Dr. Pashupatinath Chatterjee

ডাঃ পশুপতিনাথ চ্যাটার্জি

তুষার কাঞ্জিলাল

জীবনে এমন কিছু মানুষের সঙ্গে পরিচিতি ঘটে যাঁদের আত্মীয় বলে ভেবে নিতে বেশিদিন সময় লাগে না৷‌ নিজগুণে তাঁরা অন্যের মনের অনেক কাছাকাছি চলে আসতে পারেন৷‌ কিছু মাত্র চেষ্টা না করে তাঁরা মানুষের শ্রদ্ধা, অকুন্ঠ প্রীতি অতি সহজেই আদায় করে নেন৷‌ এমনই একজন মানুষ ডাঃ পশুপতিনাথ চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে পরিচিতি এবং দীর্ঘকাল কাছাকাছি থাকার সুযোগ ঘটেছে৷‌ তাঁর প্রীতি এবং স্নেহধন্য ছিলাম এটা ভাবলে গর্ব হয়৷‌টেগোর সোসাইটি যার আমি বর্তমান সম্পাদক, তিনি দীর্ঘকাল তার সভাপতি ছিলেন৷‌ আমাদের মুখপত্র কম্পাস পত্রিকারও তিনি ছিলেন প্রধান সম্পাদক৷‌ লেজুড়ের মতো সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য হিসেবে আমার নাম থাকলেও সব দায়িত্ব উনি নিজেই বহন করতেন৷‌ তাঁর গত ২৭ তারিখে দেহাবসান ঘটেছে৷‌ পরিণত বয়সেই মৃত্যু কিন্তু আমাদের মতো অনেকেই চরম বেদনাহত৷‌ পৃথিবী থেকে অতি পবিত্র একটি মানুষ চিরতরে বিদায় নিলেন৷‌
কোনও কোনও মৃত্যু পৃথিবীকে দরিদ্র করে৷‌ তাঁর ক্ষেত্রে সেটাই ঘটেছে৷‌ পেশায় ছিলেন খ্যাতনামা শল্যচিকিত্সক, দেশ থেকে ডাক্তারি পাস করে তিনি চীনে চলে যান৷‌ সেখানে একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্হার সঙ্গে কয়েক বছর চিকিত্সক হিসেবে থেকে তারপর বিলেতে চলে যান৷‌ ওখান থেকে এফ আর সি এস করে দেশে ফিরে অন্য দু-একটি সংস্হার সঙ্গে কাজ করেন এবং শেষে সরকারি চাকরিতে যোগ দেন৷‌ কলকাতার বিভিন্ন মেডিক্যাল কলেজে অধ্যাপনা সূত্রে যুক্ত থাকাকালীন তাঁর ব্যক্তিত্ব, কাজের প্রতি নিষ্ঠা এবং রোগীদের প্রতি সহমর্মিতা তাঁর অনেক ছাত্রকে প্রভাবিত করেছিল৷‌
টেগোর সোসাইটির সঙ্গে যুক্ত হওয়ার পর দেখেছিলাম প্রয়াত পান্নালাল দাশগুপ্ত তাঁকে শ্রদ্ধার চোখে দেখতেন এবং অনেক ব্যাপারে সম্পূর্ণ নির্ভর করতেন৷‌ তাঁর জীবনের মূল্যবোধগুলির সঙ্গে তিনি কখনও compromise করতেন না৷‌ অত্যম্ত দক্ষ শল্যচিকিত্সক হওয়া সত্ত্বেও অর্থোপার্জনের দিকে তিনি অনেকটা নির্মোহ ছিলেন৷‌ তাঁর মাপের সমসাময়িক চিকিত্সকরা যে পরিমাণ অর্থোপার্জন করেছেন, তিনি তার ধারেকাছেও যান না৷‌ এটা নয় যে তাঁর রোগীর সংখ্যাল্পতা ছিল৷‌ প্রচুর রোগী ছিল, কিন্তু অর্থাভাবের কথা বললে সে রোগীর কাছ থেকে তিনি টাকা নিতেন না৷‌ এমনকি এমনও দেখেছি যে অপারেশনের পর রোগী সুস্হ হওয়া পর্যম্ত ওষুধের খরচা তিনি নিজেই দিতেন৷‌আমি তখন সুন্দরবনে থাকি, অনেক চেষ্টাচরিত্র করে একটা ছোট হাসপাতাল গড়ে তোলা গিয়েছিল৷‌ তার সঙ্গে রাঙ্গাবেলিয়ার নিকটবর্তী দ্বীপগুলিতে কিছু স্বাস্হ্য পরিষেবা পৌঁছবার চেষ্টা চলছিল৷‌ ডাঃ চ্যাটার্জি তখন অবসর নিয়েছেন৷‌ আমাদের এই চেষ্টায় সব ধরনের সহায়তা দেওয়ার জন্য তিনি প্রায় একশত বারেরও বেশিবার রাঙ্গাবেলিয়ায় গিয়েছেন৷‌ কলকাতায় তাঁর প্র্যাকটিসের আয় ছেড়ে দিয়ে প্রয়োজনে তিন-চারদিন থেকেছেন এবং কয়েকশো রোগীর অপারেশন করেছেন৷‌ বোকার মতো প্রথমবার তাঁকে কিছু অর্থ দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিলাম, তিনি বলেছিলেন, তাহলে তিনি রাঙ্গাবেলিয়া আসাই বন্ধ করে দেবেন৷‌ বলেছিলেন, ওই হতদরিদ্র মানুষগুলির কাছ থেকে পয়সা নিলে তার বদলে যা খোয়াতে হবে, তা হচ্ছে মানবিকতাবোধ এবং মনের শাম্তি৷‌

প্রায়ই বলতেন যে তাঁর পরিবারের আর্থিক চাহিদা খুবই সামান্য৷‌ বহুকষ্টে সল্টলেকে একটা বাড়ি করেছিলেন এবং দুটি পুত্রসম্তানের পিতা ছিলেন৷‌ ছেলেদের লেখাপড়ার ব্যাপারে এলাহি কাণ্ডকারখানা কিছু করেননি৷‌ ছেলে দুটি এখন প্রতিষ্ঠিত৷‌ এদের লেখাপড়ার খরচাটা তাঁকে রোজগার করতে হত৷‌ উনি বলতেন যে, সেটা রোজগার করতে এবং মধ্যবিত্ত জীবনযাপন করতে যে অর্থের প্রয়োজন সেটা রোজগার করতে খুব চেষ্টা করতে হয় না৷‌ বাকি সময়টা কীভাবে ব্যয় করবেন তার একটা নিজস্ব পরিকল্পনা ছিল৷‌ তিনি বলতেন যে, ডাক্তারি পাস করতে তাঁর পেছনে যে অর্থ ব্যয় হয়েছে, তার অনেকটাই বহন করেছে সরকার এবং সমাজ৷‌ একটা হিসেব বের করেছিলেন যে, তিনি ডাক্তার হতে গিয়ে একজন শ্রমজীবী মানুষের ৩৪ বছরের আয় ভোগ করেছেন৷‌ তাই এঁদের ঋণ ফিরিয়ে দেওয়ার দায়টা সারাজীবন বয়ে যেতে হবে৷‌ পারিবারিক বৃত্তের বাইরেও যে বৃহত্তর সমাজ, তার কাছে তিনি দায়বদ্ধ, এটা জীবনের অবশ্যকর্তব্যের মধ্যে একটি৷‌

প্রসঙ্গত দুটি ঘটনার কথা বলে আমার কথা শেষ করব৷‌ সেটা ব্যক্তিগত ঋণ, যা স্বীকার না করলে পাপ হবে৷‌ তখন সুন্দরবনে আমার বাস, হঠাত্ ডাক্তারবাবু বললেন, আমার স্ত্রীর একটা অপারেশন করা অত্যম্ত জরুরি৷‌ তখন কলকাতায় আমার কোনও স্হায়ী ঠিকানা ছিল না৷‌ ডাক্তারবাবু সেটা জানতেন৷‌ তিনি আমার গোটা পরিবারকে কলকাতায় এনে তাঁর বাড়িতে আশ্রয় দিলেন৷‌ সমস্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে নিজেই অপারেশন করে আমার স্ত্রীকে সুস্হ করে তুললেন৷‌ গোটা দায়িত্বটাই তাঁর৷‌ কোনও ধরনের সাহায্য লাগতে পারে কিনা জিজ্ঞেস করায় উত্তর পেয়েছিলাম, এটা আমার নয়, ওনার দায়৷‌ বীণাদেবী সুন্দরবনে বসে যে কাজটা করছেন তাঁকে সুস্হ রাখায় দায় আমাদের৷‌ আমি বেশি কিছু করছি না৷‌

তাঁর জীবনের আর একটা দিক ছিল আগ্রহী পাঠকের৷‌ শত ব্যস্ততার মধ্যেও সময় করে তিনি বিভিন্ন বিষয়ে প্রচুর পড়াশোনা করতেন৷‌ পৃথিবীর সাহিত্য এবং বিজ্ঞানের জগতে নতুন কী ভাবা হচ্ছে এবং তা আমাদের ক্ষেত্রে কতটা কাজে লাগতে পারে প্রায়ই এসে সে-সব বিষয় আলোচনা করতেন৷‌ অনেক সময় সদ্য প্রকাশিত অনেক বইয়ের খবর তাঁর কাছ থেকে পেতাম৷‌ প্রকৃত অর্থে তিনি সব সময়ই আধুনিক৷‌ কোনও মালিন্য তাঁকে স্পর্শ করত না৷‌ কোনওদিন তাঁকে কারও বিরুদ্ধে কিছু বলতে শুনিনি৷‌ সংগঠনের কাজে যখন যা চেয়েছি সেই সাহায্য পেয়েছি৷‌ ডাঃ চ্যাটার্জির মৃত্যুর পর বারবার মনে হচ্ছে যে এই ধরনের অতি উচ্চমাপের মানুষগুলি বিলুপ্ত প্রজাতি হয়ে যাচ্ছে৷‌ এ ধরনের মানুষ কোনও প্রচারের আশা না নিয়ে নিজের জীবনকে বহুর মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়ার ব্রত নিয়ে জীবনকে পরিপূর্ণভাবে ভোগ করেছেন৷‌ এ জাতের মানুষ আজকের সমাজে বিরল৷‌ কিন্তু এঁদেরই বোধহয় সমাজে আজ সবচেয়ে বেশি দরকার৷‌

Advertisements

Tags: , , , ,

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s


%d bloggers like this: