Well-planned Communal Battle Cry

গোরু থেকে পাথর, যা হচ্ছে সবই পরিকল্পিত

সাম্প্রদায়িক হিংসা লাফিয়ে বাড়ছে

বিশেষ প্রতিবেদক

লরি বোঝাই পাথর আসছে অযোধ্যায়। শিলাপূজা চলছে। রাম জনমভূমি ন্যাসের সভাপতি ঘোষণা করছেন, মোদী সরকারের ‘সিগন্যাল’ মিলেছে। মন্দির তৈরি করতে হবে এখনই।সাম্প্রদায়িক জিগির, হিংসা ছড়ানোর আরো এক তাস খেলা শুরু হলো। গত দেড় বছরে এটাই নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে। রোজ নতুন নতুন সাম্প্রদায়িক অ্যাজেন্ডা সামনে আনছে আর এস এস-বি জে পি। নতুন ঠিক নয়, পুরনো, আর এস এসের চিরকালীন বিষয়গুলিই। বলা ভালো নতুন করে তুলে আনছে। গোটা দেশকে সেই অ্যাজেন্ডায় ঢুকিয়ে দিচ্ছে

‘আচ্ছে দিন’-এর স্লোগানকে পিছনে ঠেলে জিনিসের দাম লাফিয়ে বাড়ছে, কৃষির সংকট, ফসল না-পাওয়া কৃষকের আত্মহত্যার ক্রমবর্ধমান ঘটনা, শ্রম আইন সংশোধন করে মেহনতির ন্যূনতম অধিকারটুকুও কেড়ে নিয়ে কর্পোরেট পুঁজির লুটের রাস্তা অবাধ করার কাজ চলছে। রেগা, আই সি ডি এস, মহিলা সুরক্ষা সহ বিভিন্ন সামাজিক প্রকল্পে ছাঁটাই চলছে নির্বিচারে। প্রধানমন্ত্রী বিদেশ ঘুরছেন, কোটি কোটি কর্মপ্রার্থীর কাজের সুযোগ তৈরির কোনো প্রচেষ্টা নেই।

এমন অবস্থায় আরো বেশি জরুরি হয়ে পড়েছে বিভাজনের রাজনীতি। ধর্মীয় উন্মাদনার গোলকধাঁধায় ঢুকিয়ে দিতে হবে মানুষকে, বিশেষত তরুণ প্রজন্মকে। রোজ সাম্প্রদায়িক হিংসার ঘটনা ঘটছে। মঙ্গলবারই লোকসভায় স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী যে তথ্য দিয়েছেন তাতে বছরের প্রথম দশ মাসেই ৬৫০টি সাম্প্রদায়িক হিংসার ঘটনায় ৮৪জনের মৃত্যু হয়েছে। সংখ্যাতত্ত্বেও কারিকুরির অভিযোগ উঠছে।

মোদী-রাজে দেশে সাম্প্রদায়িকতা, অসহিষ্ণুতা বৃদ্ধির ঘটনায় দেশজোড়া প্রতিবাদের মধ্যেই গুরুতর প্রশ্ন উঠে এসেছে সরকার এই ধরনের ঘটনা কম করে দেখাচ্ছে। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের হিসেব অনুযায়ী ২০১৪সালে দেশে ৬৪৪টি সাম্প্রদায়িক হিংসার ঘটনা ঘটেছে। অথচ কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের অধীন ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ডস ব্যুরোর হিসেব অনুযায়ী ২০১৪সালে দেশে ১২২৭টি সাম্প্রদায়িক হিংসার ঘটনায় ২০০০জন জখম হয়েছেন। তাহলে কোনটি সঠিক? বিপদে পড়ে এখন একই মন্ত্রকের দুইরকম তথ্যের তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক।

সংখ্যার হিসেবের কচকচানি ছেড়ে দিলেও খালি চোখেই যা দেখা যাচ্ছে তাতে স্পষ্ট শুধু সাম্প্রদায়িক হানাহানি নয়, প্রতিদিনের জীবনযাপনকে নিয়ন্ত্রণ করতে চাইছে সংঘ। খাদ্যাভ্যাস থেকে ধর্মাচরণ, প্রেম-বিবাহ, সঙ্গী নির্বাচনের মত একান্ত ব্যক্তিগত বিষয়েও নিয়ন্তা হতে চাইছে উগ্র হিন্দুত্ববাদীরা। বিপদ সবথেকে বেশি সেখানেই।

উচ্চশিক্ষা, গবেষণার প্রতিষ্ঠানগুলির দখলদারি সম্পূর্ণ হয়েছে। সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলিতেও একই অবস্থা। ইতিহাস বিকৃতির কাজ চলছে। শিশুমনেই সংঘের ইতিহাস গেঁথে দেওয়ার সরকারী উদ্যোগ শুরু হয়েছে। অন্ধবিশ্বাস, কুসংস্কারের আবাদ হচ্ছে। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়া হচ্ছে। কর্পোরেট মিডিয়াকে পকেটে পুরে সোশ্যাল মিডিয়া নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চলছে। যে কোনো পোস্ট মন মতো না হলেই শারীরিক আক্রমণ। শুরুতেই মুম্বাইয়ে খুন হয়ে গেছেন পেশাদার সফটওয়ার বিশেষজ্ঞ সাদিক শেখ।

একের পর এক যুক্তিবাদীরা খুন হচ্ছেন। অপরাধীরা ধরা পড়ছে না। এতই অপদার্থ আমাদের পুলিশ, প্রশাসন? এতই নিষ্কর্মা গোয়েন্দা বিভাগ? নাকি এক্ষেত্রেও হিন্দু সন্ত্রাসবাদীদের মত ছাড় দেওয়ার খেলা চলছে, প্রশ্ন সেটাই। এই সরকার তো সন্ত্রাসবাদীও স্থির করছে ধর্ম দেখে।

গোরুর মাংসের গুজব ছড়িয়ে মহম্মদ আখলাককে খুন করা হচ্ছে। আবার উগ্র হিন্দুত্ববাদী সাংসদরাই জোর করে মুখে খাবার গুঁজে দিচ্ছে রোজা রাখা সরকারি কর্মীকে। বই প্রকাশ আটকাতে কালি লেপা হচ্ছে তো আমির খানকে দেশ ছাড়তে বলা হচ্ছে। ক্রিকেট মাঠ থেকে দিলওয়ালে– আক্রমণ সর্বব্যাপী।

সাম্প্রদায়িক উসকানি ছড়াতে সরকারের নেতা-মন্ত্রীরা বেপরোয়া, বেলাগাম। প্রধানমন্ত্রী নীরব, নিশ্চুপ। তবে চুপ থাকতে পারলেন না বেশি দিন। বিহার ভোটে ‘ময়ূর পুচ্ছ’ খুলে উলঙ্গ হয়েই ময়দানে নেমে পড়লেন। দেশের প্রধানমন্ত্রী যে এভাবে সরাসরি সাম্প্রদায়িক জিগির ছড়াতে পারেন, সে ঘটনারও সাক্ষী হলো দেশ।

ধর্মান্তরকরণ, লাভ জিহাদ, অভিন্ন দেওয়ানি বিধি, কাশ্মীর, ৩৭০ ধারা, গোরু, রাম মন্দির– উগ্র ধর্মীয় জিগির ছড়ানোর কাজ চলছে। যখন যেটা সামনে আনলে সুবিধে সেই মত কাজ চলছে। রাজ্যে রাজ্যে বিশেষ করে গরিব মানুষকে ভয় বা লোভ দেখিয়ে একদফা ধর্মান্তরকরণ চললো। ‘লাভ জিহাদের’ নামে তরুণ-তরুণীদের মেলামেশা, সঙ্গী নির্বাচনেও বাধা দিতে নেমে পড়লো সংঘ। দিল্লি সহ একাধিক রাজ্যে আক্রান্ত হলো খ্রিস্টানদের উপাসনা ঘর। আক্রান্ত হলেন যাজকরা

ছত্তিশগড়, মধ্য প্রদেশের মত বি জে পি শাসিত রাজ্যের রেগার কাজ, রেশন দেওয়া বন্ধ করে আদিবাসী খ্রিস্টানদের জোর করে ধর্মান্তরকরণ করানো হলো। এরপর শুরু হলো গোরু। যাকে যেখানে খুশি ‘গো-মাতার’ নামে আক্রমণ করা যায়। খুন করা যায়। বিহার ভোটের মুখেও গোরু নিয়ে মরিয়া প্রচার চললো। এবার টার্গেট উত্তর প্রদেশ। ভোট ২০১৭সালে। শুরু হয়েছে রাম মন্দির নিয়ে নতুন করে উত্তেজনা ছড়ানোর খেলা।

কোনোকিছুই বিচ্ছিন্ন বা বিক্ষিপ্ত নয়। হঠাৎ করে কিছু ঘটে যাচ্ছে না। সারা দেশে সাম্প্রদায়িক জিগির ছড়ানোর যে কাজ চলছে তাকে শুধুই অসহিষ্ণুতা বলা চলে না। আর এস এস তার নিজস্ব অ্যাজেন্ডা অনুযায়ী চলছে এবং তা চাপিয়ে দিচ্ছে জনগণের ওপর। মানুষকে ঠেলে দিচ্ছে সেই অ্যাজেন্ডায়। সবটাই সুপরিকল্পিত, পূর্বনির্ধারিত

Advertisements

Tags: , , , , , , , , , , , ,

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s


%d bloggers like this: