Archive for the ‘Column’ Category

CPI(M)’s Income From ‘Unknown Sources’

February 3, 2017

লক্ষ লক্ষ মানুষের সাহায্যই আমাদের ‘অজানা উৎস’

অভীক দত্ত

বছরখানেক আগে কাঁচড়াপাড়ায় সি পি আই (এম)-র এক কর্মী নিজের ছেলের বিয়ের অনুষ্ঠানের খরচ বাঁচিয়ে ২৫হাজার টাকা পার্টির জন্য দান করেছেন। অবসর গ্রহণের পরে বারাসতের এক রেলকর্মী প্রাপ্ত টাকা থেকে ২৫হাজার টাকা সাহায্য করেছেন। কলকাতায় অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষিকা মৃদুলা ঘোষ কদিন আগেই তাঁর প্রয়াত কন্যা সুরঞ্জনা ভট্টাচার্যের স্মৃতিতে ২লক্ষ টাকা দিয়ে গেছেন। উদাহরণ এরকম অজস্র রয়েছে। কেউ নিজের পি এফ গ্র্যাচুইটির টাকা হাতে পেয়ে দান করেছেন, কেউ মুজফ্‌ফর আহ্‌মদ স্মৃতি পুরস্কার পেয়ে সেই অর্থ পার্টি তহবিলে দিয়েছেন, কেউ বা নিজের সারাজীবনের সঞ্চয় পার্টিকে দিয়েছেন। পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বামপন্থী আন্দোলনের জন্য সাহায্যের এমন অসংখ্য উদাহরণ ছড়িয়ে আছে। টাকার অঙ্ক বড় কথা নয়, কিন্তু মানুষের সাহায্য কী শক্তিধর হতে পারে তা যারা গ্রহণ করে তারাই টের পায়। টাকা আর মানুষের শুভকামনা এখানে একাকার হয়ে মিলেমিশে আমাদের শক্তি দিয়েছে। সি পি আই (এম) তার সংগঠন ও রাজনৈতিক সংগ্রাম পরিচালনার জন্য মানুষের কাছ থেকে এভাবেই অর্থসাহায্য পেয়ে থাকে।কিন্তু কিছু সংবাদমাধ্যমের সাহায্যে গত কয়েক বছর ধরে নিয়মিত প্রচার করা হচ্ছে, অন্য সব রাজনৈতিক দলের মতো সি পি আই (এম)-র আয়ও রহস্যময়, অস্বচ্ছ। সি পি আই (এম)-রও আয়ের বেশিরভাগই নাকি ‘অজানা উৎস’ থেকে। এক কথায় ভূতুড়ে। উদ্দেশ্যটা পরিষ্কার, এই রাজনৈতিক চৌর্যবৃত্তির রমরমা বাজারে সি পি আই (এম)-র গায়েও কালির ছিটে লাগানো। বুঝিয়ে দেওয়ার চেষ্টা, দুর্নীতিতে সব রাজনৈতিক দলই সমান। মুড়ি আর মিছরি এক করে দেখানোর চেষ্টা।

সম্প্রতি দু-একটি সংবাদমাধ্যমে লেখা হয়েছে, ‘‘২০০৪-’০৫ থেকে ২০১৪-’১৫। এই ১১ বছরে দেশের রাজনৈতিক দলগুলির তহবিলে মোট ১১,৩৬৭ কোটি টাকা চাঁদা জমা পড়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৬৯ শতাংশ ক্ষেত্রেই চাঁদার উৎস কী, তা কেউ জানে না।’’ অ্যাসোসিয়েশন ফর ডেমোক্রেটিক রিফর্মস (এ ডি আর) নামের একটি সংস্থার প্রকাশিত রিপোর্ট উদ্ধৃত করে ঐ সংবাদে অজানা উৎস থেকে আয়ের ক্ষেত্রে বি জে পি, কংগ্রেস, তৃণমূল কংগ্রেস এবং অন্যান্য দক্ষিণপন্থী দলের সঙ্গে সি পি আই (এম)-রও নাম উল্লেখ করে লেখা হয়েছে, এই ১১ বছরে সি পি আই (এম)-র মোট আয় প্রায় ৮৯৩ কোটি টাকা। এরমধ্যে ৪৭১.১৫ কোটি টাকা ‘অজানা উৎস থেকে’।

একটু খেয়াল করলেই দেখা যাবে সি পি আই (এম)-র আয়ের উৎস নিয়ে প্রশ্ন তোলা প্রায় প্রতি বছরের একটি নিয়মিত ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর আগেও কিছু সংবাদমাধ্যম সি পি আই (এম)-র আয়ের উৎস নিয়ে অপপ্রচার করেছে। কিছু আর্থিক পরিসংখ্যানকে তারা ‘অজানা উৎস’ জাতীয় তকমা লাগিয়ে নিজেদের মতো করে ব্যাখ্যা করে এই অপপ্রচার সেরেছে এবং অন্য রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সি পি আই (এম)-কে এক পঙ্‌ক্তিতে বসিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছে। অন্য কোনো রাজনৈতিক দল তাদের আয় নিয়ে সংবাদমাধ্যমের তোলা প্রশ্নের জবাব দেওয়ার প্রয়োজনবোধ করে না, বরং এড়িয়ে যায়। কিন্তু সি পি আই (এম) প্রতিবারই নিজেদের আয়ের উৎস ব্যাখ্যা করে জোরের সঙ্গে এর জবাব দিয়েছে, যদিও সংবাদমাধ্যমগুলি কখনোই সেই জবাব উল্লেখ করার সৌজন্যটুকুও দেখায় না।

অথচ আয়ের স্বচ্ছতা নিয়ে সি পি আই (এম) রীতিমতো গর্ববোধ করতে পারে। অন্য রাজনৈতিক দলগুলি যে প্রশ্নে অস্বস্তিতে কুঁকড়ে যেতে পারে, সেই প্রশ্নের উত্তরে সি পি আই (এম) গর্বের সঙ্গে বলতে পারে, আমরা কোনো পুঁজিপতি বা কর্পোরেট সংস্থার থেকে টাকা নিয়ে চলি না। সি পি আই (এম) তার সদস্যদের দেওয়া লেভি এবং শ্রমজীবী জনগণের কাছ থেকে সংগৃহীত টাকায় পার্টি ও পার্টির সংগ্রামের কর্মসূচি পরিচালনা করে। রাজনৈতিক দলগুলিকে স্বচ্ছভাবে অনুদান দেওয়ার প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে টাটা শিল্পগোষ্ঠী একবার জাতীয়স্তরে স্বীকৃত প্রতিটি রাজনৈতিক দলকে চাঁদা হিসাবে চেক পাঠিয়েছিল। দিল্লিতে সি পি আই (এম)-র কেন্দ্রীয় কমিটির দপ্তর এ কে গোপালন ভবনেও সেই চেক এসেছিল। কিন্তু সি পি আই (এম)-ই একমাত্র রাজনৈতিক দল যারা নিজেদের অপারগতার কথা জানিয়ে সেই চেক টাটাদের ফেরত পাঠিয়ে দিয়েছিল। অন্য কোনো জাতীয় দল এই বলিষ্ঠতা দেখাতে পেরেছে? জনগণের সংগ্রাম পরিচালনার জন্য কেবলমাত্র জনগণের অর্থের ওপরেই নির্ভরশীলতায় বিশ্বাসী সি পি আই (এম)। এটা যদি গর্বের না হয় তবে রাজনীতিতে গর্বের আর কি থাকতে পারে!

অন্য রাজনৈতিক দলগুলির আয়ের উৎসের সঙ্গে সি পি আই (এম)-র আয়ের উৎসের মিল খুঁজতে গেলে গোড়াতেই হোঁচট খাওয়াটা অবশ্য স্বাভাবিক। একটি বিপ্লবী রাজনৈতিক সংগঠন হিসাবে, কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যদের প্রতিমাসে নিয়মিত লেভি দেওয়াটা বাধ্যতামূলক। পার্টির গঠনতন্ত্রের ১০নং ধারায় স্পষ্ট ভাষায় লেখা আছে কোনো ব্যক্তিকে সি পি আই (এম)-র সদস্য থাকতে গেলে তাঁকে পার্টির দায়িত্ব ও কর্তব্য পালনের সঙ্গে সঙ্গে আয় অনুসারে পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটি নির্ধারিত হারে প্রতি মাসে লেভি দিতে হবে। পরপর তিন মাস কোনো কারণ ছাড়া কেউ লেভি জমা না দিলে এমনকি তাঁর সদস্যপদও খারিজ হয়ে যেতে পারে। সি পি আই (এম) গঠিত হওয়ার পরে ছয়ের দশকের মাঝামাঝি সময়ে পশ্চিমবঙ্গে পার্টির সদস্য সংখ্যা ছিল ১১হাজারের মতো। এখন পার্টি সদস্যের সংখ্যা আড়াই লক্ষের কাছাকাছি। বিভিন্ন আয়ের পার্টি সদস্য রয়েছেন। ৫০০০ টাকা আয় করেন এমন সদস্যও ন্যূনতম ২৫ টাকা লেভি দেন প্রতি মাসে। প্রতিটি পার্টি সদস্যকে প্রতি মাসের লেভি এবং প্রতিবছর সদস্যপদ পুনর্নবীকরণের জন্য ৫টাকা করে জমা দিতে হয়। যে-কোনো কমিউনিস্ট পার্টির মতই সি পি আই (এম)-র আয়ের মূল উৎস পার্টি সদস্যদের কাছ থেকে পাওয়া এই লেভি। গণসংগ্রহ প্রত্যেক পার্টি সদস্যের অবশ্য পালনীয় কর্তব্য ও শৃঙ্খলা। মোট সংগ্রহের ৭০ভাগই আসে ক্ষুদ্র সংগ্রহ থেকে।

লেভি ছাড়াও মাঝে মাঝেই পার্টির পক্ষ থেকে প্রকাশ্যে বিশেষ তহবিলের ডাক দেওয়া হয়। তাতেও কখনো এক দিনের আয় অথবা অর্ধেক দিনের আয় পার্টি সদস্যদের পার্টি তহবিলে জমা দিতে হয়। তাছাড়া, পার্টির প্রতীকে নির্বাচিত সাংসদ, বিধায়ক বা জনপ্রতিনিধিদের প্রাপ্য সরকারি বেতন বা ভাতার টাকাও সাধারণভাবে পার্টির তহবিলেই জমা দিতে হয়। এমনকি, অবসরপ্রাপ্ত সাংসদ বা বিধায়করা পেনশন বাবদ যে টাকা পান, তারও সবটা বা অধিকাংশ টাকাই পার্টি তহবিলে জমা পড়ে। কমিউনিস্ট পার্টি ছাড়া অন্য দলে এমন প্রক্রিয়ার কথা কেউ ভাবতে পারে? ভাবুন, সমর মুখার্জি, নীরেন ঘোষ এবং অনেক আত্মোৎসর্গী সাংসদ নেতার কথা, যাদের এক টাকাও সঞ্চয় ছিল না। অন্য কোন দলে এমন দৃষ্টান্ত আছে! প্রাকৃতিক দুর্যোগেও মানুষের সাহায্যে গণ-অর্থসংগ্রহে সাড়া পায় আমাদের পার্টি।

এর চাইতে এমন ভাবা এবং ভাবানো হয়তো অনেক সহজ যে দক্ষিণপন্থী রাজনৈতিক দলগুলি যেভাবে টাকা সংগ্রহ করে উৎস গোপন করে থাকে, সেভাবেই উৎস গোপন করে আয় করছে সি পি আই (এম)।

কিন্তু আয়কর আইন এবং জনপ্রতিনিধিত্ব আইন অনুযায়ী ২০হাজার টাকার বেশি অঙ্কের অর্থদাতাদের নাম জানাতে বাধ্য যে-কোনো রাজনৈতিক দল। সি পি আই (এম) এই অর্থদাতাদের নাম নিয়মিতভাবে নির্বাচন কমিশন এবং আয়কর দপ্তরকে জানিয়ে আসছে আইন মেনে। যদিও সি পি আই (এম)-র মোট আয়ের মাত্র ১শতাংশেরও মতো আসে এমন অর্থদাতাদের দান থেকে। মুখ্য আয় হয়ে থাকে, পার্টি সদস্যদের লেভি (৪০শতাংশের মতো) এবং গণসংগ্রহ থেকে। কমিউনিস্ট পার্টির ভাণ্ডার প্রকৃত অর্থেই রয়েছে গরিবের ঘরে ঘরে। অসংখ্য গরিব মানুষ পার্টির সংগ্রামকে নিজেদের সংগ্রাম মনে করে দশটাকা বিশ টাকা করে দান করে থাকেন। বহু গরিব ও মধ্যবিত্ত মানুষের সাহায্য এবং কমিউনিস্ট মতাদর্শের প্রতি দৃঢ় সমর্থন থেকে কিছু সচ্ছল মানুষের নিজেদের সর্বস্ব দেওয়ার অজস্র নজির এরাজ্যে রয়েছে। ২০১৫ সালের ৬ই আগস্টের সংবাদপত্রে প্রকাশিত ছবিতে দেখা যায়, মুজফ্‌ফর আহ্‌মদের জন্মদিন উপলক্ষ সভার মঞ্চে এক সদ্য পুত্রহারা বৃদ্ধা জননী ২লক্ষ টাকা তুলে দিচ্ছেন সূর্য মিশ্র এবং বিমান বসুর হাতে।

জেলায় জেলায় সি পি আই (এম)-র অজস্র পার্টি দপ্তর এবং স্থাবর সম্পত্তি রয়েছে যা গড়ে উঠেছে পার্টি নিবেদিত প্রাণ কোনো ব্যক্তির দান করা জমি অথবা বাড়িতে। এই সমস্ত আয় এবং সম্পদ এসেছে অন্য দলের মতোই ‘অজানা উৎস’ থেকে বলে দেওয়ার সঙ্গে বাস্তবের কোনও সম্পর্ক নেই। কমরেড সরোজ মুখোপাধ্যায়ের কথায় ‘এলাকার প্রতিটি মানুষের কাছে পার্টির অর্থের প্রয়োজনের কথা বোঝাতে হবে। কি কি কাজে টাকা খরচ হয় তা সাধারণভাবে তাঁদের বোঝাতে হবে’। শ্রমিকশ্রেণির পার্টি গরিবের পার্টি হলেও এ পার্টির ভাণ্ডার অফুরন্ত। এজন্য শত আক্রমণেও এই পার্টি ভেঙে পড়ে না। কারণ শ্রমজীবী জনগণের সংখ্যা শোষক শ্রেণির জনসংখ্যার চেয়ে অনেক বেশি। প্রত্যেকে দশ টাকা বা পাঁচ টাকা করে দিলেও লক্ষ লক্ষ মানুষের কাছ থেকে কমিউনিস্ট পার্টির অর্থসংগ্রহ সম্ভব, কমরেড সরোজ মুখোপাধ্যায়ের শেখানো পথ এলাকায় এলাকায় আমরা অনুসরণ করে চলেছি।

খনি অথবা স্পেকট্রামের বরাত দিতে মন্ত্রীদের যখন ঘুষ নিতে দেখা গেছে, আম্বানি আদানিদের টাকায় যখন রাজনৈতিক দলের রমরমা চলছে, যখন মানুষ চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছেন চিট ফান্ডের টাকা লুটে একটি রাজনৈতিক দল দাপটের সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গে সরকার চালাচ্ছে, চোখের সামনে টেলিভিশনের পর্দায় ঘুষ নিতে দেখা যাচ্ছে শাসকদলের মন্ত্রী সাংসদদের, তখন রাজনীতি সম্পর্কে সাধারণ মানুষের কোন্‌ মনোভাব তৈরি হচ্ছে তা বুঝতে অসুবিধা হয় না।সর্বশেষ সাধারণ বাজেটে মোদী সরকার রাজনৈতিক দলকে ২হাজার টাকার বেশি নগদে অনুদান দেওয়া যাবে না বলে যে ঘোষণা করেছে সেটা নেহাতই মানুষের চোখে ধুলো দেওয়া ছাড়া কিছু নয়। নয়া উদারনীতির যুগে নির্বাচনে সীমাহীন অর্থশক্তি ও কালো টাকার ব্যবহার, মাফিয়াদের পেশিশক্তি, রাজনীতির অপরাধীকরণ জনগণের অধিকারকে প্রহসনে পরিণত করছে এবং সংসদীয় গণতন্ত্রের সামনে গুরুতর বিপদ তৈরি করছে। তা ঠেকানোর কোনো প্রচেষ্টা সরকারের তরফে দেখা যাচ্ছে না। একমাত্র বামপন্থীরাই এর বিরুদ্ধে রাজনৈতিক চেতনা বৃদ্ধির কাজ ছাড়াও আমূল নির্বাচনী সংস্কারের দাবি করেছে।

সি পি আই (এম) চায় রাজনৈতিক দলকে কর্পোরেটের দান সবদিক থেকে নিষিদ্ধ করা হোক। তার পরিবর্তে নির্বাচন কমিশনের নিয়ন্ত্রণে রাষ্ট্রীয় তহবিল তৈরি করে নির্বাচনে ব্যবহার করা হোক। যাতে টাকা নিয়ে কোনও রাজনৈতিক দলকে কর্পোরেটের প্রতি দায়বদ্ধ থাকতে না হয়।এই জটিল পরিস্থিতিতে দুর্নীতির মূলে থাকা রাজনৈতিক অর্থনীতিকে চিনিয়ে দেওয়াটাই জনগণের কাছে প্রয়োজনীয় ছিলো। দক্ষিণপন্থী রাজনীতি আর বামপন্থী রাজনীতির ফারাকটা আরও স্পষ্টভাবে চেনানোর দরকার ছিলো। কিন্তু সংবাদমাধ্যম করছে তার উলটোটাই। তারা সাধারণভাবে সমগ্র রাজনীতিকেই চুরির দায়ে কাঠগড়ায় তোলার চেষ্টা করছে, সাদা-কালো মিশিয়ে দিচ্ছে, ভিন্নধরনের প্রক্রিয়ায় আয় সংগ্রহ করা রাজনৈতিক দল সি পি আই (এম)-কে এক পঙ্‌ক্তিতে বসাচ্ছে এবং জনগণের মধ্যে ‘সবাই সমান’ বলে বিরাজনীতির স্রোত তৈরির চেষ্টা করছে

এমন অপচেষ্টা রাজনীতিতে দুর্নীতি বন্ধ করতে সাহায্য করবে না, বরং ‘সবাই সমান’ রটনার আড়ালে প্রকৃত দুর্নীতিগ্রস্তদের পার পাওয়ার সুযোগ তৈরি করে দেবে।

এই লেখা শেষ করবো, গান্ধীজীকে লেখা পি সি যোশীর একটি চিঠির অংশ উল্লেখ করে। একদল কমিউনিস্ট-বিদ্বেষীর কাছ থেকে ক্রমাগত কুৎসা শুনে ১৯৪৪ সালে গান্ধীজী কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক পি সি যোশীকে চিঠিতে লিখেছিলেন, ‘আপনাদের পার্টির আয় ব্যয়ের হিসাব কি আমি দেখতে পারি?’ সশ্রদ্ধ নম্রতা নিয়ে যোশী তাঁকে ইতিবাচক জবাবই দিয়েছিলেন। কিন্তু সেই সঙ্গে আরেকটি অনুরোধ করেছিলেন। যোশী লিখেছিলেন, ‘আমি আপনাকে আরেকটি পালটা অনুরোধ করার লোভ সামলাতে পারছি না। আমি যখন গ্রামে গ্রামে ঘুরে বেড়াবো আপনি আপনার একজন প্রতিনিধি পাঠাবেন। তিনি দেখতে পাবেন, আমাদের পার্টির কথা শুনতে কীভাবে দশ হাজার থেকে পঞ্চাশ হাজার মানুষ বের হয়ে আসছেন। তাঁদের উৎসাহ উদ্দীপনা আপনাকে ১৯২০ সালের দিনগুলির কথা মনে পড়িয়ে দেবে। সবশেষে আমি তাঁদের কাছে পার্টি তহবিলে দান করার জন্য অনুরোধ করবো। হাজার হাজার মানুষ কীভাবে দান করছেন তা দেখে আপনার প্রতিনিধির চোখে জল চলে আসবে।’

আজকে যারা সি পি আই (এম)-র আয়ের ‘অজানা উৎস’ সন্ধান করতে চাইছেন, তাঁদেরকেও যোশীর মতোই পালটা অনুরোধ করতে ইচ্ছা করে। গর্ব করে বলতে পারি, দেখতে পাবেন সেই ঐতিহ্য সি পি আই (এম) রক্ষা করেই চলেছে। তবে মোদী বা মমতার দেওয়া চশমাটা খুলে আসবেন। খোলা চোখে দেখলে আপনার কাছে ‘অজানা’ তথ্য জানা হয়ে যাবে।

আমরা বিশ্বাস করি, শ্রেণিশত্রুর আক্রমণের ফলে কমিউনিস্ট পার্টি কোনদিন দুর্বল হয় না। আরো শক্তিশালী হয়। আরো পরিণত, সুদৃঢ় পার্টিতে পরিণত হয়। সেই আক্রমণের মধ্য দিয়েই আমরা পথ হাঁটছি।


   সৌজন্যেঃ গণশক্তি

Advertisements

Politics of Cashless Economy

December 29, 2016

নগদহীন ব্যবস্থার অর্থনীতি

মানব মুখার্জি

২০১৬-র ৮ই নভেম্বরের প্রায় মধ্যরাতের ৫০০ এবং ১০০০ টাকার নোট বাতিল বলে ঘোষণা করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। কেন এই সার্জিক্যাল স্ট্রাইক—এরও কারণ তিনি বলেছিলেন। আর পাঁচজন আর এস এস নেতার মতই তিনি সচরাচর সত্য ভাষণ করেন না। এক্ষেত্রেও করেননি — বললেন ‘পাকিস্তানকে জব্দ করার জন্য এ কাজ করেছেন’। পরে বললেন, ‘সন্ত্রাসবাদীদের আঘাত করতে এই কাজ করেছেন’। বাজারে এখন পাকিস্তান বা সন্ত্রাসবাদ বিরোধিতার কথা ভালো ‘খায়’ তাই প্রথমে এটা। দেশের মানুষ কিন্তু এটা খেলো না। তারপর বললেন কালো টাকা উদ্ধার করার জন্য এটা করেছেন। যেটা কিছুটা হলেও মানুষ খাচ্ছে। কারণ দেশের অর্থনীতিতে কালো টাকা একটা বাস্তব বিষয়। চোখের সামনে বেআইনি বড়লোকী দেখে মানুষ যারপর নাই ক্ষুব্ধ। কিন্তু প্রশাসক হিসাবে তার এবং তার সরকারের অপদার্থতা গোটা বিষয়টাকে চূড়ান্ত জায়গায় নিয়ে গেছে।

নোট বাতিলের সিদ্ধান্ত দেশের ১৩০কোটি মানুষের ওপর একটি অর্থনৈতিক পারমাণবিক বোমার মতো ফেটে পড়েছে। গোটা অর্থনীতি বিপর্যস্ত। স্বাধীন ভারতবর্ষে এতবড় অর্থনৈতিক বিপর্যয় আর কখনও হয়নি। আর ক্ষয়ক্ষতির একটা বড় অংশের মেরামতিও হবে না। সর্বশেষ প্রধানমন্ত্রী তার গোটা সরকার এবং অনুগত কর্পোরেট এবং তাদের মিডিয়া সমস্বরে বলছে আসলে এর মাধ্যমে আমরা নাকি মুদ্রাহীন অর্থনৈতিক (Cashless Economy) ব্যবস্থার দিকে যাচ্ছি। অবশেষে আমরা আধুনিকতার দিকে যাত্রা শুরু করলাম।

এই সমস্ত দাবি-পালটা দাবি, রাজনৈতিক কোলাহল ছেড়ে আমাদের বোঝা দরকার — আসলে নোট বাতিলের মধ্যে দিয়ে কি হলো। সরকার আসলে দেশের সমস্ত মানুষের কাছে যা নগদ টাকা ছিল সেই টাকা তুলে নিল। ব্যাঙ্কেই তা জমা পড়ল, কিন্তু মানুষ চাইলেই সেই গোটা টাকাটা নিজের হাতে ফিরিয়ে নিতে পারছে না। যেহেতু ৫০০ এবং ১০০০ টাকার নোটে দেশের মোট টাকার ৮৬%, কাজেই বলা যায় টাকার সিংহভাগ এখন ব্যাঙ্কের হাতে, মানুষের হাতে না। যে টাকাটা এলো, এর মধ্যে একটা অংশ কালো টাকা, তবে সেটা খুব ছোট অংশ। কারণ টাকাতে কালো টাকা রাখা হয় খুব কম। কালো টাকা জমি-সোনা-বাড়ি এই সব কিছুতে রূপান্তরিত হয়ে থাকে। নানাভাবে কালো টাকা বিদেশে চলে যায়, রূপান্তরিত হয় বিদেশি মুদ্রায় যা আমাদের সরকারের ধরা ছোঁয়ার বাইরে। আবার রূপান্তরিত বিদেশি মুদ্রা বিদেশি বিনিয়োগ হিসাবে দেশে ফিরে আসে। অসংখ্য সংস্থা আছে যারা সরকারের নজর এড়িয়ে কালো টাকাকে সাদা করে দেয় যাকে ইংরেজিতে বলে Money Laundering.

কাজেই কালো টাকা-ঠাকা নয়, এর মধ্য দিয়ে সরকার দেশের সমস্ত জমা নগদ ব্যাঙ্কজাত করে দিল। এখানেই সরকারের শেষ দাবিটিকে প্রাসঙ্গিক মনে হচ্ছে — আমরা মুদ্রাহীন অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় যাওয়ার চেষ্টা করছি।

আসলে মুদ্রাহীন ব্যবস্থার মানে কি? ক্রেতার কাছে কোনো নগদ টাকা থাকবে না। সে কার্ডের (ডেবিট বা ক্রেডিট) মাধ্যমে জিনিস কিনবে। এমনকি ইন্টারনেট সংবলিত একটি মোবাইল ফোন থাকলেই (যেমন পে টি এম) সে জিনিস কিনতে পারবে। নোটের কোনো দরকার থাকবে না। এটা ইতিমধ্যেই আমাদের দেশে আছে। এই যে নগদহীন দেড় মাসে ভারতবর্ষের বড়লোক এমনকি মধ্যবিত্তদের একটা অংশেরও খুব একটা অসুবিধা হয়নি এর জন্য। এ দেড় মাসে বাকি সব কিছুর চাহিদা কমেছে বেড়েছে কেবল কার্ড এবং পে টি এমের। নগদহীন অর্থনীতির মানে পরিমাণটা বাড়ানো।

আমাদের দেশে যত খুচরো লেনদেন হয় তার শতকরা ৯৮% হলো নগদে, আর লেনদেনের টাকার পরিমাণের ৭০% হলো নগদ টাকা। নগদহীন অর্থনীতি মানে এই পরিমাণটাকে দ্রুত কমিয়ে আনতে হবে। এই গোটা কাণ্ডটি ঘটানোর জন্য যে কার্ড দরকার আমাদের দেশের সেই কার্ডের মোট সংখ্যা ৭৫ কোটি। কিন্তু কার্ডের মালিকের সংখ্যা এর ধারে কাছেও না। কারণ কার্ডের মালিকদের অধিকাংশরই একাধিক কার্ড। একাধিক ব্যাঙ্কের এবং ডেবিট এবং ক্রেডিট উভয় ধরনের। (ডেবিট কার্ড হলো ব্যাঙ্কের অ্যাকাউন্টে একজনের যত টাকা থাকে সর্বাধিক প্রায় সেই পরিমাণের টাকা সে কার্ডের মাধ্যমে খরচ করতে পারবে। ক্রেডিট কার্ডে ব্যবহার করা যায় ব্যাঙ্কে এক পয়সাও না থাকলে। একটি সর্বচ্চোসীমা কার্ড কোম্পানি নির্দিষ্ট করে দেয়। এই পরিমাণের টাকা এই কার্ডের মাধ্যমে একজন খরচ করতে পারে এবং নির্দিষ্ট তারিখে প্রতি মাসে সে যত টাকা নিয়েছে সেই টাকা শোধ করতে হয়। শোধ না করলে বিপুল পরিমাণের সুদ দিতে হয়। তবে দু’ধরনের কার্ডেই প্রতি কেনাকাটায় একটি সার্ভিস চার্জ দিতে হয়। বছরে একবার কার্ডটিকে রিনিউ করতে হয় টাকা দিয়ে) আপাতত আমাদের ঘোষিত লক্ষ্য দেশের অধিকাংশ মানুষকে কার্ড সংবলিত করতে হবে।

মোবাইল ফোনের মাধ্যমে চলে পে টি এম। আগেই সেখানে টাকা রাখতে হয় ব্যাঙ্ক থেকে ইন্টারনেটের মাধ্যমে। তারপর মোবাইল ফোন থেকে টাকা দিতে হয়। এছাড়াও একটি আধা নগদহীন ব্যবস্থা আছে, সেটা বেশ চালু পদ্ধতি। আমার পকেটে টাকা থাকবে না, কিন্তু কোনো একটি জিনিস কিনতে গেলে এ টি এম (Automated Teller Machine) কার্ড দিয়ে সেই পরিমাণ টাকা এ টি এম থেকে তুলে নিয়ে কিনে নাও। কিন্তু এর প্রতিটি আম-ভারতীয়র ক্ষমতার বাইরে। আমাদের দেশের মতো বিশাল একটি দেশে এ টি এম-এর সংখ্যা মাত্র ২.৩লক্ষ। কার্ড ব্যবহার করতে হলে বিক্রেতার কাছে নেট সংবলিত একটি টার্মিনাল থাকতে হবে। এরকম যন্ত্র এই মুহূর্তে দেশে আছে মাত্র ১৪ লাখ দোকানে। আর পে টি এম-এর ক্ষেত্রে ক্রেতা এবং বিক্রেতা দু’জনের কাছেই অন্তত ৩জি নেটওয়ার্ক সংবলিত স্মার্টফোন থাকতে হবে।

কবে ১৩০কোটির দেশ নগদহীন হবে? জনসংখ্যার তুলনায় এই ব্যবস্থা আমাদের দেশে খুব দুর্বল, এমনকি পৃথিবীর সবচেয়ে পিছিয়ে থাকা একটি দেশের মধ্যে পড়ি আমরা। আর এর থেকেও বড় পরিকাঠামোগত সমস্যা তো আছেই। দেশের কত অংশে নেটওয়ার্ট আছে? দেশে টেলিফোন ব্যবহার করতে পারে কত মানুষ? ৫১% গ্রামে টেলিফোন নেই। লেখাপড়া জানে না কত জন? প্রায় ৩০কোটি। ইংরেজি পড়তে পারে কত অংশ? ২০%। দারিদ্র্যসীমার নিচে আছে কত অংশের মানুষ? ২৭কোটি। ২৩.৩ কোটি মানুষের কোনো ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টই নেই। এর মধ্যে ৪৩% ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে কোনদিন কোনো লেনদেন হয় না। কার্ড বা এ‍‌ টি এম বা স্মার্টফোনের সংখ্যা যা, তাও প্রধানত শহরাঞ্চলে — বিস্তীর্ণ গ্রাম প্রায় মরুভূমি। তবে কি করে আমরা নগদহীন হব?

একটি নগদহীন অর্থনীতি করা যায় বা করার প্রয়োজন এরকম কথা দু’দিন আগেও দেশের সাধারণ মানুষ ভাবেনি। এগুলো আমরা নতুন শুনছি। আমরা জানছি সুইডেনই নাকি পৃথিবীতে প্রথম নগদহীন দেশ হবে। আমরাও খোঁজ নেবার চেষ্টা করছি — কি করে সুইডেন এরকম হলো? এবং বুঝবার চেষ্টা করছি আমরা কি করে সুইডেন হব? সুইডেন মাথা পিছু আয়ে পৃথিবীর সব চেয়ে বড়লোক একটি দেশের মধ্যে পড়ে। মানব উন্নয়ন সূচকেও সুইডেন প্রথম সারিতে। সুইডেনের সরকার ঘোষণা করেই নগদহীন অর্থনীতির দিকে এগোচ্ছে। অবশ্য এর মানে এই না যে সুইডেনে নগদ টাকার কোনো ব্যবহার নেই। সুইডেনের ৫৯% বেচাকেনা হয় নগদ ছাড়া। এ প্রশ্নে সর্বোচ্চ জায়গায় আছে সিঙ্গাপুর ৬১%। আমাদের দেশে এটা মাত্র ২%। কিন্তু এ বিষয়ে পরিষ্কার ধারণা থাকা ভালো এটা প্রধানত খুচরো বিক্রি। দেশের বড় ব্যবসা বাণিজ্যের একটা বড় অংশ চিরকালই নগদহীন। টাটা স্টিল যখন ইন্ডিয়ান অয়েল থেকে জ্বালানি কেনে বা আম্বানিরা রেলের মাধ্যমে মাল পাঠালে নগদে রেলকে ভাড়া দি‍‌তে হয় না। সেটা সরাসরি ব্যাঙ্কের মাধ্যমে হয়। যত সমস্যা সাধারণ ক্রেতার। গোটা পৃথিবীতেই এটা নিয়ম।

সরকার বলছে বলেই সুইডেনে সবাই নগদহীন পথে যাচ্ছে তা না। যদি টেকনোলজি জানা থাকে তবে এটি খুবই সুবিধার। কোন টাকা পয়সা সঙ্গে রাখার দরকার নেই, চুরি ছিনতাই, পকেটমারের দুশ্চিন্তা নেই। এখনও সুইডেনে নগদ চলে দূরবর্তী গ্রামীণ অঞ্চলে এবং বয়স্ক যারা নতুন টেকনোলজি ব্যবহার করতে পারে না তারা নগদ ব্যবহার করে। এটাও কমে আসছে। সুইডেনের ব্যাঙ্কগুলো তাদের এ টি এম-গুলো বন্ধ করে দিচ্ছে। সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রতিষ্ঠান এখন নগদ নেয় না।

কিন্তু এখানেই শেষ না। উন্নত পুঁজিবাদী অর্থনীতিতে ব্যাঙ্কে সুদের হার চিরকালই খুব কম। এখন সেই সুদের হারকে ঋণাত্মক জায়গায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে। অর্থাৎ তুমি ব্যাঙ্কে টাকা রাখলে তোমাকে ব্যাঙ্ক কোনো সুদ দেবে না। বরং তোমার টাকা রে‍‌খেছে বলে ব্যাঙ্ক ‍‌তোমার টাকা কাটবে। তোমার জমা রাখা টাকা প্রতি বছরে কমবে। এই ঘটনা প্রধানত ঘটছে উন্নত পুঁজিবাদী দেশে বিশেষত পশ্চিম ইউরোপে। এবং দেখা যাচ্ছে যে, যত Cash Less তত তার সুদের হার কম। এই বছরের আগস্ট মাসের হিসাব অনুযায়ী ঋণাত্মক সুদের হার — ডেনমার্ক -০.৬৫%, জাপান, -০.১০%, সুইজারল্যান্ড -০.৭৪%, সুইডেন -০.৫০%। যে সমস্ত দেশে নগদহীন অর্থনীতির প্রসার বেশি হয়েছে সেখানে ব্যাঙ্কের সুদ কমতে কমতে ঋণাত্মক জায়গায় গিয়ে পৌঁচেছে, দু’টি সম্পর্কযুক্ত। সুদের হার কম মানে বিনিয়োগের জন্য অঢেল টাকা খুব কম সুদে পাওয়া যায়

এখন সুইডেনে বা নগদহীন অর্থনীতির যে কোনো নাগরিকের সামনে কি কি পথ খোলা রইল। তার অর্জিত অর্থ নগদে সে ঘরে রাখতে পারবে না, কারণ সেই নগদ টাকায় সে কোনো কিছু কিনতে পারবে না, কারণ নগদে কেউ কিছু বিক্রি করবে না। একটাই পথ গোটা টাকাটা তাকে ব্যাঙ্কে রাখতে হবে। কিন্তু ব্যাঙ্কে রাখলে ঋণাত্মক সুদের কারণে তোমার টাকার একটা অংশ ব্যাঙ্ক কেটে নেবে, তোমার সঞ্চয়ের পরিমাণের ক্রমাগত ক্ষয় হবে। অন্য পথ হলো সঞ্চয়ের টাকা নগদহীন ভাবে খরচ কর। যদি ব্যাঙ্কে টাকা রেখে দাও তবে সে টাকা নামমাত্র সুদে বিনিয়োগকারীর হাতে পৌঁছবে। আর যদি জিনিস কিনে সেই টাকা খরচ করো তাহলেও তোমার টাকার একটি অংশ মুনাফা হিসাবে মালিকের হাতে পৌঁছবে। অর্থাৎ তুমি যাই করো লাভ মালিকদের, তোমার নয় — অথচ টাকার মালিক তুমি।

আধুনিক পৃথিবীতে যে কোনো মানুষের সবচেয়ে মৌলিক যে অর্থনৈতিক অধিকার আছে তা হলো নিজের পরিশ্রমের মাধ্যমে আয় করার অধিকার। এই আয়ের একটি ছোটো অংশ রাষ্ট্রকে কর হিসাবে দিয়ে বাকি টাকাটার মালিক তুমি। তুমি ঠিক করবে সেই টাকা দিয়ে তুমি কি করবে।

সেই টাকা নিয়ে বাজারে গিয়ে তুমি ক্রেতা ঠিক করবে। কি কিনবে তা ঠিক করবে। তোমাকে এই অধিকার দেয় রাষ্ট্র। এক টুকরো কাগজে রাষ্ট্রের হয়ে রিজার্ভ ব্যাঙ্ক লিখে দেয় এই কাগজ যার হাতে সে এই টাকার মালিক। সেই পরিমাণটিও কাগজে ছাপা থাকে। এই হলো নগদ টাকা। এই গোটা প্রক্রিয়ায় সে স্বাধীন এবং নোটের বিনিময়ে পণ্য বিক্রি করবে যে বিক্রেতা সেও স্বাধীন। দুই স্বাধীন নাগরিকের মধ্যে কোনো তৃতীয় ব্যক্তি থাকবে না। নগদহীন অর্থনীতিতে এই মৌলিক অর্থনৈতিক স্বাধীনতার অবসান। এক, তুমি তোমার টাকা নিয়ে কি করবে সেটা পুরোপুরি তুমি ঠিক করবে না। সেটা ঠিক করবে সরকার অথবা সরকারের হয়ে ব্যাঙ্ক, সে ব্যাঙ্ক রাষ্ট্রায়ত্ত হতে পারে, বেসরকারিও হতে পারে, দেশি ব্যাঙ্ক পারে, বিদেশি ব্যাঙ্কও হতে পারে।

ক্রেতা এবং বিক্রেতার মধ্যেকার স্বাধীন দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কেরও কোনো অস্তিত্ব নগদহীন ব্যবস্থায় থাকবে না। তুমি বিক্রেতাকে সরাসরি জিনিসের দাম দিতে পারবে না। তোমার হয়ে তৃতীয় পক্ষ দাম দেবে। সে তৃতীয় পক্ষ হতে পারে ব্যাঙ্ক হতে পারে যে কোম্পানির কার্ড তুমি ব্যবহার করছ সেই কোম্পানি। তুমি বিক্রেতাও সব সময় স্বাধীনভাবে ঠিক করতে পারবে না। বিজ্ঞাপন দিয়ে ডিসকাউন্ট দিয়ে কার্ডের কোম্পানি তোমাকে প্রভাবিত করবে বিশেষ কোম্পানির জিনিস কিনতে। এমনকি চরম ক্ষেত্রে কোনো বিশেষ বিক্রেতাকে টাকা দিতে অস্বীকার করতে পারে সে। তুমি কোনো একটি সংগঠন, বা রাজনৈতিক দলকে টাকা দিতে চাও। কার্ডের কোম্পানি সরকারি বির্দেশ উল্লেখ করে সেই টাকা দিতে অস্বীকার করতে পারে। পৃথিবী জোড়া কার্ডের ব্যবসাকে নিয়ন্ত্রণ করে দু’টি মার্কিন কোম্পানি — ভিসা এবং মাস্টারকার্ড। এদের ক্ষমতা বোঝাবার জন্য ভিসার উদাহরণ দেওয়া যায়। ২০১৫ সালে গোটা পৃথিবীর ১লক্ষ কোটি লেনদেন হয়েছে ভিসার মাধ্যমে। এতে লেনদেন হয়েছে ৬.৮ ট্রিলিয়ন ডলার। পৃথিবীর ২৫০০০ ব্যাঙ্কের হয়ে ভিসা কাজ করে। এরা সিদ্ধান্ত ক’রে উইকিলিক্সের ‍‌(যারা সমস্ত গোপন ইলেকট্রনিক বার্তা ফাঁস করে সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলোকে বেআব্রু করে দিয়েছে।) টাকা দেওয়া বন্ধ করে দিয়েছে। একইভাবে কয়েকটি বিশেষ রাশিয়ান ব্যাঙ্কের আন্তর্জাতিক লেনদেন বন্ধ করে দিয়েছে এরা। এবং এই তথাকথিত ‘তৃতীয় পক্ষ’ মাগনায় কোনো কাজ করে না। নগদ ভিত্তিক অর্থনীতিতে ক্রেতা নগদে দাম দেয়, বিক্রেতা তার মাল দেয়। এর মধ্যে আর কোনো টাকা পয়সার লেনদেন থাকে না। কিন্তু নগদহীন ব্যবস্থায় এই তথাকথিত ‘তৃতীয় পক্ষ’ প্রতিটি লেনদেন থেকে টাকা পায়, ক্রেতা এবং বিক্রেতা উভয়ের কাছ থেকে। এবং এই টাকা তারা দিতে বাধ্য।

আজ গোটা দুনিয়া জুড়ে নগদহীন অর্থনীতির দাবিতে সমস্বরে কোলাহল করা হচ্ছে। তাতে গলা মিলিয়েছে রাজনৈতিক নেতা, বড় বড় কোম্পানি, নিজের ভালো-মন্দ না বোঝা কিছু মূর্খ মানুষ। কিন্তু সবচেয়ে সজোরে চেঁচাচ্ছে এই ‘তৃতীয় পক্ষ’ কোম্পানিগুলো। নগদ ১০টাকা দিয়ে কেউ যদি এক কিলো আলুও কেনে তাহলে এই তৃতীয় পক্ষরা মনে করে তাদের সুযোগ হাতছাড়া হয়ে গেল।

পৃথিবীতে ২০০৮ থেকে লাগাতার সংকট চলছে — নতুন বিনিয়োগ নেই, বাজারে স্থায়ী মন্দা, কর্মসংস্থান তলানিতে। তথাকথিত নগদহীন অর্থনীতি এবং সুদের হার শূন্যের কাছাকাছি নামিয়ে চেষ্টা চলছে মানুষের কষ্টার্জিত সম্পদকে ব্যবহার করে বাজার চাঙ্গা করতে, নতুন বিনিয়োগ ব্যবস্থা করতে। এবং এই প্রক্রিয়াটাই এক কথায় একটি নিকৃষ্ট রাহাজানিতে পরিণত হয়েছে।

এই রাহাজানির তালিকায় আমাদের দেশ থাকবে না, এ হয় না। নোট বাতিলের সিদ্ধান্তের প্রাথমিক কারণও একটি বিশুদ্ধ রাহাজানি। বেসরকারিকরণের ঢাক গত ২৫বছর ধরে বাজানো হচ্ছে, কিন্তু তা সত্ত্বেও দেশের ব্যাঙ্কিং ব্যবস্থাকে এখনও নিয়ন্ত্রণ করে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কগুলো। দেশের মোট আমানতের ৭২%-ই আছে ১৯টি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কের কাছে। মোদীর ‘আচ্ছে দিনের’ ছোঁয়া এই ব্যাঙ্কের গায়েও লেগেছে। ২০১৪-১৫ সালে এই ব্যাঙ্কগুলোর সম্মিলিত লাভের পরিমাণ ছিল ৩৬হাজার কোটি টাকা। আর এ বছরে লাভ উলটে ক্ষতি হয়েছে প্রায় ১৮হাজার কোটি টাকা। এটা যে কোনো ব্যাঙ্কের ক্ষেত্রে একটি অশনি সংকেত। বিপদটা সরকারও বুঝেছিল।

কিন্তু রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কের এই দুরবস্থার একটিই কারণ — তারা যে টাকা ধার দিয়েছিল তার একটা বড় অংশ তারা ফেরত পায়নি। এই পরিমাণটা আঁতকে ওঠার মতো, প্রায় ১১লক্ষ কোটি টাকা। এবং এটা প্রধানত হয়েছে দেশের অর্থনীতির মাতব্বররা তাদের ধারের টাকা ফেরত দেয়নি বলে। এই বকেয়ার তালিকায় শীর্ষস্থানে আছে অনিল আম্বানি। প্রধানমন্ত্রীর অনুজতুল্য গৌতম আদানীর বকেয়ার পরিমাণও বিপুল। মার্কিনী পরামর্শদাতারা ম্যাকিনসে সরকারকে সাবধান করে যদি অবিলম্বে সরকার যথেষ্ট পরিমাণ মূলধন এই ব্যাঙ্কগুলোতে বিনিয়োগ না করে তবে দেশে গোটা ব্যাঙ্ক ব্যবস্থাটা ভেঙ্গে পড়বে। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কের কাছেই জমা আছে দেশের ৭২% টাকা। সরকার নীতিগতভাবে এই প্রস্তাব মেনে নেয়। কিন্তু ‘আচ্ছে দিন’-র ঠেলায় সরকারেরও ‘ভাঁড়ে মা ভবানী’। এই টাকা সরকার দিতে পারেনি। নোট বাতিল করে মানুষের ওপর এই বোঝা চাপিয়ে দিয়েছে সাধারণ মানুষের ওপর। আমার আপনার মেয়ের বিয়ের জন্য জমানো টাকা, মায়ের চিকিৎসার জন্য সামান্য সংস্থান — এই সব নিয়ে আমরা ব্যাঙ্কের লাইনে দাঁড়াতে বাধ্য হলাম, কারণ আম্বানি, আদানী বিজয় মালিয়ারা ফুর্তি করে টাকা উড়িয়েছে, ব্যাঙ্কের ধার শোধ করেনি। এদের কিছু হবে না কিন্তু আমার আপনার পকেট থেকে ১৪.৫০ লক্ষ কোটি টাকা সরকার তুলে নিয়ে চলে গেল এ ক’দিনে ব্যাঙ্ক বাঁচাতে। অথচ আমরা কোনো অপরাধ করিনি।

এটা গেল প্রাথমিক কারণ — কিন্তু চূড়ান্ত লক্ষ্য ‘নগদহীন অর্থনীতি’। দেশের বর্তমান অবস্থায় এটা অসম্ভব এটা কেবল আমি, আপনি জানি তাই নয়, নরেন্দ্র মোদীও জানেন। যে দেশের ৩৫কোটি মানুষের দৈনিক আয় ৪০টাকারও কম, যে দেশের সিংহভাগ গরিব মনুষ দৈনিক আয়ের ওপর নির্ভরশীল সে দেশে নগদহীন অর্থনীতি আসতে শতাব্দী পার হয়ে যাবে। তাহলে? যেটুকু আছে তাই বা কম কিসের? National Council of Applied Economics Research (NCAER)-এর দেওয়া হিসাব অনুযায়ী দেশে মধ্যবিত্তের সংখ্যা ২৬.৭ কোটি আর দশ বছর পরে এই সংখ্যা দাঁড়াবে ৫৪.৭ কোটি। মধ্যবিত্ত মানে যার যথেষ্ট ক্রয়ক্ষমতা আছে, উল্লেখযোগ্য পরিমাণে সঞ্চয় আছে — এটি একটি বিশাল বাজার। সংখ্যার দিক থেকে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় অর্থনীতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জনসংখ্যার সমান। দেশের সবচেয়ে গরিব যে অংশ, প্রায় কাছাকাছি। দেশের অর্থনীতি যাদের ভূমিকা ন্যূনতম — তাদের গোল্লায় পাঠিয়েও যা পড়ে থাকে তাকে যদি নগদহীন ব্যবস্থার ছাঁচের সঙ্গে এনে ফেলা যায় তাহলেই হলো — দেশ লুণ্ঠনের সোনার খনি হয়ে যাবে। যত সঞ্চয় কমবে সেই অনুপাতে বাজার বাড়বে, বিনিয়োগ বাড়বে, মুনাফা বাড়বে। আমাদের দেশে বর্তমানে বিনিয়োগ প্রায় নেই। কর্মসংস্থান বন্ধ। দেশের সাধারণ মানুষের জন্য এদের কিছু যায় আসে না, কিন্তু কর্পোরেটের মুনাফাতেও তো টান পড়বে। গরিব ছিলই, এখন এই মধ্যবিত্তের মাথায় নগদহীন কাঁঠালটি ভাঙলে বড়লোকদের ‘আচ্ছে দিন’ আসবেই আসবে।

এবং এতে এক ঢিলে দুই পাখি মরবে। দেশের ব্যাঙ্কিং ব্যবস্থাটাও ধীরে ধীরে প্রাইভেট এবং বিদেশি ব্যাঙ্কের হাতে তুলে দেওয়া যাবে। ব্যাঙ্কের সাধারণ আমানত প্রধানত আসে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কে। কিন্তু নগদহীন ব্যবস্থার গোটাটা ছুটবে ইলেকট্রনিক বিনিময়ের দিকে। যেমন আমাদের দেশে বর্তমানে কার্ডের মাধ্যমে যে লেনদেন হয় তার ৫৪% হয় প্রাইভেট ব্যাঙ্কের মাধ্যমে, ২২% হয় বিদেশি ব্যাঙ্কের মাধ্যমে। আর বাকি ২৬% লেনদেনও পুরোপুরি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কের মাধ্যমে হয় না, অল্প হলেও কিছু সমবায় ব্যাঙ্কও দেশে কার্ড ব্যবসায় ঢুকেছে, তাদেরও একটা ভাগ থাকবে। Cash Less ব্যবস্থা আসলে ধাপে ধাপে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্ক — less ব্যবস্থায় পরিণত হবে। আম্বানি, আদানী, বিজয় মালিয়াদের একটু অসুবিধা হবে। কারণ রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কের টাকা তারা যেভাবে লুট করতে পারে প্রাইভেট ব্যাঙ্কের থেকে সেটা করা যাবে না। এতে দুঃখ করে কোনো লাভ নেই। পাকা আমের যতটা রস ছিল সব তারা খেয়েছে — এখন আঁটি নামক রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্ক ছুঁড়ে ফেলতে হবে। আর এস এস-প্রণীত দেশপ্রেমের গানে জয় ভারত, জয় মোদীর সাথে জয় ভিসা, জয় মাস্টারকার্ড এটাও যুক্ত হবে। আমরা সত্যি সত্যিই আধুনিক হব।


   সৌজন্যেঃ গণশক্তি

Cashless Economy of Chikalthana

November 25, 2016

চিকলথানার ক্যাশলেস ইকনমি

পি সাইনাথ

1111

নোট বাতিলে মহারাষ্ট্র জুড়ে বিপর্যস্ত কৃষক, ভূমিহীন খেতমজুর, পেনশনভোগী, ছোট ব্যবসাদার ও আরো আরো অনেকে। মোদীর ‘মাস্টার স্ট্রোকে’ তাঁদের সেই জীবনযন্ত্রণাই তুলে ধরলেন স্বনামধন্য সাংবাদিক পি সাইনাথ

এখানে এলে মনে হতেই পারে প্রধানমন্ত্রী মোদীর ক্যাশলেস ইকনমির খোয়াব বাস্তবায়িত হয়েছে। মহারাষ্ট্রের ঔরঙ্গাবাদ শহরের একেবারে গা ঘেঁষে থাকা এই চিকলথানা গ্রামে সেই স্বপ্ন ঘোর বাস্তব। এখানে কারও হাতে কোনো নগদ টাকা নেই। ব্যাঙ্ক ও, এটিএম-এও নেই। তাই সেগুলির আশপাশে একবুক হতাশা নিয়ে মানুষের আনাগোনা, লাইন কোনোটাই নেই। এমনকি ব্যাঙ্কের শাখার বাইরে ভ্যানে বসা কোনো পুলিশকর্মীকে ওই চৌহদ্দিতেই নজরে পড়বে না।তবে চিন্তার কিছু নেই। খুবই শীঘ্রই ওই গ্রামের মানুষও তাঁদের আঙ্গুলে কালির দাগ দেখতে পাবেন।

চলুন ঘুরে আসা যাক দুর্গ শহর ঔরঙ্গাবাদের ভেতর থেকে। স্টেট ব্যাঙ্ক অব হায়দরাবাদের শাহগঞ্জ শাখায় ঢুকলেই নজরে পড়বে মরিয়া ব্যাঙ্ককর্মীরা তাঁদের গরিব ক্লায়েন্টদের সাহায্য করার জন্য ‘সংগ্রামরত’। সেখানে কেন, শহরের অন্য শাখা, প্রত্যেকটি শাখায় এখন ছেঁড়া-ফাটা ৫০, ১০০টাকার নোট ঝাড়াই-বাছাই চলছে। চূড়ান্তভাবে নষ্ট করে ফেলার জন্য এগুলির সবকটিই রিজার্ভ ব্যাঙ্কে পাঠানোর কথা। উপায় না দেখে এখন সেই বাতিল নোটই আবার নতুন করে বিলি করার ব্যবস্থা হচ্ছে। রিজার্ভ ব্যাঙ্কও বিষয়টা ভালোই জানে, কিন্তু নীরবতা দিয়েই ব্যাপারটা উপেক্ষা করে চলেছে।

‘‘আমাদের আর কীই বা উপায় আছে?’’ জানতে চাইছেন এই সমস্ত ব্যাঙ্কের কর্মীরা। ‘‘লোকের তো এখন ছোট নোট দরকার। ওদের সমস্ত কাজকর্ম, লেনদেন বন্ধ হয়ে রয়েছে।’’ ব্যাঙ্ককর্মীদের সঙ্গে কথার মাঝেই সেখানে এসে হাজির জাভেদ হায়াত খান। ঠেলাওয়ালা, বাড়ি বাড়ি জিনিস ফেরি করে পেট চলে। রবিবার ব্যাঙ্কের বাইরে প্রায় এক কিলোমিটার লাইন পেরিয়ে যখন ব্যাঙ্কের দোড়গোড়ায় পৌঁছালেন, তাঁর হাতে ধরা মেয়ে রশিদা খাতুনের বিয়ের কার্ড।

‘‘সবমিলিয়ে আমার অ্যাকাউন্টে ২৭হাজার টাকা রয়েছে।’’ বলছিলেন, ‘‘তিন সপ্তাহ পরে মেয়ের বিয়ে, আর আমাকে বলা হচ্ছে মেয়ের বিয়ের জন্য মাত্র দশ হাজার টাকা তোলা যাবে। আমিই আমার টাকা তুলতে পারবো না।’’ আগের দিন দশহাজার টাকা তুলে নিয়ে যাওয়ায় ব্যাঙ্ক তাঁকে ফেরত পাঠাচ্ছে। যদিও আজও তাঁর ওই একই টাকা তোলার এক্তিয়ার রয়েছে। কারণ ব্যাঙ্ককর্মীদের আন্দাজ, যেভাবে ব্যাঙ্কের চারপাশে সর্পিল লাইন বেড়ে চলেছে তার জন্য তাদের হাতে থাকা টাকা যথেষ্ট নয়। আর তাঁরা চাইছেন এই লাইনগুলির প্রত্যেকে যেন কিছু না কিছু টাকা পান। এঁদেরই দুজন এখন জাভেদকে সাহায্য করতে চান। তাঁরাই জানালেন, মেয়ের বিয়ের জন্য ফিক্সড ডিপোজিট ভাঙিয়ে ওই টাকা তাঁর অ্যাকাউন্টে এসেছে।

বহু নিবন্ধকার, বিশ্লেষক আর সরকারি রিপোর্ট এরই মধ্যে তুলে ধরেছে, ভারতের ‘কালো’ অর্থনীতির বড় অংশটাই রয়েছে সোনা-রুপোর বাজার, বেনামী জমির কারবার ও বৈদেশিক মূদ্রার কবলে। পুরানো কাঠের সিন্দুকে ঠাকুমার জমিয়ে রাখা নোটের গাদায় নয়। ভারত ও বিদেশের কালো টাকা মোকাবিলায় পদক্ষেপ সম্পর্কে ২০১২সালের একটি রিপোর্টে এই কথাটাই বলেছিলেন সেন্ট্রাল বোর্ড অব ডাইরেক্ট ট্যাক্সের চেয়ারম্যান। ১৯৪৬ ও ১৯৭৮-এ অতীতের দু-দুবার টাকা বাতিলের ‘শোচনীয়ভাবে ব্যর্থতার’ কথাও ওই রিপোর্টে তুলে ধরা হয়েছিল (পৃষ্ঠা ১৪, পার্ট টু, ৯.১)। তা সত্ত্বেও সেই একই কাজের পুনরাবৃত্তি করলো বিজেপি সরকার। এমন একটা অবিশ্বাস্য নির্বুদ্ধিতার কাজকে বাহবা দিতে হরেক কিসিমের অ্যাঙ্কর আর টেলিভিশন ভাঁড়রা ‘মোদীর মাস্টারস্ট্রোক’ বলে গলা ফাটাচ্ছে, তা আসলে গ্রাম ভারত জুড়ে মর্ম বেদনা আর দুর্গতিই ছড়াচ্ছে। এতে যদি কারও ‘স্ট্রোক’ হয়ে থাকে তা হলো ওই গ্রামীণ অর্থনীতির হৃদয়েই।

আর সেই স্ট্রোকের ধাক্কা থেকে সেরে উঠতে কতটা সময় লাগতে পারে তা প্রথমেই গুলিয়ে দিলেন কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী ও তাঁর দলীয় সহকর্মীরা, ২-৩দিনের অস্বস্তি বলে। ড. জেটলি আবার পরে তা শুধরে নিয়ে বললেন ২-৩সপ্তাহ। ঠিক তারপরই তাঁর সিনিয়র সার্জেন, নরেন্দ্র মোদী, বললেন যে রোগীর স্বাস্থ্যের পুনরুদ্ধারে তাঁর ৫০দিন সময় চাই। তাহলে ২০১৭-তেও চলবে আমাদের এই চিকিৎসা পর্ব। আমরা জানি না এর মধ্যে দেশজুড়ে আরো কত মানুষ লাইন দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে করতে মরে যাবেন, তবে প্রতিদিন তাঁদের সংখ্যা বাড়বে।

‘‘নাসিকের লাসালগাঁওতে, কিষানরা নগদ সংকটে পেঁয়াজ বাজারই বন্ধ করে দিয়েছে’’, খবর দিলেন আধুনিক কিষান সাপ্তাহিকীর সম্পাদক নিশিকান্ত ভালেরাও। ‘‘বিদর্ভ আর মারাঠাওয়াড়ায় তুলোর দাম প্রতি কুইন্টালে ৪০শতাংশ পড়ে গেছে।’’ সামান্য কিছু লেনদেন ছাড়া বিক্রিবাটা বন্ধ হয়ে রয়েছে। ‘‘কারও হাতে কোনো ক্যাশ নেই। কমিশন এজেন্ট, পণ্য উৎপাদন, ক্রেতা সকলেই সমানভাবে সমস্যার মধ্যে রয়েছেন,’’ জানালেন দ্য টেলিগ্রাফের নাগপুরের সাংবাদিক জয়দীপ হারদিকার। ‘‘গ্রামীণ ব্যাঙ্কগুলিতে চেক জমা দেওয়া সবসময়েই একটা ক্লান্তিকর ব্যাপার ছিল আর এখন টাকা তোলা হলো একটা দুঃস্বপ্ন।’’

তাই, খুব কম কৃষকই চেক নেবে। কিন্তু কবে যে এগুলি দিয়ে টাকা তোলা যাবে তার অপেক্ষায় থাকলে ওদের সংসার চলবে কী করে? অনেকেরই আবার চালু কোনো ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টই নেই।

এই রাজ্যের একটা গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কের সারা দেশে ৯৭৫টা এ টি এম রয়েছে। তার মধ্যে ৫৪৯টা হতাশা ছাড়া আর কিছুই পরিবেশন করছে না। ওই অচল এ টি এম-গুলির বেশিরভাগই গ্রামীণ এলাকায়। এর প্রভাবের একটা ছেঁদো যুক্তি খাড়া করা হয়, ‘‘গ্রামীণ এলাকা ধারের উপরেই চলে। নগদের এখানে কোনো মানেই নেই।’’ সত্যিই? এটাই এখানে সবকিছু।

একেবারে নিচের স্তরে লেনদেনের সিংহভাগটাই চলে নগদে। এক সপ্তাহের মধ্যে ছোট নোট না পৌঁছালে আইন-শৃঙ্খলার সমস্যার ভয় পাচ্ছেন ছোট গ্রামীণ শাখার ব্যাঙ্ককর্মীরা। অন্যরা বলছেন, সংকট তো এর মধ্যেই রয়েছে। এই সময়ের মধ্যে কিছু নগদ এলেও তা কিছুই কমবে না।

ঔরঙ্গাবাদে আরেকটা লাইনের সামনে দাঁড়িয়ে ভয়ে সিঁটিয়ে পারভেজ পাঠান। এক কনস্ট্রাকশন সাইটের সুপারভাইজার। ভয় পাচ্ছেন কখন তাঁর সাইটের শ্রমিকরা খেপে গিয়ে তাঁকে মারতে আসেন। ‘‘ওরা তো ওদের কাজ করেছে, ওদের তো পয়সা দিতে হবে।’’ বলছিলেন, ‘‘কিন্তু আমার হাতে কোনো নগদ টাকা নেই।’’ চিকলথানা গ্রামে, রাইস আখতার খান বলছিলেন, তিনি আর তাঁর মতোই কমবয়সি অন্য মায়েদের এখন ছেলেমেয়ের জন্য খাবার জোগাড়ই দায় হয়েছে। কখনই বা তাঁরা করবেন এসব। ‘‘কারণ দিনের বেশিরভাগটাই তো চলে যাচ্ছে লাইন দিতে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা চলে যাচ্ছে, ছেলেমেয়েগুলো অভুক্ত থেকে যাচ্ছে।’’

লাইনে দাঁড়ানো বেশিরভাগ মহিলাই বলছেন, তাঁদের হাতে ২-৪দিনের সুযোগ আছে। খুব কষ্ট করেও তাঁরা এমনটা ভাবতে পারছেন না, তার মধ্যে ক্যাশ ফ্লো’র সমস্যা মিটে যাবে। হায়! সমস্যা মেটার নয়।

কৃষক, ভূমিহীন খেতমজুর, গৃহপরিচারক, পেনশনভোগী, ছোটখাটো ব্যবসাদার, আরও অনেকে- সকলেই ভয়ানক আঘাতের মুখে। এমন অনেকেই রয়েছেন যাঁরা শ্রমিকদের কাজে লাগাতে গিয়ে ধারের খাতায় চলে যাবেন, মজুরি মেটাতে টাকা ধার করতে হচ্ছে। আবার অন্যদের মতো তাঁদের খাবার কিনতে পয়সা জোগাড় করতে হচ্ছে। ঔরঙ্গাবাদ স্টেশন রোডে স্টেট ব্যাঙ্ক অব হায়দরাবাদের শাখার এক কর্মী জানালেন, ‘‘যত দিন যাচ্ছে, আমাদের লাইন বেড়েই চলেছে, কমার নাম নেই।’’ হাতে গোনা এই সামান্য কর্মী নিয়ে এই বিপুল পরিমাণ লোক সামাল দেওয়া মুখের কথা। আরেক কর্মী আবার তুলে ধরলেন সফটওয়ারের ত্রুটির কথা, যা পরিচিতিপত্র ও অন্যান্য কাগজপত্র যাচাইয়ের জন্য পাঠানো হয়েছে।

লোককে দুটো ২০০০টাকা নোটের জন্য সর্বোচ্চ আটটা ৫০০ কিংবা চারটি ১০০০টাকা নোট বদলের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। এটা এককালীন লেনদেন। ‘‘হ্যাঁ, পরদিনই যদি আপনি আবার চেষ্টা করেন তাহলে আপনার ধরা পড়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু আপনি এই ফাঁদ এড়িয়ে যেতে পারেন। কিছুই না, কেবল একটা অন্য আইডি ব্যবহার করুন। আজ যদি আপনি আধার কার্ড ব্যবহার করেন, কাল তাহলে আপনার পাসপোর্ট নিয়ে আসুন, তার পরদিন আনুন প্যান কার্ড, ধরা না পড়েই আপনি বারে বারে টাকা বদলে যেতে পারবেন।’’

এখন, বাস্তবে যদিও কম লোকই এমনটা করছেন। বেশিরভাগই সিস্টেমের এই ত্রুটির কথাটা জানেই না। কিন্তু সরকারের প্রতিক্রিয়া উন্মাদের মতো। ওরা এখন লোকের হাতে ভোটের কালি লাগানোর কথা ঠিক করেছে। কালি লাগানো হবে ডানহাতে যাতে যেখানে যেখানে উপনির্বাচন রয়েছে সেখানে কোনো সমস্যা না হয়।

স্টেশন রোডের লাইনে দাঁড়ানো ছোট ঠিকাদার আর পাতিল বললেন, ‘‘সরকারের অর্ডার নিয়ে কখনো ভাববেন না।’’ ‘‘বাস্তবে কোথাও কোনো হসপিটাল বা ওষুধের দোকানে ৫০০ বা ১০০০-এর নোট নিচ্ছেই না।’’ পাতিলের পাশে দাঁড়ানো সঈদ মোদক বলে উঠলেন। পেশায় কাঠের মিস্ত্রি সঈদকে গুরুতর অসুস্থ এক নিকটাত্মীয়কে নিয়ে ক্লিনিকে ক্লিনিকে ঘুরতে হয়েছে। ‘‘প্রত্যেক জায়গা থেকে আমাদের ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে।’’ বলছিলেন, ‘‘হয় তারা ২০০০টাকার নোট নেবে না, নয়তো বলেছে, খুচরো নেই।’’

এরই মধ্যে গোটা ভারতের চোখ এখন নাসিকের উপর, সেখান থেকে নতুন ছাপা নোট বেরিয়ে আসবে। গ্রামাঞ্চলের কেউই এখনও তা হাতে পাননি। তবে সকলেরই আশা  তা ঘটবে।


   Courtesy: Ganashakti

Honour 1953 Agreement On J&K

May 17, 2016

কাশ্মীরঃ ১৯৫৩ সালের চুক্তি পুনর্বহাল করতে হবে

220px-Kuldip_Nayar-2

কুলদীপ নায়ার

কাশ্মীর এখন স্বাভাবিক। কথাটা এই অর্থে বলা যায় কারণ, সেখানে আমরা পাথর নিক্ষেপের ঘটনা দেখিনি। জঙ্গিবাদও শেষ পর্যায়ে চলে এসেছে। কিন্তু তারপরও এই উপত্যকার মানুষের মনে অসন্তোষ ক্রমেই বাড়ছে। সেখানে পা দেওয়ামাত্র আপনি এটা বুঝতে পারবেন। এর জন্য অনেক কারণই দায়ী। তবে তার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে, কাশ্মীরিদের মনে সাধারণভাবে এই বোধ সৃষ্টি হয়েছে যে ভারত কাশ্মীরের সবকিছুর মধ্যে ঢুকে পড়েছে। যদিও কাশ্মীর তাকে স্রেফ তিনটি জিনিসের নিয়ন্ত্রণ দিয়েছিল: প্রতিরক্ষা, পররাষ্ট্র ও যোগাযোগ।
এই অভিযোগের যৌক্তিকতা আছে। কারণ, রাষ্ট্রের একটি অংশ কেন্দ্রের কাছে কতটা সার্বভৌমত্ব সমর্পণ করবে, সেটা তার ওপরই নির্ভর করে। ফেডারেশন নিজে থেকে কিছু নিতে পারে না। কিন্তু নয়াদিল্লি ঠিক এ কাজটিই করেছে। জওহরলাল নেহরু ও শেখ আবদুল্লাহ ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন, এ কারণেই তাঁদের মধ্যে মনোমালিন্যের সৃষ্টি হয়েছিল। শেখ ১২ বছর অন্তরীণ ছিলেন। তবে নেহরু নিজের ভুল বুঝতে পেরেছিলেন, আর তা শোধরানোর জন্য তিনি শেখকে প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনে এনে রেখেছিলেন।
নয়াদিল্লি ও শ্রীনগরের সম্পর্ক নষ্ট হয়েছে ঠিক একই কারণে। কথা হচ্ছে, একজন মুখ্যমন্ত্রী কীভাবে একই সঙ্গে কেন্দ্রের সুনজরে থাকবেন, আবার উপত্যকাবাসীর মনে এই অনুভূতি সৃষ্টি করবেন যে তাঁদের স্বতন্ত্র পরিচয় রয়েছে। এই চিন্তায় বিভিন্ন রাজ্যের রাজনৈতিক দলগুলোর ঘুম হারাম হয়ে যায়।
যাঁরা কাশ্মীরকে ভারতের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ মনে করেন, তাঁরা ভারতীয় সংবিধানের ৩৭০ নম্বর ধারা মুছে দিতে চান। এঁরা একদিকে যেমন ভারতীয় সংবিধানের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করছেন, তেমনি অন্যদিকে কাশ্মীরিদের সঙ্গেও। দুঃখজনকভাবে ক্ষমতাসীন দল ভারতীয় জনতা পার্টির চিন্তা একটু ভিন্ন, যদিও প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এখন পর্যন্ত এমন কিছু করেননি, যা কাশ্মীরের স্বায়ত্তশাসন খাটো করতে পারে। কিন্তু এই উপত্যকার সর্বত্রই ভয় জেঁকে বসেছে
সে কারণেই কাশ্মীরের ভারতীয় ইউনিয়নে যোগ দেওয়ার বিষয়টি গুরুতর প্রশ্নের মুখে পড়েছে। যাঁরা একসময় কাশ্মীরের স্বাধীনতার ডাকে সামান্যই সাড়া পেতেন, তাঁরা কিন্তু এখন ভালোই সাড়া পাচ্ছেন। আর তাঁদের অনুসারীদের সংখ্যা যে দিনের পর দিন বাড়ছে, তাতে বিস্ময়েরও কিছু নেই।
নয়াদিল্লিকে এটা বুঝতে হবে, কাশ্মীরিরা যে ভারতের কাছ থেকে নিজেদের দূরে রাখতে চাইছে, তার মানে হয়তো এই নয় যে তারা নয়াদিল্লির কাছ থেকে শ্রীনগরের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের কথা ভাবছে। তারপরও কাশ্মীরিরা নিজেদের শাসন করছে—এমন একটি আবহ বজায় রাখতে হবে। মহারাজা হরি সিংয়ের পর শেখ আবদুল্লাহ রাজ্যে ধর্মনিরপেক্ষ ও গণতান্ত্রিক শাসন চালু করেছিলেন। কিন্তু তাঁর পার্টি নয়াদিল্লির খুব ঘনিষ্ঠ প্রমাণিত হওয়ায় রাজ্যসভায় হেরে গিয়েছিল।
পিপলস ডেমোক্রেটিক পার্টি জিতেছিল, কারণ এর প্রতিষ্ঠাতা মুফতি মোহাম্মদ সাঈদ নয়াদিল্লি থেকে দূরে ছিলেন, যদিও বিচ্ছিন্ন হননি। কাশ্মীরিরা তাঁকে ভোট দিয়েছিল, কারণ তিনি তাদের মনে নয়াদিল্লির বিরুদ্ধাচরণের অনুভূতি সৃষ্টি করেছিলেন। ওমর ফারুক আবদুল্লাহকেও শেখের পরিণতি বরণ করতে হয়েছিল একই কারণে। ভারতের সঙ্গে কাশ্মীরের সম্পর্ক খুবই নিবিড়, ফলে তারা তাকে একটি নির্দিষ্ট পর্যায়ের বাইরে গিয়ে চ্যালেঞ্জ জানাতে পারে না। কিন্তু বিরোধীরা তারপরও কাশ্মীরবাসীর মনে দিল্লি বিরোধিতার অনুভূতি বয়ে আনছে।
লর্ড সিরিল র‍্যাডক্লিফ কাশ্মীরকে তেমন গুরুত্ব দেননি। তিনি ছিলেন লন্ডনের একজন বিচারক, যিনি ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সীমারেখা টেনে দুটি পৃথক দেশের সৃষ্টি করেছিলেন। বহু বছর পর এক সাক্ষাৎকারে তিনি আমাকে বলেছিলেন, কাশ্মীর যে এত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে, সেটা তিনি বুঝতেই পারেননি।
কয়েক সপ্তাহ আগে শ্রীনগরে এক উর্দু ম্যাগাজিনের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করার সময় আমি এ ঘটনার পুনরাবৃত্তি করেছিলাম। উর্দুকে অনেক রাজ্য থেকেই শিষ্টাচারবহির্ভূতভাবে বাদ দেওয়া হয়েছে, এমনকি পাঞ্জাব থেকেও, যেখানে এটি কিছুদিন আগেও প্রধান ভাষা ছিল। বস্তুত, পাকিস্তান উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার পরই ভাষাটি ভারতে গুরুত্ব হারিয়েছে।
নয়াদিল্লি যে এই ভাষাটির সঙ্গে বিমাতাসুলভ আচরণ করে, এ ব্যাপারে কাশ্মীরবাসীর মনে গভীর দুঃখবোধ রয়েছে। সাধারণভাবে ধারণা করা যায়, ভাষাটি অযত্ন ও অবহেলায় হারিয়ে যেতে বসেছে, কারণ এটিকে মুসলমানদের ভাষা বলে মনে করা হয়। নয়াদিল্লি যদি উর্দু ভাষাকে নিজের মনে করত এবং এর চর্চাকে উৎসাহিত করত, তাহলে কাশ্মীরবাসীর সংক্ষুব্ধ হওয়ার একটি কারণ অন্তত কমে যেত।
ভারতের বাকি জনগণের মতো কাশ্মীরবাসীও গরিব, তাদের চাকরির দরকার। তারা মনে করে, শুধু উন্নয়নের মধ্য দিয়েও এটা সম্ভব, তার সঙ্গে আছে পর্যটন। কিন্তু তারা জঙ্গিদের তাড়ানোর জন্য বন্দুক বা অন্য কোনো অস্ত্র হাতে তুলে নিচ্ছে না। প্রথমত, তারা জঙ্গিদের ভয় করে। দ্বিতীয়ত, তারা মনে করে, এই জঙ্গিরা তাদের একটি পরিচয় দেওয়ার চেষ্টা করছে। ফলে তারা যে জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে মাথা তুলে দাঁড়াচ্ছে না, তার কারণ হচ্ছে, এটা তাদের স্বাভাবিক বিচ্ছিন্নতাবোধেরই অংশ।
কয়েক বছর আগে কাশ্মীরে যে প্রলয়ংকরী বন্যা হয়েছিল, তারপর নয়াদিল্লি উপত্যকাটির জন্য প্যাকেজ দেবে বলে ঘোষণা দিয়েছিল, তারা সেটা দেয়নি। ব্যাপারটা দুঃখজনক। গণমাধ্যমও এই কথা ভঙ্গের সমালোচনা করেনি। নেতারাও কিছু বলেননি। ফলে কাশ্মীরবাসী মনে করে, এটা নয়াদিল্লির দায়সারা কথা ছিল
আমি এখনো বিশ্বাস করি, ১৯৫৩ সালের চুক্তিতে যে ভারতকে কাশ্মীরের প্রতিরক্ষা, পররাষ্ট্র ও যোগাযোগের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল, সেটা এখনো এই উপত্যকার পরিস্থিতির উত্তরণ ঘটাতে পারে। কাশ্মীরের তরুণেরা রাজ্যের মর্যাদা নিয়ে ক্ষুব্ধ, ফলে তাঁদের জয় করার জন্য এই নিশ্চয়তা দেওয়া যেতে পারে যে পুরো ভারতের বাজার তাদের জন্য উন্মুক্ত।
কিন্তু শুধু এতেই যে কাজ হবে, এমনটা মনে হয় না। নয়াদিল্লিকে প্রতিরক্ষা, পররাষ্ট্র ও যোগাযোগ ছাড়া আর অন্য সব ক্ষেত্রে জারি করা বিধান বাতিল করতে হবে। ২৫ বছর আগে যে বিশেষ ক্ষমতা আইন জারি করা হয়েছিল, সেটা এখনো বলবৎ আছে। সরকার যদি এটা প্রত্যাহার করে, তাহলে যেমন কাশ্মীরিরা শান্ত হবে, তেমনি অন্যদিকে নিরাপত্তা বাহিনী আরও দায়িত্বশীল হবে।
মানুষ তো মনের শান্তি চায়। কাশ্মীরিদের অবশ্যই মনে করতে হবে যে তাদের পরিচয় আক্রমণের মুখে পড়েনি, সেই সঙ্গে নয়াদিল্লিকেও কাশ্মীরিদের আকাঙ্ক্ষা বুঝতে হবে। আর ১৯৫৩ সালের চুক্তি পুনর্বহাল করা হলে পরিস্থিতির উত্তরণ ঘটতে পারে, তা না হলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে।

Kanhaiya Kumar, The Pied Piper of JNU

February 22, 2016

অত্যাচারের বিরুদ্ধে কানহাইয়াদের বাঁশী

জিকো দাশগুপ্ত

Kanhaiya_Kumar_1

সংবাদমাধ্যমের অসংখ্য ক্যামেরার সামনেই দেশের আইন–সংবিধানকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে একদল ‘‌দেশপ্রেমী’‌ উকিল কোর্ট চত্বরেই কানহাইয়া কুমারকে মারলেন, আক্রান্ত হলেন এক সাংবাদিকও। দুষ্কৃতীরা চিহ্নিত হওয়া সত্ত্বেও পুলিস কাউকে গ্রেপ্তার করেনি। এই বিক্রম চৌহানরাই ঠিক দুদিন আগে বি জে পি বিধায়ক ও পি শর্মার নেতৃত্বে অধ্যাপক এবং সাংবাদিকদের মারধর করেছিলেন এই পাটিয়ালা কোর্টেই, তার প্রমাণও অসংখ্য, কেউ গ্রেপ্তার হননি। জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের গেটের বাইরে প্রতিদিন কয়েকশো উন্মত্ত হিন্দু পরিষদ–বজরং দলের কর্মী জে এন ইউ–র ‘‌দেশদ্রোহী’‌দের বিনা তদন্তে গ্রেপ্তার করার দাবি জানাচ্ছে, ক্যাম্পাসের ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করছে। সৌদি আরব বা আই এস–শাসিত অঞ্চলে হতে পারে, বা এ দেশের ‘‌মাওবাদী’‌রাও তাতে বিশ্বাস করতে পারে, তবে ‘‌ক্যাঙ্গারু’‌ কোর্ট চালিয়ে কাউকে দোষী সাব্যস্ত করার বা তাকে শাস্তি দেওয়ার অনুমতি আর যাই হোক ভারতীয় আইন–সংবিধান দেয় না।

তবে বেগুসরাইয়ের অঙ্গনওয়াড়ি সেবিকার পুত্র কানহাইয়া কুমারের ক্ষেত্রে অবশ্য গ্রেপ্তার করার মাপদণ্ডই আলাদা। এখনও একটাও প্রমাণ দেখাতে পারেনি, অথচ ‘‌দেশদ্রোহের’‌ মতো অভিযোগে তাকে গ্রেপ্তার করেছিল পুলিস। ৯ ফেব্রুয়ারি জে এন ইউ–তে যে সব প্রতিক্রিয়াশীল ভারতবিরোধী স্লোগান উঠেছিল, ছাত্র সংসদের তরফ থেকে আগেই দ্ব্যর্থহীন ভাষায় তার নিন্দা করেছেন কানহাইয়া। দেশের সংবিধানের ওপর সম্পূর্ণ আস্থা রেখে তার ভাষণ একটি সংবাদপত্রে পুঙ্খানুপুঙ্খ ছাপাও হয়েছে। এর মধ্যে কোনটা দেশদ্রোহ?‌

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর স্নেহভাজন দিল্লির পুলিস কমিশনার এখন বলছেন বেল চাইলে পুলিস আর আপত্তি জানাবে না, কিন্তু প্রমাণ ছাড়া ‘‌দেশদ্রোহে’‌র মতো অভিযোগে একজন ছাত্রকে গ্রেপ্তার করেছিলেনই বা কেন?‌ প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও বি জে পি মদতপুষ্ট বিক্রম চৌহানদের গ্রেপ্তার করা যাচ্ছে না, আর জে এন ইউ ছাত্র সংসদ সভাপতির বেলায় গ্রেপ্তার করার পর প্রমাণ খোঁজার প্রচেষ্টা?‌ বি জে পি নেতারা বলে বেড়াচ্ছেন আইনের ওপর ভরসা রাখতে, কানহাইয়া নির্দোষ হলে ছাড়া পেয়ে যাবেন। তাহলে ও পি শর্মার নেতৃত্বে বিক্রম চৌহানরা কোর্টে কী করছেন?‌ বি জে পি–র মুখপাত্র সম্বিত পাত্র এক সর্বভারতীয় সংবাদ চ্যানেলে গিয়ে কানহাইয়াকে দেশদ্রোহী প্রমাণ করার চেষ্টা করলেন একটি ভিডিও ফুটেজ দেখিয়ে যার সত্যতা নিয়েই গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। আইন–সংবিধানে বিশ্বাস রাখেন তো প্রমাণ কোর্টে পেশ করুন, একটি ছাত্রের মিডিয়া ট্রায়াল করছেন কেন?‌

নিজেদের রাজনৈতিক অ্যাজেন্ডা চাপিয়ে দিতে বি জে পি সরকার এই মুহূর্তে স্ববিরোধী নীতি নিয়েছে— এক, দেশের আইন–সংবিধান দেখিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করে নিরস্ত্র ছাত্রদের দমন করা। এবং দুই, আর এস এস–বি জে পি কর্মীদের ব্যবহার করে সেই আইন–সংবিধানকেই পরাভূত করা। দেশের আইন–সংবিধানের ওপর আর এস এস–এর অ্যাজেন্ডা চাপিয়ে দিতে বিক্রম চৌহানরা আছেন। গণতন্ত্রের ওপর এই অভূতপূর্ব আক্রমণের মুখেও লিবারেল মধ্যবিত্ত শ্রেণীর সমর্থন ধরে রাখতে দরকার সংবিধানের ১২৪এ ধারা। এক কথায়, কানহাইয়া কুমারের হাজতবাস এবং পাটিয়ালা কোর্টে গুণ্ডামি, এই দুটো ঘটনা একই সূত্রে গাঁথা।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গৈরিকীকরণ এবং নিজেদের সঙ্কীর্ণ রাজনৈতিক স্বার্থকে চরিতার্থ করতে ছাত্রদের দমন করার উদাহরণ এই সরকারের আমলে অবশ্যই প্রথম না। পুণের ফিল্ম ইনস্টিটিউট থেকে শুরু করে হায়দরাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়, আই আই টি দিল্লি হোক বা আই আই টি মাদ্রাজ, ছাত্রদের গণতান্ত্রিক অধিকারের ওপর ক্রমাগত আক্রমণ হয়ে চলেছে। রোহিত ভেমুলাদের প্রাণ দিতে হচ্ছে, যাদবপুর ক্যাম্পাস আক্রান্ত হচ্ছে। তবে, জে এন ইউ–এর ক্ষেত্রে গোটা বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপরেই আক্রমণ নেমে এল। আস্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকেই দেশদ্রোহীদের আস্তানা বলে প্রচার করা হল।

জে এন ইউ দেশদ্রোহীদের আস্তানা হয়ে থাকলে একই যুক্তিতে এই সরকারকেও দেশদ্রোহী বলতে হয়, কারণ বর্তমাণ বাণিজ্যমন্ত্রী থেকে শুরু করে দেশের বিদেশ সচিব, নীতি আয়োগের সি ই ও থেকে শুরু করে প্রধানমন্ত্রীর দ্বারা নিযুক্ত কাউন্টার–টেররিজমের স্পেশ্যাল এনভয়, প্রত্যেকেই এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন। শিক্ষাজগৎ থেকে শুরু করে সর্বভারতীয় সংবাদমাধ্যম, আমলা থেকে শুরু করে বিভিন্ন ধারার সামাজিক–রাজনৈতিক আন্দোলনে বিগত চল্লিশ বছরে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র এবং অধ্যাপকদের নাম এবং ভূমিকা লিখতে গেলে কয়েকটা বই লিখে ফেলতে হবে। তাই দেশদ্রোহিতার অপপ্রচার কতটা অবান্তর, সেই প্রসঙ্গে না ঢুকে বরং সেই অপপ্রচারের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে আসা যাক।

বি জে পি–মদতপুষ্ট এই অপপ্রচার জে এন ইউ–এর বিরুদ্ধে প্রথমবার না, বাজপেয়ী জমানাতেও হয়েছে, ইদানীংকালে ইউ জি সি আন্দোলন চলার সময়ও আর এস এস–এর মুখপত্র ‘‌পাঞ্চজন্য’‌–তে এই বিশ্ববিদ্যালয়কে ‘‌দেশদ্রোহীদের আস্তানা’‌ বলা হয়েছে। ভূমিকা বিশাল, তবে এর কারণ শুধুমাত্র ধর্মনিরপেক্ষ এবং নব–উদারবাদ বিরোধী জে এন ইউ–এর ছাত্র আন্দোলনে খুঁজলে ভুল হবে। সামগ্রিকভাবেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে জে এন ইউ সেই সব কিছুর প্রতীক, যা আর এস এসের স্বার্থবিরোধী। কারণ ‘‌হিন্দু রাষ্ট্র’‌ গড়ে তোলার যুক্তির বিরুদ্ধে গিয়ে জে এন ইউ বিশ্বাস করে আম্বেদকর–রচিত ধর্মনিরপেক্ষ ভারতীয় সংবিধানে, তুলে ধরে সংবিধানের প্রিঅ্যাম্বল–এ ঘোষিত সামাজিক ন্যায়ের বার্তা।’‌

রাজনৈতিক মতাদর্শ নির্বিশেষে আজ এই বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র–অধ্যাপক–কর্মচারীদের যে বিশাল ঐক্য গড়ে উঠেছে, তার ভিত্তি হল জে এন ইউ–এর অনন্য সংস্কৃতি। সামাজিক ন্যায় এবং গণতান্ত্রিক অধিকারকে রক্ষা করার সংস্কৃতি, মাথা উঁচু করে ঠিককে ঠিক এবং ভুলকে ভুল বলার সংস্কৃতি। তাই হাতে–গোনা কিছু বিদ্যার্থী পরিষদের কর্মী যখন হিংসা ছড়ানোর উদ্দেশ্যে স্লোগান দিতে দিতে ধেয়ে আসে চার হাজার ছাত্রের জমায়েতে, অধ্যাপকেরাই গড়ে তোলেন মানবশৃঙ্খল, রক্ষা করা হয় মুষ্টিমেয় সেই ছাত্রদের স্লোগান দেওয়ার অধিকারকেও। তাই এই আন্দোলনের সঙ্গে সহমর্মিতা রেখে ইস্তফা দেন বিদ্যার্থী পরিষদের ছাত্রনেতারাও।

শীর্ষস্থানীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হয়ে ওঠার পেছনে বড় ভূমিকা পালন করেছে জে এন ইউ–র চিরকালীন ঐতিহ্য, ‘‌academics of dissent‌’‌। উন্নততর ভারত গড়ে তোলার লক্ষ্যে, প্রথাগত ধ্যানধারণাকে প্রশ্ন করে গবেষণার বৃত্তকে বাড়িয়ে তোলা এই ঐতিহ্যের অংশ। এবং অর্জিত এই শিক্ষাকে সমাজে বাস্তবায়িত করার লক্ষ্যে, ‘‌academics of dissent‌’‌, এই বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘‌politics of dissent‌‌’‌–এর সঙ্গে যুক্ত। জরুরি অবস্থার সময় থেকে শুরু করে নির্ভয়া, যার সাক্ষী বিগত ৪০ বছরের বিভিন্ন আন্দোলন। পড়াশোনা এখানে রাজনীতিকে সমৃদ্ধ করে, এবং রাজনীতি পড়াশোনাকে। এখানে ছাত্ররা স্লোগান দেন ‘‌পড়াশোনা করার জন্য লড়ো, সমাজ পাল্টানোর জন্য পড়ো’‌। ছাত্ররা শুধু নিজেদের স্বার্থে নয়, লড়েন এমন জে এন ইউ–এর জন্য যাতে সমাজের সব থেকে পিছিয়ে পড়া অংশের মানুষ এখানে পড়তে পারে। বিশ্ববিদ্যালয়ে যখন নেমে এসেছে চরম আক্রমণ, চলছে মরণপণ প্রতিরোধ, এই ক্যাম্পাসেই অধ্যাপকেরা প্রতিদিন জাতীয়তাবাদের ওপর ক্লাস নিচ্ছেন, যা একসঙ্গে শুনতে আসছেন কয়েক হাজার ছাত্রছাত্রী।

পেশিশক্তি বা টাকার জোরে না, এখানে রাজনীতি হয় মতাদর্শের ভিত্তিতে। প্যামফ্লেট, পাবলিক মিটিং এবং ঘরে ঘরে গিয়ে রাজনৈতিক প্রচারের মাধ্যমে বিভিন্ন ছাত্র সংগঠন নিজেদের বক্তব্য তুলে ধরে। ছাত্ররাই গড়ে তোলেন নিজেদের ‘‌ইলেকশন কমিটি’‌, ছাত্ররাই পরিচালনা করেন ছাত্র সংসদ নির্বাচন। ইউনিভার্সিটি জেনারেল বডি মিটিং ছাত্রদের ‘‌highest decision making body‌’‌, যাতে অংশগ্রহণ করে হাজার হাজার ছাত্রছাত্রী। এই প্রগতিশীল ঐতিহ্যেরই প্রতিফলন যে কানহাইয়া কুমার, লেনিন কুমার, বাত্তিলাল বেয়োরা, চন্দ্রশেখরের মতো সমাজের সব থেকে শোষিত এবং পিছিয়ে পড়া অংশের মানুষ এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ সভাপতি হন।

মার্ক্স বলে গেছেন, ‘‌when an idea grips the masses, it becomes a material force‌’‌। ন্যায় এবং গণতন্ত্রের ‌‘‌idea‌’‌ এখানে ছাত্র আন্দোলনের মাধ্যমে ‘‌material force‌’‌ হয়ে জেগে থাকে। আর এস এস এই ‘‌material force‌’‌–কে ভয় পায়। আর জে এন ইউ–র সংস্কৃতির দ্বারা ঐক্যবদ্ধ অধ্যাপক–ছাত্ররা গণতন্ত্র এবং সামাজিক ন্যায়ের এই বস্তুবাদী শক্তিকেই বাঁচানোর লড়াই লড়ছেন।

গণতন্ত্রে যে কোনও রাজনৈতিক শক্তিকে আধিপত্য বিস্তার করার জন্য দরকার হয় সামাজিক সমর্থনের। বিগত লোকসভা ভোটে বিগত সরকারের অকর্মণ্যতার বিরুদ্ধে ‌অচ্ছে দিনের স্লোগান রেখে সেই সামাজিক সমর্থন অর্জন করেছিল বি জে পি। অর্থনৈতিক সঙ্কট এবং নব–উদারবাদী নীতির জন্যে অচ্ছে দিনের স্লোগান দ্রুতই মুখ থুবড়ে পড়েছে। সংখ্যালঘু এবং সামাজিকভাবে শোষিত মানুষের বিরুদ্ধে লোক–খ্যাপানোর রাজনীতি করেও সামাজিক সমর্থন হারাতে হল বিহারে। ঘৃণার রাজনীতি করে মানুষের অচ্ছে দিন আনার অবকাশ নেই, তাই সমর্থন পেতে দরকার নতুন শত্রুর। রোহিত–জে এন ইউ–যাদবপুর এবং সেই সমস্ত মানুষ যাঁরা আর এস এসের রাজনীতিতে বিশ্বাস করেন না, তাদের দেখিয়ে তাই কাল্পনিক ‘‌দেশদ্রোহী’‌ খোঁজার প্রচেষ্টা

শুধু সাম্প্রদায়িক বা নব–উদারবাদী আক্রমণই না, এবার দেশবাসীদের মধ্যেই কাল্পনিক ‘‌দেশপ্রেমী’‌ এবং ‘‌দেশদ্রোহী’‌ বিভাজন করে বি জে পি গৃহযুদ্ধ শুরু করতে চাইছে নিজেদের সঙ্কীর্ণ রাজনৈতিক স্বার্থে। এই দেশবিরোধী শক্তিকে কোণঠাসা করতে গড়ে তুলতে হবে সাম্প্রদায়িকতা, জাতি–ভেদাভেদ, লিঙ্গ বৈষম্য এবং নব–উদারবাদের বিরুদ্ধে গণতান্ত্রিক ভাবনাচিন্তার পক্ষে যৌথ আন্দোলন। সেই আন্দোলনের ভিত্তিতে অর্জন করতে হবে মানুষের বৃহত্তম ঐক্য। অত্যাচারের বিরুদ্ধে বাঁশি ধরেছেন কানহাইয়ারা, কংস মামারা প্রস্তুত থাকুন।



(‌লেখক জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির গবেষক)‌‌‌

Fight For Rice, Meat; And Mamata

November 6, 2015

ভাতের লড়াই, মাংসের কাজিয়া এবং মমতা

চন্দন দাস

মিড ডে মিলে মাংস দেওয়া হয় না। ডিম দেওয়া হয়। সাধারণত একদিন।ডিম কার? কে দিয়েছে? এ’ নিয়ে কাজিয়া বাধানোর অবকাশ নেই। কারণ পাখির সঙ্গে দেশপ্রেমের সরাসরি সংযোগ সংক্রান্ত কোনও নিদান নেই।

আগামী দিনে মিড ডে মিলে আদৌ ভাত দেওয়া যাবে কিনা, শিশুরা আর পড়তে আসতে পারবে কিনা নিদারুণ আর্থিক সঙ্কট ডিঙিয়ে — এই প্রশ্ন ক্রমাগত সক্রিয় হয়ে উঠছে দেশে এবং রাজ্যে। পশ্চিমবঙ্গে অনেক শিশু শিক্ষাকেন্দ্র, মাধ্যমিক শিক্ষাকেন্দ্রের ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার সামনে। তবু ভাত নিয়ে, চাল নিয়ে, ‘ভাতের কারখানা’ নিয়ে মাথাব্যথা বিশেষ কারও নেই। ভাতের সঙ্গে কী দেশপ্রেম, নাগরিকত্বের কোনও সম্পর্ক নেই?

থাকার কথা। কে কত বড় দেশপ্রেমিক ঠিক করা উচিত, কে দেশের গরিবের জন্য কত সুযোগ সৃষ্টি করতে পারছে তার উপর। কিন্তু তা হয়নি গত ৬৮ বছরে। দেশপ্রেমের ঠিকাদাররা এখন মাংসের মানদণ্ডে দেশপ্রেমের সার্টিফিকেট দিচ্ছেন। আর দেশপ্রেমের দিনমজুররা ভাতের লড়াইটা পৌঁছে দিচ্ছেন, দেওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছেন আজও। তা সে বর্ধমানে হোক, জঙ্গলমহলে হোক কিংবা চা বাগানে — ছবি একই। মাংসের কাজিয়া মূলত সেই ভাতের লড়াইকে ভুল দিকে ঘুরিয়ে দিতে।

দেশপ্রেমের দিনমজুর…

সাভারকারের সঙ্গে আমাদের লড়াই অনেকদিনের। ১৯২৫-এ আরএসএস-র জন্ম। ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির ১৯২০-তে। সাভারকার ভারতে ‘হিন্দুত্ব’ ভাবনার স্থপতি। তিনি সেলুলার জেলে ছিলেন। গণেশ ঘোষও। সাভারকার জেল থেকে ব্রিটিশ সরকারের কাছে মুচলেকা দিয়েছিলেন। গণেশ ঘোষরা অবশ্য সেখান থেকেই, বিস্তর কষ্ট সহ্য করে কমিউনিস্ট হওয়ার রাস্তা তৈরি করেন। সাভারকারের ভাবশিষ্যরা এখন ঠিক করছে কে দেশপ্রেমিক, আর কে পাকিস্তানি। আর গণেশ ঘোষের উত্তরসূরিরা এখনও পদাতিক, দেশপ্রেমের দিনমজুর। রাষ্ট্র তাঁদের দেখে না। মোটা মাইনে দেয় না। কিন্তু দেশবাসীর ভাত, মোটা কাপড়, কাজ, এতটুকু ছাদের লড়াইটা এখনও, বিস্তর রক্তপাতের পরেও লড়ে যাচ্ছেন তাঁরা।

এ’ লড়াই বাঁচার লড়াই। এ’ লড়াই জিততে হবে — স্লোগানটা বস্তাপচা হয়নি। এখনও লাল পতাকা মানে এটাই।

সাক্ষী, প্রমাণ জঙ্গলমহলে। ২৩টি ব্লক। ২০০১-র ২৩শে জানুয়ারি থেকে ২০১১-র ৩০ শে নভেম্বর — সময়কাল মাত্র ১০ বছর ১০ মাস। মানে ১৩০ মাস। আর এই সময়ে জঙ্গলমহলে ২৭৫ জন শহীদ হয়েছেন। নির্দিষ্ট একটি এলাকায়। তাঁদের মধ্যে পার্টির জেলা সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য আছেন। আবার নেহাতই স্কুলছাত্র — তিনিও আছেন। অসমসাহসী মহিলা আছেন। সংখ্যালঘু আছেন। আদিবাসী তো আছেনই। সবচেয়ে বড় কথা — খেতমজুর আছেন অনেকে। গরিব কৃষক, ছোট ব্যবসায়ীও আছেন শহীদ তালিকায়।

তারপরও টিকে আছে পার্টি। সিপিআই(এম)। ‘টিকে থাকা’ শব্দটির মধ্যে একটি নেতিবাচক মনোভাব অনুরণিত হয়? তাই না। আসলে এতজন সংগঠককে হারিয়ে হাঁটু মুড়ে, দুমরে মুচড়ে পড়ে যাওয়ার কথা। কোথাও কোথাও মিশে যাওয়ার কথা লালমাটির সঙ্গে। লোধাশুলির অফিস বিস্ফোরণে উড়ে যেতে পারে। সে তো ইঁট, কাঠ, কংক্রিটের। কিন্তু জান আছে দেশপ্রেমের ধারণায়। দেশপ্রেম মানে মানুষ। তাই সিপিআই(এম)-র নেতা, কর্মী, সমর্থকদের গুলি ঝাঁঝরা করা মাওবাদী নেত্রী যখন তৃণমূল কংগ্রেস নেতার সুখী ঘরণীর জীবন কাটাচ্ছেন, তখনও, সেই ‘বিপ্লবী’দের ভয় জাগানো আঁকা বাঁকা মেঠো পথে প্রচার চালাচ্ছে সিপিআই(এম)।

জঙ্গলমহলে রেগার জবকার্ড আছে ৬লক্ষ ২৭ হাজার ৪০১টি পরিবারের। আর কাজ পেয়েছেন চলতি বছরে ৩৬ হাজার ৮০টি পরিবার। শতাংশের হিসাব করলে রাষ্ট্র, সরকারের লজ্জায় মাথা হেঁট হওয়া উচিত। নতুন ধানের দাম বস্তা(৬০ কেজি) ৫৫০ টাকা। নির্ধারিত দামের প্রায় অর্ধেক। আর ৩০ কেজি বীজধানের দাম ১২০০টাকা। প্রতিটি ব্লকে কিষান বাজারের প্রতিশ্রুতি ছিল। সব ব্লকে হয়নি। যে কটি ব্লকে হয়েছে, সেগুলির ভবনগুলি শুধু দাঁড়িয়ে আছে। কৃষক সেখানে যান না। সেখানে কোনও কেনাবেচার দেখা নেই। গোয়ালতোড়ে ১০০০ একর জমিতে শিল্পের ঘোষণা এখনও প্রতিশ্রুতির পর্যায়ে রয়েছে। জঙ্গলমহলের জন্য পৃথক এমপ্লয়মেন্ট ব্যাঙ্কের ঘোষণা করেছিলেন মমতা ব্যানার্জি। সেটি হয়নি। ল্যাম্পস যা ছিল আদিবাসীদের উপার্জনের অন্যতম মাধ্যম, সেগুলি এখন ধুঁকছে। গ্রামগুলিতে কর্জ, দাদনে জর্জরিত কৃষক ক্রমাগত মহাজনের দেনা-চক্রে জড়িয়ে পড়ছেন। এই পরিস্থিতিতে রেগার মজুরি চাই, কাজ কোথায়, শিল্পের কী হলো, কেন ফসলের দাম পাচ্ছি না, এত যে প্রতিশ্রুতি দিলে তার কী হলো — নানা দাবি ধূমায়িত। আবার সভা, মিছিল দেখা যাচ্ছে জোরালো। প্রতিটি ব্লকে জমায়েত হয়েছে এই সময়ে। পুলিশের সাধ্য কী তাকে আটকায়? ডেপুটেশন দিচ্ছেন গ্রামবাসীরা — সামনে পার্টির নেতা, কর্মীরা। সেই চেনা ঝান্ডা। শহীদদের পতাকা।

শিলদায় দেখা হলেই অনন্ত বলতো —‘‘শেষ পর্যন্ত লড়ে যাবো।’’ কমরেড অনন্ত মুখার্জি নেই। তাতে কী? এই হেমন্তেও ‘অনন্তরা’ থেমে নেই।

দেশে এমন উদাহরণ আছে? না। বিদেশে? হাতে গোনা যাবে।

ভয়ও হেরে যায়, রাস্তা ছেড়ে দেয় নতজানু হয়ে — এমন পার্টি দেশে একটিই আছে। কবিতা মনে হচ্ছে? মনে হচ্ছে বান এসেছে হৃৎকমলের সুবর্ণরেখায়? মোটেও না।

আমি হাজারও ঋত্বিক দেখেছিলাম। হাজারও ঋত্বিক দেখছি। দেশপ্রেমের পদাতিক তো তাঁরাই। তাই ভরসা থাকুক তাঁদের উপর। নজর থাকুক সামনে। জোয়ার আসছে কাঁসাইয়ে।

অপেক্ষাকে যত্ন করুন।

মাংসের কাজিয়া, মুখ্যমন্ত্রীর নীরবতা..

চা বাগানে ঠিক মত খাওয়াই জুটছে না। অনাহারে মারা যাচ্ছেন বন্ধ বাগানের শ্রমিক পরিবার। জঙ্গলমহলে কাজ নেই। রেগার মজুরি জুটছে না রাজ্যের কোনও জেলায়। বর্ধমান, বাঁকুড়া, বীরভূমে ধান পুড়ে খাক। অন্যত্র ধানের দাম নেই। আলুর দাম নেই। বাকি সব ফসলের একই হাল। ঠিক এখন, এই পশ্চিমবঙ্গে মাংসের চরিত্র নির্ধারণের সময় নেই বেশিরভাগের। দেশের অবস্থাও প্রায় এক। এ’ কথা ঠিক যে, দেশের অন্য কোনও রাজ্যেই এমন রাজ্য সরকার নেই। উৎসবের বিলাসিতায়, ঘোষণা-প্রতিশ্রুতির ভেলায় ভেসে চলা এমন রাজ্য প্রশাসন দেশে বেনজির। প্রতিবাদী আক্রান্ত হবেই, নির্ঘাৎ হবে — এমন নিশ্চয়তা দেশের প্রায় কোনও রাজ্যে নেই। চুরির দায়ে অভিযুক্ত মন্ত্রীর ‘পাশে থাকার’ পোস্টার সাঁটিয়ে অবলীলায় স্কুল, কলেজের ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে ছুটে চলা অটো দেশের কোথাও মিলবে না। আর এখানেই রাজ্য সরকারের অগণতন্ত্র, ব্যর্থতার পরিপ্রেক্ষিতে রাজপথের লড়াইয়ে এত রক্তক্ষরণ, তীব্রতা সাম্প্রতিককালে দেশের আর কোথাও মেলেনি।

মোদীর হাতে দেশ বিপন্ন। মমতা ব্যানার্জির সরকারই বেসামাল।

কতটা বেসামাল তৃণমূল কংগ্রেসের সরকার মুখ্যমন্ত্রী নিজে বুঝিয়ে দিয়েছেন উত্তরবঙ্গ সফরে। শিল্পপতিদের হাত জড়ো করে অনুনয়, বিনয় করেছেন বিনিয়োগের জন্য। অথচ ২০০৬-০৭-এ কী নিদারুণ ‘বীরত্ব’ আমরা দেখেছিলাম তাঁর মধ্যে। সিঙ্গুর সাক্ষী। কাটোয়া সাক্ষী। ভাঙড় সাক্ষী। সাক্ষী আরও অনেক জায়গা, যেখানে বামফ্রন্টের সরকার শিল্পের উদ্যোগ নিয়েছিল। তখন, নন্দীগ্রামের এক সভায় তৃণমূল কংগ্রেসের নেত্রী বলেছিলেন,‘‘ভাতের কারখানা ধ্বংস করে মোটর গাড়ির কারখানা/ সে হবে না, সে হবে না।’’ ‘কৃষক-দরদী’ তৃণমূল কংগ্রেসের নেতা, কর্মীরা সেই ছড়াকে নিজেদের উত্থানের রিং টোন করে ফেলেছিলেন।

এখন রাজ্যে বিনিয়োগের দেখা নেই। আর ‘ভাতের কারখানা’, অর্থাৎ খেতখামারের অবস্থা গত আটত্রিশ বছরের সবচেয়ে দুরবস্থার মুখোমুখি। একশোর বেশি কৃষক আত্মঘাতী হয়েছেন। ন্যূনতম সহায়ক মূল্য ১৪১০ টাকা কুইন্টাল প্রতি হলেও, রাজ্যের কোথাও কুইন্টাল প্রতি ৯০০-৯৫০ টাকা ধানের দাম কৃষকরা পাচ্ছেন না। আসলে ভাতের কারখানা আর মোটর গাড়ির কারখানার একটি গভীর যোগাযোগ ছিল, যা মমতা ব্যানার্জি কিছুতেই রাজ্যের মানুষ বুঝে ফেলুন, তা চাননি। তাই কখনও মাওবাদী, কখনও আরএসএস, কখনও জামাতের সঙ্গে মিলে রাজ্য জুড়ে নৈরাজ্য তৈরি করেছিলেন।

বামফ্রন্ট সংবেদনশীল ছিল। অনেকে তাকে দুর্বলতা ভেবেছিল। আর সেই নৈরাজ্যের ফল এখন মিলছে। শিল্প গত। ভাতের কারখানাও পতিত হতে বসেছে। এমন সময়ে মাংসের কাজিয়া নিয়ে মমতা ব্যানার্জি কী করে কঠোর সমালোচনা করেন? দেশের নানা পর্যায়ের মানুষ প্রতিবাদ করছেন। বামপন্থীরা তো হিন্দুত্ববাদীদের পয়লা নম্বর দুশমন। তাঁরা তো প্রতিবাদে সোচ্চার হবেনই। কিন্তু মমতা ব্যানার্জি বিলকুল চুপ। এই নীরবতা সন্দেহজনক। কিন্তু একেবারে বোঝা যাচ্ছে না নীরবতার কারণ, তা নয়। ‘মাংসের কারবারিরা’ই তাঁকে আবার রক্ষা করতে পারে, সেই অঙ্ক করে ফেলেছেন তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী। তাঁর অনেক দিনের পুরোন বন্ধুরা আছেন এই মাংসের পরিচয়পত্র তৈরির কাজে।

বাঁটোয়ারাপন্থীরা বাড়ছে…

মাংস কার? গোরুর না মোষের? নাকি পাঁঠার? নাকি মুরগি, হাঁসের মাংস খাওয়া উচিত? বিতর্কের বল গড়াতে গড়াতে শেষ পর্যন্ত ‘দেশপ্রেমে’ পৌঁছে গেছে। কে পাকিস্তানি, কে ভারতীয় — ঠিক করছে মমতা ব্যানার্জির ‘দেশপ্রেমিকরা’। অর্থাৎ আরএসএস, সঙ্ঘ পরিবার। ২০০৩-র ১৫ই সেপ্টেম্বর দিল্লিতে আরএসএস-র সভায় হাজির হয়ে আজকের বাংলার মুখ্যমন্ত্রী বলেছিলেন,‘‘আপনারা সত্যিকারের দেশপ্রেমিক। আমরা জানি আপনারা দেশকে ভালোবাসেন।’’ সেই আরএসএস ‘দেশপ্রেমের’ শংসাপত্র দিচ্ছে। কার কার পাকিস্তানে যাওয়া উচিত, তাও ঠিক করে দিচ্ছে। এদের কাছে মমতা ব্যানার্জি কমিউনিস্টদের সরানোর জন্য সহায়তা চেয়েছিলেন। বলেছিলেন,‘‘যদি আপনারা(আরএসএস) ১শতাংশও সহায়তা করেন আমরা কমিউনিস্টদের সরাতে পারবো।’’ আরএসএস সেদিন তাঁকে ‘সাক্ষাৎ দূর্গা’ বলে অভিহিত করেছিল।

সেই আরএসএস-র ‘মাংস বিতর্ক’ এবং দেশপ্রেমের অপপ্রচার মমতা ব্যানার্জিকে আগামী বিধানসভা নির্বাচনে সহায়তা করবে, এমনটাই তৃণমূল কংগ্রেসের অভিজ্ঞ নেতারাও মনে করছেন। রাজ্যে আরএসএস বেড়েছে গত চারবছরে। গত চার বছরে তাঁদের শাখার সংখ্যা ৫৮০ থেকে হয়েছে ১৪৯০। বৃদ্ধি ১৫৭ শতাংশ। স্বাধীনতার পরে পশ্চিমবঙ্গে আরএসএস-র এমন বিকাশ কখনও হয়নি। রাজ্যে আরএসএস ‘অনুপ্রবেশ’ সমস্যাকেই প্রধান বিপদ বলে প্রচার শুরু করেছে। আর খোদ মমতা ব্যানার্জিই সংসদে ‘অনুপ্রবেশ’ ইস্যুতে সঙ্ঘ পরিবারের বক্তব্য তৃণমূলের সাংসদ হিসাবে তুলে ধরেছিলেন।

দিনটি ছিল ২০০৫-র ৪ঠা আগস্ট। লোকসভায় অধ্যক্ষের মুখের উপরে কাগজের তাড়া ছুঁড়ে দিয়ে অভব্যতার এক নজির সৃষ্টি করেছিলেন আজকের মুখ্যমন্ত্রী। পুরো সংসদ বিস্মিত হয়েছিল তাঁর এই কাণ্ডে। কেন সেদিন তিনি এমন করেছিলেন? কারণ, সেদিন তিনি সংসদে ‘অনুপ্রবেশ সমস্যা’ নিয়ে আলোচনা করতে চেয়েছিলেন। বামফ্রন্ট সরকার কিভাবে অনুপ্রবেশে মদত দিচ্ছে, তার গল্প শোনাতে চেয়েছিলেন। অনুমতি মেলেনি। তাই ওই অভব্যতা। অর্থাৎ, রাজ্যে যখন শক্তিশালী বামপন্থী আন্দোলনের অবস্থানের কারণে সাম্প্রদায়িক শক্তি পা রাখার সামান্য জায়গা পাচ্ছে না, তখন ‘পশ্চিমবঙ্গের অনুপ্রবেশ’ নিয়ে সংসদে বলে সঙ্ঘ পরিবারের কাছে বার্তা দিয়েছিলেন মমতা ব্যানার্জি — ‘আমি তোমাদেরই লোক’।

গত চারবছরে রাজ্যে মৌলবাদীরাও বেড়েছে আরএসএস-র মত। পশ্চিমবঙ্গে বামফ্রন্ট সরকারের সময়কালে এই মৌলবাদীদের সমর্থকরা কখনও মাথা তুলতে পারেনি। মমতা ব্যানার্জিকে মুখ্যমন্ত্রী করার জন্য এই প্রবল স্বাধীন বাংলাদেশ বিরোধী, ধর্মান্ধ, উগ্রপন্থায় বিশ্বাসী অংশের একটি সহযোগিতা ছিল। সম্প্রতি সারদার টাকা সেই উগ্রপন্থীদের হাতে পৌঁছোনর খবর প্রকাশিত হয়েছে। তাতে আবার মুক্তিযুদ্ধের সময়, ১৯৭১-এ বাংলাদেশ ছেড়ে চলে আসা হাসান আহমেদ ইমরানের নাম জড়িয়েছে। তিনি রাজ্যে কট্টর মৌলবাদী সিমি-র প্রতিষ্ঠাতাদের একজন। ২০০৭-’০৮ থেকে তৃণমূল কংগ্রেসে আশ্রয় নেন। তসলিমা নাসরিনের ভিসার বিষয় নিয়ে বামফ্রন্ট সরকারের সময়কালে রাজ্যে এক উত্তেজনা, ধর্মীয় উন্মাদনা তৈরি করেছিলেন ইদ্রিশ আলি। তাকেও মমতা ব্যানার্জি সাংসদ করেছেন। ফলে গত সাড়ে তিন বছরে রাজ্যে কট্টর মৌলবাদী একাংশ সরকার এবং শাসক দলের উপর প্রভাব বিস্তার করেছে। যা আসলে পশ্চিমবঙ্গের ঐতিহ্যের পক্ষে ঘোর লজ্জার। তবু তাই হয়েছে।

দুই সাম্প্রদায়িক শক্তিই এই সময়ে পশ্চিমবঙ্গে বেড়েছে। বেড়েছে সরকারের ব্যর্থতা, আর্থিক মন্দাকে ভিত্তি করে। এমন পরিস্থিতিতে সামনে বিধানসভা নির্বাচন। কাজের লক্ষ্যে পরিচালিত আন্দোলন অনুঘটক হতে চলেছে সেখানে। ভাতের দাবিতে গর্জে ওঠা লড়াই হয়ে উঠতে চলেছে নিয়ন্ত্রক। আর ঠিক এখনই, মাংসের কাজিয়া, দেশপ্রেমের প্রচার জরুরি মমতা ব্যানার্জিরও। বিজেপি, আরএসএস সেই কাজই করছে।

তাই নীরবতা মুখ্যমন্ত্রীর। কোনও সন্দেহ নেই।

Religious Fundamentalism & Fight Of The Left

October 30, 2015

ধর্মীয় মৌলবাদ ও বামপন্থীদের লড়াই

কৃষ্ণেন্দু রায়চৌধুরি

মরশুম উৎসবের, কিন্তু বেনজির ন্যক্কারজনক আক্রমণ তাল কেটেছে উৎসবমুখী মানুষের মেজাজে। সাম্প্রদায়িক শক্তির মাত্রাতিরিক্ত তৎপরতা এবং একই সঙ্গে ভারতীয় জনতা পার্টির নেতৃত্বাধীন দেশের সরকার। রাষ্ট্রের প্ররোচনা, উদাসীনতায় যে ন্যক্কারজনক ঘটনাগুলি দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ঘটে চলেছে অবিরত, তাতে ধ্বংস হচ্ছে দেশের ধর্মনিরপেক্ষ কাঠামো। গোবিন্দ পানসারে, নরেন্দ্র দাভোলকর, এম এম কালুবর্গীকে হত্যা, দাদরিতে প্ররোচনা ছড়িয়ে নৃশংসভাবে খুন, এমনকি শিল্প সংস্কৃতি জগৎও এই সাম্প্রদায়িক মেরুকরণধর্মী আক্রমণের হাত থেকে রেহাই পাচ্ছে না। পাকিস্তানের প্রাক্তন বিদেশ সচিবের বই প্রকাশ অনুষ্ঠান, জম্মু-কাশ্মীরের বিধায়কের প্রেস কনফারেন্স কিংবা ভারত-পাকিস্তান ক্রিকেট সিরিজ উপলক্ষে দু’দেশের বোর্ডের সভা আক্রান্ত ধর্মীয় মৌলবাদীদের দ্বারা।

দেশের গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা ও শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষার স্বার্থে সব ধরনের মৌলবাদী কার্যকলাপ বন্ধ করতে ও দে‍‌শের মানুষের ঐক্য, সংহতি ও সম্প্রীতির মেলবন্ধনকে দৃঢ় করার জন্য সমাজের সব অংশের মানুষের ঐক্যবদ্ধ প্রয়াস নেওয়া বর্তমান সময়ে সবচেয়ে জরুরি হয়ে পড়েছে। দেশের অগণিত মানুষ, যারা শান্তি চান, ধর্মনিরপেক্ষতার ঐতিহ্যকে অটুট রাখতে চান — মানুষের সেই ঐক্যবদ্ধ শক্তির প্রতিবাদে প্রতিরোধে গর্জে ওঠার সময় এখন। রাজ্যের বিশিষ্ট কবি, সাহিত্যিক, শিল্পীরা রাষ্ট্রপতিকে চিঠি পাঠিয়ে বলেছেন, ‘সাম্প্রতিককালে আমাদের দেশে হত্যা ও অসহিষ্ণুতার যে আবহ তৈরি হয়ে উঠেছে, তা নিয়ে আমরা পশ্চিমবঙ্গের শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষেরা সন্ত্রস্ত এবং অসহায় বোধ করছি। ক্রমাগত অবাধে আঘাত হানা হচ্ছে আমাদের মতপ্রকাশের স্বাধীনতার উপর। দেশের বিশিষ্ট নাগরিক, নিরপরাধ সাধারণ নাগরিকের হত্যায় শুভবুদ্ধিসম্পন্ন নাগরিক সমাজ স্তব্ধবাক। সরকারি নিষ্ক্রিয়তা ক্ষমার অযোগ্য

প্রশাসনিক অকর্মণ্যতা নাগরিকের মানবিক অধিকার খণ্ডিত করছে। স্বাধীন চিন্তার শ্বাসরোধের এই সুপরিকল্পিত ষড়যন্ত্রে ভারতীয় গণতন্ত্র বিপন্ন হয়ে পড়ছে। দেশের ‘লৌহপুরুষ’ প্রধানমন্ত্রীর মুখে কোন কথা নেই। দাদরি হত্যাকাণ্ড, যুক্তিবাদী লেখকদের উপর আক্রমণ, দেশের নানা প্রান্তে খোলাখুলি সাম্প্রদায়িক প্ররোচনার বিরুদ্ধে প্রতিনিয়ত প্রতিবাদ জোরালো হচ্ছে। দেশের বিশিষ্ট লেখক, বুদ্ধিজীবীরা সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার পুরস্কার ঘৃণাভরে ফিরিয়ে দিচ্ছেন। প্রধানমন্ত্রী দোষ চাপিয়ে দিচ্ছেন বিরোধীদের উপর– এটা আমাদের সর্বভারতীয় রাজনৈতিক সংস্কৃতির এক প্রহেলিকাদগ্ধ দিক ছাড়া আর কিছু নয়। আর এটাই এখনকার ভারতবর্ষের সবচেয়ে প্রকটিত সমাজনৈতিক-রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক দৈত্যদর্পী সমস্যা : ধর্মনিরপেক্ষতার সংকট– মানবিক ধর্মসত্তার বিপর্যয়। Ralph Fox যাকে বলেছেন: ‘Anarchy of capitalism in the human spirit’ — তৃণমূলে বুর্জোয়া সংস্কৃতির অরাজকতা কিংবা ‘Cultural terrorism of the ruling class’।

আমরা অধিকাংশই কম-বেশি Sick Society-র Sick product হয়ে পড়েছি। এর ফলে ভারতবর্ষের সমাজ-সভ্যতার অনুপম মুখশ্রী সাম্প্রদায়িক সমস্যার বিষগর্তে পাক খেতে খেতে রক্তাক্ত-ক্লিন্ন-ক্লেদাক্ত হয়ে যাচ্ছে। সাম্রাজ্যবাদের তীব্র কশাঘাতে রাষ্ট্র ও শাসকশ্রেণি Humanity বা মানবিকতা ভুলে সাম্রাজ্যবাদের ক্রীড়নকে পরিণত হয়েছেপ্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তা ও প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ মদতে ধর্মীয় মৌলবাদ ও গৈরিক ফ্যাসিবাদ উৎসাহিত হচ্ছে। Marx-Engels এর মতে, ‘…In reality and for the practical materialist, i.e, the communist, it is a question of revolutionizing the existing world, of practically attacking and changing existing things’.

(২)

সাম্প্রতিককালে আমাদের দেশের বর্তমান সামাজিক-অর্থনৈতিক কাঠামো থেকে উদ্ভূত অনেকগুলি চরম প্রতিক্রিয়াশীল বৈশিষ্ট্য বিশেষ জোরদার হয়ে উঠেছে। যেমন সাম্প্রদায়িকতা ও উগ্র জাতীয়তাবাদ, ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের প্রতি সযত্ন লালিত ঘৃণা, উচ্চবর্ণভিত্তিক পুরুষ আধিপত্যের মানসিকতা, সমাজের সাধারণভাবে দুর্বলতর অংশগুলির উপর এবং বিশেষভাবে গণতান্ত্রিক অধিকারের উপর ক্রমবর্ধমান আক্রমণ, যুদ্ধোন্মাদনা ও রাজনীতির সামরিকীকরণ, দুর্নীতি ও রাজনীতির দুর্বৃত্তায়ন, মুখে স্বাদেশিকতার বুলি আউড়ে কার্যত সাম্রাজ্যবাদ নিয়ন্ত্রিত অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের বাস্তবায়ন, ইত্যাদি।

এই প্রায় সবগুলি প্রতিক্রিয়াশীল বৈশিষ্ট্যের সমাহার হিসেবে যে পতাকাটি আজ আমাদের দেশে আন্দোলিত হচ্ছে তার রঙ ‘গৈরিক’। হিন্দুত্বের জয়ধ্বনি তুলে এই পতাকাটির দণ্ড ধারণ করে আছে রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সংঘ (RSS) ও তার শাখা সংগঠনগুলি। হিন্দুত্বের এই যন্ত্রটি ‘৪৭-পরবর্তী’ ভারতে আগে কোনদিন আজকের মতো প্রাসঙ্গিক ও ভয়াবহ তাৎপর্যসম্পন্ন হয়ে উঠতে পারেনি।

১৯৯২-এর ৬ই ডিসেম্বর বাবরি মসজিদ ধ্বংসের ঘটনা হিন্দুত্বের এই আগ্রাসী অভিযানের প্রথম পর্বের বিজয় সূচিত করেছিল। কেননা, ওই ধ্বংসকাণ্ডটি কতিপয় দুবৃর্ত্তের দুষ্কর্মমাত্র ছিল না, বরং তার পেছনে ছিল সেই হিন্দুত্বের রাজনীতির দীর্ঘ ইতিহাস, যার প্রতিটি অধ্যায়ে খোদিত ছিল আগ্রাসী সংকীর্ণতা ও সাম্প্রদায়িকতা, বহুত্ববাদী ভারতীয় সভ্যতা ও সংস্কৃতির অস্বীকৃতি, অন্য সম্প্রদায়ের, এমনকি ব্যাপক হিন্দু সম্প্রদায়ের ‘দলিত’ অংশের প্রতি ঘৃণা ও হিংসা এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের ঐতিহ্য ও আচার আচরণের প্রতি তীব্র অনীহা।

রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সংঘ ও তার প্রবক্তাদের প্রকৃতপক্ষে দুটি রূপ — একটি প্রকৃত মুখ, আরেকটি মুখোশ। তারা কথা বলে সম্পূর্ণ দুই পৃথক ভাষায়, কাজ করে দুই বিপরীত পদ্ধতিতে। সেই ভাষা গণতন্ত্রের, কর্মপদ্ধতি স্বৈরতন্ত্রের। একদিকে ঐকমত্যের, অন্যদিকে বলপ্রয়োগের। হিন্দুত্বের রাজনীতির ধারক ও বাহক এই সংঘ পরিবারের মূল কেন্দ্রে রয়েছে RSS ও তার রাজনৈতিক সংগঠন ভারতীয় জনতা পার্টি (BJP)। অন্যদিকে RSS নিজে এবং বিশ্ব হিন্দু পরিষদ, বজরং দল প্রভৃতি জানা-অজানা অসংখ্য অঙ্গপ্রত্যঙ্গ এই কাঠামোটিকেই যেনতেন প্রকারেণ ধ্বংস করতে চায়।

সংঘ পরিবারের এই একইসঙ্গে পরিপূরক ও পরস্পরবিরোধী বিভিন্ন অঙ্গের জটিল টানাপোড়েনের স্বাভাবিক পরিণতি ছিল বাবরি মসজিদ ধ্বংসের ঘটনা। একইসঙ্গে তা উদ্‌ঘাটিত করে দিয়েছিল বি জে পি-র সযত্ন-সৃষ্ট তথাকথিত গণতান্ত্রিক বাতাবরণের অন্তঃসারশূন্যতার এবং তার অন্তরালবর্তী চরম হিংস্রতার প্রকৃত স্বরূপ। হিন্দুত্বের এই হিংস্র অভিযানের অন্তর্নিহিত দর্শনের প্রণেতা ও ভাষ্যকার স্বাভাবিকভাবেই তার মস্তিষ্ক অর্থাৎ RSS। অবশ্যই তাদের দাবি- আর এস এস রাজনৈতিক নয়, বরং একটি সাংস্কৃতিক সংগঠন। হিন্দুদের সংস্কৃতির সংস্কারের মাধ্যমে নিজের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সম্পর্কে সচেতন হিন্দু-আত্মপরিচয়ের জন্ম দেওয়াই তাদের লক্ষ্য।

এই তথাকথিত সাংস্কৃতিক কর্মসূচি আসলে গভীরভাবে রাজনৈতিক। এই কর্মসূচির অন্তর্নিহিত আগ্রাসী ও প্রাতিষ্ঠানিকতামুখী হিন্দুত্বের রাজনীতির করাল ছায়া সমাজের প্রতিটি ক্ষেত্রে আজ প্রসারিত। সাঁড়াশির মতো তা আষ্টেপৃষ্টে বেঁধে ফেলেছে আমাদের সমাজ ও রাজনীতিকে। আমাদের বাস্তব জীবনকে, আমাদের অস্তিত্বকে, সংস্কৃতি, শিক্ষা, সংবাদমাধ্যম, আমলাতন্ত্র, পুলিশ, সামরিক বাহিনী প্রভৃতি রাষ্ট্রীয় ও রাষ্ট্র-বহির্ভূত সমাজের প্রতিটি স্তরে ঘটছে তার অনুপ্রবেশ। চলছে তার সার্বিক আধিপত্য বিস্তারের প্রচেষ্টা।

প্রথমে তেরোদিন, তারপর তেরো মাস, পাঁচ বছর হয়ে এবার একক ক্ষমতায় পরবর্তী পাঁচ বছর রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখলের সুযোগ তার এই করাল বন্ধনকে আরো বেশি আগ্রাসী ও ভয়াবহ করে তুলেছে। সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতিটি গণতান্ত্রিক ঐতিহ্যের ও মূল্যবোধে এবং সরকারি, বেসরকারি সংগঠনে তার প্রভাব ধরা পড়েছে। হিন্দুত্বের মন্ত্র আওড়ানো এই ধর্মীয় ফ্যাসিবাদের আগ্রাসী অভিযান অবাধে চলতে থাকলে তার সম্ভাব্য পরিণতি কী বীভৎস ও ভয়ঙ্কর হতে পারে সেকথা চিন্তা করে ন্যূনতম গণতান্ত্রিক চেতনাসম্পন্ন যে-কোনো মানুষই শিউরে উঠছেন। শহীদ বিরসার হাত ধরে যে শতাব্দীর সূচনা, যে শতক দেখেছে অগ্নিযুগের আত্মদান, ভারত-ছাড়ো আন্দোলন আর নৌ-বিদ্রোহ, সাক্ষী থেকেছে শোলাপুর-তেভাগা-তেলেঙ্গানা-সাঁওতাল এবং আরও কত মহান গণজাগরণের। তার অন্তিমে আজ ভারতভাগ্যবিধাতার আসনে অধিষ্ঠিত গেরুয়াধারী বকধার্মিকরা।

ভারতীয় রাষ্ট্রক্ষমতায় ফ্যাসিবাদ এখনো জাঁকিয়ে বসতে পারেনি — বি জে পি-কে এখন গৈরিক রঙ-এর পেছনে ফ্যাসিবাদ প্রতিষ্ঠার প্রস্তুতি চালাতে হচ্ছে। যে দেশে পুঁজিবাদ দূরের কথা, সামন্ততন্ত্রও ইউরোপীয় ধরনে ও মাত্রায় বিকশিত হয়নি, সেখানে ফ্যাসিবাদের শ্রেণী-ভিত অতী‍‌তের ইতালি বা জার্মানির মতো হতে পারে। বি জে পি কেন্দ্রীয় ক্ষমতার সুবাদে হাতে নিয়েছে মৌলিক কিছু কাজ। যেমন, ফ্যাসিস্ত দৃষ্টিকোণ থেকে রাষ্ট্রের ইতিহাস পালটে লেখা, সংবিধান সংশোধন, শিক্ষা-সংস্কৃতির গৈরিকীকরণ ও হিন্দু মৌলবাদের পৃষ্ঠপোষকতা। দেশে এখন একটা কথা প্রায়ই শুনতে পাওয়া যায়, কথাটা হলো ধর্মীয় ফ্যাসিবাদ। দেশের জাতীয় গণতান্ত্রিক মোর্চার যে সরকার, সেই সরকারের প্রধান শরিক হলো ভারতীয় জনতা পার্টি। বর্তমান যিনি দেশের প্রধানমন্ত্রী তিনি এই দলের প্রধান নেতা। প্রসঙ্গটা হলো বি জে পি ধর্মের নামে, গেরুয়া রঙের আড়ালে ফ্যাসিবাদ কায়েম করার চেষ্টা করছে। বি জে পি-র অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক অ্যাজেন্ডা ‘হিন্দুত্ববাদ’কে বাস্তবায়িত করা।

(৩)

নরেন্দ্র মোদীর শাসনের এক বছর পর এটা বুঝতে কষ্ট হবার কথা নয় যে ধর্মীয় মৌলবাদ, গৈরিক ফ্যাসিবাদ দি‍য়ে বলীয়ান হয়ে তাঁরা চান দেশের মানুষের উপর সীমাহীন শোষণ নামিয়ে এনে ধনীদের আরও ধনী করতে, পুঁ‍‌জির মালিকদের বাড়তি সুবিধা পাইয়ে দিতে, সর্বোপরি আমেরিকান সাম্রাজ্যবাদ নির্দেশিত নয়া উদারনীতির রথযাত্রার পথ মসৃণ করতে। সহজ করে বলা যায়– আমাদের দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠের মৌলবাদের মূল ধারা হলো ধর্ম নিয়ে ধুয়ো তুলে নিজেদের শাসন ক্ষমতার পথ সুগম করা ও তার মাধ্যমে এদেশকে আন্তর্জাতিক পুঁজির লুটের ক্ষেত্র করে তোলার পথ আরও প্রশস্ত করা। এর জন্য সংখ্যালঘু-জুজু তৈরি করে ক্ষমতা দখল এবং এদেশকে আন্তর্জাতিক পুঁজির মৃগয়াক্ষেত্র বানানো। এর জন্য প্রয়োজন ইতিহাস-বিকৃতি, প্রগতিশীল লেখক, দরিদ্র মানুষ, নিরপরাধ শিশু এমনকি মুসলিম বুদ্ধিজীবী বিধায়কদের আক্রমণ, হত্যা। এদের আসল শত্রু হলো- শ্রেণী রাজনীতি, বামপন্থা, মার্কসবাদ

নয়া উদারবাদের বিরুদ্ধে বামপন্থীদের নেতৃত্বে মেহনতি মানুষ বিক্ষোভরত। ধর্মের নামে তাদের ভাগ করে এই আন্দোলনকে দুর্বল করার চেষ্টা চলছে। বামপন্থীরা মেহনতি মানুষকে জোটবদ্ধ করে। বামপন্থা হলো ইতিহাসকে বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখার একটা জোরালো মতাদর্শ। সেই মতাদর্শ সমাজে প্রোথিত করতে পারলে সমাজে মৌলবাদীরা দুর্বল হয়ে পড়বে। তাই মেহনতি মানুষের সংগ্রাম বন্ধ করতে, বামপন্থী গণ-আন্দোলনকে স্তব্ধ করতে চারদিক থেকে আক্রমণ চলছে। ভারতের রাজনীতিতে ধর্মীয় মৌলবাদ হলো একটি রাজনৈতিক তাস। বি জে পি-র পক্ষে হিন্দু মৌলবাদী তাস ছাড়া অন্য কোন তাস খেলা সম্ভব নয়।

নীতিগতভাবে ধর্মনিরপেক্ষ হতে পারে একমাত্র শ্রমজীবী শ্রেণী, কেননা শ্রেণীর স্বার্থ রক্ষা করার উপায়ই হলো ধর্মনিরপেক্ষ হওয়া। শ্রমজীবী শ্রেণীর দল সেই অর্থে ধর্মনিরপেক্ষ। মৌলবাদ, গৈরিক ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে আন্দোলন সংহত করতে হলে বুর্জোয়া শ্রেণী ও তার দলের বিরুদ্ধে সংগ্রামে নামতে হবে এবং সেটা কেবলমাত্র শ্রমজীবী শ্রেণীর দলগুলির পক্ষেই সম্ভব। শ্রমজীবী মানুষের লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে সামনে উঠে আসবে যেসব গণতান্ত্রিক ও দেশপ্রেমিক শক্তি, তারা হাত মেলাবে বামপন্থীদের সঙ্গে। তাদের নিয়ে একেবারে নিম্নস্তর থেকে গড়ে উঠবে মৌলবাদ-ফ্যাসিবিরোধী মঞ্চ।

সাম্প্রদায়িকতা, উদারীকরণ, বেসরকারিকরণ-সহ বি জে পি সরকারের জনবিরোধী নীতিগুলির বিরুদ্ধে দ্বিধাহীন নিরবচ্ছিন্ন লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে বামপন্থীরা। জনগণের জীবন-জীবিকার সংগ্রাম, গণতন্ত্রের জন্য সংগ্রাম, সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী সংগ্রাম, দেশের মর্যাদা ও সার্বভৌমত্ব অক্ষুণ্ণ রাখার সংগ্রাম অব্যাহত গতিতে আরও প্রসারিত, আরও শক্তিশালী করে তোলাই বর্তমান সময়ে বামপন্থীদের মূল কর্তব্য। নরেন্দ্র মোদী সরকারের জনবিরোধী-দেশবিরোধী কাজের বিরোধিতাই শুধু নয়, সমগ্রভাবে শাসকশ্রেণির ও সাম্রাজ্যবাদী শক্তির প্রতিস্পর্ধী হোক বামপন্থা।

Dadri Lynching: A Challenge To Cultural Diversity

October 18, 2015

দাদরি : বহুত্ববাদের সামনে চ্যালেঞ্জ

মইনুল হাসান

দাদরির ঘটনা দেশবাসীর জানা হয়ে গেছে। দাদরি পরবর্তী সময়টুকু আমাদের আলোচনার জন্য বরাদ্দ করেছি। তবে একবারও ভুলে যায়নি আখলাকের বাড়ির বারান্দায় যখন তার নিথর দেহটি পড়েছিল তখন তার কিশোরী কন্যা সাজিদা কি বলেছিল। ‘‘মাত্র কয়েকদিন আগে ঈদ হলো। বাড়িতে বিরিয়ানি হয়েছিল অনেক। খুশবু বের হচ্ছিল দারুণ। পাড়াপ্রতিবেশী বন্ধুরা খেয়ে গেল প্রতিবারের মতো। তাদের মধ্যে বেশিরভাগই অমুসলমান। ৪ দিন বাদে তাদেরই কেউ কেউ আমাদের বাড়ি চড়াও হয়ে বাবাকে মিথ্যা কারণে খুন করলো। আমি নিশ্চিত, তাদের অনেকের হাত থেকে তখনও ঈদের দিনের বিরিয়ানির খুশবু শুকিয়ে যায়নি।’’ এই কথার কোনো উত্তর ভূ-ভারতে কারও কাছে আছে? বাচ্চা মেয়েটি ঠিকই তো বলেছে, মাংসটা গবেষণাগারে নিয়ে গেছে কিসের মাংস জানার জন্য। কি লাভ! আখলাক কি ফিরে আসবে? গবেষণাগার অবশ্য আখলাকের দাবি-র সপক্ষে প্রমাণ দিয়েছে।

(২)

দেশের ঐক্য, সহনশীলতা, গণতন্ত্র এবং ধর্মনিরপেক্ষতার সামনে এটা একটি নেতিবাচক ঘটনা তাতে কারো সংশয় থাকার কথা নয়। কিন্তু পরবর্তী সময়কালে সরকারের নেতা, মন্ত্রী, সাংসদ বা বিধায়করা যা করে চলেছেন তাতে আতঙ্কিত হবার যথেষ্ট কারণ আছে। বিশিষ্ট মন্ত্রী অরুণ জেটলি বললেন, ‘আখলাকের হত্যার মতো ঘটনায় ভারতের নাম ডুবছে এবং বদনাম হচ্ছে। এমন হওয়া উচিত নয়’। এমনভাবে কথাটি বলা হলো যে, ভারতের নাম ডুবে যাওয়া ছাড়া একজন নিরপরাধ বয়স্ক মানুষকে পিটিয়ে মেরে ফেলার ব্যাপারটিতে আর কোনো চিন্তার বিষয় নেই। সাংসদ তরুণ বিজয় যা বলেছেন তাতে আমি স্তম্ভিত। আমার দৃঢ় বিশ্বাস অনেকেরই আমার মতো অবস্থা হয়েছে। তিনি বলেন, ‘কোনো প্রমাণ ছাড়া কেবলমাত্র সন্দেহ করে এমন ঘটনা নিতান্তই দুর্ভাগ্যজনক’। তাহলে যুক্তি এটাই যে, প্রমাণ থাকলেই এমনভাবে পিটিয়ে মেরে ফেলতে কোনো অসুবিধা নেই।

এলাকার সাংসদ এবং দেশের সংস্কৃতি মন্ত্রী প্রথম থেকেই বিষয়টিকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা, ভুল বোঝাবুঝি’র ফল ইত্যাদি বলে কাটিয়ে দিতে চেয়েছেন। সর্বশেষ বলেছেন যদি আখলাকের বাড়িতে হামলা হয় তাহলে তার কিশোরী কন্যা অক্ষত থাকলো কি করে? মন্ত্রী মহোদয়ের অনুশোচনা এটাই যে পূর্বপরিকল্পনা থাকা সত্ত্বেও কন্যাটিকে জল্লাদরা অক্ষত রাখলো কেন? আর আখলাকের মৃত্যুটি মায়া ছাড়া কিছুই নয়। আসলে দি‍ল্লির সরকারি মহলে তড়িঘড়ি পড়ে গেছে কে সবচাইতে আগে এবং সবচাইতে ঘৃণ্য ভাষায় এবং কাজে দেশের সহনশীলতা ও ধৈর্যের উপর আঘাত করতে পারে। এমন অশ্লীল পরিস্থিতি ভারতবর্ষ আগে কোনোদিন দেখেনি।

এরপর মারাত্মক ঘটনা ঘটেছে জম্মু ও কাশ্মীর বিধানসভায়। লানগেট থেকে নির্বাচিত একজন বিধায়ক ইঞ্জিনিয়ার শেখ রশিদ বিধায়ক আবাসের লনে ‘বিফ ফেস্ট’-এর আয়োজন করেন। সবাই জানেন গোরুর মাংস নিষিদ্ধ করার বিষয়টি এই রাজ্যে সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত গড়িয়েছে। উচ্চ আদালত সব দিক বিচার করে নিষিদ্ধ করার যে নির্দেশ নিম্ন আদালত দিয়েছিল তাকে ২ মাসের জন্য স্থগিত করে দিয়েছে। শেখ রশিদের আমন্ত্রণে অনেকেই এসেছিলেন সেই উৎসবে। পরের দিন তিনি যখন বিধানসভা কক্ষে ঢুকছেন তখন বি জে পি বিধায়করা তার উপর চড়াও হয় এবং নির্মমভাবে মারধর শুরু করে। বিধানসভার রক্ষী বাহিনী না থাকলে দেশ আর একজন ‘আখলাক’ সেদিনই পেয়ে যেত।

বি জে পি’র টি‍‌কিটে অনেকেই সাংসদ হয়েছেন যারা যোগী অথবা সাধু। সাধারণত অহিংসা তাদের অন্যতম অস্ত্র। হঠাৎ তারা এমন হিংস্র হয়ে উঠেছেন যা কল্পনারহিত। সাক্ষী মহারাজ বলছেন, ‘গো-মাতা রক্ষার জন্য তিনি খুন করবেন, অথবা খুন হবেন।’ যোগী আদিত্যনাথের তো কথাই নেই। এমন অশ্লীল ভাষা যোগীজী(!) ব্যবহার করেন যা লেখা যায় না। শোনার আগেই কানে আঙুল দিতে হয়।

(৩)

এতসব ঘটনার মধ্যে একটি রুপালি রেখা দেখা গেছে ১নং রাইসিনা হিলে। ছোট্ট একটি অনুষ্ঠান। রাষ্ট্রপতি’র উপরেই লেখা বই প্রকাশের অনুষ্ঠান। সেখানেই রাষ্ট্রপতি বললেন, বহুত্ববাদ এবং সহনশীলতা ভারত রাষ্ট্রের মর্মবস্তু। বললেন, দেশের সাংস্কৃতিক বহুত্ববাদকে রক্ষা করতে পারলেই দেশ এগিয়ে যাবে। জর্ডনের একটি সংবাদপত্রে সাক্ষাৎকার দিয়ে রাষ্ট্রপতি সাংস্কৃতিক বহুত্ববাদ রক্ষা করার কথা বলেছেন। এই হট্টমেলার ঋতুতে সেটা ভারতবাসীর কম পাওনা নয়। এরই সূত্র ধরে আমাদের আবার ফিরতে হবে কতকগুলো পুরানো কিন্তু সতত সজীব ‘ডিসকাসে’। একটি গণতান্ত্রিক দেশে ব্যক্তির অধিকার কি? আমি একজন সাধারণ ভারতবাসী। কারও প্রতি কোনোরকম হিংসা বিদ্বেষ না ঘটিয়ে নিজের ইচ্ছামতো বাস করতে পারবো কিনা? আমার নিজের মতো বাঁচার এবং চলবার অধিকার থাকবে কিনা? আখলাকের ঘটনাতে এই প্রশ্নগুলিই আবার বেশি বেশি করে সামনে এসে গেছে। ধর্মীয় বিশ্বাস অথবা ধর্মীয় আচরণের আগে বিবেচ্য হতে হবে ব্যক্তির গণতান্ত্রিক অধিকার। আমার রান্নাঘরে দারোগাগিরি করার অধিকার কারও নেই! এই মৌলিক কথাটিতে রাজ্য-কেন্দ্র অথবা যে কোনো রাজনৈতিক দল সকলকে নিশ্চয়তা দিতে হবে।

এই নিশ্চয়তা প্রথম দিতে হবে রাষ্ট্রের প্রধানকে। প্রধানমন্ত্রী। তিনি প্রথমে বিদেশ ভ্রমণে ব্যস্ত ছিলেন। সেখান থেকেই জল মাপতে শুরু করেছেন। কারণ বিহারে ভোট আছে। প্রধানমন্ত্রীর প্রতি মাসে পালা করে পুরানো আমন্ত্রণপত্র খুঁজে বিদেশ ভ্রমণের কর্মসূচি ঠিক করা এখন দিল্লির অলিন্দে হাসি-মশকরার ব্যাপার হয়েছে। তাতেও কোনো বিনিয়োগ নেই। সরকারি খরচে বিদেশে ‍‌হিন্দু মহাসভা বা আর এস এস-র সভা করছেন। দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয় নিয়ে অযৌক্তিকভাবে মুখ খুলছেন। আর নাটকীয় ভঙ্গিতে জানতে চাইছেন ‘বলুন, আমি সবার চাইতে বেশি কাজ করছি কিনা?’ সবাই হাততালি দিচ্ছে। এটাতেই প্রধানমন্ত্রীর আনন্দ। এসব না করে দেশে তার নন্দীভৃঙ্গীরা যে কাণ্ড করে বেড়াচ্ছে তা যদি সামলাতেন তাহলে আখলাক বেচারাকে বেঘোরে প্রাণ দিতে হতো না।

দেশের ধর্মনিরপেক্ষতা রক্ষা করার শপথ গ্রহণ করার পর মন্ত্রীরা কার্যভার নেন। কারও দ্বারা প্রভাবিত হয়ে দেশের মূল সূত্র বহুত্ববাদকে নষ্ট করবেন না – প্রতিশ্রুতি দেন। কিন্তু তাদের দ্বারাই দেশের এমনতর মূল্যবোধগুলি বেশিরভাগ ক্ষেত্রে আক্রান্ত হচ্ছে। সেটা জম্মু-কাশ্মীর প্রসঙ্গেই হোক, ধর্মান্তরকরণই হোক, গির্জার উপর আক্রমণই হোক। কেউই রাষ্ট্রের প্রধান দ্বারা নিরস্ত্র অথবা সমালোচিত হচ্ছেন না। সামগ্রিক সমস্যার মূল কেন্দ্রটি এখানেই নিমজ্জিত। দাদরির ঘটনাতে গোমাংস খাবার নৈতিকতা, প্রাচীন ভারতের ইতিহাস, কারা কারা এই মাংস খেতেন তারই পক্ষে বিপক্ষে তুমুল বিতর্কে অনেকেই লিপ্ত। সেটাই প্রধান আলোচ্য বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই কারণেই হয়তো ‘বিফ ফেস্ট’ আয়োজিত হচ্ছে, কলেজের মধ্যে গোমাংস ভক্ষণ করে কলেজ থেকে বহিষ্কৃত হচ্ছে। দু’দিন পরেই এই হুজুগ বন্ধ হয়ে যাবে। তখন আখলাকের নামটাও কেউ সহজে মনে আনতে পারবে না। বিষণ্ণতায় ডুবে যাবে তার সংসারটি। রেখে যাওয়া ৭০ বছরের মা প্রতিদিন সন্ধ্যায় মগরবের নমাজের শেষে ছেলের নামে দোয়া করতে গিয়ে ডুকরে কেঁদে উঠছে।

কিন্তু যে প্রশ্নগুলো আখলাকের মৃত্যু আমাদের সামনে এনে দিয়েছে তারই জন্য বিতর্ক জরুরি। সমাধানের দাবি আরও দৃঢ় করাটা যুক্তিসঙ্গত। এই নারকীয় ঘটনা যে আইন সমর্থন করে না সেটা জোরের সঙ্গে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। সমগ্র বিষয়টি আইনশৃঙ্খলার দিক দিয়ে কড়াভাবে দেখতে হবে। এই কাজে যুক্ত যারা তাদের কঠিন শাস্তিদান অত্যন্ত জরুরি। সবকিছু অপেক্ষা করতে পারে, কিন্তু হত্যাকারীদের গ্রেপ্তার করাটা বিলম্ব করা মানে দেশের আইনকে অবমাননা করা। এক্ষেত্রে ইতিমধ্যে প্রশাসন এবং বি জে পি যে ভূমিকা পালন করেছে সেটা ন্যক্কারজনক এবং হৃদয় কেঁপে ওঠার মতো। যাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে তারা বেশিরভাগই নাবালক। আর বি জে পি, যারা গ্রেপ্তার হয়েছে তাদের যে কোনো উপায়ে ছা‍‌ড়িয়ে আনার চেষ্টায় ব্রত। ভারতবর্ষ একটা গণতান্ত্রিক দেশ, বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশ। রাষ্ট্রপুঞ্জের নিরাপত্তা পরিষদে তার একটা স্থায়ী আসন থাকতে হবে, এ দাবি বহু দিনের এবং ন্যায্যদাবি। কিন্তু উলটোদিকের প্রশ্নটিকে ফেলে দেওয়া যাচ্ছে না। নিজের দেশের মাটিতে একটুখানি আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করবার ক্ষমতা কেন ভারতের নেই। দিনকে দিন ভারত যে এই অন্ধকার ও মূঢ়তার দিকে অগ্রসর হচ্ছে সেটাকে অস্বীকার করবে কি করে?

(৪)

এতগুলো কথা হয়তো বলার প্রয়োজন হতো না যদি দেশটা পঞ্চদশ শতাব্দীতে থাকতো। দেশটা একবিংশ শতাব্দীতে আছে আর বিশ্বজুড়ে প্রধানমন্ত্রী ‘ডিজিটাল ইন্ডিয়ার’ কড়া ভাষণ দিয়ে যাচ্ছেন তখন ‘পুতিগন্ধময়’ বিষয়গুলোতে নজর না দিয়ে উপায় নেই। কারণ, আর যাই হোক, যখন প্রচারের চকচকে রাংতাটি সরিয়ে ফেললে গো-ময় ভারত তার যাবতীয় দুর্গন্ধ নিয়ে হাজির হবে তখন ডিজিটাল ইন্ডিয়ার নাগাল পাওয়া মুশকিল বলেই আমার মনে হয়। যে আধুনিক ভারতের স্বপ্ন আমরা দেখি তার সঙ্গে বাস্তবের তফাৎটি বিশ্রী রকমের বিশাল তা মনে না রেখে উপায় নেই। কেবল মনে রাখছেন না প্রধানমন্ত্রী। আধুনিকতার নাম করে দেশের রন্ধ্রে রন্ধ্রে যে হিংসার বাস পাকাপাকিভাবে হতে যাচ্ছে, ক্লীবতার ঘরবাড়ি পোক্ত হয়ে উঠছে, প্রধানমন্ত্রী সেটা দেখেও দেখছেন না। অবলীলাক্রমে এসব কিছুকে নগ্নভাবে প্রশ্রয় দিয়ে যাচ্ছেন।

আমার এ বিশ্বাস ক্রমেই দৃঢ় হচ্ছে যে, ধর্মীয় বিদ্বেষ বলে আমাদের সকলের জানা যে ‘চেনা ছক’ আছে তার মধ্যে ঘটনাগুলি ফেলে দেওয়া যায় না। যদি ফেলে দেওয়া যেত তাহলে অনেকেই হিমেল বাতাসের পরশ গায়ে লাগিয়ে বেশ খানিকটা স্বস্তিবোধ করতে পারতেন সন্দেহ নেই। কিন্তু সেটা ঠিক নয়। সমগ্র ঘটনার পিছনে আছে একটি দানবীয় শক্তি যার নাম রাজনীতি। ক্ষমতার রাজনীতি। যা অত্যন্ত আধুনিক। এটি একটি ক্লেদাক্ত তত্ত্ব যা নিজেদের সাময়িক স্বার্থ মেটাবার জন্য ধর্মীয় বা যে কোনো সামাজিক কার্যক্রমকে ব্যবহার করতে ইতস্তত করে না। দাদরি ঘটনাতেও এই রাজনীতি কাজ করেছে। যেমন করেছিল মুজফ্‌ফরনগরের ঘটনায়।

সুতরাং এমনতর ঘটনাগুলিকে সামাজিক রোগ বলে সমগ্র দায়টি সমাজের কাঁধে ফেলে দিয়ে পথ খোঁজাটা নৈতিক দিক দিয়ে অন্যায় হবে। শুধু তাই নয়, নৈতিক অধিকারই নেই। আখলাক হত্যার মীমাংসা সেই কারণে প্রশাসনকে যেমন করতে হবে, রাজনীতিকদের নিজেদের দায়িত্ব নিতে হবে। প্রথম দায়িত্ব নিতে হবে প্রধানমন্ত্রীকে। কারণ তিনি রাষ্ট্রের প্রধান। তা ছাড়া যে সংগঠনের তিনি প্রচাক, তারই সভ্যরা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এমন জঘন্য কর্মে রত। ‘গুরুভাই’দের দায়িত্ব তিনি অস্বীকার করতে পারেন না। তাই সামাজিক রোগ বলে অন্তত তিনি এড়িয়ে যেতে পারবেন না। কিন্তু তাঁর সময় নেই। বেশিরভাগ সময় বাইরে। যতটুকু সময় দেশে থাকেন সেই সময় ঘনঘন পোশাক পরিচ্ছদ পালটাতে, ‘মন কী বাত’ বলতে আর ২/৪টে জনসভায় নাটকীয় ভাষণ দিতেই ফুরিয়ে যায়! প্রধানমন্ত্রীও অস্বীকার করতে পারেন না। আখলাক শহীদ হয়েছে। কিন্তু এই প্রশ্নগুলো রেখে গেছে, যার উত্তর প্রধানমন্ত্রীকেই দিতে হবে।

(৫)

ভারতের শাসন কেন্দ্রে বসে থাকা কেষ্টুবিষ্টুরা অনেকেই মনে করেন দেশের গণতন্ত্র, বহুত্ববাদ, সহনশীলতা, ধর্মনিরপেক্ষতা কেবল কথার কথা। এগুলোর নাকি বাস্তব জীবনে কোনো মূল্য নেই। আজকে তাদের কাছে সুবর্ণ সুযোগ এসেছে ভারতকে ‘হিন্দুরাষ্ট্রে’ পরিণত করার। ইতিহাসের শিক্ষা এবং তার ধারাবাহিকতা তাদের কাছে মূল্যহীন। প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকেই এব্যাপারে উৎসাহ পেয়ে যাচ্ছেন তারা। তা নইলে, দাদরির ঘটনাতে প্রধানমন্ত্রী ১৫ দিন পর মুখ খুললেও কড়া নিন্দা করতে পারেননি। দোষীরা শাস্তি পাবে এই সহজ সত্য কথাটি বলতে পারেননি। এমন কি রাষ্ট্রপতির কড়া প্রতিক্রিয়ার পরও তার হেলদোল নেই। বিহারের জনসভার ভাষণ তারই প্রমাণ। এব্যাপারে তিনি যা বলেছেন তাতে ধর্মীয় মেরুকরণ আরও স্পষ্ট হয়ে গেছে।

ভারত একটা নানা মত, নানা ধর্ম-বিশ্বাসের দেশ। সব মতের প্রাধান্য এবং মর্যাদা ব্যতিরেকে দেশ ঐক্যবদ্ধ থাকতে পারে না। বি জে পি বা আর এস এস-এর লোকরা গায়ের জোরে, লোকসভাতে সংখ্যা গরিষ্ঠতার জোরে সব কিছুকে পালটে দিতে চায়। ভারতের সংস্কৃতিকে হিন্দু সংস্কৃতি বলে চালাতে চায়, এই মিশ্র সংস্কৃতির দেশে সেটা করতে গেলে অনেক রক্ত যে ঝরাতে হবে এবং তা অসম্ভব  – এটা বোঝার মতো সাধারণ বুদ্ধির অভাব হয়েছে হিন্দুত্ববাদীদের।

সম্প্রতি আর একটি ঘটনা সারা দেশের মানুষের নজর কেড়েছে। এক সন্তান সম্ভাবনা মুসলমান মায়ের কথা। সেদিন রাত্রে হঠাৎই মায়ের তীব্র প্রসব যন্ত্রণা শুরু হয়েছে। স্বামীটি প্রথমে এটা ওটা করে, ওষুধ দিয়ে ব্যথা কমাবার চেষ্টা করেছে। হয়নি। ব্যথা আরও তীব্র। রাস্তায় নেমেছে তারা। একটু দূরে হাসপাতাল। গন্তব্য সেখানেই। কিন্তু কিছুদূর যাবার পর মা তখন চলৎশক্তিরহিত। বাধ্য হয়ে রাস্তার পাশে থাকা বিরাট গণেশ-মন্দিরের চাতালে শুইয়ে দিয়েছে মা-কে। তখন পুণ্যার্থীরা আসতে শুরু করেছে। বিশেষ করে মেয়েরা। স্বামীটি তো ভয়ে কাঁটা। কি জানি কি হবে! পুণ্যার্থী মেয়েরা কিন্তু বুঝে গিয়েছে কি হয়েছে এবং কি হতে যাচ্ছে। প্রধান পুরোহিত বাইরে এসে দেখেন এমন কাণ্ড। তিনি তাড়াতাড়ি পুজো দিতে আসা মায়েদের প্রয়োজনীয় নির্দেশ দিয়ে ভিতরে গেলেন। পুণ্যার্থী মায়েরা তাদের গায়ের ওড়না খুলে অস্থায়ী ‘লেবার রুম’ করে ফেললেন। তার মধ্যে নিয়ে গেলেন মা-কে। স্বামীটি অবাক হয়ে দেখছে। একটু পরেই সদ্যোজাত শিশুর কান্নার শব্দ পাওয়া গেল। পুণ্যার্থী মায়েদের হর্ষধ্বনি। মন্দিরের ঘণ্টা বেজে উঠেছে জোরে, আরও। মুসলমান মায়ের সন্তান জন্ম নিল গণেশ মন্দিরে। মন্দিরের বাইরের রাস্তায় পিতা তখন আজান দিচ্ছে সন্তানের জন্য। পরবর্তী ঘটনাটি আরও মজার। পুত্রসন্তান। মা আদর করে তার নাম রেখেছেন ‘গণেশ’

চিরদিন ভারত এই ঐতিহ্য ও সহনশীলতা বহন করে যাচ্ছে। আখলাক হত্যার মতো ঘটনার পরও তা অক্ষুণ্ণ থাকবে। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে – দেশের শাসকবর্গ নিজ রাজনৈতিক স্বার্থে সেটাকে নষ্ট করতে চাচ্ছে। মাত্র দেড় বছরের শাসনকালে এত দাঙ্গা হবে, এত রক্ত ঝরবে, এত হিংসা ছডিয়ে পড়বে, আগুন জ্বলবে কেউ ভা‍‌বেনি। সামাজিক ক্ষেত্রে এই বিশৃঙ্খলার জন্য দায়ী কেন্দ্রের সরকার। মানুষের কাছে তাদের জবাবদিহি করার সময় এসেছে।

আবার পুরানো কথাতেই ফিরে আসি। বহুত্ববাদ সারা পৃথিবীতে একটি প্রধান আলোচ্য বিষয়। মানুষ সেটাকেই জীবন চর্চার মাধ্যম হিসাবে গ্রহণ করেছে। ধর্ম যদি ক্রমাগত মানুষের পরিচয় নির্দিষ্ট করে দিতে থাকে বা দেওয়ানোর চেষ্টা হয় তাহলে যে কোনো সমাজের সুস্থিতি নষ্ট হয়ে যাবে। এই অবস্থা নিয়ে একটা সমাজ চলতে পারে না। আমাদের দেশের প্রধান শক্তি হচ্ছে দীর্ঘকাল থেকে ভারতের মাটিতে প্রোথিত এই সহনশীলতা আর ঐক্য। রবীন্দ্রনাথ বলেছেন – ‘বিবিধের মাঝে দেখ মিলন মহান…’। ঝড়-ঝাপ্টা এর উপর দিয়ে বয়ে গেলেও মূল সুরটি এখনও অক্ষত আছে।

সব মানুষের সক্রিয় উদ্যোগ ছাড়া বহুত্ববাদ কার্যকর হতে পারে না। সব অংশের মানুষকে, জাতি, ধর্ম, বর্ণ, রাজনীতি নির্বিশেষে রাস্তায় নেমে দেশের ঐক্য রক্ষার কাজে নিয়োজিত হতে হবে। ভারতের কাছে সেটাই হবে ইতিবাচক পদক্ষেপ।

In the Quaqgmire of Inane Politics

January 3, 2015

বাংলাদেশ : বড় দুই দল শোধরাবে কবে?

আবুল মোমেন

অঙ্গসংগঠনগুলোর মধ্যে ছাত্রলীগ সরকার ও আওয়ামী লীগের জন্য যে হারে বিব্রতকর পরিিস্থতি সৃষ্টি করেই চলেছে, তাতে দল ও সরকারে জ্যেষ্ঠ নেতৃবৃন্দের অসন্তোষ চাপা থাকছে না। খোদ প্রধানমন্ত্রীও শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়েছেন অপরাধীদের দল বিবেচনায় না নিয়ে ধরার নির্দেশ দিতে। তাতে সরকারের শুভানুধ্যায়ীরা আশ্বস্ত হয়েছিলেন, এবার বোধ হয় ক্ষমতার বেপরোয়া অপপ্রয়োগ ও অপরাধের মাত্রা কমে আসবে।

কিন্তু আশঙ্কা হচ্ছে অতিষ্ঠ প্রধানমন্ত্রীর উক্তির ঝাঁজ পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহে উবে গেছে কি না। প্রধান প্রতিপক্ষ বিএনপি এবারে কোমর বেঁধে নামতে চেয়েছিল আন্দোলনে। মূল লক্ষ্য ছিল গত বছরের ৫ জানুয়ারির প্রহসনের নির্বাচনের বর্ষপূর্তিকে কেন্দ্র করে গণ–আন্দোলন সৃষ্টি। তার মহড়া হিসেবে ২৭ ডিসেম্বর ঢাকার পার্শ্ববর্তী গাজীপুরে ডেকেছিল জনসভা। তাদের ইচ্ছা ছিল সারা দেশ থেকে কর্মী সমাবেশ করে শক্তি প্রদর্শন করা, তার মাধ্যমে সমর্থকদের চাঙা করা এবং সরকারকে আপোসের পথে আসার বারতা দেওয়া। তাদের পরিকল্পনা একা ছাত্রলীগই বানচাল করে দিয়েছে। কয়েকটি মোটরসাইকেল র‍্যালি, প্রতিপক্ষের মিছিলে একটি-দুটি হামলায় ওরা কার্যসিদ্ধি করেছে। মাঠ তথা রাজপথ থেকে বিএনপি ও ২০ দলের কর্মীদের বাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছে। এভাবে বলার অর্থ ছাত্রলীগের অপকর্মকে সমর্থন নয়। আমরা বিষয়ের আরেকটু গভীরে যাব।

বিএনপি আপাতত দুই কদম পিছিয়ে আসার কৌশল নিয়েছে এবং নেতৃবৃন্দ আত্মপক্ষ সমর্থন করে বলেছেন, বিএনপি কোনো সন্ত্রাসী দল নয়, নিয়মতান্ত্রিক গণতান্ত্রিক দল। ছাত্রলীগের লাঠিসোঁটা, পিস্তল-কাটা বন্দুকের বিরুদ্ধে ওরা সশস্ত্র লড়াই করবে না। এর ওপরে সরকারের হাতে আছে পুলিশ, র‍্যাব, বিজিবি, বিভিন্ন গোয়েন্দা বাহিনী, যারা নিজেরাও আক্রমণ চালায় এবং আক্রমণকারী ছাত্র-যুবলীগের গুন্ডাবাহিনীকে সহায়তা দেয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এ একেবারেই অসম রণাঙ্গন—বিএনপি ও তার সহযোগীদের জন্য।

২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির জবরদস্তি নির্বাচনের সময় বিএনপির নেতৃত্ব খুবই আশা করেছিল– যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্র পশ্চিমা দেশ, সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দেশ এবং চীন ও জাপানের মতো বাংলাদেশের উন্নয়নে এশীয় অংশীদারদের সমর্থন পাবে। এমন একটা একতরফা নির্বাচন তারা সমর্থন করবে না, জবরদস্তি নির্বাচন হয়ে গেলেও অন্তত পরবর্তীকালে নতুন সরকার আন্তর্জাতিক মহলের অনুমোদন পাবে না। সত্যিই এসব দেশ এ নির্বাচন, নির্বাচিত সরকারকে আন্তরিকভাবে সমর্থন জানাতে কুণ্ঠা বোধ করে। কিন্তু তারাও নিরুপায়। এ কেবল তাদের পুঁজি লগ্নির স্বার্থ বা কূটনৈতিক সীমাবদ্ধতার বিষয় নয়। তাদের জন্য বড় সমস্যা ছিল বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর গাঁটছড়া। দুর্ভাবনার কারণ বিএনপি-জামায়াতের বিগত শাসনামলে গড়ে ওঠা সন্ত্রাসী জঙ্গিগোষ্ঠীর তৎপরতা ও তাদের সঙ্গে সরকারি ব্যক্তিদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ।

দেখা যাচ্ছে জামায়াতের সঙ্গ ছাড়তে বিএনপি ভরসা পায় না, আন্দোলনের জন্য নিজেদের চেয়ে জামায়াতের কর্মীদের ওপর তাদের ভরসা বেশি, আর ভোটের ক্ষেত্রে জামায়াতের ৫-১০ শতাংশ ভোটারের সমর্থন অনেকগুলো আসনে ফলাফল প্রভাবিত করে থাকে। ফলে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারে জামায়াতের শীর্ষ নেতাদের অপরাধ আদালতে প্রমাণিত হওয়া সত্ত্বেও তাদের ও তাদের দলকে সমর্থন দিয়ে বিএনপি একটি গণতান্ত্রিক দল হিসেবে নিজেদের ভাবমূর্তিকে প্রশ্নবিদ্ধ করে রাখছে। দ্বিতীয়ত, ২০০১-২০০৬ আমলে সংঘটিত মারাত্মক সব জঙ্গি সন্ত্রাসের ঘটনার কোনো স্পষ্ট জবাব তারা দেয়নি, তাদের স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীসহ একাধিক মন্ত্রী, হাওয়া ভবন ও তারেক জিয়ার ভূমিকা নিয়ে যেসব প্রশ্ন উঠেছে, তারও সদুত্তর দলটি দিতে পারেনি। ফলে ধর্মান্ধতার পাশাপাশি জঙ্গিবাদের প্রশ্নেও দলের ভাবমূর্তি প্রশ্নবিদ্ধ থেকে যাচ্ছে।

এই অবস্থানে থেকে পশ্চিমা গণতান্ত্রিক বিশ্বের দৃঢ় সমর্থন আশা করা বৃথা, কারণ আজকের দিনে তাদের প্রধান প্রতিপক্ষ জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসবাদ, যার মূল প্রবক্তা, হোতা ও কুশীলব কট্টরপন্থী মুসলিম গোষ্ঠীগুলো থেকেই আসছে। ইতোমধ্যেই আন্তর্জাতিক মহলে যেসব সংগঠনকে সন্ত্রাসী দল হিসেবে কালো তালিকাভুক্ত করা হয়েছে তাদের সমর্থক, সদস্য, এমনকি সাংগঠনিক কিছু কাঠামোর অস্তিত্ব বাংলাদেশে পাওয়া গেছে। এসব সংগঠন ও ব্যক্তি এবং বাংলাদেশ সরকার যেসব সংগঠনকে সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের দায়ে নিষিদ্ধ করেছে সেগুলোর সঙ্গে জামায়াত বা বিএনপির কোনো কোনো নেতার সংশ্লিষ্টতা সন্দেহের ঊর্ধ্বে নয়। ফলে বর্তমান বাস্তবতায় বিএনপির পক্ষে গণতান্ত্রিক বিশ্বের দৃঢ় সমর্থন আশা করা উচিত হবে না।

সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের অনেক মুসলিম দেশের আদত সমর্থন তাদের পক্ষে থাকলেও এই দেশগুলো অর্থনৈতিক ও সামরিকভাবে প্রায় পশ্চিমের তাঁবেদার দেশ। তাদের বাইরে গিয়ে প্রকাশ্যে কোনো দলকে সমর্থন জানানো এদের পক্ষে সম্ভব নয়, বড়জোর গোপনে অর্থসাহায্য জোগাতে পারে। তাতে বিএনপির বিশেষ ফায়দা হবে না। আর জাপান পশ্চিমের অন্ধ অনুসারী দেশ, চীনের কাছে বর্তমানে নিজেদের অর্থনৈতিক স্বার্থই মুখ্য বিষয়। সেদিক থেকেও বিএনপি কার্যকর সমর্থন আশা করতে পারে না। এর বাইরে বাংলাদেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নের অংশীদার আন্তর্জাতিক সংস্থাসমূহ, যেমন বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক, ইউএনডিপি, ইইউ এবং দ্বিপক্ষীয় সংস্থাগুলোর মনোভাব ও অবস্থানও একই রকম থাকবে। নির্বাচন ও রাজনীতি নিয়ে আপত্তি ও সমালোচনা করলেও দেশ ও সরকারকে অনিশ্চয়তায় ফেলবে না তারা। কারণ তাতে তাদের স্বার্থ ক্ষুণ্ন হবে।

এ কথাও বলা দরকার, দেশের সিংহভাগ সচেতন ও বিবেকবান মানুষ আওয়ামী লীগ ও তার অঙ্গসংগঠনগুলোর নেতা-কর্মীদের ক্ষমতার দাপট ও অপব্যবহার, লুটপাট, খুনখারাবি, দখলবাজিতে অতিষ্ঠ, বিরক্ত এবং তার প্রতিকার চায়। অনেকের মনে এসব দেখেশুনে স্বাধীনতা-পরবর্তীকালের অরাজক অবস্থার স্মৃতি ফিরে আসছে। তার দায় তো সে সময়ের আওয়ামী লীগ এড়াতে পারেনি।

ঠিক আগের মতোই যেন আওয়ামী লীগের উচ্চাভিলাষী কর্মীরা বিরাজমান বাস্তবতায় তাদের জন্য যে সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে, তা লুফে নিতে উদ্গ্রীব। আর তাদের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে সমাজের সুযোগসন্ধানী নীতিহীন বেপরোয়া মানুষেরা। আইন বাঁচল কি না, গণতন্ত্র ক্ষুণ্ন হলো কি না, দলের ভাবমূর্তি নষ্ট হলো কি না ইত্যাদি ব্যক্তিস্বার্থের যূপকাষ্ঠে বলি দিতে তারা ব্যস্ত। এই আখের গোছানোর দলকে চুয়াত্তর-পঁচাত্তরে বঙ্গবন্ধু ‘চাটার দল’ বলে আক্ষেপ করেছিলেন, কিন্তু কিছুতেই তাদের নিরস্ত করতে পারেননি। এর ফলে তিন বছরের মাথায় সরকারের জনসমর্থন বেশ কমে গিয়েছিল। আর ঠিক তখনই প্রতিক্রিয়াশীলদের প্রত্যাঘাতটা এসেছিল। আমরা লক্ষ করছি, আওয়ামী লীগ বর্তমানে জনসমর্থনের ওপর ভরসা করতে পারছে না এবং পুলিশ, র‍্যাব, গোয়েন্দানির্ভরতা বেড়ে চলেছে এবং অবাধ নির্বাচনে বিজয়ের ব্যাপারে যথেষ্ট সংশয়ে ভুগছে তারা নিজেরাই

এই অবস্থায় দেশের মানুষ পড়েছে বিপাকে। জামায়াতকে সঙ্গে নিয়ে জঙ্গিদের প্রতি তাদের মনোভাব অস্পষ্ট রেখে বিএনপি এ দেশে ক্ষমতায় আসুক—এটা জনগোষ্ঠীর বড় অংশ চায় না এবং তারা এ ব্যাপারে নিষ্ক্রিয় থাকবে না, যুদ্ধাপরাধীর বিচার এবং জঙ্গিবাদ বিরোধিতায় তারা দীর্ঘদিন ধরেই মাঠপর্যায়ে সক্রিয় ছিল এবং এখনো আছে। এত দূর এগিয়ে তারা এখন পিছু হটতে রাজি নয়। আওয়ামী লীগের হঠকারিতা সত্ত্বেও গণজাগরণ মঞ্চের বারতা দেশের তরুণসমাজকেও এ পক্ষে শামিল করেছে। কিন্তু শুভবুদ্ধিসম্পন্ন এই জনগোষ্ঠী টেন্ডারবাজ, দখলদার, লুটেরা, খুনজখমে অভ্যস্ত হয়ে পড়া ছাত্রলীগ-যুবলীগের সেসব কর্মীর কর্মকাণ্ডের সমর্থক হতে পারে না। আওয়ামী লীগ নির্বিঘ্নে ক্ষমতায় টিকে থাকছে বস্তুত বিএনপির ভ্রান্ত রাজনীতির কারণে।

দেশকে শান্তিপূর্ণ সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নিতে হলে বিএনপিকে শোধরাতে হবে তার রাজনীতি, ছাড়তে হবে জামায়াত ও ধর্মান্ধ দলের সংস্পর্শ, স্পষ্ট করতে হবে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, অসাম্প্রদায়িকতা ও গণতন্ত্রের পক্ষে অবস্থান। একই কারণে আওয়ামী লীগকে শোধরাতে হবে তার কিছু নেতা ও অনেক কর্মীর ক্ষমতার অপব্যবহার, মারাত্মক অসহিষ্ণুতা, দখলদারের মানসিকতা, বেআইনি উচ্চাভিলাষ চরিতার্থ করার প্রবণতা।

দেশে রাজনৈতিক তৃতীয় শক্তির শূণ্যতার আকালে নাগরিক সমাজেরই বড় দুই দলকে সঠিক পথে রাখার কাজে অভিভাবকত্ব করার কথা। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয়, আমাদের নাগরিক সমাজের বিশিষ্টজনেরা ব্যক্তিগত লাভের মোহে পড়ে জনসমর্থনের বিচারে আকারে বড় কিন্তু মূল্যবোধের বিচারে ক্ষয়িষ্ণু দুটি দলের কাছে আত্মবিক্রয় করে বসে আছেন। বাংলাদেশের জন্য এটিই সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি।

2014 – A Retrospect

January 3, 2015

২০১৪ : বিভীষিকার এক বছর

হাসান ফেরদৌস

২০১৪ সাল শুরু হয়েছিল আইসিস নামক এক দানবের উত্থান-কাহিনি দিয়ে। বছর শেষ হলো তালেবান নামক আরেক দানবের হাতে ১৩২ শিশুর নৃশংস হত্যার ভেতর দিয়ে। মাঝখানের একটি বড় ঘটনা ছিল ইবোলা নামক এক ভয়াবহ সংক্রামক ব্যাধির আক্রমণ।

এ ছাড়া আরও দুটি ঘটনা সদ্য বিগত ২০১৪ সালে ঘটে, যা আমার চোখে ভীতির। এক. মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে রিপাবলিকান পার্টির কংগ্রেসের উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ অর্জন ও ভারতে নরেন্দ্র মোদির নিরঙ্কুশ সংখ্যাধিক্যে ক্ষমতা গ্রহণ। মন্দ খবরের তালিকায় কেউ কেউ হয়তো বিনা নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ক্ষমতা দখলকেও অন্তর্ভুক্ত করবেন, তবে সে ঘটনার তেমন কোনো আন্তর্জাতিক চরিত্র নেই। ফলে, আমার ২০১৪ সালের বৈশ্বিক পরিমণ্ডলের বিভীষিকার তালিকা থেকে সে অঘটন বাদ রাখছি।

আইসিস বা আইএস অর্থাৎ ইসলামিক স্টেটের উত্থান আকস্মিক, তবে একদম অপ্রত্যাশিত নয়। মধ্যপ্রাচ্যে আল-কায়েদা থেকে উদ্ভূত এই জিহাদি আন্দোলন বস্তুত ইরাকে মার্কিন আক্রমণ ও সিরিয়ায় হাফিজ আল-আসাদ সরকারের ব্যর্থতার গর্ভ থেকে জন্ম নিয়েছে। সাদ্দাম হোসেনের পতনের পর ইরাকে যে শিয়া সরকার ক্ষমতা গ্রহণ করে, তা সে দেশের সুন্নি সংখ্যালঘুদের ক্ষমতার কেন্দ্র থেকে উৎপাটিত করে কার্যত দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিকে পরিণত করে। অধিকারবঞ্চিত এই সুন্নিদের নিজের দলে টানতে জিহাদি নেতাদের তেমন বেগ পেতে হয়নি। নিজেদের অধিকারহীন ও ব্রাত্য বিবেচনা করে ইউরোপ, মধ্য ও দক্ষিণ এশিয়ার এমন তরুণেরাও ইসলামি বিপ্লবের ডাকে আইএস কাতারে শামিল হয়ে পড়ে। পর পর কয়েকটি নৃশংস হত্যাকাণ্ড ভিডিওতে ধারণের মাধ্যমে তা প্রচার করে আইএস হঠাৎ যেন সব তথ্যমাধ্যমের শিরোনাম হয়ে ওঠে।

মার্কিন প্রশাসন গোড়াতে আইসিসের প্রতি তেমন গুরুত্ব দেয়নি। প্রেসিডেন্ট ওবামা ঠাট্টা করে বলেছিলেন, বাস্কেটবল খেলোয়াড় কোবি ব্র্যায়ান্টের জার্সি গায়ে দিলেই তো আর কেউ ব্রায়ান্টের মতো দক্ষ খেলোয়াড়ে পরিণত হয় না। পরে তাঁকে নিজের থুতু নিজেকেই গিলতে হয়েছে। ২০১৪-এর অর্ধেকের বেশি সময় ইরাকের শিয়া নেতৃত্ব কোন্দলের কারণে নতুন সরকার গঠনে সক্ষম হয়নি। এর ফলে যে শূন্যতার সৃষ্টি হয়, আইএস তার সুযোগ গ্রহণ করে। পাশাপাশি সিরিয়ার অব্যাহত গৃহযুদ্ধে আসাদ বা তাঁর বিরোধী পক্ষ কেউই নিজেদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠায় সফল না হওয়ায় আইএসের পক্ষে পেছনের দরজা দিয়ে অনুপ্রবেশ সহজ হয়। অবশ্য বছরের শেষ নাগাদ যুক্তরাষ্ট্র পরিস্থিতি সামলে নিয়ে আইএসের বিরুদ্ধে জোর হামলা চালায়।

আইএস শুধু ইরাক বা সিরিয়ায় আসন গেড়ে সন্তুষ্ট ছিল না, সৌদি আরব ও উপসাগরীয় দেশসমূহে নিজেদের প্রভাব সম্প্রসারণে তাদের আগ্রহ এই দেশগুলোকে উদ্বিগ্ন করে। ফলে তারাও আইএস ঠেকাতে হাত লাগায়। বছরের শেষ তিন মাসে আইএসের আধিপত্য অনেকটা স্তিমিত হয়ে এসেছে, তবে তাকে উৎপাটন করা সম্ভব হয়নি। পূর্ব ও পশ্চিমের এই দড়ি টানাটানিতে একমাত্র লাভবান হয়েছেন সিরিয়ার হাফিজ আল–আসাদ। আমেরিকা তার নজর আসাদের ওপর থেকে সরিয়ে নিয়েছে। অন্যদিকে আইএস তাদের ‘কমন এনিমি’ এই যুক্তিতে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র তাদের গত ৩০ বছরের কাজিয়া আপাতত তোরঙ্গে তুলে রেখেছে। ইরানের জন্য সেটাও খুব মন্দ খবর নয়।

বছরের দ্বিতীয় বিপর্যয়, পাকিস্তানে তালেবানের হামলা, সে দেশের নিজের সৃষ্টি। ভারতের বিরুদ্ধে নিজস্ব ‘রিজার্ভ’ সৃষ্টির লক্ষ্যে সে দেশের গোয়েন্দা পুলিশের তত্ত্বাবধানে তালেবানের জন্ম। নিজের পোষা কালসাপ একসময় গৃহকর্তাকে ছোবল মারে। পাকিস্তানেও ঠিক সে ঘটনাই ঘটেছে। অনেকেই বলছেন, ১৬ ডিসেম্বর পেশোয়ারের বিদ্যালয়ে তালেবান হামলার যে প্রতিক্রিয়া হয়েছে, তাতে তালেবানের বিরুদ্ধে এক জাতীয় মতৈক্যের সম্ভাবনার জন্ম দিয়েছে। পাকিস্তানের সরকার, সেনাবাহিনী ও অধিকাংশ রাজনীতিক তালেবান ঠেকাতে এককাট্টা হয়েছেন।

অবশ্য এমন সম্ভাবনা পাকিস্তানে যে এই প্রথম সৃষ্টি হলো তা নয়। সে দেশে একদিকে সামরিক বাহিনী নিজেদের জায়গিরদারি টিকিয়ে রাখার জন্য তালেবান ও জিহাদি দলগুলোকে নিজেদের থাবার নিচে রাখতে চায়। অন্যদিকে, ইসলামি জোশের হুমকিতে ভীত রাজনৈতিক দলগুলো কে কার চেয়ে অধিক ধার্মিক, তা প্রমাণের প্রতিযোগিতায় লিপ্ত। ইমরান খানের মতো আপাত–আধুনিক রাজনীতিকও ক্ষমতা দখলের চেষ্টায় বিদেশ থেকে আমদানি করা জিহাদি নেতার জামার আস্তিন ধরে আছেন। ফলে, ১৬ ডিসেম্বরের মতো ট্র্যাজেডি সে দেশে আবারও যে ঘটবে না, সে কথা ভাবার কোনো কারণ আছে বলে আমার মনে হয় না।

ইবোলার দংশন আফ্রিকার ভেতর ও বাইরে ভীতির সৃষ্টি করেছে, এ কথা ঠিক। কিন্তু এই ভয়াবহ সংক্রামক ব্যাধির বিরুদ্ধে লড়াইতে যে আন্তর্জাতিক সংহতির প্রকাশ দেখা গেছে, তাতে অনেকেই আশান্বিত হয়েছেন। সিয়েরা লিওন বা লাইবেরিয়া দীর্ঘদিন গৃহযুদ্ধে পর্যুদস্ত, ক্লান্ত। ইবোলাকে পরাস্ত করার মতো লোকবল, অর্থবল কোনোটাই তাদের নেই। এই ব্যাধির মোকাবিলায় বিশ্বজুড়ে সাড়া মিলেছে। বিপদের আশঙ্কা আছে জেনেও ইউরোপ ও আমেরিকা থেকে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক স্বেচ্ছাসেবক ইবোলা-আক্রান্ত দেশগুলোতে পাড়ি দিয়েছেন।

ইবোলা ব্যাধির ঠিক পরপর নরেন্দ্র মোদির নাম উচ্চারণ সুবুদ্ধির পরিচায়ক না হতে পারে, কিন্তু আমার বিবেচনার এই হিন্দুত্ববাদী নেতার উত্থান কোনো অংশে কম ভীতিকর নয়। প্রযুক্তিগতভাবে আধুনিক ও অর্থনৈতিকভাবে উন্নত ভারত নির্মাণে মোদির অঙ্গীকার আশার কারণ। তাঁর এই ‘ভিশন’ সে দেশের মানুষকে বিজেপিমুখী করেছে। কিন্তু একই সঙ্গে মোদি নিজের হিন্দুত্ববাদী পরিচয় এগিয়ে ধরতে যে আগ্রহ দেখিয়েছেন, সে দেশের সংখ্যালঘুদের জন্য তা ভীতির কারণ। মোদি নিজের মুখে বলেননি, কিন্তু তাঁর দলের একাধিক নেতা এমন বিদ্বেষপূর্ণ প্রচার চালাতে পিছপা হননি যে ভারত শুধু হিন্দুদের দেশ। বিজেপি ও তার অঙ্গসংগঠনসমূহ মুসলমান, খ্রিষ্টান ও আদিবাসীদের নিজ নিজ ধর্ম বদলে হিন্দু ধর্মে রূপান্তরের যে আন্দোলন শুরু করেছে, বহু জাতি ও ধর্মভিত্তিক ভারতকে তা প্রগতির বদলে পশ্চাদ্মুখী করছে। এর প্রতিক্রিয়ায় শুধু ভারতে নয়, প্রতিবেশী বাংলাদেশ ও পাকিস্তানে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ছড়াতে পারে, জঙ্গিবাদ আরও মারমুখী হতে পারে।

আমার বিবেচনায় বিগত বছরের পঞ্চম দুর্বিপাক মার্কিন কংগ্রেসের উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ রিপাবলিকান পার্টির হাতে চলে যাওয়া। ২০১৪ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকান দলের বিজয় খুব অভাবিত কিছু ছিল না। ওবামা ২০০৮ ও ২০১২ সালে পর পর দুবার বিজয়ী হন এক বহুবর্ণের রংধনু ‘কোয়ালিশন’ নির্মাণ করে। এই কোয়ালিশনের অন্তর্গত ছিল ১৮ থেকে ৩০ বছর বয়সী নতুন ভোটার, কৃষ্ণাঙ্গ ও অন্যান্য সংখ্যালঘু ও দেশের নারী ভোটারদের বৃহদংশ। ডেমোক্রেটিক পার্টি এবার তাদের এই কোয়ালিশন ধরে রাখতে পারেনি। মধ্যবর্তী নির্বাচনে সব সময়ই ভোটার অংশগ্রহণ কম। এবার তা আরও কমেছে, কারণ এই কোয়ালিশন অনুপ্রাণিত হয়, এমন কিছুই এই দল করেনি।

উদাহরণ হিসেবে অভিবাসনের কথা ভাবা যাক। ওবামা ও ডেমোক্রেটিক পার্টি বরাবর বলে এসেছে, যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত সোয়া কোটি অবৈধ বহিরাগত ব্যক্তির নাগরিকত্বের পথ নিশ্চিত করতে তারা বদ্ধপরিকর। অথচ একটি স্বল্পমেয়াদি নির্বাহী ব্যবস্থা ছাড়া কোনো কিছুই তারা করেনি। ২০০৮ থেকে ২০১০ পর্যন্ত কংগ্রেসের উভয় কক্ষই ছিল ডেমোক্র্যাটদের দখলে। চাইলে অনায়াসেই তাঁরা সে সময় এই প্রশ্নে আইনগত ব্যবস্থা নিতে পারতেন। রিপাবলিকান সমর্থক, বিশেষত শ্বেতাঙ্গ নির্বাচকেরা ক্ষিপ্ত হবেন, এই আশঙ্কায় কোনো পদক্ষেপ গ্রহণে তাঁরা বিরত থাকেন। বিরক্ত ও আশাহত হিস্পানিকেরা, যারা ওবামার বিজয়ের পেছনে বড় শক্তি ছিল, ২০১৪ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে তারা ভোটকেন্দ্রেই আসেনি।

কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ রিপাবলিকানদের হাতে চলে যাওয়ার ফলে পরিবেশ, নাগরিক অধিকার, স্বাস্থ্যবিমা ইত্যাদি খাতে আমেরিকা যে অগ্রগতি অর্জন করেছে, তার অনেকটাই বিপদগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা আছে। ওবামা কিউবার সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনঃস্থাপন ও ইরানের সঙ্গে আণবিক শক্তি ব্যবহার প্রশ্নে শান্তিপূর্ণ সমাধানের উদ্যোগ নিয়েছেন, তাও হুমকির সম্মুখীন হতে পারে। তবে আশার কথা, এ দেশে প্রতি দুই বছর পর নির্বাচন হয়। ২০১৬ সালে আমেরিকা তার পরবর্তী প্রেসিডেন্ট নির্বাচন করবে। সঙ্গে সঙ্গে প্রতিনিধি পরিষদের সব সদস্য ও সিনেটের এক-তৃতীয়াংশ ভোটের সম্মুখীন হবে। এক মাঘে শীত যায় না—এ কথা বাংলাদেশে যেমন সত্যি, আমেরিকায়ও। নিজেদের ঘর সামলে উঠলে ডেমোক্র্যাটদের নিদেনপক্ষে হোয়াইট হাউস দখলে রাখা ও সিনেটের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাওয়া একদম অসম্ভব নাও হতে পারে।