Posts Tagged ‘cpim’

CPI(M)’s Income From ‘Unknown Sources’

February 3, 2017

লক্ষ লক্ষ মানুষের সাহায্যই আমাদের ‘অজানা উৎস’

অভীক দত্ত

বছরখানেক আগে কাঁচড়াপাড়ায় সি পি আই (এম)-র এক কর্মী নিজের ছেলের বিয়ের অনুষ্ঠানের খরচ বাঁচিয়ে ২৫হাজার টাকা পার্টির জন্য দান করেছেন। অবসর গ্রহণের পরে বারাসতের এক রেলকর্মী প্রাপ্ত টাকা থেকে ২৫হাজার টাকা সাহায্য করেছেন। কলকাতায় অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষিকা মৃদুলা ঘোষ কদিন আগেই তাঁর প্রয়াত কন্যা সুরঞ্জনা ভট্টাচার্যের স্মৃতিতে ২লক্ষ টাকা দিয়ে গেছেন। উদাহরণ এরকম অজস্র রয়েছে। কেউ নিজের পি এফ গ্র্যাচুইটির টাকা হাতে পেয়ে দান করেছেন, কেউ মুজফ্‌ফর আহ্‌মদ স্মৃতি পুরস্কার পেয়ে সেই অর্থ পার্টি তহবিলে দিয়েছেন, কেউ বা নিজের সারাজীবনের সঞ্চয় পার্টিকে দিয়েছেন। পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বামপন্থী আন্দোলনের জন্য সাহায্যের এমন অসংখ্য উদাহরণ ছড়িয়ে আছে। টাকার অঙ্ক বড় কথা নয়, কিন্তু মানুষের সাহায্য কী শক্তিধর হতে পারে তা যারা গ্রহণ করে তারাই টের পায়। টাকা আর মানুষের শুভকামনা এখানে একাকার হয়ে মিলেমিশে আমাদের শক্তি দিয়েছে। সি পি আই (এম) তার সংগঠন ও রাজনৈতিক সংগ্রাম পরিচালনার জন্য মানুষের কাছ থেকে এভাবেই অর্থসাহায্য পেয়ে থাকে।কিন্তু কিছু সংবাদমাধ্যমের সাহায্যে গত কয়েক বছর ধরে নিয়মিত প্রচার করা হচ্ছে, অন্য সব রাজনৈতিক দলের মতো সি পি আই (এম)-র আয়ও রহস্যময়, অস্বচ্ছ। সি পি আই (এম)-রও আয়ের বেশিরভাগই নাকি ‘অজানা উৎস’ থেকে। এক কথায় ভূতুড়ে। উদ্দেশ্যটা পরিষ্কার, এই রাজনৈতিক চৌর্যবৃত্তির রমরমা বাজারে সি পি আই (এম)-র গায়েও কালির ছিটে লাগানো। বুঝিয়ে দেওয়ার চেষ্টা, দুর্নীতিতে সব রাজনৈতিক দলই সমান। মুড়ি আর মিছরি এক করে দেখানোর চেষ্টা।

সম্প্রতি দু-একটি সংবাদমাধ্যমে লেখা হয়েছে, ‘‘২০০৪-’০৫ থেকে ২০১৪-’১৫। এই ১১ বছরে দেশের রাজনৈতিক দলগুলির তহবিলে মোট ১১,৩৬৭ কোটি টাকা চাঁদা জমা পড়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৬৯ শতাংশ ক্ষেত্রেই চাঁদার উৎস কী, তা কেউ জানে না।’’ অ্যাসোসিয়েশন ফর ডেমোক্রেটিক রিফর্মস (এ ডি আর) নামের একটি সংস্থার প্রকাশিত রিপোর্ট উদ্ধৃত করে ঐ সংবাদে অজানা উৎস থেকে আয়ের ক্ষেত্রে বি জে পি, কংগ্রেস, তৃণমূল কংগ্রেস এবং অন্যান্য দক্ষিণপন্থী দলের সঙ্গে সি পি আই (এম)-রও নাম উল্লেখ করে লেখা হয়েছে, এই ১১ বছরে সি পি আই (এম)-র মোট আয় প্রায় ৮৯৩ কোটি টাকা। এরমধ্যে ৪৭১.১৫ কোটি টাকা ‘অজানা উৎস থেকে’।

একটু খেয়াল করলেই দেখা যাবে সি পি আই (এম)-র আয়ের উৎস নিয়ে প্রশ্ন তোলা প্রায় প্রতি বছরের একটি নিয়মিত ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর আগেও কিছু সংবাদমাধ্যম সি পি আই (এম)-র আয়ের উৎস নিয়ে অপপ্রচার করেছে। কিছু আর্থিক পরিসংখ্যানকে তারা ‘অজানা উৎস’ জাতীয় তকমা লাগিয়ে নিজেদের মতো করে ব্যাখ্যা করে এই অপপ্রচার সেরেছে এবং অন্য রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সি পি আই (এম)-কে এক পঙ্‌ক্তিতে বসিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছে। অন্য কোনো রাজনৈতিক দল তাদের আয় নিয়ে সংবাদমাধ্যমের তোলা প্রশ্নের জবাব দেওয়ার প্রয়োজনবোধ করে না, বরং এড়িয়ে যায়। কিন্তু সি পি আই (এম) প্রতিবারই নিজেদের আয়ের উৎস ব্যাখ্যা করে জোরের সঙ্গে এর জবাব দিয়েছে, যদিও সংবাদমাধ্যমগুলি কখনোই সেই জবাব উল্লেখ করার সৌজন্যটুকুও দেখায় না।

অথচ আয়ের স্বচ্ছতা নিয়ে সি পি আই (এম) রীতিমতো গর্ববোধ করতে পারে। অন্য রাজনৈতিক দলগুলি যে প্রশ্নে অস্বস্তিতে কুঁকড়ে যেতে পারে, সেই প্রশ্নের উত্তরে সি পি আই (এম) গর্বের সঙ্গে বলতে পারে, আমরা কোনো পুঁজিপতি বা কর্পোরেট সংস্থার থেকে টাকা নিয়ে চলি না। সি পি আই (এম) তার সদস্যদের দেওয়া লেভি এবং শ্রমজীবী জনগণের কাছ থেকে সংগৃহীত টাকায় পার্টি ও পার্টির সংগ্রামের কর্মসূচি পরিচালনা করে। রাজনৈতিক দলগুলিকে স্বচ্ছভাবে অনুদান দেওয়ার প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে টাটা শিল্পগোষ্ঠী একবার জাতীয়স্তরে স্বীকৃত প্রতিটি রাজনৈতিক দলকে চাঁদা হিসাবে চেক পাঠিয়েছিল। দিল্লিতে সি পি আই (এম)-র কেন্দ্রীয় কমিটির দপ্তর এ কে গোপালন ভবনেও সেই চেক এসেছিল। কিন্তু সি পি আই (এম)-ই একমাত্র রাজনৈতিক দল যারা নিজেদের অপারগতার কথা জানিয়ে সেই চেক টাটাদের ফেরত পাঠিয়ে দিয়েছিল। অন্য কোনো জাতীয় দল এই বলিষ্ঠতা দেখাতে পেরেছে? জনগণের সংগ্রাম পরিচালনার জন্য কেবলমাত্র জনগণের অর্থের ওপরেই নির্ভরশীলতায় বিশ্বাসী সি পি আই (এম)। এটা যদি গর্বের না হয় তবে রাজনীতিতে গর্বের আর কি থাকতে পারে!

অন্য রাজনৈতিক দলগুলির আয়ের উৎসের সঙ্গে সি পি আই (এম)-র আয়ের উৎসের মিল খুঁজতে গেলে গোড়াতেই হোঁচট খাওয়াটা অবশ্য স্বাভাবিক। একটি বিপ্লবী রাজনৈতিক সংগঠন হিসাবে, কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যদের প্রতিমাসে নিয়মিত লেভি দেওয়াটা বাধ্যতামূলক। পার্টির গঠনতন্ত্রের ১০নং ধারায় স্পষ্ট ভাষায় লেখা আছে কোনো ব্যক্তিকে সি পি আই (এম)-র সদস্য থাকতে গেলে তাঁকে পার্টির দায়িত্ব ও কর্তব্য পালনের সঙ্গে সঙ্গে আয় অনুসারে পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটি নির্ধারিত হারে প্রতি মাসে লেভি দিতে হবে। পরপর তিন মাস কোনো কারণ ছাড়া কেউ লেভি জমা না দিলে এমনকি তাঁর সদস্যপদও খারিজ হয়ে যেতে পারে। সি পি আই (এম) গঠিত হওয়ার পরে ছয়ের দশকের মাঝামাঝি সময়ে পশ্চিমবঙ্গে পার্টির সদস্য সংখ্যা ছিল ১১হাজারের মতো। এখন পার্টি সদস্যের সংখ্যা আড়াই লক্ষের কাছাকাছি। বিভিন্ন আয়ের পার্টি সদস্য রয়েছেন। ৫০০০ টাকা আয় করেন এমন সদস্যও ন্যূনতম ২৫ টাকা লেভি দেন প্রতি মাসে। প্রতিটি পার্টি সদস্যকে প্রতি মাসের লেভি এবং প্রতিবছর সদস্যপদ পুনর্নবীকরণের জন্য ৫টাকা করে জমা দিতে হয়। যে-কোনো কমিউনিস্ট পার্টির মতই সি পি আই (এম)-র আয়ের মূল উৎস পার্টি সদস্যদের কাছ থেকে পাওয়া এই লেভি। গণসংগ্রহ প্রত্যেক পার্টি সদস্যের অবশ্য পালনীয় কর্তব্য ও শৃঙ্খলা। মোট সংগ্রহের ৭০ভাগই আসে ক্ষুদ্র সংগ্রহ থেকে।

লেভি ছাড়াও মাঝে মাঝেই পার্টির পক্ষ থেকে প্রকাশ্যে বিশেষ তহবিলের ডাক দেওয়া হয়। তাতেও কখনো এক দিনের আয় অথবা অর্ধেক দিনের আয় পার্টি সদস্যদের পার্টি তহবিলে জমা দিতে হয়। তাছাড়া, পার্টির প্রতীকে নির্বাচিত সাংসদ, বিধায়ক বা জনপ্রতিনিধিদের প্রাপ্য সরকারি বেতন বা ভাতার টাকাও সাধারণভাবে পার্টির তহবিলেই জমা দিতে হয়। এমনকি, অবসরপ্রাপ্ত সাংসদ বা বিধায়করা পেনশন বাবদ যে টাকা পান, তারও সবটা বা অধিকাংশ টাকাই পার্টি তহবিলে জমা পড়ে। কমিউনিস্ট পার্টি ছাড়া অন্য দলে এমন প্রক্রিয়ার কথা কেউ ভাবতে পারে? ভাবুন, সমর মুখার্জি, নীরেন ঘোষ এবং অনেক আত্মোৎসর্গী সাংসদ নেতার কথা, যাদের এক টাকাও সঞ্চয় ছিল না। অন্য কোন দলে এমন দৃষ্টান্ত আছে! প্রাকৃতিক দুর্যোগেও মানুষের সাহায্যে গণ-অর্থসংগ্রহে সাড়া পায় আমাদের পার্টি।

এর চাইতে এমন ভাবা এবং ভাবানো হয়তো অনেক সহজ যে দক্ষিণপন্থী রাজনৈতিক দলগুলি যেভাবে টাকা সংগ্রহ করে উৎস গোপন করে থাকে, সেভাবেই উৎস গোপন করে আয় করছে সি পি আই (এম)।

কিন্তু আয়কর আইন এবং জনপ্রতিনিধিত্ব আইন অনুযায়ী ২০হাজার টাকার বেশি অঙ্কের অর্থদাতাদের নাম জানাতে বাধ্য যে-কোনো রাজনৈতিক দল। সি পি আই (এম) এই অর্থদাতাদের নাম নিয়মিতভাবে নির্বাচন কমিশন এবং আয়কর দপ্তরকে জানিয়ে আসছে আইন মেনে। যদিও সি পি আই (এম)-র মোট আয়ের মাত্র ১শতাংশেরও মতো আসে এমন অর্থদাতাদের দান থেকে। মুখ্য আয় হয়ে থাকে, পার্টি সদস্যদের লেভি (৪০শতাংশের মতো) এবং গণসংগ্রহ থেকে। কমিউনিস্ট পার্টির ভাণ্ডার প্রকৃত অর্থেই রয়েছে গরিবের ঘরে ঘরে। অসংখ্য গরিব মানুষ পার্টির সংগ্রামকে নিজেদের সংগ্রাম মনে করে দশটাকা বিশ টাকা করে দান করে থাকেন। বহু গরিব ও মধ্যবিত্ত মানুষের সাহায্য এবং কমিউনিস্ট মতাদর্শের প্রতি দৃঢ় সমর্থন থেকে কিছু সচ্ছল মানুষের নিজেদের সর্বস্ব দেওয়ার অজস্র নজির এরাজ্যে রয়েছে। ২০১৫ সালের ৬ই আগস্টের সংবাদপত্রে প্রকাশিত ছবিতে দেখা যায়, মুজফ্‌ফর আহ্‌মদের জন্মদিন উপলক্ষ সভার মঞ্চে এক সদ্য পুত্রহারা বৃদ্ধা জননী ২লক্ষ টাকা তুলে দিচ্ছেন সূর্য মিশ্র এবং বিমান বসুর হাতে।

জেলায় জেলায় সি পি আই (এম)-র অজস্র পার্টি দপ্তর এবং স্থাবর সম্পত্তি রয়েছে যা গড়ে উঠেছে পার্টি নিবেদিত প্রাণ কোনো ব্যক্তির দান করা জমি অথবা বাড়িতে। এই সমস্ত আয় এবং সম্পদ এসেছে অন্য দলের মতোই ‘অজানা উৎস’ থেকে বলে দেওয়ার সঙ্গে বাস্তবের কোনও সম্পর্ক নেই। কমরেড সরোজ মুখোপাধ্যায়ের কথায় ‘এলাকার প্রতিটি মানুষের কাছে পার্টির অর্থের প্রয়োজনের কথা বোঝাতে হবে। কি কি কাজে টাকা খরচ হয় তা সাধারণভাবে তাঁদের বোঝাতে হবে’। শ্রমিকশ্রেণির পার্টি গরিবের পার্টি হলেও এ পার্টির ভাণ্ডার অফুরন্ত। এজন্য শত আক্রমণেও এই পার্টি ভেঙে পড়ে না। কারণ শ্রমজীবী জনগণের সংখ্যা শোষক শ্রেণির জনসংখ্যার চেয়ে অনেক বেশি। প্রত্যেকে দশ টাকা বা পাঁচ টাকা করে দিলেও লক্ষ লক্ষ মানুষের কাছ থেকে কমিউনিস্ট পার্টির অর্থসংগ্রহ সম্ভব, কমরেড সরোজ মুখোপাধ্যায়ের শেখানো পথ এলাকায় এলাকায় আমরা অনুসরণ করে চলেছি।

খনি অথবা স্পেকট্রামের বরাত দিতে মন্ত্রীদের যখন ঘুষ নিতে দেখা গেছে, আম্বানি আদানিদের টাকায় যখন রাজনৈতিক দলের রমরমা চলছে, যখন মানুষ চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছেন চিট ফান্ডের টাকা লুটে একটি রাজনৈতিক দল দাপটের সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গে সরকার চালাচ্ছে, চোখের সামনে টেলিভিশনের পর্দায় ঘুষ নিতে দেখা যাচ্ছে শাসকদলের মন্ত্রী সাংসদদের, তখন রাজনীতি সম্পর্কে সাধারণ মানুষের কোন্‌ মনোভাব তৈরি হচ্ছে তা বুঝতে অসুবিধা হয় না।সর্বশেষ সাধারণ বাজেটে মোদী সরকার রাজনৈতিক দলকে ২হাজার টাকার বেশি নগদে অনুদান দেওয়া যাবে না বলে যে ঘোষণা করেছে সেটা নেহাতই মানুষের চোখে ধুলো দেওয়া ছাড়া কিছু নয়। নয়া উদারনীতির যুগে নির্বাচনে সীমাহীন অর্থশক্তি ও কালো টাকার ব্যবহার, মাফিয়াদের পেশিশক্তি, রাজনীতির অপরাধীকরণ জনগণের অধিকারকে প্রহসনে পরিণত করছে এবং সংসদীয় গণতন্ত্রের সামনে গুরুতর বিপদ তৈরি করছে। তা ঠেকানোর কোনো প্রচেষ্টা সরকারের তরফে দেখা যাচ্ছে না। একমাত্র বামপন্থীরাই এর বিরুদ্ধে রাজনৈতিক চেতনা বৃদ্ধির কাজ ছাড়াও আমূল নির্বাচনী সংস্কারের দাবি করেছে।

সি পি আই (এম) চায় রাজনৈতিক দলকে কর্পোরেটের দান সবদিক থেকে নিষিদ্ধ করা হোক। তার পরিবর্তে নির্বাচন কমিশনের নিয়ন্ত্রণে রাষ্ট্রীয় তহবিল তৈরি করে নির্বাচনে ব্যবহার করা হোক। যাতে টাকা নিয়ে কোনও রাজনৈতিক দলকে কর্পোরেটের প্রতি দায়বদ্ধ থাকতে না হয়।এই জটিল পরিস্থিতিতে দুর্নীতির মূলে থাকা রাজনৈতিক অর্থনীতিকে চিনিয়ে দেওয়াটাই জনগণের কাছে প্রয়োজনীয় ছিলো। দক্ষিণপন্থী রাজনীতি আর বামপন্থী রাজনীতির ফারাকটা আরও স্পষ্টভাবে চেনানোর দরকার ছিলো। কিন্তু সংবাদমাধ্যম করছে তার উলটোটাই। তারা সাধারণভাবে সমগ্র রাজনীতিকেই চুরির দায়ে কাঠগড়ায় তোলার চেষ্টা করছে, সাদা-কালো মিশিয়ে দিচ্ছে, ভিন্নধরনের প্রক্রিয়ায় আয় সংগ্রহ করা রাজনৈতিক দল সি পি আই (এম)-কে এক পঙ্‌ক্তিতে বসাচ্ছে এবং জনগণের মধ্যে ‘সবাই সমান’ বলে বিরাজনীতির স্রোত তৈরির চেষ্টা করছে

এমন অপচেষ্টা রাজনীতিতে দুর্নীতি বন্ধ করতে সাহায্য করবে না, বরং ‘সবাই সমান’ রটনার আড়ালে প্রকৃত দুর্নীতিগ্রস্তদের পার পাওয়ার সুযোগ তৈরি করে দেবে।

এই লেখা শেষ করবো, গান্ধীজীকে লেখা পি সি যোশীর একটি চিঠির অংশ উল্লেখ করে। একদল কমিউনিস্ট-বিদ্বেষীর কাছ থেকে ক্রমাগত কুৎসা শুনে ১৯৪৪ সালে গান্ধীজী কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক পি সি যোশীকে চিঠিতে লিখেছিলেন, ‘আপনাদের পার্টির আয় ব্যয়ের হিসাব কি আমি দেখতে পারি?’ সশ্রদ্ধ নম্রতা নিয়ে যোশী তাঁকে ইতিবাচক জবাবই দিয়েছিলেন। কিন্তু সেই সঙ্গে আরেকটি অনুরোধ করেছিলেন। যোশী লিখেছিলেন, ‘আমি আপনাকে আরেকটি পালটা অনুরোধ করার লোভ সামলাতে পারছি না। আমি যখন গ্রামে গ্রামে ঘুরে বেড়াবো আপনি আপনার একজন প্রতিনিধি পাঠাবেন। তিনি দেখতে পাবেন, আমাদের পার্টির কথা শুনতে কীভাবে দশ হাজার থেকে পঞ্চাশ হাজার মানুষ বের হয়ে আসছেন। তাঁদের উৎসাহ উদ্দীপনা আপনাকে ১৯২০ সালের দিনগুলির কথা মনে পড়িয়ে দেবে। সবশেষে আমি তাঁদের কাছে পার্টি তহবিলে দান করার জন্য অনুরোধ করবো। হাজার হাজার মানুষ কীভাবে দান করছেন তা দেখে আপনার প্রতিনিধির চোখে জল চলে আসবে।’

আজকে যারা সি পি আই (এম)-র আয়ের ‘অজানা উৎস’ সন্ধান করতে চাইছেন, তাঁদেরকেও যোশীর মতোই পালটা অনুরোধ করতে ইচ্ছা করে। গর্ব করে বলতে পারি, দেখতে পাবেন সেই ঐতিহ্য সি পি আই (এম) রক্ষা করেই চলেছে। তবে মোদী বা মমতার দেওয়া চশমাটা খুলে আসবেন। খোলা চোখে দেখলে আপনার কাছে ‘অজানা’ তথ্য জানা হয়ে যাবে।

আমরা বিশ্বাস করি, শ্রেণিশত্রুর আক্রমণের ফলে কমিউনিস্ট পার্টি কোনদিন দুর্বল হয় না। আরো শক্তিশালী হয়। আরো পরিণত, সুদৃঢ় পার্টিতে পরিণত হয়। সেই আক্রমণের মধ্য দিয়েই আমরা পথ হাঁটছি।


   সৌজন্যেঃ গণশক্তি

Fight For Rice, Meat; And Mamata

November 6, 2015

ভাতের লড়াই, মাংসের কাজিয়া এবং মমতা

চন্দন দাস

মিড ডে মিলে মাংস দেওয়া হয় না। ডিম দেওয়া হয়। সাধারণত একদিন।ডিম কার? কে দিয়েছে? এ’ নিয়ে কাজিয়া বাধানোর অবকাশ নেই। কারণ পাখির সঙ্গে দেশপ্রেমের সরাসরি সংযোগ সংক্রান্ত কোনও নিদান নেই।

আগামী দিনে মিড ডে মিলে আদৌ ভাত দেওয়া যাবে কিনা, শিশুরা আর পড়তে আসতে পারবে কিনা নিদারুণ আর্থিক সঙ্কট ডিঙিয়ে — এই প্রশ্ন ক্রমাগত সক্রিয় হয়ে উঠছে দেশে এবং রাজ্যে। পশ্চিমবঙ্গে অনেক শিশু শিক্ষাকেন্দ্র, মাধ্যমিক শিক্ষাকেন্দ্রের ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার সামনে। তবু ভাত নিয়ে, চাল নিয়ে, ‘ভাতের কারখানা’ নিয়ে মাথাব্যথা বিশেষ কারও নেই। ভাতের সঙ্গে কী দেশপ্রেম, নাগরিকত্বের কোনও সম্পর্ক নেই?

থাকার কথা। কে কত বড় দেশপ্রেমিক ঠিক করা উচিত, কে দেশের গরিবের জন্য কত সুযোগ সৃষ্টি করতে পারছে তার উপর। কিন্তু তা হয়নি গত ৬৮ বছরে। দেশপ্রেমের ঠিকাদাররা এখন মাংসের মানদণ্ডে দেশপ্রেমের সার্টিফিকেট দিচ্ছেন। আর দেশপ্রেমের দিনমজুররা ভাতের লড়াইটা পৌঁছে দিচ্ছেন, দেওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছেন আজও। তা সে বর্ধমানে হোক, জঙ্গলমহলে হোক কিংবা চা বাগানে — ছবি একই। মাংসের কাজিয়া মূলত সেই ভাতের লড়াইকে ভুল দিকে ঘুরিয়ে দিতে।

দেশপ্রেমের দিনমজুর…

সাভারকারের সঙ্গে আমাদের লড়াই অনেকদিনের। ১৯২৫-এ আরএসএস-র জন্ম। ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির ১৯২০-তে। সাভারকার ভারতে ‘হিন্দুত্ব’ ভাবনার স্থপতি। তিনি সেলুলার জেলে ছিলেন। গণেশ ঘোষও। সাভারকার জেল থেকে ব্রিটিশ সরকারের কাছে মুচলেকা দিয়েছিলেন। গণেশ ঘোষরা অবশ্য সেখান থেকেই, বিস্তর কষ্ট সহ্য করে কমিউনিস্ট হওয়ার রাস্তা তৈরি করেন। সাভারকারের ভাবশিষ্যরা এখন ঠিক করছে কে দেশপ্রেমিক, আর কে পাকিস্তানি। আর গণেশ ঘোষের উত্তরসূরিরা এখনও পদাতিক, দেশপ্রেমের দিনমজুর। রাষ্ট্র তাঁদের দেখে না। মোটা মাইনে দেয় না। কিন্তু দেশবাসীর ভাত, মোটা কাপড়, কাজ, এতটুকু ছাদের লড়াইটা এখনও, বিস্তর রক্তপাতের পরেও লড়ে যাচ্ছেন তাঁরা।

এ’ লড়াই বাঁচার লড়াই। এ’ লড়াই জিততে হবে — স্লোগানটা বস্তাপচা হয়নি। এখনও লাল পতাকা মানে এটাই।

সাক্ষী, প্রমাণ জঙ্গলমহলে। ২৩টি ব্লক। ২০০১-র ২৩শে জানুয়ারি থেকে ২০১১-র ৩০ শে নভেম্বর — সময়কাল মাত্র ১০ বছর ১০ মাস। মানে ১৩০ মাস। আর এই সময়ে জঙ্গলমহলে ২৭৫ জন শহীদ হয়েছেন। নির্দিষ্ট একটি এলাকায়। তাঁদের মধ্যে পার্টির জেলা সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য আছেন। আবার নেহাতই স্কুলছাত্র — তিনিও আছেন। অসমসাহসী মহিলা আছেন। সংখ্যালঘু আছেন। আদিবাসী তো আছেনই। সবচেয়ে বড় কথা — খেতমজুর আছেন অনেকে। গরিব কৃষক, ছোট ব্যবসায়ীও আছেন শহীদ তালিকায়।

তারপরও টিকে আছে পার্টি। সিপিআই(এম)। ‘টিকে থাকা’ শব্দটির মধ্যে একটি নেতিবাচক মনোভাব অনুরণিত হয়? তাই না। আসলে এতজন সংগঠককে হারিয়ে হাঁটু মুড়ে, দুমরে মুচড়ে পড়ে যাওয়ার কথা। কোথাও কোথাও মিশে যাওয়ার কথা লালমাটির সঙ্গে। লোধাশুলির অফিস বিস্ফোরণে উড়ে যেতে পারে। সে তো ইঁট, কাঠ, কংক্রিটের। কিন্তু জান আছে দেশপ্রেমের ধারণায়। দেশপ্রেম মানে মানুষ। তাই সিপিআই(এম)-র নেতা, কর্মী, সমর্থকদের গুলি ঝাঁঝরা করা মাওবাদী নেত্রী যখন তৃণমূল কংগ্রেস নেতার সুখী ঘরণীর জীবন কাটাচ্ছেন, তখনও, সেই ‘বিপ্লবী’দের ভয় জাগানো আঁকা বাঁকা মেঠো পথে প্রচার চালাচ্ছে সিপিআই(এম)।

জঙ্গলমহলে রেগার জবকার্ড আছে ৬লক্ষ ২৭ হাজার ৪০১টি পরিবারের। আর কাজ পেয়েছেন চলতি বছরে ৩৬ হাজার ৮০টি পরিবার। শতাংশের হিসাব করলে রাষ্ট্র, সরকারের লজ্জায় মাথা হেঁট হওয়া উচিত। নতুন ধানের দাম বস্তা(৬০ কেজি) ৫৫০ টাকা। নির্ধারিত দামের প্রায় অর্ধেক। আর ৩০ কেজি বীজধানের দাম ১২০০টাকা। প্রতিটি ব্লকে কিষান বাজারের প্রতিশ্রুতি ছিল। সব ব্লকে হয়নি। যে কটি ব্লকে হয়েছে, সেগুলির ভবনগুলি শুধু দাঁড়িয়ে আছে। কৃষক সেখানে যান না। সেখানে কোনও কেনাবেচার দেখা নেই। গোয়ালতোড়ে ১০০০ একর জমিতে শিল্পের ঘোষণা এখনও প্রতিশ্রুতির পর্যায়ে রয়েছে। জঙ্গলমহলের জন্য পৃথক এমপ্লয়মেন্ট ব্যাঙ্কের ঘোষণা করেছিলেন মমতা ব্যানার্জি। সেটি হয়নি। ল্যাম্পস যা ছিল আদিবাসীদের উপার্জনের অন্যতম মাধ্যম, সেগুলি এখন ধুঁকছে। গ্রামগুলিতে কর্জ, দাদনে জর্জরিত কৃষক ক্রমাগত মহাজনের দেনা-চক্রে জড়িয়ে পড়ছেন। এই পরিস্থিতিতে রেগার মজুরি চাই, কাজ কোথায়, শিল্পের কী হলো, কেন ফসলের দাম পাচ্ছি না, এত যে প্রতিশ্রুতি দিলে তার কী হলো — নানা দাবি ধূমায়িত। আবার সভা, মিছিল দেখা যাচ্ছে জোরালো। প্রতিটি ব্লকে জমায়েত হয়েছে এই সময়ে। পুলিশের সাধ্য কী তাকে আটকায়? ডেপুটেশন দিচ্ছেন গ্রামবাসীরা — সামনে পার্টির নেতা, কর্মীরা। সেই চেনা ঝান্ডা। শহীদদের পতাকা।

শিলদায় দেখা হলেই অনন্ত বলতো —‘‘শেষ পর্যন্ত লড়ে যাবো।’’ কমরেড অনন্ত মুখার্জি নেই। তাতে কী? এই হেমন্তেও ‘অনন্তরা’ থেমে নেই।

দেশে এমন উদাহরণ আছে? না। বিদেশে? হাতে গোনা যাবে।

ভয়ও হেরে যায়, রাস্তা ছেড়ে দেয় নতজানু হয়ে — এমন পার্টি দেশে একটিই আছে। কবিতা মনে হচ্ছে? মনে হচ্ছে বান এসেছে হৃৎকমলের সুবর্ণরেখায়? মোটেও না।

আমি হাজারও ঋত্বিক দেখেছিলাম। হাজারও ঋত্বিক দেখছি। দেশপ্রেমের পদাতিক তো তাঁরাই। তাই ভরসা থাকুক তাঁদের উপর। নজর থাকুক সামনে। জোয়ার আসছে কাঁসাইয়ে।

অপেক্ষাকে যত্ন করুন।

মাংসের কাজিয়া, মুখ্যমন্ত্রীর নীরবতা..

চা বাগানে ঠিক মত খাওয়াই জুটছে না। অনাহারে মারা যাচ্ছেন বন্ধ বাগানের শ্রমিক পরিবার। জঙ্গলমহলে কাজ নেই। রেগার মজুরি জুটছে না রাজ্যের কোনও জেলায়। বর্ধমান, বাঁকুড়া, বীরভূমে ধান পুড়ে খাক। অন্যত্র ধানের দাম নেই। আলুর দাম নেই। বাকি সব ফসলের একই হাল। ঠিক এখন, এই পশ্চিমবঙ্গে মাংসের চরিত্র নির্ধারণের সময় নেই বেশিরভাগের। দেশের অবস্থাও প্রায় এক। এ’ কথা ঠিক যে, দেশের অন্য কোনও রাজ্যেই এমন রাজ্য সরকার নেই। উৎসবের বিলাসিতায়, ঘোষণা-প্রতিশ্রুতির ভেলায় ভেসে চলা এমন রাজ্য প্রশাসন দেশে বেনজির। প্রতিবাদী আক্রান্ত হবেই, নির্ঘাৎ হবে — এমন নিশ্চয়তা দেশের প্রায় কোনও রাজ্যে নেই। চুরির দায়ে অভিযুক্ত মন্ত্রীর ‘পাশে থাকার’ পোস্টার সাঁটিয়ে অবলীলায় স্কুল, কলেজের ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে ছুটে চলা অটো দেশের কোথাও মিলবে না। আর এখানেই রাজ্য সরকারের অগণতন্ত্র, ব্যর্থতার পরিপ্রেক্ষিতে রাজপথের লড়াইয়ে এত রক্তক্ষরণ, তীব্রতা সাম্প্রতিককালে দেশের আর কোথাও মেলেনি।

মোদীর হাতে দেশ বিপন্ন। মমতা ব্যানার্জির সরকারই বেসামাল।

কতটা বেসামাল তৃণমূল কংগ্রেসের সরকার মুখ্যমন্ত্রী নিজে বুঝিয়ে দিয়েছেন উত্তরবঙ্গ সফরে। শিল্পপতিদের হাত জড়ো করে অনুনয়, বিনয় করেছেন বিনিয়োগের জন্য। অথচ ২০০৬-০৭-এ কী নিদারুণ ‘বীরত্ব’ আমরা দেখেছিলাম তাঁর মধ্যে। সিঙ্গুর সাক্ষী। কাটোয়া সাক্ষী। ভাঙড় সাক্ষী। সাক্ষী আরও অনেক জায়গা, যেখানে বামফ্রন্টের সরকার শিল্পের উদ্যোগ নিয়েছিল। তখন, নন্দীগ্রামের এক সভায় তৃণমূল কংগ্রেসের নেত্রী বলেছিলেন,‘‘ভাতের কারখানা ধ্বংস করে মোটর গাড়ির কারখানা/ সে হবে না, সে হবে না।’’ ‘কৃষক-দরদী’ তৃণমূল কংগ্রেসের নেতা, কর্মীরা সেই ছড়াকে নিজেদের উত্থানের রিং টোন করে ফেলেছিলেন।

এখন রাজ্যে বিনিয়োগের দেখা নেই। আর ‘ভাতের কারখানা’, অর্থাৎ খেতখামারের অবস্থা গত আটত্রিশ বছরের সবচেয়ে দুরবস্থার মুখোমুখি। একশোর বেশি কৃষক আত্মঘাতী হয়েছেন। ন্যূনতম সহায়ক মূল্য ১৪১০ টাকা কুইন্টাল প্রতি হলেও, রাজ্যের কোথাও কুইন্টাল প্রতি ৯০০-৯৫০ টাকা ধানের দাম কৃষকরা পাচ্ছেন না। আসলে ভাতের কারখানা আর মোটর গাড়ির কারখানার একটি গভীর যোগাযোগ ছিল, যা মমতা ব্যানার্জি কিছুতেই রাজ্যের মানুষ বুঝে ফেলুন, তা চাননি। তাই কখনও মাওবাদী, কখনও আরএসএস, কখনও জামাতের সঙ্গে মিলে রাজ্য জুড়ে নৈরাজ্য তৈরি করেছিলেন।

বামফ্রন্ট সংবেদনশীল ছিল। অনেকে তাকে দুর্বলতা ভেবেছিল। আর সেই নৈরাজ্যের ফল এখন মিলছে। শিল্প গত। ভাতের কারখানাও পতিত হতে বসেছে। এমন সময়ে মাংসের কাজিয়া নিয়ে মমতা ব্যানার্জি কী করে কঠোর সমালোচনা করেন? দেশের নানা পর্যায়ের মানুষ প্রতিবাদ করছেন। বামপন্থীরা তো হিন্দুত্ববাদীদের পয়লা নম্বর দুশমন। তাঁরা তো প্রতিবাদে সোচ্চার হবেনই। কিন্তু মমতা ব্যানার্জি বিলকুল চুপ। এই নীরবতা সন্দেহজনক। কিন্তু একেবারে বোঝা যাচ্ছে না নীরবতার কারণ, তা নয়। ‘মাংসের কারবারিরা’ই তাঁকে আবার রক্ষা করতে পারে, সেই অঙ্ক করে ফেলেছেন তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী। তাঁর অনেক দিনের পুরোন বন্ধুরা আছেন এই মাংসের পরিচয়পত্র তৈরির কাজে।

বাঁটোয়ারাপন্থীরা বাড়ছে…

মাংস কার? গোরুর না মোষের? নাকি পাঁঠার? নাকি মুরগি, হাঁসের মাংস খাওয়া উচিত? বিতর্কের বল গড়াতে গড়াতে শেষ পর্যন্ত ‘দেশপ্রেমে’ পৌঁছে গেছে। কে পাকিস্তানি, কে ভারতীয় — ঠিক করছে মমতা ব্যানার্জির ‘দেশপ্রেমিকরা’। অর্থাৎ আরএসএস, সঙ্ঘ পরিবার। ২০০৩-র ১৫ই সেপ্টেম্বর দিল্লিতে আরএসএস-র সভায় হাজির হয়ে আজকের বাংলার মুখ্যমন্ত্রী বলেছিলেন,‘‘আপনারা সত্যিকারের দেশপ্রেমিক। আমরা জানি আপনারা দেশকে ভালোবাসেন।’’ সেই আরএসএস ‘দেশপ্রেমের’ শংসাপত্র দিচ্ছে। কার কার পাকিস্তানে যাওয়া উচিত, তাও ঠিক করে দিচ্ছে। এদের কাছে মমতা ব্যানার্জি কমিউনিস্টদের সরানোর জন্য সহায়তা চেয়েছিলেন। বলেছিলেন,‘‘যদি আপনারা(আরএসএস) ১শতাংশও সহায়তা করেন আমরা কমিউনিস্টদের সরাতে পারবো।’’ আরএসএস সেদিন তাঁকে ‘সাক্ষাৎ দূর্গা’ বলে অভিহিত করেছিল।

সেই আরএসএস-র ‘মাংস বিতর্ক’ এবং দেশপ্রেমের অপপ্রচার মমতা ব্যানার্জিকে আগামী বিধানসভা নির্বাচনে সহায়তা করবে, এমনটাই তৃণমূল কংগ্রেসের অভিজ্ঞ নেতারাও মনে করছেন। রাজ্যে আরএসএস বেড়েছে গত চারবছরে। গত চার বছরে তাঁদের শাখার সংখ্যা ৫৮০ থেকে হয়েছে ১৪৯০। বৃদ্ধি ১৫৭ শতাংশ। স্বাধীনতার পরে পশ্চিমবঙ্গে আরএসএস-র এমন বিকাশ কখনও হয়নি। রাজ্যে আরএসএস ‘অনুপ্রবেশ’ সমস্যাকেই প্রধান বিপদ বলে প্রচার শুরু করেছে। আর খোদ মমতা ব্যানার্জিই সংসদে ‘অনুপ্রবেশ’ ইস্যুতে সঙ্ঘ পরিবারের বক্তব্য তৃণমূলের সাংসদ হিসাবে তুলে ধরেছিলেন।

দিনটি ছিল ২০০৫-র ৪ঠা আগস্ট। লোকসভায় অধ্যক্ষের মুখের উপরে কাগজের তাড়া ছুঁড়ে দিয়ে অভব্যতার এক নজির সৃষ্টি করেছিলেন আজকের মুখ্যমন্ত্রী। পুরো সংসদ বিস্মিত হয়েছিল তাঁর এই কাণ্ডে। কেন সেদিন তিনি এমন করেছিলেন? কারণ, সেদিন তিনি সংসদে ‘অনুপ্রবেশ সমস্যা’ নিয়ে আলোচনা করতে চেয়েছিলেন। বামফ্রন্ট সরকার কিভাবে অনুপ্রবেশে মদত দিচ্ছে, তার গল্প শোনাতে চেয়েছিলেন। অনুমতি মেলেনি। তাই ওই অভব্যতা। অর্থাৎ, রাজ্যে যখন শক্তিশালী বামপন্থী আন্দোলনের অবস্থানের কারণে সাম্প্রদায়িক শক্তি পা রাখার সামান্য জায়গা পাচ্ছে না, তখন ‘পশ্চিমবঙ্গের অনুপ্রবেশ’ নিয়ে সংসদে বলে সঙ্ঘ পরিবারের কাছে বার্তা দিয়েছিলেন মমতা ব্যানার্জি — ‘আমি তোমাদেরই লোক’।

গত চারবছরে রাজ্যে মৌলবাদীরাও বেড়েছে আরএসএস-র মত। পশ্চিমবঙ্গে বামফ্রন্ট সরকারের সময়কালে এই মৌলবাদীদের সমর্থকরা কখনও মাথা তুলতে পারেনি। মমতা ব্যানার্জিকে মুখ্যমন্ত্রী করার জন্য এই প্রবল স্বাধীন বাংলাদেশ বিরোধী, ধর্মান্ধ, উগ্রপন্থায় বিশ্বাসী অংশের একটি সহযোগিতা ছিল। সম্প্রতি সারদার টাকা সেই উগ্রপন্থীদের হাতে পৌঁছোনর খবর প্রকাশিত হয়েছে। তাতে আবার মুক্তিযুদ্ধের সময়, ১৯৭১-এ বাংলাদেশ ছেড়ে চলে আসা হাসান আহমেদ ইমরানের নাম জড়িয়েছে। তিনি রাজ্যে কট্টর মৌলবাদী সিমি-র প্রতিষ্ঠাতাদের একজন। ২০০৭-’০৮ থেকে তৃণমূল কংগ্রেসে আশ্রয় নেন। তসলিমা নাসরিনের ভিসার বিষয় নিয়ে বামফ্রন্ট সরকারের সময়কালে রাজ্যে এক উত্তেজনা, ধর্মীয় উন্মাদনা তৈরি করেছিলেন ইদ্রিশ আলি। তাকেও মমতা ব্যানার্জি সাংসদ করেছেন। ফলে গত সাড়ে তিন বছরে রাজ্যে কট্টর মৌলবাদী একাংশ সরকার এবং শাসক দলের উপর প্রভাব বিস্তার করেছে। যা আসলে পশ্চিমবঙ্গের ঐতিহ্যের পক্ষে ঘোর লজ্জার। তবু তাই হয়েছে।

দুই সাম্প্রদায়িক শক্তিই এই সময়ে পশ্চিমবঙ্গে বেড়েছে। বেড়েছে সরকারের ব্যর্থতা, আর্থিক মন্দাকে ভিত্তি করে। এমন পরিস্থিতিতে সামনে বিধানসভা নির্বাচন। কাজের লক্ষ্যে পরিচালিত আন্দোলন অনুঘটক হতে চলেছে সেখানে। ভাতের দাবিতে গর্জে ওঠা লড়াই হয়ে উঠতে চলেছে নিয়ন্ত্রক। আর ঠিক এখনই, মাংসের কাজিয়া, দেশপ্রেমের প্রচার জরুরি মমতা ব্যানার্জিরও। বিজেপি, আরএসএস সেই কাজই করছে।

তাই নীরবতা মুখ্যমন্ত্রীর। কোনও সন্দেহ নেই।

Religious Fundamentalism & Fight Of The Left

October 30, 2015

ধর্মীয় মৌলবাদ ও বামপন্থীদের লড়াই

কৃষ্ণেন্দু রায়চৌধুরি

মরশুম উৎসবের, কিন্তু বেনজির ন্যক্কারজনক আক্রমণ তাল কেটেছে উৎসবমুখী মানুষের মেজাজে। সাম্প্রদায়িক শক্তির মাত্রাতিরিক্ত তৎপরতা এবং একই সঙ্গে ভারতীয় জনতা পার্টির নেতৃত্বাধীন দেশের সরকার। রাষ্ট্রের প্ররোচনা, উদাসীনতায় যে ন্যক্কারজনক ঘটনাগুলি দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ঘটে চলেছে অবিরত, তাতে ধ্বংস হচ্ছে দেশের ধর্মনিরপেক্ষ কাঠামো। গোবিন্দ পানসারে, নরেন্দ্র দাভোলকর, এম এম কালুবর্গীকে হত্যা, দাদরিতে প্ররোচনা ছড়িয়ে নৃশংসভাবে খুন, এমনকি শিল্প সংস্কৃতি জগৎও এই সাম্প্রদায়িক মেরুকরণধর্মী আক্রমণের হাত থেকে রেহাই পাচ্ছে না। পাকিস্তানের প্রাক্তন বিদেশ সচিবের বই প্রকাশ অনুষ্ঠান, জম্মু-কাশ্মীরের বিধায়কের প্রেস কনফারেন্স কিংবা ভারত-পাকিস্তান ক্রিকেট সিরিজ উপলক্ষে দু’দেশের বোর্ডের সভা আক্রান্ত ধর্মীয় মৌলবাদীদের দ্বারা।

দেশের গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা ও শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষার স্বার্থে সব ধরনের মৌলবাদী কার্যকলাপ বন্ধ করতে ও দে‍‌শের মানুষের ঐক্য, সংহতি ও সম্প্রীতির মেলবন্ধনকে দৃঢ় করার জন্য সমাজের সব অংশের মানুষের ঐক্যবদ্ধ প্রয়াস নেওয়া বর্তমান সময়ে সবচেয়ে জরুরি হয়ে পড়েছে। দেশের অগণিত মানুষ, যারা শান্তি চান, ধর্মনিরপেক্ষতার ঐতিহ্যকে অটুট রাখতে চান — মানুষের সেই ঐক্যবদ্ধ শক্তির প্রতিবাদে প্রতিরোধে গর্জে ওঠার সময় এখন। রাজ্যের বিশিষ্ট কবি, সাহিত্যিক, শিল্পীরা রাষ্ট্রপতিকে চিঠি পাঠিয়ে বলেছেন, ‘সাম্প্রতিককালে আমাদের দেশে হত্যা ও অসহিষ্ণুতার যে আবহ তৈরি হয়ে উঠেছে, তা নিয়ে আমরা পশ্চিমবঙ্গের শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষেরা সন্ত্রস্ত এবং অসহায় বোধ করছি। ক্রমাগত অবাধে আঘাত হানা হচ্ছে আমাদের মতপ্রকাশের স্বাধীনতার উপর। দেশের বিশিষ্ট নাগরিক, নিরপরাধ সাধারণ নাগরিকের হত্যায় শুভবুদ্ধিসম্পন্ন নাগরিক সমাজ স্তব্ধবাক। সরকারি নিষ্ক্রিয়তা ক্ষমার অযোগ্য

প্রশাসনিক অকর্মণ্যতা নাগরিকের মানবিক অধিকার খণ্ডিত করছে। স্বাধীন চিন্তার শ্বাসরোধের এই সুপরিকল্পিত ষড়যন্ত্রে ভারতীয় গণতন্ত্র বিপন্ন হয়ে পড়ছে। দেশের ‘লৌহপুরুষ’ প্রধানমন্ত্রীর মুখে কোন কথা নেই। দাদরি হত্যাকাণ্ড, যুক্তিবাদী লেখকদের উপর আক্রমণ, দেশের নানা প্রান্তে খোলাখুলি সাম্প্রদায়িক প্ররোচনার বিরুদ্ধে প্রতিনিয়ত প্রতিবাদ জোরালো হচ্ছে। দেশের বিশিষ্ট লেখক, বুদ্ধিজীবীরা সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার পুরস্কার ঘৃণাভরে ফিরিয়ে দিচ্ছেন। প্রধানমন্ত্রী দোষ চাপিয়ে দিচ্ছেন বিরোধীদের উপর– এটা আমাদের সর্বভারতীয় রাজনৈতিক সংস্কৃতির এক প্রহেলিকাদগ্ধ দিক ছাড়া আর কিছু নয়। আর এটাই এখনকার ভারতবর্ষের সবচেয়ে প্রকটিত সমাজনৈতিক-রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক দৈত্যদর্পী সমস্যা : ধর্মনিরপেক্ষতার সংকট– মানবিক ধর্মসত্তার বিপর্যয়। Ralph Fox যাকে বলেছেন: ‘Anarchy of capitalism in the human spirit’ — তৃণমূলে বুর্জোয়া সংস্কৃতির অরাজকতা কিংবা ‘Cultural terrorism of the ruling class’।

আমরা অধিকাংশই কম-বেশি Sick Society-র Sick product হয়ে পড়েছি। এর ফলে ভারতবর্ষের সমাজ-সভ্যতার অনুপম মুখশ্রী সাম্প্রদায়িক সমস্যার বিষগর্তে পাক খেতে খেতে রক্তাক্ত-ক্লিন্ন-ক্লেদাক্ত হয়ে যাচ্ছে। সাম্রাজ্যবাদের তীব্র কশাঘাতে রাষ্ট্র ও শাসকশ্রেণি Humanity বা মানবিকতা ভুলে সাম্রাজ্যবাদের ক্রীড়নকে পরিণত হয়েছেপ্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তা ও প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ মদতে ধর্মীয় মৌলবাদ ও গৈরিক ফ্যাসিবাদ উৎসাহিত হচ্ছে। Marx-Engels এর মতে, ‘…In reality and for the practical materialist, i.e, the communist, it is a question of revolutionizing the existing world, of practically attacking and changing existing things’.

(২)

সাম্প্রতিককালে আমাদের দেশের বর্তমান সামাজিক-অর্থনৈতিক কাঠামো থেকে উদ্ভূত অনেকগুলি চরম প্রতিক্রিয়াশীল বৈশিষ্ট্য বিশেষ জোরদার হয়ে উঠেছে। যেমন সাম্প্রদায়িকতা ও উগ্র জাতীয়তাবাদ, ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের প্রতি সযত্ন লালিত ঘৃণা, উচ্চবর্ণভিত্তিক পুরুষ আধিপত্যের মানসিকতা, সমাজের সাধারণভাবে দুর্বলতর অংশগুলির উপর এবং বিশেষভাবে গণতান্ত্রিক অধিকারের উপর ক্রমবর্ধমান আক্রমণ, যুদ্ধোন্মাদনা ও রাজনীতির সামরিকীকরণ, দুর্নীতি ও রাজনীতির দুর্বৃত্তায়ন, মুখে স্বাদেশিকতার বুলি আউড়ে কার্যত সাম্রাজ্যবাদ নিয়ন্ত্রিত অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের বাস্তবায়ন, ইত্যাদি।

এই প্রায় সবগুলি প্রতিক্রিয়াশীল বৈশিষ্ট্যের সমাহার হিসেবে যে পতাকাটি আজ আমাদের দেশে আন্দোলিত হচ্ছে তার রঙ ‘গৈরিক’। হিন্দুত্বের জয়ধ্বনি তুলে এই পতাকাটির দণ্ড ধারণ করে আছে রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সংঘ (RSS) ও তার শাখা সংগঠনগুলি। হিন্দুত্বের এই যন্ত্রটি ‘৪৭-পরবর্তী’ ভারতে আগে কোনদিন আজকের মতো প্রাসঙ্গিক ও ভয়াবহ তাৎপর্যসম্পন্ন হয়ে উঠতে পারেনি।

১৯৯২-এর ৬ই ডিসেম্বর বাবরি মসজিদ ধ্বংসের ঘটনা হিন্দুত্বের এই আগ্রাসী অভিযানের প্রথম পর্বের বিজয় সূচিত করেছিল। কেননা, ওই ধ্বংসকাণ্ডটি কতিপয় দুবৃর্ত্তের দুষ্কর্মমাত্র ছিল না, বরং তার পেছনে ছিল সেই হিন্দুত্বের রাজনীতির দীর্ঘ ইতিহাস, যার প্রতিটি অধ্যায়ে খোদিত ছিল আগ্রাসী সংকীর্ণতা ও সাম্প্রদায়িকতা, বহুত্ববাদী ভারতীয় সভ্যতা ও সংস্কৃতির অস্বীকৃতি, অন্য সম্প্রদায়ের, এমনকি ব্যাপক হিন্দু সম্প্রদায়ের ‘দলিত’ অংশের প্রতি ঘৃণা ও হিংসা এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের ঐতিহ্য ও আচার আচরণের প্রতি তীব্র অনীহা।

রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সংঘ ও তার প্রবক্তাদের প্রকৃতপক্ষে দুটি রূপ — একটি প্রকৃত মুখ, আরেকটি মুখোশ। তারা কথা বলে সম্পূর্ণ দুই পৃথক ভাষায়, কাজ করে দুই বিপরীত পদ্ধতিতে। সেই ভাষা গণতন্ত্রের, কর্মপদ্ধতি স্বৈরতন্ত্রের। একদিকে ঐকমত্যের, অন্যদিকে বলপ্রয়োগের। হিন্দুত্বের রাজনীতির ধারক ও বাহক এই সংঘ পরিবারের মূল কেন্দ্রে রয়েছে RSS ও তার রাজনৈতিক সংগঠন ভারতীয় জনতা পার্টি (BJP)। অন্যদিকে RSS নিজে এবং বিশ্ব হিন্দু পরিষদ, বজরং দল প্রভৃতি জানা-অজানা অসংখ্য অঙ্গপ্রত্যঙ্গ এই কাঠামোটিকেই যেনতেন প্রকারেণ ধ্বংস করতে চায়।

সংঘ পরিবারের এই একইসঙ্গে পরিপূরক ও পরস্পরবিরোধী বিভিন্ন অঙ্গের জটিল টানাপোড়েনের স্বাভাবিক পরিণতি ছিল বাবরি মসজিদ ধ্বংসের ঘটনা। একইসঙ্গে তা উদ্‌ঘাটিত করে দিয়েছিল বি জে পি-র সযত্ন-সৃষ্ট তথাকথিত গণতান্ত্রিক বাতাবরণের অন্তঃসারশূন্যতার এবং তার অন্তরালবর্তী চরম হিংস্রতার প্রকৃত স্বরূপ। হিন্দুত্বের এই হিংস্র অভিযানের অন্তর্নিহিত দর্শনের প্রণেতা ও ভাষ্যকার স্বাভাবিকভাবেই তার মস্তিষ্ক অর্থাৎ RSS। অবশ্যই তাদের দাবি- আর এস এস রাজনৈতিক নয়, বরং একটি সাংস্কৃতিক সংগঠন। হিন্দুদের সংস্কৃতির সংস্কারের মাধ্যমে নিজের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সম্পর্কে সচেতন হিন্দু-আত্মপরিচয়ের জন্ম দেওয়াই তাদের লক্ষ্য।

এই তথাকথিত সাংস্কৃতিক কর্মসূচি আসলে গভীরভাবে রাজনৈতিক। এই কর্মসূচির অন্তর্নিহিত আগ্রাসী ও প্রাতিষ্ঠানিকতামুখী হিন্দুত্বের রাজনীতির করাল ছায়া সমাজের প্রতিটি ক্ষেত্রে আজ প্রসারিত। সাঁড়াশির মতো তা আষ্টেপৃষ্টে বেঁধে ফেলেছে আমাদের সমাজ ও রাজনীতিকে। আমাদের বাস্তব জীবনকে, আমাদের অস্তিত্বকে, সংস্কৃতি, শিক্ষা, সংবাদমাধ্যম, আমলাতন্ত্র, পুলিশ, সামরিক বাহিনী প্রভৃতি রাষ্ট্রীয় ও রাষ্ট্র-বহির্ভূত সমাজের প্রতিটি স্তরে ঘটছে তার অনুপ্রবেশ। চলছে তার সার্বিক আধিপত্য বিস্তারের প্রচেষ্টা।

প্রথমে তেরোদিন, তারপর তেরো মাস, পাঁচ বছর হয়ে এবার একক ক্ষমতায় পরবর্তী পাঁচ বছর রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখলের সুযোগ তার এই করাল বন্ধনকে আরো বেশি আগ্রাসী ও ভয়াবহ করে তুলেছে। সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতিটি গণতান্ত্রিক ঐতিহ্যের ও মূল্যবোধে এবং সরকারি, বেসরকারি সংগঠনে তার প্রভাব ধরা পড়েছে। হিন্দুত্বের মন্ত্র আওড়ানো এই ধর্মীয় ফ্যাসিবাদের আগ্রাসী অভিযান অবাধে চলতে থাকলে তার সম্ভাব্য পরিণতি কী বীভৎস ও ভয়ঙ্কর হতে পারে সেকথা চিন্তা করে ন্যূনতম গণতান্ত্রিক চেতনাসম্পন্ন যে-কোনো মানুষই শিউরে উঠছেন। শহীদ বিরসার হাত ধরে যে শতাব্দীর সূচনা, যে শতক দেখেছে অগ্নিযুগের আত্মদান, ভারত-ছাড়ো আন্দোলন আর নৌ-বিদ্রোহ, সাক্ষী থেকেছে শোলাপুর-তেভাগা-তেলেঙ্গানা-সাঁওতাল এবং আরও কত মহান গণজাগরণের। তার অন্তিমে আজ ভারতভাগ্যবিধাতার আসনে অধিষ্ঠিত গেরুয়াধারী বকধার্মিকরা।

ভারতীয় রাষ্ট্রক্ষমতায় ফ্যাসিবাদ এখনো জাঁকিয়ে বসতে পারেনি — বি জে পি-কে এখন গৈরিক রঙ-এর পেছনে ফ্যাসিবাদ প্রতিষ্ঠার প্রস্তুতি চালাতে হচ্ছে। যে দেশে পুঁজিবাদ দূরের কথা, সামন্ততন্ত্রও ইউরোপীয় ধরনে ও মাত্রায় বিকশিত হয়নি, সেখানে ফ্যাসিবাদের শ্রেণী-ভিত অতী‍‌তের ইতালি বা জার্মানির মতো হতে পারে। বি জে পি কেন্দ্রীয় ক্ষমতার সুবাদে হাতে নিয়েছে মৌলিক কিছু কাজ। যেমন, ফ্যাসিস্ত দৃষ্টিকোণ থেকে রাষ্ট্রের ইতিহাস পালটে লেখা, সংবিধান সংশোধন, শিক্ষা-সংস্কৃতির গৈরিকীকরণ ও হিন্দু মৌলবাদের পৃষ্ঠপোষকতা। দেশে এখন একটা কথা প্রায়ই শুনতে পাওয়া যায়, কথাটা হলো ধর্মীয় ফ্যাসিবাদ। দেশের জাতীয় গণতান্ত্রিক মোর্চার যে সরকার, সেই সরকারের প্রধান শরিক হলো ভারতীয় জনতা পার্টি। বর্তমান যিনি দেশের প্রধানমন্ত্রী তিনি এই দলের প্রধান নেতা। প্রসঙ্গটা হলো বি জে পি ধর্মের নামে, গেরুয়া রঙের আড়ালে ফ্যাসিবাদ কায়েম করার চেষ্টা করছে। বি জে পি-র অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক অ্যাজেন্ডা ‘হিন্দুত্ববাদ’কে বাস্তবায়িত করা।

(৩)

নরেন্দ্র মোদীর শাসনের এক বছর পর এটা বুঝতে কষ্ট হবার কথা নয় যে ধর্মীয় মৌলবাদ, গৈরিক ফ্যাসিবাদ দি‍য়ে বলীয়ান হয়ে তাঁরা চান দেশের মানুষের উপর সীমাহীন শোষণ নামিয়ে এনে ধনীদের আরও ধনী করতে, পুঁ‍‌জির মালিকদের বাড়তি সুবিধা পাইয়ে দিতে, সর্বোপরি আমেরিকান সাম্রাজ্যবাদ নির্দেশিত নয়া উদারনীতির রথযাত্রার পথ মসৃণ করতে। সহজ করে বলা যায়– আমাদের দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠের মৌলবাদের মূল ধারা হলো ধর্ম নিয়ে ধুয়ো তুলে নিজেদের শাসন ক্ষমতার পথ সুগম করা ও তার মাধ্যমে এদেশকে আন্তর্জাতিক পুঁজির লুটের ক্ষেত্র করে তোলার পথ আরও প্রশস্ত করা। এর জন্য সংখ্যালঘু-জুজু তৈরি করে ক্ষমতা দখল এবং এদেশকে আন্তর্জাতিক পুঁজির মৃগয়াক্ষেত্র বানানো। এর জন্য প্রয়োজন ইতিহাস-বিকৃতি, প্রগতিশীল লেখক, দরিদ্র মানুষ, নিরপরাধ শিশু এমনকি মুসলিম বুদ্ধিজীবী বিধায়কদের আক্রমণ, হত্যা। এদের আসল শত্রু হলো- শ্রেণী রাজনীতি, বামপন্থা, মার্কসবাদ

নয়া উদারবাদের বিরুদ্ধে বামপন্থীদের নেতৃত্বে মেহনতি মানুষ বিক্ষোভরত। ধর্মের নামে তাদের ভাগ করে এই আন্দোলনকে দুর্বল করার চেষ্টা চলছে। বামপন্থীরা মেহনতি মানুষকে জোটবদ্ধ করে। বামপন্থা হলো ইতিহাসকে বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখার একটা জোরালো মতাদর্শ। সেই মতাদর্শ সমাজে প্রোথিত করতে পারলে সমাজে মৌলবাদীরা দুর্বল হয়ে পড়বে। তাই মেহনতি মানুষের সংগ্রাম বন্ধ করতে, বামপন্থী গণ-আন্দোলনকে স্তব্ধ করতে চারদিক থেকে আক্রমণ চলছে। ভারতের রাজনীতিতে ধর্মীয় মৌলবাদ হলো একটি রাজনৈতিক তাস। বি জে পি-র পক্ষে হিন্দু মৌলবাদী তাস ছাড়া অন্য কোন তাস খেলা সম্ভব নয়।

নীতিগতভাবে ধর্মনিরপেক্ষ হতে পারে একমাত্র শ্রমজীবী শ্রেণী, কেননা শ্রেণীর স্বার্থ রক্ষা করার উপায়ই হলো ধর্মনিরপেক্ষ হওয়া। শ্রমজীবী শ্রেণীর দল সেই অর্থে ধর্মনিরপেক্ষ। মৌলবাদ, গৈরিক ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে আন্দোলন সংহত করতে হলে বুর্জোয়া শ্রেণী ও তার দলের বিরুদ্ধে সংগ্রামে নামতে হবে এবং সেটা কেবলমাত্র শ্রমজীবী শ্রেণীর দলগুলির পক্ষেই সম্ভব। শ্রমজীবী মানুষের লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে সামনে উঠে আসবে যেসব গণতান্ত্রিক ও দেশপ্রেমিক শক্তি, তারা হাত মেলাবে বামপন্থীদের সঙ্গে। তাদের নিয়ে একেবারে নিম্নস্তর থেকে গড়ে উঠবে মৌলবাদ-ফ্যাসিবিরোধী মঞ্চ।

সাম্প্রদায়িকতা, উদারীকরণ, বেসরকারিকরণ-সহ বি জে পি সরকারের জনবিরোধী নীতিগুলির বিরুদ্ধে দ্বিধাহীন নিরবচ্ছিন্ন লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে বামপন্থীরা। জনগণের জীবন-জীবিকার সংগ্রাম, গণতন্ত্রের জন্য সংগ্রাম, সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী সংগ্রাম, দেশের মর্যাদা ও সার্বভৌমত্ব অক্ষুণ্ণ রাখার সংগ্রাম অব্যাহত গতিতে আরও প্রসারিত, আরও শক্তিশালী করে তোলাই বর্তমান সময়ে বামপন্থীদের মূল কর্তব্য। নরেন্দ্র মোদী সরকারের জনবিরোধী-দেশবিরোধী কাজের বিরোধিতাই শুধু নয়, সমগ্রভাবে শাসকশ্রেণির ও সাম্রাজ্যবাদী শক্তির প্রতিস্পর্ধী হোক বামপন্থা।

Anandabazar Discovers…

October 28, 2015

সরকার বাড়ির আবিষ্কার

ঠুলি সহযোগে উন্মীলিত চোখে বিশ্ব দর্শন করে সরকার বাড়ির কলমচিরা এই স্বতঃসিদ্ধ সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন যে, মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ বলে এতকাল যা কথিত ও চর্চিত হয়েছে তা এখন অতীত। বর্তমানে তার কোন অস্তিত্ব নেই। এমনকি সাম্রাজ্যবাদের ধারণাটিও নাকি এখন মুছে গেছে। সরকার বাড়ির বাজারি পাঠ্যসূচিতে সাম্রাজ্যবাদ বলে যে বিষয়কে পরিবেশনের চেষ্টা হচ্ছে তার সঙ্গে অর্থনৈতিক আধিপত্যেরও সংযোগ নেই। বস্তুত উদারীকরণ-বিশ্বায়নের যুগে পুঁজির যখন কোন দেশ নেই, সীমানা নেই, সারা বিশ্বটাই যখন তার কাছে অবারিত তখন আধিপত্য, সাম্রাজ্যবাদ বিষয়টাই অপ্রাসঙ্গিক।

এতদ্‌সত্ত্বেও সরকার বাড়ি অতীতের ‘সোভিয়েত সাম্রাজ্যবাদের’ মতো এখন নতুন এক সাম্রাজ্যবাদ আবিষ্কার করেছে। সেটা চীনের ভূ-রাজনৈতিক সাম্রাজ্যবাদ। গাঁয়ে মানে না আপনি মোড়লের মতো সরকার বাড়ির স্বঘোষিত জ্যাঠামশাইদের এই পাঠ্যসূচিই তাদের বাজারি পাঠশালায় নিত্যদিন আপ্তবাক্যের মতো গেলানো হচ্ছে। জ্যাঠামশাইরা এই ভেবে আত্মশ্লাঘা অনুভব করেন বাংলার মানুষের যাবতীয় চিন্তা-চেতনার ঠিকাদারি নিয়েছেন তাঁরা। তাঁরা যে পাঠ দান করবেন সেটাই এগিয়ে থাকার বীজমন্ত্র। সাম্রাজ্যবাদ সম্পর্কিত নতুন তত্ত্ব তারই নবতম সংযোজন।

কিন্তু সমস্যা হচ্ছে বামপন্থীদের নিয়ে। বামপন্থীরা সরকার বাড়ির উদ্ভট পাঠ্যসূচিকে পাত্তা দেয় না। বামপন্থীরা চলে তাদের নিজস্ব পথে, নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গিতে ও নিজস্ব বিশ্লেষণে। তাই সরকার বাড়ির ঠুলিপরা চোখে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ উধাও হয়ে গেলেও বামপন্থীদের খোলা চোখে ধরা পড়ে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের ভয়ংেকর উপস্থিতি এবং অতি সক্রিয়তা। এই ভাবনা-বিশ্লেষণই বামপন্থীদের সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী লড়াইয়ের ময়দানে অবিচল রেখেছে। তারজন্যই কলকাতায় সম্প্রতি সংগঠিত হয়েছে বিশাল সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী মিছিল। উপলক্ষ বঙ্গোপসাগরে মার্কিন নেতৃত্বে ত্রিদেশীয় নৌ-মহড়া। আমেরিকার নেতৃত্বে এশিয়া-প্রশান্তসাগরীয় তথা ভারত-প্রশান্তসাগরীয় অঞ্চলে নতুন সামরিক জোট গঠনের প্রক্রিয়ারই অঙ্গ এটা। তাই বামপন্থীরা রাস্তায়।

এ কারণেই বামপন্থীদের নিয়ে মহা সমস্যায় সরকার বাড়ি। বামপন্থীরা এতটাই বেয়াড়া যে সরকার বাড়ির তত্ত্বকে ফুৎকারে উড়িয়ে দিয়ে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে গর্জে উঠছে, মিছিল করছে। গাত্রদাহ হওয়াই স্বাভাবিক। তাই বামপন্থীদের যুক্তি-বিশ্লেষণের ধারে কাছে না গিয়ে মোটা দাগের কিছু শব্দ ব্যবহার করে বামপন্থীদের নিন্দা-মন্দ করা হচ্ছে। গায়ের ঝাল ঝাড়ার জন্য আশ্রয় নেওয়া হচ্ছে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপের। ক্ষুরধার যুক্তি আর বাস্তবতার তীক্ষ্ণ বিশ্লেষণে বাম-মতাদর্শ তথা মার্কসবাদ-সাম্যবাদকে ধরাশায়ী করা অসম্ভব বলেই তাদের এই বালখিল্য আচরণ। বামপন্থীরা নাকি বিদেশি তত্ত্ব নিয়ে দুনিয়া কাঁপায়, দেশের খবর রাখে না। মস্কোয় বৃষ্টি হলে ভারতের বামপন্থীরা মাথায় ছাতা ধরে। বাজারি কাগজের এমন বিনোদনী বালখিল্যপনা পথেঘাটে চা-দোকানে নিম্নমানের আড্ডার মশলা হতে পারে। উচ্চমানের বিতর্ক-বিশ্লেষণে ঠাঁই মেলে না।

ঠাণ্ডা যুদ্ধের সময় বাজারি চোখে সাম্রাজ্যবাদ ধরা পড়েছিল। তবে সেটা ‘সোভিয়েত সাম্রাজ্যবাদ’। সোভিয়েত বিপর্যয়ের পর সরকার বাড়ি আর সাম্রাজ্যবাদ দেখতে পায়নি। এই সময়কালে বিশ্বের সর্বত্র অন্তত একশটি যুদ্ধ সংঘাতে মার্কিন সামরিক হস্তক্ষেপ হলেও, ইরাকে, আফগানিস্তানে, লিবিয়ায় সামরিক অভিযান চললেও মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের অস্তিত্ব খুঁজে পায়নি সরকার বাড়ি। সারা বিশ্বে মার্কিন ভূখণ্ডের বাইরে প্রায় এক হাজার মার্কিন সামরিক ঘাঁটি কি কারণে সরকার বাড়ি জানতে চায় না। ভারত মহাসাগরে আমেরিকার এত উৎসাহের উৎস কোথায় প্রশ্ন করে না তারা। অথচ দেশের বাইরে চীনের একটাও সামরিক ঘাঁটি নেই। অন্য দেশে সামরিক হস্তক্ষেপের কোন নজির নেই। তথাপি বাজারি চো‍‌খে আবিষ্কৃত হয়েছে ‘চীন সাম্রাজ্যবাদ’। অতএব জ্যাঠামশাইদের মতে আমেরিকা নয়, যদি মিছিল করতে হয় তবে চীনের বিরুদ্ধেই করা উচিত।

Dadri Lynching: A Challenge To Cultural Diversity

October 18, 2015

দাদরি : বহুত্ববাদের সামনে চ্যালেঞ্জ

মইনুল হাসান

দাদরির ঘটনা দেশবাসীর জানা হয়ে গেছে। দাদরি পরবর্তী সময়টুকু আমাদের আলোচনার জন্য বরাদ্দ করেছি। তবে একবারও ভুলে যায়নি আখলাকের বাড়ির বারান্দায় যখন তার নিথর দেহটি পড়েছিল তখন তার কিশোরী কন্যা সাজিদা কি বলেছিল। ‘‘মাত্র কয়েকদিন আগে ঈদ হলো। বাড়িতে বিরিয়ানি হয়েছিল অনেক। খুশবু বের হচ্ছিল দারুণ। পাড়াপ্রতিবেশী বন্ধুরা খেয়ে গেল প্রতিবারের মতো। তাদের মধ্যে বেশিরভাগই অমুসলমান। ৪ দিন বাদে তাদেরই কেউ কেউ আমাদের বাড়ি চড়াও হয়ে বাবাকে মিথ্যা কারণে খুন করলো। আমি নিশ্চিত, তাদের অনেকের হাত থেকে তখনও ঈদের দিনের বিরিয়ানির খুশবু শুকিয়ে যায়নি।’’ এই কথার কোনো উত্তর ভূ-ভারতে কারও কাছে আছে? বাচ্চা মেয়েটি ঠিকই তো বলেছে, মাংসটা গবেষণাগারে নিয়ে গেছে কিসের মাংস জানার জন্য। কি লাভ! আখলাক কি ফিরে আসবে? গবেষণাগার অবশ্য আখলাকের দাবি-র সপক্ষে প্রমাণ দিয়েছে।

(২)

দেশের ঐক্য, সহনশীলতা, গণতন্ত্র এবং ধর্মনিরপেক্ষতার সামনে এটা একটি নেতিবাচক ঘটনা তাতে কারো সংশয় থাকার কথা নয়। কিন্তু পরবর্তী সময়কালে সরকারের নেতা, মন্ত্রী, সাংসদ বা বিধায়করা যা করে চলেছেন তাতে আতঙ্কিত হবার যথেষ্ট কারণ আছে। বিশিষ্ট মন্ত্রী অরুণ জেটলি বললেন, ‘আখলাকের হত্যার মতো ঘটনায় ভারতের নাম ডুবছে এবং বদনাম হচ্ছে। এমন হওয়া উচিত নয়’। এমনভাবে কথাটি বলা হলো যে, ভারতের নাম ডুবে যাওয়া ছাড়া একজন নিরপরাধ বয়স্ক মানুষকে পিটিয়ে মেরে ফেলার ব্যাপারটিতে আর কোনো চিন্তার বিষয় নেই। সাংসদ তরুণ বিজয় যা বলেছেন তাতে আমি স্তম্ভিত। আমার দৃঢ় বিশ্বাস অনেকেরই আমার মতো অবস্থা হয়েছে। তিনি বলেন, ‘কোনো প্রমাণ ছাড়া কেবলমাত্র সন্দেহ করে এমন ঘটনা নিতান্তই দুর্ভাগ্যজনক’। তাহলে যুক্তি এটাই যে, প্রমাণ থাকলেই এমনভাবে পিটিয়ে মেরে ফেলতে কোনো অসুবিধা নেই।

এলাকার সাংসদ এবং দেশের সংস্কৃতি মন্ত্রী প্রথম থেকেই বিষয়টিকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা, ভুল বোঝাবুঝি’র ফল ইত্যাদি বলে কাটিয়ে দিতে চেয়েছেন। সর্বশেষ বলেছেন যদি আখলাকের বাড়িতে হামলা হয় তাহলে তার কিশোরী কন্যা অক্ষত থাকলো কি করে? মন্ত্রী মহোদয়ের অনুশোচনা এটাই যে পূর্বপরিকল্পনা থাকা সত্ত্বেও কন্যাটিকে জল্লাদরা অক্ষত রাখলো কেন? আর আখলাকের মৃত্যুটি মায়া ছাড়া কিছুই নয়। আসলে দি‍ল্লির সরকারি মহলে তড়িঘড়ি পড়ে গেছে কে সবচাইতে আগে এবং সবচাইতে ঘৃণ্য ভাষায় এবং কাজে দেশের সহনশীলতা ও ধৈর্যের উপর আঘাত করতে পারে। এমন অশ্লীল পরিস্থিতি ভারতবর্ষ আগে কোনোদিন দেখেনি।

এরপর মারাত্মক ঘটনা ঘটেছে জম্মু ও কাশ্মীর বিধানসভায়। লানগেট থেকে নির্বাচিত একজন বিধায়ক ইঞ্জিনিয়ার শেখ রশিদ বিধায়ক আবাসের লনে ‘বিফ ফেস্ট’-এর আয়োজন করেন। সবাই জানেন গোরুর মাংস নিষিদ্ধ করার বিষয়টি এই রাজ্যে সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত গড়িয়েছে। উচ্চ আদালত সব দিক বিচার করে নিষিদ্ধ করার যে নির্দেশ নিম্ন আদালত দিয়েছিল তাকে ২ মাসের জন্য স্থগিত করে দিয়েছে। শেখ রশিদের আমন্ত্রণে অনেকেই এসেছিলেন সেই উৎসবে। পরের দিন তিনি যখন বিধানসভা কক্ষে ঢুকছেন তখন বি জে পি বিধায়করা তার উপর চড়াও হয় এবং নির্মমভাবে মারধর শুরু করে। বিধানসভার রক্ষী বাহিনী না থাকলে দেশ আর একজন ‘আখলাক’ সেদিনই পেয়ে যেত।

বি জে পি’র টি‍‌কিটে অনেকেই সাংসদ হয়েছেন যারা যোগী অথবা সাধু। সাধারণত অহিংসা তাদের অন্যতম অস্ত্র। হঠাৎ তারা এমন হিংস্র হয়ে উঠেছেন যা কল্পনারহিত। সাক্ষী মহারাজ বলছেন, ‘গো-মাতা রক্ষার জন্য তিনি খুন করবেন, অথবা খুন হবেন।’ যোগী আদিত্যনাথের তো কথাই নেই। এমন অশ্লীল ভাষা যোগীজী(!) ব্যবহার করেন যা লেখা যায় না। শোনার আগেই কানে আঙুল দিতে হয়।

(৩)

এতসব ঘটনার মধ্যে একটি রুপালি রেখা দেখা গেছে ১নং রাইসিনা হিলে। ছোট্ট একটি অনুষ্ঠান। রাষ্ট্রপতি’র উপরেই লেখা বই প্রকাশের অনুষ্ঠান। সেখানেই রাষ্ট্রপতি বললেন, বহুত্ববাদ এবং সহনশীলতা ভারত রাষ্ট্রের মর্মবস্তু। বললেন, দেশের সাংস্কৃতিক বহুত্ববাদকে রক্ষা করতে পারলেই দেশ এগিয়ে যাবে। জর্ডনের একটি সংবাদপত্রে সাক্ষাৎকার দিয়ে রাষ্ট্রপতি সাংস্কৃতিক বহুত্ববাদ রক্ষা করার কথা বলেছেন। এই হট্টমেলার ঋতুতে সেটা ভারতবাসীর কম পাওনা নয়। এরই সূত্র ধরে আমাদের আবার ফিরতে হবে কতকগুলো পুরানো কিন্তু সতত সজীব ‘ডিসকাসে’। একটি গণতান্ত্রিক দেশে ব্যক্তির অধিকার কি? আমি একজন সাধারণ ভারতবাসী। কারও প্রতি কোনোরকম হিংসা বিদ্বেষ না ঘটিয়ে নিজের ইচ্ছামতো বাস করতে পারবো কিনা? আমার নিজের মতো বাঁচার এবং চলবার অধিকার থাকবে কিনা? আখলাকের ঘটনাতে এই প্রশ্নগুলিই আবার বেশি বেশি করে সামনে এসে গেছে। ধর্মীয় বিশ্বাস অথবা ধর্মীয় আচরণের আগে বিবেচ্য হতে হবে ব্যক্তির গণতান্ত্রিক অধিকার। আমার রান্নাঘরে দারোগাগিরি করার অধিকার কারও নেই! এই মৌলিক কথাটিতে রাজ্য-কেন্দ্র অথবা যে কোনো রাজনৈতিক দল সকলকে নিশ্চয়তা দিতে হবে।

এই নিশ্চয়তা প্রথম দিতে হবে রাষ্ট্রের প্রধানকে। প্রধানমন্ত্রী। তিনি প্রথমে বিদেশ ভ্রমণে ব্যস্ত ছিলেন। সেখান থেকেই জল মাপতে শুরু করেছেন। কারণ বিহারে ভোট আছে। প্রধানমন্ত্রীর প্রতি মাসে পালা করে পুরানো আমন্ত্রণপত্র খুঁজে বিদেশ ভ্রমণের কর্মসূচি ঠিক করা এখন দিল্লির অলিন্দে হাসি-মশকরার ব্যাপার হয়েছে। তাতেও কোনো বিনিয়োগ নেই। সরকারি খরচে বিদেশে ‍‌হিন্দু মহাসভা বা আর এস এস-র সভা করছেন। দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয় নিয়ে অযৌক্তিকভাবে মুখ খুলছেন। আর নাটকীয় ভঙ্গিতে জানতে চাইছেন ‘বলুন, আমি সবার চাইতে বেশি কাজ করছি কিনা?’ সবাই হাততালি দিচ্ছে। এটাতেই প্রধানমন্ত্রীর আনন্দ। এসব না করে দেশে তার নন্দীভৃঙ্গীরা যে কাণ্ড করে বেড়াচ্ছে তা যদি সামলাতেন তাহলে আখলাক বেচারাকে বেঘোরে প্রাণ দিতে হতো না।

দেশের ধর্মনিরপেক্ষতা রক্ষা করার শপথ গ্রহণ করার পর মন্ত্রীরা কার্যভার নেন। কারও দ্বারা প্রভাবিত হয়ে দেশের মূল সূত্র বহুত্ববাদকে নষ্ট করবেন না – প্রতিশ্রুতি দেন। কিন্তু তাদের দ্বারাই দেশের এমনতর মূল্যবোধগুলি বেশিরভাগ ক্ষেত্রে আক্রান্ত হচ্ছে। সেটা জম্মু-কাশ্মীর প্রসঙ্গেই হোক, ধর্মান্তরকরণই হোক, গির্জার উপর আক্রমণই হোক। কেউই রাষ্ট্রের প্রধান দ্বারা নিরস্ত্র অথবা সমালোচিত হচ্ছেন না। সামগ্রিক সমস্যার মূল কেন্দ্রটি এখানেই নিমজ্জিত। দাদরির ঘটনাতে গোমাংস খাবার নৈতিকতা, প্রাচীন ভারতের ইতিহাস, কারা কারা এই মাংস খেতেন তারই পক্ষে বিপক্ষে তুমুল বিতর্কে অনেকেই লিপ্ত। সেটাই প্রধান আলোচ্য বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই কারণেই হয়তো ‘বিফ ফেস্ট’ আয়োজিত হচ্ছে, কলেজের মধ্যে গোমাংস ভক্ষণ করে কলেজ থেকে বহিষ্কৃত হচ্ছে। দু’দিন পরেই এই হুজুগ বন্ধ হয়ে যাবে। তখন আখলাকের নামটাও কেউ সহজে মনে আনতে পারবে না। বিষণ্ণতায় ডুবে যাবে তার সংসারটি। রেখে যাওয়া ৭০ বছরের মা প্রতিদিন সন্ধ্যায় মগরবের নমাজের শেষে ছেলের নামে দোয়া করতে গিয়ে ডুকরে কেঁদে উঠছে।

কিন্তু যে প্রশ্নগুলো আখলাকের মৃত্যু আমাদের সামনে এনে দিয়েছে তারই জন্য বিতর্ক জরুরি। সমাধানের দাবি আরও দৃঢ় করাটা যুক্তিসঙ্গত। এই নারকীয় ঘটনা যে আইন সমর্থন করে না সেটা জোরের সঙ্গে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। সমগ্র বিষয়টি আইনশৃঙ্খলার দিক দিয়ে কড়াভাবে দেখতে হবে। এই কাজে যুক্ত যারা তাদের কঠিন শাস্তিদান অত্যন্ত জরুরি। সবকিছু অপেক্ষা করতে পারে, কিন্তু হত্যাকারীদের গ্রেপ্তার করাটা বিলম্ব করা মানে দেশের আইনকে অবমাননা করা। এক্ষেত্রে ইতিমধ্যে প্রশাসন এবং বি জে পি যে ভূমিকা পালন করেছে সেটা ন্যক্কারজনক এবং হৃদয় কেঁপে ওঠার মতো। যাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে তারা বেশিরভাগই নাবালক। আর বি জে পি, যারা গ্রেপ্তার হয়েছে তাদের যে কোনো উপায়ে ছা‍‌ড়িয়ে আনার চেষ্টায় ব্রত। ভারতবর্ষ একটা গণতান্ত্রিক দেশ, বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশ। রাষ্ট্রপুঞ্জের নিরাপত্তা পরিষদে তার একটা স্থায়ী আসন থাকতে হবে, এ দাবি বহু দিনের এবং ন্যায্যদাবি। কিন্তু উলটোদিকের প্রশ্নটিকে ফেলে দেওয়া যাচ্ছে না। নিজের দেশের মাটিতে একটুখানি আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করবার ক্ষমতা কেন ভারতের নেই। দিনকে দিন ভারত যে এই অন্ধকার ও মূঢ়তার দিকে অগ্রসর হচ্ছে সেটাকে অস্বীকার করবে কি করে?

(৪)

এতগুলো কথা হয়তো বলার প্রয়োজন হতো না যদি দেশটা পঞ্চদশ শতাব্দীতে থাকতো। দেশটা একবিংশ শতাব্দীতে আছে আর বিশ্বজুড়ে প্রধানমন্ত্রী ‘ডিজিটাল ইন্ডিয়ার’ কড়া ভাষণ দিয়ে যাচ্ছেন তখন ‘পুতিগন্ধময়’ বিষয়গুলোতে নজর না দিয়ে উপায় নেই। কারণ, আর যাই হোক, যখন প্রচারের চকচকে রাংতাটি সরিয়ে ফেললে গো-ময় ভারত তার যাবতীয় দুর্গন্ধ নিয়ে হাজির হবে তখন ডিজিটাল ইন্ডিয়ার নাগাল পাওয়া মুশকিল বলেই আমার মনে হয়। যে আধুনিক ভারতের স্বপ্ন আমরা দেখি তার সঙ্গে বাস্তবের তফাৎটি বিশ্রী রকমের বিশাল তা মনে না রেখে উপায় নেই। কেবল মনে রাখছেন না প্রধানমন্ত্রী। আধুনিকতার নাম করে দেশের রন্ধ্রে রন্ধ্রে যে হিংসার বাস পাকাপাকিভাবে হতে যাচ্ছে, ক্লীবতার ঘরবাড়ি পোক্ত হয়ে উঠছে, প্রধানমন্ত্রী সেটা দেখেও দেখছেন না। অবলীলাক্রমে এসব কিছুকে নগ্নভাবে প্রশ্রয় দিয়ে যাচ্ছেন।

আমার এ বিশ্বাস ক্রমেই দৃঢ় হচ্ছে যে, ধর্মীয় বিদ্বেষ বলে আমাদের সকলের জানা যে ‘চেনা ছক’ আছে তার মধ্যে ঘটনাগুলি ফেলে দেওয়া যায় না। যদি ফেলে দেওয়া যেত তাহলে অনেকেই হিমেল বাতাসের পরশ গায়ে লাগিয়ে বেশ খানিকটা স্বস্তিবোধ করতে পারতেন সন্দেহ নেই। কিন্তু সেটা ঠিক নয়। সমগ্র ঘটনার পিছনে আছে একটি দানবীয় শক্তি যার নাম রাজনীতি। ক্ষমতার রাজনীতি। যা অত্যন্ত আধুনিক। এটি একটি ক্লেদাক্ত তত্ত্ব যা নিজেদের সাময়িক স্বার্থ মেটাবার জন্য ধর্মীয় বা যে কোনো সামাজিক কার্যক্রমকে ব্যবহার করতে ইতস্তত করে না। দাদরি ঘটনাতেও এই রাজনীতি কাজ করেছে। যেমন করেছিল মুজফ্‌ফরনগরের ঘটনায়।

সুতরাং এমনতর ঘটনাগুলিকে সামাজিক রোগ বলে সমগ্র দায়টি সমাজের কাঁধে ফেলে দিয়ে পথ খোঁজাটা নৈতিক দিক দিয়ে অন্যায় হবে। শুধু তাই নয়, নৈতিক অধিকারই নেই। আখলাক হত্যার মীমাংসা সেই কারণে প্রশাসনকে যেমন করতে হবে, রাজনীতিকদের নিজেদের দায়িত্ব নিতে হবে। প্রথম দায়িত্ব নিতে হবে প্রধানমন্ত্রীকে। কারণ তিনি রাষ্ট্রের প্রধান। তা ছাড়া যে সংগঠনের তিনি প্রচাক, তারই সভ্যরা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এমন জঘন্য কর্মে রত। ‘গুরুভাই’দের দায়িত্ব তিনি অস্বীকার করতে পারেন না। তাই সামাজিক রোগ বলে অন্তত তিনি এড়িয়ে যেতে পারবেন না। কিন্তু তাঁর সময় নেই। বেশিরভাগ সময় বাইরে। যতটুকু সময় দেশে থাকেন সেই সময় ঘনঘন পোশাক পরিচ্ছদ পালটাতে, ‘মন কী বাত’ বলতে আর ২/৪টে জনসভায় নাটকীয় ভাষণ দিতেই ফুরিয়ে যায়! প্রধানমন্ত্রীও অস্বীকার করতে পারেন না। আখলাক শহীদ হয়েছে। কিন্তু এই প্রশ্নগুলো রেখে গেছে, যার উত্তর প্রধানমন্ত্রীকেই দিতে হবে।

(৫)

ভারতের শাসন কেন্দ্রে বসে থাকা কেষ্টুবিষ্টুরা অনেকেই মনে করেন দেশের গণতন্ত্র, বহুত্ববাদ, সহনশীলতা, ধর্মনিরপেক্ষতা কেবল কথার কথা। এগুলোর নাকি বাস্তব জীবনে কোনো মূল্য নেই। আজকে তাদের কাছে সুবর্ণ সুযোগ এসেছে ভারতকে ‘হিন্দুরাষ্ট্রে’ পরিণত করার। ইতিহাসের শিক্ষা এবং তার ধারাবাহিকতা তাদের কাছে মূল্যহীন। প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকেই এব্যাপারে উৎসাহ পেয়ে যাচ্ছেন তারা। তা নইলে, দাদরির ঘটনাতে প্রধানমন্ত্রী ১৫ দিন পর মুখ খুললেও কড়া নিন্দা করতে পারেননি। দোষীরা শাস্তি পাবে এই সহজ সত্য কথাটি বলতে পারেননি। এমন কি রাষ্ট্রপতির কড়া প্রতিক্রিয়ার পরও তার হেলদোল নেই। বিহারের জনসভার ভাষণ তারই প্রমাণ। এব্যাপারে তিনি যা বলেছেন তাতে ধর্মীয় মেরুকরণ আরও স্পষ্ট হয়ে গেছে।

ভারত একটা নানা মত, নানা ধর্ম-বিশ্বাসের দেশ। সব মতের প্রাধান্য এবং মর্যাদা ব্যতিরেকে দেশ ঐক্যবদ্ধ থাকতে পারে না। বি জে পি বা আর এস এস-এর লোকরা গায়ের জোরে, লোকসভাতে সংখ্যা গরিষ্ঠতার জোরে সব কিছুকে পালটে দিতে চায়। ভারতের সংস্কৃতিকে হিন্দু সংস্কৃতি বলে চালাতে চায়, এই মিশ্র সংস্কৃতির দেশে সেটা করতে গেলে অনেক রক্ত যে ঝরাতে হবে এবং তা অসম্ভব  – এটা বোঝার মতো সাধারণ বুদ্ধির অভাব হয়েছে হিন্দুত্ববাদীদের।

সম্প্রতি আর একটি ঘটনা সারা দেশের মানুষের নজর কেড়েছে। এক সন্তান সম্ভাবনা মুসলমান মায়ের কথা। সেদিন রাত্রে হঠাৎই মায়ের তীব্র প্রসব যন্ত্রণা শুরু হয়েছে। স্বামীটি প্রথমে এটা ওটা করে, ওষুধ দিয়ে ব্যথা কমাবার চেষ্টা করেছে। হয়নি। ব্যথা আরও তীব্র। রাস্তায় নেমেছে তারা। একটু দূরে হাসপাতাল। গন্তব্য সেখানেই। কিন্তু কিছুদূর যাবার পর মা তখন চলৎশক্তিরহিত। বাধ্য হয়ে রাস্তার পাশে থাকা বিরাট গণেশ-মন্দিরের চাতালে শুইয়ে দিয়েছে মা-কে। তখন পুণ্যার্থীরা আসতে শুরু করেছে। বিশেষ করে মেয়েরা। স্বামীটি তো ভয়ে কাঁটা। কি জানি কি হবে! পুণ্যার্থী মেয়েরা কিন্তু বুঝে গিয়েছে কি হয়েছে এবং কি হতে যাচ্ছে। প্রধান পুরোহিত বাইরে এসে দেখেন এমন কাণ্ড। তিনি তাড়াতাড়ি পুজো দিতে আসা মায়েদের প্রয়োজনীয় নির্দেশ দিয়ে ভিতরে গেলেন। পুণ্যার্থী মায়েরা তাদের গায়ের ওড়না খুলে অস্থায়ী ‘লেবার রুম’ করে ফেললেন। তার মধ্যে নিয়ে গেলেন মা-কে। স্বামীটি অবাক হয়ে দেখছে। একটু পরেই সদ্যোজাত শিশুর কান্নার শব্দ পাওয়া গেল। পুণ্যার্থী মায়েদের হর্ষধ্বনি। মন্দিরের ঘণ্টা বেজে উঠেছে জোরে, আরও। মুসলমান মায়ের সন্তান জন্ম নিল গণেশ মন্দিরে। মন্দিরের বাইরের রাস্তায় পিতা তখন আজান দিচ্ছে সন্তানের জন্য। পরবর্তী ঘটনাটি আরও মজার। পুত্রসন্তান। মা আদর করে তার নাম রেখেছেন ‘গণেশ’

চিরদিন ভারত এই ঐতিহ্য ও সহনশীলতা বহন করে যাচ্ছে। আখলাক হত্যার মতো ঘটনার পরও তা অক্ষুণ্ণ থাকবে। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে – দেশের শাসকবর্গ নিজ রাজনৈতিক স্বার্থে সেটাকে নষ্ট করতে চাচ্ছে। মাত্র দেড় বছরের শাসনকালে এত দাঙ্গা হবে, এত রক্ত ঝরবে, এত হিংসা ছডিয়ে পড়বে, আগুন জ্বলবে কেউ ভা‍‌বেনি। সামাজিক ক্ষেত্রে এই বিশৃঙ্খলার জন্য দায়ী কেন্দ্রের সরকার। মানুষের কাছে তাদের জবাবদিহি করার সময় এসেছে।

আবার পুরানো কথাতেই ফিরে আসি। বহুত্ববাদ সারা পৃথিবীতে একটি প্রধান আলোচ্য বিষয়। মানুষ সেটাকেই জীবন চর্চার মাধ্যম হিসাবে গ্রহণ করেছে। ধর্ম যদি ক্রমাগত মানুষের পরিচয় নির্দিষ্ট করে দিতে থাকে বা দেওয়ানোর চেষ্টা হয় তাহলে যে কোনো সমাজের সুস্থিতি নষ্ট হয়ে যাবে। এই অবস্থা নিয়ে একটা সমাজ চলতে পারে না। আমাদের দেশের প্রধান শক্তি হচ্ছে দীর্ঘকাল থেকে ভারতের মাটিতে প্রোথিত এই সহনশীলতা আর ঐক্য। রবীন্দ্রনাথ বলেছেন – ‘বিবিধের মাঝে দেখ মিলন মহান…’। ঝড়-ঝাপ্টা এর উপর দিয়ে বয়ে গেলেও মূল সুরটি এখনও অক্ষত আছে।

সব মানুষের সক্রিয় উদ্যোগ ছাড়া বহুত্ববাদ কার্যকর হতে পারে না। সব অংশের মানুষকে, জাতি, ধর্ম, বর্ণ, রাজনীতি নির্বিশেষে রাস্তায় নেমে দেশের ঐক্য রক্ষার কাজে নিয়োজিত হতে হবে। ভারতের কাছে সেটাই হবে ইতিবাচক পদক্ষেপ।

Rule of Terror, Violence & Coercion in Bengal

May 7, 2014

352041

Mamata’s Conspiracy Theory

April 21, 2014

350661

Unimaginable Electoral Fraud

August 30, 2013

330516

Panchayat Vote (2013) Collage

August 3, 2013

Vote Loot – Picture 1

vote-loot-1

 

327930

 

Vote Loot – Picture 2

vote-loot-2

 

328036

 

328026

 

Vote Loot – Picture 3

vote-loot-3

 

Vote Loot – Picture 4

vote-loot-4

Bengal Today

July 15, 2013

কেমন আছে বাংলা?

পরান মাঝি

১।। দেখছি …আলু নিয়ে বসে আছেন কৃষক। কোথায় বিক্রি করবেন, জানা নেই তাঁর। ধান ফলেছে জমিতে। কাটা হয়ে গেছে। বিক্রি হবে কোথায়? কৃষক জানেন না। পাট ফলেছে। তারপর? বাজারটা কোথায়? কিনবে কে? শশা রাস্তায় ফেলে দিতে হয়। বিক্রি হয় না। টমেটো গাড়ির চাকার তলায় থেত্‌লে যায় জাতীয় সড়কে। বিক্রি হয় না। কৃষক আত্মহত্যা করেন। কৃষিমন্ত্রী-খাদ্যমন্ত্রী বলেন, ‘‘মিথ্যে কথা। কেউ মরে নি।’’ মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘‘মাত্র ১ জন মরেছে।’’ সরকার আদালতে হলফনামা পেশ করে মুখ্যমন্ত্রীর কথাকেও মিথ্যে প্রমাণ করে। সেখানে বলা হয় এরাজ্যে একজন কৃষকও আত্মহত্যা করেননি! ওদিকে বাস্তবে দেখা যায় ৮২ জন কৃষক এরাজ্যে আত্মহত্যা করেছেন ফসলের দাম না পেয়ে, এই ২ বছরে। এবং এভাবেই চলছে এখন আমাদের পরিবর্তিত বাংলা।

মন্বন্তর দেখেছে বাংলা। কিন্তু এমন ভয়ঙ্কর কৃষক-মৃত্যু দেখেনি কোনও দিন। মাঠে মাঠে সবুজ ফসল অথচ বিক্রি করার উপায় নেই। মা-মাটি-মানুষের সরকার চলছে এখন। আর তারই পরিণতি দেখছি আমরা। মাত্র ২ বছরেই কী হাল হয়েছে সোনার বাংলার!

গ্রামের পর গ্রাম উজাড় হয়েছে কয়েকটা বদমাইশ চিট ফান্ড মালিকের কারসাজিতে। সারদা তার প্রধান। গরিব মানুষের কাছ থেকে টাকা তুলে সেই টাকায় ফুর্তি করেছে কতগুলো শয়তান। তৃণমূলের নেতা-মন্ত্রী-মুখ্যমন্ত্রী-সাংসদ—তাঁদের পোষা গুণ্ডা-পেয়াদা-আমলা-সাংবাদিক-নাচিয়ে-গাইয়ে-বলিয়ে-কইয়ে-আঁকিয়ে-লিখিয়ে-বাজিয়ে-লাফিয়ে—সবাই, সব্বাই সেই টাকায় ফুর্তি করেছে। কার টাকায়? ওই টাকা কাদের? কাদের টাকায় সারদার এতো হোটেল-রিসর্ট-সিনেমা-ইভেন্ট-প্রাইজ? তৃণমূলের দপ্তরে নেতা-মন্ত্রীর পকেটে কত টাকা গেছে? কাদের টাকায় খবরের কাগজ-টিভি চ্যানেল? চিট ফান্ডের মালিকের নিজস্ব টাকায় হয় এসব? কোন্‌ গরিবের টাকা? তারপর যখন খুশি, যেমন খুশি সেই টাকা নিজের করে নিয়ে, ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধ করে দিয়ে, আমানতকারীর টাকা ফেরত না দিয়ে চম্পট দিলেই হয়ে গেল? সরকার আছেন — সব দেখে-শুনে ব্যবস্থা করে দেবেন? বাঃ।

কতজন আমানতকারী-এজেন্ট আত্মহত্যা করেছেন? সংখ্যাটা কত? এই দায় কার? এই মৃত্যুর দায় কার? কেন এতগুলো লোক মরে গেলেন? সুদীপ্ত সেনের চিঠিতে যাঁদের নাম ছিল, কেন তাঁদের জেরা পর্যন্ত করা হলো না? মা-মাটি-মানুষ, মা-মাটি-মানুষ বলে হদ্দ হয়ে গেলেন মুখ্যমন্ত্রী, আর যে এতগুলো গরিব আত্মহত্যা করলেন, তাঁরা মানুষ নন? তাঁদের মা নেই? তাঁদের বুকের রক্ত জল করা পয়সা ‍‌তিলে তিলে সঞ্চিত হয়ে চিট ফান্ডের বিপুল সম্পত্তি হয়েছে। সেই টাকায় পার্টি-ফুর্তি-চ্যানেল-দলবাজি! লজ্জা করে না! গ্রামের পর গ্রাম উজাড় হয়ে গেল, মুখ্যমন্ত্রী দেখতে পান না?

এখানে এখন কেউ কিছু বলতে পারেন না? মুখ্যমন্ত্রীর এক অনুপম নিদান আছে—চুপ! ফলে সবাই চুপ করেই থাকে। যদি কেউ মুখ ফস্‌কে কিছু বলে ফেলেন, মুখ্যমন্ত্রী সঙ্গে সঙ্গে বিধান দেন—ওকে ধর! ধর ওকে! ওটা মাওবাদী! ওটা সি পি এম! প্রভুর নির্দেশে পেয়াদারা লাফিয়ে পড়ে। মুখ্যমন্ত্রীর বাইকবাহিনী সক্রিয় হয়। ঘাসফুলের ঝাণ্ডা আর পেয়াদার ডাণ্ডা কার্যকরী হয়। মুখ্যমন্ত্রী তৃপ্তির হাসি হেসে বলেন, দেখলেন তো ধরে দিলাম। আমি মাওবাদী আর সি পি এম দেখলেই চিনতে পারি। হুঁ হুঁ বাবা! ২৬ দিন চকোলেট খেয়ে অনশন করেছি। আমার চোখকে ফাঁকি দেওয়া অত সহজ নয়! তবুও প্রতিবাদ হয়।

২।। শুনছি …

২০১২ সালের ৬ই সেপ্টেম্বর মহাকরণে দাঁড়িয়ে মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছিলেন, কোনও নাবালিকা যদি ধর্ষিত হয় তবে ৩০ হাজার টাকা আর্থিক সাহায্য পাবে এবং কোনও প্রাপ্তবয়স্ক মহিলার ক্ষেত্রে ক্ষতিপূরণের পরিমাণ হবে ২০ হাজার টাকা। পরদিন ৭ই সেপ্টেম্বরের কাগজে আমরা জেনেছিলাম, মন্ত্রিসভার বৈঠকে এমনই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এবং এই মর্মে একটা বিল আসছে। ধর্ষণে ক্ষতিপূরণ!

বারাসতের মেয়েটা খুন হওয়ার পর রাজ্যের খাদ্যমন্ত্রী সেই মেয়ের পাড়ায় গিয়েছিলেন ক্ষতিপূরণ দিতে। সঙ্গে চাকরিরও টোপ ছিল। কামদুনির মেয়েটাকে ধর্ষণ করে খুন করা হয়েছে। অভিযুক্তদের একজন তৃণমূল। তার আত্মীয় পঞ্চায়েত নির্বাচনে তৃণমূল প্রার্থী। দিদির দলের সম্পদ এরা সবাই

দিদির স্নেহধন্য ভাই!

মুখ্যমন্ত্রী প্রথমে ১৫ দিন তারপর ২৫ দিন তারপর … হাবিজাবি কত কী বললেন। তাঁর দক্ষ পেয়াদারা এখনও একটা সম্পূর্ণ চার্জশিট দিয়ে উঠতে পারলো না। কিন্তু চাকরি-ক্ষতিপূরণের টোপ নিয়ে চারজন মন্ত্রী ঘুরঘুর করছেন এখনও। এখন মৃতার ভাইকে ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট খুলতে বলছেন এক মন্ত্রী।

দারিদ্র্য নজরুলকে মহান করেছিল। তিনি লিখেছিলেন সেকথা। বারাসতের মেয়েটাও দরিদ্র ছিল। তার বাবা-মা অনেক কষ্ট করেই লেখাপড়া শেখাচ্ছিলেন তাকে। মেয়েটা ক‍‌লেজে যাচ্ছিল। তার বাড়িতে সে-ই ছিল প্রথম প্রজন্মের পড়ুয়া।

গরিব মানুষের পয়সা থাকে না। কিন্তু আত্মমর্যাদাবোধটা প্রখর থাকে। তাঁদের ছেলে-মেয়েগুলো দু’বেলা পেট ভরে খেতে পায় না, তাও ভিক্ষে করে না। সেই মন্বন্তরের সময় দলে দলে না খেয়ে মরেছে, তবু ছিনিয়ে খায়নি। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় লিখেছিলেন, কেন? মুখ্যমন্ত্রী আর তাঁর দলবল এসব জানেন না তাই নিরন্তর টোপ নিয়ে ছুঁক ছুঁক করেন। এবং যদি কেউ সেই টোপ গিলতে অস্বীকার করেন, তাতেই ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন মুখ্যমন্ত্রী। বাগে আনা গেল না যে! বশ করা গেল না। কামদুনির মেয়েরা তো এটাই স্পষ্ট করেছে। তাতেই তো দিদির এতো রাগ! তিনি সবাইকে চুপ করিয়ে রেখে একা অনর্গল বকে যাবেন। অন্যে কেন কইবে? ব্যস্‌! গোয়েন্দা রিপোর্ট বেরিয়ে গেল, ওই মেয়েগুলো সি পি এম-র সাজানো! একটা মেয়েকে ধর্ষণ করে মেরে ফেলা হলো, তার শাস্তি চেয়ে মেয়েটার বন্ধুরা দিদিকে বলতে গিয়ে সি পি এম-মাওবাদী হয়ে গেল, গোয়েন্দারা সেই রিপোর্টও তৈরি করে ফেলতে পারলো, অথচ ধর্ষণ করে খুনের ঘটনার একটা পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট হলো না!

৩।। জানছি …

জুলাই মাসের ৬ তারিখে মমতা ব্যানার্জি জয়নগরে গিয়েছিলেন ভাষণ দিতে। সেখানে তিনি বলেছেন, ‘‘অনেক কাজ করেছি।’’ তারপর দর্শকদের উদ্দেশে প্রশ্ন ছুঁড়েছেন পরপর ২ বার — বাকি আছে কোনটা? বাকি আছে কোনটা? উত্তর এসেছে কিছু বাকি নেই আর। অর্থাৎ, সব কাজ হয়ে গেছে। কী কাজ করার ছিল এবং কোন কাজটাই বা হয়ে গেছে, এসব অবশ্য জানার উপায় নেই। তা এক ঘন রহস্যে ঢাকা। ফলে, দর্শকদের দিয়ে অতি সহজেই আর কিছু বাকি নেই বলিয়ে নিতে পেরেছেন মমতা ব্যানার্জি। এবং তারপর আবার তাঁর প্রশ্ন, ‘‘কি পাহাড়ে বেড়ানো বন্ধ হয়ে গিয়েছিল তো? কি পাহাড়ে বেড়ানো বন্ধ হয়ে গিয়েছিল তো?’’ জয়নগরের দর্শকদের উত্তর দিয়েছেন, হ্যাঁ! মমতা ব্যানার্জি তৃপ্ত হয়েছেন। পাহাড়ে হাসি ফুটেছে। তারপর তিনি বলেছেন মন্দারমণি আমি তৈরি করে দিয়েছিলাম।

শ্রীরামকৃষ্ণ বলতেন, ‘‘আমির আঁশটে গন্ধ’’। এটাই যেন এখন প্রতিভাত হয় সর্বত্র। জয়নগরেও তার অন্যথা দেখা গেল না। মমতা ব্যানার্জি বললেন, ‘‘আমি আছি বলেই সব কাজ হচ্ছে।’’ মমতা ব্যানার্জি বললেন, ‘‘আমি এতটাই জেদি।’’ মমতা ব্যানার্জি বললেন, ‘‘আমি ভাঙি তবু মচকাই না।’’ অনর্গল আমি’র স্রোত—আমি ঘরের কাজ খুব ভালবাসি। আমি রাঁধতেও জানি। আমি মাইনে নিই না। আমি সরকারের পয়সায় এককাপ চাও খাই না। আমার চল্লিশটা বই আছে—ইত্যাদি! ইত্যাদি!

এই যে এতো ‘‘আমি’’র প্রচার এর সঙ্গে রাজ্য চালানোর সম্পর্ক কী? তিনি এতো কিছু পারেন-করেন, তাতে রাজ্যের লোকের কী?

আসলে এই এতো ‘‘আমি’’-র দাপট অন্য কারণে। মমতা ব্যানার্জি গণতন্ত্রে বিশ্বাস করেন না। তাঁর মতটা অন্যকে দিয়ে স্বীকার করিয়ে নেওয়াতেই স্বচ্ছন্দ তিনি। এতো আমি-আমি-র অর্থ, তিনি যা বলবেন সেটাই শেষ কথা। এই স্বৈরতান্ত্রিক এক নায়কের ভঙ্গি আমরা সব সময়েই প্রত্যক্ষ করছি। তিনি কলকাতার পুলিস কমিশনারকে দিয়ে বলিয়েছিলেন পার্কস্ট্রিটে ধর্ষণ হয়নি। ডিজি-কে দিয়ে বলিয়েছিলেন, কাটোয়ার ধর্ষণ হয়নি। সি আই ডি-কে দিয়ে বলিয়ে নিয়েছেন, কামদুনির মেয়েরা সি পি এম। নিজের দলের নেতা-মন্ত্রীদের দিয়ে তো যা খুশি তাই বলাচ্ছেন। মঞ্চে ডি এম-এস পি-দের দিয়েও নিজের কথা বলিয়ে নিচ্ছেন। এখন জনসভায় তৃণমূল সমর্থকদের দিয়ে বলাচ্ছেন — কোন কাজটা বাকি আছে? কোনটা বাকি আছে? উপস্থিত জনতা বলছেন, ‘‘কোন কাজ বাকি নেই।’’ ব্যস—আর কিছু বলারও নেই। এখন শুধু দেখার আছে। আর শোনার আছে, ‘‘১০০ দিনের কাজ হয়ে গেছে। দে‍শের মধ্যে আমরা ১ নম্বর। ১০০ দিনের কাজ হ‍‌য়ে গেছে। এবার ২০০ দিনের কাজ হবে। ‘‘আরও শোনার আছে, ‘‘জঙ্গলমহলে চাল দিতে ৪০০০ কোটি টাকা ব্যয় হয়।’’

বাস্তব বলে অন্য কথা। জঙ্গলমহলে যে চাল দেওয়া হয় তা বরাদ্দ করে কেন্দ্র। আর ১০০ দিনের কাজ? জঙ্গলমহলেই ৬/৭ দিন থেকে কারো কারো জুটেছে ১২/১৩ দিন। আর একেবারে নিচের দিকে সাগরের গ্রামেও তাই। আবার এর বিপরীত চিত্র-ও আছে। জবকার্ড হাতিয়ে নিয়ে কাজের নামে টাকা তুলে নিচ্ছে তৃণমূলের লোকেরা। এরই পাশাপাশি একটা খবরের উদ্ধৃতি দেওয়া যাক :—

‘‘পঞ্চায়েত নির্বাচনের আগে ১০০‍ দিনের কাজের প্রকল্পের টাকা খরচে নিয়ন্ত্রণ আনছে রাজ্য সরকার। ইতোমধ্যেই প্রতিটি জেলাকে এই প্রকল্পের টাকা খরচে নজরদারি চালানোর জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। রাজনৈতিক মহল মনে করছে, এই মুহূর্তে রাজ্যের ৬৫ শতাংশের বেশি গ্রাম পঞ্চায়েত সি পি এমের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। পঞ্চায়েত ভোটের আগে সি পি এম পরিচালিত গ্রাম পঞ্চায়েতগুলি যাতে এই প্রকল্পে অতিরিক্ত টাকা খরচ করে বাড়তি সুবিধা না পেতে পারে, সেই কারণেই রাজ্য সরকার এই নিয়ন্ত্রণ শুরু করেছে।’’

জানুয়ারির ৭ তারিখের ‘‘বর্তমান’’ পত্রিকায় এই সংবাদ প্রকাশ পেয়েছে। খেয়াল করে যদি দেখা যায় তাহলে মনে পড়ে যাবে, মুখ্যমন্ত্রী ডি এম, বিডিও-দের দিয়ে মহাকরণে বসে পঞ্চায়েত চালাবেন বলে ঘোষণা করেছেন। গ্রাম বাংলা কেমন থাকবে তা তিনিই ঠিক করবেন। পঞ্চায়েতের নির্বাচিত প্রতিনিধিরা নন। ক্ষমতার কেন্দ্রে থাকবেন তিনি। সব থাকবে তাঁর কুক্ষিগত। গণতন্ত্র বা বিকেন্দ্রীকরণ এখানে অর্থবহ হবে না। মুখ্যমন্ত্রীই যে সব। মমতা ব্যানার্জি ৬ই জুলাই জয়নগরের মিটিং-এ পরিষ্কার বলে দিয়েছেন, ‘‘জেলা পরিষদ যে তৈরি হবে আমি নিজে কাউন্সেলিং করব।’’ আর টাউন হলের সেই ঐতিহাসিক সভায় তিনিতো বিডিও‍‌-দের তাঁর মোবাইল নম্বর দিয়েই দিয়েছেন এবং বলেওছেন সব সময় যোগাযোগ রাখতে। ফলে আর তো কোনও অসুবিধে নেই। পঞ্চায়েতটাও চলবে কলকাতা থেকেই। সেখানে কী পরিকল্পনা, কী উন্নয়ন, কী যোজনা অথবা গরিব মানুষ কাজ পাচ্ছেন না আত্মহত্যা করছেন—এসব ফালতু বিষয় নিয়ে অত মাথাব্যথাই নেই মমতা ব্যানার্জির। তাই, সি পি এম পরিচালিত পঞ্চায়েত ১০০ দিনের কাজের প্রকল্পে টাকা খরচ করায় সরকার‍‌ যে নিয়ন্ত্রণ আনবেন তাতে আর আশ্চর্যের কী? এই পরিস্থিতিতেই প্রথম দফার পঞ্চায়েত ভোট হয়ে গেল।

৪।। ভাবছি …

মাওবাদী নেতা কিষেনজী মমতা ব্যানার্জিকে মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে দেখতে চেয়েছিলেন। মুখ্যমন্ত্রী হয়েই মমতা ব্যানার্জি কিষেনজী-কে মেরে ফেলতে সক্ষম হয়েছেন। তাঁর দলের সাংসদরা দিল্লিকে বলেছেন, দেশে মাওবাদী দমনে মমতা মডেল প্রয়োগ করতে। আর মমতা ব্যানার্জি বলেছেন, সি পি এম-কংগ্রেস-বি জে পি এবং মাওবাদীরা মিলে তাঁকে খুনের চক্রান্ত করেছে! কী কাণ্ড!

মমতা ব্যানার্জি মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার আগে যখন জঙ্গলমহলে যেতেন, তখন তিনি ছত্রধর মাহাতোর বাইকে চেপেই যেতেন। তখন বলতেন ‘‘কোথায় মাও? মাও ফাও কিছু নেই।’’ শুধু তিনি নন, ত‌াঁর অনুগত বুদ্ধিজীবীরাও সেদিন ছত্রধরের আঙিনায় পাতা মাদুরে বসে বলে এসেছিলেন, ‘‘কোথায়? মাওবাদী তো দেখলাম না বাবা।’’ এখানেই শেষ নয়, জ্ঞানেশ্বরী এক্সপ্রেসের সেই বিস্ফোরণের পরও মুখ্যমন্ত্রী এবং তাঁর অনুগত বুদ্ধিজীবীরা চিৎকার করেছিলেন, ‘‘এটা সি পি এমের কাজ!’’ তারপর ২০১১ সালে মমতা ব্যানার্জি মুখ্যমন্ত্রী হলেন। ছবিটা এবং চিৎকারের বয়ান গেল পালটে। দফায় দফায় মাওবাদীরা সেজে-গুজে হাজির হয়ে গেলেন মহাকরণের অলিন্দে। গর্বিত মুখ্যমন্ত্রী ‘‘মাওবাদী’’দের মাফ করে দিলেন। তাঁদের চাকরি হলো হোমগার্ডে। কত নাম। সুচিত্রা-জাগরী-শশধর-খগপতি-বুদ্ধেশ্বর-নিরঞ্জন-ললিত-জগা-সুখেন্দ্র-ক্ষমানন্দ-প্রবীর-হামলেট-দুলাল-জ্যোতিপ্রসাদ-বাদল-অমিয়-সুনীল-অজিত-স্বপন-বিনয়-অনিল—এতো এতো মাওবাদী ছিল। সবাই এখন আত্মসমর্পণ করে পাউডার মেখে দিব্যি চাকরি করছেন অথবা তৃণমূলের হয়ে পঞ্চায়েতের ভোটে দাঁড়াচ্ছেন! মমতা ব্যানার্জি বলেছিলেন, ‘‘এখানে মাও ফাও কিছু নেই। সি পি এম-ই মাও।’’

তবে যে এখন শুনি, মমতা ব্যানার্জি এবং তাঁর আরও কয়েকজন সাংসদ-মন্ত্রীকে নাকি মাওবাদীরা খুনের হুমকি দেয়! এজন্য নিরাপত্তা বলয় তৈরি হয় তাঁদের ঘিরে এবং বিহার-ঝাড়খণ্ডে মাওবাদী নাশকতা হলে এখানে সতর্কতা জারি হয়—কেন? মাও ফাও বলে তাহলে কিছু আছে নাকি? কী বলেন তাঁর অনুগত আত্মহারা বুদ্ধিজীবীরা? ওই যে জ্ঞানেশ্বরী এক্সপ্রেসে বিস্ফোরণ হলো, তাতে জড়িতদেরই মুখ্যমন্ত্রী চাকরি দিয়েছেন। তিনি অবশ্য বলেন, হাসি ফুটিয়েছেন। ওই লোকগুলো কারা?

২০০৭ সালের ৭ই জানুয়ারি নন্দীগ্রামের সি পি আই (এম) কর্মী শঙ্কর সামন্তকে খুন করেছিল কারা? কিষেনজী বলেছিলেন ‘‘নন্দীগ্রামের আন্দোলনে প্রথম সারিতে’’ তাঁরা ছিলেন। শঙ্কর সামন্তকে কুপিয়ে খড়ের গাদায় আগুন জ্বালিয়ে, সেই আগুনে ছুঁড়ে ফেলা হয়েছিল। খোকন শিট নামে একজন তার নেতৃত্বে ছিল। সে এবার তৃণমূলের প্রার্থী!

মমতা ব্যানার্জি এখন খুব চিৎকার করেন ‘‘সি পি এম-কংগ্রেস-বি জে‍‌ পি এবং মাওবাদীরা’’ তাঁকে খুনের চক্রান্ত করেছে। বিচিত্র কল্পনাশক্তি মাননীয়ার। তিনি গত ১৮ই জুন গাইঘাটার এক জনসভায়, তাঁর প্রাণনাশের যে চেষ্টা হয়েছিল আগের দিন তা বলেছিলেন। অর্থাৎ ১৭ই জুন। যেদিন তিনি কামদুনিতে গিয়েছিলেন, সেদিনই তিনি কামদুনির মেয়েদের দেখে চিনতে পেরেছিলেন সি পি এম এবং মাওবাদী বলে। এবং —

‘‘… ১৭ই জুন কামদুনিতে তাঁর প্রাণনাশের চেষ্টা হয়েছিল। পুলিসের কাছ থেকেই তিনি এই প্রাণনাশের চক্রান্তের কথা জানতে পেরেছেন বলে সভায় জানিয়েছিলেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর সেই বক্তব্য নিয়েই তথ্য জানার অধিকার (আর টি আই) আইনে পুলিসকে চিঠি দেন…হাওড়ার বাসিন্দা অমিতাভ চৌধুরী। … কলকাতার পুলিস কমিশনারের কাছে পাঠানো চিঠিতে অমিতাভবাবু লিখেছিলেন, এক) মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রী এনিয়ে কোনও অভিযোগ দায়ের করেছেন কিনা। দুই) যদি করে থাকেন, তাহলে কোন থানায় করেছেন তার নামসহ জেনারেল ডায়েরি নম্বর, তারিখ ও সময় জানানো হোক। তিন) তাঁর ওই অভিযোগের অনুলিপি দেওয়ার অনুরোধ করছি। চার) ওই অভিযোগে নিযুক্ত তদন্তকারী অফিসারের নাম ও পদ জানানোর অনুরোধ করছি।… কলকাতা পুলিসের যুগ্ম-কমিশনার (প্রশাসন) প্রথম প্রশ্নের জবাবে জানিয়েছেন, কলকাতা পুলিসের কোনও থানায় ওই বিষয়ে কোনও অভিযোগ দায়ের করা হয়নি। তাই বাকি প্রশ্নগুলির উত্তর দেওয়ার প্রশ্ন ওঠে না বলে জানিয়ে দেওয়া হয়।… এই চিঠি পাওয়ার পর অমিতাভবাবুর অভিযোগ, মুখ্যমন্ত্রী নিজের প্রাণনাশের কথা জানালেও পুলিসের কাছে এনিয়ে কার্যত কোনও তথ্যই নেই!’’

১২ই জুলাইয়ে আনন্দবাজার পত্রিকার ৬ পৃষ্ঠায় এই সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। খবরে প্রকাশ, ‘‘পুলিস আসলে পুরো বিষয়টিকে আড়াল করার চেষ্টা করছে…’’। মমতা ব্যানার্জি মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর প্রাণনাশের চেষ্টা হচ্ছে আর পুলিস বিষয়টিকে আড়াল করার চেষ্টা করছে! কেন? পুলিসের এই চেষ্টার কারণ কী?

নেপথ্যে কী রহস্য রয়েছে?

এতো মিথ্যের ওপর একটা সরকার দাঁড়িয়ে রয়েছে। সরকারের ১ নম্বর ব্যক্তি থেকে শুরু করে একেবারে নিচের তলার লোকটি—সবাই নিরন্তর মিথ্যে বলে চলেছেন। এবং এঁরাই এখন আমাদের রাজ্যের সর্বেসর্বা! এবং এঁদের হাতে পড়ে যেমন থাকা উচিত, বাংলা তেমনই আছে।

পুনঃ মমতা ব্যানার্জি একবার বলেছিলেন, ‘‘সি পি এম টালার ট্যাঙ্কে বিষ মিশিয়েছে!’’