Archive for the ‘Obituary’ Category

Jogesh Chandra Ghosh – It’s Not Only A Name It’s A History

April 4, 2016

শ্রী যোগেশচন্দ্র ঘোষ। একটি নাম! একটি ইতিহাস!

jogesh_chandra_ghosh_51103

শ্রী যোগেশচন্দ্র ঘোষ। দুস্থ-অসহায় মানুষের কল্যাণে নিবেদিত একটি প্রাণ! প্রখ্যাত আয়ুর্বেদ শাস্ত্রবিশারদ এবং শিক্ষাবিদ। তিনি আয়ুর্বেদ শাস্ত্র সম্পর্কিত বহু গ্রন্থ রচনা করেন। তিনি সাধনা ঔষধালয়ের প্রতিষ্ঠাতা। তাঁর জীবনের একমাত্র সাধনা ছিল ‘সাধনা ঔষধালয়’। যে ঔষধালয়ের খ্যাতি এ দেশ ছাড়িয়েও সমগ্র বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছিল। নব নব সৃষ্টির মাঝেই যোগেশ বাবু বেঁচে ছিলেন। ১৯৭১ সালে ৪ এপ্রিল পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর গুলিতে নিহত হন মহৎপ্রাণ এই মানুষটি।যোগেশচন্দ্র ঘোষ ১৮৮৭ সালে শরীয়তপুরের গোঁসাইরহাট গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯০২ সালে ঢাকার কে এল জুবিলী স্কুল থেকে এন্ট্রান্স পাশ করেন। ১৯০৪ সালে জগন্নাথ কলেজ থেকে এফ.এ. পাশ করেন। এর পর ১৯০৬ সালে কুচবিহার কলেজ থেকে বি.এ. এবং ১৯০৮ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রসায়নশাস্ত্রে এম.এ. পাশ করেন। ১৯০৮ থেকে ১৯১২ সাল পর্যন্ত ভাগলপুর কলেজে ও ১৯১২ থেকে ১৯৪৮ সাল পর্যন্ত জগন্নাথ কলেজে রসায়নশাস্ত্র বিষয়ের অধ্যাপনা করেন। ১৯৪৭-১৯৪৮ পর্যন্ত জগন্নাথ কলেজের অধ্যক্ষের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৪৮ সালে শিক্ষকতা পেশা থেকে অবসর গ্রহণ করেন। যোগেশচন্দ্র লন্ডন কেমিক্যাল সোসাইটি-র ফেলো (১৯১১-১৯৭১) এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কেমিক্যাল সোসাইটির সদস্য ছিলেন।

যোগেশচন্দ্র ঘোষ ১৯১৪ সালে ঢাকার ঐতিহ্যবাহী গেন্ডারিয়ায় ৭১ দীননাথ সেন রোডে বিশাল এলাকা নিয়ে গড়ে তোলেন আয়ুর্বেদ ঔষধ প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান ‘সাধনা ঔষধালয়’ । বিপুল সাফল্যের কারনে এক সময় চীন ও উত্তর আমেরিকায় সাধনা ঔষধালয়ের শাখা বা এজেন্সী ছিল । পৃথিবীতে যতদিন আয়ুর্বেদ শাস্ত্র থাকবে ততদিন এই চিকিৎসা বিজ্ঞানের সঙ্গে জড়িয়ে থাকবে অধ্যক্ষ যোগেশ চন্দ্রের নাম । তাঁর গবেষণা ও সাধনার ফলে বাংলাদেশে আয়ুর্বেদ চিকিৎসা পদ্ধতি ও ঔষধ প্রস্তুত প্রণালী আধুনিক মানে উন্নীত হয়। তিনি রোগ-ব্যাধির কারণ ও লক্ষণ, আয়ুর্বেদ চিকিৎসার তত্ত্ব এবং এর ব্যবহার পদ্ধতি সম্পর্কে বহু বই লিখে গেছেন। তার আয়ুর্বেদ সংক্রান্ত বইগুলোর মধ্যে ‘অগ্নিমান্দ্য ও কোষ্ঠবদ্ধতা’, ‘আরোগ্যের পথ’, ‘গৃহ-চিকিৎসা’, ‘চর্ম ও সাধারণ স্বাস্থ্যবিধি’, ‘চক্ষু-কর্ণ-নাসিকা ও মুখরোগ চিকিৎসা’, ‘আমরা কোনপথে’, ‘আয়ুর্বেদ ইতিহাস’, ‘Whither Bound Are We’ ও ‘Home Treatment’ উল্লেখযোগ্য। দানবীর হিসেবে তাঁর সুনাম ছিল।

পঁচিশে মার্চ ১৯৭১। পুরনো ঢাকার সূত্রাপুর এলাকার অনেকেই এরই মধ্যে শহর ছেড়ে পালিয়ে গেছে। সমস্ত এলাকায় বাড়ি কাম কারখানায় কেবল যোগেশ বাবু রয়ে গেলেন। বিরাট এলাকা জুড়ে সাধনা ঔষধালয় কারখানা। এখানেই তিনি কাটিয়েছেন জীবনের অধিকাংশ সময়, গবেষণা করেছেন! তাঁর একমাত্র সাধনাস্থল এই কারখানা, এখানকার একেকটা ইটে আছে তাঁর মমতার ছোঁয়া! নিঃসঙ্গ জীবনের একমাত্র সাথীরা ছিল কারখানার শ্রমিকরা। সবাই যখন কাজ সেরে ফিরে যেত তখন কেবল থাকতেন, সুরুজ মিয়া এবং রামপাল।

সুরুজ মিয়া এবং রামপাল কারখানার দারোয়ান। তাঁরা দীর্ঘ ১৭ বছর যোগেশ বাবুর সঙ্গে কাটিয়েছে। ২৫ শে মার্চের পর সবাই যখন একে একে বাবুকে ফেলে চলে গেল, গেলেন না কেবল এই ২ জন! ২৫ শে মার্চের পরের ঘটনা। ৩ এপ্রিল দিবাগত গভীর রাত। একটি মিলিটারী জীপ এসে থামলো। ৫/৬ জন সশস্ত্র সৈনিক জীপ থেকে নামলো। তাদের সবার হাতে ভারী অস্ত্র। একে একে গেটের তালা ভেঙ্গে ফেললো তারা। কয়েক রাউন্ড ফাঁকা গুলি ছুড়লো।

পাহারাদার সুরুজ মিয়ার হাতের বন্দুকও গর্জে উঠলো। সেনাদের দিকে তাক করে তিনিও গুলি ছোড়া শুরু করলেন। শুরু হলো অসম যুদ্ধ। সামান্য অস্ত্র, সামান্যতম অস্ত্রচালনায় পারদর্শী একজন সাধারণ বাঙালি সুরুজ মিয়া পাহারাদারের কাছে হার মানলো পাক সৈন্যরা। রাতের আধারে পাক সেনারা পালিয়ে গেল। সুরুজ মিয়া যোগেশ বাবুকে বললেন পালিয়ে যেতে। যোগেশ বাবুর এক কথা, মরতে হয় দেশের মাটিতে মরব। আমার সন্তানসম এই সব ছেড়ে আমি কোথায় যাবো?

৪ এপ্রিল সকাল। পাকিস্তানী আর্মি আবারও ফিরে এলো, বিপুল পরিমাণ অস্ত্রশস্ত্র এবং লোকবল নিয়ে। পাক সেনারা নীচে সবাইকে লাইন করে দাঁড় করালো। এরা যোগেশ বাবুকে উপরে নিয়ে গেল। রাইফেলের মুখে ওই বয়স্ক মানুষটা কি বলেছিলেন তা কোনদিন আর জানা হবে না! পাক সেনারা তাঁকে বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে মেরেছে। তাদের উল্লাসধ্বনি নীচে ভেসে আসছিল! নীচের লোকজনরা সুযোগ বুঝে পালিয়ে প্রাণ বাঁচালেন।

যোগেশচন্দ্র ঘোষ নামের বয়স্ক এই মানুষটা শুধু পড়ে ছিলেন এলোমেলো ভঙ্গিতে, মৃত। শরীরে অজস্র বেয়নেটের দাগ নিয়ে। পাক আর্মিরা শুধু তাঁকে হত্যা করেই ক্ষান্ত হয়নি, লুটে নিয়ে গিয়েছিল যোগেশ বাবুর অর্জিত সমস্ত সম্পদ। কেবল নিতে পারেনি এ দেশের জন্য যোগেশ বাবুর একবুক ভালোবাসা!


   সৌজন্যেঃ sahos24.com

Advertisements

Com Ananda Pathak Passes Away

November 29, 2014

368652

Dr. Pashupatinath Chatterjee

February 8, 2014

ডাঃ পশুপতিনাথ চ্যাটার্জি

তুষার কাঞ্জিলাল

জীবনে এমন কিছু মানুষের সঙ্গে পরিচিতি ঘটে যাঁদের আত্মীয় বলে ভেবে নিতে বেশিদিন সময় লাগে না৷‌ নিজগুণে তাঁরা অন্যের মনের অনেক কাছাকাছি চলে আসতে পারেন৷‌ কিছু মাত্র চেষ্টা না করে তাঁরা মানুষের শ্রদ্ধা, অকুন্ঠ প্রীতি অতি সহজেই আদায় করে নেন৷‌ এমনই একজন মানুষ ডাঃ পশুপতিনাথ চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে পরিচিতি এবং দীর্ঘকাল কাছাকাছি থাকার সুযোগ ঘটেছে৷‌ তাঁর প্রীতি এবং স্নেহধন্য ছিলাম এটা ভাবলে গর্ব হয়৷‌টেগোর সোসাইটি যার আমি বর্তমান সম্পাদক, তিনি দীর্ঘকাল তার সভাপতি ছিলেন৷‌ আমাদের মুখপত্র কম্পাস পত্রিকারও তিনি ছিলেন প্রধান সম্পাদক৷‌ লেজুড়ের মতো সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য হিসেবে আমার নাম থাকলেও সব দায়িত্ব উনি নিজেই বহন করতেন৷‌ তাঁর গত ২৭ তারিখে দেহাবসান ঘটেছে৷‌ পরিণত বয়সেই মৃত্যু কিন্তু আমাদের মতো অনেকেই চরম বেদনাহত৷‌ পৃথিবী থেকে অতি পবিত্র একটি মানুষ চিরতরে বিদায় নিলেন৷‌
কোনও কোনও মৃত্যু পৃথিবীকে দরিদ্র করে৷‌ তাঁর ক্ষেত্রে সেটাই ঘটেছে৷‌ পেশায় ছিলেন খ্যাতনামা শল্যচিকিত্সক, দেশ থেকে ডাক্তারি পাস করে তিনি চীনে চলে যান৷‌ সেখানে একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্হার সঙ্গে কয়েক বছর চিকিত্সক হিসেবে থেকে তারপর বিলেতে চলে যান৷‌ ওখান থেকে এফ আর সি এস করে দেশে ফিরে অন্য দু-একটি সংস্হার সঙ্গে কাজ করেন এবং শেষে সরকারি চাকরিতে যোগ দেন৷‌ কলকাতার বিভিন্ন মেডিক্যাল কলেজে অধ্যাপনা সূত্রে যুক্ত থাকাকালীন তাঁর ব্যক্তিত্ব, কাজের প্রতি নিষ্ঠা এবং রোগীদের প্রতি সহমর্মিতা তাঁর অনেক ছাত্রকে প্রভাবিত করেছিল৷‌
টেগোর সোসাইটির সঙ্গে যুক্ত হওয়ার পর দেখেছিলাম প্রয়াত পান্নালাল দাশগুপ্ত তাঁকে শ্রদ্ধার চোখে দেখতেন এবং অনেক ব্যাপারে সম্পূর্ণ নির্ভর করতেন৷‌ তাঁর জীবনের মূল্যবোধগুলির সঙ্গে তিনি কখনও compromise করতেন না৷‌ অত্যম্ত দক্ষ শল্যচিকিত্সক হওয়া সত্ত্বেও অর্থোপার্জনের দিকে তিনি অনেকটা নির্মোহ ছিলেন৷‌ তাঁর মাপের সমসাময়িক চিকিত্সকরা যে পরিমাণ অর্থোপার্জন করেছেন, তিনি তার ধারেকাছেও যান না৷‌ এটা নয় যে তাঁর রোগীর সংখ্যাল্পতা ছিল৷‌ প্রচুর রোগী ছিল, কিন্তু অর্থাভাবের কথা বললে সে রোগীর কাছ থেকে তিনি টাকা নিতেন না৷‌ এমনকি এমনও দেখেছি যে অপারেশনের পর রোগী সুস্হ হওয়া পর্যম্ত ওষুধের খরচা তিনি নিজেই দিতেন৷‌আমি তখন সুন্দরবনে থাকি, অনেক চেষ্টাচরিত্র করে একটা ছোট হাসপাতাল গড়ে তোলা গিয়েছিল৷‌ তার সঙ্গে রাঙ্গাবেলিয়ার নিকটবর্তী দ্বীপগুলিতে কিছু স্বাস্হ্য পরিষেবা পৌঁছবার চেষ্টা চলছিল৷‌ ডাঃ চ্যাটার্জি তখন অবসর নিয়েছেন৷‌ আমাদের এই চেষ্টায় সব ধরনের সহায়তা দেওয়ার জন্য তিনি প্রায় একশত বারেরও বেশিবার রাঙ্গাবেলিয়ায় গিয়েছেন৷‌ কলকাতায় তাঁর প্র্যাকটিসের আয় ছেড়ে দিয়ে প্রয়োজনে তিন-চারদিন থেকেছেন এবং কয়েকশো রোগীর অপারেশন করেছেন৷‌ বোকার মতো প্রথমবার তাঁকে কিছু অর্থ দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিলাম, তিনি বলেছিলেন, তাহলে তিনি রাঙ্গাবেলিয়া আসাই বন্ধ করে দেবেন৷‌ বলেছিলেন, ওই হতদরিদ্র মানুষগুলির কাছ থেকে পয়সা নিলে তার বদলে যা খোয়াতে হবে, তা হচ্ছে মানবিকতাবোধ এবং মনের শাম্তি৷‌

প্রায়ই বলতেন যে তাঁর পরিবারের আর্থিক চাহিদা খুবই সামান্য৷‌ বহুকষ্টে সল্টলেকে একটা বাড়ি করেছিলেন এবং দুটি পুত্রসম্তানের পিতা ছিলেন৷‌ ছেলেদের লেখাপড়ার ব্যাপারে এলাহি কাণ্ডকারখানা কিছু করেননি৷‌ ছেলে দুটি এখন প্রতিষ্ঠিত৷‌ এদের লেখাপড়ার খরচাটা তাঁকে রোজগার করতে হত৷‌ উনি বলতেন যে, সেটা রোজগার করতে এবং মধ্যবিত্ত জীবনযাপন করতে যে অর্থের প্রয়োজন সেটা রোজগার করতে খুব চেষ্টা করতে হয় না৷‌ বাকি সময়টা কীভাবে ব্যয় করবেন তার একটা নিজস্ব পরিকল্পনা ছিল৷‌ তিনি বলতেন যে, ডাক্তারি পাস করতে তাঁর পেছনে যে অর্থ ব্যয় হয়েছে, তার অনেকটাই বহন করেছে সরকার এবং সমাজ৷‌ একটা হিসেব বের করেছিলেন যে, তিনি ডাক্তার হতে গিয়ে একজন শ্রমজীবী মানুষের ৩৪ বছরের আয় ভোগ করেছেন৷‌ তাই এঁদের ঋণ ফিরিয়ে দেওয়ার দায়টা সারাজীবন বয়ে যেতে হবে৷‌ পারিবারিক বৃত্তের বাইরেও যে বৃহত্তর সমাজ, তার কাছে তিনি দায়বদ্ধ, এটা জীবনের অবশ্যকর্তব্যের মধ্যে একটি৷‌

প্রসঙ্গত দুটি ঘটনার কথা বলে আমার কথা শেষ করব৷‌ সেটা ব্যক্তিগত ঋণ, যা স্বীকার না করলে পাপ হবে৷‌ তখন সুন্দরবনে আমার বাস, হঠাত্ ডাক্তারবাবু বললেন, আমার স্ত্রীর একটা অপারেশন করা অত্যম্ত জরুরি৷‌ তখন কলকাতায় আমার কোনও স্হায়ী ঠিকানা ছিল না৷‌ ডাক্তারবাবু সেটা জানতেন৷‌ তিনি আমার গোটা পরিবারকে কলকাতায় এনে তাঁর বাড়িতে আশ্রয় দিলেন৷‌ সমস্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে নিজেই অপারেশন করে আমার স্ত্রীকে সুস্হ করে তুললেন৷‌ গোটা দায়িত্বটাই তাঁর৷‌ কোনও ধরনের সাহায্য লাগতে পারে কিনা জিজ্ঞেস করায় উত্তর পেয়েছিলাম, এটা আমার নয়, ওনার দায়৷‌ বীণাদেবী সুন্দরবনে বসে যে কাজটা করছেন তাঁকে সুস্হ রাখায় দায় আমাদের৷‌ আমি বেশি কিছু করছি না৷‌

তাঁর জীবনের আর একটা দিক ছিল আগ্রহী পাঠকের৷‌ শত ব্যস্ততার মধ্যেও সময় করে তিনি বিভিন্ন বিষয়ে প্রচুর পড়াশোনা করতেন৷‌ পৃথিবীর সাহিত্য এবং বিজ্ঞানের জগতে নতুন কী ভাবা হচ্ছে এবং তা আমাদের ক্ষেত্রে কতটা কাজে লাগতে পারে প্রায়ই এসে সে-সব বিষয় আলোচনা করতেন৷‌ অনেক সময় সদ্য প্রকাশিত অনেক বইয়ের খবর তাঁর কাছ থেকে পেতাম৷‌ প্রকৃত অর্থে তিনি সব সময়ই আধুনিক৷‌ কোনও মালিন্য তাঁকে স্পর্শ করত না৷‌ কোনওদিন তাঁকে কারও বিরুদ্ধে কিছু বলতে শুনিনি৷‌ সংগঠনের কাজে যখন যা চেয়েছি সেই সাহায্য পেয়েছি৷‌ ডাঃ চ্যাটার্জির মৃত্যুর পর বারবার মনে হচ্ছে যে এই ধরনের অতি উচ্চমাপের মানুষগুলি বিলুপ্ত প্রজাতি হয়ে যাচ্ছে৷‌ এ ধরনের মানুষ কোনও প্রচারের আশা না নিয়ে নিজের জীবনকে বহুর মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়ার ব্রত নিয়ে জীবনকে পরিপূর্ণভাবে ভোগ করেছেন৷‌ এ জাতের মানুষ আজকের সমাজে বিরল৷‌ কিন্তু এঁদেরই বোধহয় সমাজে আজ সবচেয়ে বেশি দরকার৷‌

Sudipto Gupta — An Obituary

April 5, 2013

317477

Litterateur Sunil Gangopadhyay passes away

October 23, 2012

Sunil Gangopadhyay is no more


Eminent litterateur and SahityaAkademi President SunilGangopadhyay died at his SouthKolkata residence in the early hours on Tuesday following a massive heart attack. He was 78.

Gangopadhyay’s body will be kept in a mortuary till his son arrives from Boston for performing the last rites, family sources said.

A prolific writer and winner of several awards, Gangopadhyay was the founder editor of Krittibas, a seminal poetry magazine that became a platform for a new generation of poets experimenting with many new forms.

Author of over 200 books, Gangopadhyay excelled in different genres but declared poetry to be his “first love”. His Neera series of poems are popular.

Gangopadhyay also excelled in short story, novels, travelogues and children’s fiction.

He had won the Sahitya Akademi Award (1985), Ananda Puraskar (1989) and the Hindu Literary Prize(2011).

After serving five years as the Vice President, he was elected the President of the Sahitya Akademi on February 20, 2008.

He used the pen-names of Nil Lohit, Sanatan Pathak and Nil Upadhyay.

Gangopadhyay is survived by wife and son.

On hearing the news of Gangopadhyay’s death, several writers, includingNabaneeta Dev Sen, rushed to his house in the morning.

Eminent writers, including Shirshendu Mukhopadhyay, SamareshMajumdar, Nirendranath Chakrabarty and Abul Bashar mourned his death.

Condoling his death, Shirshendu Mukhopadhyay said, “It will be extremely difficult to fill the vacuum in Bengali literature after his death as Sunil had heralded a new style in Bengali literature”. “Bengali literature has lost its guardian”, writer Samaresh Majumdar said. Recalling his long association with Gangopadhyay, veteran poet Nirendranath Chakrabarty said though he was senior to Sunil by ten years in age, he had high respect for his style of writing.

“I saw a sapling when Sunil started writing and keenly observed how it grew into a big tree with thousands of branches”, Chakrabarty observed.

Abul Bashar said Gangopadhyay was inimitable in all respects. “We had entered the world of poetry with his guidance”.

Eric John Ernest Hobsbawm Is No More

October 2, 2012

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

‘Moyna Tadanta’ Writer Aniket Chakraborty is No More

August 31, 2012

সমাজকে ধাক্কা দিত কমরেড অনিকেতের লেখনী

 নারায়ণ দত্ত

    একটা কঠিন ঝোড়ো পরিস্থিতির মধ্যে আমরা গণশক্তির একজন দক্ষ পরিশ্রমী নিষ্ঠাবান সাংবাদিককে হারালাম। গত ১০ই আগস্ট দুপুরে গণশক্তির সাংবাদিক এবং সম্পাদকমন্ডলীর সদস্য কমরেড অনিকেত চক্রবর্তী আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন। অনিকেতের প্রকৃত নাম অনিরুদ্ধ চক্রবর্তী। কিন্তু গণশক্তিতে এবং গণশক্তির অগণিত পাঠকদের কাছে তিনি অনিকেত চক্রবর্তী নামেই পরিচিত ছিলেন। বলা ভালো, জনপ্রিয় ছিলেন। সাংবাদিকতার মাধ্যমে মানুষের ভালোবাসা ও জনপ্রিয়তা অর্জন করায় তিনি দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবেন।

ভারাক্রান্ত হৃদয়ে তাঁর স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে এখন আমাদের অনেক কথাই মনে পড়ছে। ২১ বছর একই প্রতিষ্ঠানে কাজ করা এক সহকর্মীকে হারানোর বেদনার সঙ্গে সঙ্গে আমরা সকলেই অনুভব করছি একটি বড় লড়াইয়ের শক্তিশালী সহযোদ্ধাকে হারানোর বেদনা, আর প্রতি মুহূর্তে অনুভব করছি এক বিপুল ক্ষতির পরিমাণ। বয়সকালে প্রাকৃতিক নিয়মে অনেক প্রিয় কমরেডকেই আমাদের চিরবিদায় জানাতে হয়েছে। মন মানুক না মানুক, অনেক কিছু মানতেই হয়। কিন্তু মাত্র ৪৫ বছর বয়সে আত্মঘাতী হয়ে চলে যাওয়া এক কমরেডকে বিদায় জানানোর কষ্ট মেনে নেওয়ার কি আর কোনো সহজ উপায় হয়!

তবু অনিকেতের জীবন তো কোনো সাধারণ বয়ে যাওয়া জীবন ছিলো না, ছিলো এমন কোনো এক বহমান সংগ্রামের জীবন যার প্রতিটি স্মৃতিচারণ আমাদের অন্যভাবেও ভাবতে শেখায়। যে অকস্মাৎ জীবন থেকে সরে দাঁড়ালো, তাঁরই জীবনের বিগত দিনগুলি আমাদের অন্য কোনো মানে খুঁজতে সাহায্য করে। কমরেড অনিকেত চক্রবর্তীর জীবন মানে দিনের পর দিন শ্রমজীবী গরিব মানুষের জন্য প্রবল পরিশ্রম করে তথ্যের পর তথ্য সংগ্রহ করে সংগ্রামের বারুদভরা সংবাদ তৈরি করা। অনিকেত নিজে হাতে দেখিয়ে দিয়ে গেছেন, অসির চেয়ে মসির জোর কতটা বেশি হতে পারে। গণশক্তি পত্রিকা তাঁর লিখিত সংবাদ ও নিবন্ধে দিনের পর দিন ঋদ্ধ হয়েছে।

আজ যখন আমাদের রাজ্যের সামগ্রিক পরিস্থিতি এক গভীর সঙ্কটের মধ্য দিয়ে অতিবাহিত হচ্ছে, সংবাদমাধ্যম সম্পর্কে নানা প্রশ্ন নানা দিক উঠে আসছে ঠিক তখনই সাংবাদিক অনিকেত আমাদের মধ্যে আর নেই। কিন্তু সাংবাদিক ও সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতারক্ষার লড়াই, এবং সংবাদমাধ্যমকে মুনাফার বদলে জনস্বার্থের পথে রাখার লড়াইকে অনিকেত তাঁর লেখনীর মাধ্যমে বরাবর গুরুত্ব দিয়ে এসেছেন।

বিগত কয়েকবছর ধরে পশ্চিমবঙ্গের সামগ্রিক রাজনৈতিক পটভূমিতে সংবাদমাধ্যমের ভূমিকা নিঃসন্দেহে ভবিষ্যতের গবেষণার বিষয় হয়ে থাকবে। সংবাদমাধ্যমের এই চলতি সময়ের ভূমিকা দেখিয়ে দিচ্ছে, বাজারের মুনাফা সন্ধানী ব্যবসায়িক চরিত্রের সংবাদমাধ্যম কোনো মতেই সত্যনিষ্ঠা এবং জনস্বার্থরক্ষায় কাজ করে না। সংবাদমাধ্যমের এই চরিত্রকে রীতিমতো তথ্যের আলোকে বিশ্লেষণ করে, সংবাদপত্র ঘেঁটে তাদেরই প্রকাশিত তথ্যের ভিতরকার পরস্পর বিরোধিতা, অসত্যতা এবং কখনো কখনো বিচ্ছিন্নভাবে প্রকাশিত হয়ে যাওয়া নির্মম সত্যকে শৈল্পিক দক্ষতায় তুলে ধরেছিলেন অনিকেত। গণশক্তি পত্রিকার উত্তরসম্পাদকীয় বিভাগে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয় এই সংক্রান্ত কলাম ‘ময়নাতদন্ত’। অনীক চক্রবর্তী ছদ্মনামে এই ‘ময়নাতদন্ত’ লিখতেন অনিকেত চক্রবর্তীই। তাঁর লেখা ‘ময়নাতদন্ত’ পাঠক মহলে এত জনপ্রিয় হয়েছিলো যে এই লেখাটি পড়ার জন্য নির্দিষ্ট দিনে অনেকেই অপেক্ষা করে থাকতেন।

ধারাবাহিক ‘ময়নাতদন্ত’ -এর লেখাগুলি একটি সময়কালের সংবাদমাধ্যমের ইতিহাসের চিত্র হয়ে থাকবে। ভবিষ্যতেও সংবাদমাধ্যম সংক্রান্ত গবেষণায় এই লেখাগুলি তথ্যনিষ্ঠ উপাদানের ভূমিকা পালন করবে। শুধু সংবাদমাধ্যমের কাজের মূল্যায়নেই নয়, বর্তমান সময়কালে এরাজ্যের রাজনৈতিক ঘটনাবলীরও একটি প্রাঞ্জল বিবরণ তুলে ধরে এই ‘ময়নাতদন্ত’। বর্তমান রাজনীতিকে বুঝতে এই লেখাগুলি অত্যন্ত সহায়ক। এই কারণে গণশক্তির পক্ষ থেকে অনিকেতের লেখা ‘ময়নাতদন্ত’-এর দুটি সংকলন প্রকাশ করা হয়েছে যাও পাঠকমহলে অত্যন্ত সমাদৃত হয়েছে।

ভারতে সাংবাদিকতার উৎপত্তি ও বিকাশের সঙ্গে গণসংগ্রামের হাত ধরাধরি করা সম্পর্ক। পরাধীন ভারতে জাতীয় মুক্তি আন্দোলনের পরিপূরক হিসাবে কাজ করেছে ভারতের সাংবাদিকতা এবং সেখান থেকেই তার আধুনিকতা। পৃথিবীর বহু দেশের মতো ভারতেও সাংবাদিকতার বিকাশের সঙ্গে তার অ্যাক্টিভিস্ট বা মিশনারি ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু স্বাধীন ভারতে পুঁজিবাদের বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে সংবাদমাধ্যম এবং সাংবাদিকতায় বাণিজ্যিকতার ছোঁয়া লেগেছে, এবং পরবর্তীতে বাণিজ্যিকতাই সাংবাদিকতাকে গ্রাস করতে লেগেছে। এই বাণিজ্যিকতার স্রোতের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে সাংবাদিকতাকে তার প্রকৃত আদর্শে ধরে রাখার জন্য যে সংগ্রাম অবিরত চলছে অনিকেত ছিলেন তার একনিষ্ঠ সৈনিক।

মিডিয়া গবেষণায় লব্ধ জ্ঞান থেকে অনিকেত এই পথে আসেননি, অনিকেত তাঁর রাজনৈতিক জীবনের সংগ্রামের অভিজ্ঞতা থেকে মিডিয়া জগতের এই সংগ্রামের পথে এসেছিলেন। ছাত্র অবস্থাতেই শ্রমজীবী মানুষের মুক্তির সংগ্রাম তাঁকে হাতছানি দিয়েছিলো। তাই হাওড়ার নরসিংহ দত্ত কলেজে পড়াকালীন সক্রিয়ভাবে তিনি এস এফ আই-র কাজে যোগ দেন। পরে মহেশ ভট্টাচার্য হোমিওপ্যাথিক মেডিক্যাল কলেজে পড়ার সময় হাওড়া জেলায় ছাত্র আন্দোলনের একজন গুরুত্বপূর্ণ সংগঠক হয়ে ওঠেন। ১৯৮৮ সালে তিনি এস এফ আই-এর হাওড়া জেলার সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য হন। এই সময়েই তিনি এস এফ আই-এর পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটির মুখপত্র ‘ছাত্র সংগ্রাম’-এর সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য হন। ১৯৮৪ সালে তিনি সি পি আই (এম)-র সদস্যপদ লাভ করেন। কমিউনিস্ট রাজনৈতিক সংগ্রামই তাঁকে বুঝিয়ে দিয়েছিলো, লেনিনের বর্ণিত রাজনৈতিক সংগ্রাম ও সংগঠনের সংগঠক হিসাবে সংবাদপত্রের ভূমিকা। তাই ১৯৯১সালে তিনি পার্টির সর্বক্ষণের কর্মী হিসাবে যোগ দেন গণশক্তি পত্রিকার সাংবাদিকতার কাজে।

সাংবাদিকতার কাজকে তিনি রাজনৈতিক মতাদর্শের অঙ্গ হিসাবেই দেখতেন। তাই দুই-তিন বছর আগে বিরোধী দলে থাকা তৃণমূল কংগ্রেসের নৈরাজ্যের রাজনীতিতে যখন ছাত্র খুন হয়েছে, এক ছাত্রের চোখ নষ্ট হয়ে গেছে, তখন কোনোরকম ভনিতার সাংবাদিকতার বদলে দৃঢ় কলমে তিনি ‘ময়নাতদন্ত’-এ লিখেছিলেন ‘চোখ নষ্টের প্রতিবাদ যদি রাজনীতি হয় তো হোক’। আবার রাজ্যে নতুন সরকার আসার পরে একের পর এক আক্রমণে সংবাদমাধ্যমকে কাজে বাধা দেওয়ার সময় তিনিই প্রতিবাদে লিখেছেন, ‘কইতে কথা বাধবে না, সবাই চুপ থাকবে না’।

দশবারো বছর আগে কেশপুর গড়বেতায় সন্ত্রাসের সময় অনিকেত সেখানে গিয়ে অত্যন্ত ঝুঁকির সঙ্গে এবং দিনরাত প্রবল পরিশ্রম করে তথ্য সংগ্রহ করেছেন। দিনের পর দিন সেখানকার অত্যাচারিত মানুষের সঙ্গে কথা বলেছেন, তাঁদের সঙ্গে থেকেছেন, খেয়েছেন এবং দিন কাটিয়েছেন এবং তারপর রিপোর্টাজে সেই সবের নির্মম বিবরণ তুলে ধরেছেন। গণশক্তির অন্যান্য সাংবাদিকদের সঙ্গে যৌথভাবে তিনি তুলে ধরেছিলেন সেখানকার মানুষের সংগ্রামের চিত্রও। পরবর্তীতে সিঙ্গুরে শিল্প উৎখাত করতে তৃণমূল কংগ্রেসের নৈরাজ্যের আন্দোলনের সময়েও তিনি দীর্ঘদিন সেখানকার সংবাদ লিখেছেন। সিঙ্গুরে তাপসী মালিকের মৃত্যু নিয়ে মামলা ও চক্রান্তের সময়েও তিনি ধারাবাহিকভাবে সেই আইনী লড়াইয়ের বর্ণনা দিয়েছেন।

মূলত: রাজনৈতিক বিষয়ক সাংবাদিক হিসাবে কাজ করলেও অনিকেতের দৃষ্টিতেই থাকতো গরিব ও শ্রমজীবী মানুষের স্বার্থবাহী কষ্ঠিপাথর। তাই সাধারণভাবে অরাজনৈতিক খবরের মধ্যেও গরিব শ্রমজীবী মানুষের কথা কীভাবে তুলে ধরা যায় সেদিকে তাঁর দৃষ্টি থাকতো সজাগ। দুর্ঘটনা বা প্রাকৃতিক দুর্যোগের খবরেও যেখানে গরিব মানুষের স্বার্থ জড়িত সেখানেও অনিকেত থাকতেন প্রবল যত্নবান। শ্রমজীবী গরিব মানুষের প্রশ্নে সমাজকে ধাক্কা দিতে খবরকে সেনসেসনাইলজড্‌ করাকে কর্তব্য মনে করলেও নিছক খবরকে আকর্ষণীয় করার স্বার্থে তিনি এই পথকে গুরুত্ব দিতেন না। এই সব বিষয়ে তিনি শুধু একজন কমিউনিস্ট হিসাবেই নয়, প্রগতিশীল সাংবাদিক হিসাবেও চিহ্নিত হয়ে থাকবেন। অনিকেত বহু লিটল ম্যাগাজিনে গল্পও লিখেছেন। অত্যন্ত লক্ষ্মণীয়, তাঁর গল্পগুলিতেও ছিলো সেই শ্রমজীবী মানুষের সুখ দুঃখের কথারই প্রাধান্য, যা তাঁর চোখে ধরা পড়েছে সাংবাদিকতার পথের আনাচে কানাচে।

গণশক্তির একজন কর্মী হিসাবে অনিকেত ছিলেন অত্যন্ত পরিশ্রমী, দক্ষ এবং নিজের আদর্শের প্রতি সৎ। নিজের কাজ ও আদর্শের প্রতি দৃঢ় বিশ্বাসের কারণেই তিনি কোনো প্রতিদানের আশা ছাড়াই নিরলস পরিশ্রম করতে পারতেন। কমিউনিস্ট পার্টির একজন সর্বক্ষণের কর্মী হিসাবেও তিনি ছিলেন দৃষ্টান্তস্বরূপ। যা তিনি সঠিক নয় বলে মনে করতেন তা উচ্চারণে তিনি ছিলেন দ্বিধাহীন। কিন্তু সহকর্মীদের প্রতি ভালোবাসা এবং প্রয়োজনে তাঁদের পাশে দাড়ানোয় তাঁর মনটা ছিল সুবিশাল। গণশক্তির একতলা থেকে পাঁচতলার সব কর্মীরাই তাই ভালোবাসতেন হাসিখুশি মিশুকে অনিকেতকে। শুধু গণশক্তি নয়, কলকাতার বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের সাংবাদিকদের সঙ্গেও নিবিড় ভালোবাসার সম্পর্ক ছিলো অনিকেতের। সাম্প্রতিক সময়ে পার্টি এবং গণশক্তি যখন নানাদিক থেকে আক্রান্ত তখনো তিনি ভীত না হয়ে অসীম সাহসের সঙ্গে লড়াইয়ের ময়দানে ছিলেন। অনিকেতকে এই সংগ্রামী জীবনের থেকে কেউ কখনো তাঁকে সরে যেতে দেখেনি। সব হিসেব এলোমেলো করে শুধু একবার অন্যরকম কিছু ঘটে গেলো গত ১০ই আগস্ট। কবিতাপ্রিয় অনিকেতের অন্যতম প্রিয় কবি ছিলেন জীবনানন্দ দাশ।

কে জানে চেনাজানা পরিচিত অনিকেতের বুকের ভিতরেও খেলা ছিলো কোনো এক বিপন্ন বিস্ময়ের!

INA’s Rani Jhansi Passes Away

July 24, 2012

A Different Story of a Common Man…

October 29, 2011

 

মনে হচ্ছিল, যেন পার্টি ক্লাসে বসে শুনছি

অনিকেত চক্রবর্তী

    ডায়েরির সেই পাতাগুলো হাতড়ে বেড়াচ্ছি। কোথায় যে রেখেছি নীল ডট পেনের কালিতে লেখা ছেঁড়া পাতাগুলো! মুঠোর ভাঁজে দলা পাকিয়ে যাওয়া সেই পাতাগুলো হাতে দিয়ে জগন্নাথদা বলেছিলেন, ‘এই নিন। গিয়ে যা দেখলাম, কোনওরকমে লিখে রেখেছিলাম। এবার যেভাবে যা করার করুন। ওখানে একেবারে দম আটকে যাওয়া পরিবেশ…।’

    জগন্নাথদা মানে কমরেড জগন্নাথ ধাড়া। সি পি আই (এম)-র হুগলী জেলা কমিটির কার্যালয়ের সর্বসময়ের পার্টিকর্মী। গোঘাটের নকুণ্ডা গ্রামের মানুষ। পার্টির কাজেই শ্রীরামপুরে পার্টির জেলা অফিস থেকে প্রায়ই আসতেন পার্টির রাজ্য অফিস আলিমুদ্দিন স্ট্রিটে। ঘুরে যেতেন একবার গণশক্তি অফিসেও। কখনও লেখা নিয়ে আসতেন। কখনও এমনিই শুধুই খোঁজখবর নিতে। আমরা সবাই কে কেমন আছি, জানতে। সেই জানতে চাওয়ার মধ্যে কোনও আনুষ্ঠানিকতা থাকতো না। বরং গণশক্তিতে এসে আমাদের জেলা ডেস্ক বিভাগে ঢুকে যখন একগাল হেসে জিজ্ঞাসা করতেন, কী! কেমন আছেন, তাতে মিশে থাকতো দীর্ঘদিনের পরিচিত আপনজনের খোঁজ নেওয়ার অকৃত্রিম আত্মীয়তা!

    সেই জগন্নাথদা গত মে মাসের তৃতীয় সপ্তাহে গণশক্তিতে এসে বলেছিন, ‘গ্রামে যাবো একবার, মা বাড়িতে আছেন, অন্যরা কে কেমন আছেন, একবার গিয়ে দেখে আসা দরকার।’ তাঁকে বলেছিলাম, ‘যাবেন? কীভাবে ঢুকবেন? যা খবর, তাতে গোঘাটেও ওরা দাপিয়ে বেড়াচ্ছে।’

    তখন দিন সাতেক হয়েছে, পরিবর্তনের জমানা শুরু হয়েছে রাজ্যে। গোঘাটের ‘অপরাধ’ তো ভয়ঙ্কর। অনেক জায়গায় লালঝাণ্ডা ভোটের লড়াইয়ে হারলেও গোঘাটের মতো বেশ কিছু এলাকায় জিতেছে লালঝাণ্ডাই। এই ‘অপরাধের’ কী কোনও ক্ষমা হয়? তাই শুরু হয়ে গিয়েছিল তৃণমূ‍‌লের দাপাদাপি। ১৯৯৯-২০০০ সালে পাশকুড়া লাইনে তৃণমূলী সন্ত্রাসের মতই দাপাদাপি। গোঘাট তখনও ক্ষতবিক্ষত হয়েছিল।

    জগন্নাথদা বলেছিলেন, ‘জানি। অবস্থা খারাপ। তবুও যাবো। দেখি, কী হয় গিয়ে।’

    স্বার্থপরের মতো বলেছিলাম, ‘যাবেন যখন, একটা কাজ করবেন? গিয়ে যা দেখবেন, সব নোট করবেন? একদম দিন-সময়-জায়গা ধরে ধরে সব অভিজ্ঞতা?’ জগন্নাথদা বলেছিলেন, ‘যদি সুযোগ পাই, নোট করবো।’ তাঁকে বলেছিলাম, ‘না হলে আমরা কীভাবেই বা জানবো? মানুষকেই বা কীভাবে জানাবো কেমন শুরু হয়েছে পরিবর্তনের ট্যাবলেট খাওয়ার ফল!’ হেসেছিলেন জগন্নাথদা।

    ঠিক তিনদিন বাদে ফের এসেছিলেন জগন্নাথদা। একটু ধ্বস্ত যেন। হাতে দলাপাকানো ডায়েরির ছেড়া পাতা ধরিয়ে দিয়ে বলেছিলেন, ‘যখন যেভাবে পেরেছি, নোট করেছি। এই নিন।…’

    ডায়েরি থেকে ছিঁড়ে নেওয়া পাতায় নীল ডট পেনের লেখা।

    বাসে করে গিয়ে গোঘাটে নেমে নকুণ্ডা গ্রামে ঢোকার মুখে আমাদের পার্টি অফিস। সেখানে গিয়ে কী অভিজ্ঞতা। বাড়ি গিয়ে সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে গ্রামের এই পাড়া – ওই পাড়ার কী চেহারা। কীভাবে তৃণমূলীরা তাঁকে ঘিরে ধরলো। অশ্রাব্য ভাষায় গালমন্দ করে তাঁকে দিয়ে কী করাতে চাইল, তা না করায় কীভাবে তাঁকে অত্যাচার করা হলো। শেষ পর্যন্ত থানায় গিয়ে পরিবর্তনের জমানায় কী দেখলেন, বাধ্য হয়ে রাতে বাস ধরে গোঘাটের গ্রাম ছেড়ে আসার পথে কী অভিজ্ঞতা। সব টুকরো টুকরো করে লেখা। কোনওমতে যেভাবে সুযোগ মিলেছে, নোট করেছেন তিনি, সেই প্রয়াস স্পষ্ট ডায়েরির পাতায়।

    সেই অভিজ্ঞতা আমরা প্রকাশ করলাম গণশক্তিতে। বের হওয়ার পর জগন্নাথদা’র ফোন। ‘ঠিকই বলেছেন আপনারা। অনেক মানুষ জানতে পারলো কী ঘটছে গ্রামের ভিতর। প্রচুর ফোন পাচ্ছি…। আরো কোনও অভিজ্ঞতা হলে আবার লিখবো।’

    তখনও জানি না, জানা তো সম্ভবও নয় যে জগন্নাথদা আর সুযোগ পাবেন না ওইরকমভাবে কোথায় যাওয়ার, ওইরকমভাবে লেখার। কী করে জানবো যে শ্রীরামপুর স্টেশনে ট্রেনের তলায় কাটা পড়ে মর্মান্তিকভাবে চলে যাবে সত্যিকারের অর্থেই মাটির সঙ্গে থাকা পার্টিঅন্ত এই জীবন!

    ডায়েরির সেই পাতাগুলো খুঁজছি এখন। কোথায় যে রেখেছি! ছাপা যা হয়েছে, হয়েছে। কিন্তু জগন্নাথদার হাতে লেখা সেই ডায়েরির পাতা তো মূল্যবান। কত ঝুঁকি নিয়ে তিনি আমাদের জন্য এনেছিলেন মূল্যবান তথ্য!

    জগন্নাথদার সঙ্গে পরিচয় হয়েছিলো ২০০০ সালে।

    খবর সংগ্রহের উদ্দেশ্যেই চমকাইতলা গিয়েছিলাম। জায়গাটা পশ্চিম মেদিনীপুরের উঠোনে। কিন্তু গোঘাটের পিঠোপিঠি। হুগলীর গোঘাট। সেখান দিয়েই ফিরেছিলাম। কামারপুকুরে আমাদের পার্টির জোনাল অফিস। ওখানে পার্টিকর্মী নেতাদের সঙ্গে বসে চা খাওয়ার ফাঁকে হঠাৎই আন্তরিক গলায় প্রশ্ন কানে এসেছিলো, ‘চমকাইতলা গিয়েছিলেন?’

    দেখি, সুতির সাদা ধুতি-পাঞ্জাবি পরনে রোগা চেহারার ক্ষয়াটে একজন মানুষ। কোটরে ঢুকে যাওয়া চোখ। কিন্তু উজ্জ্বল। ঝকঝকে হাসি। অমলিন। আমি তাঁকে চিনতাম না। কিন্তু চমকাইতলায় গিয়েছিলাম কীনা, হেসে এত আন্তরিকভাবে জানতে চাইলেন, যেন কতদিনের চেনা মানুষ।

    সেদিনই পরিচয় হয়েছিল, উনি জগন্নাথ ধাড়া। কৃষক আন্দোলনের কর্মী। তাঁকে বলেছিলাম, হ্যাঁ। চমকাইতলা গিয়েছিলাম। ফেরার পথে এখানে একটু এসেছি। আপনাদের গোঘাটে। গল্প করার জন্য।

    তৃণমূল এবং বি জে পি-র যৌথ সন্ত্রাস থেকে তখন সবে মুক্ত হয়েছিল গড়বেতা-গোঘাটের মতো জায়গাগুলি। সন্ত্রাসমুক্তির সেই দিনগুলির খবর সংগ্রহ করতে ঘনঘন যেতে হতো তখন ওইসব এলাকায়। ১০ বছর আগে সেই সময়েই চা-মুড়ি খেতে খেতে গল্প করার মাঝে জগন্নাথদা সেই সময়ের ঘটনাবলীর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক সম্পর্কে চোখ খুলে দিয়েছিলেন আমার। সেই সময়কার সন্ত্রাসের উৎস খোঁজার কথাবার্তার মধ্যেই জগন্নাথদা শুনিয়েছিলেন গ্রামে গঞ্জে গড়ে ওঠা নব্যধনীর উত্থানের কাহিনী। কেন এবং কীভাবে সন্ত্রাসে এরা মদত দেয়, শুনিয়েছিলেন সেই কথা। গল্পের মতো করে। কিন্তু জীবন্ত। সেই সময়ের সন্ত্রাসেও তৃণমূল পরিবর্তনের স্লোগান দিয়েছিল। সঙ্গী ছিলো বি জে পি। কেননা কেন্দ্রে তখন বি জে পি-র সরকার। তৃণমূলের তাই তখন দরকার ছিলো বি জে পি-কেই।

    আমাদের পার্টির গোঘাট জোনাল অফিসের সামনে ফাঁকা জায়গা অনেকটাই আছে। সেইখানে বসে বলছিলেন সেদিন জগন্নাথ ধাড়া। ‘এই যে ওরা পরিবর্তনের স্লোগান দিচ্ছে, এটা ওরা কাদের কথা ভেবে দিচ্ছে জানেন তো? জোতদার-জমিদারদের কথা ভেবে। জোতদার-জমিদাররাই এই স্লোগানটা বেছে দিয়েছে ওদের।’

    জগন্নাথদা এমন মানুষ, পালটা প্রশ্ন করলে রেগে যান না। বরং একগাল হেসে শিক্ষকের মতো বোঝাতে থাকেন। যদি তিনি মনে করেন যে, শ্রোতা সত্যিই বুঝতে চাইছে। ভীষণ ধীর-স্থির হয়ে কথা বলেন। এই পরিচয় আরো পরে পেয়েছিলাম। চেনাজানা যখন আরো গভীর হয়েছিলা। সেদিন কিছু না জেনেই পালটা প্রশ্ন করেছিলাম, ‘জোতদার-জমিদাররা কই এখন? ওরা তো সব জমিহারা হয়ে গিয়েছে। কী করে ওরা?’

    তখন ষষ্ঠ বামফ্রন্ট সরকারের আমল।

    জগন্নাথদা একগাল হেসে বলেছিলেন, ‘জমি হারালে কী হবে? আপনি ভূমিসংস্কারের কথা বলছেন তো!’ মাথা নেড়ে সম্মতি দিই জগন্নাথদার প্রশ্নে।উনি বলতে থাকেন, ‘‘জমি হারালেও জোতদার-জমিদারদের একটা অংশ তো গ্রামেই রয়ে গিয়েছে। গ্রামেই তারা এখনও কৃষির উপর নির্ভরশীল। তেমন জমি নেই তাদের। কিন্তু জমির উপর টান আছে। হারানো জমির উপর লোভ। মাঝে মাঝে ফোঁস ফোঁস করে। ওই অবধিই। আবার খরা-বন্যায় কিংবা ফসলের দাম না পেলে কাত হয়ে যায়। ওদের আরেকটা অংশ বামফ্রন্ট সরকারের আমলেই জমিজমার মায়া ত্যাগ করেছিলো। ওরা মনে করে গাঁয়ের গরিব মানুষ যারা ওদের খেতে খামারে খাটতো এই সব ছোটলোককে বামফ্রন্ট মাথায় তুলেছে। তাই গ্রামে আর থাকা যাবে না। তাই ওরা জমিজমার মায়া ফেলে, সব কেনা-বেচা করে পুঁজিপাটা গুটিয়ে নিয়ে উঠতি চকচকে গঞ্জ শহরের দিকে চলে গেছে ওরা। এরা কিন্তু দ্রুত বাড়ছে।’’

    বাড়ছে তো কী হয়েছে, গ্রামে তো নেই। ওরা কী করে সন্ত্রাসে মদত দিচ্ছে?

    প্রশ্ন শুনে জগন্নাথদা একটুও বিরক্ত না হয়ে জলের মতো স্বচ্ছ করে দেন সব ধাঁধা। ঠাসবুনোট কৌতূহলে জড়িয়ে নেন শ্রোতাকে। বলতে থাকেন তাঁর যুক্তি এমনভাবে যেন মাটি থেকে উঠে আসা মানুষ কথা বলছেন।

    ‘‘এই যে শহর গঞ্জের দিকে চলে গেল জোতদার জমিদারদের একটা অংশ, এদের হাতেই তো কোল্ড স্টোরেজ, রাইস মিল, কাঠমিল, পেট্রোল পাম্প, ট্রান্সপোর্ট, লেদ, ফসল কেনাবেচার আড়ত। সার, বীজ কীটনাশকেরও ব্যবসা। এই যে আপনি চমকাইতলা থেকে এলেন, দেখছেন তো কত ফসল চমকাইতলার মাঠে। এ ছিল শুকনো মাঠ। বামফ্রন্ট সরকার আর আমাদের কৃষক আন্দোলন কৃষকদের হাতে দিয়েছিল চমকাইতলার শুকনো মাঠ। কৃষক কঠিন শ্রম দিয়েছে। চমকাইতলার শুকনো মাটিতে করলা খেত তৈরি করেছে। পঞ্চায়েত করে দিয়েছে জলের ব্যবস্থা। জমি কৃষকের। করলা কার?’’

    প্রশ্নটা করে থেমে যান জগন্নাথদা। মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনছি তখন তার কথা। উত্তর দিই, কেন, জমি যখন কৃষকের, করলাও তাঁর। তিনিই তো চাষ করেছেন!

    জগন্নাথদা শুনে বলতে থাকেন, ‘‘তাই তো হওয়ার কথা। কিন্তু সমস্যা হচ্ছিল। করলা-চাষের মরসুমে কখনও টাকা ধার করতে, কখনও সার-বীজ কীটনাশক কিনতে, কখনও ডিজেল কিনতে, ফসল উঠলে তা বেচতে কিংবা হিমঘরে রাখতে কৃষককে যেতে হয় কামারপুকুর, জয়রামবাটি, শ্রীনগর, বাঁকা চন্দ্রকোনা, গড়বেতা, আমলাগুড়ির ব্যবসায়ী মহাজনদের কাছে। ওরা সব গ্রামে জমিজমার মায়া ত্যাগ করে সব ফেলে গঞ্জে গিয়েছে বটে। কিন্তু ফেলে আসা জমির ফসলের বারো আনা এখনও এইভাবেই ওদের ঘরে ওঠে।’’

    একটু থামেন জগন্নাথদা। তারপরেই খেয়াল করিয়ে দেন, “আর্থিক দিক থেকে এভাবেই ওরা সবল থাকলেও গ্রামের সামাজিক বিষয়ে কিন্তু ওরা নাক গলাতে পারছিল না। কিন্তু ওদের আগে-পিছে গ্রামের করলা খেত-পান বরোজ-কামারশালা, মফস্বল শহর গঞ্জের ফেরিওয়ালা, রিকশাচালক, টালি, ইটভাটার শ্রমিক মজুরের ঘর থেকে উঠছে একটা নতুন শক্তি। কীরকম?’’

    সহজ সরল ভাষায় একেবারে জীবন্ত সব ছোট ছোট অভিজ্ঞতা দিয়ে বলতে থাকেন জগন্নাথদা। ‘‘এবছর হয়তো উচ্চমাধ্যমিকে রিকশাওয়ালার ছেলেটা খুব ভালো ফল করেছে। গ্রামের মানুষ গর্বিত হয়েছেন। চমকাইতলার করলা খেতের বর্গাদারের ছেলেটি এবছর হয়তো ডাক্তারি পাস করেছে। গ্রামের মানুষের কী আনন্দ। কিন্তু আনন্দ বেশি দিন টেকে না। বছর দুই বাদে দেখা গেল, ওই ছেলে এখন মিল মালিকের জামাই। উপহার পেয়েছে নার্সিংহোম। মিল মালিক শ্বশুরই দিয়েছে। কাঁচি ধরলেই দশ হাজার। সরকারী হাসপাতালের সঙ্গে যুক্ত। সেখা‍নেও মোটা টাকা। কেউ ওদের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়ছে আত্মীয়তার সম্পর্কে। কেউ জড়িয়ে পড়ছে ওদের সঙ্গে ব্যবসা বাণিজ্য মহাজনী কারবারের সঙ্গে। এমনিতেই কর্মক্ষেত্রে এদের উপার্জন ভালো। এর বাইরেও আছে উপরি রোজগারের নানা উৎস। ব্যবসাদারের সঙ্গে যৌথভাবে উকিলবাবু, মাস্টারমশাই, অফিসারবাবুরা এখন ফসল আবাদির কারবার করেন। স্টোরে আলু রাখেন। পথে-বিপথে উপার্জনের এই টাকা আড়ালে-আবডালে খাটছে মহাজনী কারবারে। গ্রামীণ ব্যবসা আর মহাজনী কারবারে এলো নতুন সমীকরণ। আসল ব্যবসায়ীরা এই সমীকরণকেই ঢাল হিসাবে ব্যবহারের সুযোগ পেয়ে গেল। সুযোগ নিলো ওরা।’’

    মনে হচ্ছিল যেন পার্টি ক্লাস করছি। গোঘাট জোনাল পার্টি অফিসের সামনে ফাঁকা মাঠে। শোনাচ্ছেন শ্রদ্ধেয় শিক্ষক। এইমাত্র যাঁর সঙ্গে পরিচয় হয়েছে। বলছেন তিনি টুকরো টুকরো অভিজ্ঞতা। ‘‘জানেন তো, ৯০ সাল পর্যন্ত ওরা গ্রামীণ কোনও সামাজিক বিষয়ে নাক গলানোর সাহস পায়নি। পরে ওরা নতুন বন্ধু পেল বি জে পি-কে। এই যে নতুন শক্তি ওরা সঙ্গে পেল এখানে, তাদের হাত ধরে খুব ধীরে ধীরে লুকিয়ে চুরিয়ে গ্রামের সামাজিক বিষয়ে হস্তক্ষেপ করা শুরু করলো। কীভাবে জানেন? কলেজে পড়া গ্রামের দু’টো ছেলে-মেয়ে হয়তো বাড়ির অমতে অসবর্ণ বিয়ে করেছে। ওরা এসে উসকে দিলো। আমরা বামপন্থী গণআন্দোলনে যারা আছি, তারা হয়তো যথেষ্ট সাহস দেখাতে পারলাম না। তো উসকানিতে দু’টো গরিব পাড়া ভাগ হয়ে গেল।

    ৯৬-৯৭ সাল থেকে ওদের সাহস আরো বাড়লো। এবার আর পিছন থেকে নয়। একেবারে সামনেই। প্রকাশ্যে। আরেক নতুন বন্ধু তৃণমূল এবার ওদের সঙ্গে। এতদিন যারা গ্রামের মাটি মাড়ায়নি, এখন তারাও গ্রামের উৎসবগুলিতে নিয়মিত আসতে শুরু করলো। আগেও বাধা ছিল না। এখনও নেই। উৎসবে আসে ওরা। টাকা ওড়ায়। বাজনাবাদ্যি-পানীয়ের অভাব হয় না। ভোজসভা দেয়। উগ্র পানীয়ে অনেকের গলা ভেজে। গলা ভিজলে পা টলে। টলছেও। পঞ্চায়েত আর কৃষক সংগঠন দেখলো বিপদ। বললো, উৎসব হোক কিন্তু জুয়া খেলা চলবে না। পরের দিন দেখা গেল, পঞ্চায়েত অফিসের সামনে কিংবা পার্টি অফিসের সামনে মাটির দেবদেবীর মূর্তি সব সার সার বসানো। প্রচার শুরু হয়ে গেল, উৎসব করতে দিচ্ছে না সি পি এম। মানুষ কোথাও কোথাও বিভ্রান্ত হলেন। ষড়যন্ত্র কিন্তু এভাবেও হয়েছে…।’’

    বলতে থাকেন জগন্নাথদা। শুনতে থাকি। সন্ধে নামতে থাকে গোঘাটে। কলকাতা ফেরা হবে না আজ। জগন্নাথদাকে বলি, এগুলো লিখবেন না? কত মূল্যবান সব অভিজ্ঞতা! বলেছিলেন, লিখবো। লিখেছিলেন গণশক্তিতে।

    সেই লেখা আজও প্রাসঙ্গিক। মনে রাখবো আমরা। যেমন মনে রাখবো উজ্জ্বল দু’টো চোখ আর ঝকঝকে হাসির রোগা কালো মানুষটিকে। কমরেড জগন্নাথ ধাড়াকে।