Sangh-Inspired Film Censor Board

অমর্ত্য সেনকে নিয়ে তথ্যচিত্রে কোপ
তীব্র ক্ষোভের মুখে সেন্সর বোর্ড

নয়াদিল্লি ও কলকাতা, ১২ই জুলাই– তাঁকে নিয়ে তৈরি তথ্যচিত্রে কয়েকটি অতি সাধারণ শব্দেও সেন্সর বোর্ডের নিষেধাজ্ঞায় বিস্মিত অমর্ত্য সেন বলেছেন, এ থেকে প্রমাণ হচ্ছে দেশ এক স্বৈরাচারী রাজত্বের হাতে চলে গেছে। দেশের পক্ষে কী ভালো তা তারাই একমাত্র স্থির করবেন এবং চাপিয়ে দেবেন দেশের মানুষের ওপরে।অমর্ত্য সেনের জীবন ও কাজ নিয়ে তৈরি তথ্যচিত্র ‘দি আর্গুমেনটেটিভ ইন্ডিয়ান’—এর পরিচালক সুমন ঘোষকে সেন্ট্রাল বোর্ড অব ফিল্ম সার্টিফিকেশন জানিয়েছে বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদের উচ্চারিত কয়েকটি শব্দ বাদ দিতে হবে। পরিচালক জানিয়েছেন, অন্তত চারটি শব্দ বাদ দিতে বলা হয়েছে: গোরু, গুজরাট, ভারত সম্পর্কে হিন্দুত্ববাদী দৃষ্টিভঙ্গি, হিন্দু ভারত। কলকাতায় সেন্সর বোর্ডের দপ্তরে তিন ঘণ্টা ধরে তথ্যচিত্রটি খুঁটিয়ে দেখার পরে বোর্ডের তরফে ওই রায় দেওয়া হয়েছে। পরিচালক বুধবার বলেছেন, তাঁকে মৌখিক ভাবেই ওই শব্দগুলি বাদ দিতে বলা হয়েছে। আমি এ ব্যাপারে আমার অপারগতার কথা জানিয়েছি।

পরিচলাক সুমন ঘোষ বলেছেন, তথ্যচিত্রটি নির্মিত হয়েছে অমর্ত্য সেনের সঙ্গে তাঁর ছাত্র ও বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ কৌশিক বসুর কথোপকথনের ধাঁচে। এই আলোচনার মধ্যে থেকে কয়েকটি শব্দ বাদ দিলে তথ্যচিত্রের মর্মবস্তুই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। আমি সেন্সর বোর্ডের লিখিত বক্তব্যের জন্য অপেক্ষা করছি। মুম্বাইয়ে রিভিউ কমিটিকে পাঠাবে কিনা, তা-ও দেখতে হবে। তবে যে কোনো পরিস্থিতিতেই আমার উত্তর হবে একই। হয়তো বিষয়টি মিটে যাবে, কিন্তু আমি কোনও শব্দ সরিয়ে নেব না। সুমন ঘোষ নিজেও অর্থনীতির শিক্ষক। ২০০২ থেকে ২০১৭ পর্যন্ত ১৫ বছরে ছবিটি নির্মিত।

অমর্ত্য সেন নিজে এই ঘটনা জেনে ‘বিস্মিত’। স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিমায় তিনি বলেছেন, এমনিতে ‘গোরু’ আমার খুব পছন্দের শব্দ এমন নয়। আসলে গোরু নয়, আপত্তি গুজরাট নিয়ে। এই নয় যে গুজরাট শুনলেই ওঁরা আপত্তি করবেন। ২০০২-এ গুজরাটে কী ঘটেছিল সেটা বলেছি বলে এই আপত্তি।

জানা গেছে, তথ্যচিত্রে গুজরাটের ২০০২-র ঘটনাবলীর উল্লেখ এসেছে কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ে অমর্ত্য সেনের একটি বক্তৃতায়। সেই ভাষণে গণতন্ত্রের গুরুত্বের কথা বোঝাতে গিয়ে গুজরাটে সরকারি মদতে অপরাধের কথা এসেছিল। এই তথ্যচিত্র ইতিমধ্যেই লন্ডন ভারতীয় চলচ্চিত্র উৎসবে দেখানো হয়েছে।

কৌশিক বসু মন্তব্য করেছেন, ভারতের মতো দেশের মর্যাদার সঙ্গে, অমর্ত্য সেনকে সেন্সর করা, মেলে না। ভারত যেসব দেশের প্রতিনিয়ত সমালোচনা করে থাকে, এই ব্যবহার তাদের সঙ্গেই তুলনীয়।

সেন্সর বোর্ডের নির্দেশ নিয়ে ক্ষোভ ছড়িয়েছে। বিশিষ্ট শিল্পী, বুদ্ধিবৃত্তির জগতের মানুষজন প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছেন, কোন্‌ ফতোয়ায় সেন্সর বোর্ড চলছে। বিশিষ্ট চিত্র পরিচালক বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত এদিন বলেন, সেন্সর বোর্ড একটি রাজনৈতিক দলের আখড়ায় পরিণত হয়েছে। তাঁবেদার সংগঠনের কাজ করছে। অমর্ত্য সেন কী বলবেন, তা-ও কি ওঁরা ঠিক করে দেবেন নাকি? এ হলো মূর্খামি। এ শুধু সিনেমা জগতের ব্যাপার নয়, সমস্ত গণতান্ত্রিক মানুষেরই উচিত এর জোরালো প্রতিবাদ করা।

অভিনেতা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় বলেছেন, এ তো এক ধরনের ফ্যাসিবাদ। যাঁর মুখের শব্দ নিয়ে আপত্তি করা হচ্ছে তিনি আন্তর্জাতিকভাবে সমাদৃত এক ব্যক্তি। সুতরাং এ চরম বোকামিও। তবে এই সরকারের কাছ থেকে এই ধরনের আচরণ ক্রমশই আসতে থাকবে।

সি পি আই (এম)-র সাধারণ সম্পাদক সীতারাম ইয়েচুরি বলেছেন, নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ গোরু বা হিন্দুত্ব উচ্চারণ করেছেন বলে তথ্যচিত্র বন্ধ হয়ে যাবে? এ কী করে সম্ভব? ওরা ঠিক করছে আমরা কী খাব, কী পরবো, কী বলব, কার সঙ্গে প্রেম করবো, কাকে বিয়ে করব; এখন ওরা ঠিক করতে চাইছে তথ্যচিত্রে কোন কথা আমরা শুনবো

অমর্ত্য সেনকে নিয়ে তথ্যচিত্রে এই বিতর্কের মধ্যেই সামনে এসেছে অনীক দত্তের ছবি ‘মেঘনাদবধ রহস্য’ নিয়ে আরো এক বিতর্ক। এই ছবির রিলিজ এক সপ্তাহ পিছিয়ে গিয়ে হচ্ছে ২১শে জুলাই। ছবির এক প্রযোজক সংবাদমাধ্যমে জানিয়েছেন, সেন্সর বোর্ড ‘রামরাজ্য’ শব্দ ব্যবহার আপত্তি জানিয়েছে। ‘রামরাজ্য’ শব্দটি বাংলায় নানা দ্যোতনায় ব্যবহার হয়। কিন্তু বি জে পি-রাজত্বে এখন এই শব্দের ব্যবহারও বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ছবির প্রযোজক-পরিচালকরা এ নিয়ে তেমন কোনও মন্তব্য না করলেও জানা গেছে, ‘রাম’ শব্দটি বাদ দেবার জন্যই নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পরিচালকের আপত্তি থাকলে তাঁকে রিভিউ কমিটির কাছে আবেদন করতে হবে। সেই আবেদন করা হচ্ছে না বলেই এদিন জানা গেছে।

সেন্সর বোর্ডের মাথায় এখন পহলাজ নিহালনি। তিনি খোলাখুলি বি জে পি-র সমর্থক। একের পর এক ছবির ক্ষেত্রে দক্ষিণপন্থী, হিন্দুত্ববাদী দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বোর্ড আপত্তি জানিয়ে যাচ্ছে। মঙ্গলবারই চিত্র পরিচালক প্রকাশ ঝা বলেছেন, নিহালনি ব্যক্তি হিসেবে কী করছেন, তা বড় কথা নয়। একটি মতাদর্শ পিছনে কাজ করছে।

অমর্ত্য সেন সম্পর্কে বি জে পি ও সঙ্ঘ পরিবারের মৌলিক আপত্তিই রয়েছে। তাঁর ধর্মনিরপেক্ষ অবস্থানকে দেশদ্রোহের সঙ্গে তুলনা করে বি জে পি-র তরফ থেকে বিশেষ করে সোশ‌্যাল মিডিয়ায় লাগাতার প্রচার করা হয়ে থাকে।

Advertisements

Tags: , , , , , ,

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s


%d bloggers like this: