Posts Tagged ‘bangla gaan’

Unforgettable Sudhirlal Chakraborty

May 11, 2017

অবিস্মরণীয় সুধীরলাল

সুরেন মুখোপাধ্যায়

কালের অনিবার্য নিয়মেই শতবর্ষে উপনীত হলেন শিল্পী ও সুরকার সুধীরলাল চক্রবর্তী। সুধীরলালের গান বাংলা কাব্যসংগীতের ইতিহাসে একটি স্বতন্ত্র ধারা। শতবর্ষের দূরত্ব থেকে আজ মনে হয় সুধীরলালের সংক্ষিপ্ত জীবনের গায়ন ও সুরনির্মাণ পদ্ধতি কতদূর বিস্তৃত। কতখানি স্বতন্ত্র ছিল তাঁর সংগীত শিক্ষা ও সংগীত ভাবনার পরিপ্রেক্ষিত। যুগ যায় যুগ আসে, সেই চলমান সুরপ্রবাহের বৈশিষ্ট্য ফুটিয়ে তোলাই ছিল তাঁর শিল্পী মনের মুখ্য বিষয়।সুধীরলালের গান যেন অনায়াস শ্বাসপ্রশ্বাস। যেন সরোবরে হংসসম সঞ্চরণ। তাঁর গাওয়া গান আধুনিকতার যান্ত্রিক কোলাহল পেরিয়ে হৃদয়ে শিকড়ের সন্ধানে পরিব্যাপ্ত থাকে। কথার অতলান্তে ডুবে ভাবের মুক্তো তুলে এনে কাব্য সংগীতের অনুপম মালা গেঁথে দেয়। তার এইসব মায়াবী গুণের জন্যই সুধীরলাল সামাজিক নানা ঝড়-তুফানের পরেও জন্মশতবর্ষে আজও অমলিন থাকেন এবং বাংলা গানের ইতিহাসে ভবিষ্যতেও উজ্জ্বল হয়েই থাকবেন।

হেমন্ত মুখোপাধ্যায়কে একবার আমীর খাঁ বলেছিলেন — ‘আধুনিক ফাধুনিক বুঝি না। যে সুর লাগাতে জানে, যে গান সুরে ভরিয়ে দেয়, আনন্দ দেয় সেই তো প্রকৃত সংগীত। তুমি দু-ঘণ্টা ধরে কালোয়াতি করলে অথচ সুর লাগলো না, হৃদয়কে নাড়া দিল না, আনন্দ দিলো না। তাকে সংগীত বলি কী করে— কথাটা বড় সত্যি মনে হয় সুধীরলাল প্রসঙ্গে। তাঁর ‘মধুর আমার মায়ের হাসি’, ‘ও তোর জীবনবীণা’, ‘খেলাঘর মোর ভেঙে গেছে’, ‘রজনী গো যেওনা চলে’, ‘গান গেয়ে মোর দিন কেটে যায়’, ‘তুমি ছিলে তাই ছিল গো লগন’, ‘প্রথম দিনের প্রথম সে পরিচয়’, ‘মিলনের গান তোমার আমার নয়’, ‘এ জীবনে মোর যত কিছু ব্যথা’ ইত্যাদি গান এখনও শ্রোতাদের মনে উজ্জ্বল হয়ে আছে মায়াবী কণ্ঠ ও সুরের মোহজালে হৃদয় নাড়িয়ে মন ভরিয়ে দিতে পারে বলেই। দু-ঘণ্টা কালোয়াতি নয়, শুধু সাড়ে তিন মিনিট সময়েই শ্রোতাদের অবিষ্ট করে মাত করে দিতে পারেন সুধীরলাল চক্রবর্তী।

সুধীরলালের গানের গঠন-শৈলী একেবারেই লোকজ এবং ক্ল্যাসিকাল। প্রধানত ক্ল্যাসিকাল হলেও তাঁর গায়কী এবং সুরের বুনটের মধ্যে যে টানাপোড়েন তা উচ্চকিত নয়। রাগ-রাগিনীকে তিনি ভাবের নিরিখেই দেখেছেন। তিনি নিজে যখন ‘মধুর আমার মায়ের হাসি’, ‘ও তোর জীবনবীণা’, ইত্যাদি গান গাইছেন তখন শ্রোতাদের মনে হচ্ছে কত অনায়াস, কত মধুর কত স্নিগ্ধ সে চলন। একটু খেয়াল করলে দেখা যাবে মার্গ সংগীতে অত্যন্ত দক্ষ হলেও তিনি তৎকালীন প্রবহমান সুরের শাস্ত্রীয় ধারা থেকে অনেকখানি সরে গিয়েছেন। কথার ভাবানুসারে সুর নির্মাণ ক্ষেত্রে তিনি রাগ-রাগিনীর মেদ ঝরিয়ে দিয়েছেন, ছোটো ছোটো দ্রুত তান বাদ দিয়েছেন। মিড় ছোটো করে হালকা মুড়কি দিয়েছেন, হরকৎ-ফিরৎ একেবারে বর্জন করেছেন। অর্থাৎ যতখানি স্বাভাবিক আবেগে উচ্চারণ করা যায় ততটাই রেখেছেন।

এ প্রসঙ্গে তাঁর সুরারোপিত তিনটি গানের উল্লেখ করি। একটি হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের গাওয়া ‘শুধু অবহেলা দিয়ে বিদায় করেছ যারে’, দ্বিতীয়টি শ্যামল মিত্রের গাওয়া ‘শেষ কথা আজি বলে যাও’ এবং তৃতীয়টি উৎপলা সেনের গাওয়া ‘এক হাতে মোর পূজার থালা’। এইসব গানের সুর শুনলে কখনই মনে হবে না শুধু কথার ওপর রাগনির্ভর বৈশিষ্ট্যহীন সুর সৃজন। কথার সেন্টিমেন্ট অনুসারে জাত শিল্পীর পরিচয়েই রাগরাগিনী সুপ্ত রেখে সুধীরলাল সুর করে দিয়েছিলেন এবং গানগুলি তুলে দিয়েছিলেন কোন্‌ কণ্ঠবৈশিষ্ট্যে কোন্‌ গানটি উত্তীর্ণ হবে এটা বুঝেই। এইজন্যে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের গানে খাড়া কাটা স্বরের প্রয়োগ কিন্তু শ্যামল মিত্রের ক্ষেত্রে লম্বা মিড়।

সুধীরলালের গানের আরও একটা বড় বৈশিষ্ট্য হলো তালকে সঙ্গে নিয়ে গান করা। শাস্ত্রীয় বিধিবদ্ধ তাল তার নিজের স্থানে ঠিকই আছে। কিন্তু আধুনিক গানে তাকে মাখিয়ে নিতে হয় গানের কথার সঙ্গে। সুরের সঙ্গে আপন যতিবোধকে সার্থকভাবে, সাংগীতিকভাবে স্থাপনা করতে হয়। সুধীরলাল তালকে তাঁর গানের নিজস্ব স্টাইলের সঙ্গে সহায়ক হিসাবে ব্যবহার করেছিলেন। বহু নামী শিল্পীকে দেখেছি তালের ব্যাপারে অকারণ সতর্কতা। আড়িতে গাইবার প্রবণতা, যা গানের অন্তর্নিহিত মাধুর্যকে অনেক ক্ষেত্রে ব্যাহতও করেছে। কিন্তু সুধীরলালের গানের সঙ্গে তাল যেন বশংবদ অনুগামীর মতো চলেছে। নিজের সুরে গাওয়া ‘আঁখি তারে ভোলে যদি’, ‘ছাইল অম্বর ঘন মেঘে’ অথবা ‘কেন ডাক পিয়া পিয়া শুনলে’ বোঝা যাবে তালের সহজ ও সঠিক ব্যবহার গানকে কত মজিয়ে দিতে পারে।

সুধীরলাল চক্রবর্তী জানতেন মার্গ সংগীতের ভিত না থাকলে বিভিন্ন রকমের গান ভাল করে রসিয়ে গাওয়া কঠিন। ‘রজনী গো যেওনা চলে’ অথবা গজল প্রভাবান্বিত ‘বনভূমি শ্যামায়িত’, কাওয়ালি ছন্দ ও তালে ‘দোলানো কেন ডাক পিয়া পিয়া’ ইত্যাদি গানের মাধুর্য ফুটিয়ে তুলতে হলে গায়কীর যে মুনশিয়ানার দরকার তা তো তাঁর ছিলই, উপরন্তু এক গম্ভীর ন্যাজাল টোনের জাদু দিয়ে তিনি তৎকালীন গানের গতানুগতিকতার বেড়াটাকেই একেবারে ভেঙে দিয়েছিলেন। ওঁর গলার খাদের আওয়াজটা ছিল ভারী স্নিগ্ধ। তার সপ্তকে প্রবেশ করতো একটু ন্যাজাল টোন এবং দুয়ে মিলে পেথোজ বা বেদনাভরা আর্তি চমৎকার ফুটে উঠতো। ‘রজনী গো যেওনা চলে’ গানে ‘রজনী গো’ তার সপ্তকে বলে যেভাবে যেওনা চলে মধ্য সপ্তক দিয়ে অবরোহণে নেমে এসেছে, তাতে প্রাণস্পর্শী হয়ে উঠেছে বিদায় আসন্ন রজনীকে ধরে রাখার আকুল প্রয়াস। সুধীরলালের মতো দরদি শিল্পীর গান তাই একাধারে সমকালীন, সেই সঙ্গে সময়োত্তীর্ণ।

সুধীরলালের জন্ম ১৯১৬ সালে অধুনা বাংলাদেশের ফরিদপুর জেলার কোটালিপাড়া পরগনার অন্তর্গত বালিয়াভাঙা গ্রামে। শৈশব থেকেই গানের প্রতি ছিল তাঁর সুতীব্র আকর্ষণ ও অনুরাগ। জন্মলব্ধ সুকণ্ঠের অধিকারী সুধীরলাল অনায়াসে গান তুলে তৎক্ষণাৎ গেয়ে সবাইকে মুগ্ধ করে দিতে পারতেন। পিতা গঙ্গাধর চক্রবর্তীও ছিলেন সংগীত প্রিয় মানুষ। বাড়িতে গানের আসর মাঝে মাঝেই বসতো। একবার বহরমপুরে একটি আসরে গান গাইতে এসেছেন তৎকালের অন্যতম সংগীত নায়ক গিরিজাশঙ্কর চক্রবর্তী। হাফ-প্যান্ট পরা সুধীরলাল মাত্র এগারো বছর বয়সে সেখানে উপস্থিত এবং শ্রোতাদের আদেশে প্রথমে একটি গান করলেন। সেই গান শুনে গিরিজাশঙ্কর মুগ্ধ, যিনি ছাত্র নির্বাচনের ক্ষেত্রে অত্যন্ত রক্ষণশীল ছিলেন, যথেষ্ট সুর চেতনাসম্পন্ন না হলে সংগীত শেখাতেন না, সেই সংগীত নায়ক গিরিজাশঙ্কর চক্রবর্তী নিজেই সুধীরলালকে সংগীত শিক্ষাদানে আগ্রহ প্রকাশ করলেন। আর গানের টানে সুধীরলাল কলকাতার গড়পাড়ে মামার বাড়িতে এসে উঠলেন। এইভাবেই গিরিজাশঙ্করের তত্ত্বাবধানে সুধীরলালের ধ্রুপদ ধামার খেয়াল, ঠুংরির ভাণ্ডার ক্রমশই সমৃদ্ধ হতে লাগলো।

নানা আসরে শিক্ষক গিরিজাশঙ্কর এই ছাত্রকে সংগীত পরিবেশনের জন্য পাঠাতেন এবং ছাত্রও সাফল্যের সঙ্গে সংগীত পরিবেশন করে আসতেন। ক্রমে মামাবাড়ি ছেড়ে গুরুগৃহে বসবাস এবং আপন প্রতিভা ও দক্ষতায় খেয়াল ঠুংরিতে অনন্য শিল্পী হয়ে ওঠেন। এলাহাবাদ মিউজিক কম্পিটিশন এবং বেঙ্গল মিউজিক কম্পিটিশনে সুধীরলাল অসাধারণ কৃতিত্বের নিদর্শন রাখেন এবং রেডিওতেও সংগীত পরিবেশনের সুযোগ পান। তখনও সুধীরলাল যৌবনে পা রাখেননি। তখন রেডিওতে লাইভ প্রোগ্রাম হতো। একবার রেডিওতে সকাল ৮-৩০ মিনিটে অনুষ্ঠান। সকাল সাড়ে সাতটার পরে সুধীরলাল এসে গুরুর কাছে বিলাসখানি টোড়ির ওপর বিখ্যাত গান ‘এ ছত্র নেহে সে যাই’ তুলে রেডিও-তে গাইলেন। গানের চলন এবং গান এত অপূর্ব হয়েছিল যে স্বয়ং গিরিজাশঙ্করও মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিলেন। সুধীরলাল ক্রমেই বাংলার রাগসংগীত চর্চার ক্ষেত্রে একটি প্রিয় নাম হয়ে উঠলেন।

বেতারে নিয়মিত গান করতে করতেই ১৯৪৩ সালে তিনি ঢাকার বেতার কেন্দ্রের মিউজিক সেকশনের প্রডিউসার হিসাবে যোগদান করেন। এখানেই তিনি পেয়ে যান বন্ধু ও সংগীত জীবনের অন্যতম সুহৃদ পবিত্র মিত্রকে। প্রকৃতপক্ষে এখান থেকেই বাংলা গানের আরও একটি বাঁক এলো এই যুগলবন্দির মধ্য দিয়ে। যদিও সুধীরলাল চক্রবর্তীর প্রথম রেকর্ড প্রকাশিত হয় ১৯৩৯ সা‍‌লে হিন্দুস্তান রেকর্ড কোম্পানি থেকে দেবেশ বাগচীর কথায়। নিজের সুরে সুধীরলালের গাওয়া গান দুটি ছিল ‘ভালোবেসেছিনু আলেয়ারে’ এবং ‘রজনী গো যেওনা চলি’ গান দুটি প্রবল জনপ্রিয় হয়। ১৯৪৫ সালে গানের টানে কলকাতায় ফিরলেন সুধীরলাল এবং নিয়ে এলেন বন্ধু পবিত্র মিত্রকেও। পবিত্র মিত্রের কথা ও সুধীরলালের সুরে জোয়ার এলো। অজস্র কালজয়ী গান তৈরি হলো এই যুগলবন্দিতে। এরমধ্যে উল্লেখযোগ্য কিছু গান হলো ‘ওগো নয়নে আবীর দিও না’ শিল্পী নীতা বর্ধন, ‘যে দিন রব না আমি’ শিল্পী অনন্তদেব মুখোপাধ্যায়, ‘কার বাঁশি বাজে আজ’ শিল্পী সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায় ‘এ জীবনে মোর যত কিছু ব্যথা’ — শিল্পী সুধীরলাল, ‘খেলাঘর মোর ভেসে গেছে হায়’ শিল্পী সুধীরলাল, ‘তোমার আঁখির পরে’ শিল্পী সবিতা সিং ‘কেন মিছে ফিরে চাও’ শিল্পী গায়ত্রী বসু, ‘ঘুমায়ো না সহেলি গো’ শিল্পী মানবেন্দ্র মুখোপাধ‌্যায়, ‘জীবনের পথে শুধু কেন’ শিল্পী উৎপলা সেন, ‘ওগো মোর গানের পাখি’ শিল্পী সুপ্রভা সরকার, ‘স্মৃতি তুমি বেদনার’ শিল্পী শ্যামল মিত্র, ‘শুধু অবহেলা দিয়ে বিদায় করেছ যারে’ শিল্পী হেমন্ত মুখোপাধ্যায়সহ আরও অজস্র গান। বাংলার পাশাপাশি হিন্দি গীত গজল, কাওয়ালি সমৃদ্ধ হলো তাঁর কণ্ঠ স্পর্শে। ছায়াছবির জগতে প্রথম সুর করেন ১৯৫০ সালে ‘গরবিনী’ ছবিতে। ১৯৫১ সালে ‘সুনন্দার বিয়ে’ এবং ‘জাগরণ’ এই দুটি ছবিতে সঙ্গীত পরিচালনা করেন এরমধ্যে ‘সুনন্দার বিয়ে’ ছবির গান প্রবল জনপ্রিয় হয়। ১৯৫২ সালের ২০শে এপ্রিল মাত্র ছত্রিশ বছর বয়সের জীবনাবসান হয় সুধীরলাল চক্রবর্তীর।

শিক্ষক হিসাবেও অত্যন্ত সফল তিনি। তাঁর হাতে গড়া কিছু অসামান্য ছাত্রছাত্রী আছেন, যারা উত্তরকালে বাংলা গানের শ্রোতধারাটি সফলভাবে বহন করে নিয়ে গিয়েছেন, বাংলা গানের স্বর্ণযুগের যে মেলোডি, সুধীরলাল সঠিকভাবেই তাঁদের সে পথে পরিচালিত করেছেন। শ্যামল মিত্র, উৎপলা সেন, নীতা বর্ধন, গায়ত্রী বসু, অপরেশ লাহিড়ী তাঁর কৃতী ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে অন্যতম। একটি সাক্ষাৎকারে শ্যামল মিত্র একবার বলেছিলেন— ভালোভাবে সংগীতশিক্ষা আরম্ভ করি সুধীরলাল চক্রবর্তীর কাছে। সুধীরদা আজ নেই, কিন্তু আজ আমার যেটুকু সাফল্য আপনারা দেখছেন, এর মূলে ছিলেন সুধীরদা। আমাকে গড়ে তোলার ব্যাপারে তিনি দিনরাত অক্লান্ত পরিশ্রম করতেন এবং তাঁরই চেষ্টায় আমি রেকর্ড ও ফিল্মে গান করি। গান শেখাবার কালে গভীরভাব নিয়েই তিনি এমনভাবে ছাত্রছাত্রীদের শেখাতেন যাতে সুর তাল এসবের সঙ্গে গানের ভাবও হৃদয়ের মধ্যে গেঁথে যায়। আসলে গান ছিল সুধীরলালের মনের আশ্রয়। অনুভূতির অভিব্যক্তি ছিল তাতে আর ছিল সহজ আর্তি, কিন্তু ভাবালুতা নয়। এই অনুভূতির অনুকরণীয় প্রকাশভঙ্গি তিনি শিখিয়ে গেছেন নিজের ছাত্রছাত্রীদের।

সুরকার সুধীরলালের সুর নির্মাণের ক্ষেত্রে বিশেষ কয়েকটি উল্লেখযোগ্য দিক ছিল। ভারতীয় রাগসংগীতকে ভিত্তি করে আপন প্রতিভার জারক রসে নিজস্ব মিড়, মুড়কির স্পর্শে গানের বাণী ও ভাবকে ফুটিয়ে তুলতেন যথার্থ সুরশিল্পীর মতো। শিল্পীর কণ্ঠের গঠন অনুসারে গান তিনি এমনভাবে বাছতেন যাতে গানটি শেখাবার সময়েই সুর ও বাণীর যুগল সম্মিলনে গানটি অন্যতর আবেদন সৃষ্টি করে। প্রত্যেক শিল্পীর কণ্ঠে যে ভাল দিকটি থাকে গানটি শিল্পী কণ্ঠের সেই ভাল দিকের স্বরসংগতি স্বচ্ছন্দ খেয়াল রেখে গানটি তুলিয়ে দিতেন। ফলে শিল্পীর পক্ষে গান পরিবেশন করাটা অনায়াস হয়ে উঠতো। যে শিল্পীই সুধীরলালের সুরে গান গেয়েছেন সেই গান জনপ্রিয় তো হয়েছেই, শিল্পীও গানটি গেয়ে প্রতিষ্ঠা পেয়েছেন। অনন্তদেব মুখোপাধ্যায়ের ‘যে দিন রবো না আমি’, প্রতিমা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘উছল তটিনী আমি’, ‘পান্না কাওয়ালের আমারে ভুলিতে’, উৎপলা সেনের ‘কেন জাগে শুকতারা’, অপরেশ লাহিড়ীর ‘সেই মালা দেওয়া নেওয়া’, গীতা দত্তের কণ্ঠে ‘বৃন্দাবনে শ‌্যাম নাই ফুলে মধু নাই’, গায়ত্রী বসুর ‘কেন এলে মধুরাতে’, এবং সুধীরলালের জীবনাবসানের পর শ্যামল মিত্রের কণ্ঠে ‘স্মৃতি তুমি বেদনার’ শুধু গান হিসেবেই কালজয়ী হয়নি, শিল্পীদেরও এনে দিয়েছে প্রাতিষ্ঠানিক সাফল্য।

সুধীরলালের ভিতরে একটা কবি মন ছিল, তাই বিভিন্ন গীতিকারদের রচনাতে আপন কবিসত্ত্বার কারণে লিরিক অনুসারে যথাযথ সুরে সাজানোর ধ্যানকে যুক্ত করে রসোত্তীর্ণ ও কালজয়ী গান উপহার দিতে পেরেছেন। ‘মধুর আমার মায়ের হাসি’ অথবা ‘স্মৃতি তুমি বেদনার’ মতো গানে কথার যে অন্তর্মুখীনতা, যে আত্মনিবেদনের মাধুর্য, তার গভীরে প্রবেশ করতে না পারলে এই সুর করা একেবারেই অসম্ভব। রবীন্দ্রনাথ জানিয়েছিলেন বাংলার সুর কথাকে খোঁজে। সে যুগল মিলনের পক্ষপাতী একের যোগেই অন্যটি সার্থক। অত্যন্ত সম্ভ্রান্ত শিক্ষার ঔজ্জ্বল্যের জন্যই ভাবনার সঙ্গে একাত্ম হয়ে এমন মন কেমনের দোলা জাগানো সুরে সুধীরলাল গানগুলিকে বাঁধতে পেরেছিলেন। এইসব গান যেমন কাব্যধর্মীতায় সমৃদ্ধ তেমনি সুরের আভিজাত্যে উজ্জ্বল। আমাদের অতি পুরাতন অতি প্রিয় রাগও যেন নবরূপে সেজে সুধীরলালের হাত ধরে বিচিত্ররূপে আত্মপ্রকাশ করেছে। এটাই সুরকার সুধীরলালের বিশেষত্ব। শিল্পী ও গবেষক ড. অনুপ ঘোষাল সুধীরলাল সম্পর্কে মূল্যায়ন করতে গিয়ে যথার্থই বলেছেন — ‘রাগসংগীত ভেঙে সুধীরলাল যে সমস্ত সুর রচনা করেছিলেন বাংলা এবং হিন্দিতে সে সব গানে ছিল এক অনিন্দ্য সুন্দর মেলোডি, অপূর্ব স্বাদ। সংগীত প্রেমিক বাঙালির কাছে তা ছিল অভূতপূর্ব। সুরসাগর হিমাংশু দত্তের পর সুধীরলাল চক্রবর্তী হলেন বাংলার আরেক ব্যক্তিত্বময় সুরস্রষ্টা যিনি ক্ষণিক সময়ের জন্য এ জগতে অবস্থান করলেও কর্মের ঔজ্জ্বল্য দিয়ে বাংলা গানের ভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করে গেছেন।

সুধীরলাল যখন গানের ক্ষেত্রে এলেন তখন বাংলায় সংগীত প্রতিভা বড় কম ছিল না। কৃষ্ণচন্দ্র দে ছিলেন, পঙ্কজকুমার মল্লিক ছিলেন। ছিলেন শচীনদেব বর্মণ, ছিলেন জগন্ময় মিত্র। কিন্তু গায়কের আবেগ, গলার মাদকতা, স্বরক্ষেপণ, বিশুদ্ধ উচ্চারণ এবং কথা ও সুরের সঙ্গে নিজেকে একাত্ম করে নেওয়ার অনন্য ক্ষমতায় সুধীরলাল তখনই অন্যদের চেয়ে অনেকটাই স্বতন্ত্র। সংগীত বোধের চমৎকারিত্বে অনেকটাই আলাদা। আসলে কথা ও সুরের ওপর ব্যক্তি অনুভূতি আবেগের এমন পাতলা এক আস্তরণ তাঁর গানে মিশে আছে যে এই অনুভূতির আঘ্রাণে আন্তরিকতায় তিনি অন্যদের থেকে নিজেকে ব্যতিক্রমী করেছেন। যার জন্যে ‘মধুর আমার মায়ের হাসি’, ‘খেলাঘর মোর ভেঙে গেছে’, ‘এ জীবনে মোর যতকিছু ব্যথা’, ‘ভালোবেসে ছিনু’ ইত্যাদি বিষাদঘন গানগুলি আজও হৃদয়ে বুলিয়ে দেয় স্নিগ্ধ চন্দনের প্রলেপ। আর এখানেই সুধীরলাল ট্রেন্ডসেটার, বাংলা গানের মাইল-ফলক। নিজের সময়ের চেয়ে এগিয়ে থাকার মানসিকতার দৃষ্টান্ত ছড়িয়ে আছে তাঁর গান ও সুরের সর্বত্র। তিনটি সপ্তক জুড়ে সুরের বিচরণ কিন্তু আশ্চর্য স্নিগ্ধ; জটিল সুর বিন্যাস কিন্তু আশ্চর্য আবেগঘন, নির্লিপ্ত। আমাদের রুচিবোধ গড়ে দেওয়ার, তৃপ্তি দেওয়ার মহার্ঘ্য সম্ভার নিয়ে আজও উজ্জ্বল হয়ে আছেন তিনি। বিশেষত এই মূল্যবোধহীন, সুরের নামে অস্থির সময়ে নিরাসক্ত বাউল সুধীরলাল বড় প্রাসঙ্গিক হয়ে আমাদের কাছে আসেন। তিনি বাংলা গানের এক চিরকালীন নস্টালজিয়া।


   সৌজন্যেঃ গণশক্তি

Advertisements

Those Nostalgic Pujor Gaan

October 27, 2015

পুজোর গান ও সেইসব জলসার দিন

সে একটা দিন ছিল, আজ নেই। রাতের আকাশ চিরে বেজে উঠত গান। আর মুহূর্তে বদলে যেত পরিবেশ। ভেসে আসছে হয়ত, ‘সেদিনের সোনাঝরা সন্ধ্যা, আর এমনি মায়াবি রাত মিলে/দুজনে শুধাই যদি তোমারে কি দিয়েছি/আমারে তুমি কিবা দিলে।’ তখন মধুক্ষরা শ্যামল মিত্র- দিন। একের পর এক কালজয়ী গানে সুর দিয়ে তাকে উপযুক্ত শ্রোতার কাছে পৌঁছে দেওয়াই ছিল যেন তাঁর ব্রত। না হলে কী করে সৃষ্টি হয়, ‘মহুল ফুলে জমেছে মউ/হিজল ডালে ডাহুক ডাকে/ওগো কালো বউ কোথায় তুমি যাও।’ অথবা ‘ও শিমুল বন, দাও রাঙিয়ে মন/কৃষ্ণচূড়া, দোপাটি আর পলাশ দিল ডাক/মধুর লোভে ভিড় জমালো মউ পিয়াসী অলির ঝাঁক।’ সবই ভিন্ন ভিন্ন পুজোয় পুজোর গান হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। আর কে ভুলতে পারে তাঁর গাওয়া ‘এমনও দিন আসতে পারে, যখন তুমি দেখবে আমি নেই—’ কিংবা ‘ঝিরি ঝিরি পিয়ালের কুঞ্জে’ অথবা ‘ছিপখান, তিন দাঁড়’। এরকম অজস্র গান।

প্রত্যেক পুজোতে বের হত নতুন নতুন গান বিভিন্ন শিল্পীর কণ্ঠে। উৎপলা সেন, সতীনাথ মুখোপাধ্যায় মাত করে দিতে লাগলেন বাংলার শ্রোতৃমণ্ডলীকে। সতীনাথের ‘সোনার হাতে সোনার কাঁকন কে কার অলঙ্কার’, ‘জীবনে যদি দীপ জ্বালাতে নাহি পার, সমাধি ’পরে মোর জ্বেলে দিও’ অথবা ‘বনের পাখি গায় বোলো না, বোলো না/ফাগুন রাতি শুধু ছলনা ছলনা।’…

উৎপলা সেন এক পুজোয় গাইলেন, ‘ঝিকমিক জোনাকীর দীপ জ্বলে শিয়রে’… ‘ময়ূরপঙ্ক্ষী ভেসে যায়/রামধনু জ্বলে তার গায়।’ শুধু গান আর গান প্রতি পুজোয়। আর অনুপম কণ্ঠের অধিকারী হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের তো কোনও তুলনাই নেই। এক পুজোয় যদি বাজে ‘ধিতাং ধিতাং বোলে, ওই মাদলে তাল তোলে’, তো অন্য পুজোয় বেজে ওঠে ‘পথ হারাব বলেই এবার পথে নেমেছি’। এইসব শ্রুতিমধুর গানে আবার সুর দিয়েছেন ‘সুরের গুরু’ সলিল চৌধুরি। যার কোনও তুলনা পরবর্তীকালেও দেখা যায়নি। এমনকি এখনও, এই ২০১৫ সালে, সুরের মধুঝরা নতুনত্বের সন্ধান মেলেনি।

সে সময়টাই ছিল যেন বাংলা গানের এক আশ্চর্য যুগ। একই সঙ্গে জলসারও যুগ। পুজোর পরেই শুরু হয়ে যেত জলসার দিন। পুজোয় বিসর্জন হল কী শুরু হল ওই মঞ্চে গানের আসর। প্যান্ডেল কখনও কখনও থাকত। ডায়াসে শুরু হত গানের শিল্পীদের মধুঝরা কণ্ঠের আলোড়ন–তোলা গান। গানের পর গান। শ্রোতারা একটি গান শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ‘আর একটা, আর একটা’ বলে চিৎকার করে উঠতেন। কখনও নির্দেশ যেত, ‘এই গানটা’। কাগজের স্লিপেও অনুরোধ যেত মঞ্চে। রাত্রি ১১টা, ১২টা, ১টা— গান চলছে। আসর জমজমাট। রাস্তাঘাট নির্জন হলেও কোনও ভয় ছিল না। সুবিধেমতো কেউ কেউ বা কয়েকজন মিলে একসঙ্গে রাস্তায় হেঁটে যেতেন। স্ত্রী–পুরুষ নির্বিশেষে সবাই। এইসব দিনকাল ছিল প্রধানত পঞ্চাশের দশকের শেষদিক থেকে ষাটের দশকের সবটা জুড়ে। পরে নানা কারণে কমে যায়।

আরও কে কে গাইত বা গাইতেন? শুনুন তবে। অখিলবন্ধু ঘোষ, আলপনা বন্দ্যোপাধ্যায়, গীতা দত্ত, তরুণ বন্দ্যোপাধ্যায়— কে নয়? ধনঞ্জয় ভট্টাচার্য ও দ্বিজেন মুখোপাধ্যায় ছিলেন এই সময়ের গানের রাজা। আমরা অপেক্ষা করে থাকতাম, এবার কী গান বেরবে পুজোয়! কারণ পুজোর সময় যত নতুন নতুন গান বের হত, অন্যসময় তা হত না। অল্প অল্প শীতের রেশ, ঝকঝকে রাত্রি, মাইকে ভেসে আসছে জলসার গান। ভেসে আসছে ধনঞ্জয় ভট্টাচার্যের আশ্চর্য গান: ‘মাটিতে জন্ম নিলাম, মাটি তাই রক্তে মিশেছে/ এ মাটির গান গেয়ে ভাই, জীবন কেটেছে।… মাটিতে জন্ম নিলাম…’ কখনও ভেসে আসত ‘ত্রিনয়নী দুর্গা, মা তোর রূপের সীমা পাই না খুঁজে।…’ হ্যাঁ, সিনেমার গান। যেমন সুর, তেমনই কণ্ঠ ও তার গায়কি! শুধু গান আর গান। ধনঞ্জয় ভট্টাচার্য এক আশ্চর্য শিল্পী। মাঝরাত্রি পার হয়ে গেছে, তিনি গান গাইছেন। শ্রোতায় শ্রোতায় ছয়লাপ। শুধু মানুষ আর মানুষের সমাবেশ। নিস্তব্ধ পরিবেশ। গানের সুর ও কণ্ঠের জাদুকরী আমেজ ছাড়া আর কিছু নেই।

রাস্তা দিয়ে শ্রোতারা দল বেঁধে হেঁটে যেতে যেতে অন্য একটি জলসার গান শুনতে পেতেন মাইকে ভেসে–আসা হাওয়ায়। দ্বিজেন মুখোপাধ্যায় ধরেছেন, ‘মন ছুটেছে তেপান্তরে দূর গাঁয়ে ধানক্ষেতের আলেরই ধারে ধারে/রাঙা মাটির ভুবনখানি যেথা পাখির কলতানে উছলে পড়ে’।… কিংবা ‘শ্যামলবরণী ওগো কন্যা/এই ঝিরঝির বাতাসে ওড়াও ওড়না/মেঘের অলক দোলায় কোথা যাও/কত হাসির ফোয়ারা তোমারই ঝরনা।’ অথবা ‘এই ছায়া ঘেরা কালো রাতে/স্তব্ধ ঝরা বেদনাতে/মিটিমিটি জ্বলে তারা আকাশের গায়, যেন কথা বলে কার সাথে।’ ভোলা যায় না অখিলবন্ধু ঘোষ গাইছেন, ‘পিয়ালশাখার ফাঁকে ওঠে একফালি চাঁদ বাঁকা ওই…।

সুরের মূর্ছনায় রাত্রি কেঁপে ওঠে। হেঁটে যেতে যেতে আবার শোনা যায় কোনও জলসার গান। ভেসে আসছে মাইকের গমগম আওয়াজে। সুপ্রীতি ঘোষ গান গাইছেন, ‘পদ্মকলি সকলে খোঁজে রাতের আকাশে তারা/তোমার খোঁজে আমার দুটি নয়ন দিশাহারা’ অথবা ‘আকাশ যদি না অত সুদূর হত/কত তারা যদি হত ফুলের মতো/তাহলে সে ফুলগুলি গেঁথে মালিকায়/উপহার দিতাম তোমায়।’ আর মৃণাল চক্রবর্তীর ‘যমুনা কিনারে শাজাহানের স্বপ্ন শতদল/শ্বেত মর্মরে মরমের ব্যথা বিরহীর অশ্রুজল/তাজমহল… তাজমহল।’ তুলনা নেই।

কত গান, কত পুজো পার হয়ে যেত। গান ফুরত না, পুজো ফুরত না। ঘুরে ঘুরে পুজো আসত, নতুন নতুন গানের সৃষ্টি হত। বস্তুত পুজো আসছে মানেই গান আসছে। এমনই দিন ছিল সেকালে। আনন্দে বয়ে যেত সুন্দর সময়। ঠিক কথা, সে ছিল গানের দিন। ওই সময়েই বাংলা সিনেমার গানের জগৎও ছিল আলাদা। না হলে এক আশ্চর্য সুর কথার সৌন্দর্যকে আশ্রয় করে কী করে বেজে উঠতে পারে, ‘গানে মোর কোন ইন্দ্রধনু আজ স্বপ্ন ছড়াতে চায়।’… হ্যাঁ, সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায় তাঁর অনুপম কণ্ঠলাবণ্যে রাত্রিকে ভাসিয়ে দিয়েছেন এক আশ্চর্য সুরের স্রোতে। সুর দিয়েছিলেন কে? অনুপম ঘটক।… সবচেয়ে বড় কথা, পুজোর গানগুলি প্রথমে প্রচার করত আকাশবাণী শনিবার ও রবিবার দুপুর দুটোর অনুরোধের আসরে

এক পুজোয় বের হল তরুণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের রেকর্ড। দু’পিঠে দুটি গান। ‘মোর মালঞ্চে বসন্ত নাইরে নাই/ফাগুন ফিরিয়া গেল তাই।’ সম্ভবত অন্যটা হল, ‘পৃথিবী আমারে চায়, রেখো না বেঁধে আমায়/ খুলে দাও প্রিয়া খুলে দাও বাহুডোর।’ তরুণ বন্দ্যোপাধ্যায় একের পর এক গান গেয়েছেন, কালজয়ী গান। ‘এক এক দিন মেঘ করে মন বলে হারিয়ে যাই, রূপকাহিনীর গল্প বলো শুনতে চাই।’ কিংবা ‘রূপকাঠি গাঁয়ে শ্যামলী মেয়েটি পথ চলে/হাওয়া ঝিরঝির, নদী ছলছল কথা বলে।’ অথবা যে অসাধারণ গানটি একদিন রাত্রি প্রায় দশটা– এগারোটায় দূরের রেডিও থেকে ভেসে এল, তা হল, ‘কাজল নদীর জলে ভরা ঢেউ ছলছলে, প্রদীপ ভাসাও কারে স্মরিয়া— সোনার বরণী মেয়ে বলো কার পথ চেয়ে আঁখি দুটি ওঠে জলে ভরিয়া।’… এই তরুণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের কত গান যে জনপ্রিয় হয়েছিল এবং এখনও তা সমান দাবি করে, তার হিসেব নেই। তারপর ‘চম্পা আমার ওগো শোনো, পারুলকুমার ডাকে তোমায়/ঘুমায়োনা, জাগো।’

এক পুজোয় প্রথম দিকে বেজে উঠল, শচীন দেববর্মণের ‘মন দিল না বঁধু, মন নিল যে শুধু/আমি কী নিয়ে থাকি।’… যেমন সুরের নতুনত্ব, তেমনই কণ্ঠসৌন্দর্যের নতুনত্ব। সব মিলে এক আশ্চর্য রাগাশ্রয়ী তানের ও তালের মনভোলানো উপহার। সারা বাংলা যেন নতুনত্বের স্বাদ পেল। সম্ভবত পঞ্চাশের দশকের শেষদিকে এই সংযোজন। শচীনকত্তার একের পর এক মোহ সঞ্চারকারী গান ও সুর। যেমন, ‘ঝিলমিল ঝিলমিল ঝিলের জলে ঢেউ খেলিয়া যায় রে/ঝিরঝিরঝির হাওয়ায় রে, ঢেউ খেলিয়া যায়।’ মনে পড়ে, তাঁর সর্বকালের এক সেরা গানের কথা। তা হল, সেই যে বাঁশি বাজানোর দিনগুলির মধ্যে ‘তাক দুম, তাক দুম বাজে, বাজে ভাঙা ঢোল,/ ও মন যা ভুলে যা কী হারালি ভোল রে ব্যথা ভোল।’ সুরের মূর্ছনা ছড়িয়ে পড়ে, মা দুর্গার বিসর্জনের পর শূন্য হৃদয়ের আকুতিতে। ভাঙা মন যেন সান্ত্বনা পায়। আরও কত গান এই প্রবীণ শিল্পী তৈরি করেছেন ও গেয়েছেন, তার হিসেব নেই।

এক পুজোয় হেমন্ত মুখোপাধ্যায় গাইলেন, ‘মাগো, আমরা তোমার শান্তিপ্রিয় শান্ত ছেলে,/তবু শত্রু এলে অস্ত্র হাতে ধরতে জানি।’ গাইলেন, ‘শোনো কোনও একদিন, আকাশ বাতাস জুড়ে রিমঝিম বরষায়/দেখি, তোমার চুলের মতো মেঘ সব ছড়ানো/চাঁদের মুখের পাশে জড়ানো/মন হারালো হারালো মন হারালো/সেইদিন।…’ হ্যাঁ, সুর? অবশ্যই সলিল চৌধুরি। যাঁর হাত ছিল ঈশ্বরদত্ত। হারমোনিয়াম বা পিয়ানো অ্যাকর্ডিয়ান যেন তাঁর কথা শুনে চলত।… আরও অনেক কথা বলা যায়, কিন্তু থাক।…

শেষে বলি, এখন পুজোর গান বলতে গেলে সেরকম বেরয় না বললেই চলে। বেরলেও কোনও উন্মাদনা নেই, আকর্ষণ নেই। অতীতের মতো সুরকার, গীতিকার ও কণ্ঠশিল্পীর বড় অভাব। আর, গানের জলসাই বা কোথায়? হাতে গুনে একটি–দুটি জায়গায়। স্থানীয় শিল্পীরাও তো নেই। উদ্যোক্তাও নেই। গানের সমঝদারের সংখ্যাও কমে আসছে। এখন টিভির নাচ–গানের অনুষ্ঠানে সবাই মগ্ন।


সৌজন্যেঃ আজকাল