Dadri Lynching: A Challenge To Cultural Diversity

দাদরি : বহুত্ববাদের সামনে চ্যালেঞ্জ

মইনুল হাসান

দাদরির ঘটনা দেশবাসীর জানা হয়ে গেছে। দাদরি পরবর্তী সময়টুকু আমাদের আলোচনার জন্য বরাদ্দ করেছি। তবে একবারও ভুলে যায়নি আখলাকের বাড়ির বারান্দায় যখন তার নিথর দেহটি পড়েছিল তখন তার কিশোরী কন্যা সাজিদা কি বলেছিল। ‘‘মাত্র কয়েকদিন আগে ঈদ হলো। বাড়িতে বিরিয়ানি হয়েছিল অনেক। খুশবু বের হচ্ছিল দারুণ। পাড়াপ্রতিবেশী বন্ধুরা খেয়ে গেল প্রতিবারের মতো। তাদের মধ্যে বেশিরভাগই অমুসলমান। ৪ দিন বাদে তাদেরই কেউ কেউ আমাদের বাড়ি চড়াও হয়ে বাবাকে মিথ্যা কারণে খুন করলো। আমি নিশ্চিত, তাদের অনেকের হাত থেকে তখনও ঈদের দিনের বিরিয়ানির খুশবু শুকিয়ে যায়নি।’’ এই কথার কোনো উত্তর ভূ-ভারতে কারও কাছে আছে? বাচ্চা মেয়েটি ঠিকই তো বলেছে, মাংসটা গবেষণাগারে নিয়ে গেছে কিসের মাংস জানার জন্য। কি লাভ! আখলাক কি ফিরে আসবে? গবেষণাগার অবশ্য আখলাকের দাবি-র সপক্ষে প্রমাণ দিয়েছে।

(২)

দেশের ঐক্য, সহনশীলতা, গণতন্ত্র এবং ধর্মনিরপেক্ষতার সামনে এটা একটি নেতিবাচক ঘটনা তাতে কারো সংশয় থাকার কথা নয়। কিন্তু পরবর্তী সময়কালে সরকারের নেতা, মন্ত্রী, সাংসদ বা বিধায়করা যা করে চলেছেন তাতে আতঙ্কিত হবার যথেষ্ট কারণ আছে। বিশিষ্ট মন্ত্রী অরুণ জেটলি বললেন, ‘আখলাকের হত্যার মতো ঘটনায় ভারতের নাম ডুবছে এবং বদনাম হচ্ছে। এমন হওয়া উচিত নয়’। এমনভাবে কথাটি বলা হলো যে, ভারতের নাম ডুবে যাওয়া ছাড়া একজন নিরপরাধ বয়স্ক মানুষকে পিটিয়ে মেরে ফেলার ব্যাপারটিতে আর কোনো চিন্তার বিষয় নেই। সাংসদ তরুণ বিজয় যা বলেছেন তাতে আমি স্তম্ভিত। আমার দৃঢ় বিশ্বাস অনেকেরই আমার মতো অবস্থা হয়েছে। তিনি বলেন, ‘কোনো প্রমাণ ছাড়া কেবলমাত্র সন্দেহ করে এমন ঘটনা নিতান্তই দুর্ভাগ্যজনক’। তাহলে যুক্তি এটাই যে, প্রমাণ থাকলেই এমনভাবে পিটিয়ে মেরে ফেলতে কোনো অসুবিধা নেই।

এলাকার সাংসদ এবং দেশের সংস্কৃতি মন্ত্রী প্রথম থেকেই বিষয়টিকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা, ভুল বোঝাবুঝি’র ফল ইত্যাদি বলে কাটিয়ে দিতে চেয়েছেন। সর্বশেষ বলেছেন যদি আখলাকের বাড়িতে হামলা হয় তাহলে তার কিশোরী কন্যা অক্ষত থাকলো কি করে? মন্ত্রী মহোদয়ের অনুশোচনা এটাই যে পূর্বপরিকল্পনা থাকা সত্ত্বেও কন্যাটিকে জল্লাদরা অক্ষত রাখলো কেন? আর আখলাকের মৃত্যুটি মায়া ছাড়া কিছুই নয়। আসলে দি‍ল্লির সরকারি মহলে তড়িঘড়ি পড়ে গেছে কে সবচাইতে আগে এবং সবচাইতে ঘৃণ্য ভাষায় এবং কাজে দেশের সহনশীলতা ও ধৈর্যের উপর আঘাত করতে পারে। এমন অশ্লীল পরিস্থিতি ভারতবর্ষ আগে কোনোদিন দেখেনি।

এরপর মারাত্মক ঘটনা ঘটেছে জম্মু ও কাশ্মীর বিধানসভায়। লানগেট থেকে নির্বাচিত একজন বিধায়ক ইঞ্জিনিয়ার শেখ রশিদ বিধায়ক আবাসের লনে ‘বিফ ফেস্ট’-এর আয়োজন করেন। সবাই জানেন গোরুর মাংস নিষিদ্ধ করার বিষয়টি এই রাজ্যে সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত গড়িয়েছে। উচ্চ আদালত সব দিক বিচার করে নিষিদ্ধ করার যে নির্দেশ নিম্ন আদালত দিয়েছিল তাকে ২ মাসের জন্য স্থগিত করে দিয়েছে। শেখ রশিদের আমন্ত্রণে অনেকেই এসেছিলেন সেই উৎসবে। পরের দিন তিনি যখন বিধানসভা কক্ষে ঢুকছেন তখন বি জে পি বিধায়করা তার উপর চড়াও হয় এবং নির্মমভাবে মারধর শুরু করে। বিধানসভার রক্ষী বাহিনী না থাকলে দেশ আর একজন ‘আখলাক’ সেদিনই পেয়ে যেত।

বি জে পি’র টি‍‌কিটে অনেকেই সাংসদ হয়েছেন যারা যোগী অথবা সাধু। সাধারণত অহিংসা তাদের অন্যতম অস্ত্র। হঠাৎ তারা এমন হিংস্র হয়ে উঠেছেন যা কল্পনারহিত। সাক্ষী মহারাজ বলছেন, ‘গো-মাতা রক্ষার জন্য তিনি খুন করবেন, অথবা খুন হবেন।’ যোগী আদিত্যনাথের তো কথাই নেই। এমন অশ্লীল ভাষা যোগীজী(!) ব্যবহার করেন যা লেখা যায় না। শোনার আগেই কানে আঙুল দিতে হয়।

(৩)

এতসব ঘটনার মধ্যে একটি রুপালি রেখা দেখা গেছে ১নং রাইসিনা হিলে। ছোট্ট একটি অনুষ্ঠান। রাষ্ট্রপতি’র উপরেই লেখা বই প্রকাশের অনুষ্ঠান। সেখানেই রাষ্ট্রপতি বললেন, বহুত্ববাদ এবং সহনশীলতা ভারত রাষ্ট্রের মর্মবস্তু। বললেন, দেশের সাংস্কৃতিক বহুত্ববাদকে রক্ষা করতে পারলেই দেশ এগিয়ে যাবে। জর্ডনের একটি সংবাদপত্রে সাক্ষাৎকার দিয়ে রাষ্ট্রপতি সাংস্কৃতিক বহুত্ববাদ রক্ষা করার কথা বলেছেন। এই হট্টমেলার ঋতুতে সেটা ভারতবাসীর কম পাওনা নয়। এরই সূত্র ধরে আমাদের আবার ফিরতে হবে কতকগুলো পুরানো কিন্তু সতত সজীব ‘ডিসকাসে’। একটি গণতান্ত্রিক দেশে ব্যক্তির অধিকার কি? আমি একজন সাধারণ ভারতবাসী। কারও প্রতি কোনোরকম হিংসা বিদ্বেষ না ঘটিয়ে নিজের ইচ্ছামতো বাস করতে পারবো কিনা? আমার নিজের মতো বাঁচার এবং চলবার অধিকার থাকবে কিনা? আখলাকের ঘটনাতে এই প্রশ্নগুলিই আবার বেশি বেশি করে সামনে এসে গেছে। ধর্মীয় বিশ্বাস অথবা ধর্মীয় আচরণের আগে বিবেচ্য হতে হবে ব্যক্তির গণতান্ত্রিক অধিকার। আমার রান্নাঘরে দারোগাগিরি করার অধিকার কারও নেই! এই মৌলিক কথাটিতে রাজ্য-কেন্দ্র অথবা যে কোনো রাজনৈতিক দল সকলকে নিশ্চয়তা দিতে হবে।

এই নিশ্চয়তা প্রথম দিতে হবে রাষ্ট্রের প্রধানকে। প্রধানমন্ত্রী। তিনি প্রথমে বিদেশ ভ্রমণে ব্যস্ত ছিলেন। সেখান থেকেই জল মাপতে শুরু করেছেন। কারণ বিহারে ভোট আছে। প্রধানমন্ত্রীর প্রতি মাসে পালা করে পুরানো আমন্ত্রণপত্র খুঁজে বিদেশ ভ্রমণের কর্মসূচি ঠিক করা এখন দিল্লির অলিন্দে হাসি-মশকরার ব্যাপার হয়েছে। তাতেও কোনো বিনিয়োগ নেই। সরকারি খরচে বিদেশে ‍‌হিন্দু মহাসভা বা আর এস এস-র সভা করছেন। দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয় নিয়ে অযৌক্তিকভাবে মুখ খুলছেন। আর নাটকীয় ভঙ্গিতে জানতে চাইছেন ‘বলুন, আমি সবার চাইতে বেশি কাজ করছি কিনা?’ সবাই হাততালি দিচ্ছে। এটাতেই প্রধানমন্ত্রীর আনন্দ। এসব না করে দেশে তার নন্দীভৃঙ্গীরা যে কাণ্ড করে বেড়াচ্ছে তা যদি সামলাতেন তাহলে আখলাক বেচারাকে বেঘোরে প্রাণ দিতে হতো না।

দেশের ধর্মনিরপেক্ষতা রক্ষা করার শপথ গ্রহণ করার পর মন্ত্রীরা কার্যভার নেন। কারও দ্বারা প্রভাবিত হয়ে দেশের মূল সূত্র বহুত্ববাদকে নষ্ট করবেন না – প্রতিশ্রুতি দেন। কিন্তু তাদের দ্বারাই দেশের এমনতর মূল্যবোধগুলি বেশিরভাগ ক্ষেত্রে আক্রান্ত হচ্ছে। সেটা জম্মু-কাশ্মীর প্রসঙ্গেই হোক, ধর্মান্তরকরণই হোক, গির্জার উপর আক্রমণই হোক। কেউই রাষ্ট্রের প্রধান দ্বারা নিরস্ত্র অথবা সমালোচিত হচ্ছেন না। সামগ্রিক সমস্যার মূল কেন্দ্রটি এখানেই নিমজ্জিত। দাদরির ঘটনাতে গোমাংস খাবার নৈতিকতা, প্রাচীন ভারতের ইতিহাস, কারা কারা এই মাংস খেতেন তারই পক্ষে বিপক্ষে তুমুল বিতর্কে অনেকেই লিপ্ত। সেটাই প্রধান আলোচ্য বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই কারণেই হয়তো ‘বিফ ফেস্ট’ আয়োজিত হচ্ছে, কলেজের মধ্যে গোমাংস ভক্ষণ করে কলেজ থেকে বহিষ্কৃত হচ্ছে। দু’দিন পরেই এই হুজুগ বন্ধ হয়ে যাবে। তখন আখলাকের নামটাও কেউ সহজে মনে আনতে পারবে না। বিষণ্ণতায় ডুবে যাবে তার সংসারটি। রেখে যাওয়া ৭০ বছরের মা প্রতিদিন সন্ধ্যায় মগরবের নমাজের শেষে ছেলের নামে দোয়া করতে গিয়ে ডুকরে কেঁদে উঠছে।

কিন্তু যে প্রশ্নগুলো আখলাকের মৃত্যু আমাদের সামনে এনে দিয়েছে তারই জন্য বিতর্ক জরুরি। সমাধানের দাবি আরও দৃঢ় করাটা যুক্তিসঙ্গত। এই নারকীয় ঘটনা যে আইন সমর্থন করে না সেটা জোরের সঙ্গে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। সমগ্র বিষয়টি আইনশৃঙ্খলার দিক দিয়ে কড়াভাবে দেখতে হবে। এই কাজে যুক্ত যারা তাদের কঠিন শাস্তিদান অত্যন্ত জরুরি। সবকিছু অপেক্ষা করতে পারে, কিন্তু হত্যাকারীদের গ্রেপ্তার করাটা বিলম্ব করা মানে দেশের আইনকে অবমাননা করা। এক্ষেত্রে ইতিমধ্যে প্রশাসন এবং বি জে পি যে ভূমিকা পালন করেছে সেটা ন্যক্কারজনক এবং হৃদয় কেঁপে ওঠার মতো। যাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে তারা বেশিরভাগই নাবালক। আর বি জে পি, যারা গ্রেপ্তার হয়েছে তাদের যে কোনো উপায়ে ছা‍‌ড়িয়ে আনার চেষ্টায় ব্রত। ভারতবর্ষ একটা গণতান্ত্রিক দেশ, বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশ। রাষ্ট্রপুঞ্জের নিরাপত্তা পরিষদে তার একটা স্থায়ী আসন থাকতে হবে, এ দাবি বহু দিনের এবং ন্যায্যদাবি। কিন্তু উলটোদিকের প্রশ্নটিকে ফেলে দেওয়া যাচ্ছে না। নিজের দেশের মাটিতে একটুখানি আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করবার ক্ষমতা কেন ভারতের নেই। দিনকে দিন ভারত যে এই অন্ধকার ও মূঢ়তার দিকে অগ্রসর হচ্ছে সেটাকে অস্বীকার করবে কি করে?

(৪)

এতগুলো কথা হয়তো বলার প্রয়োজন হতো না যদি দেশটা পঞ্চদশ শতাব্দীতে থাকতো। দেশটা একবিংশ শতাব্দীতে আছে আর বিশ্বজুড়ে প্রধানমন্ত্রী ‘ডিজিটাল ইন্ডিয়ার’ কড়া ভাষণ দিয়ে যাচ্ছেন তখন ‘পুতিগন্ধময়’ বিষয়গুলোতে নজর না দিয়ে উপায় নেই। কারণ, আর যাই হোক, যখন প্রচারের চকচকে রাংতাটি সরিয়ে ফেললে গো-ময় ভারত তার যাবতীয় দুর্গন্ধ নিয়ে হাজির হবে তখন ডিজিটাল ইন্ডিয়ার নাগাল পাওয়া মুশকিল বলেই আমার মনে হয়। যে আধুনিক ভারতের স্বপ্ন আমরা দেখি তার সঙ্গে বাস্তবের তফাৎটি বিশ্রী রকমের বিশাল তা মনে না রেখে উপায় নেই। কেবল মনে রাখছেন না প্রধানমন্ত্রী। আধুনিকতার নাম করে দেশের রন্ধ্রে রন্ধ্রে যে হিংসার বাস পাকাপাকিভাবে হতে যাচ্ছে, ক্লীবতার ঘরবাড়ি পোক্ত হয়ে উঠছে, প্রধানমন্ত্রী সেটা দেখেও দেখছেন না। অবলীলাক্রমে এসব কিছুকে নগ্নভাবে প্রশ্রয় দিয়ে যাচ্ছেন।

আমার এ বিশ্বাস ক্রমেই দৃঢ় হচ্ছে যে, ধর্মীয় বিদ্বেষ বলে আমাদের সকলের জানা যে ‘চেনা ছক’ আছে তার মধ্যে ঘটনাগুলি ফেলে দেওয়া যায় না। যদি ফেলে দেওয়া যেত তাহলে অনেকেই হিমেল বাতাসের পরশ গায়ে লাগিয়ে বেশ খানিকটা স্বস্তিবোধ করতে পারতেন সন্দেহ নেই। কিন্তু সেটা ঠিক নয়। সমগ্র ঘটনার পিছনে আছে একটি দানবীয় শক্তি যার নাম রাজনীতি। ক্ষমতার রাজনীতি। যা অত্যন্ত আধুনিক। এটি একটি ক্লেদাক্ত তত্ত্ব যা নিজেদের সাময়িক স্বার্থ মেটাবার জন্য ধর্মীয় বা যে কোনো সামাজিক কার্যক্রমকে ব্যবহার করতে ইতস্তত করে না। দাদরি ঘটনাতেও এই রাজনীতি কাজ করেছে। যেমন করেছিল মুজফ্‌ফরনগরের ঘটনায়।

সুতরাং এমনতর ঘটনাগুলিকে সামাজিক রোগ বলে সমগ্র দায়টি সমাজের কাঁধে ফেলে দিয়ে পথ খোঁজাটা নৈতিক দিক দিয়ে অন্যায় হবে। শুধু তাই নয়, নৈতিক অধিকারই নেই। আখলাক হত্যার মীমাংসা সেই কারণে প্রশাসনকে যেমন করতে হবে, রাজনীতিকদের নিজেদের দায়িত্ব নিতে হবে। প্রথম দায়িত্ব নিতে হবে প্রধানমন্ত্রীকে। কারণ তিনি রাষ্ট্রের প্রধান। তা ছাড়া যে সংগঠনের তিনি প্রচাক, তারই সভ্যরা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এমন জঘন্য কর্মে রত। ‘গুরুভাই’দের দায়িত্ব তিনি অস্বীকার করতে পারেন না। তাই সামাজিক রোগ বলে অন্তত তিনি এড়িয়ে যেতে পারবেন না। কিন্তু তাঁর সময় নেই। বেশিরভাগ সময় বাইরে। যতটুকু সময় দেশে থাকেন সেই সময় ঘনঘন পোশাক পরিচ্ছদ পালটাতে, ‘মন কী বাত’ বলতে আর ২/৪টে জনসভায় নাটকীয় ভাষণ দিতেই ফুরিয়ে যায়! প্রধানমন্ত্রীও অস্বীকার করতে পারেন না। আখলাক শহীদ হয়েছে। কিন্তু এই প্রশ্নগুলো রেখে গেছে, যার উত্তর প্রধানমন্ত্রীকেই দিতে হবে।

(৫)

ভারতের শাসন কেন্দ্রে বসে থাকা কেষ্টুবিষ্টুরা অনেকেই মনে করেন দেশের গণতন্ত্র, বহুত্ববাদ, সহনশীলতা, ধর্মনিরপেক্ষতা কেবল কথার কথা। এগুলোর নাকি বাস্তব জীবনে কোনো মূল্য নেই। আজকে তাদের কাছে সুবর্ণ সুযোগ এসেছে ভারতকে ‘হিন্দুরাষ্ট্রে’ পরিণত করার। ইতিহাসের শিক্ষা এবং তার ধারাবাহিকতা তাদের কাছে মূল্যহীন। প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকেই এব্যাপারে উৎসাহ পেয়ে যাচ্ছেন তারা। তা নইলে, দাদরির ঘটনাতে প্রধানমন্ত্রী ১৫ দিন পর মুখ খুললেও কড়া নিন্দা করতে পারেননি। দোষীরা শাস্তি পাবে এই সহজ সত্য কথাটি বলতে পারেননি। এমন কি রাষ্ট্রপতির কড়া প্রতিক্রিয়ার পরও তার হেলদোল নেই। বিহারের জনসভার ভাষণ তারই প্রমাণ। এব্যাপারে তিনি যা বলেছেন তাতে ধর্মীয় মেরুকরণ আরও স্পষ্ট হয়ে গেছে।

ভারত একটা নানা মত, নানা ধর্ম-বিশ্বাসের দেশ। সব মতের প্রাধান্য এবং মর্যাদা ব্যতিরেকে দেশ ঐক্যবদ্ধ থাকতে পারে না। বি জে পি বা আর এস এস-এর লোকরা গায়ের জোরে, লোকসভাতে সংখ্যা গরিষ্ঠতার জোরে সব কিছুকে পালটে দিতে চায়। ভারতের সংস্কৃতিকে হিন্দু সংস্কৃতি বলে চালাতে চায়, এই মিশ্র সংস্কৃতির দেশে সেটা করতে গেলে অনেক রক্ত যে ঝরাতে হবে এবং তা অসম্ভব  – এটা বোঝার মতো সাধারণ বুদ্ধির অভাব হয়েছে হিন্দুত্ববাদীদের।

সম্প্রতি আর একটি ঘটনা সারা দেশের মানুষের নজর কেড়েছে। এক সন্তান সম্ভাবনা মুসলমান মায়ের কথা। সেদিন রাত্রে হঠাৎই মায়ের তীব্র প্রসব যন্ত্রণা শুরু হয়েছে। স্বামীটি প্রথমে এটা ওটা করে, ওষুধ দিয়ে ব্যথা কমাবার চেষ্টা করেছে। হয়নি। ব্যথা আরও তীব্র। রাস্তায় নেমেছে তারা। একটু দূরে হাসপাতাল। গন্তব্য সেখানেই। কিন্তু কিছুদূর যাবার পর মা তখন চলৎশক্তিরহিত। বাধ্য হয়ে রাস্তার পাশে থাকা বিরাট গণেশ-মন্দিরের চাতালে শুইয়ে দিয়েছে মা-কে। তখন পুণ্যার্থীরা আসতে শুরু করেছে। বিশেষ করে মেয়েরা। স্বামীটি তো ভয়ে কাঁটা। কি জানি কি হবে! পুণ্যার্থী মেয়েরা কিন্তু বুঝে গিয়েছে কি হয়েছে এবং কি হতে যাচ্ছে। প্রধান পুরোহিত বাইরে এসে দেখেন এমন কাণ্ড। তিনি তাড়াতাড়ি পুজো দিতে আসা মায়েদের প্রয়োজনীয় নির্দেশ দিয়ে ভিতরে গেলেন। পুণ্যার্থী মায়েরা তাদের গায়ের ওড়না খুলে অস্থায়ী ‘লেবার রুম’ করে ফেললেন। তার মধ্যে নিয়ে গেলেন মা-কে। স্বামীটি অবাক হয়ে দেখছে। একটু পরেই সদ্যোজাত শিশুর কান্নার শব্দ পাওয়া গেল। পুণ্যার্থী মায়েদের হর্ষধ্বনি। মন্দিরের ঘণ্টা বেজে উঠেছে জোরে, আরও। মুসলমান মায়ের সন্তান জন্ম নিল গণেশ মন্দিরে। মন্দিরের বাইরের রাস্তায় পিতা তখন আজান দিচ্ছে সন্তানের জন্য। পরবর্তী ঘটনাটি আরও মজার। পুত্রসন্তান। মা আদর করে তার নাম রেখেছেন ‘গণেশ’

চিরদিন ভারত এই ঐতিহ্য ও সহনশীলতা বহন করে যাচ্ছে। আখলাক হত্যার মতো ঘটনার পরও তা অক্ষুণ্ণ থাকবে। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে – দেশের শাসকবর্গ নিজ রাজনৈতিক স্বার্থে সেটাকে নষ্ট করতে চাচ্ছে। মাত্র দেড় বছরের শাসনকালে এত দাঙ্গা হবে, এত রক্ত ঝরবে, এত হিংসা ছডিয়ে পড়বে, আগুন জ্বলবে কেউ ভা‍‌বেনি। সামাজিক ক্ষেত্রে এই বিশৃঙ্খলার জন্য দায়ী কেন্দ্রের সরকার। মানুষের কাছে তাদের জবাবদিহি করার সময় এসেছে।

আবার পুরানো কথাতেই ফিরে আসি। বহুত্ববাদ সারা পৃথিবীতে একটি প্রধান আলোচ্য বিষয়। মানুষ সেটাকেই জীবন চর্চার মাধ্যম হিসাবে গ্রহণ করেছে। ধর্ম যদি ক্রমাগত মানুষের পরিচয় নির্দিষ্ট করে দিতে থাকে বা দেওয়ানোর চেষ্টা হয় তাহলে যে কোনো সমাজের সুস্থিতি নষ্ট হয়ে যাবে। এই অবস্থা নিয়ে একটা সমাজ চলতে পারে না। আমাদের দেশের প্রধান শক্তি হচ্ছে দীর্ঘকাল থেকে ভারতের মাটিতে প্রোথিত এই সহনশীলতা আর ঐক্য। রবীন্দ্রনাথ বলেছেন – ‘বিবিধের মাঝে দেখ মিলন মহান…’। ঝড়-ঝাপ্টা এর উপর দিয়ে বয়ে গেলেও মূল সুরটি এখনও অক্ষত আছে।

সব মানুষের সক্রিয় উদ্যোগ ছাড়া বহুত্ববাদ কার্যকর হতে পারে না। সব অংশের মানুষকে, জাতি, ধর্ম, বর্ণ, রাজনীতি নির্বিশেষে রাস্তায় নেমে দেশের ঐক্য রক্ষার কাজে নিয়োজিত হতে হবে। ভারতের কাছে সেটাই হবে ইতিবাচক পদক্ষেপ।

Advertisements

Tags: , , , , , , , , , ,

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s


%d bloggers like this: