India’s Casteism & Class Exploitation

জাতপাত ও শ্রেণী শোষণ

শ্যামল চক্রবর্তী

বর্তমান ভারতে বামপন্থী আন্দোলনের দুর্বলতা এবং শ্রেণী সংগ্রামের দুর্বলতার ফলে জাতপাতভিত্তিক আন্দোলন মাথা তুলেছে। এর পিছনে দেশের আভ্যন্তরীণ এবং আন্তর্জাতিক দু’টো কারণই আছে। আভ্যন্তরীণ কারণের মধ্যে আছে তিনহাজার বছরব্যাপী ভারতের জাতপাত ব্যবস্থা এবং উচ্চ বর্ণের দ্বারা নিম্ন বর্ণের অর্থনৈতিক ও সামাজিক শোষণ। নিপীড়িত জাতগুলোর কাছে বিচারের বাণী চিরকালই নীরবে, নিভৃতে কেঁদে গেছে। নিয়তিবাদ, জন্মান্তরবাদ এবং কর্মফল দর্শনের প্রভাবে মানুষ একেই অপরিহার্য বলে মেনে চলেছিলো। কিন্তু এর বিরুদ্ধে নিপীড়িত মানুষ মুষ্টিমেয় অত্যাচারী শোষকের বিরুদ্ধে একত্রিত হতে পারেনি। তার কারণ, প্রথমতঃ রাষ্ট্রশক্তি যা রাজধর্মের নামে ব্রাহ্মণ ও ক্ষত্রিয়রা পরিচালিত করতো। দ্বিতীয়তঃ নিম্নবর্গের একই জাতের মানুষের মধ্যে বহু উপ-বিভাগ ছিলো এবং আছে। একই জাতের উপবিভাগগুলির পরস্পরের মধ্যে সামাজিক আদান-প্রদান, বিবাহ বা বলা চলে জলচল ছিলো না। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে উত্তর-আধুনিক মতবাদ খণ্ড খণ্ড পরিচিতি সত্তার দর্শন নিয়ে অগ্রসর হয়েছে। আন্তর্জাতিক ফিনান্স পুঁজি ও তাদের পরিচালিত সংবাদমাধ্যম এবং এন-জি-ও পরিচিতি সত্তার নামে বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীকে খণ্ড, ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন করে দিচ্ছে। পরিচিতি সত্তার নামে শ্রেণী ধারণাকে গুলিয়ে দেওয়া হচ্ছে। ফলে জাতপাতভিত্তিক আন্দোলনের নেতাদের মধ্যে অনেকেই তার শ্রেণীসত্তার কথা ভুলিয়ে দিয়ে নিজের নিজের জাতের উন্নয়ন, এবং জাতভিত্তিক বৈষম্যের অবসান এবং সমান অধিকার চাইছেন।

বিকাশের আকাঙ্ক্ষার মধ্যে অন্যায় কিছু নেই। কিন্তু শ্রেণী শোষণের অবসান না হলে জাতপাতভিত্তিক শোষণেরও যে অবসান হয় না, এই ধারণা ভুলিয়ে দেওয়া হচ্ছে। বিহার ও উত্তর প্রদেশে জাতপাতভিত্তিক সরকার হয়েছিলো কিছু কিছু জাত-উপজাতের সমন্বয়ও হয়েছিলো কিন্তু সবই হয়েছিলো নির্বাচনকে সামনে রেখে। কৃষিক্ষেত্রে বা শিল্পক্ষেত্রে কোনো ক্ষেত্রেই শ্রেণী শোষণের অবসান বা কমানোর লক্ষ্যে আন্দোলন পরিচালিত হয়নি। বরং শোষণের আইনগুলো আরও জোরদার হয়েছে। এবং নিপীড়িত জাতপাতগুলোর মধ্যে একটি ছোট অংশ শোষকে রূপান্তরিত হয়ে গেছে। তা নাহলে দলিতদের মধ্যেকার অধিকতর অর্থনৈতিক,সামাজিক বৈষম্যের শিকার মানুষেরা মিলিত হয়ে মহাদলিত অংশ তৈরি করত না।সাধারণভাবে পুঁজিপতিরা পুঁজিবাদ বিকাশের পাশাপাশি জাতপাত ও সাম্প্রদায়িক বিভাজনকে উৎখাত করে থাকে কিন্তু তৃতীয় বিশ্বের অন্যান্য অনেক দেশের মতোই ভারতে পুঁজিবাদ সামন্ত্রতন্ত্রের সঙ্গে ক্ষমতার ভাগাভাগি করে চলেছে। এর ফলে প্রাক্‌-পুঁজিবাদী শ্রেণীগুলির অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সামাজিক দার্শনিক প্রভাবের আধিপত্য সমাজে বজায় থাকে। আমাদের দেশে তাই তিনহাজার বছরের জাতপাত ব্যবস্থা এখনো বহাল তবিয়তে চালু আছে এবং ধর্মীয় সংস্কারও বহাল তবিয়তে বিরাজ করছে।

ভারতে বিশেষ করে স্বাধীনতা-উত্তরকালে পিছিয়ে-পড়া মানুষের জন্য, বিশেষ করে বিভিন্ন জাতি উপজাতিগুলির ক্ষেত্রে যে বিভিন্ন রকমের সুযোগ-সুবিধাগুলি প্রবর্তন করা হয়েছে তা কিন্তু একেবারে তৃণমূল স্তরে সমানভাবে পৌঁছোয়নি। ওই সুবিধাগুলি প্রায় নিরঙ্কুশভাবে ভোগ করার ফলে একটা উচ্চ সুবিধাভোগী অংশ (ক্রিমি লেয়ার) তৈরি হয়ে গেছে। তারাই হয়ে পড়েছে ওই জাত-সমাজের প্রভাবশালী প্রতিনিধি। আর তাদের তলাকার অংশের মানুষের গা দিয়ে ওই তেল গড়িয়ে পড়ছে কিন্তু আলোটা নিচে পর্যন্ত পৌঁছচ্ছে না। এর পরিণতি হিসেবে দরিদ্রের নিচেও আর একটা অংশ তৈরি হয়ে গেল মহাদলিত নামে। রাজনীতির ময়দানে জাতপাতের মধ্যেকার বিভিন্ন বর্গগুলি নতুন নতুন রূপ নিয়ে বিশাল ব্যাপ্তি লাভ করেছে। জাত সম্পর্কে সচেতন হওয়া মানে কিন্তু কাস্টইজিম নয়, কিন্তু দেখা যাচ্ছে জাতপাত নিয়ে গবেষণার নামে শ্রেণীর ধারণাটি অদৃশ্য করে দেওয়া হচ্ছে।

নিম্নবর্গের মানুষ যখন এগোচ্ছে তখন দেখা যাচ্ছে এতদিন যারা তাদের চেয়ে উঁচু অবস্থাতে ছিলো এবং তার ফলে একচেটিয়া সুবিধা ভোগ করছিলো তারা সেটা মেনে নিতে চাইছে না।

বামপন্থী আন্দোলনের অনেক ঘাটতি আছে একথা ঠিক, কিন্তু জাতপাত নিয়ে এত কথা হলেও একমাত্র বামপন্থীরা এ কথা বলতে পারে যে জাতপাত আন্দোলনের বাস্তব ভিত্তি অবশ্যই আছে, কিন্তু এটা কখনোই শ্রেণী সংগ্রামের বিকল্প হতে পারে না। এজন্য আমাদের লড়াইটা হবে দ্বিমুখী। বিভিন্ন জাতি ও উপজাতি সমাজের দীর্ঘদিনের বৈষম্য থেকে উদ্ভূত অনেক দাবি আছে যা ন্যায্য ও গণতান্ত্রিক। কমিউনিস্টদের তা অবশ্যই সমর্থন করতে হবে। কিন্তু শ্রেণী সংগ্রামকে বাদ দিয়ে নয়। মার্কসবাদীরা সমাজের জাতপাতভিত্তিক শোষণের শিকার মানুষগুলোর ট্রাজেডির তৃপ্ত কথক হলে চলবে না। জাতিধর্ম নির্বিশেষে মেহনতী মানুষের ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের মূল ধারাকে ক্রমাগত শক্তিশালী করতে হবে। দেখা যাচ্ছে যে, আশির দশক থেকে জাতপাতের বিচ্ছিন্নতায় শ্রেণী সংগ্রামের মূল ধারা শ্লথ হয়ে যাচ্ছে।

উৎপাদনধর্মী কাজে যুক্ত শ্রমিকরা সাধারণত একসাথে গোষ্ঠীবদ্ধভাবে বাস করে কিন্তু লুম্পেনরা কোনো গোষ্ঠী তৈরি করে না। শ্রেণীবিচ্যুত এই লোকগুলো শ্রমিকশ্রেণীর বাইরে, জাতপাত বা ধর্ম, যেটাই হোক না কেন, একটা বিমূর্ত গোষ্ঠীর মধ্যে আটকে যায়। সাম্প্রদায়িক রাজনীতির সাথে যুক্ত হবার পর তাদের মধ্যে একটা কাল্পনিক বোধ তৈরি করে দেওয়া হয় যে তারাই প্রকৃত গোষ্ঠী এইভাবেই তাদের লুম্পেনজীবনে তাদের টিকে থাকার জন্য যে উগ্রভাবটা দরকার সেই উগ্রভাবটা জাতপাত,সাম্প্রদায়িক বা ফ্যাসিস্ট কায়দায় সংঘটিত রূপ পায়।

শূদ্রবর্ণের সৃষ্টি হলো কী করে ?

ঋক বেদের ( খ্রিস্টপূর্ব ১৫০০— খ্রিস্টপূর্ব ৫০০) প্রথম দিকে তিনটি সুস্পষ্ট শ্রেণী বিভাগের উল্লেখ পাওয়া যায়। তখন আর্যরা গ্রামাঞ্চলে বাস করত, লোহা আবিষ্কার হয়নি, দ্বিতীয় নগর সভ্যতা তৈরি হয়নি। উপরোক্ত তিনটে সামাজিক শ্রেণী ছিল ক্ষত্রিয় (রাজা, যোদ্ধা, শাসক), ব্রাহ্মণ (পুরোহিত) এবং বিশ্‌ (সাধারণ মানুষ)। তখন জমিতে ব্যক্তি মালিকানা ছিলো। কৃষকরাই জমির কামিক ছিল। আর্য ও প্রাক্‌ আর্যদের মধ্যে যুদ্ধে পরাজিতদের তাদের দাস হিসেবে ব্যবহার করা হতো, এমনকি তাদের দানও করা হতো। ঋকবেদ অনুযায়ী, বিভিন্ন গোষ্ঠীকে পরাজিত করে অথবা বশ্যতা স্বীকার করিয়ে আর্যরা তাদের দাস ও প্রজার সংখ্যা বৃদ্ধি করেছিলো। এদের মধ্যে তৈরি হয়েছিলো শূদ্র বর্ণ। বৈদিক যুগের প্রথম দিকে শূদ্রদের পদ মর্যাদা কী ছিলো সেছিলো সে বিষয়ে কোনো স্পষ্ট প্রমাণ মেলে না। কিন্তু বোঝা যায় তারা কৃষক ছিলো না। সমগ্র উপজাতির কাছে বা ব্যক্তি মালিকের কাছে তারা ছিলো দাস, খেতমজুর। তাদের ভূমিদাস বলেই মনে করা হতো। ( ডি ডি কোসাম্বী—ভারত ইতিহাসের ভূমিকা, পৃ: ৪১)। শ্রমবিভাজনই পরবর্তীকালে সামাজিক শ্রেণীগুলির ভিত্তি হয়ে ওঠে। আর্য এবং দাস এই দু‘টি বড় বড় জনগোষ্ঠী বদলে গিয়ে সামাজিক শ্রেণীতে পরিণত হয়।

চতুর্বণের উৎপত্তি সম্পর্কে প্রাচীনতম উদাহরণ আছে ঋকবেদের। পুরুষ সূত্রে ‘সৃষ্টি’ সংক্রান্ত অতিকথায়। মনে করা হয় ওই সংহিতার দশম মণ্ডলে এটি একটি প্রক্ষেপ অর্থাৎ পরবর্তীকালের সংযোজন। পরবর্তীকালেও বৈদিক রচনা মহাভারত, ধর্মশাস্ত্রে কিছু পরিবর্তন-সহ এটি পুনঃস্থাপিত হয়েছে। আর এস শর্মা এবং আরও অনেক বিশ্লেষকের মতে, এটি খ্রিস্টপূর্ব আট শতকের সংযোজন। ঋকবেদীয় পর্বে শ্রম বিভাজন অনেক এগিয়ে গিয়েছিলো। অনেকের মতে এটি আসলে ছিলো অথর্ববেদের আদিপর্বে, পরবর্তীকালে এটি ঋকবেদের দশম মণ্ডলে প্রক্ষিপ্ত হয় আর এস শর্মা শূদ্রস্ ইন ইন্ডিয়া। এই পুরুষ সূত্রে বলা হয়েছে, সৃষ্টির যিনি আদি পুরুষ তিনি ছিলেন বিশালদেহী। বংশবৃদ্ধির উদ্দেশ্যে তিনি একজন নারীকে সৃষ্টি করেন। তারপর তাদের সন্তান হয়, এই সন্তানরা ছিলেন দেবতা এবং একজন বিশাল পুরুষ। দেবতারা সেই বিশাল পুরুষকে বলি দিলেন। সেই পুরুষের মুখ থেকে যারা জন্ম নিলেন তাঁরা হলে ব্রাহ্মণ, বাহু থেকে জন্ম নিলো ক্ষত্রিয়, ঊরু থেকে বৈশ্য এবং পা থেকে শূদ্র। সমাজে তাদের স্থান হয়ে গেলো সেই ক্রমেই— সব থেকে উঁচু ব্রাহ্মণ, তারপর ক্ষত্রিয়, তারপর বৈশ্য আর সবার নিচে শূদ্র। শূদ্রের কাজ হবে উপরের তিনটি বর্ণের সেবা করা। পৃথিবীর সর্বত্র বৃত্তি বদলে নেওয়া যায়। কিন্তু ভারতে নেওয়া যেতো না এবং এখনো অনেক ক্ষেত্রে যায় না। জাত ব্যবস্থা শুধু ভারতেই চালু আছে। এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি।

পুরোহিত এবং ক্ষত্রিয়দের উদ্দেশ্য ছিলো যারা উৎপাদক তাদের কাছ থেকে উদ্বৃত্ত কেড়ে নেওয়া। এজন্য তারা প্রয়োজনীয় সামাজিক চেতনা তৈরি করে এবং তাতে ধর্মীয় লেবেল লাগিয়ে দেয়। তাদের স্থান নির্ধারণ করা হলো চতুর্থ বর্গে। ‘স্মরণাতীত কাল থেকে এই প্রথা চলে আসছে’ এই আপ্ত বাক্য সমাজে চালিয়ে দিয়ে মান্যতা দেওয়া হয়। তৎকালীন পরিস্থিতিতে এটা উৎপাদন বৃদ্ধিতে সাহায্য করে। গোটা প্রক্রিয়াই ধর্মের নামে চালানো হয়। এর ফলে অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ ও বিদ্রোহের সম্ভাবনাকে চেপে দেওয়া যায়। কর্মফল এবং নিয়তিবাদ এই জাতীয় দর্শনের আমদানি করে শোষিত মানুষকে মানিয়ে নেওয়ার পথ প্রশস্ত করে দেওয়া হয়।

পুরোহিত এবং ক্ষত্রিয়দের পক্ষে মানানসই এই ব্যবস্থা শোষণের পথকে সহজতর করে দিয়েছিলো। কারণ, জন্মসূত্রেই সব মানুষকে পূর্বপুরুষদের সামাজিক অংশে অঙ্গীভূত করা বাধ্যতামূলক হয়ে গেলো। চেষ্টা করলেও কেউ পূর্ব-পুরুষদের বৃত্তি পরিবর্তন করতে পারতো না। তাকে ওই বৃত্তি গ্রহণ করতেই হতো। এর ফলে তার দর কষাকষির ক্ষমতা ছিলো না। শ্রেণী শোষণ এবং শোষিত মানুষের তা’ ধর্মের নামে মেনে নেওয়া– এমন সুবন্দোবস্ত শাসকশ্রেণী বিশ্বের কোথাও করতে পারেনি।

বৌদ্ধ ধর্মের প্রসার এবং বিদেশীদের বসতি স্থাপনের ফলে তৎকালীন সামাজিক কাঠামো ভেঙে পড়ে। ব্যবসা-বাণিজ্যের মাধ্যমে নগর-জীবনের প্রসার ও বিস্তারের ফলে মানুষে মানুষে বিনিময়, সংযোগ এবং চলাচলের বৃদ্ধির ফলে জাতি ব্যবস্থার ভিত্তি টলে গিয়েছিলো। জাতকে হিন্দু সমাজের যে ছবি উপস্থাপিত হয়েছে দেখা যায় যে ব্রাহ্মণদের অবস্থার অবনতি হয়েছিলো, ক্ষত্রিয় এবং মধ্যবর্তী শ্রেণীগুলিরও বংশগত পেশা অবলম্বন বাধ্যতামূলক ছিলো না এবং পেশা বদলানো সাধারণ ঘটনা ছিল না। পণ্য উৎপাদনের দ্রুত বৃদ্ধির সাথে যে সমাজ সয়ংক্রিয়ভাবে এগিয়ে চলে তার বুকে জাতি ব্যবস্থা গভীর শিকড় গড়তে পারে না। মগধ রাষ্ট্রের কৃষি উদ্যোগ রাষ্ট্রীয় মালিকানার ধাক্কায় প্রাচীন ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়েছিলো। এই সময় বৌদ্ধ জৈন আজীবক ইত্যাদি অনেকগুলি প্রভাবশালী ধর্ম জন্ম নেয়। ফলে জাতিবাদ দুর্বল হতে থাকে। দ্বিতীয় নগর বিপ্লবের পর খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় শতাব্দী পর্যন্ত নগর জীবনের ক্রমাগত উন্নতির সঙ্গে সাত-আটশো বছরে উত্তর ভারতে এই সার্বিক পরিবর্তন আসে। অনুমান করা যেতে পারে ব্রাহ্মণদের প্রভাবশালী অংশ নবোদিত নগর সভ্যতার সঙ্গে নিজেদের খাপ খাওয়াতে পুরোপুরি সফল হয়নি। কিন্তু বৌদ্ধধর্ম দুর্বল হয়ে পড়ার সুযোগে আবার জাতিবাদকে কঠোর নিয়মে বাঁধা হয়। মনুসংহিতা সেই ঐতিহাসিক সময়ে সৃষ্ট ও পরিপুষ্ট।

গৌতমবুদ্ধ ছিলেন যুক্তির আদর্শের প্রতীক। আর মনুসংহিতা হলো জাতপাত ব্যবস্থা দৃঢ় করার জন্য কু-যুক্তি তৈরির তত্ত্ব।

প্রাচীন ভারতে ধর্মশাস্ত্রকারদের তালিকায় মনুর নাম সর্বপ্রথম। মনুস্মৃতি ধর্মশাস্ত্রকারদের মধ্যে প্রধান বলে গণ্য হয়। এর সময়কাল নিয়ে সন্দেহ আছে। বেশিরভাগ গবেষকদের মত অনুযায়ী, মনুস্মৃতি লেখার সময়কাল আনুমানিক ২০০ খ্রিস্ট পূর্বাব্দ থেকে ২০০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে। পরবর্তীকালে যে ধর্মশাস্ত্রগুলি রচিত হয়েছিলো তা মনুস্মৃতিকে অবলম্বন করেই। এর রচয়িতা একজনই কিনা তা নিয়ে সন্দেহের অবকাশ আছে।

মনুর বিধান : চার বর্ণ সম্পর্কে

খ্রিস্টীয় প্রথম সহস্রাব্দের প্রথম দিকে বৌদ্ধ ধর্মের প্রভাব ক্ষীয়মান হওয়ার ফলে ব্রাহ্মণ্য ধর্ম আবার জাঁকিয়ে বসার সুযোগ পায়। এই সুযোগে জাতিভেদ প্রথা দৃঢ় করার উদ্দেশ্যে মনু-সংহিতা রচনা করা হয়। পুরুষতান্ত্রিক সমাজের বন্ধন দৃঢ় করার লক্ষ্যে মহিলাদের সম্পর্কেও বিধি নিষেধ জারি করা হয়।

‘সৃষ্টিকে রক্ষা করবার জন্য মহানন্দময় প্রভু তার মুখ, বাহু, ঊরু ও পদযুগল থেকে উত্থিত বিভিন্ন শ্রেণীর জন্য ভিন্ন নির্দিষ্ট কর্তব্য করেছেন।’

শিক্ষা প্রদান, অধ্যয়ন, যাগ-যজ্ঞাদি অনুষ্ঠান, অন্যের দ্বারা যাগ-যজ্ঞাদি অনুষ্ঠান করানো, উপহার দেওয়া ও গ্রহণ করা— এই কর্মগুলোকে তিনি ব্রাহ্মণদের উপর অর্পণ করেন।’

‘জনগণকে রক্ষা করা, সম্পদ বিতরণ করে দেওয়া, যাগ-যজ্ঞাদির অনুষ্ঠান করা, ব্যবসা-বাণিজ্য, সুদী কারবার ও কৃষি এগুলিই হলো বৈশ্যদের বৃত্তি।’

‘ঈশ্বর শূদ্রদের জন্য একটাই কর্ম নির্দিষ্ট করেছেন তা হলো কোনোরকম ক্ষোভ ব্যতীত উপরোক্ত তিন শ্রেণীকে সেবা করা’।

দিব্য পুরুষের শ্রেষ্ঠতম অঙ্গ থেকে (মুখ) সৃষ্টি হওয়ার জন্য, তার প্রবীণতার জন্য ও বেদকে রক্ষা করার দায়িত্বের জন্য ধর্ম অনুয়ায়ী ব্রাহ্মণই হচ্ছে এই সমগ্র সৃষ্টির প্রভু।

ব্রাহ্মণ কীভাবে সৃষ্টিকে রক্ষা করবে ? জাতপাতের ঘৃণা (বিশেষ করে শূদ্রদের বিরুদ্ধে) কেমনভাবে তৈরি হবে, উচ্চ বর্ণের মানুষ কী সুবিধা পাবে, নিম্ন বর্ণের মানুষের ওপর কেমন অত্যাচার চালাতে পারবে মনু সংহিতার ছত্র ছত্রে তা লেখা লেখা হয়েছে।

এইরকমই কয়েকটা মাত্র মণিমুক্তা উদ্ধৃত করা হলো (সূত্র : ‘দ্য ল-জ অব মনু’-র অনুবাদ ওয়েনডি ডুনিগার ও ব্রায়ান কে স্মিথ)।

১) ২৭০ নং ধারা, ‘যদি কোনো দ্বিজকে কোনো নিম্নবর্ণের মানুষ কটু কথা বলে, তাহলে তার জিহ্বা কেটে নেওয়া হবে’। (পৃ: ১৮১)।

কিন্তু যদি কোনো দ্বিজ নিম্নবর্ণের মানুষকে কটু কথা বলে তাহলে দ্বিজ-প্রবরের কী হবে? কিছুই না। কারণ ওটা তার জন্মগত অধিকার।

২) ২৭১ নং ধারা, ‘যদি কোনো নিম্ন বর্ণের মানুষ উচ্চ বর্ণের মানুষের নাম বা জাত ধরে কুৎসা করে তাহলে দশ আঙুল লম্বা একটা গরম শলাকা তার গলার মধ্যে ঢুকিয়ে দেওয়া হবে’। (পৃ : ১৮১)। আর যদি উল্টো‌টা হয়, বিচারের প্রশ্নই আসে না। ওটা তো উচ্চবর্ণের জন্মগত অধিকার।

৩) ২৭২ নং ধারা, ‘যদি নিম্নবর্ণের মানুষ কোনো পুরোহিতকে তার সম্পর্কে নির্দেশ দেওয়ার মতো ঔদ্ধত্য দেখায় তাহলে রাজা তার মুখ এবং কানে গরম তেল ঢেলে দেবে’ (পৃ : ১৮১)।

৪) ২৭৯ নং ধারা, ‘নিম্নজাতের কোনো মানুষ উচ্চতর স্তরে কোনো মানুষকে আঘাত করে তবে তার শরীরের সেই বিশেষ অংশ কেটে ফেলা হবে।’

৫) ২৮০ নং ধারা, ’নিম্নবর্ণের কোনো মানুষ যদি উচ্চবর্ণের মানুষের আসনে বসার চেষ্টা করে তবে তার নিতম্বে ছাপ দেওয়া হবে অথবা নিতম্ব কেটে নেওয়া হবে।’

৬) ৩৬৬নং ধারা, ‘কোনো নিম্নবর্ণের মানুষ উচ্চবর্ণের কোনো মেয়ের প্রতি প্রণয়াসক্ত হয় তবে তার মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হবে’

৭) ৪১৭নং ধারা, ‘একজন পুরোহিত তার ভৃত্যের (স্বভাবতই নিম্নবর্ণের) জিনিসপত্র নিতে পারবে, কারণ ভৃত্যের নিজস্ব কিছু থাকবে না। সবই তার প্রভু নিতে পারবে।

৮) ১২৯নং ধারা, ‘ক্ষমতা বা যোগ্যতা থাকলেও একজন ভৃত্য সম্পদ জমাতে পারবে না, কারণ সে সম্পদের মালিক হলে পুরোহিত বিরক্ত হবে‘ (পৃ : ২৫০)।

ব্রাহ্মণ্য সমাজ বেঁচে ছিলো রাজন্যবর্গের দান-ধ্যান, বৈশ্য ও শূদ্রদের শ্রম আত্মসাৎ করে। কিন্তু একজন ব্রাহ্মণ যে কায়িক শ্রম করবেন না তার একটা তত্ত্বগত ভিত্তি তো খাড়া করতে হবে। তাই মনুর বিধান, ‘‘(কেউ কেউ) কৃষিকর্মকে চমৎকার বলে মনে করেন, কিন্তু জীবনধারণের এই উপায়টাকে পুণ্যবানরা নিন্দা করেন। লোহার বর্শামুখ সংবলিত কাষ্ঠ নির্মিত হল ভূমিকে এবং ভূমিতলে অবস্থিত জীবদের আহত করে।

কেমন চমৎকার যুক্তি। আমি কৃষিকাজের ফল ভোগ করবো। ভাত-রুটি-ডাল খাবো কিন্তু কৃষিকাজ নিন্দনীয় বলবো। কেন নিন্দনীয় বলবো? কারণ, লাঙলের ফলা ভূমিতলে অবস্থিত জীবদের আহত করে। আমি জীবের মাংস খাবো কিন্তু তাদের আহত করার নিন্দাও করবো।

রাজধর্ম প্রসঙ্গে বলা আছে মনু সংহিতা কেমন শ্রেণী সচেতনভাবে রাজার জন্য শূদ্রদের বেগার খাটানোর সুযোগ করে দিয়েছে। আবার বেগার খাটানোর বিধি ব্যবস্থাও করে দিয়েছে। জোঁক, বাছুর ও মৌমাছি যেমন একটু একটু করে রক্ত, দুধ ও মধু পান করে তেমন রাজাও একটু একটু করে কর আদায় করবে। (সপ্তম অধ্যায় ১২৯)। যারা খেটে-খাওয়া মানুষ তারা স্বভাবত করদানে অসমর্থ; তারা বিনা মজুরিতে একদিন করে রাজার কাজ করে দেবে। রাজা পাচক, কর্মকার, স্বর্ণকার এবং গায়ে খেটে খাওয়া শূ্দ্রদের মাসে একবার বিনা বেতনে কাজ করিয়ে নেবেন। (সপ্তম অধ্যায় ১৩৮)।

তাই দলিতরা যে সামাজিক ও অর্থনৈতিক দু’টো বৈষম্যের শিকার এই সত্যকে ভুলে গেলে চলবে না। শুধু শ্রেণী সংগ্রাম অথবা শুধু সামাজিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে সংগ্রাম পরিচালিত করার চেষ্টা হলে সংগ্রামের স্রোতপথ দারিদ্র্য ও সামাজিক বৈষম্যের মরুভূমিতে বিলীন হয়ে যাবে তাই প্রয়োজন প্রত্যেকটা জাতি উপজাতি এবং তাদের উপ-বিভাগ সমূহের দাবিগুলির মধ্যে ন্যায্য ও গণতান্ত্রিক দাবিগুলির ভিত্তিতে তাদের সঙ্গে ঐক্যবদ্ধ সংগ্রাম গড়ে তোলা। আবার একই সঙ্গে শ্রেণী সংগ্রামের দাবিগুলির মধ্যে সামাজিক শোষণের অবসানের জনপ্রিয় দাবিগুলিকে ঐক্যবদ্ধ করে সংগ্রাম পরিচালিত করা।


সৌজন্যেঃ গণশক্তি

Advertisements

Tags: , , , , , , , , ,

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s


%d bloggers like this: