Posts Tagged ‘isis’

2014 – A Retrospect

January 3, 2015

২০১৪ : বিভীষিকার এক বছর

হাসান ফেরদৌস

২০১৪ সাল শুরু হয়েছিল আইসিস নামক এক দানবের উত্থান-কাহিনি দিয়ে। বছর শেষ হলো তালেবান নামক আরেক দানবের হাতে ১৩২ শিশুর নৃশংস হত্যার ভেতর দিয়ে। মাঝখানের একটি বড় ঘটনা ছিল ইবোলা নামক এক ভয়াবহ সংক্রামক ব্যাধির আক্রমণ।

এ ছাড়া আরও দুটি ঘটনা সদ্য বিগত ২০১৪ সালে ঘটে, যা আমার চোখে ভীতির। এক. মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে রিপাবলিকান পার্টির কংগ্রেসের উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ অর্জন ও ভারতে নরেন্দ্র মোদির নিরঙ্কুশ সংখ্যাধিক্যে ক্ষমতা গ্রহণ। মন্দ খবরের তালিকায় কেউ কেউ হয়তো বিনা নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ক্ষমতা দখলকেও অন্তর্ভুক্ত করবেন, তবে সে ঘটনার তেমন কোনো আন্তর্জাতিক চরিত্র নেই। ফলে, আমার ২০১৪ সালের বৈশ্বিক পরিমণ্ডলের বিভীষিকার তালিকা থেকে সে অঘটন বাদ রাখছি।

আইসিস বা আইএস অর্থাৎ ইসলামিক স্টেটের উত্থান আকস্মিক, তবে একদম অপ্রত্যাশিত নয়। মধ্যপ্রাচ্যে আল-কায়েদা থেকে উদ্ভূত এই জিহাদি আন্দোলন বস্তুত ইরাকে মার্কিন আক্রমণ ও সিরিয়ায় হাফিজ আল-আসাদ সরকারের ব্যর্থতার গর্ভ থেকে জন্ম নিয়েছে। সাদ্দাম হোসেনের পতনের পর ইরাকে যে শিয়া সরকার ক্ষমতা গ্রহণ করে, তা সে দেশের সুন্নি সংখ্যালঘুদের ক্ষমতার কেন্দ্র থেকে উৎপাটিত করে কার্যত দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিকে পরিণত করে। অধিকারবঞ্চিত এই সুন্নিদের নিজের দলে টানতে জিহাদি নেতাদের তেমন বেগ পেতে হয়নি। নিজেদের অধিকারহীন ও ব্রাত্য বিবেচনা করে ইউরোপ, মধ্য ও দক্ষিণ এশিয়ার এমন তরুণেরাও ইসলামি বিপ্লবের ডাকে আইএস কাতারে শামিল হয়ে পড়ে। পর পর কয়েকটি নৃশংস হত্যাকাণ্ড ভিডিওতে ধারণের মাধ্যমে তা প্রচার করে আইএস হঠাৎ যেন সব তথ্যমাধ্যমের শিরোনাম হয়ে ওঠে।

মার্কিন প্রশাসন গোড়াতে আইসিসের প্রতি তেমন গুরুত্ব দেয়নি। প্রেসিডেন্ট ওবামা ঠাট্টা করে বলেছিলেন, বাস্কেটবল খেলোয়াড় কোবি ব্র্যায়ান্টের জার্সি গায়ে দিলেই তো আর কেউ ব্রায়ান্টের মতো দক্ষ খেলোয়াড়ে পরিণত হয় না। পরে তাঁকে নিজের থুতু নিজেকেই গিলতে হয়েছে। ২০১৪-এর অর্ধেকের বেশি সময় ইরাকের শিয়া নেতৃত্ব কোন্দলের কারণে নতুন সরকার গঠনে সক্ষম হয়নি। এর ফলে যে শূন্যতার সৃষ্টি হয়, আইএস তার সুযোগ গ্রহণ করে। পাশাপাশি সিরিয়ার অব্যাহত গৃহযুদ্ধে আসাদ বা তাঁর বিরোধী পক্ষ কেউই নিজেদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠায় সফল না হওয়ায় আইএসের পক্ষে পেছনের দরজা দিয়ে অনুপ্রবেশ সহজ হয়। অবশ্য বছরের শেষ নাগাদ যুক্তরাষ্ট্র পরিস্থিতি সামলে নিয়ে আইএসের বিরুদ্ধে জোর হামলা চালায়।

আইএস শুধু ইরাক বা সিরিয়ায় আসন গেড়ে সন্তুষ্ট ছিল না, সৌদি আরব ও উপসাগরীয় দেশসমূহে নিজেদের প্রভাব সম্প্রসারণে তাদের আগ্রহ এই দেশগুলোকে উদ্বিগ্ন করে। ফলে তারাও আইএস ঠেকাতে হাত লাগায়। বছরের শেষ তিন মাসে আইএসের আধিপত্য অনেকটা স্তিমিত হয়ে এসেছে, তবে তাকে উৎপাটন করা সম্ভব হয়নি। পূর্ব ও পশ্চিমের এই দড়ি টানাটানিতে একমাত্র লাভবান হয়েছেন সিরিয়ার হাফিজ আল–আসাদ। আমেরিকা তার নজর আসাদের ওপর থেকে সরিয়ে নিয়েছে। অন্যদিকে আইএস তাদের ‘কমন এনিমি’ এই যুক্তিতে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র তাদের গত ৩০ বছরের কাজিয়া আপাতত তোরঙ্গে তুলে রেখেছে। ইরানের জন্য সেটাও খুব মন্দ খবর নয়।

বছরের দ্বিতীয় বিপর্যয়, পাকিস্তানে তালেবানের হামলা, সে দেশের নিজের সৃষ্টি। ভারতের বিরুদ্ধে নিজস্ব ‘রিজার্ভ’ সৃষ্টির লক্ষ্যে সে দেশের গোয়েন্দা পুলিশের তত্ত্বাবধানে তালেবানের জন্ম। নিজের পোষা কালসাপ একসময় গৃহকর্তাকে ছোবল মারে। পাকিস্তানেও ঠিক সে ঘটনাই ঘটেছে। অনেকেই বলছেন, ১৬ ডিসেম্বর পেশোয়ারের বিদ্যালয়ে তালেবান হামলার যে প্রতিক্রিয়া হয়েছে, তাতে তালেবানের বিরুদ্ধে এক জাতীয় মতৈক্যের সম্ভাবনার জন্ম দিয়েছে। পাকিস্তানের সরকার, সেনাবাহিনী ও অধিকাংশ রাজনীতিক তালেবান ঠেকাতে এককাট্টা হয়েছেন।

অবশ্য এমন সম্ভাবনা পাকিস্তানে যে এই প্রথম সৃষ্টি হলো তা নয়। সে দেশে একদিকে সামরিক বাহিনী নিজেদের জায়গিরদারি টিকিয়ে রাখার জন্য তালেবান ও জিহাদি দলগুলোকে নিজেদের থাবার নিচে রাখতে চায়। অন্যদিকে, ইসলামি জোশের হুমকিতে ভীত রাজনৈতিক দলগুলো কে কার চেয়ে অধিক ধার্মিক, তা প্রমাণের প্রতিযোগিতায় লিপ্ত। ইমরান খানের মতো আপাত–আধুনিক রাজনীতিকও ক্ষমতা দখলের চেষ্টায় বিদেশ থেকে আমদানি করা জিহাদি নেতার জামার আস্তিন ধরে আছেন। ফলে, ১৬ ডিসেম্বরের মতো ট্র্যাজেডি সে দেশে আবারও যে ঘটবে না, সে কথা ভাবার কোনো কারণ আছে বলে আমার মনে হয় না।

ইবোলার দংশন আফ্রিকার ভেতর ও বাইরে ভীতির সৃষ্টি করেছে, এ কথা ঠিক। কিন্তু এই ভয়াবহ সংক্রামক ব্যাধির বিরুদ্ধে লড়াইতে যে আন্তর্জাতিক সংহতির প্রকাশ দেখা গেছে, তাতে অনেকেই আশান্বিত হয়েছেন। সিয়েরা লিওন বা লাইবেরিয়া দীর্ঘদিন গৃহযুদ্ধে পর্যুদস্ত, ক্লান্ত। ইবোলাকে পরাস্ত করার মতো লোকবল, অর্থবল কোনোটাই তাদের নেই। এই ব্যাধির মোকাবিলায় বিশ্বজুড়ে সাড়া মিলেছে। বিপদের আশঙ্কা আছে জেনেও ইউরোপ ও আমেরিকা থেকে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক স্বেচ্ছাসেবক ইবোলা-আক্রান্ত দেশগুলোতে পাড়ি দিয়েছেন।

ইবোলা ব্যাধির ঠিক পরপর নরেন্দ্র মোদির নাম উচ্চারণ সুবুদ্ধির পরিচায়ক না হতে পারে, কিন্তু আমার বিবেচনার এই হিন্দুত্ববাদী নেতার উত্থান কোনো অংশে কম ভীতিকর নয়। প্রযুক্তিগতভাবে আধুনিক ও অর্থনৈতিকভাবে উন্নত ভারত নির্মাণে মোদির অঙ্গীকার আশার কারণ। তাঁর এই ‘ভিশন’ সে দেশের মানুষকে বিজেপিমুখী করেছে। কিন্তু একই সঙ্গে মোদি নিজের হিন্দুত্ববাদী পরিচয় এগিয়ে ধরতে যে আগ্রহ দেখিয়েছেন, সে দেশের সংখ্যালঘুদের জন্য তা ভীতির কারণ। মোদি নিজের মুখে বলেননি, কিন্তু তাঁর দলের একাধিক নেতা এমন বিদ্বেষপূর্ণ প্রচার চালাতে পিছপা হননি যে ভারত শুধু হিন্দুদের দেশ। বিজেপি ও তার অঙ্গসংগঠনসমূহ মুসলমান, খ্রিষ্টান ও আদিবাসীদের নিজ নিজ ধর্ম বদলে হিন্দু ধর্মে রূপান্তরের যে আন্দোলন শুরু করেছে, বহু জাতি ও ধর্মভিত্তিক ভারতকে তা প্রগতির বদলে পশ্চাদ্মুখী করছে। এর প্রতিক্রিয়ায় শুধু ভারতে নয়, প্রতিবেশী বাংলাদেশ ও পাকিস্তানে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ছড়াতে পারে, জঙ্গিবাদ আরও মারমুখী হতে পারে।

আমার বিবেচনায় বিগত বছরের পঞ্চম দুর্বিপাক মার্কিন কংগ্রেসের উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ রিপাবলিকান পার্টির হাতে চলে যাওয়া। ২০১৪ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকান দলের বিজয় খুব অভাবিত কিছু ছিল না। ওবামা ২০০৮ ও ২০১২ সালে পর পর দুবার বিজয়ী হন এক বহুবর্ণের রংধনু ‘কোয়ালিশন’ নির্মাণ করে। এই কোয়ালিশনের অন্তর্গত ছিল ১৮ থেকে ৩০ বছর বয়সী নতুন ভোটার, কৃষ্ণাঙ্গ ও অন্যান্য সংখ্যালঘু ও দেশের নারী ভোটারদের বৃহদংশ। ডেমোক্রেটিক পার্টি এবার তাদের এই কোয়ালিশন ধরে রাখতে পারেনি। মধ্যবর্তী নির্বাচনে সব সময়ই ভোটার অংশগ্রহণ কম। এবার তা আরও কমেছে, কারণ এই কোয়ালিশন অনুপ্রাণিত হয়, এমন কিছুই এই দল করেনি।

উদাহরণ হিসেবে অভিবাসনের কথা ভাবা যাক। ওবামা ও ডেমোক্রেটিক পার্টি বরাবর বলে এসেছে, যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত সোয়া কোটি অবৈধ বহিরাগত ব্যক্তির নাগরিকত্বের পথ নিশ্চিত করতে তারা বদ্ধপরিকর। অথচ একটি স্বল্পমেয়াদি নির্বাহী ব্যবস্থা ছাড়া কোনো কিছুই তারা করেনি। ২০০৮ থেকে ২০১০ পর্যন্ত কংগ্রেসের উভয় কক্ষই ছিল ডেমোক্র্যাটদের দখলে। চাইলে অনায়াসেই তাঁরা সে সময় এই প্রশ্নে আইনগত ব্যবস্থা নিতে পারতেন। রিপাবলিকান সমর্থক, বিশেষত শ্বেতাঙ্গ নির্বাচকেরা ক্ষিপ্ত হবেন, এই আশঙ্কায় কোনো পদক্ষেপ গ্রহণে তাঁরা বিরত থাকেন। বিরক্ত ও আশাহত হিস্পানিকেরা, যারা ওবামার বিজয়ের পেছনে বড় শক্তি ছিল, ২০১৪ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে তারা ভোটকেন্দ্রেই আসেনি।

কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ রিপাবলিকানদের হাতে চলে যাওয়ার ফলে পরিবেশ, নাগরিক অধিকার, স্বাস্থ্যবিমা ইত্যাদি খাতে আমেরিকা যে অগ্রগতি অর্জন করেছে, তার অনেকটাই বিপদগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা আছে। ওবামা কিউবার সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনঃস্থাপন ও ইরানের সঙ্গে আণবিক শক্তি ব্যবহার প্রশ্নে শান্তিপূর্ণ সমাধানের উদ্যোগ নিয়েছেন, তাও হুমকির সম্মুখীন হতে পারে। তবে আশার কথা, এ দেশে প্রতি দুই বছর পর নির্বাচন হয়। ২০১৬ সালে আমেরিকা তার পরবর্তী প্রেসিডেন্ট নির্বাচন করবে। সঙ্গে সঙ্গে প্রতিনিধি পরিষদের সব সদস্য ও সিনেটের এক-তৃতীয়াংশ ভোটের সম্মুখীন হবে। এক মাঘে শীত যায় না—এ কথা বাংলাদেশে যেমন সত্যি, আমেরিকায়ও। নিজেদের ঘর সামলে উঠলে ডেমোক্র্যাটদের নিদেনপক্ষে হোয়াইট হাউস দখলে রাখা ও সিনেটের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাওয়া একদম অসম্ভব নাও হতে পারে।

Advertisements