Jo Hill – A Deathless Life

মৃত্যুহীন গান

দেবাশিস চক্রবর্তী


joe-hill-with-quote

১৯১৫-র ১৯শে নভেম্বর ফায়ারিং স্কোয়াডে গুলি করে হত্যা করা হয়েছিল মার্কিন শ্রমিক আন্দোলনের সংগঠক, প্রতিবাদী সঙ্গীতের প্রবাদপ্রতিম কন্ঠ জো হিলকে। কিন্তু একশ বছর পরেও তিনি মৃত্যুহীন। মুক্তির স্বপ্নে দেখা দিচ্ছেন বারংবার।

যদি শ্রমিকরা মনে করে,

তারা থামিয়ে দিতে পারে ছুটন্ত সব ট্রেন;

সমুদ্রে ভাসতে থাকা সব জাহাজকে

বেঁধে ফেলতে পারে বিশাল শিকলে;

সমস্ত চাকা, সমস্ত খনি, সমস্ত কারখানা, সমস্ত নৌপোত,

সব দেশের যত সেনাবাহিনী

স্থির দাঁড়িয়ে যেতে পারে তাদের নির্দেশে।

নিশ্চিত মৃত্যুর কয়েকদিন আগে অন্ধকার এক কারাকক্ষে বসে লিখেছিলেন এক কবি- গীতিকার। তাঁর ডান হাত তখন ভাঙা, বুকে এক ক্ষত। ঘিরে ধরেছে রাষ্ট্র, তাঁকে বাঁচতে দেওয়া হবে না। বিচারের নামে প্রহসন শেষে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল তাঁকে: ফাঁসি না ফায়ারিং স্কোয়াড, বেছে নিতে পারেন তিনি শুধু এটুকুই। তখন লিখেছিলেন সেই ‌আশ্চর্য গান, কাঁপতে থাকা হাতে স্বরলিপিও। যে গানের শেষ স্তবকে লেখা ছিলো: ‘জাগো, দুনিয়ার শ্রমিক, জেগে ওঠো/ জাগো তোমার চমৎকার শক্তি নিয়ে/ তোমারই তৈরি করা সম্পদ নাও নিজেরই অধিকারে/ কেউ কাঁদবে না রুটির জন্য/ আমরা পাবো স্বাধীনতা, ভালোবাসা আর চনমনে শরীর/ যখন শ্রমিকের যৌথখামারে উড়বে মহান লাল পতাকা।’

১৯১৫-র ১৯শে নভেম্বর। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সল্ট লেক সিটি কারাগারের বন্দী জো হিলকে ফায়ারিং স্কোয়াডেই হত্যা করা হয়। তাঁর মুক্তির দাবিতে উত্তাল একের পর এক শহর। জো’র শেষ ইচ্ছা মেনে তাঁকে দাহ করা হয়েছিল। সেই ছাই নিয়েই মিছিলের ঢেউ ওঠে শিকাগো থেকে উটা। আমেরিকার শ্রমিক আন্দোলনের লড়াকু সংগঠক, প্রতিবাদী সঙ্গীতের অন্যতম আদিপুরুষ জো হিল। রেলকর্মী থেকে তামার খনির ধর্মঘট সংগঠিত করার অপরাধে জো হিলকে শত্রু চিহ্নিত করেছিল রাষ্ট্র। মুক্তি আর স্বাধীনতার নামে গড়ে ওঠা মার্কিন ভূখন্ডে হে মার্কেটের রক্তস্নান, জো হিলকে ফায়ারিং স্কোয়াডে দাঁড় করিয়ে গুলি।

কিন্তু জো মরলেন না। তাঁর মৃত্যুর দশ বছর পরে আলফ্রেড হেস কবিতায় লেখেন: ‘কাল রাতে জো হিলকে আমি স্বপ্নে দেখেছি/ যেন আমার-তোমার মতোই জীবন্ত/ আমি বললাম, তুমি তো দশ বছর আগেই মৃত/ আমি কোনোদিনই মরিনি, বললো সে।’ তিরিশের দশকে আর্ল রবিনসন এই কবিতায় সুরারোপ করেন। শ্রমিক আন্দোলনের অন্যতম প্রিয় গান হয়ে দাঁড়ায় তা। মৃত্যুহীন জো হিল। ‘দ্য ম্যান হু নেভার ডাইজ’। আরো পরে পল রোবসনের কন্ঠে, গিটার হাতে জোয়ান বায়েজের গলায়, পিট সিগার-বব ডিলান থেকে ব্রুস স্প্রিংস্টনের কণ্ঠে এই গান বেজে উঠেছে শ্রমিক মহল্লা থেকে সমস্ত রাস্তার লড়াইয়ে। এমনকি অকুপাই ওয়াল স্ট্রিটের জমায়েতেও বায়েজের এই গলা মেলালেন হাজার কন্ঠ। দুনিয়ার কত না ভাষায় তা অনূদিত হয়েছে শ্রমিকের চিরউড্ডীন পতাকারই গর্বের মতো।

************

জো হিল নাম পরে নেওয়া। জন্মেছিলেন জোয়েল ইমানুয়েল হাগাল্যান্ড নামে, সুইডেনের গাভলেতে। ১৮৭৯-র ৭ই অক্টোবর। জো-রা ছিলেন নয় ভাইবোন। বাবা রেলওয়ে কন্ডাক্টর, নিম্নবিত্ত। রক্ষণশীল ও ধর্মপ্রাণ পরিবারে জো বড় হয়েছিলেন সঙ্গীতকে সাথী করেই। বাবা-মা সঙ্গীতে উৎসাহ দিতেন। খুব ছোটবেলাতেই জো অর্গান, বেহালা, অ্যার্ডিয়ন ও গিটার বাজানো শিখেছিলেন। জো’র যখন ৮বছর, তাঁর বাবা কর্মস্থলেই দুর্ঘটনায় আঘাত পান, তা থেকে তাঁর মৃত্যুও হয়। অথৈ জলে পড়া পরিবারের প্রায় সকলকেই কোনো না কোনো উপার্জনের সন্ধানে বেরিয়ে পড়তে হয়। এমনকি ছোট্ট জো-কেও। দড়ির কারখানায় কাজ নিয়েছিলেন তিনি। সেখানেই যক্ষ্মা হয়, দীর্ঘ সময় লাগে সুস্থ হতে। ফের জাহাজঘাটায় শ্রমিকের কাজ শুরু করেন জো, রাতে স্থানীয় কাফেতে পিয়ানো বাজাতেন। গাভলের সেই জাহাজঘাটাতেই শ্রমিক সংগঠনে যুক্ত হয়ে যান।

১৯০২-এ জো’র মা মারা যান। পরিবারও বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। বিংশ শতাব্দীর সূচনালগ্নে তখন কাজের সন্ধানে ইউরোপ থেকে অসংখ্য পরিযায়ীর স্রোত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অভিমুখে। শিল্পের বিকাশ হচ্ছে আমেরিকায়, নতুন প্রযুক্তি চাইছে শ্রম। পাড়ি দিলেন জো। ১৯০২-র অক্টোবরে ভাই পলের সঙ্গে জো পৌঁছোলেন নিউ ইয়র্কে। প্রথমে নাম নিয়েছিলেন জোশেফ হিলস্ট্রম, পরে জো হিল। যে নামে দুনিয়া তাঁকে চিনবে।

হাজার হাজার অভিবাসীর শ্রমে তখন গড়ে উঠছে আমেরিকার কারখানা, ভরে উঠছে গমের খেত। তেমনই একজন জো। এই জীবনের কয়েক বছরের খুব নির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যায় না। তবে প্রথমে তিনি নিউ ইয়র্কে কুলির কাজ করতেন, রেস্তোঁরায় পিয়ানো বাজাতেন। কখনও রেলপথ নির্মাণের শ্রমিক, কখনও এমনকি খেতেও কাজ করেছেন বলে পরবর্তী সময়ে পরিচিতদের টুকরো টুকরো স্মৃতিচারণে পাওয়া গেছে। ১৯০৬-এ সান ফ্রান্সিসকোয় বড় ভূমিকম্প হয়েছিল। জো তখন ওখানেই ছিলেন, এমনকি এক সুইডিশ পত্রিকায় তার বিবরণও লিখেছিলেন।

জো শ্রমিক আন্দোলনের সংগঠক হয়ে ওঠেন ধীরে ধীরে। জো ছিলেন ইন্ডাস্ট্রিয়াল ওয়ার্কার্স অফ দি ওয়ার্ল্ড (আই ডব্লিউ ডব্লিউ)-র সদস্য। এই সংগঠন গড়ে ওঠে শিকাগোয়, ১৯০৫-র জুন মাসে। ‘কন্টিনেন্টাল কংগ্রেস অফ দি ওয়ার্কিং ক্লাস’ শিরোনামে এক কনভেনশন থেকে এই সংগঠনের জন্ম। প্রথম আন্তর্জাতিকের সঙ্গে যুক্ত ইন্টারন্যাশনাল ওয়ার্কিং পিপলস অ্যাসোসিয়েশন তখন প্রায় ভেঙে পড়েছে। তবে শিকাগোর কনভেনশনে তাদের সংগঠকরা অন্যতম উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেছিলেন। ছিলেন খনি শ্রমিকদের সংগঠনের নেতারা, সোস্যালিস্ট লেবার পার্টির নেতারাও। আই ডব্লিউ ডব্লিউ-র নেতৃত্বে আমেরিকার বিভিন্ন প্রান্তে শুরু হয় শ্রমিক বিক্ষোভ, ধর্মঘট। ১৯০৬-এ গোল্ডফিল্ডে মজুরি ছাঁটাইয়ের বিরুদ্ধে ধর্মঘট ভাঙতে সেনাবাহিনী পাঠানো হয়েছিল। সে-বছরই নিউ ইয়র্কে জেনারেল ইলেকট্রিক কোম্পানিতে তিন হাজার শ্রমিক কারখানার ভেতরে থেকেই ধর্মঘট করেন। বলা হয়, সেটি ছিলো বিংশ শতাব্দীর প্রথম অবস্থান-ধর্মঘট।

১৯০৭-এ মেইনে বস্ত্রশিল্পে ধর্মঘট, পোর্টল্যান্ডে কাঠচেরাই মিলে ধর্মঘট, সান ফ্রান্সিসকোতে বেকারী শ্রমিকদের ধর্মঘট হয়। বস্তুত প্রথম পাঁচ বছরেই ধর্মঘটের ঝড় তুলে দিতে সক্ষম হয়েছিল আই ডব্লিউ ডব্লিউ। শুধু তারাই নয়, মার্কিন মজদুর তখন ক্ষোভে ফুটছিলো, তাঁদের সাহস বাড়ছিল। সেইসঙ্গে মালিক ও রাষ্ট্রের আক্রমণও বাড়ছিলো। ১৯১২-তে কালিফোর্নিয়ার বাজায় কিছুদিনের জন্য অভ্যুত্থান এবং বাজা কমিউন তৈরি করেছিলেন শ্রমিকরা। জো হিল সেই কমিউনের শ্রমিকদের পাশে দাঁড়িয়ে লড়েছিলেন। ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যাচ্ছে, বিরাট আকারের ধর্মঘটে তখন বস্ত্রশিল্প থেকে খনি, রেলওয়ে কর্মী থেকে গাড়ি কারখানার শ্রমিকরা কাঁপিয়ে দিয়েছেন মার্কিন ভূখন্ড। ১৯১২-তে গ্রেট নর্দান এবং গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক লাইনের রেলপথ নির্মাণের শ্রমিকদের ধর্মঘটের কথা উল্লেখ করে রাখা যেতে পারে। সেই ধর্মঘটে শ্রমিকদের পিকেটিংয়ের দৈর্ঘ ছিলো ‘এক হাজার মাইল’। জো হিলের গানে এবং তাঁকে নিয়ে লেখা গানে বারবার ফিরে এসেছে এই উত্তাল দিনের কথা। জো হিলও এক ধর্মঘট থেকে আরেক ধর্মঘট গড়ে তুলতে ঘুরে বেড়িয়েছেন। সান পেড্রোয় আই ডব্লিউ ডব্লিউ-র সম্পাদক হন তিনি, আবার ব্রিটিশ কলম্বিয়ায় ফ্রেজার রিভার ধর্মঘটে যোগ দিয়েছিলেন।

******************

সেই সময়ের শ্রমিক আন্দোলনের বিশেষ করে আই ডব্লিউ ডব্লিউ-র আন্দোলনে গানের ভূমিকা ছিলো খুবই উল্লেখযোগ্য। এর কারণও ছিলো। চলচ্চিত্র, রেডিওর আগের যুগে বিনোদনের, ক্ষণিকের শান্তি-স্বস্তিরও বড় মাধ্যম ছিলো গান। শ্রমিক মহল্লায়, বা মার্কিনী পরিভাষায় স্কিড রোডের পাশে শ্রমিক বসতিতে এসে ব্যালাড শোনাতেন খ্রীষ্টান প্রচারকরা। অভিবাসী শ্রমিকরা তাঁদের বিশেষ লক্ষ্য ছিলো। তাদের, বিশেষ করে স্যালভেশন আর্মির অনেক গান জনপ্রিয় ছিলো। শ্রমিক আন্দোলনের সংগঠকদের কেউ কেউ সেই গানের সুরেই, প্যারোডির মতো করে লড়াইয়ের বিদ্রোহের বার্তা ছড়িয়ে দিতেন। জো হিলের প্রথম দিকের অনেক গানই এইরকম ‘প্যারোডি’। আই ডব্লিউ ডব্লিউ-র ছিলো গানের বই। ইশ্‌তেহারেও লেখা থাকতে গান। শৈশব থেকে গান-বাজনা ভালোবাসা জো হিলের কাছে এ ছিলো এক আদর্শ পরিবেশ।

জো’র প্রথম স্বীকৃত গান ‘দি প্রিচার অ্যান্ড দি স্লেভ’ ১৯১১-তে প্রকাশিত হয়। তবে তার আগে থেকেই তা মুখে মুখে ঘুরছিল। স্যালভেশন আর্মির জনপ্রিয় গান ‘সুইট বাই অ্যান্ড বাই’-এর কায়দায় লেখা সেই গানে ছিলো: লম্বা চুলের প্রচারকরা আসে রোজ রাতে / কী ঠিক আর কী ভুল চেষ্টা করে বোঝাতে/ কিন্তু যদি প্রশ্ন করি কিছু খাবার পাওয়া যাবে?/ খুবই মিষ্টি গলায় তারা জানাবে:/ (কোরাস) তোমরা খাবে এখন নয় পরে/ আকাশের ওপরে ওই যে দারুণ জায়গায়/ এখন শুধু কাজ করো আর প্রার্থনা, থাকো খড়ের গাদায়/ মারা গেলেই নিজের খাবার মিলবে এই ‌আশায়। (সাধারণ অনুবাদ, ছন্দ ছাড়াই)। তীক্ষ্ণ কটাক্ষ করে স্যালভেশন আর্মির পরোক্ষ উল্লেখে এই গানে বলা হয়েছিল, স্টারভেশন আর্মির সামনে ওরা গান গায়, যতক্ষণ না পয়সা পড়ছে থালায়। গানের উপসংহারে বলা হচ্ছে: ‘সব দেশের শ্রমজীবী এক হও/ স্বাধীনতার জন্য এসো পাশাপাশি লড়ি/ যখন এই বিশ্ব আর তার সম্পদ আসবে আমাদের হাতে/ এই ঘুষদাতাদের আমরা বলবো:/ (কোরাস) তোমরা খাবে এখন নয় পরে/ যখন শিখবে রান্না শিখবে ভাজতে/ কাঠ কাটতে শেখো, এতে ভালোই হবে/ তোমরা একদিন পাবেই পাবে মিষ্টি’। শ্রমিকদের বশে রাখতে ধর্ম ও পরকালের মোহে আচ্ছন্ন রাখার বিরুদ্ধে ছুরির ফলার মতো ধারালো এই গান স্কিড রোডের মতাদর্শগত লড়াই।

একসময়ে রাস্তায় রাস্তায় শ্রমিক আন্দোলনের বক্তৃতা ও গানের এতোটাই প্রসার ঘটে যে তাদের ওপরে নিষেধাজ্ঞা জারি হয় আমেরিকার অনেক প্রদেশেই। পালটা শুরু হয় অবাধ বাকস্বাধীনতার লড়াই। ১৯০৯-১৩ পর্বে সেই লড়াই তীব্র আকার নেয়। ওয়াশিংটনের স্পোকানে, কালিফোর্নিয়ার ফ্রেসনো, সান দিয়েগোতে সেই লড়াই চলতে থাকে। জো নিজেও সান দিয়েগো, ফ্রেসনোয় এই লড়াইয়ে যোগ দেন। অনেক সময়ে রাস্তার মোড়ে মঞ্চ খাটিয়ে শ্রমিকরা গান গাইছেন দেখে তা আটকাতে পাঠানো হতো ভাড়া-খাটা ড্রাম বাজিয়েদের দল। স্যালভেশন আর্মির প্রচারকরাও দল বেঁধে আসতো। হই হল্লা করে শ্রমিকদের জমায়েত ভেস্তে দেওয়া হতো। পরের পর্বে শুরু হয় পুলিশের অত্যাচার, হাজার হাজার শ্রমিককে গ্রেপ্তার করে নিয়ে যাওয়া হয় জেলে। জো কখনও ঠিক এইভাবেই গ্রেপ্তার হয়েছিলেন কিনা, তা জানা যায়নি। কিন্তু এই অসম ও বিচিত্র যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে জো হিলের গান ঘুরতে শুরু করে শ্রমিকদের মুখে মুখে।

**********************

১৯১১-র সেপ্টেম্বরে রেলের লোকোমোটিভ ও কামরা তৈরির ৪০হাজার শ্রমিক ধর্মঘট করেন। এই ধর্মঘটে কিছু শ্রমিক দালালের, মালিকপক্ষের স্তাবকের কাজ করছিলেন। ধর্মঘটে অনুপ্রাণিত জো পরিচিত চরিত্র কেসি জোনসকে নিয়ে লেখা ব্যালাডকে বদলে দেন শ্রমিকের গানে। কেসি জোনস ছিলেন এক রেলকর্মী যিনি সহকর্মীদের প্রাণ বাঁচিয়েছিলেন নিজের জীবনের বিনিময়ে। জো হিলের গানে কাহিনী এইরকম: এস পি লাইনের শ্রমিকরা ধর্মঘট করলেও ইঞ্জিনিয়ার কেসি ইঞ্জিন চালাচ্ছে। শ্রমিকদের অনৈক্যের সুযোগে একের কাজ অন্যকে দিয়ে করিয়ে কেসি খুব নামডাকও করেছে। একদিন কেসি দুর্ঘটনায় মরে গেল স্বর্গে। সেখানে পিটার বললো আমাদের বাজনদাররা ধর্মঘট করেছে, তুমি বাজাও। কিন্তু পরীরা তাকে খারিজ করলো দালাল বলে। এই গান শ্রমিকদের মধ্যে দারুণ জনপ্রিয় হয়। হিলের অনেক গানেই ফিরে ফিরে এসেছে এই ধর্মঘট-ভাঙা স্তাবকদের কটাক্ষ, মেহনতীর ঐক্যের প্রয়োজনীয়তার কথা।

১৯১৩-তে লেখা ‘সিজার বিল’ এমনই এক শ্রমিককে নিয়ে যে কৃষ্ণাঙ্গ এবং অভিবাসীদের ঘৃণা করে। সে কখনও ইউনিয়ন করে না, অভিবাসীদের দায়ী করে যাবতীয় দুর্দশার জন্য এবং মালিকরা তাকে পুরস্কৃত করে। কিন্তু খাটতে খাটতে তার যে জান যায়, খেয়ালই করে না সে। হিল লিখেছিলেন, ‘ দেশের সব জায়গায়, মরুতে কিংবা পাহাড়ে, যত খনিতে-কারখানায় পুরনো সেই সিজার্স বিলকে পাবেন/ দেখতে তাকে মানুষেরই মতো কিন্তু কথা বলতে শুরু করলেই বুঝবেন সে তা নয়/ পুলিশে তাড়া করলেও সে বলতেই থাকে এই দেশ আমার’। এই কথা কি আজও সত্য নয়? ঠিক এই রকমই শ্রমিককে ‘আদর্শ’ হিসাবে পেতে চায় মালিকরা, চায় রাষ্ট্রও।

কালানুক্রমে আরো পরে, জেলের মধ্যে বসে লেখা হিলের ‘রিবেল গার্ল’ শ্রমিক আন্দোলনে মহিলাদের ভূমিকা নিয়ে চমৎকার গান। বিংশ শতাব্দীর শুরুতে এই প্রশ্নকে সামনে তুলে ধরা খুব সহজ কাজ ছিলো না। সম্ভবত আই ডব্লিউ ডব্লিউ-র নেত্রী এলিজাবেথ গারলে ফ্লিনকে দেখে, তাঁর সাথে হিলের বন্ধুত্বের ফলেই এই গান রচিত হয়েছিল। এই গান প্যারোডি নয়, সুর হিলের নিজেরই। হিল এই গানকেই যে তাঁর সেরা লেখা বলতেন, তা-ও লক্ষণীয়। গানটি এইরকম:

সকলেই জানে এই পৃথিবীতে অনেক রকমের নারী রয়েছে

কেউ কেউ থাকে সুন্দর প্রাসাদে, পরে সবচেয়ে সেরা পোশাক,

রয়েছে নীল রক্তের রাণী ও রাজকন্যারা,

হীর-মুক্তোয় মুড়ে তাদের আকর্ষণও বাড়ে;

কিন্তু আসল নারী হলো

বিদ্রোহী সেই মেয়ে।

বিদ্রোহী সেই মেয়ে, বিদ্রোহী সেই মেয়ে

শ্রমিশ্রেণীর কাছে সে দামী মুক্তো

লড়াকু বিদ্রোহী ছেলের জন,

সে দেয় সাহস, গর্ব আর আনন্দ।

আমাদের আছে কয়েকজন, কিন্তু চাই আরো অনেক

কেননা বিদ্রোহী মেয়ের সাথে মুক্তির যুদ্ধে লড়া আরো মহান।

শ্রমের চিহ্নে তার হাত হয়তো শক্ত

তার পোশাক হয়তো সুন্দর নয়

কিন্তু তার হৃদস্পন্দনে ধ্বনিত হয় তার শ্রেণীর জন্য দরদ।

তার অবাধ্যতা, ছুঁড়ে দেওয়া শ্লেষে

ভয়ে কাঁপতে থাকে শোষক।

পূর্ণ নারী হলো বিদ্রোহী সেই মেয়ে।

************************

১৯১৩-তে জো হিলের জীবন ও সৃজন কর্মচঞ্চল, তাঁর লড়াইয়ের শিখরও বলা যেতে পারে। ব্রিটিশ কলম্বিয়ায় এক মাস জেল খেটে, পুলিশের তাড়া খেয়ে হিল চলে আসেন উটায়। সেখানে নির্মাণকর্মীদের সফল ধর্মঘট দেখেন। শুরু হয় তামার খনির ধর্মঘট। সেই আখ্যানে যাবার আগে এই সময়ে লেখা হিলের বিখ্যাত কয়েকটি গানের কথা বলা যেতে পারে। তার একটি শ্রমিকের চিরায়ত গান ‘দেয়ার ইজ পাওয়ার ইন এ ইউনিয়ন’ প্রকাশিত হয়েছিল আই ডব্লিউ ডব্লিউ-এর লিটল রেড সঙবুকে। এই গানে স্পষ্টই যে হিল শুধু শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির লড়াই লড়ছিলেন না, মজুরি-দাসত্বের বিরুদ্ধে ছিলো তাঁর অবস্থান।

হিল লিখছেন:‘ মজুরি দাসত্ব থেকে মুক্তি পেতে চাও/ তাহলে যোগ দাও বিরাট এই শিল্পশ্রমিকের সঙ্ঘে/ ক্ষুধা ও দুর্দশা থেকে মুক্তি পেতে চাও/ তাহলে এসো, মানুষের মতো দাঁড়াও।’ সোজা সাপটা এক স্তবকে হিল লিখেছেন: ‘তুমি যদি চাও তোমার মাথা গুঁড়িয়ে যাক/ তাহলে সংগঠিত হোয়ো না, ঘেন্না করো ইউনিয়নকে/ মৃত্যুর আগে কিছুই যদি না চাও/ তাহলে ওপরতলার সঙ্গে হাত মেলাও আর বিজ্ঞ সেজে থাকো’। আর, হিল লিখছেন, তা যদি না চাও, যদি পালটাতে চাও দুনিয়া তাহলে এসো, দুনিয়ার মজদুর এক হও।

‘উই উইল সিঙ ওয়ান সঙ’-এ হিল লিখেছেন ‘দোলনা থেকে সমাধি পর্যন্ত’ শ্রম দিয়ে চলা মানুষের জন্য একটা গান গাইবো আমরা। দারিদ্র্য ও পিঠে বোঝা নিয়ে রাস্তায় ঘুরে বেড়ানো মানুষের জন্য, শৈশবকে কারখানায় বেচে দিতে বাধ্য হওয়া শিশুদের জন্য ওই গান গাইবো আমরা। এই একই গানের কথায় যারা এই শ্রমের শোষক, এই ব্যবস্থাকে টিঁকিয়ে রাখে তাদের দ্বন্দ্বের কথা বৈপরীত্যে বলেছেন হিল। এই গানটি যেন শ্রেণীশোষণ ও শ্রেণীসংগ্রামের একটি পাঠ্যবই।

উগ্র জাতীয়তাবাদ এবং যুদ্ধ শ্রমিককে ভাগ করে দেয় অনেক সময়েই। এক দেশের শ্রমিক রাইফেল তাক করে অন্য দেশের শ্রমিকের বিরুদ্ধে। ইউরোপে সাম্রাজ্যবাদী দ্বন্দ্বে ঘনিয়ে আসা যুদ্ধ সম্পর্কে লেনিনের সতর্কতা, দ্বিতীয় আন্তর্জাতিকের মধ্যে নিজ নিজ দেশের যুদ্ধজিগিরের সপক্ষে দাঁড়িয়ে যাবার প্রবণতার বিরুদ্ধে তাঁর তীক্ষ্ণ রচনাগুলির কথা আমরা জানি। ‘ইউরোপের যুদ্ধে বিপ্লবী সোস্যাল ডেমোক্র্যাসির কর্তব্য’ পুস্তিকায় লেনিন স্পষ্টই বলেছিলেন, অন্য দেশের ভাইদের বিরুদ্ধে, যারা নিজেরাও মজুরি-দাস তাদের বিরুদ্ধে নয়, অস্ত্র ব্যবহার করো সব দেশের প্রতিক্রিয়াশীল এবং বুর্জোয়া সরকারের বিরুদ্ধে। উগ্র জাতীয়তাবাদ, তথাকথিত ‘দেশপ্রেম’ এবং বুর্জোয়া সংকীর্ণতার বিরুদ্ধে ‘নির্মম প্রচার’ গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছিলেন লেনিন। লক্ষণীয়, ঠিক সেই সময়েই, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের দু’বছর আগে আমেরিকায় বসে জো হিল লিখছেন ‘শুড আই এভার বি এ সোলজার’। সেই গানে বলা হয়েছে, ‘ প্রতি বছর কোটি কোটি টাকা খরচ করছি বন্দুক আর অস্ত্রের জন্য/ ‘আমাদের সেনা’ আর ‘আমাদের নৌসেনারা’ যাতে থাকে ভালোমন্দে/ যখন লক্ষ লক্ষ লোক থাকছে দুর্দশায়/ লক্ষ মরছে আমাদের চোখের সামনে/ ‘আমার দেশ তোমার জন্য’ বলে গেয়ো না, বরং গাও সমবেত কন্ঠে: / যদি আমি কোনোদিন সেনা হই হবো লাল ঝান্ডার তলায়/ যদি কোনোদিন কাঁধে নিই বন্দুক/ চালাবো অত্যাচারীর শক্তিকে ধ্বংস করতে’।

জো হিলের অন্তত ২৮টি গান প্রকাশিত হয়েছিল আই ডব্লিউ ডব্লিউ-র গানের সংকলনে। পরবর্তী সময়ে সুরারোপিত হয়ে গাওয়া হয়েছে সবক’টি গানই। এছাড়াও অসম্পূর্ণ, ভাঙা স্তবক পাওয়া গেছে। হিলের কবিতাও পাওয়া গেছে। মার্কিন প্রতিবাদী সঙ্গীতের অগ্রণী এই সংগ্রামী সঙ্গীতকারের গানের পূর্ণ ভাষ্য এবং স্বরলিপিও এখন পাওয়া যাচ্ছে।

জো কীভাবে গানকে দেখতেন, তা বোঝা যায় জেলবন্দী অবস্থায় ১৯১৪-র ২১শে জুন সল্ট লেক ট্রিবিউন পত্রিকায় দেওয়া তাঁর সাক্ষাৎকারে। জো বলেছিলেন, ‘যতোই ভালো হোক একটি প্রচারপত্র একবারের বেশি কেউ পড়ে না। কিন্তু গান মনে থেকে যায়, বারবার তা গাওয়া হতে থাকে। আমার মনে হয় কেউ যদি গানের ভেতরে নিকষ ও সাধারণের বোধগম্য তথ্য ঢুকিয়ে দেয় এবং তাকে রসসিক্ত করতে রসিকতার পোশাক পরিয়ে দিতে পারে তাহলে তিনি বিপুল সংখ্যক শ্রমিকের কাছে পৌঁছে যেতে পারবেন। যে শ্রমিকরা হয়তো ততো বুদ্ধিমান নন, হয়তো উদাসীন, প্রচারপত্র বা অর্থনীতির বিজ্ঞান নিয়ে সম্পাদকীয় পড়তে যাঁরা রাজি নন’। জো গানকে দেখেছিলেন আন্দোলনের অস্ত্র হিসাবে, পরিভাষায় এজিটেশন-প্রোপাগান্ডার অংশ হিসাবে, কালিঝুলি মাখা শ্রমিকের সঙ্গে সংলাপের ভাষা হিসেবে।

***************************

আলফ্রেড হেসের যে গান জো হিলকে বারবার স্বপ্নে এনে দিয়েছে, সেই ‘কাল রাতে জো হিলকে আমি স্বপ্নে দেখেছি’ গানের একটি লাইন ‘দি কপার বসেস কিলড ইউ জো’ ( তামার খনির মালিকরা তোমায় হত্যা করেছে, জো)। ১৯১৩-তে উটার তামার খনিতে ধর্মঘট হয়। দুর্ধর্ষ সেই ধর্মঘটের নেতৃত্বে ছিলো আই ডব্লিউ ডব্লিউ। ভাড়াটে সশস্ত্র বাহিনী এনে ধর্মঘট ভাঙে কোম্পানির মালিকরা। ছোট খনি-শহর টাকার থেকে তাড়ানো হয় ১৬০জন শ্রমিক সংগঠককে। এদের একজনই কি ছিলেন জো হিল? সম্ভবত হ্যাঁ। সল্ট লেক সিটিতে এই ধর্মঘটের সমর্থনে সমাবেশ চলাকালীনও আক্রমণ করেছিল দুষ্কৃতী বাহিনী।

সেই তামার খনি আজও আছে। কেনেকট উটা কপার কর্পোরেশনের এখন মালিক দুনিয়ার খনন ক্ষেত্রের পয়লা নম্বরের বহুজাতিক রিও টিন্টো। মার্কিন ভূখন্ডে মোট তামার চাহিদার প্রায় ২৫শতাংশ আসে এই খনি থেকেই। এই খনি বিশ্বে মানুষের খনন করা অন্যতম বৃহৎ এলাকা। রিও টিন্টো দুনিয়ার প্রায় সমস্ত প্রান্তে খনি চালায়। তামা, লোহা থেকে হীরে সবই উঠে আসে এই কোম্পানির দখলদারিতে। ভারতেও লোহা ও হীরের খননে ঢুকছে তারা।

ধর্মঘটের আতঙ্কে ভোগা পুলিশ ১৯১৪-র জানুয়ারিতে গ্রেপ্তার করে জো হিলকে। তাঁর বিরুদ্ধে স্থানীয় এক মুদির দোকানের মালিককে খুন করার সাজানো অভিযোগ আনা হয়। পরবর্তীকালে একথাও প্রমাণিত হয়েছে পুলিশ জানতো কে ওই খুন করেছে। সেই দাগী অপরাধীকে ধরেও পুলিশ ছেড়ে দেয় হিলকে ফাঁসানোর ছকেই। সল্ট লেক পুলিশ যোগাযোগ করেছিল কালিফোর্নিয়ার পুলিশের সঙ্গেই। সেখান থেকে বার্তা আসে একেবারে ঠিক লোককে ধরেছেন। এই লোকটা অবাঞ্ছিত নাগরিক। কালিফোর্নিয়ায় ধর্মঘটের সংগঠক জো হিলকে কারাবন্দী করে রাখে উটার তামার খনির মালিকদের স্বার্থরক্ষাকারী পুলিশ। তাঁর মুক্তির দাবিতে আমেরিকা জুড়ে রাস্তায় নামেন শ্রমিকরা। বিচারের প্রহসন চলাকালীন জেলে বসেই একটির পর একটি গান লিখতে থাকেন তিনি। এমনকি তাঁর ‘শেষ ইচ্ছাপত্র’ ছিলো গানের আকারেই। ১৯১৫-র ১৮ই নভেম্বর এক কারারক্ষীর হাতে সে-গান লিখে কাগজের টুকরো দেন হিল: ‘আমার দেহ? যদি বেছে নিতে পারতাম, চাইতাম তা ভস্ম হয়ে যাক/ খুশির হাওয়া তাকে উড়িয়ে নিয়ে যাক কোনো ফুলগাছের কাছে/ হয়তো কোনো ম্লান ফুল আবার প্রাণ পেয়ে ফুটে উঠবে।’

jo-hill-dont-mourn

মৃত্যুর আগে আই ডব্লিউ ডব্লিউ-র সাধারণ সম্পাদক বিল হেউডকে পাঠানো হিলের বার্তা ছিলো ছিলাছেঁড়া তীরের মতো: ‘শোকে সময় নষ্ট করো না, সংগঠিত করো’। মৃত্যুর পরে জো হিলের দেহ নিয়ে আসা হয় শিকাগোতে। শেষকৃত্যের দিন হাজার হাজার মানুষ পথে নামেন। কফিনের পিছনে দীর্ঘ মিছিল, রাস্তা উপচে পড়ছে ভিড়ে। অনেকের কন্ঠেই হিলের গান। সেই ঘটনা সন্ত্রস্ত করে দিয়েছিল মার্কিন রাষ্ট্রকেই। জো-কে দাহ করা হয়েছিল। কিন্তু দিন যত যেতে থাকে জো পরিণত হন এক উপকথায়—মজদুরের বীরে। আমেরিকার শ্রমিক আন্দোলনে জো হয়ে ওঠেন এক আলোকশিখা।

পরে, জো-কে নিয়ে তৈরি হয় নাটক, তথ্যচিত্র। তাঁর জন্মস্থান সুইডেনের গাভলেতে তৈরি হয়েছে জো হিল মিউজিয়াম।

জো হিলের শহীদীবরণের একশ বছর পরে লগ্নী পুঁজির আধিপত্যের বিশ্ব। শ্রমিকের লড়াই কোথাও দুর্বল, কোথাও তা নতুন করে দুর্বার হয়ে উঠছে। শুধু সান দিয়েগো-মেইনের খনি-কারখানাতেই নয়, যেখানেই শ্রমিকের লড়াই, উপস্থিত মৃত্যুহীন জো।

Advertisements

Tags: , , , , ,

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s


%d bloggers like this: