Those Nostalgic Pujor Gaan

পুজোর গান ও সেইসব জলসার দিন

সে একটা দিন ছিল, আজ নেই। রাতের আকাশ চিরে বেজে উঠত গান। আর মুহূর্তে বদলে যেত পরিবেশ। ভেসে আসছে হয়ত, ‘সেদিনের সোনাঝরা সন্ধ্যা, আর এমনি মায়াবি রাত মিলে/দুজনে শুধাই যদি তোমারে কি দিয়েছি/আমারে তুমি কিবা দিলে।’ তখন মধুক্ষরা শ্যামল মিত্র- দিন। একের পর এক কালজয়ী গানে সুর দিয়ে তাকে উপযুক্ত শ্রোতার কাছে পৌঁছে দেওয়াই ছিল যেন তাঁর ব্রত। না হলে কী করে সৃষ্টি হয়, ‘মহুল ফুলে জমেছে মউ/হিজল ডালে ডাহুক ডাকে/ওগো কালো বউ কোথায় তুমি যাও।’ অথবা ‘ও শিমুল বন, দাও রাঙিয়ে মন/কৃষ্ণচূড়া, দোপাটি আর পলাশ দিল ডাক/মধুর লোভে ভিড় জমালো মউ পিয়াসী অলির ঝাঁক।’ সবই ভিন্ন ভিন্ন পুজোয় পুজোর গান হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। আর কে ভুলতে পারে তাঁর গাওয়া ‘এমনও দিন আসতে পারে, যখন তুমি দেখবে আমি নেই—’ কিংবা ‘ঝিরি ঝিরি পিয়ালের কুঞ্জে’ অথবা ‘ছিপখান, তিন দাঁড়’। এরকম অজস্র গান।

প্রত্যেক পুজোতে বের হত নতুন নতুন গান বিভিন্ন শিল্পীর কণ্ঠে। উৎপলা সেন, সতীনাথ মুখোপাধ্যায় মাত করে দিতে লাগলেন বাংলার শ্রোতৃমণ্ডলীকে। সতীনাথের ‘সোনার হাতে সোনার কাঁকন কে কার অলঙ্কার’, ‘জীবনে যদি দীপ জ্বালাতে নাহি পার, সমাধি ’পরে মোর জ্বেলে দিও’ অথবা ‘বনের পাখি গায় বোলো না, বোলো না/ফাগুন রাতি শুধু ছলনা ছলনা।’…

উৎপলা সেন এক পুজোয় গাইলেন, ‘ঝিকমিক জোনাকীর দীপ জ্বলে শিয়রে’… ‘ময়ূরপঙ্ক্ষী ভেসে যায়/রামধনু জ্বলে তার গায়।’ শুধু গান আর গান প্রতি পুজোয়। আর অনুপম কণ্ঠের অধিকারী হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের তো কোনও তুলনাই নেই। এক পুজোয় যদি বাজে ‘ধিতাং ধিতাং বোলে, ওই মাদলে তাল তোলে’, তো অন্য পুজোয় বেজে ওঠে ‘পথ হারাব বলেই এবার পথে নেমেছি’। এইসব শ্রুতিমধুর গানে আবার সুর দিয়েছেন ‘সুরের গুরু’ সলিল চৌধুরি। যার কোনও তুলনা পরবর্তীকালেও দেখা যায়নি। এমনকি এখনও, এই ২০১৫ সালে, সুরের মধুঝরা নতুনত্বের সন্ধান মেলেনি।

সে সময়টাই ছিল যেন বাংলা গানের এক আশ্চর্য যুগ। একই সঙ্গে জলসারও যুগ। পুজোর পরেই শুরু হয়ে যেত জলসার দিন। পুজোয় বিসর্জন হল কী শুরু হল ওই মঞ্চে গানের আসর। প্যান্ডেল কখনও কখনও থাকত। ডায়াসে শুরু হত গানের শিল্পীদের মধুঝরা কণ্ঠের আলোড়ন–তোলা গান। গানের পর গান। শ্রোতারা একটি গান শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ‘আর একটা, আর একটা’ বলে চিৎকার করে উঠতেন। কখনও নির্দেশ যেত, ‘এই গানটা’। কাগজের স্লিপেও অনুরোধ যেত মঞ্চে। রাত্রি ১১টা, ১২টা, ১টা— গান চলছে। আসর জমজমাট। রাস্তাঘাট নির্জন হলেও কোনও ভয় ছিল না। সুবিধেমতো কেউ কেউ বা কয়েকজন মিলে একসঙ্গে রাস্তায় হেঁটে যেতেন। স্ত্রী–পুরুষ নির্বিশেষে সবাই। এইসব দিনকাল ছিল প্রধানত পঞ্চাশের দশকের শেষদিক থেকে ষাটের দশকের সবটা জুড়ে। পরে নানা কারণে কমে যায়।

আরও কে কে গাইত বা গাইতেন? শুনুন তবে। অখিলবন্ধু ঘোষ, আলপনা বন্দ্যোপাধ্যায়, গীতা দত্ত, তরুণ বন্দ্যোপাধ্যায়— কে নয়? ধনঞ্জয় ভট্টাচার্য ও দ্বিজেন মুখোপাধ্যায় ছিলেন এই সময়ের গানের রাজা। আমরা অপেক্ষা করে থাকতাম, এবার কী গান বেরবে পুজোয়! কারণ পুজোর সময় যত নতুন নতুন গান বের হত, অন্যসময় তা হত না। অল্প অল্প শীতের রেশ, ঝকঝকে রাত্রি, মাইকে ভেসে আসছে জলসার গান। ভেসে আসছে ধনঞ্জয় ভট্টাচার্যের আশ্চর্য গান: ‘মাটিতে জন্ম নিলাম, মাটি তাই রক্তে মিশেছে/ এ মাটির গান গেয়ে ভাই, জীবন কেটেছে।… মাটিতে জন্ম নিলাম…’ কখনও ভেসে আসত ‘ত্রিনয়নী দুর্গা, মা তোর রূপের সীমা পাই না খুঁজে।…’ হ্যাঁ, সিনেমার গান। যেমন সুর, তেমনই কণ্ঠ ও তার গায়কি! শুধু গান আর গান। ধনঞ্জয় ভট্টাচার্য এক আশ্চর্য শিল্পী। মাঝরাত্রি পার হয়ে গেছে, তিনি গান গাইছেন। শ্রোতায় শ্রোতায় ছয়লাপ। শুধু মানুষ আর মানুষের সমাবেশ। নিস্তব্ধ পরিবেশ। গানের সুর ও কণ্ঠের জাদুকরী আমেজ ছাড়া আর কিছু নেই।

রাস্তা দিয়ে শ্রোতারা দল বেঁধে হেঁটে যেতে যেতে অন্য একটি জলসার গান শুনতে পেতেন মাইকে ভেসে–আসা হাওয়ায়। দ্বিজেন মুখোপাধ্যায় ধরেছেন, ‘মন ছুটেছে তেপান্তরে দূর গাঁয়ে ধানক্ষেতের আলেরই ধারে ধারে/রাঙা মাটির ভুবনখানি যেথা পাখির কলতানে উছলে পড়ে’।… কিংবা ‘শ্যামলবরণী ওগো কন্যা/এই ঝিরঝির বাতাসে ওড়াও ওড়না/মেঘের অলক দোলায় কোথা যাও/কত হাসির ফোয়ারা তোমারই ঝরনা।’ অথবা ‘এই ছায়া ঘেরা কালো রাতে/স্তব্ধ ঝরা বেদনাতে/মিটিমিটি জ্বলে তারা আকাশের গায়, যেন কথা বলে কার সাথে।’ ভোলা যায় না অখিলবন্ধু ঘোষ গাইছেন, ‘পিয়ালশাখার ফাঁকে ওঠে একফালি চাঁদ বাঁকা ওই…।

সুরের মূর্ছনায় রাত্রি কেঁপে ওঠে। হেঁটে যেতে যেতে আবার শোনা যায় কোনও জলসার গান। ভেসে আসছে মাইকের গমগম আওয়াজে। সুপ্রীতি ঘোষ গান গাইছেন, ‘পদ্মকলি সকলে খোঁজে রাতের আকাশে তারা/তোমার খোঁজে আমার দুটি নয়ন দিশাহারা’ অথবা ‘আকাশ যদি না অত সুদূর হত/কত তারা যদি হত ফুলের মতো/তাহলে সে ফুলগুলি গেঁথে মালিকায়/উপহার দিতাম তোমায়।’ আর মৃণাল চক্রবর্তীর ‘যমুনা কিনারে শাজাহানের স্বপ্ন শতদল/শ্বেত মর্মরে মরমের ব্যথা বিরহীর অশ্রুজল/তাজমহল… তাজমহল।’ তুলনা নেই।

কত গান, কত পুজো পার হয়ে যেত। গান ফুরত না, পুজো ফুরত না। ঘুরে ঘুরে পুজো আসত, নতুন নতুন গানের সৃষ্টি হত। বস্তুত পুজো আসছে মানেই গান আসছে। এমনই দিন ছিল সেকালে। আনন্দে বয়ে যেত সুন্দর সময়। ঠিক কথা, সে ছিল গানের দিন। ওই সময়েই বাংলা সিনেমার গানের জগৎও ছিল আলাদা। না হলে এক আশ্চর্য সুর কথার সৌন্দর্যকে আশ্রয় করে কী করে বেজে উঠতে পারে, ‘গানে মোর কোন ইন্দ্রধনু আজ স্বপ্ন ছড়াতে চায়।’… হ্যাঁ, সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায় তাঁর অনুপম কণ্ঠলাবণ্যে রাত্রিকে ভাসিয়ে দিয়েছেন এক আশ্চর্য সুরের স্রোতে। সুর দিয়েছিলেন কে? অনুপম ঘটক।… সবচেয়ে বড় কথা, পুজোর গানগুলি প্রথমে প্রচার করত আকাশবাণী শনিবার ও রবিবার দুপুর দুটোর অনুরোধের আসরে

এক পুজোয় বের হল তরুণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের রেকর্ড। দু’পিঠে দুটি গান। ‘মোর মালঞ্চে বসন্ত নাইরে নাই/ফাগুন ফিরিয়া গেল তাই।’ সম্ভবত অন্যটা হল, ‘পৃথিবী আমারে চায়, রেখো না বেঁধে আমায়/ খুলে দাও প্রিয়া খুলে দাও বাহুডোর।’ তরুণ বন্দ্যোপাধ্যায় একের পর এক গান গেয়েছেন, কালজয়ী গান। ‘এক এক দিন মেঘ করে মন বলে হারিয়ে যাই, রূপকাহিনীর গল্প বলো শুনতে চাই।’ কিংবা ‘রূপকাঠি গাঁয়ে শ্যামলী মেয়েটি পথ চলে/হাওয়া ঝিরঝির, নদী ছলছল কথা বলে।’ অথবা যে অসাধারণ গানটি একদিন রাত্রি প্রায় দশটা– এগারোটায় দূরের রেডিও থেকে ভেসে এল, তা হল, ‘কাজল নদীর জলে ভরা ঢেউ ছলছলে, প্রদীপ ভাসাও কারে স্মরিয়া— সোনার বরণী মেয়ে বলো কার পথ চেয়ে আঁখি দুটি ওঠে জলে ভরিয়া।’… এই তরুণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের কত গান যে জনপ্রিয় হয়েছিল এবং এখনও তা সমান দাবি করে, তার হিসেব নেই। তারপর ‘চম্পা আমার ওগো শোনো, পারুলকুমার ডাকে তোমায়/ঘুমায়োনা, জাগো।’

এক পুজোয় প্রথম দিকে বেজে উঠল, শচীন দেববর্মণের ‘মন দিল না বঁধু, মন নিল যে শুধু/আমি কী নিয়ে থাকি।’… যেমন সুরের নতুনত্ব, তেমনই কণ্ঠসৌন্দর্যের নতুনত্ব। সব মিলে এক আশ্চর্য রাগাশ্রয়ী তানের ও তালের মনভোলানো উপহার। সারা বাংলা যেন নতুনত্বের স্বাদ পেল। সম্ভবত পঞ্চাশের দশকের শেষদিকে এই সংযোজন। শচীনকত্তার একের পর এক মোহ সঞ্চারকারী গান ও সুর। যেমন, ‘ঝিলমিল ঝিলমিল ঝিলের জলে ঢেউ খেলিয়া যায় রে/ঝিরঝিরঝির হাওয়ায় রে, ঢেউ খেলিয়া যায়।’ মনে পড়ে, তাঁর সর্বকালের এক সেরা গানের কথা। তা হল, সেই যে বাঁশি বাজানোর দিনগুলির মধ্যে ‘তাক দুম, তাক দুম বাজে, বাজে ভাঙা ঢোল,/ ও মন যা ভুলে যা কী হারালি ভোল রে ব্যথা ভোল।’ সুরের মূর্ছনা ছড়িয়ে পড়ে, মা দুর্গার বিসর্জনের পর শূন্য হৃদয়ের আকুতিতে। ভাঙা মন যেন সান্ত্বনা পায়। আরও কত গান এই প্রবীণ শিল্পী তৈরি করেছেন ও গেয়েছেন, তার হিসেব নেই।

এক পুজোয় হেমন্ত মুখোপাধ্যায় গাইলেন, ‘মাগো, আমরা তোমার শান্তিপ্রিয় শান্ত ছেলে,/তবু শত্রু এলে অস্ত্র হাতে ধরতে জানি।’ গাইলেন, ‘শোনো কোনও একদিন, আকাশ বাতাস জুড়ে রিমঝিম বরষায়/দেখি, তোমার চুলের মতো মেঘ সব ছড়ানো/চাঁদের মুখের পাশে জড়ানো/মন হারালো হারালো মন হারালো/সেইদিন।…’ হ্যাঁ, সুর? অবশ্যই সলিল চৌধুরি। যাঁর হাত ছিল ঈশ্বরদত্ত। হারমোনিয়াম বা পিয়ানো অ্যাকর্ডিয়ান যেন তাঁর কথা শুনে চলত।… আরও অনেক কথা বলা যায়, কিন্তু থাক।…

শেষে বলি, এখন পুজোর গান বলতে গেলে সেরকম বেরয় না বললেই চলে। বেরলেও কোনও উন্মাদনা নেই, আকর্ষণ নেই। অতীতের মতো সুরকার, গীতিকার ও কণ্ঠশিল্পীর বড় অভাব। আর, গানের জলসাই বা কোথায়? হাতে গুনে একটি–দুটি জায়গায়। স্থানীয় শিল্পীরাও তো নেই। উদ্যোক্তাও নেই। গানের সমঝদারের সংখ্যাও কমে আসছে। এখন টিভির নাচ–গানের অনুষ্ঠানে সবাই মগ্ন।


সৌজন্যেঃ আজকাল

Advertisements

Tags: , , , , , , , , , , , ,

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s


%d bloggers like this: