Posts Tagged ‘bjp’

Sangh-Inspired Film Censor Board

July 13, 2017

অমর্ত্য সেনকে নিয়ে তথ্যচিত্রে কোপ
তীব্র ক্ষোভের মুখে সেন্সর বোর্ড

নয়াদিল্লি ও কলকাতা, ১২ই জুলাই– তাঁকে নিয়ে তৈরি তথ্যচিত্রে কয়েকটি অতি সাধারণ শব্দেও সেন্সর বোর্ডের নিষেধাজ্ঞায় বিস্মিত অমর্ত্য সেন বলেছেন, এ থেকে প্রমাণ হচ্ছে দেশ এক স্বৈরাচারী রাজত্বের হাতে চলে গেছে। দেশের পক্ষে কী ভালো তা তারাই একমাত্র স্থির করবেন এবং চাপিয়ে দেবেন দেশের মানুষের ওপরে।অমর্ত্য সেনের জীবন ও কাজ নিয়ে তৈরি তথ্যচিত্র ‘দি আর্গুমেনটেটিভ ইন্ডিয়ান’—এর পরিচালক সুমন ঘোষকে সেন্ট্রাল বোর্ড অব ফিল্ম সার্টিফিকেশন জানিয়েছে বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদের উচ্চারিত কয়েকটি শব্দ বাদ দিতে হবে। পরিচালক জানিয়েছেন, অন্তত চারটি শব্দ বাদ দিতে বলা হয়েছে: গোরু, গুজরাট, ভারত সম্পর্কে হিন্দুত্ববাদী দৃষ্টিভঙ্গি, হিন্দু ভারত। কলকাতায় সেন্সর বোর্ডের দপ্তরে তিন ঘণ্টা ধরে তথ্যচিত্রটি খুঁটিয়ে দেখার পরে বোর্ডের তরফে ওই রায় দেওয়া হয়েছে। পরিচালক বুধবার বলেছেন, তাঁকে মৌখিক ভাবেই ওই শব্দগুলি বাদ দিতে বলা হয়েছে। আমি এ ব্যাপারে আমার অপারগতার কথা জানিয়েছি।

পরিচলাক সুমন ঘোষ বলেছেন, তথ্যচিত্রটি নির্মিত হয়েছে অমর্ত্য সেনের সঙ্গে তাঁর ছাত্র ও বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ কৌশিক বসুর কথোপকথনের ধাঁচে। এই আলোচনার মধ্যে থেকে কয়েকটি শব্দ বাদ দিলে তথ্যচিত্রের মর্মবস্তুই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। আমি সেন্সর বোর্ডের লিখিত বক্তব্যের জন্য অপেক্ষা করছি। মুম্বাইয়ে রিভিউ কমিটিকে পাঠাবে কিনা, তা-ও দেখতে হবে। তবে যে কোনো পরিস্থিতিতেই আমার উত্তর হবে একই। হয়তো বিষয়টি মিটে যাবে, কিন্তু আমি কোনও শব্দ সরিয়ে নেব না। সুমন ঘোষ নিজেও অর্থনীতির শিক্ষক। ২০০২ থেকে ২০১৭ পর্যন্ত ১৫ বছরে ছবিটি নির্মিত।

অমর্ত্য সেন নিজে এই ঘটনা জেনে ‘বিস্মিত’। স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিমায় তিনি বলেছেন, এমনিতে ‘গোরু’ আমার খুব পছন্দের শব্দ এমন নয়। আসলে গোরু নয়, আপত্তি গুজরাট নিয়ে। এই নয় যে গুজরাট শুনলেই ওঁরা আপত্তি করবেন। ২০০২-এ গুজরাটে কী ঘটেছিল সেটা বলেছি বলে এই আপত্তি।

জানা গেছে, তথ্যচিত্রে গুজরাটের ২০০২-র ঘটনাবলীর উল্লেখ এসেছে কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ে অমর্ত্য সেনের একটি বক্তৃতায়। সেই ভাষণে গণতন্ত্রের গুরুত্বের কথা বোঝাতে গিয়ে গুজরাটে সরকারি মদতে অপরাধের কথা এসেছিল। এই তথ্যচিত্র ইতিমধ্যেই লন্ডন ভারতীয় চলচ্চিত্র উৎসবে দেখানো হয়েছে।

কৌশিক বসু মন্তব্য করেছেন, ভারতের মতো দেশের মর্যাদার সঙ্গে, অমর্ত্য সেনকে সেন্সর করা, মেলে না। ভারত যেসব দেশের প্রতিনিয়ত সমালোচনা করে থাকে, এই ব্যবহার তাদের সঙ্গেই তুলনীয়।

সেন্সর বোর্ডের নির্দেশ নিয়ে ক্ষোভ ছড়িয়েছে। বিশিষ্ট শিল্পী, বুদ্ধিবৃত্তির জগতের মানুষজন প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছেন, কোন্‌ ফতোয়ায় সেন্সর বোর্ড চলছে। বিশিষ্ট চিত্র পরিচালক বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত এদিন বলেন, সেন্সর বোর্ড একটি রাজনৈতিক দলের আখড়ায় পরিণত হয়েছে। তাঁবেদার সংগঠনের কাজ করছে। অমর্ত্য সেন কী বলবেন, তা-ও কি ওঁরা ঠিক করে দেবেন নাকি? এ হলো মূর্খামি। এ শুধু সিনেমা জগতের ব্যাপার নয়, সমস্ত গণতান্ত্রিক মানুষেরই উচিত এর জোরালো প্রতিবাদ করা।

অভিনেতা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় বলেছেন, এ তো এক ধরনের ফ্যাসিবাদ। যাঁর মুখের শব্দ নিয়ে আপত্তি করা হচ্ছে তিনি আন্তর্জাতিকভাবে সমাদৃত এক ব্যক্তি। সুতরাং এ চরম বোকামিও। তবে এই সরকারের কাছ থেকে এই ধরনের আচরণ ক্রমশই আসতে থাকবে।

সি পি আই (এম)-র সাধারণ সম্পাদক সীতারাম ইয়েচুরি বলেছেন, নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ গোরু বা হিন্দুত্ব উচ্চারণ করেছেন বলে তথ্যচিত্র বন্ধ হয়ে যাবে? এ কী করে সম্ভব? ওরা ঠিক করছে আমরা কী খাব, কী পরবো, কী বলব, কার সঙ্গে প্রেম করবো, কাকে বিয়ে করব; এখন ওরা ঠিক করতে চাইছে তথ্যচিত্রে কোন কথা আমরা শুনবো

অমর্ত্য সেনকে নিয়ে তথ্যচিত্রে এই বিতর্কের মধ্যেই সামনে এসেছে অনীক দত্তের ছবি ‘মেঘনাদবধ রহস্য’ নিয়ে আরো এক বিতর্ক। এই ছবির রিলিজ এক সপ্তাহ পিছিয়ে গিয়ে হচ্ছে ২১শে জুলাই। ছবির এক প্রযোজক সংবাদমাধ্যমে জানিয়েছেন, সেন্সর বোর্ড ‘রামরাজ্য’ শব্দ ব্যবহার আপত্তি জানিয়েছে। ‘রামরাজ্য’ শব্দটি বাংলায় নানা দ্যোতনায় ব্যবহার হয়। কিন্তু বি জে পি-রাজত্বে এখন এই শব্দের ব্যবহারও বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ছবির প্রযোজক-পরিচালকরা এ নিয়ে তেমন কোনও মন্তব্য না করলেও জানা গেছে, ‘রাম’ শব্দটি বাদ দেবার জন্যই নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পরিচালকের আপত্তি থাকলে তাঁকে রিভিউ কমিটির কাছে আবেদন করতে হবে। সেই আবেদন করা হচ্ছে না বলেই এদিন জানা গেছে।

সেন্সর বোর্ডের মাথায় এখন পহলাজ নিহালনি। তিনি খোলাখুলি বি জে পি-র সমর্থক। একের পর এক ছবির ক্ষেত্রে দক্ষিণপন্থী, হিন্দুত্ববাদী দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বোর্ড আপত্তি জানিয়ে যাচ্ছে। মঙ্গলবারই চিত্র পরিচালক প্রকাশ ঝা বলেছেন, নিহালনি ব্যক্তি হিসেবে কী করছেন, তা বড় কথা নয়। একটি মতাদর্শ পিছনে কাজ করছে।

অমর্ত্য সেন সম্পর্কে বি জে পি ও সঙ্ঘ পরিবারের মৌলিক আপত্তিই রয়েছে। তাঁর ধর্মনিরপেক্ষ অবস্থানকে দেশদ্রোহের সঙ্গে তুলনা করে বি জে পি-র তরফ থেকে বিশেষ করে সোশ‌্যাল মিডিয়ায় লাগাতার প্রচার করা হয়ে থাকে।

Politics of Cashless Economy

December 29, 2016

নগদহীন ব্যবস্থার অর্থনীতি

মানব মুখার্জি

২০১৬-র ৮ই নভেম্বরের প্রায় মধ্যরাতের ৫০০ এবং ১০০০ টাকার নোট বাতিল বলে ঘোষণা করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। কেন এই সার্জিক্যাল স্ট্রাইক—এরও কারণ তিনি বলেছিলেন। আর পাঁচজন আর এস এস নেতার মতই তিনি সচরাচর সত্য ভাষণ করেন না। এক্ষেত্রেও করেননি — বললেন ‘পাকিস্তানকে জব্দ করার জন্য এ কাজ করেছেন’। পরে বললেন, ‘সন্ত্রাসবাদীদের আঘাত করতে এই কাজ করেছেন’। বাজারে এখন পাকিস্তান বা সন্ত্রাসবাদ বিরোধিতার কথা ভালো ‘খায়’ তাই প্রথমে এটা। দেশের মানুষ কিন্তু এটা খেলো না। তারপর বললেন কালো টাকা উদ্ধার করার জন্য এটা করেছেন। যেটা কিছুটা হলেও মানুষ খাচ্ছে। কারণ দেশের অর্থনীতিতে কালো টাকা একটা বাস্তব বিষয়। চোখের সামনে বেআইনি বড়লোকী দেখে মানুষ যারপর নাই ক্ষুব্ধ। কিন্তু প্রশাসক হিসাবে তার এবং তার সরকারের অপদার্থতা গোটা বিষয়টাকে চূড়ান্ত জায়গায় নিয়ে গেছে।

নোট বাতিলের সিদ্ধান্ত দেশের ১৩০কোটি মানুষের ওপর একটি অর্থনৈতিক পারমাণবিক বোমার মতো ফেটে পড়েছে। গোটা অর্থনীতি বিপর্যস্ত। স্বাধীন ভারতবর্ষে এতবড় অর্থনৈতিক বিপর্যয় আর কখনও হয়নি। আর ক্ষয়ক্ষতির একটা বড় অংশের মেরামতিও হবে না। সর্বশেষ প্রধানমন্ত্রী তার গোটা সরকার এবং অনুগত কর্পোরেট এবং তাদের মিডিয়া সমস্বরে বলছে আসলে এর মাধ্যমে আমরা নাকি মুদ্রাহীন অর্থনৈতিক (Cashless Economy) ব্যবস্থার দিকে যাচ্ছি। অবশেষে আমরা আধুনিকতার দিকে যাত্রা শুরু করলাম।

এই সমস্ত দাবি-পালটা দাবি, রাজনৈতিক কোলাহল ছেড়ে আমাদের বোঝা দরকার — আসলে নোট বাতিলের মধ্যে দিয়ে কি হলো। সরকার আসলে দেশের সমস্ত মানুষের কাছে যা নগদ টাকা ছিল সেই টাকা তুলে নিল। ব্যাঙ্কেই তা জমা পড়ল, কিন্তু মানুষ চাইলেই সেই গোটা টাকাটা নিজের হাতে ফিরিয়ে নিতে পারছে না। যেহেতু ৫০০ এবং ১০০০ টাকার নোটে দেশের মোট টাকার ৮৬%, কাজেই বলা যায় টাকার সিংহভাগ এখন ব্যাঙ্কের হাতে, মানুষের হাতে না। যে টাকাটা এলো, এর মধ্যে একটা অংশ কালো টাকা, তবে সেটা খুব ছোট অংশ। কারণ টাকাতে কালো টাকা রাখা হয় খুব কম। কালো টাকা জমি-সোনা-বাড়ি এই সব কিছুতে রূপান্তরিত হয়ে থাকে। নানাভাবে কালো টাকা বিদেশে চলে যায়, রূপান্তরিত হয় বিদেশি মুদ্রায় যা আমাদের সরকারের ধরা ছোঁয়ার বাইরে। আবার রূপান্তরিত বিদেশি মুদ্রা বিদেশি বিনিয়োগ হিসাবে দেশে ফিরে আসে। অসংখ্য সংস্থা আছে যারা সরকারের নজর এড়িয়ে কালো টাকাকে সাদা করে দেয় যাকে ইংরেজিতে বলে Money Laundering.

কাজেই কালো টাকা-ঠাকা নয়, এর মধ্য দিয়ে সরকার দেশের সমস্ত জমা নগদ ব্যাঙ্কজাত করে দিল। এখানেই সরকারের শেষ দাবিটিকে প্রাসঙ্গিক মনে হচ্ছে — আমরা মুদ্রাহীন অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় যাওয়ার চেষ্টা করছি।

আসলে মুদ্রাহীন ব্যবস্থার মানে কি? ক্রেতার কাছে কোনো নগদ টাকা থাকবে না। সে কার্ডের (ডেবিট বা ক্রেডিট) মাধ্যমে জিনিস কিনবে। এমনকি ইন্টারনেট সংবলিত একটি মোবাইল ফোন থাকলেই (যেমন পে টি এম) সে জিনিস কিনতে পারবে। নোটের কোনো দরকার থাকবে না। এটা ইতিমধ্যেই আমাদের দেশে আছে। এই যে নগদহীন দেড় মাসে ভারতবর্ষের বড়লোক এমনকি মধ্যবিত্তদের একটা অংশেরও খুব একটা অসুবিধা হয়নি এর জন্য। এ দেড় মাসে বাকি সব কিছুর চাহিদা কমেছে বেড়েছে কেবল কার্ড এবং পে টি এমের। নগদহীন অর্থনীতির মানে পরিমাণটা বাড়ানো।

আমাদের দেশে যত খুচরো লেনদেন হয় তার শতকরা ৯৮% হলো নগদে, আর লেনদেনের টাকার পরিমাণের ৭০% হলো নগদ টাকা। নগদহীন অর্থনীতি মানে এই পরিমাণটাকে দ্রুত কমিয়ে আনতে হবে। এই গোটা কাণ্ডটি ঘটানোর জন্য যে কার্ড দরকার আমাদের দেশের সেই কার্ডের মোট সংখ্যা ৭৫ কোটি। কিন্তু কার্ডের মালিকের সংখ্যা এর ধারে কাছেও না। কারণ কার্ডের মালিকদের অধিকাংশরই একাধিক কার্ড। একাধিক ব্যাঙ্কের এবং ডেবিট এবং ক্রেডিট উভয় ধরনের। (ডেবিট কার্ড হলো ব্যাঙ্কের অ্যাকাউন্টে একজনের যত টাকা থাকে সর্বাধিক প্রায় সেই পরিমাণের টাকা সে কার্ডের মাধ্যমে খরচ করতে পারবে। ক্রেডিট কার্ডে ব্যবহার করা যায় ব্যাঙ্কে এক পয়সাও না থাকলে। একটি সর্বচ্চোসীমা কার্ড কোম্পানি নির্দিষ্ট করে দেয়। এই পরিমাণের টাকা এই কার্ডের মাধ্যমে একজন খরচ করতে পারে এবং নির্দিষ্ট তারিখে প্রতি মাসে সে যত টাকা নিয়েছে সেই টাকা শোধ করতে হয়। শোধ না করলে বিপুল পরিমাণের সুদ দিতে হয়। তবে দু’ধরনের কার্ডেই প্রতি কেনাকাটায় একটি সার্ভিস চার্জ দিতে হয়। বছরে একবার কার্ডটিকে রিনিউ করতে হয় টাকা দিয়ে) আপাতত আমাদের ঘোষিত লক্ষ্য দেশের অধিকাংশ মানুষকে কার্ড সংবলিত করতে হবে।

মোবাইল ফোনের মাধ্যমে চলে পে টি এম। আগেই সেখানে টাকা রাখতে হয় ব্যাঙ্ক থেকে ইন্টারনেটের মাধ্যমে। তারপর মোবাইল ফোন থেকে টাকা দিতে হয়। এছাড়াও একটি আধা নগদহীন ব্যবস্থা আছে, সেটা বেশ চালু পদ্ধতি। আমার পকেটে টাকা থাকবে না, কিন্তু কোনো একটি জিনিস কিনতে গেলে এ টি এম (Automated Teller Machine) কার্ড দিয়ে সেই পরিমাণ টাকা এ টি এম থেকে তুলে নিয়ে কিনে নাও। কিন্তু এর প্রতিটি আম-ভারতীয়র ক্ষমতার বাইরে। আমাদের দেশের মতো বিশাল একটি দেশে এ টি এম-এর সংখ্যা মাত্র ২.৩লক্ষ। কার্ড ব্যবহার করতে হলে বিক্রেতার কাছে নেট সংবলিত একটি টার্মিনাল থাকতে হবে। এরকম যন্ত্র এই মুহূর্তে দেশে আছে মাত্র ১৪ লাখ দোকানে। আর পে টি এম-এর ক্ষেত্রে ক্রেতা এবং বিক্রেতা দু’জনের কাছেই অন্তত ৩জি নেটওয়ার্ক সংবলিত স্মার্টফোন থাকতে হবে।

কবে ১৩০কোটির দেশ নগদহীন হবে? জনসংখ্যার তুলনায় এই ব্যবস্থা আমাদের দেশে খুব দুর্বল, এমনকি পৃথিবীর সবচেয়ে পিছিয়ে থাকা একটি দেশের মধ্যে পড়ি আমরা। আর এর থেকেও বড় পরিকাঠামোগত সমস্যা তো আছেই। দেশের কত অংশে নেটওয়ার্ট আছে? দেশে টেলিফোন ব্যবহার করতে পারে কত মানুষ? ৫১% গ্রামে টেলিফোন নেই। লেখাপড়া জানে না কত জন? প্রায় ৩০কোটি। ইংরেজি পড়তে পারে কত অংশ? ২০%। দারিদ্র্যসীমার নিচে আছে কত অংশের মানুষ? ২৭কোটি। ২৩.৩ কোটি মানুষের কোনো ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টই নেই। এর মধ্যে ৪৩% ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে কোনদিন কোনো লেনদেন হয় না। কার্ড বা এ‍‌ টি এম বা স্মার্টফোনের সংখ্যা যা, তাও প্রধানত শহরাঞ্চলে — বিস্তীর্ণ গ্রাম প্রায় মরুভূমি। তবে কি করে আমরা নগদহীন হব?

একটি নগদহীন অর্থনীতি করা যায় বা করার প্রয়োজন এরকম কথা দু’দিন আগেও দেশের সাধারণ মানুষ ভাবেনি। এগুলো আমরা নতুন শুনছি। আমরা জানছি সুইডেনই নাকি পৃথিবীতে প্রথম নগদহীন দেশ হবে। আমরাও খোঁজ নেবার চেষ্টা করছি — কি করে সুইডেন এরকম হলো? এবং বুঝবার চেষ্টা করছি আমরা কি করে সুইডেন হব? সুইডেন মাথা পিছু আয়ে পৃথিবীর সব চেয়ে বড়লোক একটি দেশের মধ্যে পড়ে। মানব উন্নয়ন সূচকেও সুইডেন প্রথম সারিতে। সুইডেনের সরকার ঘোষণা করেই নগদহীন অর্থনীতির দিকে এগোচ্ছে। অবশ্য এর মানে এই না যে সুইডেনে নগদ টাকার কোনো ব্যবহার নেই। সুইডেনের ৫৯% বেচাকেনা হয় নগদ ছাড়া। এ প্রশ্নে সর্বোচ্চ জায়গায় আছে সিঙ্গাপুর ৬১%। আমাদের দেশে এটা মাত্র ২%। কিন্তু এ বিষয়ে পরিষ্কার ধারণা থাকা ভালো এটা প্রধানত খুচরো বিক্রি। দেশের বড় ব্যবসা বাণিজ্যের একটা বড় অংশ চিরকালই নগদহীন। টাটা স্টিল যখন ইন্ডিয়ান অয়েল থেকে জ্বালানি কেনে বা আম্বানিরা রেলের মাধ্যমে মাল পাঠালে নগদে রেলকে ভাড়া দি‍‌তে হয় না। সেটা সরাসরি ব্যাঙ্কের মাধ্যমে হয়। যত সমস্যা সাধারণ ক্রেতার। গোটা পৃথিবীতেই এটা নিয়ম।

সরকার বলছে বলেই সুইডেনে সবাই নগদহীন পথে যাচ্ছে তা না। যদি টেকনোলজি জানা থাকে তবে এটি খুবই সুবিধার। কোন টাকা পয়সা সঙ্গে রাখার দরকার নেই, চুরি ছিনতাই, পকেটমারের দুশ্চিন্তা নেই। এখনও সুইডেনে নগদ চলে দূরবর্তী গ্রামীণ অঞ্চলে এবং বয়স্ক যারা নতুন টেকনোলজি ব্যবহার করতে পারে না তারা নগদ ব্যবহার করে। এটাও কমে আসছে। সুইডেনের ব্যাঙ্কগুলো তাদের এ টি এম-গুলো বন্ধ করে দিচ্ছে। সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রতিষ্ঠান এখন নগদ নেয় না।

কিন্তু এখানেই শেষ না। উন্নত পুঁজিবাদী অর্থনীতিতে ব্যাঙ্কে সুদের হার চিরকালই খুব কম। এখন সেই সুদের হারকে ঋণাত্মক জায়গায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে। অর্থাৎ তুমি ব্যাঙ্কে টাকা রাখলে তোমাকে ব্যাঙ্ক কোনো সুদ দেবে না। বরং তোমার টাকা রে‍‌খেছে বলে ব্যাঙ্ক ‍‌তোমার টাকা কাটবে। তোমার জমা রাখা টাকা প্রতি বছরে কমবে। এই ঘটনা প্রধানত ঘটছে উন্নত পুঁজিবাদী দেশে বিশেষত পশ্চিম ইউরোপে। এবং দেখা যাচ্ছে যে, যত Cash Less তত তার সুদের হার কম। এই বছরের আগস্ট মাসের হিসাব অনুযায়ী ঋণাত্মক সুদের হার — ডেনমার্ক -০.৬৫%, জাপান, -০.১০%, সুইজারল্যান্ড -০.৭৪%, সুইডেন -০.৫০%। যে সমস্ত দেশে নগদহীন অর্থনীতির প্রসার বেশি হয়েছে সেখানে ব্যাঙ্কের সুদ কমতে কমতে ঋণাত্মক জায়গায় গিয়ে পৌঁচেছে, দু’টি সম্পর্কযুক্ত। সুদের হার কম মানে বিনিয়োগের জন্য অঢেল টাকা খুব কম সুদে পাওয়া যায়

এখন সুইডেনে বা নগদহীন অর্থনীতির যে কোনো নাগরিকের সামনে কি কি পথ খোলা রইল। তার অর্জিত অর্থ নগদে সে ঘরে রাখতে পারবে না, কারণ সেই নগদ টাকায় সে কোনো কিছু কিনতে পারবে না, কারণ নগদে কেউ কিছু বিক্রি করবে না। একটাই পথ গোটা টাকাটা তাকে ব্যাঙ্কে রাখতে হবে। কিন্তু ব্যাঙ্কে রাখলে ঋণাত্মক সুদের কারণে তোমার টাকার একটা অংশ ব্যাঙ্ক কেটে নেবে, তোমার সঞ্চয়ের পরিমাণের ক্রমাগত ক্ষয় হবে। অন্য পথ হলো সঞ্চয়ের টাকা নগদহীন ভাবে খরচ কর। যদি ব্যাঙ্কে টাকা রেখে দাও তবে সে টাকা নামমাত্র সুদে বিনিয়োগকারীর হাতে পৌঁছবে। আর যদি জিনিস কিনে সেই টাকা খরচ করো তাহলেও তোমার টাকার একটি অংশ মুনাফা হিসাবে মালিকের হাতে পৌঁছবে। অর্থাৎ তুমি যাই করো লাভ মালিকদের, তোমার নয় — অথচ টাকার মালিক তুমি।

আধুনিক পৃথিবীতে যে কোনো মানুষের সবচেয়ে মৌলিক যে অর্থনৈতিক অধিকার আছে তা হলো নিজের পরিশ্রমের মাধ্যমে আয় করার অধিকার। এই আয়ের একটি ছোটো অংশ রাষ্ট্রকে কর হিসাবে দিয়ে বাকি টাকাটার মালিক তুমি। তুমি ঠিক করবে সেই টাকা দিয়ে তুমি কি করবে।

সেই টাকা নিয়ে বাজারে গিয়ে তুমি ক্রেতা ঠিক করবে। কি কিনবে তা ঠিক করবে। তোমাকে এই অধিকার দেয় রাষ্ট্র। এক টুকরো কাগজে রাষ্ট্রের হয়ে রিজার্ভ ব্যাঙ্ক লিখে দেয় এই কাগজ যার হাতে সে এই টাকার মালিক। সেই পরিমাণটিও কাগজে ছাপা থাকে। এই হলো নগদ টাকা। এই গোটা প্রক্রিয়ায় সে স্বাধীন এবং নোটের বিনিময়ে পণ্য বিক্রি করবে যে বিক্রেতা সেও স্বাধীন। দুই স্বাধীন নাগরিকের মধ্যে কোনো তৃতীয় ব্যক্তি থাকবে না। নগদহীন অর্থনীতিতে এই মৌলিক অর্থনৈতিক স্বাধীনতার অবসান। এক, তুমি তোমার টাকা নিয়ে কি করবে সেটা পুরোপুরি তুমি ঠিক করবে না। সেটা ঠিক করবে সরকার অথবা সরকারের হয়ে ব্যাঙ্ক, সে ব্যাঙ্ক রাষ্ট্রায়ত্ত হতে পারে, বেসরকারিও হতে পারে, দেশি ব্যাঙ্ক পারে, বিদেশি ব্যাঙ্কও হতে পারে।

ক্রেতা এবং বিক্রেতার মধ্যেকার স্বাধীন দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কেরও কোনো অস্তিত্ব নগদহীন ব্যবস্থায় থাকবে না। তুমি বিক্রেতাকে সরাসরি জিনিসের দাম দিতে পারবে না। তোমার হয়ে তৃতীয় পক্ষ দাম দেবে। সে তৃতীয় পক্ষ হতে পারে ব্যাঙ্ক হতে পারে যে কোম্পানির কার্ড তুমি ব্যবহার করছ সেই কোম্পানি। তুমি বিক্রেতাও সব সময় স্বাধীনভাবে ঠিক করতে পারবে না। বিজ্ঞাপন দিয়ে ডিসকাউন্ট দিয়ে কার্ডের কোম্পানি তোমাকে প্রভাবিত করবে বিশেষ কোম্পানির জিনিস কিনতে। এমনকি চরম ক্ষেত্রে কোনো বিশেষ বিক্রেতাকে টাকা দিতে অস্বীকার করতে পারে সে। তুমি কোনো একটি সংগঠন, বা রাজনৈতিক দলকে টাকা দিতে চাও। কার্ডের কোম্পানি সরকারি বির্দেশ উল্লেখ করে সেই টাকা দিতে অস্বীকার করতে পারে। পৃথিবী জোড়া কার্ডের ব্যবসাকে নিয়ন্ত্রণ করে দু’টি মার্কিন কোম্পানি — ভিসা এবং মাস্টারকার্ড। এদের ক্ষমতা বোঝাবার জন্য ভিসার উদাহরণ দেওয়া যায়। ২০১৫ সালে গোটা পৃথিবীর ১লক্ষ কোটি লেনদেন হয়েছে ভিসার মাধ্যমে। এতে লেনদেন হয়েছে ৬.৮ ট্রিলিয়ন ডলার। পৃথিবীর ২৫০০০ ব্যাঙ্কের হয়ে ভিসা কাজ করে। এরা সিদ্ধান্ত ক’রে উইকিলিক্সের ‍‌(যারা সমস্ত গোপন ইলেকট্রনিক বার্তা ফাঁস করে সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলোকে বেআব্রু করে দিয়েছে।) টাকা দেওয়া বন্ধ করে দিয়েছে। একইভাবে কয়েকটি বিশেষ রাশিয়ান ব্যাঙ্কের আন্তর্জাতিক লেনদেন বন্ধ করে দিয়েছে এরা। এবং এই তথাকথিত ‘তৃতীয় পক্ষ’ মাগনায় কোনো কাজ করে না। নগদ ভিত্তিক অর্থনীতিতে ক্রেতা নগদে দাম দেয়, বিক্রেতা তার মাল দেয়। এর মধ্যে আর কোনো টাকা পয়সার লেনদেন থাকে না। কিন্তু নগদহীন ব্যবস্থায় এই তথাকথিত ‘তৃতীয় পক্ষ’ প্রতিটি লেনদেন থেকে টাকা পায়, ক্রেতা এবং বিক্রেতা উভয়ের কাছ থেকে। এবং এই টাকা তারা দিতে বাধ্য।

আজ গোটা দুনিয়া জুড়ে নগদহীন অর্থনীতির দাবিতে সমস্বরে কোলাহল করা হচ্ছে। তাতে গলা মিলিয়েছে রাজনৈতিক নেতা, বড় বড় কোম্পানি, নিজের ভালো-মন্দ না বোঝা কিছু মূর্খ মানুষ। কিন্তু সবচেয়ে সজোরে চেঁচাচ্ছে এই ‘তৃতীয় পক্ষ’ কোম্পানিগুলো। নগদ ১০টাকা দিয়ে কেউ যদি এক কিলো আলুও কেনে তাহলে এই তৃতীয় পক্ষরা মনে করে তাদের সুযোগ হাতছাড়া হয়ে গেল।

পৃথিবীতে ২০০৮ থেকে লাগাতার সংকট চলছে — নতুন বিনিয়োগ নেই, বাজারে স্থায়ী মন্দা, কর্মসংস্থান তলানিতে। তথাকথিত নগদহীন অর্থনীতি এবং সুদের হার শূন্যের কাছাকাছি নামিয়ে চেষ্টা চলছে মানুষের কষ্টার্জিত সম্পদকে ব্যবহার করে বাজার চাঙ্গা করতে, নতুন বিনিয়োগ ব্যবস্থা করতে। এবং এই প্রক্রিয়াটাই এক কথায় একটি নিকৃষ্ট রাহাজানিতে পরিণত হয়েছে।

এই রাহাজানির তালিকায় আমাদের দেশ থাকবে না, এ হয় না। নোট বাতিলের সিদ্ধান্তের প্রাথমিক কারণও একটি বিশুদ্ধ রাহাজানি। বেসরকারিকরণের ঢাক গত ২৫বছর ধরে বাজানো হচ্ছে, কিন্তু তা সত্ত্বেও দেশের ব্যাঙ্কিং ব্যবস্থাকে এখনও নিয়ন্ত্রণ করে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কগুলো। দেশের মোট আমানতের ৭২%-ই আছে ১৯টি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কের কাছে। মোদীর ‘আচ্ছে দিনের’ ছোঁয়া এই ব্যাঙ্কের গায়েও লেগেছে। ২০১৪-১৫ সালে এই ব্যাঙ্কগুলোর সম্মিলিত লাভের পরিমাণ ছিল ৩৬হাজার কোটি টাকা। আর এ বছরে লাভ উলটে ক্ষতি হয়েছে প্রায় ১৮হাজার কোটি টাকা। এটা যে কোনো ব্যাঙ্কের ক্ষেত্রে একটি অশনি সংকেত। বিপদটা সরকারও বুঝেছিল।

কিন্তু রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কের এই দুরবস্থার একটিই কারণ — তারা যে টাকা ধার দিয়েছিল তার একটা বড় অংশ তারা ফেরত পায়নি। এই পরিমাণটা আঁতকে ওঠার মতো, প্রায় ১১লক্ষ কোটি টাকা। এবং এটা প্রধানত হয়েছে দেশের অর্থনীতির মাতব্বররা তাদের ধারের টাকা ফেরত দেয়নি বলে। এই বকেয়ার তালিকায় শীর্ষস্থানে আছে অনিল আম্বানি। প্রধানমন্ত্রীর অনুজতুল্য গৌতম আদানীর বকেয়ার পরিমাণও বিপুল। মার্কিনী পরামর্শদাতারা ম্যাকিনসে সরকারকে সাবধান করে যদি অবিলম্বে সরকার যথেষ্ট পরিমাণ মূলধন এই ব্যাঙ্কগুলোতে বিনিয়োগ না করে তবে দেশে গোটা ব্যাঙ্ক ব্যবস্থাটা ভেঙ্গে পড়বে। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কের কাছেই জমা আছে দেশের ৭২% টাকা। সরকার নীতিগতভাবে এই প্রস্তাব মেনে নেয়। কিন্তু ‘আচ্ছে দিন’-র ঠেলায় সরকারেরও ‘ভাঁড়ে মা ভবানী’। এই টাকা সরকার দিতে পারেনি। নোট বাতিল করে মানুষের ওপর এই বোঝা চাপিয়ে দিয়েছে সাধারণ মানুষের ওপর। আমার আপনার মেয়ের বিয়ের জন্য জমানো টাকা, মায়ের চিকিৎসার জন্য সামান্য সংস্থান — এই সব নিয়ে আমরা ব্যাঙ্কের লাইনে দাঁড়াতে বাধ্য হলাম, কারণ আম্বানি, আদানী বিজয় মালিয়ারা ফুর্তি করে টাকা উড়িয়েছে, ব্যাঙ্কের ধার শোধ করেনি। এদের কিছু হবে না কিন্তু আমার আপনার পকেট থেকে ১৪.৫০ লক্ষ কোটি টাকা সরকার তুলে নিয়ে চলে গেল এ ক’দিনে ব্যাঙ্ক বাঁচাতে। অথচ আমরা কোনো অপরাধ করিনি।

এটা গেল প্রাথমিক কারণ — কিন্তু চূড়ান্ত লক্ষ্য ‘নগদহীন অর্থনীতি’। দেশের বর্তমান অবস্থায় এটা অসম্ভব এটা কেবল আমি, আপনি জানি তাই নয়, নরেন্দ্র মোদীও জানেন। যে দেশের ৩৫কোটি মানুষের দৈনিক আয় ৪০টাকারও কম, যে দেশের সিংহভাগ গরিব মনুষ দৈনিক আয়ের ওপর নির্ভরশীল সে দেশে নগদহীন অর্থনীতি আসতে শতাব্দী পার হয়ে যাবে। তাহলে? যেটুকু আছে তাই বা কম কিসের? National Council of Applied Economics Research (NCAER)-এর দেওয়া হিসাব অনুযায়ী দেশে মধ্যবিত্তের সংখ্যা ২৬.৭ কোটি আর দশ বছর পরে এই সংখ্যা দাঁড়াবে ৫৪.৭ কোটি। মধ্যবিত্ত মানে যার যথেষ্ট ক্রয়ক্ষমতা আছে, উল্লেখযোগ্য পরিমাণে সঞ্চয় আছে — এটি একটি বিশাল বাজার। সংখ্যার দিক থেকে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় অর্থনীতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জনসংখ্যার সমান। দেশের সবচেয়ে গরিব যে অংশ, প্রায় কাছাকাছি। দেশের অর্থনীতি যাদের ভূমিকা ন্যূনতম — তাদের গোল্লায় পাঠিয়েও যা পড়ে থাকে তাকে যদি নগদহীন ব্যবস্থার ছাঁচের সঙ্গে এনে ফেলা যায় তাহলেই হলো — দেশ লুণ্ঠনের সোনার খনি হয়ে যাবে। যত সঞ্চয় কমবে সেই অনুপাতে বাজার বাড়বে, বিনিয়োগ বাড়বে, মুনাফা বাড়বে। আমাদের দেশে বর্তমানে বিনিয়োগ প্রায় নেই। কর্মসংস্থান বন্ধ। দেশের সাধারণ মানুষের জন্য এদের কিছু যায় আসে না, কিন্তু কর্পোরেটের মুনাফাতেও তো টান পড়বে। গরিব ছিলই, এখন এই মধ্যবিত্তের মাথায় নগদহীন কাঁঠালটি ভাঙলে বড়লোকদের ‘আচ্ছে দিন’ আসবেই আসবে।

এবং এতে এক ঢিলে দুই পাখি মরবে। দেশের ব্যাঙ্কিং ব্যবস্থাটাও ধীরে ধীরে প্রাইভেট এবং বিদেশি ব্যাঙ্কের হাতে তুলে দেওয়া যাবে। ব্যাঙ্কের সাধারণ আমানত প্রধানত আসে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কে। কিন্তু নগদহীন ব্যবস্থার গোটাটা ছুটবে ইলেকট্রনিক বিনিময়ের দিকে। যেমন আমাদের দেশে বর্তমানে কার্ডের মাধ্যমে যে লেনদেন হয় তার ৫৪% হয় প্রাইভেট ব্যাঙ্কের মাধ্যমে, ২২% হয় বিদেশি ব্যাঙ্কের মাধ্যমে। আর বাকি ২৬% লেনদেনও পুরোপুরি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কের মাধ্যমে হয় না, অল্প হলেও কিছু সমবায় ব্যাঙ্কও দেশে কার্ড ব্যবসায় ঢুকেছে, তাদেরও একটা ভাগ থাকবে। Cash Less ব্যবস্থা আসলে ধাপে ধাপে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্ক — less ব্যবস্থায় পরিণত হবে। আম্বানি, আদানী, বিজয় মালিয়াদের একটু অসুবিধা হবে। কারণ রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কের টাকা তারা যেভাবে লুট করতে পারে প্রাইভেট ব্যাঙ্কের থেকে সেটা করা যাবে না। এতে দুঃখ করে কোনো লাভ নেই। পাকা আমের যতটা রস ছিল সব তারা খেয়েছে — এখন আঁটি নামক রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্ক ছুঁড়ে ফেলতে হবে। আর এস এস-প্রণীত দেশপ্রেমের গানে জয় ভারত, জয় মোদীর সাথে জয় ভিসা, জয় মাস্টারকার্ড এটাও যুক্ত হবে। আমরা সত্যি সত্যিই আধুনিক হব।


   সৌজন্যেঃ গণশক্তি

Cashless Economy of Chikalthana

November 25, 2016

চিকলথানার ক্যাশলেস ইকনমি

পি সাইনাথ

1111

নোট বাতিলে মহারাষ্ট্র জুড়ে বিপর্যস্ত কৃষক, ভূমিহীন খেতমজুর, পেনশনভোগী, ছোট ব্যবসাদার ও আরো আরো অনেকে। মোদীর ‘মাস্টার স্ট্রোকে’ তাঁদের সেই জীবনযন্ত্রণাই তুলে ধরলেন স্বনামধন্য সাংবাদিক পি সাইনাথ

এখানে এলে মনে হতেই পারে প্রধানমন্ত্রী মোদীর ক্যাশলেস ইকনমির খোয়াব বাস্তবায়িত হয়েছে। মহারাষ্ট্রের ঔরঙ্গাবাদ শহরের একেবারে গা ঘেঁষে থাকা এই চিকলথানা গ্রামে সেই স্বপ্ন ঘোর বাস্তব। এখানে কারও হাতে কোনো নগদ টাকা নেই। ব্যাঙ্ক ও, এটিএম-এও নেই। তাই সেগুলির আশপাশে একবুক হতাশা নিয়ে মানুষের আনাগোনা, লাইন কোনোটাই নেই। এমনকি ব্যাঙ্কের শাখার বাইরে ভ্যানে বসা কোনো পুলিশকর্মীকে ওই চৌহদ্দিতেই নজরে পড়বে না।তবে চিন্তার কিছু নেই। খুবই শীঘ্রই ওই গ্রামের মানুষও তাঁদের আঙ্গুলে কালির দাগ দেখতে পাবেন।

চলুন ঘুরে আসা যাক দুর্গ শহর ঔরঙ্গাবাদের ভেতর থেকে। স্টেট ব্যাঙ্ক অব হায়দরাবাদের শাহগঞ্জ শাখায় ঢুকলেই নজরে পড়বে মরিয়া ব্যাঙ্ককর্মীরা তাঁদের গরিব ক্লায়েন্টদের সাহায্য করার জন্য ‘সংগ্রামরত’। সেখানে কেন, শহরের অন্য শাখা, প্রত্যেকটি শাখায় এখন ছেঁড়া-ফাটা ৫০, ১০০টাকার নোট ঝাড়াই-বাছাই চলছে। চূড়ান্তভাবে নষ্ট করে ফেলার জন্য এগুলির সবকটিই রিজার্ভ ব্যাঙ্কে পাঠানোর কথা। উপায় না দেখে এখন সেই বাতিল নোটই আবার নতুন করে বিলি করার ব্যবস্থা হচ্ছে। রিজার্ভ ব্যাঙ্কও বিষয়টা ভালোই জানে, কিন্তু নীরবতা দিয়েই ব্যাপারটা উপেক্ষা করে চলেছে।

‘‘আমাদের আর কীই বা উপায় আছে?’’ জানতে চাইছেন এই সমস্ত ব্যাঙ্কের কর্মীরা। ‘‘লোকের তো এখন ছোট নোট দরকার। ওদের সমস্ত কাজকর্ম, লেনদেন বন্ধ হয়ে রয়েছে।’’ ব্যাঙ্ককর্মীদের সঙ্গে কথার মাঝেই সেখানে এসে হাজির জাভেদ হায়াত খান। ঠেলাওয়ালা, বাড়ি বাড়ি জিনিস ফেরি করে পেট চলে। রবিবার ব্যাঙ্কের বাইরে প্রায় এক কিলোমিটার লাইন পেরিয়ে যখন ব্যাঙ্কের দোড়গোড়ায় পৌঁছালেন, তাঁর হাতে ধরা মেয়ে রশিদা খাতুনের বিয়ের কার্ড।

‘‘সবমিলিয়ে আমার অ্যাকাউন্টে ২৭হাজার টাকা রয়েছে।’’ বলছিলেন, ‘‘তিন সপ্তাহ পরে মেয়ের বিয়ে, আর আমাকে বলা হচ্ছে মেয়ের বিয়ের জন্য মাত্র দশ হাজার টাকা তোলা যাবে। আমিই আমার টাকা তুলতে পারবো না।’’ আগের দিন দশহাজার টাকা তুলে নিয়ে যাওয়ায় ব্যাঙ্ক তাঁকে ফেরত পাঠাচ্ছে। যদিও আজও তাঁর ওই একই টাকা তোলার এক্তিয়ার রয়েছে। কারণ ব্যাঙ্ককর্মীদের আন্দাজ, যেভাবে ব্যাঙ্কের চারপাশে সর্পিল লাইন বেড়ে চলেছে তার জন্য তাদের হাতে থাকা টাকা যথেষ্ট নয়। আর তাঁরা চাইছেন এই লাইনগুলির প্রত্যেকে যেন কিছু না কিছু টাকা পান। এঁদেরই দুজন এখন জাভেদকে সাহায্য করতে চান। তাঁরাই জানালেন, মেয়ের বিয়ের জন্য ফিক্সড ডিপোজিট ভাঙিয়ে ওই টাকা তাঁর অ্যাকাউন্টে এসেছে।

বহু নিবন্ধকার, বিশ্লেষক আর সরকারি রিপোর্ট এরই মধ্যে তুলে ধরেছে, ভারতের ‘কালো’ অর্থনীতির বড় অংশটাই রয়েছে সোনা-রুপোর বাজার, বেনামী জমির কারবার ও বৈদেশিক মূদ্রার কবলে। পুরানো কাঠের সিন্দুকে ঠাকুমার জমিয়ে রাখা নোটের গাদায় নয়। ভারত ও বিদেশের কালো টাকা মোকাবিলায় পদক্ষেপ সম্পর্কে ২০১২সালের একটি রিপোর্টে এই কথাটাই বলেছিলেন সেন্ট্রাল বোর্ড অব ডাইরেক্ট ট্যাক্সের চেয়ারম্যান। ১৯৪৬ ও ১৯৭৮-এ অতীতের দু-দুবার টাকা বাতিলের ‘শোচনীয়ভাবে ব্যর্থতার’ কথাও ওই রিপোর্টে তুলে ধরা হয়েছিল (পৃষ্ঠা ১৪, পার্ট টু, ৯.১)। তা সত্ত্বেও সেই একই কাজের পুনরাবৃত্তি করলো বিজেপি সরকার। এমন একটা অবিশ্বাস্য নির্বুদ্ধিতার কাজকে বাহবা দিতে হরেক কিসিমের অ্যাঙ্কর আর টেলিভিশন ভাঁড়রা ‘মোদীর মাস্টারস্ট্রোক’ বলে গলা ফাটাচ্ছে, তা আসলে গ্রাম ভারত জুড়ে মর্ম বেদনা আর দুর্গতিই ছড়াচ্ছে। এতে যদি কারও ‘স্ট্রোক’ হয়ে থাকে তা হলো ওই গ্রামীণ অর্থনীতির হৃদয়েই।

আর সেই স্ট্রোকের ধাক্কা থেকে সেরে উঠতে কতটা সময় লাগতে পারে তা প্রথমেই গুলিয়ে দিলেন কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী ও তাঁর দলীয় সহকর্মীরা, ২-৩দিনের অস্বস্তি বলে। ড. জেটলি আবার পরে তা শুধরে নিয়ে বললেন ২-৩সপ্তাহ। ঠিক তারপরই তাঁর সিনিয়র সার্জেন, নরেন্দ্র মোদী, বললেন যে রোগীর স্বাস্থ্যের পুনরুদ্ধারে তাঁর ৫০দিন সময় চাই। তাহলে ২০১৭-তেও চলবে আমাদের এই চিকিৎসা পর্ব। আমরা জানি না এর মধ্যে দেশজুড়ে আরো কত মানুষ লাইন দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে করতে মরে যাবেন, তবে প্রতিদিন তাঁদের সংখ্যা বাড়বে।

‘‘নাসিকের লাসালগাঁওতে, কিষানরা নগদ সংকটে পেঁয়াজ বাজারই বন্ধ করে দিয়েছে’’, খবর দিলেন আধুনিক কিষান সাপ্তাহিকীর সম্পাদক নিশিকান্ত ভালেরাও। ‘‘বিদর্ভ আর মারাঠাওয়াড়ায় তুলোর দাম প্রতি কুইন্টালে ৪০শতাংশ পড়ে গেছে।’’ সামান্য কিছু লেনদেন ছাড়া বিক্রিবাটা বন্ধ হয়ে রয়েছে। ‘‘কারও হাতে কোনো ক্যাশ নেই। কমিশন এজেন্ট, পণ্য উৎপাদন, ক্রেতা সকলেই সমানভাবে সমস্যার মধ্যে রয়েছেন,’’ জানালেন দ্য টেলিগ্রাফের নাগপুরের সাংবাদিক জয়দীপ হারদিকার। ‘‘গ্রামীণ ব্যাঙ্কগুলিতে চেক জমা দেওয়া সবসময়েই একটা ক্লান্তিকর ব্যাপার ছিল আর এখন টাকা তোলা হলো একটা দুঃস্বপ্ন।’’

তাই, খুব কম কৃষকই চেক নেবে। কিন্তু কবে যে এগুলি দিয়ে টাকা তোলা যাবে তার অপেক্ষায় থাকলে ওদের সংসার চলবে কী করে? অনেকেরই আবার চালু কোনো ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টই নেই।

এই রাজ্যের একটা গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কের সারা দেশে ৯৭৫টা এ টি এম রয়েছে। তার মধ্যে ৫৪৯টা হতাশা ছাড়া আর কিছুই পরিবেশন করছে না। ওই অচল এ টি এম-গুলির বেশিরভাগই গ্রামীণ এলাকায়। এর প্রভাবের একটা ছেঁদো যুক্তি খাড়া করা হয়, ‘‘গ্রামীণ এলাকা ধারের উপরেই চলে। নগদের এখানে কোনো মানেই নেই।’’ সত্যিই? এটাই এখানে সবকিছু।

একেবারে নিচের স্তরে লেনদেনের সিংহভাগটাই চলে নগদে। এক সপ্তাহের মধ্যে ছোট নোট না পৌঁছালে আইন-শৃঙ্খলার সমস্যার ভয় পাচ্ছেন ছোট গ্রামীণ শাখার ব্যাঙ্ককর্মীরা। অন্যরা বলছেন, সংকট তো এর মধ্যেই রয়েছে। এই সময়ের মধ্যে কিছু নগদ এলেও তা কিছুই কমবে না।

ঔরঙ্গাবাদে আরেকটা লাইনের সামনে দাঁড়িয়ে ভয়ে সিঁটিয়ে পারভেজ পাঠান। এক কনস্ট্রাকশন সাইটের সুপারভাইজার। ভয় পাচ্ছেন কখন তাঁর সাইটের শ্রমিকরা খেপে গিয়ে তাঁকে মারতে আসেন। ‘‘ওরা তো ওদের কাজ করেছে, ওদের তো পয়সা দিতে হবে।’’ বলছিলেন, ‘‘কিন্তু আমার হাতে কোনো নগদ টাকা নেই।’’ চিকলথানা গ্রামে, রাইস আখতার খান বলছিলেন, তিনি আর তাঁর মতোই কমবয়সি অন্য মায়েদের এখন ছেলেমেয়ের জন্য খাবার জোগাড়ই দায় হয়েছে। কখনই বা তাঁরা করবেন এসব। ‘‘কারণ দিনের বেশিরভাগটাই তো চলে যাচ্ছে লাইন দিতে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা চলে যাচ্ছে, ছেলেমেয়েগুলো অভুক্ত থেকে যাচ্ছে।’’

লাইনে দাঁড়ানো বেশিরভাগ মহিলাই বলছেন, তাঁদের হাতে ২-৪দিনের সুযোগ আছে। খুব কষ্ট করেও তাঁরা এমনটা ভাবতে পারছেন না, তার মধ্যে ক্যাশ ফ্লো’র সমস্যা মিটে যাবে। হায়! সমস্যা মেটার নয়।

কৃষক, ভূমিহীন খেতমজুর, গৃহপরিচারক, পেনশনভোগী, ছোটখাটো ব্যবসাদার, আরও অনেকে- সকলেই ভয়ানক আঘাতের মুখে। এমন অনেকেই রয়েছেন যাঁরা শ্রমিকদের কাজে লাগাতে গিয়ে ধারের খাতায় চলে যাবেন, মজুরি মেটাতে টাকা ধার করতে হচ্ছে। আবার অন্যদের মতো তাঁদের খাবার কিনতে পয়সা জোগাড় করতে হচ্ছে। ঔরঙ্গাবাদ স্টেশন রোডে স্টেট ব্যাঙ্ক অব হায়দরাবাদের শাখার এক কর্মী জানালেন, ‘‘যত দিন যাচ্ছে, আমাদের লাইন বেড়েই চলেছে, কমার নাম নেই।’’ হাতে গোনা এই সামান্য কর্মী নিয়ে এই বিপুল পরিমাণ লোক সামাল দেওয়া মুখের কথা। আরেক কর্মী আবার তুলে ধরলেন সফটওয়ারের ত্রুটির কথা, যা পরিচিতিপত্র ও অন্যান্য কাগজপত্র যাচাইয়ের জন্য পাঠানো হয়েছে।

লোককে দুটো ২০০০টাকা নোটের জন্য সর্বোচ্চ আটটা ৫০০ কিংবা চারটি ১০০০টাকা নোট বদলের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। এটা এককালীন লেনদেন। ‘‘হ্যাঁ, পরদিনই যদি আপনি আবার চেষ্টা করেন তাহলে আপনার ধরা পড়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু আপনি এই ফাঁদ এড়িয়ে যেতে পারেন। কিছুই না, কেবল একটা অন্য আইডি ব্যবহার করুন। আজ যদি আপনি আধার কার্ড ব্যবহার করেন, কাল তাহলে আপনার পাসপোর্ট নিয়ে আসুন, তার পরদিন আনুন প্যান কার্ড, ধরা না পড়েই আপনি বারে বারে টাকা বদলে যেতে পারবেন।’’

এখন, বাস্তবে যদিও কম লোকই এমনটা করছেন। বেশিরভাগই সিস্টেমের এই ত্রুটির কথাটা জানেই না। কিন্তু সরকারের প্রতিক্রিয়া উন্মাদের মতো। ওরা এখন লোকের হাতে ভোটের কালি লাগানোর কথা ঠিক করেছে। কালি লাগানো হবে ডানহাতে যাতে যেখানে যেখানে উপনির্বাচন রয়েছে সেখানে কোনো সমস্যা না হয়।

স্টেশন রোডের লাইনে দাঁড়ানো ছোট ঠিকাদার আর পাতিল বললেন, ‘‘সরকারের অর্ডার নিয়ে কখনো ভাববেন না।’’ ‘‘বাস্তবে কোথাও কোনো হসপিটাল বা ওষুধের দোকানে ৫০০ বা ১০০০-এর নোট নিচ্ছেই না।’’ পাতিলের পাশে দাঁড়ানো সঈদ মোদক বলে উঠলেন। পেশায় কাঠের মিস্ত্রি সঈদকে গুরুতর অসুস্থ এক নিকটাত্মীয়কে নিয়ে ক্লিনিকে ক্লিনিকে ঘুরতে হয়েছে। ‘‘প্রত্যেক জায়গা থেকে আমাদের ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে।’’ বলছিলেন, ‘‘হয় তারা ২০০০টাকার নোট নেবে না, নয়তো বলেছে, খুচরো নেই।’’

এরই মধ্যে গোটা ভারতের চোখ এখন নাসিকের উপর, সেখান থেকে নতুন ছাপা নোট বেরিয়ে আসবে। গ্রামাঞ্চলের কেউই এখনও তা হাতে পাননি। তবে সকলেরই আশা  তা ঘটবে।


   Courtesy: Ganashakti

Bank Defaulter Vijay Mallya Set Free

March 14, 2016

405870

Kanhaiya Kumar, The Pied Piper of JNU

February 22, 2016

অত্যাচারের বিরুদ্ধে কানহাইয়াদের বাঁশী

জিকো দাশগুপ্ত

Kanhaiya_Kumar_1

সংবাদমাধ্যমের অসংখ্য ক্যামেরার সামনেই দেশের আইন–সংবিধানকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে একদল ‘‌দেশপ্রেমী’‌ উকিল কোর্ট চত্বরেই কানহাইয়া কুমারকে মারলেন, আক্রান্ত হলেন এক সাংবাদিকও। দুষ্কৃতীরা চিহ্নিত হওয়া সত্ত্বেও পুলিস কাউকে গ্রেপ্তার করেনি। এই বিক্রম চৌহানরাই ঠিক দুদিন আগে বি জে পি বিধায়ক ও পি শর্মার নেতৃত্বে অধ্যাপক এবং সাংবাদিকদের মারধর করেছিলেন এই পাটিয়ালা কোর্টেই, তার প্রমাণও অসংখ্য, কেউ গ্রেপ্তার হননি। জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের গেটের বাইরে প্রতিদিন কয়েকশো উন্মত্ত হিন্দু পরিষদ–বজরং দলের কর্মী জে এন ইউ–র ‘‌দেশদ্রোহী’‌দের বিনা তদন্তে গ্রেপ্তার করার দাবি জানাচ্ছে, ক্যাম্পাসের ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করছে। সৌদি আরব বা আই এস–শাসিত অঞ্চলে হতে পারে, বা এ দেশের ‘‌মাওবাদী’‌রাও তাতে বিশ্বাস করতে পারে, তবে ‘‌ক্যাঙ্গারু’‌ কোর্ট চালিয়ে কাউকে দোষী সাব্যস্ত করার বা তাকে শাস্তি দেওয়ার অনুমতি আর যাই হোক ভারতীয় আইন–সংবিধান দেয় না।

তবে বেগুসরাইয়ের অঙ্গনওয়াড়ি সেবিকার পুত্র কানহাইয়া কুমারের ক্ষেত্রে অবশ্য গ্রেপ্তার করার মাপদণ্ডই আলাদা। এখনও একটাও প্রমাণ দেখাতে পারেনি, অথচ ‘‌দেশদ্রোহের’‌ মতো অভিযোগে তাকে গ্রেপ্তার করেছিল পুলিস। ৯ ফেব্রুয়ারি জে এন ইউ–তে যে সব প্রতিক্রিয়াশীল ভারতবিরোধী স্লোগান উঠেছিল, ছাত্র সংসদের তরফ থেকে আগেই দ্ব্যর্থহীন ভাষায় তার নিন্দা করেছেন কানহাইয়া। দেশের সংবিধানের ওপর সম্পূর্ণ আস্থা রেখে তার ভাষণ একটি সংবাদপত্রে পুঙ্খানুপুঙ্খ ছাপাও হয়েছে। এর মধ্যে কোনটা দেশদ্রোহ?‌

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর স্নেহভাজন দিল্লির পুলিস কমিশনার এখন বলছেন বেল চাইলে পুলিস আর আপত্তি জানাবে না, কিন্তু প্রমাণ ছাড়া ‘‌দেশদ্রোহে’‌র মতো অভিযোগে একজন ছাত্রকে গ্রেপ্তার করেছিলেনই বা কেন?‌ প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও বি জে পি মদতপুষ্ট বিক্রম চৌহানদের গ্রেপ্তার করা যাচ্ছে না, আর জে এন ইউ ছাত্র সংসদ সভাপতির বেলায় গ্রেপ্তার করার পর প্রমাণ খোঁজার প্রচেষ্টা?‌ বি জে পি নেতারা বলে বেড়াচ্ছেন আইনের ওপর ভরসা রাখতে, কানহাইয়া নির্দোষ হলে ছাড়া পেয়ে যাবেন। তাহলে ও পি শর্মার নেতৃত্বে বিক্রম চৌহানরা কোর্টে কী করছেন?‌ বি জে পি–র মুখপাত্র সম্বিত পাত্র এক সর্বভারতীয় সংবাদ চ্যানেলে গিয়ে কানহাইয়াকে দেশদ্রোহী প্রমাণ করার চেষ্টা করলেন একটি ভিডিও ফুটেজ দেখিয়ে যার সত্যতা নিয়েই গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। আইন–সংবিধানে বিশ্বাস রাখেন তো প্রমাণ কোর্টে পেশ করুন, একটি ছাত্রের মিডিয়া ট্রায়াল করছেন কেন?‌

নিজেদের রাজনৈতিক অ্যাজেন্ডা চাপিয়ে দিতে বি জে পি সরকার এই মুহূর্তে স্ববিরোধী নীতি নিয়েছে— এক, দেশের আইন–সংবিধান দেখিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করে নিরস্ত্র ছাত্রদের দমন করা। এবং দুই, আর এস এস–বি জে পি কর্মীদের ব্যবহার করে সেই আইন–সংবিধানকেই পরাভূত করা। দেশের আইন–সংবিধানের ওপর আর এস এস–এর অ্যাজেন্ডা চাপিয়ে দিতে বিক্রম চৌহানরা আছেন। গণতন্ত্রের ওপর এই অভূতপূর্ব আক্রমণের মুখেও লিবারেল মধ্যবিত্ত শ্রেণীর সমর্থন ধরে রাখতে দরকার সংবিধানের ১২৪এ ধারা। এক কথায়, কানহাইয়া কুমারের হাজতবাস এবং পাটিয়ালা কোর্টে গুণ্ডামি, এই দুটো ঘটনা একই সূত্রে গাঁথা।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গৈরিকীকরণ এবং নিজেদের সঙ্কীর্ণ রাজনৈতিক স্বার্থকে চরিতার্থ করতে ছাত্রদের দমন করার উদাহরণ এই সরকারের আমলে অবশ্যই প্রথম না। পুণের ফিল্ম ইনস্টিটিউট থেকে শুরু করে হায়দরাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়, আই আই টি দিল্লি হোক বা আই আই টি মাদ্রাজ, ছাত্রদের গণতান্ত্রিক অধিকারের ওপর ক্রমাগত আক্রমণ হয়ে চলেছে। রোহিত ভেমুলাদের প্রাণ দিতে হচ্ছে, যাদবপুর ক্যাম্পাস আক্রান্ত হচ্ছে। তবে, জে এন ইউ–এর ক্ষেত্রে গোটা বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপরেই আক্রমণ নেমে এল। আস্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকেই দেশদ্রোহীদের আস্তানা বলে প্রচার করা হল।

জে এন ইউ দেশদ্রোহীদের আস্তানা হয়ে থাকলে একই যুক্তিতে এই সরকারকেও দেশদ্রোহী বলতে হয়, কারণ বর্তমাণ বাণিজ্যমন্ত্রী থেকে শুরু করে দেশের বিদেশ সচিব, নীতি আয়োগের সি ই ও থেকে শুরু করে প্রধানমন্ত্রীর দ্বারা নিযুক্ত কাউন্টার–টেররিজমের স্পেশ্যাল এনভয়, প্রত্যেকেই এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন। শিক্ষাজগৎ থেকে শুরু করে সর্বভারতীয় সংবাদমাধ্যম, আমলা থেকে শুরু করে বিভিন্ন ধারার সামাজিক–রাজনৈতিক আন্দোলনে বিগত চল্লিশ বছরে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র এবং অধ্যাপকদের নাম এবং ভূমিকা লিখতে গেলে কয়েকটা বই লিখে ফেলতে হবে। তাই দেশদ্রোহিতার অপপ্রচার কতটা অবান্তর, সেই প্রসঙ্গে না ঢুকে বরং সেই অপপ্রচারের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে আসা যাক।

বি জে পি–মদতপুষ্ট এই অপপ্রচার জে এন ইউ–এর বিরুদ্ধে প্রথমবার না, বাজপেয়ী জমানাতেও হয়েছে, ইদানীংকালে ইউ জি সি আন্দোলন চলার সময়ও আর এস এস–এর মুখপত্র ‘‌পাঞ্চজন্য’‌–তে এই বিশ্ববিদ্যালয়কে ‘‌দেশদ্রোহীদের আস্তানা’‌ বলা হয়েছে। ভূমিকা বিশাল, তবে এর কারণ শুধুমাত্র ধর্মনিরপেক্ষ এবং নব–উদারবাদ বিরোধী জে এন ইউ–এর ছাত্র আন্দোলনে খুঁজলে ভুল হবে। সামগ্রিকভাবেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে জে এন ইউ সেই সব কিছুর প্রতীক, যা আর এস এসের স্বার্থবিরোধী। কারণ ‘‌হিন্দু রাষ্ট্র’‌ গড়ে তোলার যুক্তির বিরুদ্ধে গিয়ে জে এন ইউ বিশ্বাস করে আম্বেদকর–রচিত ধর্মনিরপেক্ষ ভারতীয় সংবিধানে, তুলে ধরে সংবিধানের প্রিঅ্যাম্বল–এ ঘোষিত সামাজিক ন্যায়ের বার্তা।’‌

রাজনৈতিক মতাদর্শ নির্বিশেষে আজ এই বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র–অধ্যাপক–কর্মচারীদের যে বিশাল ঐক্য গড়ে উঠেছে, তার ভিত্তি হল জে এন ইউ–এর অনন্য সংস্কৃতি। সামাজিক ন্যায় এবং গণতান্ত্রিক অধিকারকে রক্ষা করার সংস্কৃতি, মাথা উঁচু করে ঠিককে ঠিক এবং ভুলকে ভুল বলার সংস্কৃতি। তাই হাতে–গোনা কিছু বিদ্যার্থী পরিষদের কর্মী যখন হিংসা ছড়ানোর উদ্দেশ্যে স্লোগান দিতে দিতে ধেয়ে আসে চার হাজার ছাত্রের জমায়েতে, অধ্যাপকেরাই গড়ে তোলেন মানবশৃঙ্খল, রক্ষা করা হয় মুষ্টিমেয় সেই ছাত্রদের স্লোগান দেওয়ার অধিকারকেও। তাই এই আন্দোলনের সঙ্গে সহমর্মিতা রেখে ইস্তফা দেন বিদ্যার্থী পরিষদের ছাত্রনেতারাও।

শীর্ষস্থানীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হয়ে ওঠার পেছনে বড় ভূমিকা পালন করেছে জে এন ইউ–র চিরকালীন ঐতিহ্য, ‘‌academics of dissent‌’‌। উন্নততর ভারত গড়ে তোলার লক্ষ্যে, প্রথাগত ধ্যানধারণাকে প্রশ্ন করে গবেষণার বৃত্তকে বাড়িয়ে তোলা এই ঐতিহ্যের অংশ। এবং অর্জিত এই শিক্ষাকে সমাজে বাস্তবায়িত করার লক্ষ্যে, ‘‌academics of dissent‌’‌, এই বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘‌politics of dissent‌‌’‌–এর সঙ্গে যুক্ত। জরুরি অবস্থার সময় থেকে শুরু করে নির্ভয়া, যার সাক্ষী বিগত ৪০ বছরের বিভিন্ন আন্দোলন। পড়াশোনা এখানে রাজনীতিকে সমৃদ্ধ করে, এবং রাজনীতি পড়াশোনাকে। এখানে ছাত্ররা স্লোগান দেন ‘‌পড়াশোনা করার জন্য লড়ো, সমাজ পাল্টানোর জন্য পড়ো’‌। ছাত্ররা শুধু নিজেদের স্বার্থে নয়, লড়েন এমন জে এন ইউ–এর জন্য যাতে সমাজের সব থেকে পিছিয়ে পড়া অংশের মানুষ এখানে পড়তে পারে। বিশ্ববিদ্যালয়ে যখন নেমে এসেছে চরম আক্রমণ, চলছে মরণপণ প্রতিরোধ, এই ক্যাম্পাসেই অধ্যাপকেরা প্রতিদিন জাতীয়তাবাদের ওপর ক্লাস নিচ্ছেন, যা একসঙ্গে শুনতে আসছেন কয়েক হাজার ছাত্রছাত্রী।

পেশিশক্তি বা টাকার জোরে না, এখানে রাজনীতি হয় মতাদর্শের ভিত্তিতে। প্যামফ্লেট, পাবলিক মিটিং এবং ঘরে ঘরে গিয়ে রাজনৈতিক প্রচারের মাধ্যমে বিভিন্ন ছাত্র সংগঠন নিজেদের বক্তব্য তুলে ধরে। ছাত্ররাই গড়ে তোলেন নিজেদের ‘‌ইলেকশন কমিটি’‌, ছাত্ররাই পরিচালনা করেন ছাত্র সংসদ নির্বাচন। ইউনিভার্সিটি জেনারেল বডি মিটিং ছাত্রদের ‘‌highest decision making body‌’‌, যাতে অংশগ্রহণ করে হাজার হাজার ছাত্রছাত্রী। এই প্রগতিশীল ঐতিহ্যেরই প্রতিফলন যে কানহাইয়া কুমার, লেনিন কুমার, বাত্তিলাল বেয়োরা, চন্দ্রশেখরের মতো সমাজের সব থেকে শোষিত এবং পিছিয়ে পড়া অংশের মানুষ এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ সভাপতি হন।

মার্ক্স বলে গেছেন, ‘‌when an idea grips the masses, it becomes a material force‌’‌। ন্যায় এবং গণতন্ত্রের ‌‘‌idea‌’‌ এখানে ছাত্র আন্দোলনের মাধ্যমে ‘‌material force‌’‌ হয়ে জেগে থাকে। আর এস এস এই ‘‌material force‌’‌–কে ভয় পায়। আর জে এন ইউ–র সংস্কৃতির দ্বারা ঐক্যবদ্ধ অধ্যাপক–ছাত্ররা গণতন্ত্র এবং সামাজিক ন্যায়ের এই বস্তুবাদী শক্তিকেই বাঁচানোর লড়াই লড়ছেন।

গণতন্ত্রে যে কোনও রাজনৈতিক শক্তিকে আধিপত্য বিস্তার করার জন্য দরকার হয় সামাজিক সমর্থনের। বিগত লোকসভা ভোটে বিগত সরকারের অকর্মণ্যতার বিরুদ্ধে ‌অচ্ছে দিনের স্লোগান রেখে সেই সামাজিক সমর্থন অর্জন করেছিল বি জে পি। অর্থনৈতিক সঙ্কট এবং নব–উদারবাদী নীতির জন্যে অচ্ছে দিনের স্লোগান দ্রুতই মুখ থুবড়ে পড়েছে। সংখ্যালঘু এবং সামাজিকভাবে শোষিত মানুষের বিরুদ্ধে লোক–খ্যাপানোর রাজনীতি করেও সামাজিক সমর্থন হারাতে হল বিহারে। ঘৃণার রাজনীতি করে মানুষের অচ্ছে দিন আনার অবকাশ নেই, তাই সমর্থন পেতে দরকার নতুন শত্রুর। রোহিত–জে এন ইউ–যাদবপুর এবং সেই সমস্ত মানুষ যাঁরা আর এস এসের রাজনীতিতে বিশ্বাস করেন না, তাদের দেখিয়ে তাই কাল্পনিক ‘‌দেশদ্রোহী’‌ খোঁজার প্রচেষ্টা

শুধু সাম্প্রদায়িক বা নব–উদারবাদী আক্রমণই না, এবার দেশবাসীদের মধ্যেই কাল্পনিক ‘‌দেশপ্রেমী’‌ এবং ‘‌দেশদ্রোহী’‌ বিভাজন করে বি জে পি গৃহযুদ্ধ শুরু করতে চাইছে নিজেদের সঙ্কীর্ণ রাজনৈতিক স্বার্থে। এই দেশবিরোধী শক্তিকে কোণঠাসা করতে গড়ে তুলতে হবে সাম্প্রদায়িকতা, জাতি–ভেদাভেদ, লিঙ্গ বৈষম্য এবং নব–উদারবাদের বিরুদ্ধে গণতান্ত্রিক ভাবনাচিন্তার পক্ষে যৌথ আন্দোলন। সেই আন্দোলনের ভিত্তিতে অর্জন করতে হবে মানুষের বৃহত্তম ঐক্য। অত্যাচারের বিরুদ্ধে বাঁশি ধরেছেন কানহাইয়ারা, কংস মামারা প্রস্তুত থাকুন।



(‌লেখক জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির গবেষক)‌‌‌

Corporate Bonanza

February 19, 2016

403697

Well-planned Communal Battle Cry

December 24, 2015

গোরু থেকে পাথর, যা হচ্ছে সবই পরিকল্পিত

সাম্প্রদায়িক হিংসা লাফিয়ে বাড়ছে

বিশেষ প্রতিবেদক

লরি বোঝাই পাথর আসছে অযোধ্যায়। শিলাপূজা চলছে। রাম জনমভূমি ন্যাসের সভাপতি ঘোষণা করছেন, মোদী সরকারের ‘সিগন্যাল’ মিলেছে। মন্দির তৈরি করতে হবে এখনই।সাম্প্রদায়িক জিগির, হিংসা ছড়ানোর আরো এক তাস খেলা শুরু হলো। গত দেড় বছরে এটাই নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে। রোজ নতুন নতুন সাম্প্রদায়িক অ্যাজেন্ডা সামনে আনছে আর এস এস-বি জে পি। নতুন ঠিক নয়, পুরনো, আর এস এসের চিরকালীন বিষয়গুলিই। বলা ভালো নতুন করে তুলে আনছে। গোটা দেশকে সেই অ্যাজেন্ডায় ঢুকিয়ে দিচ্ছে

‘আচ্ছে দিন’-এর স্লোগানকে পিছনে ঠেলে জিনিসের দাম লাফিয়ে বাড়ছে, কৃষির সংকট, ফসল না-পাওয়া কৃষকের আত্মহত্যার ক্রমবর্ধমান ঘটনা, শ্রম আইন সংশোধন করে মেহনতির ন্যূনতম অধিকারটুকুও কেড়ে নিয়ে কর্পোরেট পুঁজির লুটের রাস্তা অবাধ করার কাজ চলছে। রেগা, আই সি ডি এস, মহিলা সুরক্ষা সহ বিভিন্ন সামাজিক প্রকল্পে ছাঁটাই চলছে নির্বিচারে। প্রধানমন্ত্রী বিদেশ ঘুরছেন, কোটি কোটি কর্মপ্রার্থীর কাজের সুযোগ তৈরির কোনো প্রচেষ্টা নেই।

এমন অবস্থায় আরো বেশি জরুরি হয়ে পড়েছে বিভাজনের রাজনীতি। ধর্মীয় উন্মাদনার গোলকধাঁধায় ঢুকিয়ে দিতে হবে মানুষকে, বিশেষত তরুণ প্রজন্মকে। রোজ সাম্প্রদায়িক হিংসার ঘটনা ঘটছে। মঙ্গলবারই লোকসভায় স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী যে তথ্য দিয়েছেন তাতে বছরের প্রথম দশ মাসেই ৬৫০টি সাম্প্রদায়িক হিংসার ঘটনায় ৮৪জনের মৃত্যু হয়েছে। সংখ্যাতত্ত্বেও কারিকুরির অভিযোগ উঠছে।

মোদী-রাজে দেশে সাম্প্রদায়িকতা, অসহিষ্ণুতা বৃদ্ধির ঘটনায় দেশজোড়া প্রতিবাদের মধ্যেই গুরুতর প্রশ্ন উঠে এসেছে সরকার এই ধরনের ঘটনা কম করে দেখাচ্ছে। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের হিসেব অনুযায়ী ২০১৪সালে দেশে ৬৪৪টি সাম্প্রদায়িক হিংসার ঘটনা ঘটেছে। অথচ কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের অধীন ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ডস ব্যুরোর হিসেব অনুযায়ী ২০১৪সালে দেশে ১২২৭টি সাম্প্রদায়িক হিংসার ঘটনায় ২০০০জন জখম হয়েছেন। তাহলে কোনটি সঠিক? বিপদে পড়ে এখন একই মন্ত্রকের দুইরকম তথ্যের তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক।

সংখ্যার হিসেবের কচকচানি ছেড়ে দিলেও খালি চোখেই যা দেখা যাচ্ছে তাতে স্পষ্ট শুধু সাম্প্রদায়িক হানাহানি নয়, প্রতিদিনের জীবনযাপনকে নিয়ন্ত্রণ করতে চাইছে সংঘ। খাদ্যাভ্যাস থেকে ধর্মাচরণ, প্রেম-বিবাহ, সঙ্গী নির্বাচনের মত একান্ত ব্যক্তিগত বিষয়েও নিয়ন্তা হতে চাইছে উগ্র হিন্দুত্ববাদীরা। বিপদ সবথেকে বেশি সেখানেই।

উচ্চশিক্ষা, গবেষণার প্রতিষ্ঠানগুলির দখলদারি সম্পূর্ণ হয়েছে। সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলিতেও একই অবস্থা। ইতিহাস বিকৃতির কাজ চলছে। শিশুমনেই সংঘের ইতিহাস গেঁথে দেওয়ার সরকারী উদ্যোগ শুরু হয়েছে। অন্ধবিশ্বাস, কুসংস্কারের আবাদ হচ্ছে। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়া হচ্ছে। কর্পোরেট মিডিয়াকে পকেটে পুরে সোশ্যাল মিডিয়া নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চলছে। যে কোনো পোস্ট মন মতো না হলেই শারীরিক আক্রমণ। শুরুতেই মুম্বাইয়ে খুন হয়ে গেছেন পেশাদার সফটওয়ার বিশেষজ্ঞ সাদিক শেখ।

একের পর এক যুক্তিবাদীরা খুন হচ্ছেন। অপরাধীরা ধরা পড়ছে না। এতই অপদার্থ আমাদের পুলিশ, প্রশাসন? এতই নিষ্কর্মা গোয়েন্দা বিভাগ? নাকি এক্ষেত্রেও হিন্দু সন্ত্রাসবাদীদের মত ছাড় দেওয়ার খেলা চলছে, প্রশ্ন সেটাই। এই সরকার তো সন্ত্রাসবাদীও স্থির করছে ধর্ম দেখে।

গোরুর মাংসের গুজব ছড়িয়ে মহম্মদ আখলাককে খুন করা হচ্ছে। আবার উগ্র হিন্দুত্ববাদী সাংসদরাই জোর করে মুখে খাবার গুঁজে দিচ্ছে রোজা রাখা সরকারি কর্মীকে। বই প্রকাশ আটকাতে কালি লেপা হচ্ছে তো আমির খানকে দেশ ছাড়তে বলা হচ্ছে। ক্রিকেট মাঠ থেকে দিলওয়ালে– আক্রমণ সর্বব্যাপী।

সাম্প্রদায়িক উসকানি ছড়াতে সরকারের নেতা-মন্ত্রীরা বেপরোয়া, বেলাগাম। প্রধানমন্ত্রী নীরব, নিশ্চুপ। তবে চুপ থাকতে পারলেন না বেশি দিন। বিহার ভোটে ‘ময়ূর পুচ্ছ’ খুলে উলঙ্গ হয়েই ময়দানে নেমে পড়লেন। দেশের প্রধানমন্ত্রী যে এভাবে সরাসরি সাম্প্রদায়িক জিগির ছড়াতে পারেন, সে ঘটনারও সাক্ষী হলো দেশ।

ধর্মান্তরকরণ, লাভ জিহাদ, অভিন্ন দেওয়ানি বিধি, কাশ্মীর, ৩৭০ ধারা, গোরু, রাম মন্দির– উগ্র ধর্মীয় জিগির ছড়ানোর কাজ চলছে। যখন যেটা সামনে আনলে সুবিধে সেই মত কাজ চলছে। রাজ্যে রাজ্যে বিশেষ করে গরিব মানুষকে ভয় বা লোভ দেখিয়ে একদফা ধর্মান্তরকরণ চললো। ‘লাভ জিহাদের’ নামে তরুণ-তরুণীদের মেলামেশা, সঙ্গী নির্বাচনেও বাধা দিতে নেমে পড়লো সংঘ। দিল্লি সহ একাধিক রাজ্যে আক্রান্ত হলো খ্রিস্টানদের উপাসনা ঘর। আক্রান্ত হলেন যাজকরা

ছত্তিশগড়, মধ্য প্রদেশের মত বি জে পি শাসিত রাজ্যের রেগার কাজ, রেশন দেওয়া বন্ধ করে আদিবাসী খ্রিস্টানদের জোর করে ধর্মান্তরকরণ করানো হলো। এরপর শুরু হলো গোরু। যাকে যেখানে খুশি ‘গো-মাতার’ নামে আক্রমণ করা যায়। খুন করা যায়। বিহার ভোটের মুখেও গোরু নিয়ে মরিয়া প্রচার চললো। এবার টার্গেট উত্তর প্রদেশ। ভোট ২০১৭সালে। শুরু হয়েছে রাম মন্দির নিয়ে নতুন করে উত্তেজনা ছড়ানোর খেলা।

কোনোকিছুই বিচ্ছিন্ন বা বিক্ষিপ্ত নয়। হঠাৎ করে কিছু ঘটে যাচ্ছে না। সারা দেশে সাম্প্রদায়িক জিগির ছড়ানোর যে কাজ চলছে তাকে শুধুই অসহিষ্ণুতা বলা চলে না। আর এস এস তার নিজস্ব অ্যাজেন্ডা অনুযায়ী চলছে এবং তা চাপিয়ে দিচ্ছে জনগণের ওপর। মানুষকে ঠেলে দিচ্ছে সেই অ্যাজেন্ডায়। সবটাই সুপরিকল্পিত, পূর্বনির্ধারিত

Fight For Rice, Meat; And Mamata

November 6, 2015

ভাতের লড়াই, মাংসের কাজিয়া এবং মমতা

চন্দন দাস

মিড ডে মিলে মাংস দেওয়া হয় না। ডিম দেওয়া হয়। সাধারণত একদিন।ডিম কার? কে দিয়েছে? এ’ নিয়ে কাজিয়া বাধানোর অবকাশ নেই। কারণ পাখির সঙ্গে দেশপ্রেমের সরাসরি সংযোগ সংক্রান্ত কোনও নিদান নেই।

আগামী দিনে মিড ডে মিলে আদৌ ভাত দেওয়া যাবে কিনা, শিশুরা আর পড়তে আসতে পারবে কিনা নিদারুণ আর্থিক সঙ্কট ডিঙিয়ে — এই প্রশ্ন ক্রমাগত সক্রিয় হয়ে উঠছে দেশে এবং রাজ্যে। পশ্চিমবঙ্গে অনেক শিশু শিক্ষাকেন্দ্র, মাধ্যমিক শিক্ষাকেন্দ্রের ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার সামনে। তবু ভাত নিয়ে, চাল নিয়ে, ‘ভাতের কারখানা’ নিয়ে মাথাব্যথা বিশেষ কারও নেই। ভাতের সঙ্গে কী দেশপ্রেম, নাগরিকত্বের কোনও সম্পর্ক নেই?

থাকার কথা। কে কত বড় দেশপ্রেমিক ঠিক করা উচিত, কে দেশের গরিবের জন্য কত সুযোগ সৃষ্টি করতে পারছে তার উপর। কিন্তু তা হয়নি গত ৬৮ বছরে। দেশপ্রেমের ঠিকাদাররা এখন মাংসের মানদণ্ডে দেশপ্রেমের সার্টিফিকেট দিচ্ছেন। আর দেশপ্রেমের দিনমজুররা ভাতের লড়াইটা পৌঁছে দিচ্ছেন, দেওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছেন আজও। তা সে বর্ধমানে হোক, জঙ্গলমহলে হোক কিংবা চা বাগানে — ছবি একই। মাংসের কাজিয়া মূলত সেই ভাতের লড়াইকে ভুল দিকে ঘুরিয়ে দিতে।

দেশপ্রেমের দিনমজুর…

সাভারকারের সঙ্গে আমাদের লড়াই অনেকদিনের। ১৯২৫-এ আরএসএস-র জন্ম। ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির ১৯২০-তে। সাভারকার ভারতে ‘হিন্দুত্ব’ ভাবনার স্থপতি। তিনি সেলুলার জেলে ছিলেন। গণেশ ঘোষও। সাভারকার জেল থেকে ব্রিটিশ সরকারের কাছে মুচলেকা দিয়েছিলেন। গণেশ ঘোষরা অবশ্য সেখান থেকেই, বিস্তর কষ্ট সহ্য করে কমিউনিস্ট হওয়ার রাস্তা তৈরি করেন। সাভারকারের ভাবশিষ্যরা এখন ঠিক করছে কে দেশপ্রেমিক, আর কে পাকিস্তানি। আর গণেশ ঘোষের উত্তরসূরিরা এখনও পদাতিক, দেশপ্রেমের দিনমজুর। রাষ্ট্র তাঁদের দেখে না। মোটা মাইনে দেয় না। কিন্তু দেশবাসীর ভাত, মোটা কাপড়, কাজ, এতটুকু ছাদের লড়াইটা এখনও, বিস্তর রক্তপাতের পরেও লড়ে যাচ্ছেন তাঁরা।

এ’ লড়াই বাঁচার লড়াই। এ’ লড়াই জিততে হবে — স্লোগানটা বস্তাপচা হয়নি। এখনও লাল পতাকা মানে এটাই।

সাক্ষী, প্রমাণ জঙ্গলমহলে। ২৩টি ব্লক। ২০০১-র ২৩শে জানুয়ারি থেকে ২০১১-র ৩০ শে নভেম্বর — সময়কাল মাত্র ১০ বছর ১০ মাস। মানে ১৩০ মাস। আর এই সময়ে জঙ্গলমহলে ২৭৫ জন শহীদ হয়েছেন। নির্দিষ্ট একটি এলাকায়। তাঁদের মধ্যে পার্টির জেলা সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য আছেন। আবার নেহাতই স্কুলছাত্র — তিনিও আছেন। অসমসাহসী মহিলা আছেন। সংখ্যালঘু আছেন। আদিবাসী তো আছেনই। সবচেয়ে বড় কথা — খেতমজুর আছেন অনেকে। গরিব কৃষক, ছোট ব্যবসায়ীও আছেন শহীদ তালিকায়।

তারপরও টিকে আছে পার্টি। সিপিআই(এম)। ‘টিকে থাকা’ শব্দটির মধ্যে একটি নেতিবাচক মনোভাব অনুরণিত হয়? তাই না। আসলে এতজন সংগঠককে হারিয়ে হাঁটু মুড়ে, দুমরে মুচড়ে পড়ে যাওয়ার কথা। কোথাও কোথাও মিশে যাওয়ার কথা লালমাটির সঙ্গে। লোধাশুলির অফিস বিস্ফোরণে উড়ে যেতে পারে। সে তো ইঁট, কাঠ, কংক্রিটের। কিন্তু জান আছে দেশপ্রেমের ধারণায়। দেশপ্রেম মানে মানুষ। তাই সিপিআই(এম)-র নেতা, কর্মী, সমর্থকদের গুলি ঝাঁঝরা করা মাওবাদী নেত্রী যখন তৃণমূল কংগ্রেস নেতার সুখী ঘরণীর জীবন কাটাচ্ছেন, তখনও, সেই ‘বিপ্লবী’দের ভয় জাগানো আঁকা বাঁকা মেঠো পথে প্রচার চালাচ্ছে সিপিআই(এম)।

জঙ্গলমহলে রেগার জবকার্ড আছে ৬লক্ষ ২৭ হাজার ৪০১টি পরিবারের। আর কাজ পেয়েছেন চলতি বছরে ৩৬ হাজার ৮০টি পরিবার। শতাংশের হিসাব করলে রাষ্ট্র, সরকারের লজ্জায় মাথা হেঁট হওয়া উচিত। নতুন ধানের দাম বস্তা(৬০ কেজি) ৫৫০ টাকা। নির্ধারিত দামের প্রায় অর্ধেক। আর ৩০ কেজি বীজধানের দাম ১২০০টাকা। প্রতিটি ব্লকে কিষান বাজারের প্রতিশ্রুতি ছিল। সব ব্লকে হয়নি। যে কটি ব্লকে হয়েছে, সেগুলির ভবনগুলি শুধু দাঁড়িয়ে আছে। কৃষক সেখানে যান না। সেখানে কোনও কেনাবেচার দেখা নেই। গোয়ালতোড়ে ১০০০ একর জমিতে শিল্পের ঘোষণা এখনও প্রতিশ্রুতির পর্যায়ে রয়েছে। জঙ্গলমহলের জন্য পৃথক এমপ্লয়মেন্ট ব্যাঙ্কের ঘোষণা করেছিলেন মমতা ব্যানার্জি। সেটি হয়নি। ল্যাম্পস যা ছিল আদিবাসীদের উপার্জনের অন্যতম মাধ্যম, সেগুলি এখন ধুঁকছে। গ্রামগুলিতে কর্জ, দাদনে জর্জরিত কৃষক ক্রমাগত মহাজনের দেনা-চক্রে জড়িয়ে পড়ছেন। এই পরিস্থিতিতে রেগার মজুরি চাই, কাজ কোথায়, শিল্পের কী হলো, কেন ফসলের দাম পাচ্ছি না, এত যে প্রতিশ্রুতি দিলে তার কী হলো — নানা দাবি ধূমায়িত। আবার সভা, মিছিল দেখা যাচ্ছে জোরালো। প্রতিটি ব্লকে জমায়েত হয়েছে এই সময়ে। পুলিশের সাধ্য কী তাকে আটকায়? ডেপুটেশন দিচ্ছেন গ্রামবাসীরা — সামনে পার্টির নেতা, কর্মীরা। সেই চেনা ঝান্ডা। শহীদদের পতাকা।

শিলদায় দেখা হলেই অনন্ত বলতো —‘‘শেষ পর্যন্ত লড়ে যাবো।’’ কমরেড অনন্ত মুখার্জি নেই। তাতে কী? এই হেমন্তেও ‘অনন্তরা’ থেমে নেই।

দেশে এমন উদাহরণ আছে? না। বিদেশে? হাতে গোনা যাবে।

ভয়ও হেরে যায়, রাস্তা ছেড়ে দেয় নতজানু হয়ে — এমন পার্টি দেশে একটিই আছে। কবিতা মনে হচ্ছে? মনে হচ্ছে বান এসেছে হৃৎকমলের সুবর্ণরেখায়? মোটেও না।

আমি হাজারও ঋত্বিক দেখেছিলাম। হাজারও ঋত্বিক দেখছি। দেশপ্রেমের পদাতিক তো তাঁরাই। তাই ভরসা থাকুক তাঁদের উপর। নজর থাকুক সামনে। জোয়ার আসছে কাঁসাইয়ে।

অপেক্ষাকে যত্ন করুন।

মাংসের কাজিয়া, মুখ্যমন্ত্রীর নীরবতা..

চা বাগানে ঠিক মত খাওয়াই জুটছে না। অনাহারে মারা যাচ্ছেন বন্ধ বাগানের শ্রমিক পরিবার। জঙ্গলমহলে কাজ নেই। রেগার মজুরি জুটছে না রাজ্যের কোনও জেলায়। বর্ধমান, বাঁকুড়া, বীরভূমে ধান পুড়ে খাক। অন্যত্র ধানের দাম নেই। আলুর দাম নেই। বাকি সব ফসলের একই হাল। ঠিক এখন, এই পশ্চিমবঙ্গে মাংসের চরিত্র নির্ধারণের সময় নেই বেশিরভাগের। দেশের অবস্থাও প্রায় এক। এ’ কথা ঠিক যে, দেশের অন্য কোনও রাজ্যেই এমন রাজ্য সরকার নেই। উৎসবের বিলাসিতায়, ঘোষণা-প্রতিশ্রুতির ভেলায় ভেসে চলা এমন রাজ্য প্রশাসন দেশে বেনজির। প্রতিবাদী আক্রান্ত হবেই, নির্ঘাৎ হবে — এমন নিশ্চয়তা দেশের প্রায় কোনও রাজ্যে নেই। চুরির দায়ে অভিযুক্ত মন্ত্রীর ‘পাশে থাকার’ পোস্টার সাঁটিয়ে অবলীলায় স্কুল, কলেজের ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে ছুটে চলা অটো দেশের কোথাও মিলবে না। আর এখানেই রাজ্য সরকারের অগণতন্ত্র, ব্যর্থতার পরিপ্রেক্ষিতে রাজপথের লড়াইয়ে এত রক্তক্ষরণ, তীব্রতা সাম্প্রতিককালে দেশের আর কোথাও মেলেনি।

মোদীর হাতে দেশ বিপন্ন। মমতা ব্যানার্জির সরকারই বেসামাল।

কতটা বেসামাল তৃণমূল কংগ্রেসের সরকার মুখ্যমন্ত্রী নিজে বুঝিয়ে দিয়েছেন উত্তরবঙ্গ সফরে। শিল্পপতিদের হাত জড়ো করে অনুনয়, বিনয় করেছেন বিনিয়োগের জন্য। অথচ ২০০৬-০৭-এ কী নিদারুণ ‘বীরত্ব’ আমরা দেখেছিলাম তাঁর মধ্যে। সিঙ্গুর সাক্ষী। কাটোয়া সাক্ষী। ভাঙড় সাক্ষী। সাক্ষী আরও অনেক জায়গা, যেখানে বামফ্রন্টের সরকার শিল্পের উদ্যোগ নিয়েছিল। তখন, নন্দীগ্রামের এক সভায় তৃণমূল কংগ্রেসের নেত্রী বলেছিলেন,‘‘ভাতের কারখানা ধ্বংস করে মোটর গাড়ির কারখানা/ সে হবে না, সে হবে না।’’ ‘কৃষক-দরদী’ তৃণমূল কংগ্রেসের নেতা, কর্মীরা সেই ছড়াকে নিজেদের উত্থানের রিং টোন করে ফেলেছিলেন।

এখন রাজ্যে বিনিয়োগের দেখা নেই। আর ‘ভাতের কারখানা’, অর্থাৎ খেতখামারের অবস্থা গত আটত্রিশ বছরের সবচেয়ে দুরবস্থার মুখোমুখি। একশোর বেশি কৃষক আত্মঘাতী হয়েছেন। ন্যূনতম সহায়ক মূল্য ১৪১০ টাকা কুইন্টাল প্রতি হলেও, রাজ্যের কোথাও কুইন্টাল প্রতি ৯০০-৯৫০ টাকা ধানের দাম কৃষকরা পাচ্ছেন না। আসলে ভাতের কারখানা আর মোটর গাড়ির কারখানার একটি গভীর যোগাযোগ ছিল, যা মমতা ব্যানার্জি কিছুতেই রাজ্যের মানুষ বুঝে ফেলুন, তা চাননি। তাই কখনও মাওবাদী, কখনও আরএসএস, কখনও জামাতের সঙ্গে মিলে রাজ্য জুড়ে নৈরাজ্য তৈরি করেছিলেন।

বামফ্রন্ট সংবেদনশীল ছিল। অনেকে তাকে দুর্বলতা ভেবেছিল। আর সেই নৈরাজ্যের ফল এখন মিলছে। শিল্প গত। ভাতের কারখানাও পতিত হতে বসেছে। এমন সময়ে মাংসের কাজিয়া নিয়ে মমতা ব্যানার্জি কী করে কঠোর সমালোচনা করেন? দেশের নানা পর্যায়ের মানুষ প্রতিবাদ করছেন। বামপন্থীরা তো হিন্দুত্ববাদীদের পয়লা নম্বর দুশমন। তাঁরা তো প্রতিবাদে সোচ্চার হবেনই। কিন্তু মমতা ব্যানার্জি বিলকুল চুপ। এই নীরবতা সন্দেহজনক। কিন্তু একেবারে বোঝা যাচ্ছে না নীরবতার কারণ, তা নয়। ‘মাংসের কারবারিরা’ই তাঁকে আবার রক্ষা করতে পারে, সেই অঙ্ক করে ফেলেছেন তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী। তাঁর অনেক দিনের পুরোন বন্ধুরা আছেন এই মাংসের পরিচয়পত্র তৈরির কাজে।

বাঁটোয়ারাপন্থীরা বাড়ছে…

মাংস কার? গোরুর না মোষের? নাকি পাঁঠার? নাকি মুরগি, হাঁসের মাংস খাওয়া উচিত? বিতর্কের বল গড়াতে গড়াতে শেষ পর্যন্ত ‘দেশপ্রেমে’ পৌঁছে গেছে। কে পাকিস্তানি, কে ভারতীয় — ঠিক করছে মমতা ব্যানার্জির ‘দেশপ্রেমিকরা’। অর্থাৎ আরএসএস, সঙ্ঘ পরিবার। ২০০৩-র ১৫ই সেপ্টেম্বর দিল্লিতে আরএসএস-র সভায় হাজির হয়ে আজকের বাংলার মুখ্যমন্ত্রী বলেছিলেন,‘‘আপনারা সত্যিকারের দেশপ্রেমিক। আমরা জানি আপনারা দেশকে ভালোবাসেন।’’ সেই আরএসএস ‘দেশপ্রেমের’ শংসাপত্র দিচ্ছে। কার কার পাকিস্তানে যাওয়া উচিত, তাও ঠিক করে দিচ্ছে। এদের কাছে মমতা ব্যানার্জি কমিউনিস্টদের সরানোর জন্য সহায়তা চেয়েছিলেন। বলেছিলেন,‘‘যদি আপনারা(আরএসএস) ১শতাংশও সহায়তা করেন আমরা কমিউনিস্টদের সরাতে পারবো।’’ আরএসএস সেদিন তাঁকে ‘সাক্ষাৎ দূর্গা’ বলে অভিহিত করেছিল।

সেই আরএসএস-র ‘মাংস বিতর্ক’ এবং দেশপ্রেমের অপপ্রচার মমতা ব্যানার্জিকে আগামী বিধানসভা নির্বাচনে সহায়তা করবে, এমনটাই তৃণমূল কংগ্রেসের অভিজ্ঞ নেতারাও মনে করছেন। রাজ্যে আরএসএস বেড়েছে গত চারবছরে। গত চার বছরে তাঁদের শাখার সংখ্যা ৫৮০ থেকে হয়েছে ১৪৯০। বৃদ্ধি ১৫৭ শতাংশ। স্বাধীনতার পরে পশ্চিমবঙ্গে আরএসএস-র এমন বিকাশ কখনও হয়নি। রাজ্যে আরএসএস ‘অনুপ্রবেশ’ সমস্যাকেই প্রধান বিপদ বলে প্রচার শুরু করেছে। আর খোদ মমতা ব্যানার্জিই সংসদে ‘অনুপ্রবেশ’ ইস্যুতে সঙ্ঘ পরিবারের বক্তব্য তৃণমূলের সাংসদ হিসাবে তুলে ধরেছিলেন।

দিনটি ছিল ২০০৫-র ৪ঠা আগস্ট। লোকসভায় অধ্যক্ষের মুখের উপরে কাগজের তাড়া ছুঁড়ে দিয়ে অভব্যতার এক নজির সৃষ্টি করেছিলেন আজকের মুখ্যমন্ত্রী। পুরো সংসদ বিস্মিত হয়েছিল তাঁর এই কাণ্ডে। কেন সেদিন তিনি এমন করেছিলেন? কারণ, সেদিন তিনি সংসদে ‘অনুপ্রবেশ সমস্যা’ নিয়ে আলোচনা করতে চেয়েছিলেন। বামফ্রন্ট সরকার কিভাবে অনুপ্রবেশে মদত দিচ্ছে, তার গল্প শোনাতে চেয়েছিলেন। অনুমতি মেলেনি। তাই ওই অভব্যতা। অর্থাৎ, রাজ্যে যখন শক্তিশালী বামপন্থী আন্দোলনের অবস্থানের কারণে সাম্প্রদায়িক শক্তি পা রাখার সামান্য জায়গা পাচ্ছে না, তখন ‘পশ্চিমবঙ্গের অনুপ্রবেশ’ নিয়ে সংসদে বলে সঙ্ঘ পরিবারের কাছে বার্তা দিয়েছিলেন মমতা ব্যানার্জি — ‘আমি তোমাদেরই লোক’।

গত চারবছরে রাজ্যে মৌলবাদীরাও বেড়েছে আরএসএস-র মত। পশ্চিমবঙ্গে বামফ্রন্ট সরকারের সময়কালে এই মৌলবাদীদের সমর্থকরা কখনও মাথা তুলতে পারেনি। মমতা ব্যানার্জিকে মুখ্যমন্ত্রী করার জন্য এই প্রবল স্বাধীন বাংলাদেশ বিরোধী, ধর্মান্ধ, উগ্রপন্থায় বিশ্বাসী অংশের একটি সহযোগিতা ছিল। সম্প্রতি সারদার টাকা সেই উগ্রপন্থীদের হাতে পৌঁছোনর খবর প্রকাশিত হয়েছে। তাতে আবার মুক্তিযুদ্ধের সময়, ১৯৭১-এ বাংলাদেশ ছেড়ে চলে আসা হাসান আহমেদ ইমরানের নাম জড়িয়েছে। তিনি রাজ্যে কট্টর মৌলবাদী সিমি-র প্রতিষ্ঠাতাদের একজন। ২০০৭-’০৮ থেকে তৃণমূল কংগ্রেসে আশ্রয় নেন। তসলিমা নাসরিনের ভিসার বিষয় নিয়ে বামফ্রন্ট সরকারের সময়কালে রাজ্যে এক উত্তেজনা, ধর্মীয় উন্মাদনা তৈরি করেছিলেন ইদ্রিশ আলি। তাকেও মমতা ব্যানার্জি সাংসদ করেছেন। ফলে গত সাড়ে তিন বছরে রাজ্যে কট্টর মৌলবাদী একাংশ সরকার এবং শাসক দলের উপর প্রভাব বিস্তার করেছে। যা আসলে পশ্চিমবঙ্গের ঐতিহ্যের পক্ষে ঘোর লজ্জার। তবু তাই হয়েছে।

দুই সাম্প্রদায়িক শক্তিই এই সময়ে পশ্চিমবঙ্গে বেড়েছে। বেড়েছে সরকারের ব্যর্থতা, আর্থিক মন্দাকে ভিত্তি করে। এমন পরিস্থিতিতে সামনে বিধানসভা নির্বাচন। কাজের লক্ষ্যে পরিচালিত আন্দোলন অনুঘটক হতে চলেছে সেখানে। ভাতের দাবিতে গর্জে ওঠা লড়াই হয়ে উঠতে চলেছে নিয়ন্ত্রক। আর ঠিক এখনই, মাংসের কাজিয়া, দেশপ্রেমের প্রচার জরুরি মমতা ব্যানার্জিরও। বিজেপি, আরএসএস সেই কাজই করছে।

তাই নীরবতা মুখ্যমন্ত্রীর। কোনও সন্দেহ নেই।

2014 – A Retrospect

January 3, 2015

২০১৪ : বিভীষিকার এক বছর

হাসান ফেরদৌস

২০১৪ সাল শুরু হয়েছিল আইসিস নামক এক দানবের উত্থান-কাহিনি দিয়ে। বছর শেষ হলো তালেবান নামক আরেক দানবের হাতে ১৩২ শিশুর নৃশংস হত্যার ভেতর দিয়ে। মাঝখানের একটি বড় ঘটনা ছিল ইবোলা নামক এক ভয়াবহ সংক্রামক ব্যাধির আক্রমণ।

এ ছাড়া আরও দুটি ঘটনা সদ্য বিগত ২০১৪ সালে ঘটে, যা আমার চোখে ভীতির। এক. মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে রিপাবলিকান পার্টির কংগ্রেসের উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ অর্জন ও ভারতে নরেন্দ্র মোদির নিরঙ্কুশ সংখ্যাধিক্যে ক্ষমতা গ্রহণ। মন্দ খবরের তালিকায় কেউ কেউ হয়তো বিনা নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ক্ষমতা দখলকেও অন্তর্ভুক্ত করবেন, তবে সে ঘটনার তেমন কোনো আন্তর্জাতিক চরিত্র নেই। ফলে, আমার ২০১৪ সালের বৈশ্বিক পরিমণ্ডলের বিভীষিকার তালিকা থেকে সে অঘটন বাদ রাখছি।

আইসিস বা আইএস অর্থাৎ ইসলামিক স্টেটের উত্থান আকস্মিক, তবে একদম অপ্রত্যাশিত নয়। মধ্যপ্রাচ্যে আল-কায়েদা থেকে উদ্ভূত এই জিহাদি আন্দোলন বস্তুত ইরাকে মার্কিন আক্রমণ ও সিরিয়ায় হাফিজ আল-আসাদ সরকারের ব্যর্থতার গর্ভ থেকে জন্ম নিয়েছে। সাদ্দাম হোসেনের পতনের পর ইরাকে যে শিয়া সরকার ক্ষমতা গ্রহণ করে, তা সে দেশের সুন্নি সংখ্যালঘুদের ক্ষমতার কেন্দ্র থেকে উৎপাটিত করে কার্যত দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিকে পরিণত করে। অধিকারবঞ্চিত এই সুন্নিদের নিজের দলে টানতে জিহাদি নেতাদের তেমন বেগ পেতে হয়নি। নিজেদের অধিকারহীন ও ব্রাত্য বিবেচনা করে ইউরোপ, মধ্য ও দক্ষিণ এশিয়ার এমন তরুণেরাও ইসলামি বিপ্লবের ডাকে আইএস কাতারে শামিল হয়ে পড়ে। পর পর কয়েকটি নৃশংস হত্যাকাণ্ড ভিডিওতে ধারণের মাধ্যমে তা প্রচার করে আইএস হঠাৎ যেন সব তথ্যমাধ্যমের শিরোনাম হয়ে ওঠে।

মার্কিন প্রশাসন গোড়াতে আইসিসের প্রতি তেমন গুরুত্ব দেয়নি। প্রেসিডেন্ট ওবামা ঠাট্টা করে বলেছিলেন, বাস্কেটবল খেলোয়াড় কোবি ব্র্যায়ান্টের জার্সি গায়ে দিলেই তো আর কেউ ব্রায়ান্টের মতো দক্ষ খেলোয়াড়ে পরিণত হয় না। পরে তাঁকে নিজের থুতু নিজেকেই গিলতে হয়েছে। ২০১৪-এর অর্ধেকের বেশি সময় ইরাকের শিয়া নেতৃত্ব কোন্দলের কারণে নতুন সরকার গঠনে সক্ষম হয়নি। এর ফলে যে শূন্যতার সৃষ্টি হয়, আইএস তার সুযোগ গ্রহণ করে। পাশাপাশি সিরিয়ার অব্যাহত গৃহযুদ্ধে আসাদ বা তাঁর বিরোধী পক্ষ কেউই নিজেদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠায় সফল না হওয়ায় আইএসের পক্ষে পেছনের দরজা দিয়ে অনুপ্রবেশ সহজ হয়। অবশ্য বছরের শেষ নাগাদ যুক্তরাষ্ট্র পরিস্থিতি সামলে নিয়ে আইএসের বিরুদ্ধে জোর হামলা চালায়।

আইএস শুধু ইরাক বা সিরিয়ায় আসন গেড়ে সন্তুষ্ট ছিল না, সৌদি আরব ও উপসাগরীয় দেশসমূহে নিজেদের প্রভাব সম্প্রসারণে তাদের আগ্রহ এই দেশগুলোকে উদ্বিগ্ন করে। ফলে তারাও আইএস ঠেকাতে হাত লাগায়। বছরের শেষ তিন মাসে আইএসের আধিপত্য অনেকটা স্তিমিত হয়ে এসেছে, তবে তাকে উৎপাটন করা সম্ভব হয়নি। পূর্ব ও পশ্চিমের এই দড়ি টানাটানিতে একমাত্র লাভবান হয়েছেন সিরিয়ার হাফিজ আল–আসাদ। আমেরিকা তার নজর আসাদের ওপর থেকে সরিয়ে নিয়েছে। অন্যদিকে আইএস তাদের ‘কমন এনিমি’ এই যুক্তিতে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র তাদের গত ৩০ বছরের কাজিয়া আপাতত তোরঙ্গে তুলে রেখেছে। ইরানের জন্য সেটাও খুব মন্দ খবর নয়।

বছরের দ্বিতীয় বিপর্যয়, পাকিস্তানে তালেবানের হামলা, সে দেশের নিজের সৃষ্টি। ভারতের বিরুদ্ধে নিজস্ব ‘রিজার্ভ’ সৃষ্টির লক্ষ্যে সে দেশের গোয়েন্দা পুলিশের তত্ত্বাবধানে তালেবানের জন্ম। নিজের পোষা কালসাপ একসময় গৃহকর্তাকে ছোবল মারে। পাকিস্তানেও ঠিক সে ঘটনাই ঘটেছে। অনেকেই বলছেন, ১৬ ডিসেম্বর পেশোয়ারের বিদ্যালয়ে তালেবান হামলার যে প্রতিক্রিয়া হয়েছে, তাতে তালেবানের বিরুদ্ধে এক জাতীয় মতৈক্যের সম্ভাবনার জন্ম দিয়েছে। পাকিস্তানের সরকার, সেনাবাহিনী ও অধিকাংশ রাজনীতিক তালেবান ঠেকাতে এককাট্টা হয়েছেন।

অবশ্য এমন সম্ভাবনা পাকিস্তানে যে এই প্রথম সৃষ্টি হলো তা নয়। সে দেশে একদিকে সামরিক বাহিনী নিজেদের জায়গিরদারি টিকিয়ে রাখার জন্য তালেবান ও জিহাদি দলগুলোকে নিজেদের থাবার নিচে রাখতে চায়। অন্যদিকে, ইসলামি জোশের হুমকিতে ভীত রাজনৈতিক দলগুলো কে কার চেয়ে অধিক ধার্মিক, তা প্রমাণের প্রতিযোগিতায় লিপ্ত। ইমরান খানের মতো আপাত–আধুনিক রাজনীতিকও ক্ষমতা দখলের চেষ্টায় বিদেশ থেকে আমদানি করা জিহাদি নেতার জামার আস্তিন ধরে আছেন। ফলে, ১৬ ডিসেম্বরের মতো ট্র্যাজেডি সে দেশে আবারও যে ঘটবে না, সে কথা ভাবার কোনো কারণ আছে বলে আমার মনে হয় না।

ইবোলার দংশন আফ্রিকার ভেতর ও বাইরে ভীতির সৃষ্টি করেছে, এ কথা ঠিক। কিন্তু এই ভয়াবহ সংক্রামক ব্যাধির বিরুদ্ধে লড়াইতে যে আন্তর্জাতিক সংহতির প্রকাশ দেখা গেছে, তাতে অনেকেই আশান্বিত হয়েছেন। সিয়েরা লিওন বা লাইবেরিয়া দীর্ঘদিন গৃহযুদ্ধে পর্যুদস্ত, ক্লান্ত। ইবোলাকে পরাস্ত করার মতো লোকবল, অর্থবল কোনোটাই তাদের নেই। এই ব্যাধির মোকাবিলায় বিশ্বজুড়ে সাড়া মিলেছে। বিপদের আশঙ্কা আছে জেনেও ইউরোপ ও আমেরিকা থেকে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক স্বেচ্ছাসেবক ইবোলা-আক্রান্ত দেশগুলোতে পাড়ি দিয়েছেন।

ইবোলা ব্যাধির ঠিক পরপর নরেন্দ্র মোদির নাম উচ্চারণ সুবুদ্ধির পরিচায়ক না হতে পারে, কিন্তু আমার বিবেচনার এই হিন্দুত্ববাদী নেতার উত্থান কোনো অংশে কম ভীতিকর নয়। প্রযুক্তিগতভাবে আধুনিক ও অর্থনৈতিকভাবে উন্নত ভারত নির্মাণে মোদির অঙ্গীকার আশার কারণ। তাঁর এই ‘ভিশন’ সে দেশের মানুষকে বিজেপিমুখী করেছে। কিন্তু একই সঙ্গে মোদি নিজের হিন্দুত্ববাদী পরিচয় এগিয়ে ধরতে যে আগ্রহ দেখিয়েছেন, সে দেশের সংখ্যালঘুদের জন্য তা ভীতির কারণ। মোদি নিজের মুখে বলেননি, কিন্তু তাঁর দলের একাধিক নেতা এমন বিদ্বেষপূর্ণ প্রচার চালাতে পিছপা হননি যে ভারত শুধু হিন্দুদের দেশ। বিজেপি ও তার অঙ্গসংগঠনসমূহ মুসলমান, খ্রিষ্টান ও আদিবাসীদের নিজ নিজ ধর্ম বদলে হিন্দু ধর্মে রূপান্তরের যে আন্দোলন শুরু করেছে, বহু জাতি ও ধর্মভিত্তিক ভারতকে তা প্রগতির বদলে পশ্চাদ্মুখী করছে। এর প্রতিক্রিয়ায় শুধু ভারতে নয়, প্রতিবেশী বাংলাদেশ ও পাকিস্তানে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ছড়াতে পারে, জঙ্গিবাদ আরও মারমুখী হতে পারে।

আমার বিবেচনায় বিগত বছরের পঞ্চম দুর্বিপাক মার্কিন কংগ্রেসের উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ রিপাবলিকান পার্টির হাতে চলে যাওয়া। ২০১৪ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকান দলের বিজয় খুব অভাবিত কিছু ছিল না। ওবামা ২০০৮ ও ২০১২ সালে পর পর দুবার বিজয়ী হন এক বহুবর্ণের রংধনু ‘কোয়ালিশন’ নির্মাণ করে। এই কোয়ালিশনের অন্তর্গত ছিল ১৮ থেকে ৩০ বছর বয়সী নতুন ভোটার, কৃষ্ণাঙ্গ ও অন্যান্য সংখ্যালঘু ও দেশের নারী ভোটারদের বৃহদংশ। ডেমোক্রেটিক পার্টি এবার তাদের এই কোয়ালিশন ধরে রাখতে পারেনি। মধ্যবর্তী নির্বাচনে সব সময়ই ভোটার অংশগ্রহণ কম। এবার তা আরও কমেছে, কারণ এই কোয়ালিশন অনুপ্রাণিত হয়, এমন কিছুই এই দল করেনি।

উদাহরণ হিসেবে অভিবাসনের কথা ভাবা যাক। ওবামা ও ডেমোক্রেটিক পার্টি বরাবর বলে এসেছে, যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত সোয়া কোটি অবৈধ বহিরাগত ব্যক্তির নাগরিকত্বের পথ নিশ্চিত করতে তারা বদ্ধপরিকর। অথচ একটি স্বল্পমেয়াদি নির্বাহী ব্যবস্থা ছাড়া কোনো কিছুই তারা করেনি। ২০০৮ থেকে ২০১০ পর্যন্ত কংগ্রেসের উভয় কক্ষই ছিল ডেমোক্র্যাটদের দখলে। চাইলে অনায়াসেই তাঁরা সে সময় এই প্রশ্নে আইনগত ব্যবস্থা নিতে পারতেন। রিপাবলিকান সমর্থক, বিশেষত শ্বেতাঙ্গ নির্বাচকেরা ক্ষিপ্ত হবেন, এই আশঙ্কায় কোনো পদক্ষেপ গ্রহণে তাঁরা বিরত থাকেন। বিরক্ত ও আশাহত হিস্পানিকেরা, যারা ওবামার বিজয়ের পেছনে বড় শক্তি ছিল, ২০১৪ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে তারা ভোটকেন্দ্রেই আসেনি।

কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ রিপাবলিকানদের হাতে চলে যাওয়ার ফলে পরিবেশ, নাগরিক অধিকার, স্বাস্থ্যবিমা ইত্যাদি খাতে আমেরিকা যে অগ্রগতি অর্জন করেছে, তার অনেকটাই বিপদগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা আছে। ওবামা কিউবার সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনঃস্থাপন ও ইরানের সঙ্গে আণবিক শক্তি ব্যবহার প্রশ্নে শান্তিপূর্ণ সমাধানের উদ্যোগ নিয়েছেন, তাও হুমকির সম্মুখীন হতে পারে। তবে আশার কথা, এ দেশে প্রতি দুই বছর পর নির্বাচন হয়। ২০১৬ সালে আমেরিকা তার পরবর্তী প্রেসিডেন্ট নির্বাচন করবে। সঙ্গে সঙ্গে প্রতিনিধি পরিষদের সব সদস্য ও সিনেটের এক-তৃতীয়াংশ ভোটের সম্মুখীন হবে। এক মাঘে শীত যায় না—এ কথা বাংলাদেশে যেমন সত্যি, আমেরিকায়ও। নিজেদের ঘর সামলে উঠলে ডেমোক্র্যাটদের নিদেনপক্ষে হোয়াইট হাউস দখলে রাখা ও সিনেটের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাওয়া একদম অসম্ভব নাও হতে পারে।

Attack on MGNREGA

November 28, 2014

রেগায় কেন কোপ

যে বামপন্থীদের চাপে আইন করে রেগা প্রকল্প চালু করতে বাধ্য হয়েছিল ইউ পি এ সরকার, এবার সেই প্রকল্প সঙ্কুচিত করে গরিব মানুষের রুজির অধিকার কেড়ে নেবার ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধেও রাস্তায় নেমে লড়াই করছে বামপন্থীরা। সি পি আই (এম)-র উদ্যোগে দিল্লিতে বিক্ষোভ অবস্থান এই পর্বে একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা।

রেগা আইনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো এটি একটি চাহিদাভিত্তিক প্রকল্প। মানুষ কাজ চাইলে সরকার কাজ দিতে বাধ্য। অর্থাৎ কাজ পাওয়াটা যেমন আইনি অধিকার তেমনি কাজ দেওয়াটাও সরকারের আইনি বাধ্যবাধকতা। দেশের যেসব মানুষ বা পরিবারের সারা বছরের কাজের সুযোগ নেই। গ্রামাঞ্চলে কৃষির মরসুমে কয়েক মাস কাজ জুটলেও বছরের বাকি সময় বসে থাকতে হয়। এই সময়টা ঐসব পরিবারের কাছে দুঃসহ যন্ত্রণার। কার্যত অনাহারে তাদের দিন কাটাতে হয়। অর্থাভাবে রেশনের খাদ্যও তারা সংগ্রহ করতে পারে না। গ্রামাঞ্চলে এই সঙ্কট ভয়াবহ হলেও শহরেও ভিন্ন ভিন্ন রূপে এই সঙ্কট বিরাজমান।

গ্রাম শহরের সবচেয়ে গরিব অংশের এই মানুষদের জন্য সরকারের ন্যূনতম দায়বদ্ধতার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েই বামপন্থীরা দাবি করেছিল, এই মানুষদের জন্য বছরে অন্তত ১০০দিনের কাজের ব্যবস্থা সরকারকেই করতে হবে। এই দাবিতে বামপন্থীরা সংসদের ভেতরে ও বাহিরে দীর্ঘ আন্দোলনও সংগঠিত করেছিল। পরবর্তীকালে কংগ্রেস এই বিষয়টাকে তাদের নির্বাচনী ইশ্‌তেহারে ঘোষণা করে দ্বিতীয় ইউ পি এ সরকারের আমলে অনেক টালবাহানার পর আইন তৈরি করে। বামপন্থীরা শহর ও গ্রাম উভয় অঞ্চলের গরিবদেরই এই প্রকল্পের আওতায় আনার দাবি করলেও মনমোহন সিং সরকার শহরের গরিবদের বঞ্চিত করে শুধুমাত্র গ্রামের গরিবদের জন্য প্রকল্পটি চালু করে।

খণ্ডিত আকারে হলেও সবচেয়ে গরিব অংশের মানুষের স্বার্থে প্রকল্পটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, বলতে গেলে নজিরবিহীনও। গত কয়েক বছর ধরে প্রকল্পটি নিঃসন্দেহে লক্ষ লক্ষ গরিব মানুষের অনাহার-অর্ধাহারের সময়কে অনেকটা কমিয়েছে। এই প্রকল্প গরিব কর্মহীনদের জন্য শুধু কর্মসংস্থানের ব্যবস্থাই করেনি, গ্রামীণ অর্থনীতিতে তাৎপর্যপূর্ণ প্রভাব ফেলেছে। গ্রামীণ মানুষের ক্রয় ক্ষমতা কিছুটা বাড়িয়ে পণ্য ও পরিষেবার চাহিদা বাড়িয়েছে যা দেশের অর্থনীতিতে বাড়তি শক্তি যুক্ত করেছে। উদারনীতির যাঁতাকলে পেষাই হয়ে সাধারণ মানুষের রুজি-রোজগার আক্রান্ত হলেও রেগা তাতে খানিকটা হলেও রক্ষাকবচের কাজ করেছে। তেমনি তথাকথিত দারিদ্র্য হ্রাসের যে খতিয়ান সরকার প্রকাশ করছে সেটাও সম্ভব হতো না যদি রেগা প্রকল্প চালু না হতো।

এই প্রকল্পকেই যথাসম্ভব গুটিয়ে ফেলার ব্যবস্থা করেছে বর্তমান মোদী সরকার। সরকার জানিয়ে দিয়েছে সব ব্লকে প্রকল্প চালু রাখার প্রয়োজন নেই। এক তৃতীয়াংশ ব্লকে প্রকল্প চালু থাকলেই চলবে। তেমনি চাহিদাভিত্তিক প্রকল্পটিকে বরাদ্দভিত্তিক প্রকল্পে রূপান্তরিত করা হচ্ছে। অর্থাৎ যত মানুষ কাজ চাইবেন সেই মতো অর্থ বরাদ্দ হবে না। সরকার যেটুকু অর্থ বরাদ্দ করবে সেই মতই কাজ মিলবে। আসলে উদারনৈতিক সংস্কারের শর্ত মেনে মোদী সরকার সমস্ত ক্ষেত্র থেকেই ভরতুকি ছাঁটাই বা হ্রাসের চেষ্টা করছে, কেবল বড়লোকদের ভর্তুকি ছাড়া। ভরতুকি দিয়ে বাজেট ঘাটতি রাখতে চাইছে না। বাজেট ঘাটতি কমাবার লক্ষ্যেই ছাঁটাই হচ্ছে রেগার কাজ ও বরাদ্দ। সরকারের কাছে গরিব মানুষের রুজির থেকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারের শর্ত পূরণ।

ন্যূনতম সরকারের আর এক নমুনা হলো ন্যূনতম বাজেট। আয় কমাতে হবে, ব্যয়ও কমাতে হবে। আয় বাড়াতে হলে শিল্প-ব্যবসায়ী বড়লোকদের থেকে বেশি কর নিতে হবে। ব্যয় বাড়াতে হলে গরিব সাধারণ মানুষের স্বার্থে ব্যয় করতে হবে এবং উন্নয়নে ব্যয় বাড়াতে হবে। কর্পোরেট বান্ধব সরকার কর বাড়িয়ে আয় বাড়াবে না। উলটে বড়লোকদের প্রতি বছর ছয় লক্ষ কোটি টাকা কর ছাড় দেবে। সংস্কার-প্রিয় সরকার ঘাটতি বাড়াবে না। অতএব সোজা রাস্তা রেগায় কোপ।