Posts Tagged ‘amartya sen’

Sangh-Inspired Film Censor Board

July 13, 2017

অমর্ত্য সেনকে নিয়ে তথ্যচিত্রে কোপ
তীব্র ক্ষোভের মুখে সেন্সর বোর্ড

নয়াদিল্লি ও কলকাতা, ১২ই জুলাই– তাঁকে নিয়ে তৈরি তথ্যচিত্রে কয়েকটি অতি সাধারণ শব্দেও সেন্সর বোর্ডের নিষেধাজ্ঞায় বিস্মিত অমর্ত্য সেন বলেছেন, এ থেকে প্রমাণ হচ্ছে দেশ এক স্বৈরাচারী রাজত্বের হাতে চলে গেছে। দেশের পক্ষে কী ভালো তা তারাই একমাত্র স্থির করবেন এবং চাপিয়ে দেবেন দেশের মানুষের ওপরে।অমর্ত্য সেনের জীবন ও কাজ নিয়ে তৈরি তথ্যচিত্র ‘দি আর্গুমেনটেটিভ ইন্ডিয়ান’—এর পরিচালক সুমন ঘোষকে সেন্ট্রাল বোর্ড অব ফিল্ম সার্টিফিকেশন জানিয়েছে বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদের উচ্চারিত কয়েকটি শব্দ বাদ দিতে হবে। পরিচালক জানিয়েছেন, অন্তত চারটি শব্দ বাদ দিতে বলা হয়েছে: গোরু, গুজরাট, ভারত সম্পর্কে হিন্দুত্ববাদী দৃষ্টিভঙ্গি, হিন্দু ভারত। কলকাতায় সেন্সর বোর্ডের দপ্তরে তিন ঘণ্টা ধরে তথ্যচিত্রটি খুঁটিয়ে দেখার পরে বোর্ডের তরফে ওই রায় দেওয়া হয়েছে। পরিচালক বুধবার বলেছেন, তাঁকে মৌখিক ভাবেই ওই শব্দগুলি বাদ দিতে বলা হয়েছে। আমি এ ব্যাপারে আমার অপারগতার কথা জানিয়েছি।

পরিচলাক সুমন ঘোষ বলেছেন, তথ্যচিত্রটি নির্মিত হয়েছে অমর্ত্য সেনের সঙ্গে তাঁর ছাত্র ও বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ কৌশিক বসুর কথোপকথনের ধাঁচে। এই আলোচনার মধ্যে থেকে কয়েকটি শব্দ বাদ দিলে তথ্যচিত্রের মর্মবস্তুই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। আমি সেন্সর বোর্ডের লিখিত বক্তব্যের জন্য অপেক্ষা করছি। মুম্বাইয়ে রিভিউ কমিটিকে পাঠাবে কিনা, তা-ও দেখতে হবে। তবে যে কোনো পরিস্থিতিতেই আমার উত্তর হবে একই। হয়তো বিষয়টি মিটে যাবে, কিন্তু আমি কোনও শব্দ সরিয়ে নেব না। সুমন ঘোষ নিজেও অর্থনীতির শিক্ষক। ২০০২ থেকে ২০১৭ পর্যন্ত ১৫ বছরে ছবিটি নির্মিত।

অমর্ত্য সেন নিজে এই ঘটনা জেনে ‘বিস্মিত’। স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিমায় তিনি বলেছেন, এমনিতে ‘গোরু’ আমার খুব পছন্দের শব্দ এমন নয়। আসলে গোরু নয়, আপত্তি গুজরাট নিয়ে। এই নয় যে গুজরাট শুনলেই ওঁরা আপত্তি করবেন। ২০০২-এ গুজরাটে কী ঘটেছিল সেটা বলেছি বলে এই আপত্তি।

জানা গেছে, তথ্যচিত্রে গুজরাটের ২০০২-র ঘটনাবলীর উল্লেখ এসেছে কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ে অমর্ত্য সেনের একটি বক্তৃতায়। সেই ভাষণে গণতন্ত্রের গুরুত্বের কথা বোঝাতে গিয়ে গুজরাটে সরকারি মদতে অপরাধের কথা এসেছিল। এই তথ্যচিত্র ইতিমধ্যেই লন্ডন ভারতীয় চলচ্চিত্র উৎসবে দেখানো হয়েছে।

কৌশিক বসু মন্তব্য করেছেন, ভারতের মতো দেশের মর্যাদার সঙ্গে, অমর্ত্য সেনকে সেন্সর করা, মেলে না। ভারত যেসব দেশের প্রতিনিয়ত সমালোচনা করে থাকে, এই ব্যবহার তাদের সঙ্গেই তুলনীয়।

সেন্সর বোর্ডের নির্দেশ নিয়ে ক্ষোভ ছড়িয়েছে। বিশিষ্ট শিল্পী, বুদ্ধিবৃত্তির জগতের মানুষজন প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছেন, কোন্‌ ফতোয়ায় সেন্সর বোর্ড চলছে। বিশিষ্ট চিত্র পরিচালক বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত এদিন বলেন, সেন্সর বোর্ড একটি রাজনৈতিক দলের আখড়ায় পরিণত হয়েছে। তাঁবেদার সংগঠনের কাজ করছে। অমর্ত্য সেন কী বলবেন, তা-ও কি ওঁরা ঠিক করে দেবেন নাকি? এ হলো মূর্খামি। এ শুধু সিনেমা জগতের ব্যাপার নয়, সমস্ত গণতান্ত্রিক মানুষেরই উচিত এর জোরালো প্রতিবাদ করা।

অভিনেতা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় বলেছেন, এ তো এক ধরনের ফ্যাসিবাদ। যাঁর মুখের শব্দ নিয়ে আপত্তি করা হচ্ছে তিনি আন্তর্জাতিকভাবে সমাদৃত এক ব্যক্তি। সুতরাং এ চরম বোকামিও। তবে এই সরকারের কাছ থেকে এই ধরনের আচরণ ক্রমশই আসতে থাকবে।

সি পি আই (এম)-র সাধারণ সম্পাদক সীতারাম ইয়েচুরি বলেছেন, নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ গোরু বা হিন্দুত্ব উচ্চারণ করেছেন বলে তথ্যচিত্র বন্ধ হয়ে যাবে? এ কী করে সম্ভব? ওরা ঠিক করছে আমরা কী খাব, কী পরবো, কী বলব, কার সঙ্গে প্রেম করবো, কাকে বিয়ে করব; এখন ওরা ঠিক করতে চাইছে তথ্যচিত্রে কোন কথা আমরা শুনবো

অমর্ত্য সেনকে নিয়ে তথ্যচিত্রে এই বিতর্কের মধ্যেই সামনে এসেছে অনীক দত্তের ছবি ‘মেঘনাদবধ রহস্য’ নিয়ে আরো এক বিতর্ক। এই ছবির রিলিজ এক সপ্তাহ পিছিয়ে গিয়ে হচ্ছে ২১শে জুলাই। ছবির এক প্রযোজক সংবাদমাধ্যমে জানিয়েছেন, সেন্সর বোর্ড ‘রামরাজ্য’ শব্দ ব্যবহার আপত্তি জানিয়েছে। ‘রামরাজ্য’ শব্দটি বাংলায় নানা দ্যোতনায় ব্যবহার হয়। কিন্তু বি জে পি-রাজত্বে এখন এই শব্দের ব্যবহারও বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ছবির প্রযোজক-পরিচালকরা এ নিয়ে তেমন কোনও মন্তব্য না করলেও জানা গেছে, ‘রাম’ শব্দটি বাদ দেবার জন্যই নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পরিচালকের আপত্তি থাকলে তাঁকে রিভিউ কমিটির কাছে আবেদন করতে হবে। সেই আবেদন করা হচ্ছে না বলেই এদিন জানা গেছে।

সেন্সর বোর্ডের মাথায় এখন পহলাজ নিহালনি। তিনি খোলাখুলি বি জে পি-র সমর্থক। একের পর এক ছবির ক্ষেত্রে দক্ষিণপন্থী, হিন্দুত্ববাদী দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বোর্ড আপত্তি জানিয়ে যাচ্ছে। মঙ্গলবারই চিত্র পরিচালক প্রকাশ ঝা বলেছেন, নিহালনি ব্যক্তি হিসেবে কী করছেন, তা বড় কথা নয়। একটি মতাদর্শ পিছনে কাজ করছে।

অমর্ত্য সেন সম্পর্কে বি জে পি ও সঙ্ঘ পরিবারের মৌলিক আপত্তিই রয়েছে। তাঁর ধর্মনিরপেক্ষ অবস্থানকে দেশদ্রোহের সঙ্গে তুলনা করে বি জে পি-র তরফ থেকে বিশেষ করে সোশ‌্যাল মিডিয়ায় লাগাতার প্রচার করা হয়ে থাকে।

Harvard Students Create History

December 22, 2011

হার্ভার্ডে ছাত্ররা ইতিহাস তৈরি করলো

সুদীপ্ত ভট্টাচার্য

    গণশক্তি পত্রিকায় গত ৩রা নভেম্বর তারিখে ‘অর্থনীতিতে নোবেল : সাম্রাজ্যবাদের রাজনীতিকরণ’ প্রবন্ধে উল্লেখ করেছিলাম যে, ‘অর্থশাস্ত্রের নানা মতের নানা পথের বহু ঘরানা থাকলেও মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ একটি মাত্র ঘরানাকেই সমর্থন করে যার নাম নব্য ধ্রুপদী বা নিও-ক্লাসিক্যাল ঘরানা, যা বিদঘুটে অঙ্ক এবং আজগুবি মডেল দিয়ে সাধারণ মানুষকে খোলাচোখে নিজের দেশ ও বিশ্ব অর্থনীতিকে বোঝার পক্ষে ধোঁয়াশা সৃষ্টি করে আর ঠিক এটাই সাম্রাজ্যবাদ চায়।’ যাতে ‘সাধারণ মানুষের অজ্ঞানতার সুযোগে দেশে দেশ নয়া-উদারনীতিবাদের স্টিম রোলার চালাতে সুবিধা হয়। এই নয়া-উদারনীতিবাদকে ন্যায্যতা প্রদানের জন্যই ৯০%-র বেশি নোবেল পাওয়া অর্থনীতিবিদরা একই ঘরানাভুক্ত এবং তাদের মধ্যে ৫০%-র বেশি মার্কিন নাগরিক ও অভিবাসী।

    লেখাটা প্রকাশের ঠিক আগের দিন অর্থাৎ ২রা নভেম্বর তারিখে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরা ঐ বিশ্ববিদ্যালয়েরই নয়া-উদারবাদী ঘরানার খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ এন গ্রেগরি ম্যানকিউয়ের একপেশে, বৈচিত্র্যহীন বস্তাপচা উদারনীতির পাঠক্রমের বিরুদ্ধে জেহাদ ঘোষণা করে ক্লাস থেকে বেরিয়ে আসেন। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, ম্যানকিউ-র অর্থনীতির প্রাথমিক পাঠ সংক্রান্ত ‘ইকনমিক্স ১০’ নামক এই বিশেষ কোর্সে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ৭০০ ছাত্রছাত্রী নথিভুক্ত ছিলেন, যে সংখ্যাটা অন্যান্য সব কোর্সের তুলনায় সর্বাধিক। কে এই ম্যানকিউ? অর্থনীতির নয়া উদারপন্থী অধ্যাপকের বাইরেও তাঁর আরেকটা পরিচয় আছে। তিনি বিগত বুশ প্রশাসনের অর্থনৈতিক উপদেষ্টামণ্ডলীর সভাপতি তথা‍‌ প্রেসিডেন্ট বুশের মুখ্য অর্থনৈতিক উপদেষ্টা ছিলেন। আমেরিকার অনেক নাগরিকই মনে করেন ম্যানকিউ পরিচালিত রক্ষণশীল নয়া উদারবাদী আর্থিক নীতিই আমেরিকা তথা গোটা বিশ্বকে অর্থনৈতিক সঙ্কটের খাদে নিয়ে ফেলেছে।

নয়া-উদারনীতিবাদী পাঠক্রম ম্যানকিউরা কী পড়াতেন ?

    প্রথমেই পরিষ্কার হয়ে নেওয়া দরকার যে, ছাত্রছাত্রীদের এই জেহাদ ব্যক্তি ম্যানকিউয়ের বিরুদ্ধে নয়। ম্যানকিউ নয়া-উদারবাদী অর্থনীতির পঠন-পাঠন ও গবেষণার এক প্রতীক, যার প্রাথমিক অর্থনীতির পাঠ্যবই শুধুমাত্র হার্ভার্ড বা আমেরিকা নয়, ভারতসহ অনেক গরিব দেশেরও বিশ্ববিদ্যালয় পাঠ্যসূচীর অন্তর্গত। ম্যানকিউয়ের দুটো গুরুত্বপূর্ণ পাঠ্যবইয়ের এখানে উল্লেখ করবো। প্রথম হলো ‘ইকনমিক্স : প্রিন্সিপালস অ্যান্ড অ্যাপ্লিকেশনস’ এবং দ্বিতীয়টি হলো ‘ম্যাক্রোইকনমিক্স’। দুটি বই-ই এমন ভাষা ভঙ্গিতে লেখা হয়েছে যেন সেগুলোই গোটা অর্থনৈতিক শাস্ত্রের একমাত্র ভাবধারা। এর বাইরে যেন অর্থশাস্ত্রের অন্য কোন মতবাদ নেই, থাকতে পারে না।

    ম্যানকিউ যে অর্থনীতির কথা বলেছেন সেটাকে আমেরিকা ও ইউরোপের ধনতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা অর্থনীতির মূলধারা বলে স্বীকৃতি দিয়েছে। এটি নব্য ধ্রুপদী বা নিও-ক্লাসিক্যাল ভাবধারার উপর প্রতিষ্ঠিত—যার মূল কথা হলো মানুষ মূলত স্বার্থপর; তার জীবনের সার্থকতা হলো উপভোগ সর্বাধিক করা বা মুনাফা সর্বাধিক করা। এই মতবাদ ছাত্রদের ভাবতে শেখায় জ্ঞানবৃক্ষের ফল খেয়ে যেমন পাপিষ্ঠ আদম আর ঈভ স্বর্গ থেকে একদিন পৃথিবীতে ভূপতিত হয়ে মানবসভ্যতা সৃষ্টি করেছিলেন; ঠিক তেমনই কতকগুলো আপাদমস্তক স্বার্থপর মানুষ চূড়ান্ত অসাম্যে ভরা এই বাজার অর্থনীতিসহ ধনতান্ত্রিক সমাজ শুরু করেছিলো এবং এই ধনতন্ত্রই মানবসভ্যতার একমাত্র ভবিষ্যৎ।

    ম্যানকিউয়ের বইয়ে ধনতন্ত্রের আগে যেমন সামন্ততন্ত্র বলে কোনো কিছুর আমরা হদিস পাইনা তেমনই ধনতন্ত্রের পর? সমাজতন্ত্র? ওরে বাবা, ওসব ব্যাপারে ম্যানকিউ সাহেব শুধু প্রাক্তন সমাজতান্ত্রিক দেশের মুণ্ডুপাতই জানেন। এই মূলধারার মতাদর্শের সঙ্গে যারা একমত নন তাদের নাম ম্যানকিউ সাহেবের ঝকঝকে মলাটের বইয়ের প্রথম থেকে শেষ অবধি কোথাও খুঁজে পাওয়া যাবে না। ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে জীবনের শেষদিন অবধি যিনি জেহাদ জারি রেখেছিলেন, মৃত্যুর ১২৮ বছর পরও সারা পৃথিবীর মানুষ যার পতাকা নিয়ে লড়াই করে চলেছেন তিনি হলেন আর কেউ না, কার্ল মার্কস। কার্ল মার্কস ধনতন্ত্রকে বলেছেন ‘সর্বশেষ বৈরিতামূলক সমাজ’ (Last antagonistic mode of production) যেখানে মানুষ মানুষের উপর নিষ্ঠুর শোষণ চালায়, আর তাই মার্কস মনে করেছেন মানুষের ইতিহাস সেদিনই শুরু হবে যেদিন ধনতন্ত্র ধ্বংস হবে এবং মানুষ আর মানুষকে শোষণ করবে না। তাই মার্কসের মতে, ধনতন্ত্র মানুষের ইতিহাসের অংশ নয় মানুষের প্রাক-ইতিহাস।

    ম্যানকিউয়ের বইয়ে মার্কসের কোনো নামোল্লেখই নেই। কিন্তু কি আশ্চর্য যারা ধনতান্ত্রিক মতবাদে বিশ্বাসী অথচ ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থার মূলধারার পথিক নন তাদের সবার নাম বই থেকে উপড়ে ফেলা হয়েছে। আশ্চর্যজনকভাবে নেই অ্যাডাম স্মিথের পরই যার নাম উচ্চারিত হয় সেই ডেভিড রিকার্ডো। নাম নেই অস্ট্রিয়ান অর্থনীতির স্কুলের একজন অর্থনীতিবিদেরও—এমনকি নোবেল জয়ী হায়েকেরও। নাম নেই নোবেল জয়ী অমর্ত্য সেন এবং জোসেফ স্টিগলিৎসের। এমন‍‌কি ১৯২৯ থেকে ১৯৩৩ সালের মহামন্দা থেকে যিনি বিশ্ব ধনতন্ত্রকে পরিত্রাণ দিয়েছিলেন সেই কেইন্‌সের নাম মাত্র দু’জায়গায় উল্লেখিত। বেচারা কেইন্‌সের অপরাধ তিনি ধনতন্ত্রের পরিত্রাণ বাতলে ছিলেন রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপের মাধ্যমে।

    কেইনসকে সামগ্রিক অর্থনীতি বা ম্যাক্রোইকনমিক্সের পিতা বলে মেনে নেওয়া হয়, অথচ ম্যানকিউয়ের ম্যাক্রোইকনমিক্স নামক পাঠ্য বইয়ের কেইন্‌সীয় সামগ্রিক অর্থনীতি ও তার প্রয়োগ নিয়ে কোন আ‍‌লোচনা নেই। কারণ, তা হলে নয়া উদারনীতিবাদের বিরুদ্ধে গিয়ে রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপকে সমর্থন করতে হয়। ম্যানকিউ তার বইয়ে নয়া উদারনীতিবাদের পূর্ব পুরুষ অ্যাডাম স্মিথকে সামনে রেখে মন্তব্য করেছেন, বাজার অর্থনীতিতে সবাই স্বার্থপর, কেউ সমাজের উন্নতির কথা ভাবে না, অথচ বাজারের অদৃশ্য হাত তার ভেলকিতে সবাইকে ভাল রাখে। এর বিপরীতে গিয়ে কেইন্‌স দেখিয়েছেন যে সবাই যদি নিজের স্বার্থচিন্তায় সঞ্চয় বাড়িয়ে চলে তাহলে শেষ অবধি তা দেশের সামগ্রিক আয়কেই কমিয়ে দেবে। এরপরও কি বুঝতে অসুবিধা হয় কেন ম্যানকিউ কেইন্‌সকেও বরদাস্ত করতে রাজি নন?

ম্যানকিউকে ক্লাস ওয়াক-আউটকারী ছাত্রছাত্রীদের খোলা চিঠি

    ক্লাস ওয়াক-আউটের সঙ্গে সঙ্গেই ছাত্রছাত্রীরা ম্যানকিউ‍‌কে এক খোলা চিঠি লিখে তাদের এ হেন আচরণের ব্যাখ্যা করেন। প্রথমেই তারা ম্যানকিউয়ের ইকনমিক্স ১০ কোর্সটির বিরুদ্ধে একপেশেমির অভিযোগ এনেছেন। ছাত্রদের অভিযোগ এই একপেশেমি ক্ষতি করছে ‘ছাত্রদের। বিশ্ববিদ্যালয়ের এবং বৃহত্তর সমাজের’। ছাত্ররা জানিয়েছেন তাঁরা অনেক আশা নিয়ে কোর্সটা নিয়েছিলেন যে এটা অর্থনীতির সঙ্গে পরিবেশ বিজ্ঞান, রাষ্ট্রীয় নীতি নির্ধারণ ইত্যাদি বৈচিত্র্যময় বিষয়ের মেলবন্ধন করবে; কিন্তু বাস্তবে তা অর্থশাস্ত্রের এমন এক সঙ্কীর্ণ বিষয়ে সীমাবদ্ধ যেখান থেকে মার্কিন সমাজের বেশিরভাগ সমস্যা আরও ঘনীভূত হয়েছে এবং তা সমাজের অর্থনৈতিক বৈষম্যকে অনেকগুণ বাড়িয়ে দিয়ে এক অব্যবস্থার জন্ম দিয়েছে।

    ছাত্ররা অভিযোগ করেছেন এই কোর্সটির মাধ্যমে অর্থনীতির একটি ঘরানা বাদ দিয়ে অন্যান্য ঘরানার প্রবেশাধিকার পাওয়া যায় না। কেন অ্যাডাম স্মিথের অর্থনৈতিক তত্ত্ব কেইনসীয় তত্ত্বের থেকে অনেক বেশি মৌলিক তার কোনো ব্যাখ্যা কোর্সটিতে নেই। ছাত্ররা দাবি করেছেন হার্ভার্ডের ছাত্ররা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডী পেরিয়ে সম্পদসংস্থান সংস্থাগুলিতে (financial institutions) মুখ্য ভূমিকা পালন করে এবং সারা বিশ্বের রাষ্ট্রীয় নীতি নির্ধারণেও তাদের বিরাট ভূমিকা অনস্বীকার্য। তাই হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় যদি তার নিজেদের ছাত্রদের অর্থশাস্ত্র অনুধাবনে স্পষ্ট ও বিশ্লেষণাত্মক শিক্ষায় শিক্ষিত করতে না পারে তবে সেই ছাত্ররা যখন নীতি নির্ধারণের কাণ্ডারী হবেন তখন তাদের কার্যপদ্ধতি বিশ্ব সম্পদ সংস্থান ব্যবস্থাকে (global financial system) বিপর্যয়ের দিকে নিয়ে যাবে, যা বিগত পাঁচ বছরের বিশ্ব অর্থনীতির তোলপাডে যথেষ্টই প্রমাণিত হয়েছে।

    ছাত্ররা এরপর খোলা চিঠিতে জানিয়েছেন যে, তারা আজই (০২.১১.২০১১) বিশ্বব্যাপী বৃহত্তর ‘দখল’ (occupy) আন্দোলনের অংশরূপে সারা বোস্টনজুড়ে যে উচ্চশিক্ষার কর্পোরেটকরণের বিরুদ্ধে মিছিলের আয়োজন করা হয়েছে তাতে হাঁটতে চলেছেন। চিঠির শেষে এসে ছাত্ররা লিখছেন ‘ইকনমিক্স ১০’ কোর্সের একপেশে ধরন যেহেতু আমেরিকার ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক বৈষম্যের প্রতীক ও অবদানকারী; তাই মৌলিক অর্থনৈতিক তত্ত্বের প্রতি আপনার অপর্যাপ্ত আলোচনার প্রতিবাদে এবং সেই আন্দোলনকে সমর্থন করতে যা অর্থনৈতিক অবিচারের উপর আমেরিকার জন্য সমাজের ধ্যানধারণা বদলে দিয়েছে, আমরা আপনার ক্লাস থেকে আজ বেরিয়ে গেলাম। অধ্যাপক ম্যানকিউ আপনি আমাদের উদ্বেগ ও ক্লাস ত্যাগকে গুরুত্ব দিয়ে বিচার করবেন।

নয়া উদারনীতিবাদকে আঁস্তাকুড়ে নিক্ষেপ এবং ‘দখল করো’ অভিযান

    সবাই জানেন যে, সারা আমেরিকা ও ইউরোপব্যাপী দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়েছে দখল করো অভিযান। (occupy movement) । ছাত্ররা খোলা চিঠিতেই জানিয়েছে যে ম্যানকিউয়ের ক্লাস ওয়াক-আউট সেই দখল করো অভিযানেরই অংশ। দখল করো আন্দোলনের সূচনা মাত্র সেপ্টেম্বর ২০১১ থেকে। আমেরিকাবাসীর বিরাট অংশ মনে করতে শুরু করেছেন যে, তারা সমাজের ৯৯ শতাংশ, অথচ ১ শতাংশ কর্পোরেট কর্তা এবং রাজনীতিবিদরা দে‍শের গরিষ্ঠ সম্পদ এবং রাজনৈতিক ক্ষমতা দখল করে আছে। সুতরাং এবার এসেছে তাদের পালা যখন ৯৯ শতাংশ মানুষ দখল করবে দেশের সম্পদ এবং রাষ্ট্রক্ষমতা। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ার বাজারের কেন্দ্রভূমি যেহেতু নিউ ইয়র্কের ওয়াল স্ট্রিট, তাদের প্রথম স্লোগান ছিলো ‘ওয়াল স্ট্রিট দখল কর’। সেই আন্দোলন দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়েছে সারা বিশ্বে। আওয়াজ উঠেছে ‘লন্ডন দখল করো’, ‘দখল করো প্যারিস’ ইত্যাদি। ক্যালিফোর্নিয়াসহ বহু জায়গায় আন্দোলনরত ছাত্র ও সাধারণ মানুষের উপর নেমে এসেছে সাম্রাজ্যবাদী পুলিসের সন্ত্রাস।

    বাজারী সংবাদপত্রগুলি এরমধ্যে নেতৃত্বহীন নৈরাজ্যের বাইরে কিছুই দেখতে পাচ্ছে না। কিন্তু আমরা এর মধ্যে দেখতে পাচ্ছি বামপন্থার নতুন এক পুনর্জাগরণ। দখল আন্দোলনের কেন্দ্রগুলিতে হু হু করে বিক্রি হচ্ছে মার্কসের ক্যাপিটাল ও অন্যান্য মার্কসীয় সাহিত্যের বই। প্রবীণ বামপন্থী মার্কিন অধ্যাপক হবসবম ইতোমধ্যেই সীতারাম ইয়েচুরিকে দখল আন্দোলনের বিপুল সম্ভাবনা ব্যক্ত করেছেন। আর আমাদের মতো অর্থনীতির অধ্যাপকদের কাছে দখল আন্দোলনের বৃহত্তর মঞ্চ থেকে আহ্বান করা হয়েছে বস্তাপচা নয়া উদারনীতিবাদকে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে কিভাবে নতুনভাবে অর্থনীতির পাঠক্রম বামপন্থী বিশ্লেষণে তৈরি করা যায় তার দিক নির্দেশ করতে। আমরা ইতোমধ্যেই জানিয়েছি যে নয়া উদারনীতিবাদের প্রবল ঝড়ের মুখেও আমাদের দে‍‌শের নির্ভীক অধ্যাপকেরা সঠিক বামপন্থী নির্দেশে অর্থনীতির পঠন-পাঠন ও গবেষণা চালিয়ে গেছেন। যার ফলশ্রুতিতে বিশ্ব অর্থনীতির সঙ্কট বুঝতে রাষ্ট্রসঙ্ঘ বক্তৃতা শুনেছে অধ্যাপক প্রভাত পট্টনায়েকের। সম্প্রতি ইন্টারন্যাশনাল লেবার অর্গানাইজেশন বা আই এল ও ‘ডিসেন্ট ওয়ার্ক রিসার্চ পুরস্কার’ দিয়ে সম্মানিত করেছে অধ্যাপিকা জয়তী ঘোষকে।

    আর তাই সময় এসেছে যখন সমাজবিজ্ঞান পঠন-পাঠন গবেষণার মাধ্যমে সে‍ই মানুষদের রেখে যাওয়া বিরাট জ্ঞানের ভাণ্ডারকে মন্থন করা যারা ১৮৪৮ সালে কমিউনিস্ট পার্টির ইশ্‌তেহারের শেষলাইনে ব্যক্ত করেছিলেন এরকম দখলেরই মন্ত্র :

‘শৃঙ্খল ছাড়া সর্বহারার কোনো কিছুই হারানোর নেই। জয় করার জন্য আছে সমস্ত দুনিয়া।’