Unforgettable Sudhirlal Chakraborty

অবিস্মরণীয় সুধীরলাল

সুরেন মুখোপাধ্যায়

কালের অনিবার্য নিয়মেই শতবর্ষে উপনীত হলেন শিল্পী ও সুরকার সুধীরলাল চক্রবর্তী। সুধীরলালের গান বাংলা কাব্যসংগীতের ইতিহাসে একটি স্বতন্ত্র ধারা। শতবর্ষের দূরত্ব থেকে আজ মনে হয় সুধীরলালের সংক্ষিপ্ত জীবনের গায়ন ও সুরনির্মাণ পদ্ধতি কতদূর বিস্তৃত। কতখানি স্বতন্ত্র ছিল তাঁর সংগীত শিক্ষা ও সংগীত ভাবনার পরিপ্রেক্ষিত। যুগ যায় যুগ আসে, সেই চলমান সুরপ্রবাহের বৈশিষ্ট্য ফুটিয়ে তোলাই ছিল তাঁর শিল্পী মনের মুখ্য বিষয়।সুধীরলালের গান যেন অনায়াস শ্বাসপ্রশ্বাস। যেন সরোবরে হংসসম সঞ্চরণ। তাঁর গাওয়া গান আধুনিকতার যান্ত্রিক কোলাহল পেরিয়ে হৃদয়ে শিকড়ের সন্ধানে পরিব্যাপ্ত থাকে। কথার অতলান্তে ডুবে ভাবের মুক্তো তুলে এনে কাব্য সংগীতের অনুপম মালা গেঁথে দেয়। তার এইসব মায়াবী গুণের জন্যই সুধীরলাল সামাজিক নানা ঝড়-তুফানের পরেও জন্মশতবর্ষে আজও অমলিন থাকেন এবং বাংলা গানের ইতিহাসে ভবিষ্যতেও উজ্জ্বল হয়েই থাকবেন।

হেমন্ত মুখোপাধ্যায়কে একবার আমীর খাঁ বলেছিলেন — ‘আধুনিক ফাধুনিক বুঝি না। যে সুর লাগাতে জানে, যে গান সুরে ভরিয়ে দেয়, আনন্দ দেয় সেই তো প্রকৃত সংগীত। তুমি দু-ঘণ্টা ধরে কালোয়াতি করলে অথচ সুর লাগলো না, হৃদয়কে নাড়া দিল না, আনন্দ দিলো না। তাকে সংগীত বলি কী করে— কথাটা বড় সত্যি মনে হয় সুধীরলাল প্রসঙ্গে। তাঁর ‘মধুর আমার মায়ের হাসি’, ‘ও তোর জীবনবীণা’, ‘খেলাঘর মোর ভেঙে গেছে’, ‘রজনী গো যেওনা চলে’, ‘গান গেয়ে মোর দিন কেটে যায়’, ‘তুমি ছিলে তাই ছিল গো লগন’, ‘প্রথম দিনের প্রথম সে পরিচয়’, ‘মিলনের গান তোমার আমার নয়’, ‘এ জীবনে মোর যত কিছু ব্যথা’ ইত্যাদি গান এখনও শ্রোতাদের মনে উজ্জ্বল হয়ে আছে মায়াবী কণ্ঠ ও সুরের মোহজালে হৃদয় নাড়িয়ে মন ভরিয়ে দিতে পারে বলেই। দু-ঘণ্টা কালোয়াতি নয়, শুধু সাড়ে তিন মিনিট সময়েই শ্রোতাদের অবিষ্ট করে মাত করে দিতে পারেন সুধীরলাল চক্রবর্তী।

সুধীরলালের গানের গঠন-শৈলী একেবারেই লোকজ এবং ক্ল্যাসিকাল। প্রধানত ক্ল্যাসিকাল হলেও তাঁর গায়কী এবং সুরের বুনটের মধ্যে যে টানাপোড়েন তা উচ্চকিত নয়। রাগ-রাগিনীকে তিনি ভাবের নিরিখেই দেখেছেন। তিনি নিজে যখন ‘মধুর আমার মায়ের হাসি’, ‘ও তোর জীবনবীণা’, ইত্যাদি গান গাইছেন তখন শ্রোতাদের মনে হচ্ছে কত অনায়াস, কত মধুর কত স্নিগ্ধ সে চলন। একটু খেয়াল করলে দেখা যাবে মার্গ সংগীতে অত্যন্ত দক্ষ হলেও তিনি তৎকালীন প্রবহমান সুরের শাস্ত্রীয় ধারা থেকে অনেকখানি সরে গিয়েছেন। কথার ভাবানুসারে সুর নির্মাণ ক্ষেত্রে তিনি রাগ-রাগিনীর মেদ ঝরিয়ে দিয়েছেন, ছোটো ছোটো দ্রুত তান বাদ দিয়েছেন। মিড় ছোটো করে হালকা মুড়কি দিয়েছেন, হরকৎ-ফিরৎ একেবারে বর্জন করেছেন। অর্থাৎ যতখানি স্বাভাবিক আবেগে উচ্চারণ করা যায় ততটাই রেখেছেন।

এ প্রসঙ্গে তাঁর সুরারোপিত তিনটি গানের উল্লেখ করি। একটি হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের গাওয়া ‘শুধু অবহেলা দিয়ে বিদায় করেছ যারে’, দ্বিতীয়টি শ্যামল মিত্রের গাওয়া ‘শেষ কথা আজি বলে যাও’ এবং তৃতীয়টি উৎপলা সেনের গাওয়া ‘এক হাতে মোর পূজার থালা’। এইসব গানের সুর শুনলে কখনই মনে হবে না শুধু কথার ওপর রাগনির্ভর বৈশিষ্ট্যহীন সুর সৃজন। কথার সেন্টিমেন্ট অনুসারে জাত শিল্পীর পরিচয়েই রাগরাগিনী সুপ্ত রেখে সুধীরলাল সুর করে দিয়েছিলেন এবং গানগুলি তুলে দিয়েছিলেন কোন্‌ কণ্ঠবৈশিষ্ট্যে কোন্‌ গানটি উত্তীর্ণ হবে এটা বুঝেই। এইজন্যে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের গানে খাড়া কাটা স্বরের প্রয়োগ কিন্তু শ্যামল মিত্রের ক্ষেত্রে লম্বা মিড়।

সুধীরলালের গানের আরও একটা বড় বৈশিষ্ট্য হলো তালকে সঙ্গে নিয়ে গান করা। শাস্ত্রীয় বিধিবদ্ধ তাল তার নিজের স্থানে ঠিকই আছে। কিন্তু আধুনিক গানে তাকে মাখিয়ে নিতে হয় গানের কথার সঙ্গে। সুরের সঙ্গে আপন যতিবোধকে সার্থকভাবে, সাংগীতিকভাবে স্থাপনা করতে হয়। সুধীরলাল তালকে তাঁর গানের নিজস্ব স্টাইলের সঙ্গে সহায়ক হিসাবে ব্যবহার করেছিলেন। বহু নামী শিল্পীকে দেখেছি তালের ব্যাপারে অকারণ সতর্কতা। আড়িতে গাইবার প্রবণতা, যা গানের অন্তর্নিহিত মাধুর্যকে অনেক ক্ষেত্রে ব্যাহতও করেছে। কিন্তু সুধীরলালের গানের সঙ্গে তাল যেন বশংবদ অনুগামীর মতো চলেছে। নিজের সুরে গাওয়া ‘আঁখি তারে ভোলে যদি’, ‘ছাইল অম্বর ঘন মেঘে’ অথবা ‘কেন ডাক পিয়া পিয়া শুনলে’ বোঝা যাবে তালের সহজ ও সঠিক ব্যবহার গানকে কত মজিয়ে দিতে পারে।

সুধীরলাল চক্রবর্তী জানতেন মার্গ সংগীতের ভিত না থাকলে বিভিন্ন রকমের গান ভাল করে রসিয়ে গাওয়া কঠিন। ‘রজনী গো যেওনা চলে’ অথবা গজল প্রভাবান্বিত ‘বনভূমি শ্যামায়িত’, কাওয়ালি ছন্দ ও তালে ‘দোলানো কেন ডাক পিয়া পিয়া’ ইত্যাদি গানের মাধুর্য ফুটিয়ে তুলতে হলে গায়কীর যে মুনশিয়ানার দরকার তা তো তাঁর ছিলই, উপরন্তু এক গম্ভীর ন্যাজাল টোনের জাদু দিয়ে তিনি তৎকালীন গানের গতানুগতিকতার বেড়াটাকেই একেবারে ভেঙে দিয়েছিলেন। ওঁর গলার খাদের আওয়াজটা ছিল ভারী স্নিগ্ধ। তার সপ্তকে প্রবেশ করতো একটু ন্যাজাল টোন এবং দুয়ে মিলে পেথোজ বা বেদনাভরা আর্তি চমৎকার ফুটে উঠতো। ‘রজনী গো যেওনা চলে’ গানে ‘রজনী গো’ তার সপ্তকে বলে যেভাবে যেওনা চলে মধ্য সপ্তক দিয়ে অবরোহণে নেমে এসেছে, তাতে প্রাণস্পর্শী হয়ে উঠেছে বিদায় আসন্ন রজনীকে ধরে রাখার আকুল প্রয়াস। সুধীরলালের মতো দরদি শিল্পীর গান তাই একাধারে সমকালীন, সেই সঙ্গে সময়োত্তীর্ণ।

সুধীরলালের জন্ম ১৯১৬ সালে অধুনা বাংলাদেশের ফরিদপুর জেলার কোটালিপাড়া পরগনার অন্তর্গত বালিয়াভাঙা গ্রামে। শৈশব থেকেই গানের প্রতি ছিল তাঁর সুতীব্র আকর্ষণ ও অনুরাগ। জন্মলব্ধ সুকণ্ঠের অধিকারী সুধীরলাল অনায়াসে গান তুলে তৎক্ষণাৎ গেয়ে সবাইকে মুগ্ধ করে দিতে পারতেন। পিতা গঙ্গাধর চক্রবর্তীও ছিলেন সংগীত প্রিয় মানুষ। বাড়িতে গানের আসর মাঝে মাঝেই বসতো। একবার বহরমপুরে একটি আসরে গান গাইতে এসেছেন তৎকালের অন্যতম সংগীত নায়ক গিরিজাশঙ্কর চক্রবর্তী। হাফ-প্যান্ট পরা সুধীরলাল মাত্র এগারো বছর বয়সে সেখানে উপস্থিত এবং শ্রোতাদের আদেশে প্রথমে একটি গান করলেন। সেই গান শুনে গিরিজাশঙ্কর মুগ্ধ, যিনি ছাত্র নির্বাচনের ক্ষেত্রে অত্যন্ত রক্ষণশীল ছিলেন, যথেষ্ট সুর চেতনাসম্পন্ন না হলে সংগীত শেখাতেন না, সেই সংগীত নায়ক গিরিজাশঙ্কর চক্রবর্তী নিজেই সুধীরলালকে সংগীত শিক্ষাদানে আগ্রহ প্রকাশ করলেন। আর গানের টানে সুধীরলাল কলকাতার গড়পাড়ে মামার বাড়িতে এসে উঠলেন। এইভাবেই গিরিজাশঙ্করের তত্ত্বাবধানে সুধীরলালের ধ্রুপদ ধামার খেয়াল, ঠুংরির ভাণ্ডার ক্রমশই সমৃদ্ধ হতে লাগলো।

নানা আসরে শিক্ষক গিরিজাশঙ্কর এই ছাত্রকে সংগীত পরিবেশনের জন্য পাঠাতেন এবং ছাত্রও সাফল্যের সঙ্গে সংগীত পরিবেশন করে আসতেন। ক্রমে মামাবাড়ি ছেড়ে গুরুগৃহে বসবাস এবং আপন প্রতিভা ও দক্ষতায় খেয়াল ঠুংরিতে অনন্য শিল্পী হয়ে ওঠেন। এলাহাবাদ মিউজিক কম্পিটিশন এবং বেঙ্গল মিউজিক কম্পিটিশনে সুধীরলাল অসাধারণ কৃতিত্বের নিদর্শন রাখেন এবং রেডিওতেও সংগীত পরিবেশনের সুযোগ পান। তখনও সুধীরলাল যৌবনে পা রাখেননি। তখন রেডিওতে লাইভ প্রোগ্রাম হতো। একবার রেডিওতে সকাল ৮-৩০ মিনিটে অনুষ্ঠান। সকাল সাড়ে সাতটার পরে সুধীরলাল এসে গুরুর কাছে বিলাসখানি টোড়ির ওপর বিখ্যাত গান ‘এ ছত্র নেহে সে যাই’ তুলে রেডিও-তে গাইলেন। গানের চলন এবং গান এত অপূর্ব হয়েছিল যে স্বয়ং গিরিজাশঙ্করও মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিলেন। সুধীরলাল ক্রমেই বাংলার রাগসংগীত চর্চার ক্ষেত্রে একটি প্রিয় নাম হয়ে উঠলেন।

বেতারে নিয়মিত গান করতে করতেই ১৯৪৩ সালে তিনি ঢাকার বেতার কেন্দ্রের মিউজিক সেকশনের প্রডিউসার হিসাবে যোগদান করেন। এখানেই তিনি পেয়ে যান বন্ধু ও সংগীত জীবনের অন্যতম সুহৃদ পবিত্র মিত্রকে। প্রকৃতপক্ষে এখান থেকেই বাংলা গানের আরও একটি বাঁক এলো এই যুগলবন্দির মধ্য দিয়ে। যদিও সুধীরলাল চক্রবর্তীর প্রথম রেকর্ড প্রকাশিত হয় ১৯৩৯ সা‍‌লে হিন্দুস্তান রেকর্ড কোম্পানি থেকে দেবেশ বাগচীর কথায়। নিজের সুরে সুধীরলালের গাওয়া গান দুটি ছিল ‘ভালোবেসেছিনু আলেয়ারে’ এবং ‘রজনী গো যেওনা চলি’ গান দুটি প্রবল জনপ্রিয় হয়। ১৯৪৫ সালে গানের টানে কলকাতায় ফিরলেন সুধীরলাল এবং নিয়ে এলেন বন্ধু পবিত্র মিত্রকেও। পবিত্র মিত্রের কথা ও সুধীরলালের সুরে জোয়ার এলো। অজস্র কালজয়ী গান তৈরি হলো এই যুগলবন্দিতে। এরমধ্যে উল্লেখযোগ্য কিছু গান হলো ‘ওগো নয়নে আবীর দিও না’ শিল্পী নীতা বর্ধন, ‘যে দিন রব না আমি’ শিল্পী অনন্তদেব মুখোপাধ্যায়, ‘কার বাঁশি বাজে আজ’ শিল্পী সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায় ‘এ জীবনে মোর যত কিছু ব্যথা’ — শিল্পী সুধীরলাল, ‘খেলাঘর মোর ভেসে গেছে হায়’ শিল্পী সুধীরলাল, ‘তোমার আঁখির পরে’ শিল্পী সবিতা সিং ‘কেন মিছে ফিরে চাও’ শিল্পী গায়ত্রী বসু, ‘ঘুমায়ো না সহেলি গো’ শিল্পী মানবেন্দ্র মুখোপাধ‌্যায়, ‘জীবনের পথে শুধু কেন’ শিল্পী উৎপলা সেন, ‘ওগো মোর গানের পাখি’ শিল্পী সুপ্রভা সরকার, ‘স্মৃতি তুমি বেদনার’ শিল্পী শ্যামল মিত্র, ‘শুধু অবহেলা দিয়ে বিদায় করেছ যারে’ শিল্পী হেমন্ত মুখোপাধ্যায়সহ আরও অজস্র গান। বাংলার পাশাপাশি হিন্দি গীত গজল, কাওয়ালি সমৃদ্ধ হলো তাঁর কণ্ঠ স্পর্শে। ছায়াছবির জগতে প্রথম সুর করেন ১৯৫০ সালে ‘গরবিনী’ ছবিতে। ১৯৫১ সালে ‘সুনন্দার বিয়ে’ এবং ‘জাগরণ’ এই দুটি ছবিতে সঙ্গীত পরিচালনা করেন এরমধ্যে ‘সুনন্দার বিয়ে’ ছবির গান প্রবল জনপ্রিয় হয়। ১৯৫২ সালের ২০শে এপ্রিল মাত্র ছত্রিশ বছর বয়সের জীবনাবসান হয় সুধীরলাল চক্রবর্তীর।

শিক্ষক হিসাবেও অত্যন্ত সফল তিনি। তাঁর হাতে গড়া কিছু অসামান্য ছাত্রছাত্রী আছেন, যারা উত্তরকালে বাংলা গানের শ্রোতধারাটি সফলভাবে বহন করে নিয়ে গিয়েছেন, বাংলা গানের স্বর্ণযুগের যে মেলোডি, সুধীরলাল সঠিকভাবেই তাঁদের সে পথে পরিচালিত করেছেন। শ্যামল মিত্র, উৎপলা সেন, নীতা বর্ধন, গায়ত্রী বসু, অপরেশ লাহিড়ী তাঁর কৃতী ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে অন্যতম। একটি সাক্ষাৎকারে শ্যামল মিত্র একবার বলেছিলেন— ভালোভাবে সংগীতশিক্ষা আরম্ভ করি সুধীরলাল চক্রবর্তীর কাছে। সুধীরদা আজ নেই, কিন্তু আজ আমার যেটুকু সাফল্য আপনারা দেখছেন, এর মূলে ছিলেন সুধীরদা। আমাকে গড়ে তোলার ব্যাপারে তিনি দিনরাত অক্লান্ত পরিশ্রম করতেন এবং তাঁরই চেষ্টায় আমি রেকর্ড ও ফিল্মে গান করি। গান শেখাবার কালে গভীরভাব নিয়েই তিনি এমনভাবে ছাত্রছাত্রীদের শেখাতেন যাতে সুর তাল এসবের সঙ্গে গানের ভাবও হৃদয়ের মধ্যে গেঁথে যায়। আসলে গান ছিল সুধীরলালের মনের আশ্রয়। অনুভূতির অভিব্যক্তি ছিল তাতে আর ছিল সহজ আর্তি, কিন্তু ভাবালুতা নয়। এই অনুভূতির অনুকরণীয় প্রকাশভঙ্গি তিনি শিখিয়ে গেছেন নিজের ছাত্রছাত্রীদের।

সুরকার সুধীরলালের সুর নির্মাণের ক্ষেত্রে বিশেষ কয়েকটি উল্লেখযোগ্য দিক ছিল। ভারতীয় রাগসংগীতকে ভিত্তি করে আপন প্রতিভার জারক রসে নিজস্ব মিড়, মুড়কির স্পর্শে গানের বাণী ও ভাবকে ফুটিয়ে তুলতেন যথার্থ সুরশিল্পীর মতো। শিল্পীর কণ্ঠের গঠন অনুসারে গান তিনি এমনভাবে বাছতেন যাতে গানটি শেখাবার সময়েই সুর ও বাণীর যুগল সম্মিলনে গানটি অন্যতর আবেদন সৃষ্টি করে। প্রত্যেক শিল্পীর কণ্ঠে যে ভাল দিকটি থাকে গানটি শিল্পী কণ্ঠের সেই ভাল দিকের স্বরসংগতি স্বচ্ছন্দ খেয়াল রেখে গানটি তুলিয়ে দিতেন। ফলে শিল্পীর পক্ষে গান পরিবেশন করাটা অনায়াস হয়ে উঠতো। যে শিল্পীই সুধীরলালের সুরে গান গেয়েছেন সেই গান জনপ্রিয় তো হয়েছেই, শিল্পীও গানটি গেয়ে প্রতিষ্ঠা পেয়েছেন। অনন্তদেব মুখোপাধ্যায়ের ‘যে দিন রবো না আমি’, প্রতিমা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘উছল তটিনী আমি’, ‘পান্না কাওয়ালের আমারে ভুলিতে’, উৎপলা সেনের ‘কেন জাগে শুকতারা’, অপরেশ লাহিড়ীর ‘সেই মালা দেওয়া নেওয়া’, গীতা দত্তের কণ্ঠে ‘বৃন্দাবনে শ‌্যাম নাই ফুলে মধু নাই’, গায়ত্রী বসুর ‘কেন এলে মধুরাতে’, এবং সুধীরলালের জীবনাবসানের পর শ্যামল মিত্রের কণ্ঠে ‘স্মৃতি তুমি বেদনার’ শুধু গান হিসেবেই কালজয়ী হয়নি, শিল্পীদেরও এনে দিয়েছে প্রাতিষ্ঠানিক সাফল্য।

সুধীরলালের ভিতরে একটা কবি মন ছিল, তাই বিভিন্ন গীতিকারদের রচনাতে আপন কবিসত্ত্বার কারণে লিরিক অনুসারে যথাযথ সুরে সাজানোর ধ্যানকে যুক্ত করে রসোত্তীর্ণ ও কালজয়ী গান উপহার দিতে পেরেছেন। ‘মধুর আমার মায়ের হাসি’ অথবা ‘স্মৃতি তুমি বেদনার’ মতো গানে কথার যে অন্তর্মুখীনতা, যে আত্মনিবেদনের মাধুর্য, তার গভীরে প্রবেশ করতে না পারলে এই সুর করা একেবারেই অসম্ভব। রবীন্দ্রনাথ জানিয়েছিলেন বাংলার সুর কথাকে খোঁজে। সে যুগল মিলনের পক্ষপাতী একের যোগেই অন্যটি সার্থক। অত্যন্ত সম্ভ্রান্ত শিক্ষার ঔজ্জ্বল্যের জন্যই ভাবনার সঙ্গে একাত্ম হয়ে এমন মন কেমনের দোলা জাগানো সুরে সুধীরলাল গানগুলিকে বাঁধতে পেরেছিলেন। এইসব গান যেমন কাব্যধর্মীতায় সমৃদ্ধ তেমনি সুরের আভিজাত্যে উজ্জ্বল। আমাদের অতি পুরাতন অতি প্রিয় রাগও যেন নবরূপে সেজে সুধীরলালের হাত ধরে বিচিত্ররূপে আত্মপ্রকাশ করেছে। এটাই সুরকার সুধীরলালের বিশেষত্ব। শিল্পী ও গবেষক ড. অনুপ ঘোষাল সুধীরলাল সম্পর্কে মূল্যায়ন করতে গিয়ে যথার্থই বলেছেন — ‘রাগসংগীত ভেঙে সুধীরলাল যে সমস্ত সুর রচনা করেছিলেন বাংলা এবং হিন্দিতে সে সব গানে ছিল এক অনিন্দ্য সুন্দর মেলোডি, অপূর্ব স্বাদ। সংগীত প্রেমিক বাঙালির কাছে তা ছিল অভূতপূর্ব। সুরসাগর হিমাংশু দত্তের পর সুধীরলাল চক্রবর্তী হলেন বাংলার আরেক ব্যক্তিত্বময় সুরস্রষ্টা যিনি ক্ষণিক সময়ের জন্য এ জগতে অবস্থান করলেও কর্মের ঔজ্জ্বল্য দিয়ে বাংলা গানের ভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করে গেছেন।

সুধীরলাল যখন গানের ক্ষেত্রে এলেন তখন বাংলায় সংগীত প্রতিভা বড় কম ছিল না। কৃষ্ণচন্দ্র দে ছিলেন, পঙ্কজকুমার মল্লিক ছিলেন। ছিলেন শচীনদেব বর্মণ, ছিলেন জগন্ময় মিত্র। কিন্তু গায়কের আবেগ, গলার মাদকতা, স্বরক্ষেপণ, বিশুদ্ধ উচ্চারণ এবং কথা ও সুরের সঙ্গে নিজেকে একাত্ম করে নেওয়ার অনন্য ক্ষমতায় সুধীরলাল তখনই অন্যদের চেয়ে অনেকটাই স্বতন্ত্র। সংগীত বোধের চমৎকারিত্বে অনেকটাই আলাদা। আসলে কথা ও সুরের ওপর ব্যক্তি অনুভূতি আবেগের এমন পাতলা এক আস্তরণ তাঁর গানে মিশে আছে যে এই অনুভূতির আঘ্রাণে আন্তরিকতায় তিনি অন্যদের থেকে নিজেকে ব্যতিক্রমী করেছেন। যার জন্যে ‘মধুর আমার মায়ের হাসি’, ‘খেলাঘর মোর ভেঙে গেছে’, ‘এ জীবনে মোর যতকিছু ব্যথা’, ‘ভালোবেসে ছিনু’ ইত্যাদি বিষাদঘন গানগুলি আজও হৃদয়ে বুলিয়ে দেয় স্নিগ্ধ চন্দনের প্রলেপ। আর এখানেই সুধীরলাল ট্রেন্ডসেটার, বাংলা গানের মাইল-ফলক। নিজের সময়ের চেয়ে এগিয়ে থাকার মানসিকতার দৃষ্টান্ত ছড়িয়ে আছে তাঁর গান ও সুরের সর্বত্র। তিনটি সপ্তক জুড়ে সুরের বিচরণ কিন্তু আশ্চর্য স্নিগ্ধ; জটিল সুর বিন্যাস কিন্তু আশ্চর্য আবেগঘন, নির্লিপ্ত। আমাদের রুচিবোধ গড়ে দেওয়ার, তৃপ্তি দেওয়ার মহার্ঘ্য সম্ভার নিয়ে আজও উজ্জ্বল হয়ে আছেন তিনি। বিশেষত এই মূল্যবোধহীন, সুরের নামে অস্থির সময়ে নিরাসক্ত বাউল সুধীরলাল বড় প্রাসঙ্গিক হয়ে আমাদের কাছে আসেন। তিনি বাংলা গানের এক চিরকালীন নস্টালজিয়া।


   সৌজন্যেঃ গণশক্তি

Advertisements

Tags: , , , , , , ,

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s


%d bloggers like this: