Kanhaiya Kumar, The Pied Piper of JNU

অত্যাচারের বিরুদ্ধে কানহাইয়াদের বাঁশী

জিকো দাশগুপ্ত

Kanhaiya_Kumar_1

সংবাদমাধ্যমের অসংখ্য ক্যামেরার সামনেই দেশের আইন–সংবিধানকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে একদল ‘‌দেশপ্রেমী’‌ উকিল কোর্ট চত্বরেই কানহাইয়া কুমারকে মারলেন, আক্রান্ত হলেন এক সাংবাদিকও। দুষ্কৃতীরা চিহ্নিত হওয়া সত্ত্বেও পুলিস কাউকে গ্রেপ্তার করেনি। এই বিক্রম চৌহানরাই ঠিক দুদিন আগে বি জে পি বিধায়ক ও পি শর্মার নেতৃত্বে অধ্যাপক এবং সাংবাদিকদের মারধর করেছিলেন এই পাটিয়ালা কোর্টেই, তার প্রমাণও অসংখ্য, কেউ গ্রেপ্তার হননি। জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের গেটের বাইরে প্রতিদিন কয়েকশো উন্মত্ত হিন্দু পরিষদ–বজরং দলের কর্মী জে এন ইউ–র ‘‌দেশদ্রোহী’‌দের বিনা তদন্তে গ্রেপ্তার করার দাবি জানাচ্ছে, ক্যাম্পাসের ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করছে। সৌদি আরব বা আই এস–শাসিত অঞ্চলে হতে পারে, বা এ দেশের ‘‌মাওবাদী’‌রাও তাতে বিশ্বাস করতে পারে, তবে ‘‌ক্যাঙ্গারু’‌ কোর্ট চালিয়ে কাউকে দোষী সাব্যস্ত করার বা তাকে শাস্তি দেওয়ার অনুমতি আর যাই হোক ভারতীয় আইন–সংবিধান দেয় না।

তবে বেগুসরাইয়ের অঙ্গনওয়াড়ি সেবিকার পুত্র কানহাইয়া কুমারের ক্ষেত্রে অবশ্য গ্রেপ্তার করার মাপদণ্ডই আলাদা। এখনও একটাও প্রমাণ দেখাতে পারেনি, অথচ ‘‌দেশদ্রোহের’‌ মতো অভিযোগে তাকে গ্রেপ্তার করেছিল পুলিস। ৯ ফেব্রুয়ারি জে এন ইউ–তে যে সব প্রতিক্রিয়াশীল ভারতবিরোধী স্লোগান উঠেছিল, ছাত্র সংসদের তরফ থেকে আগেই দ্ব্যর্থহীন ভাষায় তার নিন্দা করেছেন কানহাইয়া। দেশের সংবিধানের ওপর সম্পূর্ণ আস্থা রেখে তার ভাষণ একটি সংবাদপত্রে পুঙ্খানুপুঙ্খ ছাপাও হয়েছে। এর মধ্যে কোনটা দেশদ্রোহ?‌

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর স্নেহভাজন দিল্লির পুলিস কমিশনার এখন বলছেন বেল চাইলে পুলিস আর আপত্তি জানাবে না, কিন্তু প্রমাণ ছাড়া ‘‌দেশদ্রোহে’‌র মতো অভিযোগে একজন ছাত্রকে গ্রেপ্তার করেছিলেনই বা কেন?‌ প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও বি জে পি মদতপুষ্ট বিক্রম চৌহানদের গ্রেপ্তার করা যাচ্ছে না, আর জে এন ইউ ছাত্র সংসদ সভাপতির বেলায় গ্রেপ্তার করার পর প্রমাণ খোঁজার প্রচেষ্টা?‌ বি জে পি নেতারা বলে বেড়াচ্ছেন আইনের ওপর ভরসা রাখতে, কানহাইয়া নির্দোষ হলে ছাড়া পেয়ে যাবেন। তাহলে ও পি শর্মার নেতৃত্বে বিক্রম চৌহানরা কোর্টে কী করছেন?‌ বি জে পি–র মুখপাত্র সম্বিত পাত্র এক সর্বভারতীয় সংবাদ চ্যানেলে গিয়ে কানহাইয়াকে দেশদ্রোহী প্রমাণ করার চেষ্টা করলেন একটি ভিডিও ফুটেজ দেখিয়ে যার সত্যতা নিয়েই গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। আইন–সংবিধানে বিশ্বাস রাখেন তো প্রমাণ কোর্টে পেশ করুন, একটি ছাত্রের মিডিয়া ট্রায়াল করছেন কেন?‌

নিজেদের রাজনৈতিক অ্যাজেন্ডা চাপিয়ে দিতে বি জে পি সরকার এই মুহূর্তে স্ববিরোধী নীতি নিয়েছে— এক, দেশের আইন–সংবিধান দেখিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করে নিরস্ত্র ছাত্রদের দমন করা। এবং দুই, আর এস এস–বি জে পি কর্মীদের ব্যবহার করে সেই আইন–সংবিধানকেই পরাভূত করা। দেশের আইন–সংবিধানের ওপর আর এস এস–এর অ্যাজেন্ডা চাপিয়ে দিতে বিক্রম চৌহানরা আছেন। গণতন্ত্রের ওপর এই অভূতপূর্ব আক্রমণের মুখেও লিবারেল মধ্যবিত্ত শ্রেণীর সমর্থন ধরে রাখতে দরকার সংবিধানের ১২৪এ ধারা। এক কথায়, কানহাইয়া কুমারের হাজতবাস এবং পাটিয়ালা কোর্টে গুণ্ডামি, এই দুটো ঘটনা একই সূত্রে গাঁথা।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গৈরিকীকরণ এবং নিজেদের সঙ্কীর্ণ রাজনৈতিক স্বার্থকে চরিতার্থ করতে ছাত্রদের দমন করার উদাহরণ এই সরকারের আমলে অবশ্যই প্রথম না। পুণের ফিল্ম ইনস্টিটিউট থেকে শুরু করে হায়দরাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়, আই আই টি দিল্লি হোক বা আই আই টি মাদ্রাজ, ছাত্রদের গণতান্ত্রিক অধিকারের ওপর ক্রমাগত আক্রমণ হয়ে চলেছে। রোহিত ভেমুলাদের প্রাণ দিতে হচ্ছে, যাদবপুর ক্যাম্পাস আক্রান্ত হচ্ছে। তবে, জে এন ইউ–এর ক্ষেত্রে গোটা বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপরেই আক্রমণ নেমে এল। আস্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকেই দেশদ্রোহীদের আস্তানা বলে প্রচার করা হল।

জে এন ইউ দেশদ্রোহীদের আস্তানা হয়ে থাকলে একই যুক্তিতে এই সরকারকেও দেশদ্রোহী বলতে হয়, কারণ বর্তমাণ বাণিজ্যমন্ত্রী থেকে শুরু করে দেশের বিদেশ সচিব, নীতি আয়োগের সি ই ও থেকে শুরু করে প্রধানমন্ত্রীর দ্বারা নিযুক্ত কাউন্টার–টেররিজমের স্পেশ্যাল এনভয়, প্রত্যেকেই এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন। শিক্ষাজগৎ থেকে শুরু করে সর্বভারতীয় সংবাদমাধ্যম, আমলা থেকে শুরু করে বিভিন্ন ধারার সামাজিক–রাজনৈতিক আন্দোলনে বিগত চল্লিশ বছরে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র এবং অধ্যাপকদের নাম এবং ভূমিকা লিখতে গেলে কয়েকটা বই লিখে ফেলতে হবে। তাই দেশদ্রোহিতার অপপ্রচার কতটা অবান্তর, সেই প্রসঙ্গে না ঢুকে বরং সেই অপপ্রচারের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে আসা যাক।

বি জে পি–মদতপুষ্ট এই অপপ্রচার জে এন ইউ–এর বিরুদ্ধে প্রথমবার না, বাজপেয়ী জমানাতেও হয়েছে, ইদানীংকালে ইউ জি সি আন্দোলন চলার সময়ও আর এস এস–এর মুখপত্র ‘‌পাঞ্চজন্য’‌–তে এই বিশ্ববিদ্যালয়কে ‘‌দেশদ্রোহীদের আস্তানা’‌ বলা হয়েছে। ভূমিকা বিশাল, তবে এর কারণ শুধুমাত্র ধর্মনিরপেক্ষ এবং নব–উদারবাদ বিরোধী জে এন ইউ–এর ছাত্র আন্দোলনে খুঁজলে ভুল হবে। সামগ্রিকভাবেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে জে এন ইউ সেই সব কিছুর প্রতীক, যা আর এস এসের স্বার্থবিরোধী। কারণ ‘‌হিন্দু রাষ্ট্র’‌ গড়ে তোলার যুক্তির বিরুদ্ধে গিয়ে জে এন ইউ বিশ্বাস করে আম্বেদকর–রচিত ধর্মনিরপেক্ষ ভারতীয় সংবিধানে, তুলে ধরে সংবিধানের প্রিঅ্যাম্বল–এ ঘোষিত সামাজিক ন্যায়ের বার্তা।’‌

রাজনৈতিক মতাদর্শ নির্বিশেষে আজ এই বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র–অধ্যাপক–কর্মচারীদের যে বিশাল ঐক্য গড়ে উঠেছে, তার ভিত্তি হল জে এন ইউ–এর অনন্য সংস্কৃতি। সামাজিক ন্যায় এবং গণতান্ত্রিক অধিকারকে রক্ষা করার সংস্কৃতি, মাথা উঁচু করে ঠিককে ঠিক এবং ভুলকে ভুল বলার সংস্কৃতি। তাই হাতে–গোনা কিছু বিদ্যার্থী পরিষদের কর্মী যখন হিংসা ছড়ানোর উদ্দেশ্যে স্লোগান দিতে দিতে ধেয়ে আসে চার হাজার ছাত্রের জমায়েতে, অধ্যাপকেরাই গড়ে তোলেন মানবশৃঙ্খল, রক্ষা করা হয় মুষ্টিমেয় সেই ছাত্রদের স্লোগান দেওয়ার অধিকারকেও। তাই এই আন্দোলনের সঙ্গে সহমর্মিতা রেখে ইস্তফা দেন বিদ্যার্থী পরিষদের ছাত্রনেতারাও।

শীর্ষস্থানীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হয়ে ওঠার পেছনে বড় ভূমিকা পালন করেছে জে এন ইউ–র চিরকালীন ঐতিহ্য, ‘‌academics of dissent‌’‌। উন্নততর ভারত গড়ে তোলার লক্ষ্যে, প্রথাগত ধ্যানধারণাকে প্রশ্ন করে গবেষণার বৃত্তকে বাড়িয়ে তোলা এই ঐতিহ্যের অংশ। এবং অর্জিত এই শিক্ষাকে সমাজে বাস্তবায়িত করার লক্ষ্যে, ‘‌academics of dissent‌’‌, এই বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘‌politics of dissent‌‌’‌–এর সঙ্গে যুক্ত। জরুরি অবস্থার সময় থেকে শুরু করে নির্ভয়া, যার সাক্ষী বিগত ৪০ বছরের বিভিন্ন আন্দোলন। পড়াশোনা এখানে রাজনীতিকে সমৃদ্ধ করে, এবং রাজনীতি পড়াশোনাকে। এখানে ছাত্ররা স্লোগান দেন ‘‌পড়াশোনা করার জন্য লড়ো, সমাজ পাল্টানোর জন্য পড়ো’‌। ছাত্ররা শুধু নিজেদের স্বার্থে নয়, লড়েন এমন জে এন ইউ–এর জন্য যাতে সমাজের সব থেকে পিছিয়ে পড়া অংশের মানুষ এখানে পড়তে পারে। বিশ্ববিদ্যালয়ে যখন নেমে এসেছে চরম আক্রমণ, চলছে মরণপণ প্রতিরোধ, এই ক্যাম্পাসেই অধ্যাপকেরা প্রতিদিন জাতীয়তাবাদের ওপর ক্লাস নিচ্ছেন, যা একসঙ্গে শুনতে আসছেন কয়েক হাজার ছাত্রছাত্রী।

পেশিশক্তি বা টাকার জোরে না, এখানে রাজনীতি হয় মতাদর্শের ভিত্তিতে। প্যামফ্লেট, পাবলিক মিটিং এবং ঘরে ঘরে গিয়ে রাজনৈতিক প্রচারের মাধ্যমে বিভিন্ন ছাত্র সংগঠন নিজেদের বক্তব্য তুলে ধরে। ছাত্ররাই গড়ে তোলেন নিজেদের ‘‌ইলেকশন কমিটি’‌, ছাত্ররাই পরিচালনা করেন ছাত্র সংসদ নির্বাচন। ইউনিভার্সিটি জেনারেল বডি মিটিং ছাত্রদের ‘‌highest decision making body‌’‌, যাতে অংশগ্রহণ করে হাজার হাজার ছাত্রছাত্রী। এই প্রগতিশীল ঐতিহ্যেরই প্রতিফলন যে কানহাইয়া কুমার, লেনিন কুমার, বাত্তিলাল বেয়োরা, চন্দ্রশেখরের মতো সমাজের সব থেকে শোষিত এবং পিছিয়ে পড়া অংশের মানুষ এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ সভাপতি হন।

মার্ক্স বলে গেছেন, ‘‌when an idea grips the masses, it becomes a material force‌’‌। ন্যায় এবং গণতন্ত্রের ‌‘‌idea‌’‌ এখানে ছাত্র আন্দোলনের মাধ্যমে ‘‌material force‌’‌ হয়ে জেগে থাকে। আর এস এস এই ‘‌material force‌’‌–কে ভয় পায়। আর জে এন ইউ–র সংস্কৃতির দ্বারা ঐক্যবদ্ধ অধ্যাপক–ছাত্ররা গণতন্ত্র এবং সামাজিক ন্যায়ের এই বস্তুবাদী শক্তিকেই বাঁচানোর লড়াই লড়ছেন।

গণতন্ত্রে যে কোনও রাজনৈতিক শক্তিকে আধিপত্য বিস্তার করার জন্য দরকার হয় সামাজিক সমর্থনের। বিগত লোকসভা ভোটে বিগত সরকারের অকর্মণ্যতার বিরুদ্ধে ‌অচ্ছে দিনের স্লোগান রেখে সেই সামাজিক সমর্থন অর্জন করেছিল বি জে পি। অর্থনৈতিক সঙ্কট এবং নব–উদারবাদী নীতির জন্যে অচ্ছে দিনের স্লোগান দ্রুতই মুখ থুবড়ে পড়েছে। সংখ্যালঘু এবং সামাজিকভাবে শোষিত মানুষের বিরুদ্ধে লোক–খ্যাপানোর রাজনীতি করেও সামাজিক সমর্থন হারাতে হল বিহারে। ঘৃণার রাজনীতি করে মানুষের অচ্ছে দিন আনার অবকাশ নেই, তাই সমর্থন পেতে দরকার নতুন শত্রুর। রোহিত–জে এন ইউ–যাদবপুর এবং সেই সমস্ত মানুষ যাঁরা আর এস এসের রাজনীতিতে বিশ্বাস করেন না, তাদের দেখিয়ে তাই কাল্পনিক ‘‌দেশদ্রোহী’‌ খোঁজার প্রচেষ্টা

শুধু সাম্প্রদায়িক বা নব–উদারবাদী আক্রমণই না, এবার দেশবাসীদের মধ্যেই কাল্পনিক ‘‌দেশপ্রেমী’‌ এবং ‘‌দেশদ্রোহী’‌ বিভাজন করে বি জে পি গৃহযুদ্ধ শুরু করতে চাইছে নিজেদের সঙ্কীর্ণ রাজনৈতিক স্বার্থে। এই দেশবিরোধী শক্তিকে কোণঠাসা করতে গড়ে তুলতে হবে সাম্প্রদায়িকতা, জাতি–ভেদাভেদ, লিঙ্গ বৈষম্য এবং নব–উদারবাদের বিরুদ্ধে গণতান্ত্রিক ভাবনাচিন্তার পক্ষে যৌথ আন্দোলন। সেই আন্দোলনের ভিত্তিতে অর্জন করতে হবে মানুষের বৃহত্তম ঐক্য। অত্যাচারের বিরুদ্ধে বাঁশি ধরেছেন কানহাইয়ারা, কংস মামারা প্রস্তুত থাকুন।



(‌লেখক জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির গবেষক)‌‌‌

Advertisements

Tags: , , , , , , , , , , , ,

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s


%d bloggers like this: