Posts Tagged ‘atm’

Politics of Cashless Economy

December 29, 2016

নগদহীন ব্যবস্থার অর্থনীতি

মানব মুখার্জি

২০১৬-র ৮ই নভেম্বরের প্রায় মধ্যরাতের ৫০০ এবং ১০০০ টাকার নোট বাতিল বলে ঘোষণা করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। কেন এই সার্জিক্যাল স্ট্রাইক—এরও কারণ তিনি বলেছিলেন। আর পাঁচজন আর এস এস নেতার মতই তিনি সচরাচর সত্য ভাষণ করেন না। এক্ষেত্রেও করেননি — বললেন ‘পাকিস্তানকে জব্দ করার জন্য এ কাজ করেছেন’। পরে বললেন, ‘সন্ত্রাসবাদীদের আঘাত করতে এই কাজ করেছেন’। বাজারে এখন পাকিস্তান বা সন্ত্রাসবাদ বিরোধিতার কথা ভালো ‘খায়’ তাই প্রথমে এটা। দেশের মানুষ কিন্তু এটা খেলো না। তারপর বললেন কালো টাকা উদ্ধার করার জন্য এটা করেছেন। যেটা কিছুটা হলেও মানুষ খাচ্ছে। কারণ দেশের অর্থনীতিতে কালো টাকা একটা বাস্তব বিষয়। চোখের সামনে বেআইনি বড়লোকী দেখে মানুষ যারপর নাই ক্ষুব্ধ। কিন্তু প্রশাসক হিসাবে তার এবং তার সরকারের অপদার্থতা গোটা বিষয়টাকে চূড়ান্ত জায়গায় নিয়ে গেছে।

নোট বাতিলের সিদ্ধান্ত দেশের ১৩০কোটি মানুষের ওপর একটি অর্থনৈতিক পারমাণবিক বোমার মতো ফেটে পড়েছে। গোটা অর্থনীতি বিপর্যস্ত। স্বাধীন ভারতবর্ষে এতবড় অর্থনৈতিক বিপর্যয় আর কখনও হয়নি। আর ক্ষয়ক্ষতির একটা বড় অংশের মেরামতিও হবে না। সর্বশেষ প্রধানমন্ত্রী তার গোটা সরকার এবং অনুগত কর্পোরেট এবং তাদের মিডিয়া সমস্বরে বলছে আসলে এর মাধ্যমে আমরা নাকি মুদ্রাহীন অর্থনৈতিক (Cashless Economy) ব্যবস্থার দিকে যাচ্ছি। অবশেষে আমরা আধুনিকতার দিকে যাত্রা শুরু করলাম।

এই সমস্ত দাবি-পালটা দাবি, রাজনৈতিক কোলাহল ছেড়ে আমাদের বোঝা দরকার — আসলে নোট বাতিলের মধ্যে দিয়ে কি হলো। সরকার আসলে দেশের সমস্ত মানুষের কাছে যা নগদ টাকা ছিল সেই টাকা তুলে নিল। ব্যাঙ্কেই তা জমা পড়ল, কিন্তু মানুষ চাইলেই সেই গোটা টাকাটা নিজের হাতে ফিরিয়ে নিতে পারছে না। যেহেতু ৫০০ এবং ১০০০ টাকার নোটে দেশের মোট টাকার ৮৬%, কাজেই বলা যায় টাকার সিংহভাগ এখন ব্যাঙ্কের হাতে, মানুষের হাতে না। যে টাকাটা এলো, এর মধ্যে একটা অংশ কালো টাকা, তবে সেটা খুব ছোট অংশ। কারণ টাকাতে কালো টাকা রাখা হয় খুব কম। কালো টাকা জমি-সোনা-বাড়ি এই সব কিছুতে রূপান্তরিত হয়ে থাকে। নানাভাবে কালো টাকা বিদেশে চলে যায়, রূপান্তরিত হয় বিদেশি মুদ্রায় যা আমাদের সরকারের ধরা ছোঁয়ার বাইরে। আবার রূপান্তরিত বিদেশি মুদ্রা বিদেশি বিনিয়োগ হিসাবে দেশে ফিরে আসে। অসংখ্য সংস্থা আছে যারা সরকারের নজর এড়িয়ে কালো টাকাকে সাদা করে দেয় যাকে ইংরেজিতে বলে Money Laundering.

কাজেই কালো টাকা-ঠাকা নয়, এর মধ্য দিয়ে সরকার দেশের সমস্ত জমা নগদ ব্যাঙ্কজাত করে দিল। এখানেই সরকারের শেষ দাবিটিকে প্রাসঙ্গিক মনে হচ্ছে — আমরা মুদ্রাহীন অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় যাওয়ার চেষ্টা করছি।

আসলে মুদ্রাহীন ব্যবস্থার মানে কি? ক্রেতার কাছে কোনো নগদ টাকা থাকবে না। সে কার্ডের (ডেবিট বা ক্রেডিট) মাধ্যমে জিনিস কিনবে। এমনকি ইন্টারনেট সংবলিত একটি মোবাইল ফোন থাকলেই (যেমন পে টি এম) সে জিনিস কিনতে পারবে। নোটের কোনো দরকার থাকবে না। এটা ইতিমধ্যেই আমাদের দেশে আছে। এই যে নগদহীন দেড় মাসে ভারতবর্ষের বড়লোক এমনকি মধ্যবিত্তদের একটা অংশেরও খুব একটা অসুবিধা হয়নি এর জন্য। এ দেড় মাসে বাকি সব কিছুর চাহিদা কমেছে বেড়েছে কেবল কার্ড এবং পে টি এমের। নগদহীন অর্থনীতির মানে পরিমাণটা বাড়ানো।

আমাদের দেশে যত খুচরো লেনদেন হয় তার শতকরা ৯৮% হলো নগদে, আর লেনদেনের টাকার পরিমাণের ৭০% হলো নগদ টাকা। নগদহীন অর্থনীতি মানে এই পরিমাণটাকে দ্রুত কমিয়ে আনতে হবে। এই গোটা কাণ্ডটি ঘটানোর জন্য যে কার্ড দরকার আমাদের দেশের সেই কার্ডের মোট সংখ্যা ৭৫ কোটি। কিন্তু কার্ডের মালিকের সংখ্যা এর ধারে কাছেও না। কারণ কার্ডের মালিকদের অধিকাংশরই একাধিক কার্ড। একাধিক ব্যাঙ্কের এবং ডেবিট এবং ক্রেডিট উভয় ধরনের। (ডেবিট কার্ড হলো ব্যাঙ্কের অ্যাকাউন্টে একজনের যত টাকা থাকে সর্বাধিক প্রায় সেই পরিমাণের টাকা সে কার্ডের মাধ্যমে খরচ করতে পারবে। ক্রেডিট কার্ডে ব্যবহার করা যায় ব্যাঙ্কে এক পয়সাও না থাকলে। একটি সর্বচ্চোসীমা কার্ড কোম্পানি নির্দিষ্ট করে দেয়। এই পরিমাণের টাকা এই কার্ডের মাধ্যমে একজন খরচ করতে পারে এবং নির্দিষ্ট তারিখে প্রতি মাসে সে যত টাকা নিয়েছে সেই টাকা শোধ করতে হয়। শোধ না করলে বিপুল পরিমাণের সুদ দিতে হয়। তবে দু’ধরনের কার্ডেই প্রতি কেনাকাটায় একটি সার্ভিস চার্জ দিতে হয়। বছরে একবার কার্ডটিকে রিনিউ করতে হয় টাকা দিয়ে) আপাতত আমাদের ঘোষিত লক্ষ্য দেশের অধিকাংশ মানুষকে কার্ড সংবলিত করতে হবে।

মোবাইল ফোনের মাধ্যমে চলে পে টি এম। আগেই সেখানে টাকা রাখতে হয় ব্যাঙ্ক থেকে ইন্টারনেটের মাধ্যমে। তারপর মোবাইল ফোন থেকে টাকা দিতে হয়। এছাড়াও একটি আধা নগদহীন ব্যবস্থা আছে, সেটা বেশ চালু পদ্ধতি। আমার পকেটে টাকা থাকবে না, কিন্তু কোনো একটি জিনিস কিনতে গেলে এ টি এম (Automated Teller Machine) কার্ড দিয়ে সেই পরিমাণ টাকা এ টি এম থেকে তুলে নিয়ে কিনে নাও। কিন্তু এর প্রতিটি আম-ভারতীয়র ক্ষমতার বাইরে। আমাদের দেশের মতো বিশাল একটি দেশে এ টি এম-এর সংখ্যা মাত্র ২.৩লক্ষ। কার্ড ব্যবহার করতে হলে বিক্রেতার কাছে নেট সংবলিত একটি টার্মিনাল থাকতে হবে। এরকম যন্ত্র এই মুহূর্তে দেশে আছে মাত্র ১৪ লাখ দোকানে। আর পে টি এম-এর ক্ষেত্রে ক্রেতা এবং বিক্রেতা দু’জনের কাছেই অন্তত ৩জি নেটওয়ার্ক সংবলিত স্মার্টফোন থাকতে হবে।

কবে ১৩০কোটির দেশ নগদহীন হবে? জনসংখ্যার তুলনায় এই ব্যবস্থা আমাদের দেশে খুব দুর্বল, এমনকি পৃথিবীর সবচেয়ে পিছিয়ে থাকা একটি দেশের মধ্যে পড়ি আমরা। আর এর থেকেও বড় পরিকাঠামোগত সমস্যা তো আছেই। দেশের কত অংশে নেটওয়ার্ট আছে? দেশে টেলিফোন ব্যবহার করতে পারে কত মানুষ? ৫১% গ্রামে টেলিফোন নেই। লেখাপড়া জানে না কত জন? প্রায় ৩০কোটি। ইংরেজি পড়তে পারে কত অংশ? ২০%। দারিদ্র্যসীমার নিচে আছে কত অংশের মানুষ? ২৭কোটি। ২৩.৩ কোটি মানুষের কোনো ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টই নেই। এর মধ্যে ৪৩% ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে কোনদিন কোনো লেনদেন হয় না। কার্ড বা এ‍‌ টি এম বা স্মার্টফোনের সংখ্যা যা, তাও প্রধানত শহরাঞ্চলে — বিস্তীর্ণ গ্রাম প্রায় মরুভূমি। তবে কি করে আমরা নগদহীন হব?

একটি নগদহীন অর্থনীতি করা যায় বা করার প্রয়োজন এরকম কথা দু’দিন আগেও দেশের সাধারণ মানুষ ভাবেনি। এগুলো আমরা নতুন শুনছি। আমরা জানছি সুইডেনই নাকি পৃথিবীতে প্রথম নগদহীন দেশ হবে। আমরাও খোঁজ নেবার চেষ্টা করছি — কি করে সুইডেন এরকম হলো? এবং বুঝবার চেষ্টা করছি আমরা কি করে সুইডেন হব? সুইডেন মাথা পিছু আয়ে পৃথিবীর সব চেয়ে বড়লোক একটি দেশের মধ্যে পড়ে। মানব উন্নয়ন সূচকেও সুইডেন প্রথম সারিতে। সুইডেনের সরকার ঘোষণা করেই নগদহীন অর্থনীতির দিকে এগোচ্ছে। অবশ্য এর মানে এই না যে সুইডেনে নগদ টাকার কোনো ব্যবহার নেই। সুইডেনের ৫৯% বেচাকেনা হয় নগদ ছাড়া। এ প্রশ্নে সর্বোচ্চ জায়গায় আছে সিঙ্গাপুর ৬১%। আমাদের দেশে এটা মাত্র ২%। কিন্তু এ বিষয়ে পরিষ্কার ধারণা থাকা ভালো এটা প্রধানত খুচরো বিক্রি। দেশের বড় ব্যবসা বাণিজ্যের একটা বড় অংশ চিরকালই নগদহীন। টাটা স্টিল যখন ইন্ডিয়ান অয়েল থেকে জ্বালানি কেনে বা আম্বানিরা রেলের মাধ্যমে মাল পাঠালে নগদে রেলকে ভাড়া দি‍‌তে হয় না। সেটা সরাসরি ব্যাঙ্কের মাধ্যমে হয়। যত সমস্যা সাধারণ ক্রেতার। গোটা পৃথিবীতেই এটা নিয়ম।

সরকার বলছে বলেই সুইডেনে সবাই নগদহীন পথে যাচ্ছে তা না। যদি টেকনোলজি জানা থাকে তবে এটি খুবই সুবিধার। কোন টাকা পয়সা সঙ্গে রাখার দরকার নেই, চুরি ছিনতাই, পকেটমারের দুশ্চিন্তা নেই। এখনও সুইডেনে নগদ চলে দূরবর্তী গ্রামীণ অঞ্চলে এবং বয়স্ক যারা নতুন টেকনোলজি ব্যবহার করতে পারে না তারা নগদ ব্যবহার করে। এটাও কমে আসছে। সুইডেনের ব্যাঙ্কগুলো তাদের এ টি এম-গুলো বন্ধ করে দিচ্ছে। সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রতিষ্ঠান এখন নগদ নেয় না।

কিন্তু এখানেই শেষ না। উন্নত পুঁজিবাদী অর্থনীতিতে ব্যাঙ্কে সুদের হার চিরকালই খুব কম। এখন সেই সুদের হারকে ঋণাত্মক জায়গায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে। অর্থাৎ তুমি ব্যাঙ্কে টাকা রাখলে তোমাকে ব্যাঙ্ক কোনো সুদ দেবে না। বরং তোমার টাকা রে‍‌খেছে বলে ব্যাঙ্ক ‍‌তোমার টাকা কাটবে। তোমার জমা রাখা টাকা প্রতি বছরে কমবে। এই ঘটনা প্রধানত ঘটছে উন্নত পুঁজিবাদী দেশে বিশেষত পশ্চিম ইউরোপে। এবং দেখা যাচ্ছে যে, যত Cash Less তত তার সুদের হার কম। এই বছরের আগস্ট মাসের হিসাব অনুযায়ী ঋণাত্মক সুদের হার — ডেনমার্ক -০.৬৫%, জাপান, -০.১০%, সুইজারল্যান্ড -০.৭৪%, সুইডেন -০.৫০%। যে সমস্ত দেশে নগদহীন অর্থনীতির প্রসার বেশি হয়েছে সেখানে ব্যাঙ্কের সুদ কমতে কমতে ঋণাত্মক জায়গায় গিয়ে পৌঁচেছে, দু’টি সম্পর্কযুক্ত। সুদের হার কম মানে বিনিয়োগের জন্য অঢেল টাকা খুব কম সুদে পাওয়া যায়

এখন সুইডেনে বা নগদহীন অর্থনীতির যে কোনো নাগরিকের সামনে কি কি পথ খোলা রইল। তার অর্জিত অর্থ নগদে সে ঘরে রাখতে পারবে না, কারণ সেই নগদ টাকায় সে কোনো কিছু কিনতে পারবে না, কারণ নগদে কেউ কিছু বিক্রি করবে না। একটাই পথ গোটা টাকাটা তাকে ব্যাঙ্কে রাখতে হবে। কিন্তু ব্যাঙ্কে রাখলে ঋণাত্মক সুদের কারণে তোমার টাকার একটা অংশ ব্যাঙ্ক কেটে নেবে, তোমার সঞ্চয়ের পরিমাণের ক্রমাগত ক্ষয় হবে। অন্য পথ হলো সঞ্চয়ের টাকা নগদহীন ভাবে খরচ কর। যদি ব্যাঙ্কে টাকা রেখে দাও তবে সে টাকা নামমাত্র সুদে বিনিয়োগকারীর হাতে পৌঁছবে। আর যদি জিনিস কিনে সেই টাকা খরচ করো তাহলেও তোমার টাকার একটি অংশ মুনাফা হিসাবে মালিকের হাতে পৌঁছবে। অর্থাৎ তুমি যাই করো লাভ মালিকদের, তোমার নয় — অথচ টাকার মালিক তুমি।

আধুনিক পৃথিবীতে যে কোনো মানুষের সবচেয়ে মৌলিক যে অর্থনৈতিক অধিকার আছে তা হলো নিজের পরিশ্রমের মাধ্যমে আয় করার অধিকার। এই আয়ের একটি ছোটো অংশ রাষ্ট্রকে কর হিসাবে দিয়ে বাকি টাকাটার মালিক তুমি। তুমি ঠিক করবে সেই টাকা দিয়ে তুমি কি করবে।

সেই টাকা নিয়ে বাজারে গিয়ে তুমি ক্রেতা ঠিক করবে। কি কিনবে তা ঠিক করবে। তোমাকে এই অধিকার দেয় রাষ্ট্র। এক টুকরো কাগজে রাষ্ট্রের হয়ে রিজার্ভ ব্যাঙ্ক লিখে দেয় এই কাগজ যার হাতে সে এই টাকার মালিক। সেই পরিমাণটিও কাগজে ছাপা থাকে। এই হলো নগদ টাকা। এই গোটা প্রক্রিয়ায় সে স্বাধীন এবং নোটের বিনিময়ে পণ্য বিক্রি করবে যে বিক্রেতা সেও স্বাধীন। দুই স্বাধীন নাগরিকের মধ্যে কোনো তৃতীয় ব্যক্তি থাকবে না। নগদহীন অর্থনীতিতে এই মৌলিক অর্থনৈতিক স্বাধীনতার অবসান। এক, তুমি তোমার টাকা নিয়ে কি করবে সেটা পুরোপুরি তুমি ঠিক করবে না। সেটা ঠিক করবে সরকার অথবা সরকারের হয়ে ব্যাঙ্ক, সে ব্যাঙ্ক রাষ্ট্রায়ত্ত হতে পারে, বেসরকারিও হতে পারে, দেশি ব্যাঙ্ক পারে, বিদেশি ব্যাঙ্কও হতে পারে।

ক্রেতা এবং বিক্রেতার মধ্যেকার স্বাধীন দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কেরও কোনো অস্তিত্ব নগদহীন ব্যবস্থায় থাকবে না। তুমি বিক্রেতাকে সরাসরি জিনিসের দাম দিতে পারবে না। তোমার হয়ে তৃতীয় পক্ষ দাম দেবে। সে তৃতীয় পক্ষ হতে পারে ব্যাঙ্ক হতে পারে যে কোম্পানির কার্ড তুমি ব্যবহার করছ সেই কোম্পানি। তুমি বিক্রেতাও সব সময় স্বাধীনভাবে ঠিক করতে পারবে না। বিজ্ঞাপন দিয়ে ডিসকাউন্ট দিয়ে কার্ডের কোম্পানি তোমাকে প্রভাবিত করবে বিশেষ কোম্পানির জিনিস কিনতে। এমনকি চরম ক্ষেত্রে কোনো বিশেষ বিক্রেতাকে টাকা দিতে অস্বীকার করতে পারে সে। তুমি কোনো একটি সংগঠন, বা রাজনৈতিক দলকে টাকা দিতে চাও। কার্ডের কোম্পানি সরকারি বির্দেশ উল্লেখ করে সেই টাকা দিতে অস্বীকার করতে পারে। পৃথিবী জোড়া কার্ডের ব্যবসাকে নিয়ন্ত্রণ করে দু’টি মার্কিন কোম্পানি — ভিসা এবং মাস্টারকার্ড। এদের ক্ষমতা বোঝাবার জন্য ভিসার উদাহরণ দেওয়া যায়। ২০১৫ সালে গোটা পৃথিবীর ১লক্ষ কোটি লেনদেন হয়েছে ভিসার মাধ্যমে। এতে লেনদেন হয়েছে ৬.৮ ট্রিলিয়ন ডলার। পৃথিবীর ২৫০০০ ব্যাঙ্কের হয়ে ভিসা কাজ করে। এরা সিদ্ধান্ত ক’রে উইকিলিক্সের ‍‌(যারা সমস্ত গোপন ইলেকট্রনিক বার্তা ফাঁস করে সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলোকে বেআব্রু করে দিয়েছে।) টাকা দেওয়া বন্ধ করে দিয়েছে। একইভাবে কয়েকটি বিশেষ রাশিয়ান ব্যাঙ্কের আন্তর্জাতিক লেনদেন বন্ধ করে দিয়েছে এরা। এবং এই তথাকথিত ‘তৃতীয় পক্ষ’ মাগনায় কোনো কাজ করে না। নগদ ভিত্তিক অর্থনীতিতে ক্রেতা নগদে দাম দেয়, বিক্রেতা তার মাল দেয়। এর মধ্যে আর কোনো টাকা পয়সার লেনদেন থাকে না। কিন্তু নগদহীন ব্যবস্থায় এই তথাকথিত ‘তৃতীয় পক্ষ’ প্রতিটি লেনদেন থেকে টাকা পায়, ক্রেতা এবং বিক্রেতা উভয়ের কাছ থেকে। এবং এই টাকা তারা দিতে বাধ্য।

আজ গোটা দুনিয়া জুড়ে নগদহীন অর্থনীতির দাবিতে সমস্বরে কোলাহল করা হচ্ছে। তাতে গলা মিলিয়েছে রাজনৈতিক নেতা, বড় বড় কোম্পানি, নিজের ভালো-মন্দ না বোঝা কিছু মূর্খ মানুষ। কিন্তু সবচেয়ে সজোরে চেঁচাচ্ছে এই ‘তৃতীয় পক্ষ’ কোম্পানিগুলো। নগদ ১০টাকা দিয়ে কেউ যদি এক কিলো আলুও কেনে তাহলে এই তৃতীয় পক্ষরা মনে করে তাদের সুযোগ হাতছাড়া হয়ে গেল।

পৃথিবীতে ২০০৮ থেকে লাগাতার সংকট চলছে — নতুন বিনিয়োগ নেই, বাজারে স্থায়ী মন্দা, কর্মসংস্থান তলানিতে। তথাকথিত নগদহীন অর্থনীতি এবং সুদের হার শূন্যের কাছাকাছি নামিয়ে চেষ্টা চলছে মানুষের কষ্টার্জিত সম্পদকে ব্যবহার করে বাজার চাঙ্গা করতে, নতুন বিনিয়োগ ব্যবস্থা করতে। এবং এই প্রক্রিয়াটাই এক কথায় একটি নিকৃষ্ট রাহাজানিতে পরিণত হয়েছে।

এই রাহাজানির তালিকায় আমাদের দেশ থাকবে না, এ হয় না। নোট বাতিলের সিদ্ধান্তের প্রাথমিক কারণও একটি বিশুদ্ধ রাহাজানি। বেসরকারিকরণের ঢাক গত ২৫বছর ধরে বাজানো হচ্ছে, কিন্তু তা সত্ত্বেও দেশের ব্যাঙ্কিং ব্যবস্থাকে এখনও নিয়ন্ত্রণ করে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কগুলো। দেশের মোট আমানতের ৭২%-ই আছে ১৯টি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কের কাছে। মোদীর ‘আচ্ছে দিনের’ ছোঁয়া এই ব্যাঙ্কের গায়েও লেগেছে। ২০১৪-১৫ সালে এই ব্যাঙ্কগুলোর সম্মিলিত লাভের পরিমাণ ছিল ৩৬হাজার কোটি টাকা। আর এ বছরে লাভ উলটে ক্ষতি হয়েছে প্রায় ১৮হাজার কোটি টাকা। এটা যে কোনো ব্যাঙ্কের ক্ষেত্রে একটি অশনি সংকেত। বিপদটা সরকারও বুঝেছিল।

কিন্তু রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কের এই দুরবস্থার একটিই কারণ — তারা যে টাকা ধার দিয়েছিল তার একটা বড় অংশ তারা ফেরত পায়নি। এই পরিমাণটা আঁতকে ওঠার মতো, প্রায় ১১লক্ষ কোটি টাকা। এবং এটা প্রধানত হয়েছে দেশের অর্থনীতির মাতব্বররা তাদের ধারের টাকা ফেরত দেয়নি বলে। এই বকেয়ার তালিকায় শীর্ষস্থানে আছে অনিল আম্বানি। প্রধানমন্ত্রীর অনুজতুল্য গৌতম আদানীর বকেয়ার পরিমাণও বিপুল। মার্কিনী পরামর্শদাতারা ম্যাকিনসে সরকারকে সাবধান করে যদি অবিলম্বে সরকার যথেষ্ট পরিমাণ মূলধন এই ব্যাঙ্কগুলোতে বিনিয়োগ না করে তবে দেশে গোটা ব্যাঙ্ক ব্যবস্থাটা ভেঙ্গে পড়বে। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কের কাছেই জমা আছে দেশের ৭২% টাকা। সরকার নীতিগতভাবে এই প্রস্তাব মেনে নেয়। কিন্তু ‘আচ্ছে দিন’-র ঠেলায় সরকারেরও ‘ভাঁড়ে মা ভবানী’। এই টাকা সরকার দিতে পারেনি। নোট বাতিল করে মানুষের ওপর এই বোঝা চাপিয়ে দিয়েছে সাধারণ মানুষের ওপর। আমার আপনার মেয়ের বিয়ের জন্য জমানো টাকা, মায়ের চিকিৎসার জন্য সামান্য সংস্থান — এই সব নিয়ে আমরা ব্যাঙ্কের লাইনে দাঁড়াতে বাধ্য হলাম, কারণ আম্বানি, আদানী বিজয় মালিয়ারা ফুর্তি করে টাকা উড়িয়েছে, ব্যাঙ্কের ধার শোধ করেনি। এদের কিছু হবে না কিন্তু আমার আপনার পকেট থেকে ১৪.৫০ লক্ষ কোটি টাকা সরকার তুলে নিয়ে চলে গেল এ ক’দিনে ব্যাঙ্ক বাঁচাতে। অথচ আমরা কোনো অপরাধ করিনি।

এটা গেল প্রাথমিক কারণ — কিন্তু চূড়ান্ত লক্ষ্য ‘নগদহীন অর্থনীতি’। দেশের বর্তমান অবস্থায় এটা অসম্ভব এটা কেবল আমি, আপনি জানি তাই নয়, নরেন্দ্র মোদীও জানেন। যে দেশের ৩৫কোটি মানুষের দৈনিক আয় ৪০টাকারও কম, যে দেশের সিংহভাগ গরিব মনুষ দৈনিক আয়ের ওপর নির্ভরশীল সে দেশে নগদহীন অর্থনীতি আসতে শতাব্দী পার হয়ে যাবে। তাহলে? যেটুকু আছে তাই বা কম কিসের? National Council of Applied Economics Research (NCAER)-এর দেওয়া হিসাব অনুযায়ী দেশে মধ্যবিত্তের সংখ্যা ২৬.৭ কোটি আর দশ বছর পরে এই সংখ্যা দাঁড়াবে ৫৪.৭ কোটি। মধ্যবিত্ত মানে যার যথেষ্ট ক্রয়ক্ষমতা আছে, উল্লেখযোগ্য পরিমাণে সঞ্চয় আছে — এটি একটি বিশাল বাজার। সংখ্যার দিক থেকে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় অর্থনীতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জনসংখ্যার সমান। দেশের সবচেয়ে গরিব যে অংশ, প্রায় কাছাকাছি। দেশের অর্থনীতি যাদের ভূমিকা ন্যূনতম — তাদের গোল্লায় পাঠিয়েও যা পড়ে থাকে তাকে যদি নগদহীন ব্যবস্থার ছাঁচের সঙ্গে এনে ফেলা যায় তাহলেই হলো — দেশ লুণ্ঠনের সোনার খনি হয়ে যাবে। যত সঞ্চয় কমবে সেই অনুপাতে বাজার বাড়বে, বিনিয়োগ বাড়বে, মুনাফা বাড়বে। আমাদের দেশে বর্তমানে বিনিয়োগ প্রায় নেই। কর্মসংস্থান বন্ধ। দেশের সাধারণ মানুষের জন্য এদের কিছু যায় আসে না, কিন্তু কর্পোরেটের মুনাফাতেও তো টান পড়বে। গরিব ছিলই, এখন এই মধ্যবিত্তের মাথায় নগদহীন কাঁঠালটি ভাঙলে বড়লোকদের ‘আচ্ছে দিন’ আসবেই আসবে।

এবং এতে এক ঢিলে দুই পাখি মরবে। দেশের ব্যাঙ্কিং ব্যবস্থাটাও ধীরে ধীরে প্রাইভেট এবং বিদেশি ব্যাঙ্কের হাতে তুলে দেওয়া যাবে। ব্যাঙ্কের সাধারণ আমানত প্রধানত আসে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কে। কিন্তু নগদহীন ব্যবস্থার গোটাটা ছুটবে ইলেকট্রনিক বিনিময়ের দিকে। যেমন আমাদের দেশে বর্তমানে কার্ডের মাধ্যমে যে লেনদেন হয় তার ৫৪% হয় প্রাইভেট ব্যাঙ্কের মাধ্যমে, ২২% হয় বিদেশি ব্যাঙ্কের মাধ্যমে। আর বাকি ২৬% লেনদেনও পুরোপুরি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কের মাধ্যমে হয় না, অল্প হলেও কিছু সমবায় ব্যাঙ্কও দেশে কার্ড ব্যবসায় ঢুকেছে, তাদেরও একটা ভাগ থাকবে। Cash Less ব্যবস্থা আসলে ধাপে ধাপে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্ক — less ব্যবস্থায় পরিণত হবে। আম্বানি, আদানী, বিজয় মালিয়াদের একটু অসুবিধা হবে। কারণ রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কের টাকা তারা যেভাবে লুট করতে পারে প্রাইভেট ব্যাঙ্কের থেকে সেটা করা যাবে না। এতে দুঃখ করে কোনো লাভ নেই। পাকা আমের যতটা রস ছিল সব তারা খেয়েছে — এখন আঁটি নামক রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্ক ছুঁড়ে ফেলতে হবে। আর এস এস-প্রণীত দেশপ্রেমের গানে জয় ভারত, জয় মোদীর সাথে জয় ভিসা, জয় মাস্টারকার্ড এটাও যুক্ত হবে। আমরা সত্যি সত্যিই আধুনিক হব।


   সৌজন্যেঃ গণশক্তি

Advertisements

Cashless Economy of Chikalthana

November 25, 2016

চিকলথানার ক্যাশলেস ইকনমি

পি সাইনাথ

1111

নোট বাতিলে মহারাষ্ট্র জুড়ে বিপর্যস্ত কৃষক, ভূমিহীন খেতমজুর, পেনশনভোগী, ছোট ব্যবসাদার ও আরো আরো অনেকে। মোদীর ‘মাস্টার স্ট্রোকে’ তাঁদের সেই জীবনযন্ত্রণাই তুলে ধরলেন স্বনামধন্য সাংবাদিক পি সাইনাথ

এখানে এলে মনে হতেই পারে প্রধানমন্ত্রী মোদীর ক্যাশলেস ইকনমির খোয়াব বাস্তবায়িত হয়েছে। মহারাষ্ট্রের ঔরঙ্গাবাদ শহরের একেবারে গা ঘেঁষে থাকা এই চিকলথানা গ্রামে সেই স্বপ্ন ঘোর বাস্তব। এখানে কারও হাতে কোনো নগদ টাকা নেই। ব্যাঙ্ক ও, এটিএম-এও নেই। তাই সেগুলির আশপাশে একবুক হতাশা নিয়ে মানুষের আনাগোনা, লাইন কোনোটাই নেই। এমনকি ব্যাঙ্কের শাখার বাইরে ভ্যানে বসা কোনো পুলিশকর্মীকে ওই চৌহদ্দিতেই নজরে পড়বে না।তবে চিন্তার কিছু নেই। খুবই শীঘ্রই ওই গ্রামের মানুষও তাঁদের আঙ্গুলে কালির দাগ দেখতে পাবেন।

চলুন ঘুরে আসা যাক দুর্গ শহর ঔরঙ্গাবাদের ভেতর থেকে। স্টেট ব্যাঙ্ক অব হায়দরাবাদের শাহগঞ্জ শাখায় ঢুকলেই নজরে পড়বে মরিয়া ব্যাঙ্ককর্মীরা তাঁদের গরিব ক্লায়েন্টদের সাহায্য করার জন্য ‘সংগ্রামরত’। সেখানে কেন, শহরের অন্য শাখা, প্রত্যেকটি শাখায় এখন ছেঁড়া-ফাটা ৫০, ১০০টাকার নোট ঝাড়াই-বাছাই চলছে। চূড়ান্তভাবে নষ্ট করে ফেলার জন্য এগুলির সবকটিই রিজার্ভ ব্যাঙ্কে পাঠানোর কথা। উপায় না দেখে এখন সেই বাতিল নোটই আবার নতুন করে বিলি করার ব্যবস্থা হচ্ছে। রিজার্ভ ব্যাঙ্কও বিষয়টা ভালোই জানে, কিন্তু নীরবতা দিয়েই ব্যাপারটা উপেক্ষা করে চলেছে।

‘‘আমাদের আর কীই বা উপায় আছে?’’ জানতে চাইছেন এই সমস্ত ব্যাঙ্কের কর্মীরা। ‘‘লোকের তো এখন ছোট নোট দরকার। ওদের সমস্ত কাজকর্ম, লেনদেন বন্ধ হয়ে রয়েছে।’’ ব্যাঙ্ককর্মীদের সঙ্গে কথার মাঝেই সেখানে এসে হাজির জাভেদ হায়াত খান। ঠেলাওয়ালা, বাড়ি বাড়ি জিনিস ফেরি করে পেট চলে। রবিবার ব্যাঙ্কের বাইরে প্রায় এক কিলোমিটার লাইন পেরিয়ে যখন ব্যাঙ্কের দোড়গোড়ায় পৌঁছালেন, তাঁর হাতে ধরা মেয়ে রশিদা খাতুনের বিয়ের কার্ড।

‘‘সবমিলিয়ে আমার অ্যাকাউন্টে ২৭হাজার টাকা রয়েছে।’’ বলছিলেন, ‘‘তিন সপ্তাহ পরে মেয়ের বিয়ে, আর আমাকে বলা হচ্ছে মেয়ের বিয়ের জন্য মাত্র দশ হাজার টাকা তোলা যাবে। আমিই আমার টাকা তুলতে পারবো না।’’ আগের দিন দশহাজার টাকা তুলে নিয়ে যাওয়ায় ব্যাঙ্ক তাঁকে ফেরত পাঠাচ্ছে। যদিও আজও তাঁর ওই একই টাকা তোলার এক্তিয়ার রয়েছে। কারণ ব্যাঙ্ককর্মীদের আন্দাজ, যেভাবে ব্যাঙ্কের চারপাশে সর্পিল লাইন বেড়ে চলেছে তার জন্য তাদের হাতে থাকা টাকা যথেষ্ট নয়। আর তাঁরা চাইছেন এই লাইনগুলির প্রত্যেকে যেন কিছু না কিছু টাকা পান। এঁদেরই দুজন এখন জাভেদকে সাহায্য করতে চান। তাঁরাই জানালেন, মেয়ের বিয়ের জন্য ফিক্সড ডিপোজিট ভাঙিয়ে ওই টাকা তাঁর অ্যাকাউন্টে এসেছে।

বহু নিবন্ধকার, বিশ্লেষক আর সরকারি রিপোর্ট এরই মধ্যে তুলে ধরেছে, ভারতের ‘কালো’ অর্থনীতির বড় অংশটাই রয়েছে সোনা-রুপোর বাজার, বেনামী জমির কারবার ও বৈদেশিক মূদ্রার কবলে। পুরানো কাঠের সিন্দুকে ঠাকুমার জমিয়ে রাখা নোটের গাদায় নয়। ভারত ও বিদেশের কালো টাকা মোকাবিলায় পদক্ষেপ সম্পর্কে ২০১২সালের একটি রিপোর্টে এই কথাটাই বলেছিলেন সেন্ট্রাল বোর্ড অব ডাইরেক্ট ট্যাক্সের চেয়ারম্যান। ১৯৪৬ ও ১৯৭৮-এ অতীতের দু-দুবার টাকা বাতিলের ‘শোচনীয়ভাবে ব্যর্থতার’ কথাও ওই রিপোর্টে তুলে ধরা হয়েছিল (পৃষ্ঠা ১৪, পার্ট টু, ৯.১)। তা সত্ত্বেও সেই একই কাজের পুনরাবৃত্তি করলো বিজেপি সরকার। এমন একটা অবিশ্বাস্য নির্বুদ্ধিতার কাজকে বাহবা দিতে হরেক কিসিমের অ্যাঙ্কর আর টেলিভিশন ভাঁড়রা ‘মোদীর মাস্টারস্ট্রোক’ বলে গলা ফাটাচ্ছে, তা আসলে গ্রাম ভারত জুড়ে মর্ম বেদনা আর দুর্গতিই ছড়াচ্ছে। এতে যদি কারও ‘স্ট্রোক’ হয়ে থাকে তা হলো ওই গ্রামীণ অর্থনীতির হৃদয়েই।

আর সেই স্ট্রোকের ধাক্কা থেকে সেরে উঠতে কতটা সময় লাগতে পারে তা প্রথমেই গুলিয়ে দিলেন কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী ও তাঁর দলীয় সহকর্মীরা, ২-৩দিনের অস্বস্তি বলে। ড. জেটলি আবার পরে তা শুধরে নিয়ে বললেন ২-৩সপ্তাহ। ঠিক তারপরই তাঁর সিনিয়র সার্জেন, নরেন্দ্র মোদী, বললেন যে রোগীর স্বাস্থ্যের পুনরুদ্ধারে তাঁর ৫০দিন সময় চাই। তাহলে ২০১৭-তেও চলবে আমাদের এই চিকিৎসা পর্ব। আমরা জানি না এর মধ্যে দেশজুড়ে আরো কত মানুষ লাইন দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে করতে মরে যাবেন, তবে প্রতিদিন তাঁদের সংখ্যা বাড়বে।

‘‘নাসিকের লাসালগাঁওতে, কিষানরা নগদ সংকটে পেঁয়াজ বাজারই বন্ধ করে দিয়েছে’’, খবর দিলেন আধুনিক কিষান সাপ্তাহিকীর সম্পাদক নিশিকান্ত ভালেরাও। ‘‘বিদর্ভ আর মারাঠাওয়াড়ায় তুলোর দাম প্রতি কুইন্টালে ৪০শতাংশ পড়ে গেছে।’’ সামান্য কিছু লেনদেন ছাড়া বিক্রিবাটা বন্ধ হয়ে রয়েছে। ‘‘কারও হাতে কোনো ক্যাশ নেই। কমিশন এজেন্ট, পণ্য উৎপাদন, ক্রেতা সকলেই সমানভাবে সমস্যার মধ্যে রয়েছেন,’’ জানালেন দ্য টেলিগ্রাফের নাগপুরের সাংবাদিক জয়দীপ হারদিকার। ‘‘গ্রামীণ ব্যাঙ্কগুলিতে চেক জমা দেওয়া সবসময়েই একটা ক্লান্তিকর ব্যাপার ছিল আর এখন টাকা তোলা হলো একটা দুঃস্বপ্ন।’’

তাই, খুব কম কৃষকই চেক নেবে। কিন্তু কবে যে এগুলি দিয়ে টাকা তোলা যাবে তার অপেক্ষায় থাকলে ওদের সংসার চলবে কী করে? অনেকেরই আবার চালু কোনো ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টই নেই।

এই রাজ্যের একটা গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কের সারা দেশে ৯৭৫টা এ টি এম রয়েছে। তার মধ্যে ৫৪৯টা হতাশা ছাড়া আর কিছুই পরিবেশন করছে না। ওই অচল এ টি এম-গুলির বেশিরভাগই গ্রামীণ এলাকায়। এর প্রভাবের একটা ছেঁদো যুক্তি খাড়া করা হয়, ‘‘গ্রামীণ এলাকা ধারের উপরেই চলে। নগদের এখানে কোনো মানেই নেই।’’ সত্যিই? এটাই এখানে সবকিছু।

একেবারে নিচের স্তরে লেনদেনের সিংহভাগটাই চলে নগদে। এক সপ্তাহের মধ্যে ছোট নোট না পৌঁছালে আইন-শৃঙ্খলার সমস্যার ভয় পাচ্ছেন ছোট গ্রামীণ শাখার ব্যাঙ্ককর্মীরা। অন্যরা বলছেন, সংকট তো এর মধ্যেই রয়েছে। এই সময়ের মধ্যে কিছু নগদ এলেও তা কিছুই কমবে না।

ঔরঙ্গাবাদে আরেকটা লাইনের সামনে দাঁড়িয়ে ভয়ে সিঁটিয়ে পারভেজ পাঠান। এক কনস্ট্রাকশন সাইটের সুপারভাইজার। ভয় পাচ্ছেন কখন তাঁর সাইটের শ্রমিকরা খেপে গিয়ে তাঁকে মারতে আসেন। ‘‘ওরা তো ওদের কাজ করেছে, ওদের তো পয়সা দিতে হবে।’’ বলছিলেন, ‘‘কিন্তু আমার হাতে কোনো নগদ টাকা নেই।’’ চিকলথানা গ্রামে, রাইস আখতার খান বলছিলেন, তিনি আর তাঁর মতোই কমবয়সি অন্য মায়েদের এখন ছেলেমেয়ের জন্য খাবার জোগাড়ই দায় হয়েছে। কখনই বা তাঁরা করবেন এসব। ‘‘কারণ দিনের বেশিরভাগটাই তো চলে যাচ্ছে লাইন দিতে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা চলে যাচ্ছে, ছেলেমেয়েগুলো অভুক্ত থেকে যাচ্ছে।’’

লাইনে দাঁড়ানো বেশিরভাগ মহিলাই বলছেন, তাঁদের হাতে ২-৪দিনের সুযোগ আছে। খুব কষ্ট করেও তাঁরা এমনটা ভাবতে পারছেন না, তার মধ্যে ক্যাশ ফ্লো’র সমস্যা মিটে যাবে। হায়! সমস্যা মেটার নয়।

কৃষক, ভূমিহীন খেতমজুর, গৃহপরিচারক, পেনশনভোগী, ছোটখাটো ব্যবসাদার, আরও অনেকে- সকলেই ভয়ানক আঘাতের মুখে। এমন অনেকেই রয়েছেন যাঁরা শ্রমিকদের কাজে লাগাতে গিয়ে ধারের খাতায় চলে যাবেন, মজুরি মেটাতে টাকা ধার করতে হচ্ছে। আবার অন্যদের মতো তাঁদের খাবার কিনতে পয়সা জোগাড় করতে হচ্ছে। ঔরঙ্গাবাদ স্টেশন রোডে স্টেট ব্যাঙ্ক অব হায়দরাবাদের শাখার এক কর্মী জানালেন, ‘‘যত দিন যাচ্ছে, আমাদের লাইন বেড়েই চলেছে, কমার নাম নেই।’’ হাতে গোনা এই সামান্য কর্মী নিয়ে এই বিপুল পরিমাণ লোক সামাল দেওয়া মুখের কথা। আরেক কর্মী আবার তুলে ধরলেন সফটওয়ারের ত্রুটির কথা, যা পরিচিতিপত্র ও অন্যান্য কাগজপত্র যাচাইয়ের জন্য পাঠানো হয়েছে।

লোককে দুটো ২০০০টাকা নোটের জন্য সর্বোচ্চ আটটা ৫০০ কিংবা চারটি ১০০০টাকা নোট বদলের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। এটা এককালীন লেনদেন। ‘‘হ্যাঁ, পরদিনই যদি আপনি আবার চেষ্টা করেন তাহলে আপনার ধরা পড়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু আপনি এই ফাঁদ এড়িয়ে যেতে পারেন। কিছুই না, কেবল একটা অন্য আইডি ব্যবহার করুন। আজ যদি আপনি আধার কার্ড ব্যবহার করেন, কাল তাহলে আপনার পাসপোর্ট নিয়ে আসুন, তার পরদিন আনুন প্যান কার্ড, ধরা না পড়েই আপনি বারে বারে টাকা বদলে যেতে পারবেন।’’

এখন, বাস্তবে যদিও কম লোকই এমনটা করছেন। বেশিরভাগই সিস্টেমের এই ত্রুটির কথাটা জানেই না। কিন্তু সরকারের প্রতিক্রিয়া উন্মাদের মতো। ওরা এখন লোকের হাতে ভোটের কালি লাগানোর কথা ঠিক করেছে। কালি লাগানো হবে ডানহাতে যাতে যেখানে যেখানে উপনির্বাচন রয়েছে সেখানে কোনো সমস্যা না হয়।

স্টেশন রোডের লাইনে দাঁড়ানো ছোট ঠিকাদার আর পাতিল বললেন, ‘‘সরকারের অর্ডার নিয়ে কখনো ভাববেন না।’’ ‘‘বাস্তবে কোথাও কোনো হসপিটাল বা ওষুধের দোকানে ৫০০ বা ১০০০-এর নোট নিচ্ছেই না।’’ পাতিলের পাশে দাঁড়ানো সঈদ মোদক বলে উঠলেন। পেশায় কাঠের মিস্ত্রি সঈদকে গুরুতর অসুস্থ এক নিকটাত্মীয়কে নিয়ে ক্লিনিকে ক্লিনিকে ঘুরতে হয়েছে। ‘‘প্রত্যেক জায়গা থেকে আমাদের ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে।’’ বলছিলেন, ‘‘হয় তারা ২০০০টাকার নোট নেবে না, নয়তো বলেছে, খুচরো নেই।’’

এরই মধ্যে গোটা ভারতের চোখ এখন নাসিকের উপর, সেখান থেকে নতুন ছাপা নোট বেরিয়ে আসবে। গ্রামাঞ্চলের কেউই এখনও তা হাতে পাননি। তবে সকলেরই আশা  তা ঘটবে।


   Courtesy: Ganashakti