After Much Ado Mamata Accepts EC Order

মাথা নোয়ালেন মমতা

349675

কলকাতা, ৮ই এপ্রিল— নির্বাচন কমিশনকে চ্যালেঞ্জ করে বদলি নির্দেশ ‘মানবো না’ বলার ২৪ঘণ্টার মধ্যেই মাথা নোয়াতে বাধ্য হলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি। আগের দিনে নিজের ছুঁড়ে দেওয়া চ্যালেঞ্জকে গিলে নিয়ে মঙ্গলবার তিনি বলেছেন, ‘কমিশনের নির্দেশ আমি মেনে নেবো। তবে যাদের সরানো হলো তাদের সর্বোচ্চ সম্মান দিয়ে আমার সঙ্গে রাখবো, নির্বাচন মিটে গেলে পরদিনই তাদের সেই সেই পদে ফের বহাল করবো।’

চার পুলিস সুপার, এক জেলাশাসক ও দুই অতিরিক্ত জেলাশাসককে পক্ষপাতদুষ্ট কাজ, নিষ্ক্রিয়তা, ইত্যাদি অভিযোগের কারণে সোমবারই অপসারণের নির্দেশ দেয় নির্বাচন কমিশন। আরও এক পুলিস সুপারকে বদলির নির্দেশ দেয় কমিশন। কমিশনের এই নির্দেশ জানার সঙ্গে সঙ্গে জামালপুরের জনসভায় প্রতিক্রিয়ায় মুখ্যমন্ত্রী বলেছিলেন, ‘আমি কেয়ার করি না। কমিশনকে চ্যালেঞ্জ দিয়ে বলছি, যা পারে করুক। পারলে আমাকে গ্রেপ্তার করুক। আমি মুখ্যমন্ত্রী থাকতে একজন অফিসারকেও সরাবো না।’

কিন্তু মঙ্গলবার সকাল থেকেই পরিস্থিতি অন্যদিকে গড়াতে থাকে। মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য মিডিয়া মারফত জেনেই দিল্লিতে নির্বাচন কমিশনের ফুল বেঞ্চ বৈঠকে বসে যায়। ইতোমধ্যে রাজ্য সরকারের তরফ থেকে মুখ্যসচিব চিঠি পাঠান কমিশনকে। অপসারিত অফিসারদের সরাতে আপত্তির কথা সেই চিঠিতে ছিলো না বলেই জানা গেছে। তবে তাঁদের বদলে যাঁরা নিযুক্ত হবেন, তাঁদের রাজ্য সরকারের পাঠানো তালিকা থেকে মনোনীত করার কথা বলা হয়। অন্যথায় প্রশাসনিক সমস্যা হবে বলে মুখ্যসচিব যুক্তি দেখান।

নির্বাচন কমিশন এই চিঠি বিবেচনা করেছে বলে কমিশন সূত্রে জানানো হয়েছে। তবে, সিদ্ধান্ত থেকে একচুলও নড়েনি। রাজ্যের প্রস্তাব পুরোই খারিজ করে সন্ধ্যায় রাজ্যকে কড়া ভাষায় জানিয়ে দেওয়া হয়, বুধবার সকাল দশটার মধ্যে বদলি নির্দেশ কার্যকরী করতে হবে। মুখ্যসচিবকে কমিশনের সেই নির্দেশ পাঠিয়ে দেওয়া হয়।

এদিকে কলকাতায় মুখ্যসচিব সঞ্জয় মিত্র বিপাকে পড়েন। একদিকে কমিশনের নির্দেশ মানার সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা, অন্যদিকে মুখ্যমন্ত্রীর হুঙ্কার। অন্য সব ক্ষেত্রে যে কোনো উপায়ে মুখ্যমন্ত্রীকে সন্তুষ্ট করার যে আনুগত্য মুখ্য সচিব দেখিয়ে থাকেন, এক্ষেত্রে তার কোনো পথ না থাকায় মুখ্যসচিব নোট পাঠিয়ে মুখ্যমন্ত্রীকে জানিয়ে দেন, কমিশনের বদলি নির্দেশ কার্যকর করা ছাড়া কোনো উপায় নেই। পুরুলিয়া ও বাঁকুড়ায় থাকাকালীনই মুখ্যমন্ত্রী বুঝে যান, এটা পঞ্চায়েত নয়, লোকসভার নির্বাচন হচ্ছে ভারতের নির্বাচন কমিশনের অধীনে। পরাক্রম বজায় রেখেও নিজের বক্তব্য থেকে পিছানোর পথ খোঁজা শুরু হয় তখনই। বাঁকুড়ার জনসভায় মুখ্যমন্ত্রী আগের দিনের মতো ‘কমিশনের নির্দেশ মানবো না’ গোছের কথার ধারকাছ দিয়েও যাননি। শেষ পর্যন্ত রাত সাড়ে আটটায় দুর্গাপুরে এসে সাংবাদিক বৈঠক করে মুখ্যমন্ত্রী নতুন ঘোষণা করেন।

মুখ্যমন্ত্রী সাংবাদিকদের বলেন, ‘ঠিক আছে, কমিশন যে বদলি করতে বলেছে আমি করে দেবো। দু’দিনের তো ব্যপার। তারপরে যেদিন নির্বাচন শেষ হবে সেদিনই বদলি হওয়া যে অফিসার যে জেলার পুলিস সুপার বা জেলাশাসক ছিলেন তাঁকে সেখানেই ফের বসাবো।’

নির্বাচন কমিশনের নির্দেশ ঠেকাতে মুখ্যমন্ত্রী কতদূর সচেষ্ট ছিলেন, এদিন তার প্রমাণ মিলেছে মুখ্যমন্ত্রীর বয়ানেই। পঞ্চায়েত ভোট নিয়ে রাজ্য নির্বাচন কমিশনকে ঠেকাতে রাজ্য সরকার যেভাবে আদালতকে ব্যবহার করে সময় নষ্ঠ করেছিলো, এবারও সম্ভব হলে সেরকম কিছু করতেই যে তিনি চেয়েছিলেন তা বুঝিয়ে দিয়ে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘নেহাৎ নির্বাচন প্রক্রিয়া শুরু হয়ে গেলে সুপ্রিম কোর্ট নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে কোনো কেস নেয় না, নইলে কালই আমি আদালতে গিয়ে সুবিচার নিয়ে আসতাম।’

পক্ষপাতদুষ্ট আচরণের জন্য কমিশন যাদের সরিয়ে দিলো সেই অফিসারদের সম্পর্কে প্রায় দলীয় কর্মীদের মতো করে প্রশংসা করেছেন মুখ্যমন্ত্রী। সেই সঙ্গে সংবিধানের তৈরি করে দেওয়া ব্যুরোক্রেসি বা আমলাতন্ত্র পরিচালন ব্যবস্থাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে পশ্চিমবঙ্গে তিনি কীভাবে অফিসারদের নিয়ন্ত্রণ করছেন তাও স্পষ্ট করে দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি বলেছেন, ‘যাদের সরানো হলো তাঁদের সর্বোচ্চ সম্মান দিয়ে আমার সঙ্গে রাখবো, আমার সঙ্গে ঘুরবে। আমি সি এম ও –তে রাখবো, পুলিস ডিরেকটরেটে রাখবো। ওরা বেস্ট সার্ভিস দিয়েছে।’ তিনি আরো বলেন, ‘কত কষ্ট করে খুঁজে খুঁজে একেকটা অফিসারকে বের করে দায়িত্ব দিয়েছি একেকটা জায়গায়। ভারতী ঘোষ একটা মাত্র মহিলা পুলিস সুপার, তাঁকে সরিয়ে দিলো! মেয়েদের প্রতি কি সম্মান! মির্জা (বর্ধমানের পুলিস সুপার) কালচারের লোক, সমাজসেবা করে। গায়ের জোরে সরিয়ে দিলো। অলোককে (বীরভূমের পুলিস সুপার) ভালো ছেলে বলে আমি ডেকে এনে এস পি করলাম। ৩মাসও কাজ করতে দিলো না! রাজেন্দ্র যাদব ইয়াং ছেলে, জীবনে প্রথমবার এস পি হয়েছে, জীবনের প্রথমেই জীবনটা নষ্ট করে দিলো! সঞ্জয় (উত্তর ২৪ পরগনার জেলাশাসক) তো আমাদের বেস্ট ডি এম। এত ভালো কাজ করেছে, সুব্রতদা বলছিলো, শুনে চোখ দিয়ে জল এসে যায়। তৃণমূল নেতাকে গ্রেপ্তার করেনি বলে ওকে সরিয়ে দেবে? কমিশন মহম্মদ বিন তুঘলকের মতো, সুপার ভগবানের মতো আচরণ করছে। আমি নির্বাচন কমিশনকে ধিক্কার জানাই।

প্রশাসনের ‘ইয়াং বেস্ট ছেলে’দের রাজনৈতিক পক্ষপাতিত্বের অভিযোগে সরে যেতে হলেও দলের ‘দুষ্টু দামাল ছেলে’রা যাতে মনোবল না হারায় তার জন্য মুখ্যমন্ত্রী অবশ্য একথাও বলেছেন, ‘যাদের আনলো তাতেও আমার আপত্তি নেই, ওরাও আমার ছেলেমেয়ে, ওরাও তো আমারই অফিসার। আমার সাথে সবার ভাব আছে। এতে আরো ভালো হবে। যারা আনন্দে নাচছে, তারা ব্যালট খুললে টের পাবে। আরো বেশি ভোটে জিতবো।’

নতুন ‘ছেলেমেয়ে’রাও যে মুখ্যমন্ত্রীর কথায় চলবেন সে ব্যপারে মুখ্যমন্ত্রী এরকম নিশ্চয়তা ব্যক্ত করলেও বদলি নির্দেশে তিনি যে কমিশনের ওপরে কতটা ক্ষুব্ধ তা সাংবাদিক বৈঠকের সিংহভাগ জুড়েই বুঝিয়ে দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। আগের দিনের মতোই কমিশনকে ‘পক্ষপাতদুষ্ট, সি পি এম, কংগ্রেস, বি জে পি-র সঙ্গে চক্রান্তে লিপ্ত’ ইত্যাদি বলতে বাদ রাখেননি তিনি। এই বিষয়টিকে ভোটের বাজারে ব্যবহার করতে তিনি ‘বাংলার বিরুদ্ধে চক্রান্ত’ ও ‘আঞ্চলিক দলের বিরুদ্ধে চক্রান্ত’ এই দুটি সংবেদনশীল বিষয়কে তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন। মুখ্যমন্ত্রী বলেছেন, ‘আমি ত্রিপুরায় গিয়ে দেখে এসেছি ওখানে লালপতাকা ছাড়া কিছু নেই। সি পি এমের রাজ্য বলে নির্বাচন কমিশন সেখানে কিছু করেনি। উত্তর প্রদেশ নিয়ে কিছু বলছি না, ওখানে দাঙ্গা হয়েছে, আইনশৃঙ্খলা খারাপ। কিন্তু রাজস্থান, মহারাষ্ট্র, গুজরাটে কোনো বদলি করেছে? করেনি। কংগ্রেস –বি জে পি-কে সন্তুষ্ট করছে। জয়ললিতা আমার বেস্ট ফ্রেন্ড বলে বলছি না, কিন্তু তামিলনাডুতে করেছে। আঞ্চলিক দলগুলোর ওপরে যতো রাগ। আমি ছাড়বো না, ভোটের পরে এটা বিগ ইস্যু হবে।’

মুখ্যমন্ত্রী এদিনও আগের দিনের মতোই উপনির্বাচন কমিশনার বিনোদ জুৎসিকে ব্যক্তিগত আক্রমণ করে তাঁকে ‘কালো তালিকাভুক্ত অফিসার’, ‘জমি কেলেঙ্কারিতে যুক্ত’ ইত্যাদি বলেছেন। সেইসঙ্গে ভারতের নির্বাচন কমিশনকে সংবিধানের ৩২৪ধারায় যে ক্ষমতা দেওয়া আছে তাকেও অস্বীকার করেছেন। মুখ্যমন্ত্রী বলেছেন, ‘গণতান্ত্রিক সরকারকে আপনি কেন শাসন করবেন? আপনার কাজ ভোট করা, ঠিকমতো ভোট করবেন, লোকে ভোট দিতে পারছে কিনা দেখবেন। আইনশৃঙ্খলায় আপনি কেন হস্তক্ষেপ করছেন?

Advertisements

Tags: , , , , ,

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s


%d bloggers like this: