Cashless Economy of Chikalthana

চিকলথানার ক্যাশলেস ইকনমি

পি সাইনাথ

1111

নোট বাতিলে মহারাষ্ট্র জুড়ে বিপর্যস্ত কৃষক, ভূমিহীন খেতমজুর, পেনশনভোগী, ছোট ব্যবসাদার ও আরো আরো অনেকে। মোদীর ‘মাস্টার স্ট্রোকে’ তাঁদের সেই জীবনযন্ত্রণাই তুলে ধরলেন স্বনামধন্য সাংবাদিক পি সাইনাথ

এখানে এলে মনে হতেই পারে প্রধানমন্ত্রী মোদীর ক্যাশলেস ইকনমির খোয়াব বাস্তবায়িত হয়েছে। মহারাষ্ট্রের ঔরঙ্গাবাদ শহরের একেবারে গা ঘেঁষে থাকা এই চিকলথানা গ্রামে সেই স্বপ্ন ঘোর বাস্তব। এখানে কারও হাতে কোনো নগদ টাকা নেই। ব্যাঙ্ক ও, এটিএম-এও নেই। তাই সেগুলির আশপাশে একবুক হতাশা নিয়ে মানুষের আনাগোনা, লাইন কোনোটাই নেই। এমনকি ব্যাঙ্কের শাখার বাইরে ভ্যানে বসা কোনো পুলিশকর্মীকে ওই চৌহদ্দিতেই নজরে পড়বে না।তবে চিন্তার কিছু নেই। খুবই শীঘ্রই ওই গ্রামের মানুষও তাঁদের আঙ্গুলে কালির দাগ দেখতে পাবেন।

চলুন ঘুরে আসা যাক দুর্গ শহর ঔরঙ্গাবাদের ভেতর থেকে। স্টেট ব্যাঙ্ক অব হায়দরাবাদের শাহগঞ্জ শাখায় ঢুকলেই নজরে পড়বে মরিয়া ব্যাঙ্ককর্মীরা তাঁদের গরিব ক্লায়েন্টদের সাহায্য করার জন্য ‘সংগ্রামরত’। সেখানে কেন, শহরের অন্য শাখা, প্রত্যেকটি শাখায় এখন ছেঁড়া-ফাটা ৫০, ১০০টাকার নোট ঝাড়াই-বাছাই চলছে। চূড়ান্তভাবে নষ্ট করে ফেলার জন্য এগুলির সবকটিই রিজার্ভ ব্যাঙ্কে পাঠানোর কথা। উপায় না দেখে এখন সেই বাতিল নোটই আবার নতুন করে বিলি করার ব্যবস্থা হচ্ছে। রিজার্ভ ব্যাঙ্কও বিষয়টা ভালোই জানে, কিন্তু নীরবতা দিয়েই ব্যাপারটা উপেক্ষা করে চলেছে।

‘‘আমাদের আর কীই বা উপায় আছে?’’ জানতে চাইছেন এই সমস্ত ব্যাঙ্কের কর্মীরা। ‘‘লোকের তো এখন ছোট নোট দরকার। ওদের সমস্ত কাজকর্ম, লেনদেন বন্ধ হয়ে রয়েছে।’’ ব্যাঙ্ককর্মীদের সঙ্গে কথার মাঝেই সেখানে এসে হাজির জাভেদ হায়াত খান। ঠেলাওয়ালা, বাড়ি বাড়ি জিনিস ফেরি করে পেট চলে। রবিবার ব্যাঙ্কের বাইরে প্রায় এক কিলোমিটার লাইন পেরিয়ে যখন ব্যাঙ্কের দোড়গোড়ায় পৌঁছালেন, তাঁর হাতে ধরা মেয়ে রশিদা খাতুনের বিয়ের কার্ড।

‘‘সবমিলিয়ে আমার অ্যাকাউন্টে ২৭হাজার টাকা রয়েছে।’’ বলছিলেন, ‘‘তিন সপ্তাহ পরে মেয়ের বিয়ে, আর আমাকে বলা হচ্ছে মেয়ের বিয়ের জন্য মাত্র দশ হাজার টাকা তোলা যাবে। আমিই আমার টাকা তুলতে পারবো না।’’ আগের দিন দশহাজার টাকা তুলে নিয়ে যাওয়ায় ব্যাঙ্ক তাঁকে ফেরত পাঠাচ্ছে। যদিও আজও তাঁর ওই একই টাকা তোলার এক্তিয়ার রয়েছে। কারণ ব্যাঙ্ককর্মীদের আন্দাজ, যেভাবে ব্যাঙ্কের চারপাশে সর্পিল লাইন বেড়ে চলেছে তার জন্য তাদের হাতে থাকা টাকা যথেষ্ট নয়। আর তাঁরা চাইছেন এই লাইনগুলির প্রত্যেকে যেন কিছু না কিছু টাকা পান। এঁদেরই দুজন এখন জাভেদকে সাহায্য করতে চান। তাঁরাই জানালেন, মেয়ের বিয়ের জন্য ফিক্সড ডিপোজিট ভাঙিয়ে ওই টাকা তাঁর অ্যাকাউন্টে এসেছে।

বহু নিবন্ধকার, বিশ্লেষক আর সরকারি রিপোর্ট এরই মধ্যে তুলে ধরেছে, ভারতের ‘কালো’ অর্থনীতির বড় অংশটাই রয়েছে সোনা-রুপোর বাজার, বেনামী জমির কারবার ও বৈদেশিক মূদ্রার কবলে। পুরানো কাঠের সিন্দুকে ঠাকুমার জমিয়ে রাখা নোটের গাদায় নয়। ভারত ও বিদেশের কালো টাকা মোকাবিলায় পদক্ষেপ সম্পর্কে ২০১২সালের একটি রিপোর্টে এই কথাটাই বলেছিলেন সেন্ট্রাল বোর্ড অব ডাইরেক্ট ট্যাক্সের চেয়ারম্যান। ১৯৪৬ ও ১৯৭৮-এ অতীতের দু-দুবার টাকা বাতিলের ‘শোচনীয়ভাবে ব্যর্থতার’ কথাও ওই রিপোর্টে তুলে ধরা হয়েছিল (পৃষ্ঠা ১৪, পার্ট টু, ৯.১)। তা সত্ত্বেও সেই একই কাজের পুনরাবৃত্তি করলো বিজেপি সরকার। এমন একটা অবিশ্বাস্য নির্বুদ্ধিতার কাজকে বাহবা দিতে হরেক কিসিমের অ্যাঙ্কর আর টেলিভিশন ভাঁড়রা ‘মোদীর মাস্টারস্ট্রোক’ বলে গলা ফাটাচ্ছে, তা আসলে গ্রাম ভারত জুড়ে মর্ম বেদনা আর দুর্গতিই ছড়াচ্ছে। এতে যদি কারও ‘স্ট্রোক’ হয়ে থাকে তা হলো ওই গ্রামীণ অর্থনীতির হৃদয়েই।

আর সেই স্ট্রোকের ধাক্কা থেকে সেরে উঠতে কতটা সময় লাগতে পারে তা প্রথমেই গুলিয়ে দিলেন কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী ও তাঁর দলীয় সহকর্মীরা, ২-৩দিনের অস্বস্তি বলে। ড. জেটলি আবার পরে তা শুধরে নিয়ে বললেন ২-৩সপ্তাহ। ঠিক তারপরই তাঁর সিনিয়র সার্জেন, নরেন্দ্র মোদী, বললেন যে রোগীর স্বাস্থ্যের পুনরুদ্ধারে তাঁর ৫০দিন সময় চাই। তাহলে ২০১৭-তেও চলবে আমাদের এই চিকিৎসা পর্ব। আমরা জানি না এর মধ্যে দেশজুড়ে আরো কত মানুষ লাইন দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে করতে মরে যাবেন, তবে প্রতিদিন তাঁদের সংখ্যা বাড়বে।

‘‘নাসিকের লাসালগাঁওতে, কিষানরা নগদ সংকটে পেঁয়াজ বাজারই বন্ধ করে দিয়েছে’’, খবর দিলেন আধুনিক কিষান সাপ্তাহিকীর সম্পাদক নিশিকান্ত ভালেরাও। ‘‘বিদর্ভ আর মারাঠাওয়াড়ায় তুলোর দাম প্রতি কুইন্টালে ৪০শতাংশ পড়ে গেছে।’’ সামান্য কিছু লেনদেন ছাড়া বিক্রিবাটা বন্ধ হয়ে রয়েছে। ‘‘কারও হাতে কোনো ক্যাশ নেই। কমিশন এজেন্ট, পণ্য উৎপাদন, ক্রেতা সকলেই সমানভাবে সমস্যার মধ্যে রয়েছেন,’’ জানালেন দ্য টেলিগ্রাফের নাগপুরের সাংবাদিক জয়দীপ হারদিকার। ‘‘গ্রামীণ ব্যাঙ্কগুলিতে চেক জমা দেওয়া সবসময়েই একটা ক্লান্তিকর ব্যাপার ছিল আর এখন টাকা তোলা হলো একটা দুঃস্বপ্ন।’’

তাই, খুব কম কৃষকই চেক নেবে। কিন্তু কবে যে এগুলি দিয়ে টাকা তোলা যাবে তার অপেক্ষায় থাকলে ওদের সংসার চলবে কী করে? অনেকেরই আবার চালু কোনো ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টই নেই।

এই রাজ্যের একটা গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কের সারা দেশে ৯৭৫টা এ টি এম রয়েছে। তার মধ্যে ৫৪৯টা হতাশা ছাড়া আর কিছুই পরিবেশন করছে না। ওই অচল এ টি এম-গুলির বেশিরভাগই গ্রামীণ এলাকায়। এর প্রভাবের একটা ছেঁদো যুক্তি খাড়া করা হয়, ‘‘গ্রামীণ এলাকা ধারের উপরেই চলে। নগদের এখানে কোনো মানেই নেই।’’ সত্যিই? এটাই এখানে সবকিছু।

একেবারে নিচের স্তরে লেনদেনের সিংহভাগটাই চলে নগদে। এক সপ্তাহের মধ্যে ছোট নোট না পৌঁছালে আইন-শৃঙ্খলার সমস্যার ভয় পাচ্ছেন ছোট গ্রামীণ শাখার ব্যাঙ্ককর্মীরা। অন্যরা বলছেন, সংকট তো এর মধ্যেই রয়েছে। এই সময়ের মধ্যে কিছু নগদ এলেও তা কিছুই কমবে না।

ঔরঙ্গাবাদে আরেকটা লাইনের সামনে দাঁড়িয়ে ভয়ে সিঁটিয়ে পারভেজ পাঠান। এক কনস্ট্রাকশন সাইটের সুপারভাইজার। ভয় পাচ্ছেন কখন তাঁর সাইটের শ্রমিকরা খেপে গিয়ে তাঁকে মারতে আসেন। ‘‘ওরা তো ওদের কাজ করেছে, ওদের তো পয়সা দিতে হবে।’’ বলছিলেন, ‘‘কিন্তু আমার হাতে কোনো নগদ টাকা নেই।’’ চিকলথানা গ্রামে, রাইস আখতার খান বলছিলেন, তিনি আর তাঁর মতোই কমবয়সি অন্য মায়েদের এখন ছেলেমেয়ের জন্য খাবার জোগাড়ই দায় হয়েছে। কখনই বা তাঁরা করবেন এসব। ‘‘কারণ দিনের বেশিরভাগটাই তো চলে যাচ্ছে লাইন দিতে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা চলে যাচ্ছে, ছেলেমেয়েগুলো অভুক্ত থেকে যাচ্ছে।’’

লাইনে দাঁড়ানো বেশিরভাগ মহিলাই বলছেন, তাঁদের হাতে ২-৪দিনের সুযোগ আছে। খুব কষ্ট করেও তাঁরা এমনটা ভাবতে পারছেন না, তার মধ্যে ক্যাশ ফ্লো’র সমস্যা মিটে যাবে। হায়! সমস্যা মেটার নয়।

কৃষক, ভূমিহীন খেতমজুর, গৃহপরিচারক, পেনশনভোগী, ছোটখাটো ব্যবসাদার, আরও অনেকে- সকলেই ভয়ানক আঘাতের মুখে। এমন অনেকেই রয়েছেন যাঁরা শ্রমিকদের কাজে লাগাতে গিয়ে ধারের খাতায় চলে যাবেন, মজুরি মেটাতে টাকা ধার করতে হচ্ছে। আবার অন্যদের মতো তাঁদের খাবার কিনতে পয়সা জোগাড় করতে হচ্ছে। ঔরঙ্গাবাদ স্টেশন রোডে স্টেট ব্যাঙ্ক অব হায়দরাবাদের শাখার এক কর্মী জানালেন, ‘‘যত দিন যাচ্ছে, আমাদের লাইন বেড়েই চলেছে, কমার নাম নেই।’’ হাতে গোনা এই সামান্য কর্মী নিয়ে এই বিপুল পরিমাণ লোক সামাল দেওয়া মুখের কথা। আরেক কর্মী আবার তুলে ধরলেন সফটওয়ারের ত্রুটির কথা, যা পরিচিতিপত্র ও অন্যান্য কাগজপত্র যাচাইয়ের জন্য পাঠানো হয়েছে।

লোককে দুটো ২০০০টাকা নোটের জন্য সর্বোচ্চ আটটা ৫০০ কিংবা চারটি ১০০০টাকা নোট বদলের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। এটা এককালীন লেনদেন। ‘‘হ্যাঁ, পরদিনই যদি আপনি আবার চেষ্টা করেন তাহলে আপনার ধরা পড়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু আপনি এই ফাঁদ এড়িয়ে যেতে পারেন। কিছুই না, কেবল একটা অন্য আইডি ব্যবহার করুন। আজ যদি আপনি আধার কার্ড ব্যবহার করেন, কাল তাহলে আপনার পাসপোর্ট নিয়ে আসুন, তার পরদিন আনুন প্যান কার্ড, ধরা না পড়েই আপনি বারে বারে টাকা বদলে যেতে পারবেন।’’

এখন, বাস্তবে যদিও কম লোকই এমনটা করছেন। বেশিরভাগই সিস্টেমের এই ত্রুটির কথাটা জানেই না। কিন্তু সরকারের প্রতিক্রিয়া উন্মাদের মতো। ওরা এখন লোকের হাতে ভোটের কালি লাগানোর কথা ঠিক করেছে। কালি লাগানো হবে ডানহাতে যাতে যেখানে যেখানে উপনির্বাচন রয়েছে সেখানে কোনো সমস্যা না হয়।

স্টেশন রোডের লাইনে দাঁড়ানো ছোট ঠিকাদার আর পাতিল বললেন, ‘‘সরকারের অর্ডার নিয়ে কখনো ভাববেন না।’’ ‘‘বাস্তবে কোথাও কোনো হসপিটাল বা ওষুধের দোকানে ৫০০ বা ১০০০-এর নোট নিচ্ছেই না।’’ পাতিলের পাশে দাঁড়ানো সঈদ মোদক বলে উঠলেন। পেশায় কাঠের মিস্ত্রি সঈদকে গুরুতর অসুস্থ এক নিকটাত্মীয়কে নিয়ে ক্লিনিকে ক্লিনিকে ঘুরতে হয়েছে। ‘‘প্রত্যেক জায়গা থেকে আমাদের ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে।’’ বলছিলেন, ‘‘হয় তারা ২০০০টাকার নোট নেবে না, নয়তো বলেছে, খুচরো নেই।’’

এরই মধ্যে গোটা ভারতের চোখ এখন নাসিকের উপর, সেখান থেকে নতুন ছাপা নোট বেরিয়ে আসবে। গ্রামাঞ্চলের কেউই এখনও তা হাতে পাননি। তবে সকলেরই আশা  তা ঘটবে।


   Courtesy: Ganashakti

Advertisements

Tags: , , , , , , , , , ,

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s


%d bloggers like this: