জাত-পাতের বিভাজনের ঊর্ধ্বে উঠে মূলত আর্থিক ও রাজনৈতিক বিষয়গু‍লির উপর মতামতকেই গুরুত্ব প্রদান করে (জাতীয় উন্নয়ন সংস্থার রিপোর্ট, ১৯৭৮-৭৯)।

এছাড়া, রাজ্য সরকারের উন্নয়ন ও পরিকল্পনা দপ্তরের পক্ষ থেকেও গ্রাম পঞ্চায়েত স্তরে নির্বাচিত সদস্যদের জীবিকা ও জমির মালিকানার উপর একটি নমুনা সমীক্ষা করা হয় (১৯৭৮-৭৯)। এই সমীক্ষার তথ্য থেকে দেখা যায় যে, এই পঞ্চায়েতগুলির নির্বাচিত সদস্যদের ৮০ শতাংশেরও বেশি এসেছেন শ্রমজীবী কৃষক, ভূমিহীন খেতমজুর, বর্গাদার, গ্রামীণ কারিগর, শিক্ষক ও অন্যান্যদের মধ্য থেকে।এছাড়া, শ্রমজীবী কৃষকদের ক্ষেত্রেও, ৭১ শতাংশই হলেন ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষক। অর্থাৎ, পঞ্চায়েতগুলির নির্বাচিত সদস্যরা হলেন সংখ্যাগরিষ্ঠতায় গ্রামের দরিদ্র মানুষেরই প্রতিনিধি। সদস্যদের এই শ্রেণী চরিত্র মনে রেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, পঞ্চায়েতগুলির উপর ধাপে ধাপে ত্রাণ ও উন্নয়নমূলক কাজের দায়িত্ব দেওয়া হবে।

নতুন পঞ্চায়েতগুলি কাজ শুরু করার পরেই ১৯৭৮ সালে বিধ্বংসী বন্যায় ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয় পশ্চিমবঙ্গের গ্রামাঞ্চল। তাই, এই সময়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, গ্রামের মানুষের কাছে ত্রাণসামগ্রী পৌঁছে দেওয়া হবে এই সদ্য নির্বাচিত পঞ্চায়েতগুলির মাধ্যমে। আগে এই রকম বা এর চেয়ে কম প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের সময়েও দেখা গেছে যে, ত্রাণসামগ্রী ঠিকমতো না পাওয়ায় গ্রাম থেকে বন্যাপীড়িত মানুষ শহরে চলে এসেছেন, মহামারীর প্রকোপে ব্যাপক সংখ্যায় সাধারণ মানুষ আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর মুখে পতিত হয়েছেন এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যশস্যের দাম অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু, এবার প্রাকৃতিক দুর্যোগের মুখে দাঁড়িয়ে, পঞ্চায়েতগুলি ত্রাণসামগ্রী এবং জনস্বাস্থ্য পরিষেবা সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে বহুলাংশে সফল হলেন। তার প্রমাণ পাওয়া গেল এই কারণে যে, বন্যার পর গ্রাম থেকে শহরে সাধারণ মানুষ চলে এলেন না, অসুখে, বিশেষ করে কলেরায় প্রাণহানি হলো নগণ্য, এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যশস্যের দাম বন্যার পর বৃদ্ধি পেলেও, তা এক সপ্তাহের মধ্যেই নামতে শুরু করলো।

এরপর ১৯৭৮-৭৯ সালেই পঞ্চায়েতগুলিকে আরও দায়িত্ব দেওয়া হলো ‘কাজের বিনিময়ে খাদ্য’ এই গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচীর রচনা ও রূপায়ণের ক্ষেত্রে। এই কর্মসূচীটির উদ্দেশ্য ছিল, গ্রামের গরিব মানুষদের মজুরি ও খাদ্য সামগ্রীর বিনিময়ে শ্রমে নিযুক্ত করে সামাজিক সম্পদ (জোড় বাঁধ নির্মাণ, খাল সংস্কার, জলাশয় খনন ও উন্নয়ন, জলনিকাশি ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং রাস্তা ইত্যাদি) নির্মাণ করা। প্রকল্পগুলির ব্যয়ভার কিছুটা বহন করতো রাজ্য সরকার অর্থের মাধ্যমে এবং কিছুটা কেন্দ্রীয় সরকার খাদ্য সামগ্রীর মাধ্যমে। সেই সময়ে একমাত্র পশ্চিমবঙ্গেই বামফ্রন্ট সরকার এই কর্মসূচীগুলির রচনা ও রূপায়ণের দায়িত্ব দিয়েছিল পঞ্চায়েতগুলিকে। অন্য রাজ্যে এই কর্মসূচীগুলি রূপায়িত হতো আমলাদের মাধ্যমে। পশ্চিমবঙ্গে বামফ্রন্ট সরকারের তরফ থেকে বিশেষভাবে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল, প্রকল্প নির্বাচনের সময় পঞ্চায়েতগুলি যেন স্থানীয়ভাবে উন্মুক্ত সভা আহ্বান করে সাধারণ মানুষের সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে প্রকল্পগুলির ক্ষেত্রে অগ্রাধিকারের সিদ্ধান্ত নেয়, এবং রূপায়ণের সময়েও তারা যেন এলাকার মানুষদের সরাসরি যুক্ত করে ‘উপকৃত কমিটি’র মাধ্যমে। এছাড়া, সুস্পষ্টভাবে বলা হয়েছিল, কারিগরি দিক থেকে যেন অগ্রাধিকার দেওয়া হয় শ্রম-নিবিড় এবং স্থানীয় সম্পদ-নির্ভর প্রযুক্তির ব্যবহারের উপর, যাতে যতটা সম্ভব বেশি কর্মসংস্থান এবং শ্রমজীবী মানুষদের আয় সৃষ্টি করা সম্ভব হয়।

উল্লেখ করা প্রয়োজন, ভারত সরকারের যোজনা কমিশনের কর্মসূচী মূল্যায়ন সংস্থা ১৯৭৯ সালে বিভিন্ন রাজ্যে ‘কাজের বিনিময়ে খাদ্য’ কর্মসূচীর মূল্যায়নের জন্য একটি নমুনা সমীক্ষা করে। এই সমীক্ষার চূড়ান্ত বিবরণীতে পশ্চিমবঙ্গকে বিশেষভাবে স্বীকৃতি দেওয়া হয় এই বলে যে, মুষ্টিমেয় যে কয়েকটি রাজ্যে এই কর্মসূচী সাফল্যের সঙ্গে রূপায়িত হয়েছে, পশ্চিমবঙ্গ তাদের মধ্যে অন্যতম। পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে অন্যান্য রাজ্যের পরিস্থিতির পার্থক্য উল্লেখ করে বলা হয়, ‘‘এখানে জেলা কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে বরাদ্দ খাদ্যশস্য ও অর্থ পাওয়ার পর গ্রামের জন্য প্রকল্প প্রস্তুত করার উদ্দেশ্যে গ্রাম পঞ্চায়েতগুলি জনসাধারণের সভা ডাকে। এইসব সভাতেই প্রকল্পগুলির অগ্রাধিকারও স্থির করা হয়।’’

এছাড়া, রাজ্য সরকারের উন্নয়ন ও পরিকল্পনা দপ্তরের পরিচালিত সমীক্ষা (১৯৭৯-৮০) থেকে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জানা যায়। সমীক্ষার মতে, ‘‘এ-রাজ্যে এই কর্মসূচীতে যে প্রকল্পগুলি রূপায়িত হয়েছে, সেগুলি অধিকতর শ্রম-নিবিড় এবং তাদের গড় নির্মাণ খরচও প্রচলিত খরচের তুলনায় অপেক্ষাকৃত কম। এই ব্যয় হ্রাসের কারণ হিসেবে বলা হয়েছে যে, সাধারণভাবে এই প্রকল্পগুলির রূপায়ণে ঠিকাদার নিযুক্ত করা হয়নি; তত্ত্বাবধানের কাজের প্রায় ৭৩ শতাংশ বহন করেছেন স্থানীয় জনসাধারণ এবং বিনা পারিশ্রমিকে।’’

গ্রামোন্নয়ন ও পঞ্চায়েত ব্যবস্থায় বিকল্প নীতির ফলাফল প্রথম দু’বছরে (১৯৭৭-৭৯)

ভূমিসংস্কারের ভিত্তিতে পঞ্চায়েত ব্যবস্থাকে যুক্ত করে কৃষিতে অন্যান্য উপকরণের সুবিধা সাধারণ কৃষকদের পৌঁছে দেওয়ার সিদ্ধান্তের ফলে প্রথম বামফ্রন্ট সরকারের প্রথম দু’বছরের মধ্যেই সেচের সম্প্রসারণ, উন্নত বীজের ব্যবহার এবং সারের প্রয়োগের ক্ষেত্রে লক্ষণীয় অগ্রগতি সূচিত হয়। ক্ষুদ্র সেচ দপ্তর এবং সেচ ও জলপথ দপ্তরের প্রকল্পগুলির রূপায়ণের সঙ্গে সঙ্গে পঞ্চায়েত ব্যবস্থার মাধ্যমে ‘কাজের বিনিময় খাদ্য’ কর্মসূচীর আওতায় ব্যাপক সংখ্যক সেচ প্রকল্প রূপায়িত হওয়ার কারণে, ১৯৭৬-৭৭ সালের পর বামফ্রন্ট সরকারের প্রথম দু’বছরে, ১৯৭৭-৭৮ এবং ১৯৭৮-৭৯ সালে অতিরিক্ত প্রায় ৩ লক্ষ হেক্টর কৃষি জমিতে সেচ প্রদানের ক্ষমতা সম্প্রসারিত করা সম্ভব হয়। এছাড়া পঞ্চায়েতের সহায়তায় কৃষকদের মধ্যে উন্নত বীজ ব্যবহারকে উৎসাহিত করায়, ধানের উৎপাদনে উন্নত বীজের অনুপাত ১৯৭৬-৭৭ সালে ২২ শতাংশ থেকে দু’বছর পরে ১৯৭৮-৭৯ সালে বৃদ্ধি পায় ২৮ শতাংশে। এছাড়া, সারের ব্যবহারও এ‍ই দু’বছরে লক্ষণীয়ভাবে বৃদ্ধি পায়, ১৯৭৬-৭৭ সালে ৫১.৬ হাজার মেট্রিক টন থেকে ১৯৭৮-৭৯ সালে প্রায় ৮৬.৬হাজার মেট্রিক টনে (উৎস : আর্থিক সমীক্ষা, পশ্চিমবঙ্গ সরকার, ১৯৭৯-৮০ ও ১৯৮০-৮১)।

এর পাশাপাশি, এক বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হয়, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কগুলির মারফৎ ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের, এবং নির্দিষ্টভাবে ভূমিসংস্কার থেকে উপকৃত পাট্টাদার ও নথিভুক্ত বর্গাদারদের ঋণ প্রদানের ব্যবস্থা করতে। তার ফ‍‌লে, ২৭শে আগস্ট, ১৯৭৯ পর্যন্ত সময়কালে ব্যাঙ্ক থেকে ঋণ পান ৫৮,৯৪৮ জন পাট্টাদার ও বর্গাদার, যা সংখ্যায় অল্প হলেও সমগ্র দেশের ক্ষেত্রে সৃষ্টি করে এক নতুন নজির। একই সঙ্গে শুরু হয় সমবায় ব্যবস্থার উপর গুরুত্ব প্রদান এবং সমবায় ব্যাঙ্ক ও সংস্থাগুলির মাধ্যমে ঋণ প্রদান বৃদ্ধিরও উদ্যোগ। এছাড়া, সাধারণ কৃষকরা যাতে তাঁদের উৎপন্ন ফসলের ন্যায্য দাম পান, তার জন্য ১৯৭৭-৭৮ সাল থেকেই শুরু হয় সরকারের মাধ্যমে কৃষকদের কাছ থেকে সরাসরি ন্যায্য দামে চাল কেনার উদ্যোগ, যার সঙ্গে পরে যুক্ত করা হয় পঞ্চায়েত সমিতিগুলির ভূমিকা।

ভূমিসংস্কারকে ভিত্তি করে পঞ্চায়েত ব্যবস্থার মাধ্যমে এই সামগ্রিক পদক্ষেপগুলি গ্রহণ করার ফলে রাজ্যে চালের উৎপাদন ১৯৭৬-৭৭ সালে ৫৯.৪ লক্ষ মেট্রিক টন থেকে প্রায় ২৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ১৯৭৭-৭৮ সালে উন্নীত হয় ৭৪.৯ লক্ষ মেট্রিক টনে। পরবর্তী বছরে (১৯৭৮-৭৯), ভয়াবহ বন্যায় আউশ ও আমন ধানের ব্যাপক ক্ষতি হওয়া সত্ত্বেও, ক্ষুদ্র সেচের সম্প্রসারণ এবং উন্নত বীজ ও সারের সরবরাহের ক্ষেত্রে পঞ্চায়েতকে যুক্ত করে তৎপরতার সঙ্গে পদক্ষেপ নেওয়ায়, বোরো ধানের উৎপাদন লক্ষণীয়ভাবে বৃদ্ধি পায় প্রায় ৪১ শতাংশ, যা আগে কখনো হয়নি। শুধু উৎপাদন বৃদ্ধি নয়, ১৯৭৭-৭৮ সালে খেতমজুরদের মজুরির হার টাকার হিসেবে বৃদ্ধি পায় প্রায় ১৯ শতাংশ হারে, যা ওই বছরে খেতমজুরদের পক্ষে প্রাসঙ্গিক মূলসূচকের বৃদ্ধির হারের থেকে বেশি, এবং এর ফলে প্রকৃত অর্থেও খেতমজুরদের মজুরি ১০ শতাংশে বেশি হারে‍ই বৃদ্ধি পায়। খেতমজুরদের মজুরি বৃদ্ধির ধারা পরের বছরেও অব্যাহত থাকে।

বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ হলো, বামফ্রন্ট সরকার প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় পর, ধান কাটা নিয়ে সংঘর্ষের ঘটনা কমে হয় নগণ্য, এবং সাধারণ কৃষকরা তাঁদের ফসল এবং বর্গাদাররা তাঁদের ফসলের ন্যায্য ভাগ নিজেদের ঘরের গোলায় তুলতে পারেন শান্তিতে। কোনো আত্মহত্যা বা গ্রামাঞ্চলে দরিদ্র মানুষদের উপর সংগ‍‌ঠিত আক্রমণের ঘটনাও ঘটেনি। গ্রামাঞ্চলে শ্রেণী ভারসাম্য, শ্রমজীবী মানুষদের অনুকূলে আসতে শুরু করে।

বামফ্রন্ট সরকারের পরবর্তী বছরগুলিতে অগ্রগতি

বিকল্প নীতির ভিত্তিতে বামফ্রন্ট সরকারের আম‍‌লে পরবর্তী বছরগুলিতে, ধারাবাহিকতা রেখে, প্রত্যেকটি ক্ষেত্রে—ভূমিসংস্কার, পঞ্চায়েত ব্যবস্থা এবং গ্রামোন্নয়নের প্রতিটি বিষয়ে—অগ্রগতি শুধু বজায় থেকেছে তাই নয়, তাকে করা হয়েছে আরো সম্প্রসারিত।

ভূমিসংস্কারের উপর ধারাবাহিকভাবেই বিশেষ অগ্রাধিকার আরোপ করার কারণে রাজ্যে বণ্টিত কৃষিজমির পরিমাণ ক্রমাগত বৃদ্ধি পেয়ে (১৫ই জানুয়ারি, ২০১১ পর্যন্ত সময়কালে) দাঁড়িয়েছে ১১.৩ লক্ষ একরে, এবং তার থেকে উপকৃত হয়েছেন প্রায় ৩০.৫ লক্ষ কৃষক পরিবার, যাঁদের মধ্যে তফসিলী জাতি, আদিবাসী ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের উপকৃতরাই হলেন ৬৬ শতাংশ। মহিলাদের ক্ষমতায়নের উপর গুরুত্ব আরোপ করে যৌথ পাট্টা বণ্টন করা হয়েছে ৬.২ লক্ষ এবং মহিলা পাট্টা ১.৬৫ লক্ষ সংখ্যায়, যা সমগ্র দেশের ক্ষেত্রেই নজিরবিহীন। এছাড়া, নথিভুক্তিকরণ ‍‌থেকে উপকৃত বর্গাদারদের সংখ্যা ক্রমাগত বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছে ১৫.১৬ লক্ষে।

তাছাড়া, ভূমিহীন খেতমজুর ও অন্যান্যদের বাস্তুজমির মালিকানা থেকে উপকৃত হয়েছেন ৩.২৪ লক্ষ দরিদ্র পরিবার। ভূমিসংস্কারের ক্ষেত্রে এই প্রত্যেকটি পদক্ষেপ একত্রিত করলে, এর সামগ্রিক ফল হিসেবে পশ্চিমবঙ্গের গ্রামাঞ্চলে উপকৃত হয়েছেন প্রায় ৪৯ লক্ষ দরিদ্র পরিবার, যা রাজ্যের মোট কৃষি-নির্ভর পরিবারের প্রায় ৫০ শতাংশ। উল্লেখ করা প্রয়োজন, সমগ্র দেশে ভূমিসংস্কারের ক্ষেত্রে, জমি বণ্টন থেকে উপকৃত মোট পরিবারের মধ্যে শতকরা ৫৪ জনই হলেন পশ্চিমবঙ্গের, এবং ভূমিসংস্কারে রাজ্যগুলির মধ্যে পশ্চিমবঙ্গের স্থান হয়েছে সর্বপ্রথম।

পঞ্চায়েত ব্যবস্থার ক্ষেত্রে পূর্বে বর্ণিত প্রাথমিক সাফল্যের পর এই ব্যবস্থাকে আরো সমন্বিত এবং বিকেন্দ্রীকৃত করা হয়েছে। পঞ্চায়েতের মাধ্যমে রূপায়িত প্রকল্পগুলির সঙ্গে যাতে জেলাতে রাজ্য সরকারের বিভিন্ন দপ্তরের মাধ্যমে রূপায়িত প্রকল্পগুলির মধ্যে সুষ্ঠু সমন্বয় থাকে, তার জন্য ১৯৮৫-৮৬ সালে সমগ্র দেশে এরাজ্যেই সর্বপ্রথম জেলাস্তরে জেলা পরিকল্পনা কমিটি এবং ব্লকস্তরে ব্লক পরিকল্পনা কমিটি গঠিত হয়। উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, ১৯৮৯ সালে কলকাতায় অনুষ্ঠিত পূর্বাঞ্চল এবং উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সমস্ত রাজ্যগুলির পঞ্চায়েতীরাজ সম্মেলনের উদ্বোধন করতে এসে তদানীন্তন প্রধানমন্ত্রী প্রয়াত রাজীব গান্ধী বামফ্রন্ট সরকারের আমলে পশ্চিমবঙ্গের পঞ্চায়েত ব্যবস্থা এবং বিকেন্দ্রীকরণের এই উদ্যোগকে প্রশংসা করে তাকে সমগ্র দেশের ‘মডেল’ হিসেবেই চিহ্নিত করেন।

তারপর এই ধারণাকে সামনে রেখেই পঞ্চায়েত এবং পরে পৌর সংস্থাগুলির মাধ্যমে বিকেন্দ্রীকরণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সংবিধান সংশোধনও (যথাক্রমে ৭৩তম এবং ৭৪তম সংশোধন) করা হয়। আরো উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, বামফ্রন্ট সরকারের আমলে, পরবর্তী পর্যায়ে, পঞ্চায়েত ব্যবস্থার বিকেন্দ্রীকরণের উদ্যোগকে আরো সম্প্রসারিত করা হয়েছে। বিকেন্দ্রীকরণের প্রক্রিয়াকে কাঠামোগতভাবে শুধু গ্রাম পঞ্চায়েতের স্তর নয়, প্রতিটি গ্রামের ক্ষেত্রে গ্রাম সংসদ স্তর পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া হয়েছে, যাতে গ্রামের সাধারণ মানুষ উন্মুক্ত সভার মাধ্যমে উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় আরো সরাসরি গণতান্ত্রিকভাবে অংশগ্রহণ করতে পারেন। উল্লেখ করা অপ্রাসঙ্গিক নয় যে, ভারত সরকারের পঞ্চায়েতীরাজ মন্ত্রকের রাজ্যওয়াড়ি পর্যালোচনার (২০০৯-১০) প্রকাশিত ফল অনুযায়ী, পঞ্চায়েত ব্যবস্থার মাধ্যমে অংশগ্রহণমূলক বিকেন্দ্রীকরণের নিরিখে সমস্ত দেশের মধ্যে বামফ্রন্ট সরকারের আমলেই পশ্চিমবঙ্গ অর্জন করে প্রথম স্থলাভিষিক্ত হওয়ার বিশেষ সম্মান।

ভূমিসংস্কারকে ভিত্তি করে পঞ্চায়েত ব্যবস্থার মাধ্যমে কৃষির ক্ষেত্রে উৎপাদন-উপাদানের (সেচ, উন্নত বীজ, সার ইত্যাদিতে) সহায়তার মাত্রা পরবর্তী বছরগুলিতে ক্রমাগতই প্রসারিত করা হয়। ফলে, রাজ্যের সেচ-ক্ষমতা যুক্ত কৃষি জমির অনুপাত ১৯৭৮-৭৯ সালে ৩৪ শতাংশ থেকে ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পেয়ে ২০১০-১১ সালে উন্নীত হয় প্রায় ৭২ শতাংশে। উন্নত বীজের ক্ষেত্রে, বিশেষ করে ধানের উৎপাদনে, ১৯৭৮-৭৯ সালে চাষের জমিতে উন্নত বীজের ব্যবহারের যে অনুপাত ছিল ২৮ শতাংশ, তা ২০১০-১১ সালে পৌঁছায় ৯৮ শতাংশে। সারের ক্ষেত্রে, রাসায়নিক সারের ব্যবহারের সঙ্গে সঙ্গে বিশেষ জোর দেওয়া শুরু হয় অপেক্ষাকৃত স্বল্প ব্যয়ে স্থানীয় সম্পদ-নির্ভর জৈব সার ও জীবাণু সারের ব্যবহারের উপর। এই লক্ষ্যে শুরু করে দেওয়া হয় জৈব গ্রাম ও বীজ গ্রাম স্থাপনের কাজ, এবং উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি করতে উন্নত এম আর আই পদ্ধতির ব্যবহার।

Advertisements

Tags: , , , , , , , , , ,

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s


%d bloggers like this: