Posts Tagged ‘cpi-m’

CPI(M)’s Income From ‘Unknown Sources’

February 3, 2017

লক্ষ লক্ষ মানুষের সাহায্যই আমাদের ‘অজানা উৎস’

অভীক দত্ত

বছরখানেক আগে কাঁচড়াপাড়ায় সি পি আই (এম)-র এক কর্মী নিজের ছেলের বিয়ের অনুষ্ঠানের খরচ বাঁচিয়ে ২৫হাজার টাকা পার্টির জন্য দান করেছেন। অবসর গ্রহণের পরে বারাসতের এক রেলকর্মী প্রাপ্ত টাকা থেকে ২৫হাজার টাকা সাহায্য করেছেন। কলকাতায় অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষিকা মৃদুলা ঘোষ কদিন আগেই তাঁর প্রয়াত কন্যা সুরঞ্জনা ভট্টাচার্যের স্মৃতিতে ২লক্ষ টাকা দিয়ে গেছেন। উদাহরণ এরকম অজস্র রয়েছে। কেউ নিজের পি এফ গ্র্যাচুইটির টাকা হাতে পেয়ে দান করেছেন, কেউ মুজফ্‌ফর আহ্‌মদ স্মৃতি পুরস্কার পেয়ে সেই অর্থ পার্টি তহবিলে দিয়েছেন, কেউ বা নিজের সারাজীবনের সঞ্চয় পার্টিকে দিয়েছেন। পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বামপন্থী আন্দোলনের জন্য সাহায্যের এমন অসংখ্য উদাহরণ ছড়িয়ে আছে। টাকার অঙ্ক বড় কথা নয়, কিন্তু মানুষের সাহায্য কী শক্তিধর হতে পারে তা যারা গ্রহণ করে তারাই টের পায়। টাকা আর মানুষের শুভকামনা এখানে একাকার হয়ে মিলেমিশে আমাদের শক্তি দিয়েছে। সি পি আই (এম) তার সংগঠন ও রাজনৈতিক সংগ্রাম পরিচালনার জন্য মানুষের কাছ থেকে এভাবেই অর্থসাহায্য পেয়ে থাকে।কিন্তু কিছু সংবাদমাধ্যমের সাহায্যে গত কয়েক বছর ধরে নিয়মিত প্রচার করা হচ্ছে, অন্য সব রাজনৈতিক দলের মতো সি পি আই (এম)-র আয়ও রহস্যময়, অস্বচ্ছ। সি পি আই (এম)-রও আয়ের বেশিরভাগই নাকি ‘অজানা উৎস’ থেকে। এক কথায় ভূতুড়ে। উদ্দেশ্যটা পরিষ্কার, এই রাজনৈতিক চৌর্যবৃত্তির রমরমা বাজারে সি পি আই (এম)-র গায়েও কালির ছিটে লাগানো। বুঝিয়ে দেওয়ার চেষ্টা, দুর্নীতিতে সব রাজনৈতিক দলই সমান। মুড়ি আর মিছরি এক করে দেখানোর চেষ্টা।

সম্প্রতি দু-একটি সংবাদমাধ্যমে লেখা হয়েছে, ‘‘২০০৪-’০৫ থেকে ২০১৪-’১৫। এই ১১ বছরে দেশের রাজনৈতিক দলগুলির তহবিলে মোট ১১,৩৬৭ কোটি টাকা চাঁদা জমা পড়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৬৯ শতাংশ ক্ষেত্রেই চাঁদার উৎস কী, তা কেউ জানে না।’’ অ্যাসোসিয়েশন ফর ডেমোক্রেটিক রিফর্মস (এ ডি আর) নামের একটি সংস্থার প্রকাশিত রিপোর্ট উদ্ধৃত করে ঐ সংবাদে অজানা উৎস থেকে আয়ের ক্ষেত্রে বি জে পি, কংগ্রেস, তৃণমূল কংগ্রেস এবং অন্যান্য দক্ষিণপন্থী দলের সঙ্গে সি পি আই (এম)-রও নাম উল্লেখ করে লেখা হয়েছে, এই ১১ বছরে সি পি আই (এম)-র মোট আয় প্রায় ৮৯৩ কোটি টাকা। এরমধ্যে ৪৭১.১৫ কোটি টাকা ‘অজানা উৎস থেকে’।

একটু খেয়াল করলেই দেখা যাবে সি পি আই (এম)-র আয়ের উৎস নিয়ে প্রশ্ন তোলা প্রায় প্রতি বছরের একটি নিয়মিত ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর আগেও কিছু সংবাদমাধ্যম সি পি আই (এম)-র আয়ের উৎস নিয়ে অপপ্রচার করেছে। কিছু আর্থিক পরিসংখ্যানকে তারা ‘অজানা উৎস’ জাতীয় তকমা লাগিয়ে নিজেদের মতো করে ব্যাখ্যা করে এই অপপ্রচার সেরেছে এবং অন্য রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সি পি আই (এম)-কে এক পঙ্‌ক্তিতে বসিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছে। অন্য কোনো রাজনৈতিক দল তাদের আয় নিয়ে সংবাদমাধ্যমের তোলা প্রশ্নের জবাব দেওয়ার প্রয়োজনবোধ করে না, বরং এড়িয়ে যায়। কিন্তু সি পি আই (এম) প্রতিবারই নিজেদের আয়ের উৎস ব্যাখ্যা করে জোরের সঙ্গে এর জবাব দিয়েছে, যদিও সংবাদমাধ্যমগুলি কখনোই সেই জবাব উল্লেখ করার সৌজন্যটুকুও দেখায় না।

অথচ আয়ের স্বচ্ছতা নিয়ে সি পি আই (এম) রীতিমতো গর্ববোধ করতে পারে। অন্য রাজনৈতিক দলগুলি যে প্রশ্নে অস্বস্তিতে কুঁকড়ে যেতে পারে, সেই প্রশ্নের উত্তরে সি পি আই (এম) গর্বের সঙ্গে বলতে পারে, আমরা কোনো পুঁজিপতি বা কর্পোরেট সংস্থার থেকে টাকা নিয়ে চলি না। সি পি আই (এম) তার সদস্যদের দেওয়া লেভি এবং শ্রমজীবী জনগণের কাছ থেকে সংগৃহীত টাকায় পার্টি ও পার্টির সংগ্রামের কর্মসূচি পরিচালনা করে। রাজনৈতিক দলগুলিকে স্বচ্ছভাবে অনুদান দেওয়ার প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে টাটা শিল্পগোষ্ঠী একবার জাতীয়স্তরে স্বীকৃত প্রতিটি রাজনৈতিক দলকে চাঁদা হিসাবে চেক পাঠিয়েছিল। দিল্লিতে সি পি আই (এম)-র কেন্দ্রীয় কমিটির দপ্তর এ কে গোপালন ভবনেও সেই চেক এসেছিল। কিন্তু সি পি আই (এম)-ই একমাত্র রাজনৈতিক দল যারা নিজেদের অপারগতার কথা জানিয়ে সেই চেক টাটাদের ফেরত পাঠিয়ে দিয়েছিল। অন্য কোনো জাতীয় দল এই বলিষ্ঠতা দেখাতে পেরেছে? জনগণের সংগ্রাম পরিচালনার জন্য কেবলমাত্র জনগণের অর্থের ওপরেই নির্ভরশীলতায় বিশ্বাসী সি পি আই (এম)। এটা যদি গর্বের না হয় তবে রাজনীতিতে গর্বের আর কি থাকতে পারে!

অন্য রাজনৈতিক দলগুলির আয়ের উৎসের সঙ্গে সি পি আই (এম)-র আয়ের উৎসের মিল খুঁজতে গেলে গোড়াতেই হোঁচট খাওয়াটা অবশ্য স্বাভাবিক। একটি বিপ্লবী রাজনৈতিক সংগঠন হিসাবে, কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যদের প্রতিমাসে নিয়মিত লেভি দেওয়াটা বাধ্যতামূলক। পার্টির গঠনতন্ত্রের ১০নং ধারায় স্পষ্ট ভাষায় লেখা আছে কোনো ব্যক্তিকে সি পি আই (এম)-র সদস্য থাকতে গেলে তাঁকে পার্টির দায়িত্ব ও কর্তব্য পালনের সঙ্গে সঙ্গে আয় অনুসারে পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটি নির্ধারিত হারে প্রতি মাসে লেভি দিতে হবে। পরপর তিন মাস কোনো কারণ ছাড়া কেউ লেভি জমা না দিলে এমনকি তাঁর সদস্যপদও খারিজ হয়ে যেতে পারে। সি পি আই (এম) গঠিত হওয়ার পরে ছয়ের দশকের মাঝামাঝি সময়ে পশ্চিমবঙ্গে পার্টির সদস্য সংখ্যা ছিল ১১হাজারের মতো। এখন পার্টি সদস্যের সংখ্যা আড়াই লক্ষের কাছাকাছি। বিভিন্ন আয়ের পার্টি সদস্য রয়েছেন। ৫০০০ টাকা আয় করেন এমন সদস্যও ন্যূনতম ২৫ টাকা লেভি দেন প্রতি মাসে। প্রতিটি পার্টি সদস্যকে প্রতি মাসের লেভি এবং প্রতিবছর সদস্যপদ পুনর্নবীকরণের জন্য ৫টাকা করে জমা দিতে হয়। যে-কোনো কমিউনিস্ট পার্টির মতই সি পি আই (এম)-র আয়ের মূল উৎস পার্টি সদস্যদের কাছ থেকে পাওয়া এই লেভি। গণসংগ্রহ প্রত্যেক পার্টি সদস্যের অবশ্য পালনীয় কর্তব্য ও শৃঙ্খলা। মোট সংগ্রহের ৭০ভাগই আসে ক্ষুদ্র সংগ্রহ থেকে।

লেভি ছাড়াও মাঝে মাঝেই পার্টির পক্ষ থেকে প্রকাশ্যে বিশেষ তহবিলের ডাক দেওয়া হয়। তাতেও কখনো এক দিনের আয় অথবা অর্ধেক দিনের আয় পার্টি সদস্যদের পার্টি তহবিলে জমা দিতে হয়। তাছাড়া, পার্টির প্রতীকে নির্বাচিত সাংসদ, বিধায়ক বা জনপ্রতিনিধিদের প্রাপ্য সরকারি বেতন বা ভাতার টাকাও সাধারণভাবে পার্টির তহবিলেই জমা দিতে হয়। এমনকি, অবসরপ্রাপ্ত সাংসদ বা বিধায়করা পেনশন বাবদ যে টাকা পান, তারও সবটা বা অধিকাংশ টাকাই পার্টি তহবিলে জমা পড়ে। কমিউনিস্ট পার্টি ছাড়া অন্য দলে এমন প্রক্রিয়ার কথা কেউ ভাবতে পারে? ভাবুন, সমর মুখার্জি, নীরেন ঘোষ এবং অনেক আত্মোৎসর্গী সাংসদ নেতার কথা, যাদের এক টাকাও সঞ্চয় ছিল না। অন্য কোন দলে এমন দৃষ্টান্ত আছে! প্রাকৃতিক দুর্যোগেও মানুষের সাহায্যে গণ-অর্থসংগ্রহে সাড়া পায় আমাদের পার্টি।

এর চাইতে এমন ভাবা এবং ভাবানো হয়তো অনেক সহজ যে দক্ষিণপন্থী রাজনৈতিক দলগুলি যেভাবে টাকা সংগ্রহ করে উৎস গোপন করে থাকে, সেভাবেই উৎস গোপন করে আয় করছে সি পি আই (এম)।

কিন্তু আয়কর আইন এবং জনপ্রতিনিধিত্ব আইন অনুযায়ী ২০হাজার টাকার বেশি অঙ্কের অর্থদাতাদের নাম জানাতে বাধ্য যে-কোনো রাজনৈতিক দল। সি পি আই (এম) এই অর্থদাতাদের নাম নিয়মিতভাবে নির্বাচন কমিশন এবং আয়কর দপ্তরকে জানিয়ে আসছে আইন মেনে। যদিও সি পি আই (এম)-র মোট আয়ের মাত্র ১শতাংশেরও মতো আসে এমন অর্থদাতাদের দান থেকে। মুখ্য আয় হয়ে থাকে, পার্টি সদস্যদের লেভি (৪০শতাংশের মতো) এবং গণসংগ্রহ থেকে। কমিউনিস্ট পার্টির ভাণ্ডার প্রকৃত অর্থেই রয়েছে গরিবের ঘরে ঘরে। অসংখ্য গরিব মানুষ পার্টির সংগ্রামকে নিজেদের সংগ্রাম মনে করে দশটাকা বিশ টাকা করে দান করে থাকেন। বহু গরিব ও মধ্যবিত্ত মানুষের সাহায্য এবং কমিউনিস্ট মতাদর্শের প্রতি দৃঢ় সমর্থন থেকে কিছু সচ্ছল মানুষের নিজেদের সর্বস্ব দেওয়ার অজস্র নজির এরাজ্যে রয়েছে। ২০১৫ সালের ৬ই আগস্টের সংবাদপত্রে প্রকাশিত ছবিতে দেখা যায়, মুজফ্‌ফর আহ্‌মদের জন্মদিন উপলক্ষ সভার মঞ্চে এক সদ্য পুত্রহারা বৃদ্ধা জননী ২লক্ষ টাকা তুলে দিচ্ছেন সূর্য মিশ্র এবং বিমান বসুর হাতে।

জেলায় জেলায় সি পি আই (এম)-র অজস্র পার্টি দপ্তর এবং স্থাবর সম্পত্তি রয়েছে যা গড়ে উঠেছে পার্টি নিবেদিত প্রাণ কোনো ব্যক্তির দান করা জমি অথবা বাড়িতে। এই সমস্ত আয় এবং সম্পদ এসেছে অন্য দলের মতোই ‘অজানা উৎস’ থেকে বলে দেওয়ার সঙ্গে বাস্তবের কোনও সম্পর্ক নেই। কমরেড সরোজ মুখোপাধ্যায়ের কথায় ‘এলাকার প্রতিটি মানুষের কাছে পার্টির অর্থের প্রয়োজনের কথা বোঝাতে হবে। কি কি কাজে টাকা খরচ হয় তা সাধারণভাবে তাঁদের বোঝাতে হবে’। শ্রমিকশ্রেণির পার্টি গরিবের পার্টি হলেও এ পার্টির ভাণ্ডার অফুরন্ত। এজন্য শত আক্রমণেও এই পার্টি ভেঙে পড়ে না। কারণ শ্রমজীবী জনগণের সংখ্যা শোষক শ্রেণির জনসংখ্যার চেয়ে অনেক বেশি। প্রত্যেকে দশ টাকা বা পাঁচ টাকা করে দিলেও লক্ষ লক্ষ মানুষের কাছ থেকে কমিউনিস্ট পার্টির অর্থসংগ্রহ সম্ভব, কমরেড সরোজ মুখোপাধ্যায়ের শেখানো পথ এলাকায় এলাকায় আমরা অনুসরণ করে চলেছি।

খনি অথবা স্পেকট্রামের বরাত দিতে মন্ত্রীদের যখন ঘুষ নিতে দেখা গেছে, আম্বানি আদানিদের টাকায় যখন রাজনৈতিক দলের রমরমা চলছে, যখন মানুষ চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছেন চিট ফান্ডের টাকা লুটে একটি রাজনৈতিক দল দাপটের সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গে সরকার চালাচ্ছে, চোখের সামনে টেলিভিশনের পর্দায় ঘুষ নিতে দেখা যাচ্ছে শাসকদলের মন্ত্রী সাংসদদের, তখন রাজনীতি সম্পর্কে সাধারণ মানুষের কোন্‌ মনোভাব তৈরি হচ্ছে তা বুঝতে অসুবিধা হয় না।সর্বশেষ সাধারণ বাজেটে মোদী সরকার রাজনৈতিক দলকে ২হাজার টাকার বেশি নগদে অনুদান দেওয়া যাবে না বলে যে ঘোষণা করেছে সেটা নেহাতই মানুষের চোখে ধুলো দেওয়া ছাড়া কিছু নয়। নয়া উদারনীতির যুগে নির্বাচনে সীমাহীন অর্থশক্তি ও কালো টাকার ব্যবহার, মাফিয়াদের পেশিশক্তি, রাজনীতির অপরাধীকরণ জনগণের অধিকারকে প্রহসনে পরিণত করছে এবং সংসদীয় গণতন্ত্রের সামনে গুরুতর বিপদ তৈরি করছে। তা ঠেকানোর কোনো প্রচেষ্টা সরকারের তরফে দেখা যাচ্ছে না। একমাত্র বামপন্থীরাই এর বিরুদ্ধে রাজনৈতিক চেতনা বৃদ্ধির কাজ ছাড়াও আমূল নির্বাচনী সংস্কারের দাবি করেছে।

সি পি আই (এম) চায় রাজনৈতিক দলকে কর্পোরেটের দান সবদিক থেকে নিষিদ্ধ করা হোক। তার পরিবর্তে নির্বাচন কমিশনের নিয়ন্ত্রণে রাষ্ট্রীয় তহবিল তৈরি করে নির্বাচনে ব্যবহার করা হোক। যাতে টাকা নিয়ে কোনও রাজনৈতিক দলকে কর্পোরেটের প্রতি দায়বদ্ধ থাকতে না হয়।এই জটিল পরিস্থিতিতে দুর্নীতির মূলে থাকা রাজনৈতিক অর্থনীতিকে চিনিয়ে দেওয়াটাই জনগণের কাছে প্রয়োজনীয় ছিলো। দক্ষিণপন্থী রাজনীতি আর বামপন্থী রাজনীতির ফারাকটা আরও স্পষ্টভাবে চেনানোর দরকার ছিলো। কিন্তু সংবাদমাধ্যম করছে তার উলটোটাই। তারা সাধারণভাবে সমগ্র রাজনীতিকেই চুরির দায়ে কাঠগড়ায় তোলার চেষ্টা করছে, সাদা-কালো মিশিয়ে দিচ্ছে, ভিন্নধরনের প্রক্রিয়ায় আয় সংগ্রহ করা রাজনৈতিক দল সি পি আই (এম)-কে এক পঙ্‌ক্তিতে বসাচ্ছে এবং জনগণের মধ্যে ‘সবাই সমান’ বলে বিরাজনীতির স্রোত তৈরির চেষ্টা করছে

এমন অপচেষ্টা রাজনীতিতে দুর্নীতি বন্ধ করতে সাহায্য করবে না, বরং ‘সবাই সমান’ রটনার আড়ালে প্রকৃত দুর্নীতিগ্রস্তদের পার পাওয়ার সুযোগ তৈরি করে দেবে।

এই লেখা শেষ করবো, গান্ধীজীকে লেখা পি সি যোশীর একটি চিঠির অংশ উল্লেখ করে। একদল কমিউনিস্ট-বিদ্বেষীর কাছ থেকে ক্রমাগত কুৎসা শুনে ১৯৪৪ সালে গান্ধীজী কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক পি সি যোশীকে চিঠিতে লিখেছিলেন, ‘আপনাদের পার্টির আয় ব্যয়ের হিসাব কি আমি দেখতে পারি?’ সশ্রদ্ধ নম্রতা নিয়ে যোশী তাঁকে ইতিবাচক জবাবই দিয়েছিলেন। কিন্তু সেই সঙ্গে আরেকটি অনুরোধ করেছিলেন। যোশী লিখেছিলেন, ‘আমি আপনাকে আরেকটি পালটা অনুরোধ করার লোভ সামলাতে পারছি না। আমি যখন গ্রামে গ্রামে ঘুরে বেড়াবো আপনি আপনার একজন প্রতিনিধি পাঠাবেন। তিনি দেখতে পাবেন, আমাদের পার্টির কথা শুনতে কীভাবে দশ হাজার থেকে পঞ্চাশ হাজার মানুষ বের হয়ে আসছেন। তাঁদের উৎসাহ উদ্দীপনা আপনাকে ১৯২০ সালের দিনগুলির কথা মনে পড়িয়ে দেবে। সবশেষে আমি তাঁদের কাছে পার্টি তহবিলে দান করার জন্য অনুরোধ করবো। হাজার হাজার মানুষ কীভাবে দান করছেন তা দেখে আপনার প্রতিনিধির চোখে জল চলে আসবে।’

আজকে যারা সি পি আই (এম)-র আয়ের ‘অজানা উৎস’ সন্ধান করতে চাইছেন, তাঁদেরকেও যোশীর মতোই পালটা অনুরোধ করতে ইচ্ছা করে। গর্ব করে বলতে পারি, দেখতে পাবেন সেই ঐতিহ্য সি পি আই (এম) রক্ষা করেই চলেছে। তবে মোদী বা মমতার দেওয়া চশমাটা খুলে আসবেন। খোলা চোখে দেখলে আপনার কাছে ‘অজানা’ তথ্য জানা হয়ে যাবে।

আমরা বিশ্বাস করি, শ্রেণিশত্রুর আক্রমণের ফলে কমিউনিস্ট পার্টি কোনদিন দুর্বল হয় না। আরো শক্তিশালী হয়। আরো পরিণত, সুদৃঢ় পার্টিতে পরিণত হয়। সেই আক্রমণের মধ্য দিয়েই আমরা পথ হাঁটছি।


   সৌজন্যেঃ গণশক্তি

Com Ananda Pathak Passes Away

November 29, 2014

368652

Attack on MGNREGA

November 28, 2014

রেগায় কেন কোপ

যে বামপন্থীদের চাপে আইন করে রেগা প্রকল্প চালু করতে বাধ্য হয়েছিল ইউ পি এ সরকার, এবার সেই প্রকল্প সঙ্কুচিত করে গরিব মানুষের রুজির অধিকার কেড়ে নেবার ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধেও রাস্তায় নেমে লড়াই করছে বামপন্থীরা। সি পি আই (এম)-র উদ্যোগে দিল্লিতে বিক্ষোভ অবস্থান এই পর্বে একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা।

রেগা আইনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো এটি একটি চাহিদাভিত্তিক প্রকল্প। মানুষ কাজ চাইলে সরকার কাজ দিতে বাধ্য। অর্থাৎ কাজ পাওয়াটা যেমন আইনি অধিকার তেমনি কাজ দেওয়াটাও সরকারের আইনি বাধ্যবাধকতা। দেশের যেসব মানুষ বা পরিবারের সারা বছরের কাজের সুযোগ নেই। গ্রামাঞ্চলে কৃষির মরসুমে কয়েক মাস কাজ জুটলেও বছরের বাকি সময় বসে থাকতে হয়। এই সময়টা ঐসব পরিবারের কাছে দুঃসহ যন্ত্রণার। কার্যত অনাহারে তাদের দিন কাটাতে হয়। অর্থাভাবে রেশনের খাদ্যও তারা সংগ্রহ করতে পারে না। গ্রামাঞ্চলে এই সঙ্কট ভয়াবহ হলেও শহরেও ভিন্ন ভিন্ন রূপে এই সঙ্কট বিরাজমান।

গ্রাম শহরের সবচেয়ে গরিব অংশের এই মানুষদের জন্য সরকারের ন্যূনতম দায়বদ্ধতার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েই বামপন্থীরা দাবি করেছিল, এই মানুষদের জন্য বছরে অন্তত ১০০দিনের কাজের ব্যবস্থা সরকারকেই করতে হবে। এই দাবিতে বামপন্থীরা সংসদের ভেতরে ও বাহিরে দীর্ঘ আন্দোলনও সংগঠিত করেছিল। পরবর্তীকালে কংগ্রেস এই বিষয়টাকে তাদের নির্বাচনী ইশ্‌তেহারে ঘোষণা করে দ্বিতীয় ইউ পি এ সরকারের আমলে অনেক টালবাহানার পর আইন তৈরি করে। বামপন্থীরা শহর ও গ্রাম উভয় অঞ্চলের গরিবদেরই এই প্রকল্পের আওতায় আনার দাবি করলেও মনমোহন সিং সরকার শহরের গরিবদের বঞ্চিত করে শুধুমাত্র গ্রামের গরিবদের জন্য প্রকল্পটি চালু করে।

খণ্ডিত আকারে হলেও সবচেয়ে গরিব অংশের মানুষের স্বার্থে প্রকল্পটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, বলতে গেলে নজিরবিহীনও। গত কয়েক বছর ধরে প্রকল্পটি নিঃসন্দেহে লক্ষ লক্ষ গরিব মানুষের অনাহার-অর্ধাহারের সময়কে অনেকটা কমিয়েছে। এই প্রকল্প গরিব কর্মহীনদের জন্য শুধু কর্মসংস্থানের ব্যবস্থাই করেনি, গ্রামীণ অর্থনীতিতে তাৎপর্যপূর্ণ প্রভাব ফেলেছে। গ্রামীণ মানুষের ক্রয় ক্ষমতা কিছুটা বাড়িয়ে পণ্য ও পরিষেবার চাহিদা বাড়িয়েছে যা দেশের অর্থনীতিতে বাড়তি শক্তি যুক্ত করেছে। উদারনীতির যাঁতাকলে পেষাই হয়ে সাধারণ মানুষের রুজি-রোজগার আক্রান্ত হলেও রেগা তাতে খানিকটা হলেও রক্ষাকবচের কাজ করেছে। তেমনি তথাকথিত দারিদ্র্য হ্রাসের যে খতিয়ান সরকার প্রকাশ করছে সেটাও সম্ভব হতো না যদি রেগা প্রকল্প চালু না হতো।

এই প্রকল্পকেই যথাসম্ভব গুটিয়ে ফেলার ব্যবস্থা করেছে বর্তমান মোদী সরকার। সরকার জানিয়ে দিয়েছে সব ব্লকে প্রকল্প চালু রাখার প্রয়োজন নেই। এক তৃতীয়াংশ ব্লকে প্রকল্প চালু থাকলেই চলবে। তেমনি চাহিদাভিত্তিক প্রকল্পটিকে বরাদ্দভিত্তিক প্রকল্পে রূপান্তরিত করা হচ্ছে। অর্থাৎ যত মানুষ কাজ চাইবেন সেই মতো অর্থ বরাদ্দ হবে না। সরকার যেটুকু অর্থ বরাদ্দ করবে সেই মতই কাজ মিলবে। আসলে উদারনৈতিক সংস্কারের শর্ত মেনে মোদী সরকার সমস্ত ক্ষেত্র থেকেই ভরতুকি ছাঁটাই বা হ্রাসের চেষ্টা করছে, কেবল বড়লোকদের ভর্তুকি ছাড়া। ভরতুকি দিয়ে বাজেট ঘাটতি রাখতে চাইছে না। বাজেট ঘাটতি কমাবার লক্ষ্যেই ছাঁটাই হচ্ছে রেগার কাজ ও বরাদ্দ। সরকারের কাছে গরিব মানুষের রুজির থেকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারের শর্ত পূরণ।

ন্যূনতম সরকারের আর এক নমুনা হলো ন্যূনতম বাজেট। আয় কমাতে হবে, ব্যয়ও কমাতে হবে। আয় বাড়াতে হলে শিল্প-ব্যবসায়ী বড়লোকদের থেকে বেশি কর নিতে হবে। ব্যয় বাড়াতে হলে গরিব সাধারণ মানুষের স্বার্থে ব্যয় করতে হবে এবং উন্নয়নে ব্যয় বাড়াতে হবে। কর্পোরেট বান্ধব সরকার কর বাড়িয়ে আয় বাড়াবে না। উলটে বড়লোকদের প্রতি বছর ছয় লক্ষ কোটি টাকা কর ছাড় দেবে। সংস্কার-প্রিয় সরকার ঘাটতি বাড়াবে না। অতএব সোজা রাস্তা রেগায় কোপ।

Unimaginable Electoral Fraud

August 30, 2013

330516

Left Front’s 34 Years is Haunting Mamata…

May 31, 2013

৩৪ বছর মমতাকে তাড়া করে বেড়াচ্ছে

শেখ ইসরাইল

পঞ্চায়েত নির্বাচন উপলক্ষে কংগ্রেস ও তৃণমূল কংগ্রেস প্রচারে নামছে। তাদের প্রচারের অন্যতম একটি বিষয় হচ্ছে এরাজ্যে বাম আমলের ৩৪ বছরের শাসনের সাফল্যকে নস্যাৎ করে জনসমক্ষে উপস্থাপিত করা।বাম আমলের একটানা ৩৪ বছর শাসনের সময়কালকে যতই দুঃস্বপ্নের কাল বলে কংগ্রেস, তৃণমূল কংগ্রেস চিহ্নিত করার চেষ্টা করুক না কেন, যতই সি পি আই (এম) তথা বামপন্থীদের মুছে ফেলার চেষ্টা হোক না কেন তা কোনোদিন সফল হবে না। ধারাবাহিকভাবে দুনিয়াজুড়ে সাম্রাজ্যবাদ পুঁজিবাদের সেবকরা কমিউনিস্টদের মুছে ফেলার চক্রান্ত করে এসেছে, সফল হয়নি।

তৃণমূল কংগ্রেসের একমাত্র কর্মসূচীই হলো — সি পি আই (এম) তথা বামপন্থীদের নিশ্চিহ্ন করা, ৩৪ বছরের বাম শাসনের উন্নয়নকে অস্বীকার করে নতুন প্রজন্মকে ভুল পথে চালিত করা।এ রাজ্যে সি পি আই (এম) নেতৃত্বাধীন বামফ্রন্ট সরকারকে ক্ষমতা থেকে অপসারণের লক্ষ্যে কংগ্রেস-তৃণমূল কংগ্রেস জোট হয়েছিল। কেন্দ্রে রাজ্যে ক্ষমতা ভাগাভাগিও করে নিয়েছিল। তারপর কংগ্রেস দল তৃণমূল কংগ্রেসকে নিয়ে চলতে পারল না। মধুচন্দ্রিমা অচিরেই শেষ হয়ে গেল। ছাড়াছাড়ি হয়ে গেল। কেন্দ্রে ও রাজ্যে মন্ত্রিত্বেও ছেদ পড়ে গেল।

অন্যদিকে, মমতা ব্যানার্জির নেতৃত্বাধীন তৃণমূল সরকার শাসন পরিচালনার ক্ষেত্রে ব্যর্থতার চূড়ান্ত রূপ পরিগ্রহ করেছে। দিনের পর দিন মিথ্যে কথা প্রচার করা, বিভ্রান্ত করার জন্য উন্নয়নের ঘোষণা করা, শিলান্যাস করা, মমতা ব্যানার্জি তাঁর নিজের ছবির প্রচার করা, রঙ-বেরঙের উৎসব নিয়ে মেতে থাকা — এসবের মধ্য দিয়ে কোটি কোটি টাকা খরচ করে চলেছেন। বাম আমলের ৩৪ বছরের ঋণের জন্য কেন্দ্রকে সুদ দিতে হচ্ছে, উন্নয়ন করা যাচ্ছে না, বেতন ভাতা বাড়ানো যাচ্ছে না বলে মিথ্যে কথা বলছেন। দিনের পর দিন শাসন পরিচালনায় অযোগ্যতার পরিচয় দিয়ে চলেছেন।

নিজেদের ব্যর্থতার দোহাই দিতে ৩৪ বছরের জের হিসাবে উল্লেখ করে নিজেদেরকে আড়াল করার চেষ্টা করছে তৃণমূল। কিন্তু, মানুষ ক্রমেই উপলব্ধি করছেন। হাত দিয়ে সূর্যকে ঢাকা যায় না।

ভয়ঙ্কর বিপজ্জনক স্বৈরতান্ত্রিক সরকার এসেছে রাজ্যে। এই দু’বছরে এ রাজ্যের জনগণ হাড়ে হা‍‌ড়ে টের পাচ্ছেন। ধারাবাহিকভাবে ভীতি প্রদর্শন, দৈহিক আক্রমণ, খুন, শ্লীলতাহানি, ধর্ষণ, তোলাবাজি নিত্যকার ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফসলের দাম না পেয়ে, মূল্যবৃদ্ধির চাপে ন্যূব্জ কৃষক এ পর্যন্ত ৮৭জন আত্মহত্যা করতে বাধ্য হয়েছেন। দু’বছরে তৃণমূল বাহিনীর হাতে ৯০জন বামপন্থী নেতা-কর্মী খুন হয়েছেন। সি পি আই (এমন)-এর বহু পার্টি অফিস ভাঙচুর করা হয়েছে। হামলা হয়েছে। বহু ট্রেড ইউনিয়ন অফিসে হামলা, ভাঙচুর, দখল হয়েছে।

ঘরছাড়া হয়েছেন, বেধড়ক মারধর খেয়ে হাত-পা ভাঙা, বিছানায় পড়ে থাকা আক্রান্ত মানুষও অনেক। মিথ্যা মামলার কোনো পরিসীমা নেই। খোদ বিধানসভায় মারধর, গুণ্ডামি করা হয় বামপন্থী বিধায়কদের উপর। বিরোধী দলের মহিলা বিধায়কও গুরুতর জখম হন। গত ১১ই ডিসেম্বর ’১২ তৃণমূল কংগ্রেস যে কলঙ্কজনক অধ্যায়ের সূচনা করলো তা, পশ্চিমবঙ্গের প‍‌রিষদীয় ইতিহাসে কালো দিন হিসাবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। ৭০বছর বয়সী, নিরবিচ্ছিন্ন ৪০ বছরের বিধায়ককেও মারধর করতে বিন্দুমাত্র দ্বিধাবোধ করেনি মমতার আশীর্বাদপুষ্টরা।

এই আক্রমণ কেবল সি পি আই (এম) তথা বামপন্থীদের নিশ্চিহ্ন করার জন্যই হচ্ছে না, একসময়কার জোটসঙ্গী কংগ্রেসের উপরও হচ্ছে। ওদের গোষ্ঠীদ্বন্দ্বের কারণে এক গোষ্ঠী অন্য গোষ্ঠীকে আক্রমণ করছে, খুন করছে। অর্থাৎ কোনোরকম বিরোধিতা চলবে না। ভারতবর্ষের আর কোথাও ডাকাত-ধর্ষক-গুণ্ডা-তোলাবাজ-বদমাইশরা এতো নিশ্চিন্তে নিজেদের ভয়ঙ্কর অপকর্মটি করতে পারে না। চোর-ডাকাত, ধর্ষকরা বুঝে গেছে যে তাদেরই সরকার এসেছে রাজ্যে। এখানে কোনো আমলা নিজেদের বিবেক অনুযায়ী কাজ করতে পারবে না।

এ রাজ্যে ধর্ষক দমন করতে গিয়ে মহাকরণের নির্দেশে দময়ন্তী সেন অপমানিত ও দমিত হয়েছেন। কোনো আমলা নিজের বিবেক অনুযায়ী কাজ করলে তাকে দময়ন্তী সেনের মতো অবস্থায় পড়তে হবে। এ রাজ্যে আইনশৃঙ্খলা বলে কিছু নেই। নিরাপদ নয় নারীরাও। নারী নির্যাতনের শীর্ষে পশ্চিমবঙ্গ ২৯,১৩৩, দ্বিতীয় অন্ধ্র প্রদেশ ২৮,২৪৩, তৃতীয় উত্তরপ্রদেশ ২২,৬৩৯। এ লজ্জা আমরা ঢাকবো কি করে! মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির কাছে এসব ‘ছোট ঘটনা’ আর ‘রটনা’ ছাড়া কিছু নয়। মা আজ লজ্জায় মুখ ঢেকেছেন, মাটি উৎসবে সীমাবদ্ধ, মানুষ হারিয়ে গেছেন।

মুখ্যমন্ত্রীই সব। তিনি কখনো ভুল করতে পারেন না, ভুল বলতেও পারেন না। তিনি সকলের সব পরামর্শকে অগ্রাহ্য করে চলেন। তিনি ‘ইয়েসম্যান’দের পছন্দ করেন। কোনো সমালোচনা সহ্য করেন না। তাকে কোনো প্রশ্নও করা যাবে না। তা‍‌কে নিয়ে কার্টুন আঁকাও চলবে না। তাহলে অম্বিকেশ মহাপাত্রের মতো জেলে যেতে হবে। প্রশ্ন করলে বাঁশপাহাড়ির শিলাদিত্য চৌধুরীর দশা হবে। জেলে যে‍‌তে হবে। মমতা সমালোচকদের ফুৎকারে উড়িয়ে দিয়ে নিজের সাফাই গাইতে গিয়ে বলেছেন, ‘রাজা চলে বাজার, কুত্তা ভোকে হাজার’।

আজকাল মুখ্যমন্ত্রীসহ অন্য মন্ত্রীদেরও মুখের ভাষার সংযম থাকে না। বিচারপতিদের উপর আক্রমণাত্মক ভাষা প্রয়োগের জন্য কলকাতা হাইকোর্ট তাঁকে সংযত হওয়ার পরামর্শ দিলেও সংযত হননি। মুখ্যমন্ত্রীর জন্যই রাজ্যে আতঙ্কের পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। পার্ক স্ট্রিট কাণ্ডে রাজ্য সরকার সুপ্রিম কোর্ট কর্তৃক তিরস্কৃত হলো। এদের মন্ত্রী রাজ্যপালকে ‘হলুদ’ কার্ড দেখিয়েছেন। রাজ্যপালের কঠোর মন্তব্য, ‘রাজ্যে গুণ্ডাগিরি চলছে’। কলকাতা হাইকোর্ট সমবায় সম্পর্কিত একটি মামলা প্রসঙ্গে মন্তব্য করেছে, ‘রাজ্য নৈরাজ্য চলছে’। সমাজের নানা বিশিষ্টজন মমতা ব্যানার্জি ও তার সরকারের সমালোচনা করলেও এতটুকু শিক্ষা নেননি। সাংবিধানিক দায়িত্ব পালন করছেন যারা তাদের সরকার আঘাত করছেন। কার্যত, সংবিধানকেই মান্যতা দিচ্ছেন না।

এতদিনে একথা স্পষ্ট হয়েছে যে মমতা ব্যানার্জি এ রাজ্যে ‘তৃণমূলের মুখ্যমন্ত্রী’ হয়েছেন, জনগণের মুখ্যমন্ত্রী হতে পারলেন না। তিনি ঘোরতর সি পি আই (এম) তথা বামবিরোধী। তিনি তার বিরোধীদের বিরোধিতার মাত্রা বাড়িয়ে চলেন।

বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ, মাধ্যমিক, এমনকি প্রাথমিক স্তরেও দীর্ঘদিনের প্রচলন ব্যবস্থা ভেঙে নিয়ে, প্রতিষ্ঠানসমূহের কাঠামো ভেঙে দিয়ে শিক্ষায় দলতন্ত্র কায়েম করা হচ্ছে। তৃণমূল সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে এমন একটা দিনও যায়নি, যেদিন শিক্ষক, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের উপর হামলা হয়নি। বিগত বিধানসভা নির্বাচনের ফল ঘোষণার পরে ২৪ ঘণ্টাও কাট‍‌লো না ১৪ই মে ২০১১ পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার গড়বেতায় পিটিয়ে খুন করলো প্রাথমিক শিক্ষক জিতেন নন্দীকে (৫৭)। পরবর্তীকালে আর একজন শিক্ষক বরুণ বিশ্বাস সমাজবিরোধীদের দ্বারা খুন হন।

১৪ই মে ২০১১ থেকে ৩০শে আগস্ট ২০১২ — প্রায় এই ১৬ মাসের তথ্য থেকে দেখা যায়, দৈহিকভাবে আক্রান্ত হন ৩৯, অধ্যক্ষ, অধ্যাপক, শিক্ষক, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে হামলার ঘটনা ৫১, এস এফ আই-কে মনোনয়নপত্র তুলতে না দেওয়াসহ হাঙ্গামার ঘটনা ৭০টি। এটি ১৬ মাসের হিসেব। এ পর্যন্ত আরও অনেক বেড়ে গেছে।

শিক্ষার হালহকিকত বোঝার জন্য একটি সংবাদের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করা হচ্ছে। স্কুলে ঢুকে এক প্রতিবন্ধী শিক্ষককে চড় মারলেন জেলা প্রাথমিক শিক্ষা সংসদের সভানেত্রী। ঘটনাটি ৪ঠা ফেব্রুয়ারি, ২০১৩-র। খবরে প্রকাশ, সকালে কালীতলায় বাঁকুড়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অতর্কিতে হানা দিয়ে শিক্ষক, শিক্ষিকা, পড়ুয়া ও অভিভাবকদের সামনেই স্কুলের শিক্ষক স্বরূপ কর্মকারকে সপাটে চড় মারেন বাঁকুড়া জেলা প্রাথমিক শিক্ষা সংসদের সভানেত্রী রিঙ্কু ব্যানার্জি। আকস্মিক আক্রমণ সামলাতে না পেরে ঐ প্রতিবন্ধী শিক্ষক উলটে চেয়ারে পড়ে যান।

এখানেই শেষ নয়। ঐ শিক্ষককে চড় মেরে সংসদ সভানেত্রী উপস্থিত অভিভাবকদের ডেকে গর্বিত কণ্ঠে বলেন, ‘‘দেখুন, একজন শিক্ষককে কিভাবে শায়েস্তা করতে হয়।’’ ৭ বছর পেরিয়ে যাওয়া একটি মেয়েকে প্রথম শ্রেণীতে ভর্তি না করে শিশুশিক্ষা অধিকার আইনের উল্লেখ করেছিলেন এবং মেয়ে‍‌টিকে দ্বিতীয় শ্রেণীতে ভর্তি করতে বলেন। এই ছিল শিক্ষকের অপরাধ। ঐ শিক্ষকের গালে চড় মে‍রে বলেন, ‘‘আমি স্কুল কাউন্সিলের চেয়ারপারসন, আমার কথাই আইন। এবার চড় মারলাম, পরের বার হাত-পা ভেঙে দেব।’’

৮ই ফেব্রুয়ারি (২০১৩) শুক্রবার স্কুল চলাকালীন স্কুলের মধ্যেই তৃণমূলীদের হাতে আক্রান্ত হলেন ক্যানিং ডেভিড শেষন হাই স্কুলের প্রধান শিক্ষক। স্কুল চলাকালীন প্রধান শিক্ষকের ঘরে ঢুকে তাঁকে মারধর করা হয়। তাঁকে উচিত শিক্ষা দিতেই নাকি তৃণমূলীরা মারধর করেন। ওরা কাকে কখন কোন্‌ শিক্ষা দিতে চান তা বোঝার আগেই আক্রমণ হয়ে যায়।

পশ্চিমবাংলার মুখ্যমন্ত্রী তাঁর দেহরক্ষী পুলিস আধিকারিকদের ‘চাবকানোর’ কথা বলে আস্ফালন করেন, সাংবাদিকদের ‘চড় মারার’ হুমকি দেন।

আমরা সকলেই জানি, পেটে ভাত থাকলে তবে লেখাপড়া বা শিক্ষার দিকে নজর পড়ে। তা না হলে পেটের জ্বালায় মজুরখাটা, চাকর, বাগাল প্রভৃতির কাজ করতে গিয়ে শৈশব হারিয়ে যায়। সুদূর অতীত থেকে যে কৃষক আন্দোলনের ধারা এ রাজ্যে গড়ে উঠেছিল তার তাৎপর্য না বুঝলে আজকের পরিস্থিতি বোঝা যাবে না।

বামফ্রন্ট সরকার একদিনে একটা ভোটের মধ্য দিয়েই তৈরি হয়নি। তেভাগা আন্দোলন, খাদ্য আন্দোলন, জোতদার, জমিদারদের বিরুদ্ধে আন্দোলন, ১৯৬৭ সাল ও ১৯৬৯ সালের গড়ে ওঠা যুক্তফ্রন্ট সরকার ও কৃষক আন্দোলন — এ সবের মধ্য দিয়ে নানা ঘাত-প্রতিঘাত পেরিয়ে অনেক ত্যাগের মধ্য দিয়ে এসেছে ১৯৭৭ সাল। বামফ্রন্ট সরকার।

তাই, ভূমিসংস্কারের ক্ষেত্রে সমগ্র দেশে সর্বাধিক সাফল্য এ রাজ্যে। ৩০ লক্ষাধিক কৃষক ১১ লক্ষ ২৭ হাজার একরের বেশি জমি বিনামূল্যে পেয়েছেন। এদের মধ্যে ৩৭ শতাংশ তফসিলী জাতিভুক্ত, প্রায় ১৮ শতাংশ আদিবাসী। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষরা পেয়েছেন ১৮ শতাংশ জমির পাট্টা। সারা দেশে জমির মাত্র ৩ ভাগ পশ্চিমবঙ্গে। ভূমিসংস্কারের মাধ্যমে যত জমি সমগ্র দেশে বণ্টিত হয়েছে, তার ২২ ভাগ পশ্চিমবঙ্গেই। এর সঙ্গে সেচের ব্যবস্থার উন্নতির ফলে শস্য চাষের নিবিড়তা বেড়েছে এ রাজ্যে ১৯২ শতাংশ, খাদ্যশস্য উৎপাদনে পরিমাণ হয়েছিল ১৭০ লক্ষ টন।

খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ শিল্পে পশ্চিমবঙ্গে অগ্রগতি হয়েছিল চমকপ্রদ। ২০০৬-২০০৭ থেকে ২০০৯-২০১০ অর্থবর্ষে এরাজ্যে ১৪২৬ খাদ্যপ্রক্রিয়াকরণ শিল্পে ৩৩০৫ কোটি ১৩ লক্ষ টাকা বিনিয়োগ হয়েছে। এতে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কর্মসংস্থান হয়েছে ১ লক্ষ ১৭ হাজারের বেশি লোকের। কৃষির উপর ভিত্তি করে শিল্পের সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হয়েছে। রাজ্যের মধ্যেই ৫০ হাজার কোটি টাকার বাজার সৃষ্টি হয়েছে। মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বেড়েছে।

এইসব অগ্রগতির পশ্চাদভূমিতে রয়েছে ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণ। ত্রিস্তর পঞ্চায়েতের মধ্য দিয়ে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ — জনগণের হাতে ক্ষমতাকে সঞ্চারিত করা। বামফ্রন্ট সরকার প্রথম শপথ গ্রহণকালেই ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণের ঘোষণা করা হয়েছিল এবং তা পরবর্তীকালে আইনসঙ্গতভাবে চালু করা হয়েছিল। সব কিছু মিলে এই রাজ্যে ব্যাপক উদ্যোগ-আ‍‌লোড়ন সৃষ্টি করতে পেরেছিল। এখন মমতা ব্যানার্জির সরকার পঞ্চায়েতের মূলে কুঠারাঘাত করেছে। ক্ষমতা আমলাদের হাতে।

কৃষির উপর ভিত্তি করে শিল্প গড়ে তোলার ভিত্তি প্রস্তুত হয়েছিল। অন্যদিকে বিনিয়োগের হার ছিল ঊর্ধ্বমুখী। শুধুমাত্র ২০০৯ সালে এ রাজ্যে বিনিয়োগ হয়েছে ৮ হাজার ৪০০ কোটি টাকার বেশি। পেট্রোলিয়াম কেমিক্যাল, পেট্রো-কেমিক্যাল ইনভেস্টমেন্ট রিজিয়ন স্থাপন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল রাজ্য সরকার ২০০৯ সালে, তথ্য প্রযুক্তি ক্ষেত্রে পশ্চিমবঙ্গে যেমন বহুগুণ বিনিয়োগ ঘটেছে, তেমনি কাজের সুযোগ বেড়েছে। ১ লক্ষের বেশি ছেলেমেয়ে কলকাতায় তথ্য প্রযুক্তি ক্ষেত্রে কাজ করছে। ভূমিসংস্কার, কৃষি বিকাশ, ত্রিস্তর পঞ্চায়েত, শিল্পোদ্যোগ, খাদ্য সমস্যা মিটিয়ে দিতে সাহায্য করেছে। রাজ্যে ৫০ হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ বাড়ানোর চেষ্টা হয়েছিল। এরা ক্ষমতায় এসে উলটো পথে হাঁটছে। তৃণমূলীরা রক্তাক্ত হামলা চা‍‌লিয়ে ২৬,৮৩৮জন পাট্টাদার ও বর্গাদারকে উচ্ছেদ করেছে। জমির পরিমাণ ৯,৪০৪.১৩ একর।

শিক্ষাক্ষেত্রে বাম আমলের বিগত ৩৪ বছরে এ রাজ্যের উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি ঘটেছে। রাজ্যের ৯৯.২৫% শিশুই প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যায়। ১০০ শতাংশ করার প্রয়াস চলছিল। ভোকেশনাল ট্রেনিং সেন্টার বিদ্যালয় স্তর থেকেই গড়ে উঠেছে। বিগত ৩৪ বছরে রাজ্যে প্রাথমিক বিদ্যালয় ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। অনেকগুলি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। রাজ্যের ছেলে‍‌মেয়েদের স্বার্থে অনেকগুলি ইঞ্জিনিয়ারিং ও টেকনোলজি কলেজ স্থাপিত হয়েছে এ রাজ্যে। বৃদ্ধি পেয়েছে মেডিক্যাল কলেজের সংখ্যা। ১৯৭৭ সালের মাধ্যমিক পরীক্ষার্থী ছিল ২ লক্ষ, ২০১০ সালে উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার্থী ১০ লক্ষের বেশি। জনসংখ্যা বেড়েছে ১.৬গুণ। পরীক্ষার্থী ও ছাত্র বেড়েছে ৫ গুণেরও বেশি। গরিব, নিম্নবিত্ত, নতুন পরিবার থেকে শিক্ষার অঙ্গনে এসেছে। মাদ্রাসা শিক্ষায় ব্যাপক অগ্রগতি ঘটেছে। অর্থ বরাদ্দ বেড়েছে বহুগুণ। শিক্ষা ও শিক্ষকের মর্যাদা বেড়েছে অকল্পনীয়। এরা পরিবর্তনের পরিবর্তন করতে চায়, জাগ্রত জনগণ বাধা দেবেই।

এখন মসজিদের ‘ইমাম’দের কিছু ভাতা পাইয়ে ‘মুসলিম প্রেমের’ ভণ্ডামি করা হচ্ছে। ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রে মমতা ব্যানার্জি বিপজ্জনক খেলায় মেতেছে। মমতা ব্যানার্জি নানা সময়ে অসত্য ঘোষণা করে বসেন। ঘোষণার সঙ্গে পরিকাঠামো ও রূপায়ণ নিয়ে আলোচনা করলেই ফানুস চুপসে যাবে। যেমন, মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির এ রাজ্যে ১০ লক্ষ বেকারের চাকরি দেওয়ার দাবির মানে হলো বাস্তবে ১৮৯৯জনের চাকরি। ঘোষণা, দাবি ও বাস্তবের সঙ্গে এতোটাই ফারাক। এই সরকার এসে অনুমোদিত ৪০টি মাদ্রাসা বাতিল করে দিয়েছে। সংখ্যালঘু সংরক্ষণ (ও বি সি) কথার কথা রয়ে গেছে।

মমতা ব্যানার্জির জমি নীতির কারণে শিল্পায়ন লাটে উঠে গেছে। এখন যা আছে, তাও পালাচ্ছে। এখন যা অবস্থা কোনো উন্নয়ন হবে না, রেল হবে না, সড়ক হবে না। বেকারদের কাজ হবে না। শ্রমদিবস কমে ৪৪ দিনের জায়গায় ২৫/২৬ দিনে নেমেছে জঙ্গলমহলে। অন্যত্র ৯০% থেকে ২৬.৪৭%-এ নেমেছে। জঙ্গল হাসছে না, পাহাড়ও হাসছে না। অশান্তি হচ্ছে। কাঁদছে। এ রাজ্যের সি পি আই (এম)সহ বামপন্থীদের ৩৪ বছর মমতা ব্যানা‍‌র্জিকে তাড়া করে বেড়াচ্ছে। ভূমিসংস্কারকে চেষ্টা করেও ধ্বংস করতে পারছে না। তবে, কৃষকদের আত্মহত্যার মিছিলের পরিবেশ তৈরি করতে পেরেছে।

এখন চলছে শিক্ষায় মমতায়‌ন। শিক্ষার সমস্ত স্তরকে মমতাময়ী করার জন্য তাদের ছেলেদের লেলিয়ে দিয়েছে ও দিচ্ছে। অধ্যক্ষ, অধ্যাপক, অধ্যাপিকা, শিক্ষক-শিক্ষিকাদের তাদের বশীভূত করতে হবে। না হলে রায়গঞ্জ কলেজের অধ্যক্ষকে যেভাবে তৃণমূলের হাতে আক্রান্ত, হেনস্তা হতে হয়েছে, তেমন হবে কিংবা ভাঙড়ের অধ্যাপিকাকে যেমন মস্তান আরাবুল ইসলাম জলের জগ ছুঁড়ে মেরেছিল, তেমন করে মারা হবে। কিংবা চাবি দিয়ে আটকে রাখা হবে। যারা এ কাজ করছে, তারা মমতা ব্যানার্জির স্নেহধন্য তো বটে, বিশেষ ‘এনারজেটিক’ বলে প্রশস্তি হচ্ছে। ফেল করলেও পাস করিয়ে দেওয়ার অদ্ভুত দাবি থেকে নানা ধরনের দাবি ওদের কণ্ঠে ধ্বনিত হচ্ছে। পরীক্ষার হলে গণটোকাটুকির প্রতিযোগিতা চলছে।

বর্তমানে প্রাথমিক শিক্ষাকে নিয়ে ছেলেখেলা করছে। রাজ্য সরকার প্রাথমিকে বই দিচ্ছে। ‘মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির নির্দেশে গঠিত কমিটি’ বইগুলি প্রস্তুত করেছেন বিজ্ঞাপিত করা হয়েছে। অথচ, এটা উল্লেখের কোনো প্রয়োজন ছিল না। বিষয়বস্তুর মধ্যে ভুল, অবৈজ্ঞানিক ও অসংগত বিষয়ের অবতারণা করা হয়েছে। শিক্ষক, শিক্ষার অঙ্গন, কাঠামো, শিক্ষার বিষয়কেও ক্ষতবিক্ষত করার জন্য সচেষ্ট। এভাবেই শিক্ষায় মমতায়ন চলছে। শিক্ষাঙ্গনে দুর্বৃত্তায়ন কোন্‌ স্তরে গেছে যে, গার্ডেনরিচের হরিমোহন ঘোষ কলেজের ঘটনায় একজন কর্তব্যরত পুলিস অফিসারকে দুর্বৃত্তদের গুলিতে প্রাণ দিতে হলো? অসময়ে এ কোন অন্ধকার নামিয়ে আনা হচ্ছে? বড়ই দুঃসময় এখন। সমাজবিরোধীদের দাপাদাপি চলছে। রক্তাক্ত সমাজ, ক্ষতবিক্ষত শিক্ষাঙ্গন, পরিবেশ কলুষিত। এ রাজ্যে নারীরা আদৌ নিরাপদ নয়।

শিক্ষায় মমতায়নের নামে অধ্যাপক, শিক্ষক, ছাত্রদের খুন, সন্ত্রাস চলছে। এর পাশাপাশি এই সরকারের আমলে চিট ফান্ড কেলেঙ্কারির মতো কলঙ্কজনক ঘটনা ঘটেছে। পশ্চিমবাংলার আকাশে আজ যেন নেমে এসেছে দুর্যোগের ঘনঘটা। এই কঠিন পরিস্থিতি মোকাবিলা করেই এগোতে হবে। এগোনো সম্ভব।

Anandabazar Returns to its Self…

May 7, 2012

 

Communists are Ever Ready to go through all the Trials & Tribulations

February 26, 2012

Story of a Fighter…

January 18, 2012

 

অত্রস্থ হক্কলই কুশল, খালি কাইল্যা কুত্তাডা মইর‍্যা গ্যাছে গা…

July 20, 2011

20110720-mihir sengupta

তৃণমূলের শাসনের প্রথম একমাসে খুন ২৯ জন… 29 Killed in One Month of Trinamool Rule in WB…

June 28, 2011

 

হিসাবে কারচুপি করেও বিধানসভায় রাজ্য জানালো, একমাসে খুন ১৮জন!

নিজস্ব প্রতিনিধি

 

Party leaders, workers paying homage to the CPI(M) leader Comrade Jiten Nandy who was killed by Trinamool goons in Garbeta on May14.

    কলকাতা, ২৭শে জুন — তাঁর সরকারের একমাস পূর্তির দিনে দিল্লিতে ক’দিন আগেই সাংবাদিক সম্মেলনে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি সগর্বে জানিয়েছিলেন, পশ্চিমবঙ্গে আইন-শৃঙ্খলা এখন নিয়ন্ত্রণে। কোনও গোলমাল নেই।

    ৬ দিনও কাটলো না, সেই সরকারের পরিষদীয় মন্ত্রী পার্থ চ্যাটার্জি বিধানসভায় মুখ্যমন্ত্রীর অনুপস্থিতিতে তাঁর হয়ে যে হিসাব দিলেন, তাতে দেখা যাচ্ছে, রাজ্যে তৃণমূলের সরকার প্রতিষ্ঠার পর একমাসেই ১৮জন রাজনৈতিক কর্মী খুন হয়ে গিয়েছেন!

    যদিও ওই হিসাবে যে কারচুপি আছে, তাতে কোনও সন্দেহ নেই। কমিয়ে দেখানো আছে রাজনৈতিক কর্মী খুনের হিসাব। কেননা, রবিবার পর্যন্ত ধরলে, রাজ্যে নয়া তৃণমূলী জোট সরকারের আমলে একমাস ছয় দিনেই শুধু বামফ্রন্টেরই ১৯জন নেতাকর্মী খুন হয়ে গিয়েছেন। এরমধ্যে সি পি আই (এম)-র ১৮ জন। আর এস পি-র ১জন। অথচ রাজ্যের পরিষদীয় মন্ত্রী পার্থ চ্যাটার্জি মুখ্যমন্ত্রীর হয়ে বিধানসভায় যে হিসাব দিয়েছেন, তাতে খুনের হিসাব এইরকম, সি পি আই (এম)-র ৮জন, তৃণমূলের ৬জন, কংগ্রেসের ৩জন এবং জি এন এল এফ-এর ১জন। এদের নামধাম খুনের স্থান ও দিনক্ষণ কিছু তিনি জানাননি এদিন বিধানসভায়। সরকারী খাতায় কেমন হিসাব রাখেন ওঁরা, তার একটা নমুনা অবশ্য এদিন মিলেছে বিধানসভায়। যেমন পার্থ চ্যাটার্জি প্রথমে বললেন, মোট ১৭জন রাজনৈতিক কর্মী খুন হয়েছেন। অথচ রাজনৈতিক দল পরিচয়ে খুনের যে সংখ্যা দিলেন, তার যোগফল করে সাংবাদিকরা দেখেন ১৮ হচ্ছে! এনিয়ে অবশ্য প্রশ্ন ওঠেনি বিধানসভায়।

    তবে হিসাবে যে কম দেখানোর কারচুপি আছে, তার প্রমাণ বামফ্রন্টের দেওয়া তালিকা। নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর থেকে ধরলে এবং নয়া সরকারের আমলে ১ মাস ৬দিনে যে ১৯জন বামফ্রন্ট কর্মী খুন হয়েছেন রাজ্যে, তাদের নামধাম ও খুনের তারিখ হলো,

১৪ই মে- জিতেন নন্দী (গড়বেতা) ও পূর্ণিমা ঘোড়ুই (রায়না),

১৫ই মে- অজিত লোহার (তালডাংরা),

১৯শে মে-রামপ্রবেশ রায়, মুন্দাকলা রায় (দুর্গাপুর) ও দহিরুদ্দিন (চোপড়া),

২১শে মে — মহম্মদ খোদারাখা (মাড়গ্রাম),

 ২৩শে মে-অমল সমাদ্দার (বারুইপুর), ২৪শ মে-মহবুল শেখ ও মোফাসের শেখ (বেলডাঙা),

২৯শে মে- শেখ সাহদাত (পুরশুড়া),

৩০শে মে- সুদেব বর্মা (বালুরঘাট),

৪ঠা জুন – রবি সাউ (ঝাড়গ্রাম),

৯ই জুন-লক্ষ্মীকান্ত সর্দার (গড়বেতা),

১২ই জুন-অলোক বেওড়া (কোতুলপুর),

১৪ই জুন-ভবেশ শবর (ঝাড়গ্রাম),

২২শে জুন – নরেন গায়েন (বারুইপুর),

২৫শে জুন – সীতারাম কুণ্ডল (বিষ্ণুপুর) এবং

২৬শে জুন – যদুনাথ মণ্ডল (রানাঘাট)।

    কেউ জানে না, ১৯জনের তালিকা নিয়ে এই খবর যখন মঙ্গলবার প্রকাশিত হবে, তার আগে কোথাও আরো কোনও বামফ্রন্ট কর্মী খুন হয়ে যাবেন কীনা! তবে অবস্থা এমনই। এই অবস্থাকেই আড়াল করে মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানা‍র্জি বলেছিলেন, তাঁর সরকারের আমলে আইন-শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে। অথচ তার সরকারের কম করে দেখানো হিসাবেও রাজনৈতিক কর্মী খুন ১৮ জন! বলা হয়েছে ৬জন তৃণমূল কর্মী ও কংগ্রেসের ৩জন কর্মী খুন হয়েছেন। যদি তা-ই হয়, সেটাও কেন প্রশাসনের দায় নয়, এমন প্রশ্ন ওঠেনি এদিন বিধানসভায়। বরং ঘটনা হলো, দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলায় ভাঙরে তৃণমূল যুব কংগ্রেস কর্মী মইনুদ্দিন মোল্লার খুন নিয়ে দৃষ্টি আকর্ষণী প্রস্তাবের উত্তরে মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি অনুপস্থিতিতে তাঁর হয়ে পরিষদীয় মন্ত্রী পার্থ চ্যাটার্জি যে বিবৃতি পেশ করেছেন বিধানসভায়, তাতে তাৎপর্যপূর্ণভাবে লেখা হয়েছে, তৃণমূল কংগ্রেসের যুব সভাপতি মইনুদ্দিন মোল্লা পেশাগতভাবে ইমারতি দ্রব্য সরবরাহ ও জমি কেনাবেচায় যুক্ত ছিলেন। পৃথক একটি দৃষ্টি আকর্ষণী প্রস্তাবের উত্তরে এদিন মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি উপস্থিত না থাকায় তাঁর হয়ে পার্থ চ্যাটার্জি জানান, বাঁকুড়ার তালডাংরায় সি পি আই (এম) নেতা অজিত লোহারকে খুন করেছে ‘একদল দুষ্কৃতী’। এদের রাজনৈতিক পরিচয় বিবৃতিতে জানাননি তিনি।

    ঘটনা হলো কারচুপি করে কম দেখানো হিসাবে রাজ্যে একমাসে ১৮জন রাজনৈতিক কর্মীর খুন হয়ে যাওয়ার তথ্য জানিয়েও পার্থ চ্যাটার্জি এদিন বলেছেন, ‘রাজ্যে খুন নিয়ন্ত্রণে। দু-এটি বিক্ষিপ্ত ঘটনা এদিক ওদিক ঘটছে।’ হিসাব বলছে, তৃণমূলের ৬জন ও কংগ্রেসের ৩জন এবং জি এন এল এফ-এর ১জন যদি খুন হন, এই ১০জনের হিসাবের সঙ্গে বামফ্রন্টের খুন হওয়া (যার হিসাব এই প্রতিবেদনে নামধাম তারিখ সহ দেওয়া হয়েছে) ১৯জন ধরলে এই অল্প সময়েই রাজ্যে রাজনৈতিক কর্মী খুনের সংখ্যা দাঁড়ায় ২৯জন!

    বামফ্রন্ট আমলে যখন তৃণমূল-মাওবাদী বা অন্য বিরোধীদের আক্রমণে বামফ্রন্টের কর্মীরা খুন হতেন, বিধানসভায় তার তথ্য বামফ্রন্ট বিধায়করা সরকার পক্ষে থেকেও উল্লেখ করলে, বিরোধী বেঞ্চে বসা তৃণমূল ও কংগ্রেস থেকে বলা হতো, যে দলেরই খুন হোক, দায় নিতে হবে প্রশাসনকে। খুন হচ্ছে মানে প্রশাসন দুর্বল। সে যে দলেরই খুন হোক।

    যারা বলতেন একথা, আজ তারা ক্ষমতায়। খুন হচ্ছে; আর ওরা বলছেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে! এগুলি সব বিক্ষিপ্ত এদিক ওদিকের ঘটনা!