Badshahi Sadak in Bardhaman

এন আই এ-র নজরে মঙ্গলকোট থেকে কীর্ণাহার, অনুব্রত থেকে মেহবুবের দাপটের এলাকা

সপ্তমী পুজোর দিন (২রা অক্টোবর) বর্ধমান শহর, স্টেশনের খুব কাছে, খাগড়াগড়ে এক বিস্ফোরণে ২জনের মৃত্যু হয়েছে। আহত আর একজন আশঙ্কাজনক অবস্থায় বর্ধমান হাসপাতালে ভর্তি। একটি বাড়ির দোতলায় বিস্ফোরণ হয়। বাড়িটি এক তৃণমূল কর্মীর। বাড়ির একতলায়, গ্যারেজে তৃণমূলের অফিস আছে। ঘটনাস্থলে গ্রেনেডসহ প্রচুর বিস্ফোরক, অ্যামোনিয়াম নাইট্রেটসহ প্রচুর রাসায়নিক এবং সন্ত্রাসবাদের কাগজপত্র পাওয়া গেছে। শুধু সি আই ডি নয়, ঘটনার মাত্রা বুঝে জাতীয় তদন্তকারী সংস্থা (এন আই এ)-র একটি দলও এলাকায় ইতোমধ্যেই প্রাথমিক তদন্ত করেছে। সরেজমিন তদন্ত করে এই বিশেষ প্রতিবেদনটি লিখেছেন চন্দন দাস। গ্রাফিক্স- প্রদীপ রায়।

santrasee-map-badshahi-road

বাদশাহী সড়ক ধরে মমতা-রাজে উগ্রপন্থীদের করিডর

মঙ্গলকোট, ১০ই অক্টোবর, ২০১৪:  রাস্তার নাম বাদশাহী রোড। শের শাহের আমলে তৈরি এই রাস্তার ধারে বড় বড় জলাশয় এবং বেশ কিছু প্রাচীন স্থাপত্য নজরে পড়বেই। জলাশয়গুলি মূলত সেনাবাহিনীর ঘোড়াদের জন্য বানানো হয়েছিল। এই রাস্তা ধরে বর্ধমান থেকে সরাসরি মঙ্গলকোট, কেতুগ্রাম, কীর্ণাহার, নানুর হয়ে পৌঁছানো যায় সীমান্তবর্তী মুর্শিদাবাদে। গোয়েন্দাদের পাওয়া একাধিক তথ্য জুড়লে বোঝা যাচ্ছে অপেক্ষাকৃত ধর্মনিরপেক্ষ শাসক শের শাহের বানানো এই পথ ধরেই বাংলাদেশ সীমান্ত থেকে বর্ধমান পর্যন্ত নিজেদের জাল বিছিয়েছে মৌলবাদী উগ্রপন্থীরা। এখনও পর্যন্ত, খাগড়াগড়ের বিস্ফোরণের পরে উগ্রপন্থীদের যে’কটি ডেরার হদিশ মিলেছে, তার সবকটিই এই ঐতিহাসিক, গুরুত্বপূর্ণ রাস্তার আশপাশে। আর এই বাদশাহী পথের ধারে থাকা জনপদগুলির বর্তমান নিয়ন্ত্রকরা নানাভাবে উগ্রপন্থীদের সাহায্য করেছেন এবং সাহায্য নিয়েছেন।

জাতীয় তদন্তকারী সংস্থা (এন আই এ) শুক্রবার থেকে তদন্ত শুরু করেছে। বর্ধমানে তারা শনিবারই তদন্ত শুরু করতে পারে। আর, ভবানী ভবন থেকে বর্ধমান জেলা পুলিসের কাছে যে বার্তা পৌঁছেছে, তাতে জানা যাচ্ছে শুধু খাগড়াগড় নয়, এন আই এ-র নজরে রয়েছে মঙ্গলকোট-কেতুগ্রাম-নানুর-কীর্ণাহারের করিডোরও। এদিনই মঙ্গলকোটের ভাটপাড়ায় একটি বিস্ফোরণ ঘটেছে। খবর পেয়েই জেলা পুলিস ছুটেছে। এন আই এ পৌঁছানোর আগে রাজ্য পুলিসের এই তৎপরতা কেন? এ প্রশ্নও উঠেছে।

মঙ্গলকোট এই উগ্রপন্থা কাজের ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি কেন্দ্র। আপাতত তৃণমূলের দুই গোষ্ঠীর প্রবল দ্বন্দ্ব সত্বেও মঙ্গলকোট ব্লকের নিয়ন্ত্রক এখন বোলপুরের সেই অনুব্রত ওরফে কেষ্ট মণ্ডল। ব্লকের সদর মঙ্গলকোট পঞ্চায়েত এলাকায়। এখানেই থানা এবং পঞ্চায়েত সমিতির অফিস। এবং গত ২০১১ থেকে মঙ্গলকোট পঞ্চায়েত এলাকাটিতে তৃণমূল ছাড়া আর কোনও দলের পতাকা তোলা, টাঙানো নিষিদ্ধ। অনেক বামপন্থী কর্মী ঘরছাড়া। এমনকি কেষ্ট মণ্ডলের বিরোধী গোষ্ঠীর হওয়ার কারণে আজাদ নামে এক তৃণমূল দুর্বৃত্ত এলাকাছাড়া হয়েছিল। থাকছিল নানুরে। সম্প্রতি বোলপুরে তৃণমূল অফিসের সামনে থেকে সে অপহৃত হয়। পরে তার লাশ উদ্ধার হয়। গোয়েন্দাদের অনুমান, মঙ্গলকোট-কেতুগ্রাম-নানুর-কীর্ণাহার জুড়ে চলতে থাকা বিশেষ কোনও তথ্য ফাঁস করে দেওয়ার হুমকি দিয়েছিল দীর্ঘদিন অনুব্রত মণ্ডলের লোকজনের অত্যাচারে টিকতে না পারা আজাদ। কী সেই তথ্য? আজাদ খুন হয়ে গেলেও, এন আই এ নানুর-কেতুগ্রাম-মঙ্গলকোটে ঠিকমতো তদন্ত করতে পারলে, সেই রহস্য ভেদ করতে পারবে বলেই রাজ্যের গোয়েন্দাদের একাংশের আশা। রাজ্য পুলিসের এই অংশটি মূলতঃ তৃণমূল নেতাদের মাতব্বরি, জুলুমে বীতশ্রদ্ধ। কিন্তু ‘চাকরি রক্ষার’ তাগিদে নীরব।

এই গোয়েন্দাদের মতে বাদশাহী রোডের বৈশিষ্ট্য এবং গত কিছুদিন ধরে এই রাস্তার কাছাকাছির গ্রামগুলিতে ঘটে চলা ঘটনা বিশ্লেষণ ছাড়া খাগড়াগড় বিস্ফোরণকাণ্ডের প্রকৃত সত্য, উগ্রপন্থীদের তৎপরতার মাত্রা জানা যাবে না। বর্ধমানে বাদশাহী রোডের কাছেই উগ্রপন্থীদের তিনটি ডেরার হদিশ মিলেছে। খাগড়াগড়ে যেখানে বিস্ফোরণ ঘটেছিল, সেখান থেকে বাদশাহী রোডের দূরত্ব বড়জোর দশ মিনিটের। বর্ধমান শহরের এই এলাকাটিতে তৃণমূল ছাড়া অন্য কোনও রাজনৈতিক দলের কাজকর্ম করতে দেয় না পুলিস, শাসকদল। এই এলাকাটির দখল রয়েছে মূলতঃ মেহবুব, সেলিম, বাদশা-র হাতে। সেলিম স্থানীয় কাউন্সিলর।

এর পরের এলাকা বর্ধমান সদর। বর্ধমান সদরের দেওয়ানদীঘি। বিধানসভা নির্বাচনের পরেই রাস্তার উপরে এখানে তৃণমূলীরা খুন করেছিল দুই পার্টিনেতা প্রদীপ তা’ এবং কমল গায়েনকে। তারপর থেকে আশঙ্কাই সঙ্গী এলাকাটির। উল্লেখ্য, ওই দুই নেতা দীর্ঘদিন খাগড়াগড়, মাঠপাড়া এলাকায় পার্টির প্রতিদিনকার কাজের উদ্যোগ, বিভিন্ন আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। আপাতভাবে তাঁদের খুনের সঙ্গে তৃণমূলের এলাকা দখল ছাড়া আর কিছুর প্রত্যক্ষ যোগাযোগের প্রমাণ মেলে না। কিন্তু ওই বাদশাহী রোডের ধারে ওই এলাকা থেকে সি পি আই(এম)-কে পিছু হটাতে না পারলে অস্ত্র চালান কিংবা বিস্ফোরক বয়ে নিয়ে যাওয়ার কাজে কিছুটা অসুবিধা হওয়ার সুযোগ থাকে! এটাও একটা কারণ হতে পারে ওই দুই নেতা খুনের।

বর্ধমান সদর পেরিয়ে কিছুটা যাওয়ার পর নরজা মোড়। এখান থেকেই মঙ্গলকোট, কেতুগ্রাম, নানুর-কীর্ণাহার হয়ে মুর্শিদাবাদের দিকে এগিয়ে গেছে বাদশাহী রোড। মঙ্গলকোট এখন মমতা ব্যানার্জির প্রিয় অনুব্রত মণ্ডলের দখলে। মঙ্গলকোটের কাছেই শিমুলিয়া। সেখানে গ্রামের ভিতরে ধান খেতের মধ্যে এক রহস্যময় ‘মাদ্রাসা’ গড়ে তুলেছিলেন তৃণমূল কর্মী বোরহান শেখ। সেখানে মাদ্রাসার কোনও পোস্টার, প্ল্যাকার্ড নেই। গ্রামের কোণায়, কিছুটা আড়ালে মাটির ঘর। ঘরগুলি তোলা হয়েছে ধান খেতের আল ছুঁয়ে। চারিদিকটি ঘেরা। বাইরে থেকে বোঝাই যায় না যে, এখানে কেউ থাকে কিংবা পড়াশোনা হয়। গ্রামবাসী ইউনিস শেখ জানালেন, ৪০-৪৫টি বাইরের ছোট মেয়ে এখানে থাকতো। ৫জন পুরুষ এবং ২জন মহিলা শিক্ষক ছিলেন। মাঝেমাঝে বাইরে থেকে চার পাঁচজন শিক্ষক আসতেন। মাদ্রাসার জমিটি দিয়েছিলেন বোরহান শেখই। তার স্ত্রীও মাদ্রাসায় পড়াতেন। তবে ছেলেদের মাদ্রাসার ধারেকাছে ঢুকতে দেওয়া হত না। ২রা অক্টোবর খাগড়াগড়ের ঘটনার পরই সবাই উধাও হয়ে গেছে। পুলিস যদিও এসেছিল ৬ তারিখ।’’ প্রসঙ্গতঃ শিমুলিয়ার এই অদ্ভুত মাদ্রাসা চালানো বোরহান শেখের কাকা ডালিম শেখ ওই এলাকার তৃণমূলের সর্বেসর্বা। আর পঞ্চায়েতটি বলা বাহুল্য, তৃণমূলই জোর করে, ভোট লুট করে জিতেছে গত নির্বাচনে।

উল্লেখ্য, মঙ্গলকোটের কুলসোনায় পুলিস উগ্রপন্থীদের তৎপরতার সূত্র পেয়েছে। জামাতপন্থীদের যাতায়াত ছিল সেখানে। সেই কুলসোনা আবার ভাল্যগ্রামে। এই ভাল্যগ্রামেই খুন হয়েছিলেন সি পি আই (এম)-র নেতা ফাল্গুনি মুখার্জি। ২০০৯-র ওই ঘটনার পর থেকেই তৃণমূলীদের আতঙ্ক বিস্তার শুরু হয় মঙ্গলকোটে। সেই সুযোগে কুলসোনায় পৌঁছেছে উগ্রপন্থীরা।

মঙ্গলকোট পেরিয়েই অজয়ের উপর সেতু। ওপারে কেতুগ্রাম। কেতুগ্রামের যাবতীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণের মালিক শাহনাওয়াজ খান। তিনি তৃণমূলের বিধায়ক। তার ভাই কাজল শেখের কর্তৃত্ব কায়েম রয়েছে নানুর, কীর্ণাহারে। কেতুগ্রাম হলো সেই জায়গা, যেখানে ২০০৯ থেকে ১৪জন সি পি আই (এম) কর্মী শহীদ হয়েছেন।

সি পি আই (এম) নেতা অচিন্ত্য মল্লিকের কথায়,‘‘বাদশাহী রোড তো তখনও ছিল। যখন বামফ্রন্ট সরকারে ছিল, এই সব এলাকায় সব রাজনৈতিক দলের নিজেদের কথা বলার সুযোগ, অধিকার ছিল। আমাদের আন্দোলন, কর্মসূচীর কারণে আমরাই মানুষের কাছে বেশি গ্রহণীয় ছিলাম। আতঙ্ক সৃষ্টি করা হয়েছিল, খুন করা হয়েছিল আমাদের দুর্বল করতে। লাভ হয়েছে কাদের, কারা ঘাঁটি করার সুযোগ পেয়েছে, এখন সবাই দেখছেন। সন্ত্রাস, একাধিপত্যের সুযোগ নিয়েছে উগ্রপন্থীরা।’’

কেতুগ্রাম লাগোয়া নানুর। বীরভূম আর বর্ধমান এখানে মিশেছে।

কীর্ণাহার নানুরে। রাষ্ট্রপতি কীর্ণাহারের বাড়িতে উপস্থিত থাকাকালীনই উগ্রপন্থীরা কাজ করেছে, তার প্রমাণ তো ইতোমধ্যেই মিলেছে। কিন্তু কাজল শেখ-শেখ শাহনাওয়াজের খাস তালুক নানুর-কীর্ণাহারে কী করে নিজেদের ডেরা বানালো উগ্রপন্থীরা? নানুর পেরিয়েই ঢুকে পড়া যায় মুর্শিদাবাদে। বড়ঞা হয়ে বেলডাঙ্গা যাতায়াত করেছে দুষ্কৃতীরা এই তথ্যও পেয়েছেন গোয়েন্দারা। তবে গোয়েন্দাদের একাংশ মনে করছেন বাদশাহী রোডের ধারে আরও কিছু ডেরা ছিল। যার হদিশ এখনও মেলেনি।

প্রাথমিকভাবে সি আই ডি-ও মনে করছে খাগড়াগড়, নবাববাগ, মাঠপাড়া, শিমুলিয়া, কুলসোনা, কেতুগ্রাম, কীর্ণাহার, বেলডাঙ্গা — প্রতিটি এলাকাতেই একেকটি ‘শেলটার’ তৈরি করেছিল উগ্রপন্থীরা। শিমুলিয়ায় যেমন চলতো প্রশিক্ষণ। সেখানে মিলেছে কম্পিউটার, বড় বড় ব্যাটারি, বিভিন্ন সিডি।

Advertisements

Tags: , , , , , , , , , ,

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s


%d bloggers like this: