Posts Tagged ‘left front’

Religious Fundamentalism & Fight Of The Left

October 30, 2015

ধর্মীয় মৌলবাদ ও বামপন্থীদের লড়াই

কৃষ্ণেন্দু রায়চৌধুরি

মরশুম উৎসবের, কিন্তু বেনজির ন্যক্কারজনক আক্রমণ তাল কেটেছে উৎসবমুখী মানুষের মেজাজে। সাম্প্রদায়িক শক্তির মাত্রাতিরিক্ত তৎপরতা এবং একই সঙ্গে ভারতীয় জনতা পার্টির নেতৃত্বাধীন দেশের সরকার। রাষ্ট্রের প্ররোচনা, উদাসীনতায় যে ন্যক্কারজনক ঘটনাগুলি দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ঘটে চলেছে অবিরত, তাতে ধ্বংস হচ্ছে দেশের ধর্মনিরপেক্ষ কাঠামো। গোবিন্দ পানসারে, নরেন্দ্র দাভোলকর, এম এম কালুবর্গীকে হত্যা, দাদরিতে প্ররোচনা ছড়িয়ে নৃশংসভাবে খুন, এমনকি শিল্প সংস্কৃতি জগৎও এই সাম্প্রদায়িক মেরুকরণধর্মী আক্রমণের হাত থেকে রেহাই পাচ্ছে না। পাকিস্তানের প্রাক্তন বিদেশ সচিবের বই প্রকাশ অনুষ্ঠান, জম্মু-কাশ্মীরের বিধায়কের প্রেস কনফারেন্স কিংবা ভারত-পাকিস্তান ক্রিকেট সিরিজ উপলক্ষে দু’দেশের বোর্ডের সভা আক্রান্ত ধর্মীয় মৌলবাদীদের দ্বারা।

দেশের গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা ও শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষার স্বার্থে সব ধরনের মৌলবাদী কার্যকলাপ বন্ধ করতে ও দে‍‌শের মানুষের ঐক্য, সংহতি ও সম্প্রীতির মেলবন্ধনকে দৃঢ় করার জন্য সমাজের সব অংশের মানুষের ঐক্যবদ্ধ প্রয়াস নেওয়া বর্তমান সময়ে সবচেয়ে জরুরি হয়ে পড়েছে। দেশের অগণিত মানুষ, যারা শান্তি চান, ধর্মনিরপেক্ষতার ঐতিহ্যকে অটুট রাখতে চান — মানুষের সেই ঐক্যবদ্ধ শক্তির প্রতিবাদে প্রতিরোধে গর্জে ওঠার সময় এখন। রাজ্যের বিশিষ্ট কবি, সাহিত্যিক, শিল্পীরা রাষ্ট্রপতিকে চিঠি পাঠিয়ে বলেছেন, ‘সাম্প্রতিককালে আমাদের দেশে হত্যা ও অসহিষ্ণুতার যে আবহ তৈরি হয়ে উঠেছে, তা নিয়ে আমরা পশ্চিমবঙ্গের শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষেরা সন্ত্রস্ত এবং অসহায় বোধ করছি। ক্রমাগত অবাধে আঘাত হানা হচ্ছে আমাদের মতপ্রকাশের স্বাধীনতার উপর। দেশের বিশিষ্ট নাগরিক, নিরপরাধ সাধারণ নাগরিকের হত্যায় শুভবুদ্ধিসম্পন্ন নাগরিক সমাজ স্তব্ধবাক। সরকারি নিষ্ক্রিয়তা ক্ষমার অযোগ্য

প্রশাসনিক অকর্মণ্যতা নাগরিকের মানবিক অধিকার খণ্ডিত করছে। স্বাধীন চিন্তার শ্বাসরোধের এই সুপরিকল্পিত ষড়যন্ত্রে ভারতীয় গণতন্ত্র বিপন্ন হয়ে পড়ছে। দেশের ‘লৌহপুরুষ’ প্রধানমন্ত্রীর মুখে কোন কথা নেই। দাদরি হত্যাকাণ্ড, যুক্তিবাদী লেখকদের উপর আক্রমণ, দেশের নানা প্রান্তে খোলাখুলি সাম্প্রদায়িক প্ররোচনার বিরুদ্ধে প্রতিনিয়ত প্রতিবাদ জোরালো হচ্ছে। দেশের বিশিষ্ট লেখক, বুদ্ধিজীবীরা সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার পুরস্কার ঘৃণাভরে ফিরিয়ে দিচ্ছেন। প্রধানমন্ত্রী দোষ চাপিয়ে দিচ্ছেন বিরোধীদের উপর– এটা আমাদের সর্বভারতীয় রাজনৈতিক সংস্কৃতির এক প্রহেলিকাদগ্ধ দিক ছাড়া আর কিছু নয়। আর এটাই এখনকার ভারতবর্ষের সবচেয়ে প্রকটিত সমাজনৈতিক-রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক দৈত্যদর্পী সমস্যা : ধর্মনিরপেক্ষতার সংকট– মানবিক ধর্মসত্তার বিপর্যয়। Ralph Fox যাকে বলেছেন: ‘Anarchy of capitalism in the human spirit’ — তৃণমূলে বুর্জোয়া সংস্কৃতির অরাজকতা কিংবা ‘Cultural terrorism of the ruling class’।

আমরা অধিকাংশই কম-বেশি Sick Society-র Sick product হয়ে পড়েছি। এর ফলে ভারতবর্ষের সমাজ-সভ্যতার অনুপম মুখশ্রী সাম্প্রদায়িক সমস্যার বিষগর্তে পাক খেতে খেতে রক্তাক্ত-ক্লিন্ন-ক্লেদাক্ত হয়ে যাচ্ছে। সাম্রাজ্যবাদের তীব্র কশাঘাতে রাষ্ট্র ও শাসকশ্রেণি Humanity বা মানবিকতা ভুলে সাম্রাজ্যবাদের ক্রীড়নকে পরিণত হয়েছেপ্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তা ও প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ মদতে ধর্মীয় মৌলবাদ ও গৈরিক ফ্যাসিবাদ উৎসাহিত হচ্ছে। Marx-Engels এর মতে, ‘…In reality and for the practical materialist, i.e, the communist, it is a question of revolutionizing the existing world, of practically attacking and changing existing things’.

(২)

সাম্প্রতিককালে আমাদের দেশের বর্তমান সামাজিক-অর্থনৈতিক কাঠামো থেকে উদ্ভূত অনেকগুলি চরম প্রতিক্রিয়াশীল বৈশিষ্ট্য বিশেষ জোরদার হয়ে উঠেছে। যেমন সাম্প্রদায়িকতা ও উগ্র জাতীয়তাবাদ, ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের প্রতি সযত্ন লালিত ঘৃণা, উচ্চবর্ণভিত্তিক পুরুষ আধিপত্যের মানসিকতা, সমাজের সাধারণভাবে দুর্বলতর অংশগুলির উপর এবং বিশেষভাবে গণতান্ত্রিক অধিকারের উপর ক্রমবর্ধমান আক্রমণ, যুদ্ধোন্মাদনা ও রাজনীতির সামরিকীকরণ, দুর্নীতি ও রাজনীতির দুর্বৃত্তায়ন, মুখে স্বাদেশিকতার বুলি আউড়ে কার্যত সাম্রাজ্যবাদ নিয়ন্ত্রিত অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের বাস্তবায়ন, ইত্যাদি।

এই প্রায় সবগুলি প্রতিক্রিয়াশীল বৈশিষ্ট্যের সমাহার হিসেবে যে পতাকাটি আজ আমাদের দেশে আন্দোলিত হচ্ছে তার রঙ ‘গৈরিক’। হিন্দুত্বের জয়ধ্বনি তুলে এই পতাকাটির দণ্ড ধারণ করে আছে রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সংঘ (RSS) ও তার শাখা সংগঠনগুলি। হিন্দুত্বের এই যন্ত্রটি ‘৪৭-পরবর্তী’ ভারতে আগে কোনদিন আজকের মতো প্রাসঙ্গিক ও ভয়াবহ তাৎপর্যসম্পন্ন হয়ে উঠতে পারেনি।

১৯৯২-এর ৬ই ডিসেম্বর বাবরি মসজিদ ধ্বংসের ঘটনা হিন্দুত্বের এই আগ্রাসী অভিযানের প্রথম পর্বের বিজয় সূচিত করেছিল। কেননা, ওই ধ্বংসকাণ্ডটি কতিপয় দুবৃর্ত্তের দুষ্কর্মমাত্র ছিল না, বরং তার পেছনে ছিল সেই হিন্দুত্বের রাজনীতির দীর্ঘ ইতিহাস, যার প্রতিটি অধ্যায়ে খোদিত ছিল আগ্রাসী সংকীর্ণতা ও সাম্প্রদায়িকতা, বহুত্ববাদী ভারতীয় সভ্যতা ও সংস্কৃতির অস্বীকৃতি, অন্য সম্প্রদায়ের, এমনকি ব্যাপক হিন্দু সম্প্রদায়ের ‘দলিত’ অংশের প্রতি ঘৃণা ও হিংসা এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের ঐতিহ্য ও আচার আচরণের প্রতি তীব্র অনীহা।

রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সংঘ ও তার প্রবক্তাদের প্রকৃতপক্ষে দুটি রূপ — একটি প্রকৃত মুখ, আরেকটি মুখোশ। তারা কথা বলে সম্পূর্ণ দুই পৃথক ভাষায়, কাজ করে দুই বিপরীত পদ্ধতিতে। সেই ভাষা গণতন্ত্রের, কর্মপদ্ধতি স্বৈরতন্ত্রের। একদিকে ঐকমত্যের, অন্যদিকে বলপ্রয়োগের। হিন্দুত্বের রাজনীতির ধারক ও বাহক এই সংঘ পরিবারের মূল কেন্দ্রে রয়েছে RSS ও তার রাজনৈতিক সংগঠন ভারতীয় জনতা পার্টি (BJP)। অন্যদিকে RSS নিজে এবং বিশ্ব হিন্দু পরিষদ, বজরং দল প্রভৃতি জানা-অজানা অসংখ্য অঙ্গপ্রত্যঙ্গ এই কাঠামোটিকেই যেনতেন প্রকারেণ ধ্বংস করতে চায়।

সংঘ পরিবারের এই একইসঙ্গে পরিপূরক ও পরস্পরবিরোধী বিভিন্ন অঙ্গের জটিল টানাপোড়েনের স্বাভাবিক পরিণতি ছিল বাবরি মসজিদ ধ্বংসের ঘটনা। একইসঙ্গে তা উদ্‌ঘাটিত করে দিয়েছিল বি জে পি-র সযত্ন-সৃষ্ট তথাকথিত গণতান্ত্রিক বাতাবরণের অন্তঃসারশূন্যতার এবং তার অন্তরালবর্তী চরম হিংস্রতার প্রকৃত স্বরূপ। হিন্দুত্বের এই হিংস্র অভিযানের অন্তর্নিহিত দর্শনের প্রণেতা ও ভাষ্যকার স্বাভাবিকভাবেই তার মস্তিষ্ক অর্থাৎ RSS। অবশ্যই তাদের দাবি- আর এস এস রাজনৈতিক নয়, বরং একটি সাংস্কৃতিক সংগঠন। হিন্দুদের সংস্কৃতির সংস্কারের মাধ্যমে নিজের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সম্পর্কে সচেতন হিন্দু-আত্মপরিচয়ের জন্ম দেওয়াই তাদের লক্ষ্য।

এই তথাকথিত সাংস্কৃতিক কর্মসূচি আসলে গভীরভাবে রাজনৈতিক। এই কর্মসূচির অন্তর্নিহিত আগ্রাসী ও প্রাতিষ্ঠানিকতামুখী হিন্দুত্বের রাজনীতির করাল ছায়া সমাজের প্রতিটি ক্ষেত্রে আজ প্রসারিত। সাঁড়াশির মতো তা আষ্টেপৃষ্টে বেঁধে ফেলেছে আমাদের সমাজ ও রাজনীতিকে। আমাদের বাস্তব জীবনকে, আমাদের অস্তিত্বকে, সংস্কৃতি, শিক্ষা, সংবাদমাধ্যম, আমলাতন্ত্র, পুলিশ, সামরিক বাহিনী প্রভৃতি রাষ্ট্রীয় ও রাষ্ট্র-বহির্ভূত সমাজের প্রতিটি স্তরে ঘটছে তার অনুপ্রবেশ। চলছে তার সার্বিক আধিপত্য বিস্তারের প্রচেষ্টা।

প্রথমে তেরোদিন, তারপর তেরো মাস, পাঁচ বছর হয়ে এবার একক ক্ষমতায় পরবর্তী পাঁচ বছর রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখলের সুযোগ তার এই করাল বন্ধনকে আরো বেশি আগ্রাসী ও ভয়াবহ করে তুলেছে। সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতিটি গণতান্ত্রিক ঐতিহ্যের ও মূল্যবোধে এবং সরকারি, বেসরকারি সংগঠনে তার প্রভাব ধরা পড়েছে। হিন্দুত্বের মন্ত্র আওড়ানো এই ধর্মীয় ফ্যাসিবাদের আগ্রাসী অভিযান অবাধে চলতে থাকলে তার সম্ভাব্য পরিণতি কী বীভৎস ও ভয়ঙ্কর হতে পারে সেকথা চিন্তা করে ন্যূনতম গণতান্ত্রিক চেতনাসম্পন্ন যে-কোনো মানুষই শিউরে উঠছেন। শহীদ বিরসার হাত ধরে যে শতাব্দীর সূচনা, যে শতক দেখেছে অগ্নিযুগের আত্মদান, ভারত-ছাড়ো আন্দোলন আর নৌ-বিদ্রোহ, সাক্ষী থেকেছে শোলাপুর-তেভাগা-তেলেঙ্গানা-সাঁওতাল এবং আরও কত মহান গণজাগরণের। তার অন্তিমে আজ ভারতভাগ্যবিধাতার আসনে অধিষ্ঠিত গেরুয়াধারী বকধার্মিকরা।

ভারতীয় রাষ্ট্রক্ষমতায় ফ্যাসিবাদ এখনো জাঁকিয়ে বসতে পারেনি — বি জে পি-কে এখন গৈরিক রঙ-এর পেছনে ফ্যাসিবাদ প্রতিষ্ঠার প্রস্তুতি চালাতে হচ্ছে। যে দেশে পুঁজিবাদ দূরের কথা, সামন্ততন্ত্রও ইউরোপীয় ধরনে ও মাত্রায় বিকশিত হয়নি, সেখানে ফ্যাসিবাদের শ্রেণী-ভিত অতী‍‌তের ইতালি বা জার্মানির মতো হতে পারে। বি জে পি কেন্দ্রীয় ক্ষমতার সুবাদে হাতে নিয়েছে মৌলিক কিছু কাজ। যেমন, ফ্যাসিস্ত দৃষ্টিকোণ থেকে রাষ্ট্রের ইতিহাস পালটে লেখা, সংবিধান সংশোধন, শিক্ষা-সংস্কৃতির গৈরিকীকরণ ও হিন্দু মৌলবাদের পৃষ্ঠপোষকতা। দেশে এখন একটা কথা প্রায়ই শুনতে পাওয়া যায়, কথাটা হলো ধর্মীয় ফ্যাসিবাদ। দেশের জাতীয় গণতান্ত্রিক মোর্চার যে সরকার, সেই সরকারের প্রধান শরিক হলো ভারতীয় জনতা পার্টি। বর্তমান যিনি দেশের প্রধানমন্ত্রী তিনি এই দলের প্রধান নেতা। প্রসঙ্গটা হলো বি জে পি ধর্মের নামে, গেরুয়া রঙের আড়ালে ফ্যাসিবাদ কায়েম করার চেষ্টা করছে। বি জে পি-র অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক অ্যাজেন্ডা ‘হিন্দুত্ববাদ’কে বাস্তবায়িত করা।

(৩)

নরেন্দ্র মোদীর শাসনের এক বছর পর এটা বুঝতে কষ্ট হবার কথা নয় যে ধর্মীয় মৌলবাদ, গৈরিক ফ্যাসিবাদ দি‍য়ে বলীয়ান হয়ে তাঁরা চান দেশের মানুষের উপর সীমাহীন শোষণ নামিয়ে এনে ধনীদের আরও ধনী করতে, পুঁ‍‌জির মালিকদের বাড়তি সুবিধা পাইয়ে দিতে, সর্বোপরি আমেরিকান সাম্রাজ্যবাদ নির্দেশিত নয়া উদারনীতির রথযাত্রার পথ মসৃণ করতে। সহজ করে বলা যায়– আমাদের দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠের মৌলবাদের মূল ধারা হলো ধর্ম নিয়ে ধুয়ো তুলে নিজেদের শাসন ক্ষমতার পথ সুগম করা ও তার মাধ্যমে এদেশকে আন্তর্জাতিক পুঁজির লুটের ক্ষেত্র করে তোলার পথ আরও প্রশস্ত করা। এর জন্য সংখ্যালঘু-জুজু তৈরি করে ক্ষমতা দখল এবং এদেশকে আন্তর্জাতিক পুঁজির মৃগয়াক্ষেত্র বানানো। এর জন্য প্রয়োজন ইতিহাস-বিকৃতি, প্রগতিশীল লেখক, দরিদ্র মানুষ, নিরপরাধ শিশু এমনকি মুসলিম বুদ্ধিজীবী বিধায়কদের আক্রমণ, হত্যা। এদের আসল শত্রু হলো- শ্রেণী রাজনীতি, বামপন্থা, মার্কসবাদ

নয়া উদারবাদের বিরুদ্ধে বামপন্থীদের নেতৃত্বে মেহনতি মানুষ বিক্ষোভরত। ধর্মের নামে তাদের ভাগ করে এই আন্দোলনকে দুর্বল করার চেষ্টা চলছে। বামপন্থীরা মেহনতি মানুষকে জোটবদ্ধ করে। বামপন্থা হলো ইতিহাসকে বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখার একটা জোরালো মতাদর্শ। সেই মতাদর্শ সমাজে প্রোথিত করতে পারলে সমাজে মৌলবাদীরা দুর্বল হয়ে পড়বে। তাই মেহনতি মানুষের সংগ্রাম বন্ধ করতে, বামপন্থী গণ-আন্দোলনকে স্তব্ধ করতে চারদিক থেকে আক্রমণ চলছে। ভারতের রাজনীতিতে ধর্মীয় মৌলবাদ হলো একটি রাজনৈতিক তাস। বি জে পি-র পক্ষে হিন্দু মৌলবাদী তাস ছাড়া অন্য কোন তাস খেলা সম্ভব নয়।

নীতিগতভাবে ধর্মনিরপেক্ষ হতে পারে একমাত্র শ্রমজীবী শ্রেণী, কেননা শ্রেণীর স্বার্থ রক্ষা করার উপায়ই হলো ধর্মনিরপেক্ষ হওয়া। শ্রমজীবী শ্রেণীর দল সেই অর্থে ধর্মনিরপেক্ষ। মৌলবাদ, গৈরিক ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে আন্দোলন সংহত করতে হলে বুর্জোয়া শ্রেণী ও তার দলের বিরুদ্ধে সংগ্রামে নামতে হবে এবং সেটা কেবলমাত্র শ্রমজীবী শ্রেণীর দলগুলির পক্ষেই সম্ভব। শ্রমজীবী মানুষের লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে সামনে উঠে আসবে যেসব গণতান্ত্রিক ও দেশপ্রেমিক শক্তি, তারা হাত মেলাবে বামপন্থীদের সঙ্গে। তাদের নিয়ে একেবারে নিম্নস্তর থেকে গড়ে উঠবে মৌলবাদ-ফ্যাসিবিরোধী মঞ্চ।

সাম্প্রদায়িকতা, উদারীকরণ, বেসরকারিকরণ-সহ বি জে পি সরকারের জনবিরোধী নীতিগুলির বিরুদ্ধে দ্বিধাহীন নিরবচ্ছিন্ন লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে বামপন্থীরা। জনগণের জীবন-জীবিকার সংগ্রাম, গণতন্ত্রের জন্য সংগ্রাম, সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী সংগ্রাম, দেশের মর্যাদা ও সার্বভৌমত্ব অক্ষুণ্ণ রাখার সংগ্রাম অব্যাহত গতিতে আরও প্রসারিত, আরও শক্তিশালী করে তোলাই বর্তমান সময়ে বামপন্থীদের মূল কর্তব্য। নরেন্দ্র মোদী সরকারের জনবিরোধী-দেশবিরোধী কাজের বিরোধিতাই শুধু নয়, সমগ্রভাবে শাসকশ্রেণির ও সাম্রাজ্যবাদী শক্তির প্রতিস্পর্ধী হোক বামপন্থা।

Advertisements

Mamata’s Retrograde Policy

May 23, 2015

382519

Mamata’s Conspiracy Theory

April 21, 2014

350661

Unimaginable Electoral Fraud

August 30, 2013

330516

Panchayat Vote (2013) Collage

August 3, 2013

Vote Loot – Picture 1

vote-loot-1

 

327930

 

Vote Loot – Picture 2

vote-loot-2

 

328036

 

328026

 

Vote Loot – Picture 3

vote-loot-3

 

Vote Loot – Picture 4

vote-loot-4

Bengal Today

July 15, 2013

কেমন আছে বাংলা?

পরান মাঝি

১।। দেখছি …আলু নিয়ে বসে আছেন কৃষক। কোথায় বিক্রি করবেন, জানা নেই তাঁর। ধান ফলেছে জমিতে। কাটা হয়ে গেছে। বিক্রি হবে কোথায়? কৃষক জানেন না। পাট ফলেছে। তারপর? বাজারটা কোথায়? কিনবে কে? শশা রাস্তায় ফেলে দিতে হয়। বিক্রি হয় না। টমেটো গাড়ির চাকার তলায় থেত্‌লে যায় জাতীয় সড়কে। বিক্রি হয় না। কৃষক আত্মহত্যা করেন। কৃষিমন্ত্রী-খাদ্যমন্ত্রী বলেন, ‘‘মিথ্যে কথা। কেউ মরে নি।’’ মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘‘মাত্র ১ জন মরেছে।’’ সরকার আদালতে হলফনামা পেশ করে মুখ্যমন্ত্রীর কথাকেও মিথ্যে প্রমাণ করে। সেখানে বলা হয় এরাজ্যে একজন কৃষকও আত্মহত্যা করেননি! ওদিকে বাস্তবে দেখা যায় ৮২ জন কৃষক এরাজ্যে আত্মহত্যা করেছেন ফসলের দাম না পেয়ে, এই ২ বছরে। এবং এভাবেই চলছে এখন আমাদের পরিবর্তিত বাংলা।

মন্বন্তর দেখেছে বাংলা। কিন্তু এমন ভয়ঙ্কর কৃষক-মৃত্যু দেখেনি কোনও দিন। মাঠে মাঠে সবুজ ফসল অথচ বিক্রি করার উপায় নেই। মা-মাটি-মানুষের সরকার চলছে এখন। আর তারই পরিণতি দেখছি আমরা। মাত্র ২ বছরেই কী হাল হয়েছে সোনার বাংলার!

গ্রামের পর গ্রাম উজাড় হয়েছে কয়েকটা বদমাইশ চিট ফান্ড মালিকের কারসাজিতে। সারদা তার প্রধান। গরিব মানুষের কাছ থেকে টাকা তুলে সেই টাকায় ফুর্তি করেছে কতগুলো শয়তান। তৃণমূলের নেতা-মন্ত্রী-মুখ্যমন্ত্রী-সাংসদ—তাঁদের পোষা গুণ্ডা-পেয়াদা-আমলা-সাংবাদিক-নাচিয়ে-গাইয়ে-বলিয়ে-কইয়ে-আঁকিয়ে-লিখিয়ে-বাজিয়ে-লাফিয়ে—সবাই, সব্বাই সেই টাকায় ফুর্তি করেছে। কার টাকায়? ওই টাকা কাদের? কাদের টাকায় সারদার এতো হোটেল-রিসর্ট-সিনেমা-ইভেন্ট-প্রাইজ? তৃণমূলের দপ্তরে নেতা-মন্ত্রীর পকেটে কত টাকা গেছে? কাদের টাকায় খবরের কাগজ-টিভি চ্যানেল? চিট ফান্ডের মালিকের নিজস্ব টাকায় হয় এসব? কোন্‌ গরিবের টাকা? তারপর যখন খুশি, যেমন খুশি সেই টাকা নিজের করে নিয়ে, ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধ করে দিয়ে, আমানতকারীর টাকা ফেরত না দিয়ে চম্পট দিলেই হয়ে গেল? সরকার আছেন — সব দেখে-শুনে ব্যবস্থা করে দেবেন? বাঃ।

কতজন আমানতকারী-এজেন্ট আত্মহত্যা করেছেন? সংখ্যাটা কত? এই দায় কার? এই মৃত্যুর দায় কার? কেন এতগুলো লোক মরে গেলেন? সুদীপ্ত সেনের চিঠিতে যাঁদের নাম ছিল, কেন তাঁদের জেরা পর্যন্ত করা হলো না? মা-মাটি-মানুষ, মা-মাটি-মানুষ বলে হদ্দ হয়ে গেলেন মুখ্যমন্ত্রী, আর যে এতগুলো গরিব আত্মহত্যা করলেন, তাঁরা মানুষ নন? তাঁদের মা নেই? তাঁদের বুকের রক্ত জল করা পয়সা ‍‌তিলে তিলে সঞ্চিত হয়ে চিট ফান্ডের বিপুল সম্পত্তি হয়েছে। সেই টাকায় পার্টি-ফুর্তি-চ্যানেল-দলবাজি! লজ্জা করে না! গ্রামের পর গ্রাম উজাড় হয়ে গেল, মুখ্যমন্ত্রী দেখতে পান না?

এখানে এখন কেউ কিছু বলতে পারেন না? মুখ্যমন্ত্রীর এক অনুপম নিদান আছে—চুপ! ফলে সবাই চুপ করেই থাকে। যদি কেউ মুখ ফস্‌কে কিছু বলে ফেলেন, মুখ্যমন্ত্রী সঙ্গে সঙ্গে বিধান দেন—ওকে ধর! ধর ওকে! ওটা মাওবাদী! ওটা সি পি এম! প্রভুর নির্দেশে পেয়াদারা লাফিয়ে পড়ে। মুখ্যমন্ত্রীর বাইকবাহিনী সক্রিয় হয়। ঘাসফুলের ঝাণ্ডা আর পেয়াদার ডাণ্ডা কার্যকরী হয়। মুখ্যমন্ত্রী তৃপ্তির হাসি হেসে বলেন, দেখলেন তো ধরে দিলাম। আমি মাওবাদী আর সি পি এম দেখলেই চিনতে পারি। হুঁ হুঁ বাবা! ২৬ দিন চকোলেট খেয়ে অনশন করেছি। আমার চোখকে ফাঁকি দেওয়া অত সহজ নয়! তবুও প্রতিবাদ হয়।

২।। শুনছি …

২০১২ সালের ৬ই সেপ্টেম্বর মহাকরণে দাঁড়িয়ে মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছিলেন, কোনও নাবালিকা যদি ধর্ষিত হয় তবে ৩০ হাজার টাকা আর্থিক সাহায্য পাবে এবং কোনও প্রাপ্তবয়স্ক মহিলার ক্ষেত্রে ক্ষতিপূরণের পরিমাণ হবে ২০ হাজার টাকা। পরদিন ৭ই সেপ্টেম্বরের কাগজে আমরা জেনেছিলাম, মন্ত্রিসভার বৈঠকে এমনই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এবং এই মর্মে একটা বিল আসছে। ধর্ষণে ক্ষতিপূরণ!

বারাসতের মেয়েটা খুন হওয়ার পর রাজ্যের খাদ্যমন্ত্রী সেই মেয়ের পাড়ায় গিয়েছিলেন ক্ষতিপূরণ দিতে। সঙ্গে চাকরিরও টোপ ছিল। কামদুনির মেয়েটাকে ধর্ষণ করে খুন করা হয়েছে। অভিযুক্তদের একজন তৃণমূল। তার আত্মীয় পঞ্চায়েত নির্বাচনে তৃণমূল প্রার্থী। দিদির দলের সম্পদ এরা সবাই

দিদির স্নেহধন্য ভাই!

মুখ্যমন্ত্রী প্রথমে ১৫ দিন তারপর ২৫ দিন তারপর … হাবিজাবি কত কী বললেন। তাঁর দক্ষ পেয়াদারা এখনও একটা সম্পূর্ণ চার্জশিট দিয়ে উঠতে পারলো না। কিন্তু চাকরি-ক্ষতিপূরণের টোপ নিয়ে চারজন মন্ত্রী ঘুরঘুর করছেন এখনও। এখন মৃতার ভাইকে ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট খুলতে বলছেন এক মন্ত্রী।

দারিদ্র্য নজরুলকে মহান করেছিল। তিনি লিখেছিলেন সেকথা। বারাসতের মেয়েটাও দরিদ্র ছিল। তার বাবা-মা অনেক কষ্ট করেই লেখাপড়া শেখাচ্ছিলেন তাকে। মেয়েটা ক‍‌লেজে যাচ্ছিল। তার বাড়িতে সে-ই ছিল প্রথম প্রজন্মের পড়ুয়া।

গরিব মানুষের পয়সা থাকে না। কিন্তু আত্মমর্যাদাবোধটা প্রখর থাকে। তাঁদের ছেলে-মেয়েগুলো দু’বেলা পেট ভরে খেতে পায় না, তাও ভিক্ষে করে না। সেই মন্বন্তরের সময় দলে দলে না খেয়ে মরেছে, তবু ছিনিয়ে খায়নি। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় লিখেছিলেন, কেন? মুখ্যমন্ত্রী আর তাঁর দলবল এসব জানেন না তাই নিরন্তর টোপ নিয়ে ছুঁক ছুঁক করেন। এবং যদি কেউ সেই টোপ গিলতে অস্বীকার করেন, তাতেই ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন মুখ্যমন্ত্রী। বাগে আনা গেল না যে! বশ করা গেল না। কামদুনির মেয়েরা তো এটাই স্পষ্ট করেছে। তাতেই তো দিদির এতো রাগ! তিনি সবাইকে চুপ করিয়ে রেখে একা অনর্গল বকে যাবেন। অন্যে কেন কইবে? ব্যস্‌! গোয়েন্দা রিপোর্ট বেরিয়ে গেল, ওই মেয়েগুলো সি পি এম-র সাজানো! একটা মেয়েকে ধর্ষণ করে মেরে ফেলা হলো, তার শাস্তি চেয়ে মেয়েটার বন্ধুরা দিদিকে বলতে গিয়ে সি পি এম-মাওবাদী হয়ে গেল, গোয়েন্দারা সেই রিপোর্টও তৈরি করে ফেলতে পারলো, অথচ ধর্ষণ করে খুনের ঘটনার একটা পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট হলো না!

৩।। জানছি …

জুলাই মাসের ৬ তারিখে মমতা ব্যানার্জি জয়নগরে গিয়েছিলেন ভাষণ দিতে। সেখানে তিনি বলেছেন, ‘‘অনেক কাজ করেছি।’’ তারপর দর্শকদের উদ্দেশে প্রশ্ন ছুঁড়েছেন পরপর ২ বার — বাকি আছে কোনটা? বাকি আছে কোনটা? উত্তর এসেছে কিছু বাকি নেই আর। অর্থাৎ, সব কাজ হয়ে গেছে। কী কাজ করার ছিল এবং কোন কাজটাই বা হয়ে গেছে, এসব অবশ্য জানার উপায় নেই। তা এক ঘন রহস্যে ঢাকা। ফলে, দর্শকদের দিয়ে অতি সহজেই আর কিছু বাকি নেই বলিয়ে নিতে পেরেছেন মমতা ব্যানার্জি। এবং তারপর আবার তাঁর প্রশ্ন, ‘‘কি পাহাড়ে বেড়ানো বন্ধ হয়ে গিয়েছিল তো? কি পাহাড়ে বেড়ানো বন্ধ হয়ে গিয়েছিল তো?’’ জয়নগরের দর্শকদের উত্তর দিয়েছেন, হ্যাঁ! মমতা ব্যানার্জি তৃপ্ত হয়েছেন। পাহাড়ে হাসি ফুটেছে। তারপর তিনি বলেছেন মন্দারমণি আমি তৈরি করে দিয়েছিলাম।

শ্রীরামকৃষ্ণ বলতেন, ‘‘আমির আঁশটে গন্ধ’’। এটাই যেন এখন প্রতিভাত হয় সর্বত্র। জয়নগরেও তার অন্যথা দেখা গেল না। মমতা ব্যানার্জি বললেন, ‘‘আমি আছি বলেই সব কাজ হচ্ছে।’’ মমতা ব্যানার্জি বললেন, ‘‘আমি এতটাই জেদি।’’ মমতা ব্যানার্জি বললেন, ‘‘আমি ভাঙি তবু মচকাই না।’’ অনর্গল আমি’র স্রোত—আমি ঘরের কাজ খুব ভালবাসি। আমি রাঁধতেও জানি। আমি মাইনে নিই না। আমি সরকারের পয়সায় এককাপ চাও খাই না। আমার চল্লিশটা বই আছে—ইত্যাদি! ইত্যাদি!

এই যে এতো ‘‘আমি’’র প্রচার এর সঙ্গে রাজ্য চালানোর সম্পর্ক কী? তিনি এতো কিছু পারেন-করেন, তাতে রাজ্যের লোকের কী?

আসলে এই এতো ‘‘আমি’’-র দাপট অন্য কারণে। মমতা ব্যানার্জি গণতন্ত্রে বিশ্বাস করেন না। তাঁর মতটা অন্যকে দিয়ে স্বীকার করিয়ে নেওয়াতেই স্বচ্ছন্দ তিনি। এতো আমি-আমি-র অর্থ, তিনি যা বলবেন সেটাই শেষ কথা। এই স্বৈরতান্ত্রিক এক নায়কের ভঙ্গি আমরা সব সময়েই প্রত্যক্ষ করছি। তিনি কলকাতার পুলিস কমিশনারকে দিয়ে বলিয়েছিলেন পার্কস্ট্রিটে ধর্ষণ হয়নি। ডিজি-কে দিয়ে বলিয়েছিলেন, কাটোয়ার ধর্ষণ হয়নি। সি আই ডি-কে দিয়ে বলিয়ে নিয়েছেন, কামদুনির মেয়েরা সি পি এম। নিজের দলের নেতা-মন্ত্রীদের দিয়ে তো যা খুশি তাই বলাচ্ছেন। মঞ্চে ডি এম-এস পি-দের দিয়েও নিজের কথা বলিয়ে নিচ্ছেন। এখন জনসভায় তৃণমূল সমর্থকদের দিয়ে বলাচ্ছেন — কোন কাজটা বাকি আছে? কোনটা বাকি আছে? উপস্থিত জনতা বলছেন, ‘‘কোন কাজ বাকি নেই।’’ ব্যস—আর কিছু বলারও নেই। এখন শুধু দেখার আছে। আর শোনার আছে, ‘‘১০০ দিনের কাজ হয়ে গেছে। দে‍শের মধ্যে আমরা ১ নম্বর। ১০০ দিনের কাজ হ‍‌য়ে গেছে। এবার ২০০ দিনের কাজ হবে। ‘‘আরও শোনার আছে, ‘‘জঙ্গলমহলে চাল দিতে ৪০০০ কোটি টাকা ব্যয় হয়।’’

বাস্তব বলে অন্য কথা। জঙ্গলমহলে যে চাল দেওয়া হয় তা বরাদ্দ করে কেন্দ্র। আর ১০০ দিনের কাজ? জঙ্গলমহলেই ৬/৭ দিন থেকে কারো কারো জুটেছে ১২/১৩ দিন। আর একেবারে নিচের দিকে সাগরের গ্রামেও তাই। আবার এর বিপরীত চিত্র-ও আছে। জবকার্ড হাতিয়ে নিয়ে কাজের নামে টাকা তুলে নিচ্ছে তৃণমূলের লোকেরা। এরই পাশাপাশি একটা খবরের উদ্ধৃতি দেওয়া যাক :—

‘‘পঞ্চায়েত নির্বাচনের আগে ১০০‍ দিনের কাজের প্রকল্পের টাকা খরচে নিয়ন্ত্রণ আনছে রাজ্য সরকার। ইতোমধ্যেই প্রতিটি জেলাকে এই প্রকল্পের টাকা খরচে নজরদারি চালানোর জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। রাজনৈতিক মহল মনে করছে, এই মুহূর্তে রাজ্যের ৬৫ শতাংশের বেশি গ্রাম পঞ্চায়েত সি পি এমের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। পঞ্চায়েত ভোটের আগে সি পি এম পরিচালিত গ্রাম পঞ্চায়েতগুলি যাতে এই প্রকল্পে অতিরিক্ত টাকা খরচ করে বাড়তি সুবিধা না পেতে পারে, সেই কারণেই রাজ্য সরকার এই নিয়ন্ত্রণ শুরু করেছে।’’

জানুয়ারির ৭ তারিখের ‘‘বর্তমান’’ পত্রিকায় এই সংবাদ প্রকাশ পেয়েছে। খেয়াল করে যদি দেখা যায় তাহলে মনে পড়ে যাবে, মুখ্যমন্ত্রী ডি এম, বিডিও-দের দিয়ে মহাকরণে বসে পঞ্চায়েত চালাবেন বলে ঘোষণা করেছেন। গ্রাম বাংলা কেমন থাকবে তা তিনিই ঠিক করবেন। পঞ্চায়েতের নির্বাচিত প্রতিনিধিরা নন। ক্ষমতার কেন্দ্রে থাকবেন তিনি। সব থাকবে তাঁর কুক্ষিগত। গণতন্ত্র বা বিকেন্দ্রীকরণ এখানে অর্থবহ হবে না। মুখ্যমন্ত্রীই যে সব। মমতা ব্যানার্জি ৬ই জুলাই জয়নগরের মিটিং-এ পরিষ্কার বলে দিয়েছেন, ‘‘জেলা পরিষদ যে তৈরি হবে আমি নিজে কাউন্সেলিং করব।’’ আর টাউন হলের সেই ঐতিহাসিক সভায় তিনিতো বিডিও‍‌-দের তাঁর মোবাইল নম্বর দিয়েই দিয়েছেন এবং বলেওছেন সব সময় যোগাযোগ রাখতে। ফলে আর তো কোনও অসুবিধে নেই। পঞ্চায়েতটাও চলবে কলকাতা থেকেই। সেখানে কী পরিকল্পনা, কী উন্নয়ন, কী যোজনা অথবা গরিব মানুষ কাজ পাচ্ছেন না আত্মহত্যা করছেন—এসব ফালতু বিষয় নিয়ে অত মাথাব্যথাই নেই মমতা ব্যানার্জির। তাই, সি পি এম পরিচালিত পঞ্চায়েত ১০০ দিনের কাজের প্রকল্পে টাকা খরচ করায় সরকার‍‌ যে নিয়ন্ত্রণ আনবেন তাতে আর আশ্চর্যের কী? এই পরিস্থিতিতেই প্রথম দফার পঞ্চায়েত ভোট হয়ে গেল।

৪।। ভাবছি …

মাওবাদী নেতা কিষেনজী মমতা ব্যানার্জিকে মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে দেখতে চেয়েছিলেন। মুখ্যমন্ত্রী হয়েই মমতা ব্যানার্জি কিষেনজী-কে মেরে ফেলতে সক্ষম হয়েছেন। তাঁর দলের সাংসদরা দিল্লিকে বলেছেন, দেশে মাওবাদী দমনে মমতা মডেল প্রয়োগ করতে। আর মমতা ব্যানার্জি বলেছেন, সি পি এম-কংগ্রেস-বি জে পি এবং মাওবাদীরা মিলে তাঁকে খুনের চক্রান্ত করেছে! কী কাণ্ড!

মমতা ব্যানার্জি মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার আগে যখন জঙ্গলমহলে যেতেন, তখন তিনি ছত্রধর মাহাতোর বাইকে চেপেই যেতেন। তখন বলতেন ‘‘কোথায় মাও? মাও ফাও কিছু নেই।’’ শুধু তিনি নন, ত‌াঁর অনুগত বুদ্ধিজীবীরাও সেদিন ছত্রধরের আঙিনায় পাতা মাদুরে বসে বলে এসেছিলেন, ‘‘কোথায়? মাওবাদী তো দেখলাম না বাবা।’’ এখানেই শেষ নয়, জ্ঞানেশ্বরী এক্সপ্রেসের সেই বিস্ফোরণের পরও মুখ্যমন্ত্রী এবং তাঁর অনুগত বুদ্ধিজীবীরা চিৎকার করেছিলেন, ‘‘এটা সি পি এমের কাজ!’’ তারপর ২০১১ সালে মমতা ব্যানার্জি মুখ্যমন্ত্রী হলেন। ছবিটা এবং চিৎকারের বয়ান গেল পালটে। দফায় দফায় মাওবাদীরা সেজে-গুজে হাজির হয়ে গেলেন মহাকরণের অলিন্দে। গর্বিত মুখ্যমন্ত্রী ‘‘মাওবাদী’’দের মাফ করে দিলেন। তাঁদের চাকরি হলো হোমগার্ডে। কত নাম। সুচিত্রা-জাগরী-শশধর-খগপতি-বুদ্ধেশ্বর-নিরঞ্জন-ললিত-জগা-সুখেন্দ্র-ক্ষমানন্দ-প্রবীর-হামলেট-দুলাল-জ্যোতিপ্রসাদ-বাদল-অমিয়-সুনীল-অজিত-স্বপন-বিনয়-অনিল—এতো এতো মাওবাদী ছিল। সবাই এখন আত্মসমর্পণ করে পাউডার মেখে দিব্যি চাকরি করছেন অথবা তৃণমূলের হয়ে পঞ্চায়েতের ভোটে দাঁড়াচ্ছেন! মমতা ব্যানার্জি বলেছিলেন, ‘‘এখানে মাও ফাও কিছু নেই। সি পি এম-ই মাও।’’

তবে যে এখন শুনি, মমতা ব্যানার্জি এবং তাঁর আরও কয়েকজন সাংসদ-মন্ত্রীকে নাকি মাওবাদীরা খুনের হুমকি দেয়! এজন্য নিরাপত্তা বলয় তৈরি হয় তাঁদের ঘিরে এবং বিহার-ঝাড়খণ্ডে মাওবাদী নাশকতা হলে এখানে সতর্কতা জারি হয়—কেন? মাও ফাও বলে তাহলে কিছু আছে নাকি? কী বলেন তাঁর অনুগত আত্মহারা বুদ্ধিজীবীরা? ওই যে জ্ঞানেশ্বরী এক্সপ্রেসে বিস্ফোরণ হলো, তাতে জড়িতদেরই মুখ্যমন্ত্রী চাকরি দিয়েছেন। তিনি অবশ্য বলেন, হাসি ফুটিয়েছেন। ওই লোকগুলো কারা?

২০০৭ সালের ৭ই জানুয়ারি নন্দীগ্রামের সি পি আই (এম) কর্মী শঙ্কর সামন্তকে খুন করেছিল কারা? কিষেনজী বলেছিলেন ‘‘নন্দীগ্রামের আন্দোলনে প্রথম সারিতে’’ তাঁরা ছিলেন। শঙ্কর সামন্তকে কুপিয়ে খড়ের গাদায় আগুন জ্বালিয়ে, সেই আগুনে ছুঁড়ে ফেলা হয়েছিল। খোকন শিট নামে একজন তার নেতৃত্বে ছিল। সে এবার তৃণমূলের প্রার্থী!

মমতা ব্যানার্জি এখন খুব চিৎকার করেন ‘‘সি পি এম-কংগ্রেস-বি জে‍‌ পি এবং মাওবাদীরা’’ তাঁকে খুনের চক্রান্ত করেছে। বিচিত্র কল্পনাশক্তি মাননীয়ার। তিনি গত ১৮ই জুন গাইঘাটার এক জনসভায়, তাঁর প্রাণনাশের যে চেষ্টা হয়েছিল আগের দিন তা বলেছিলেন। অর্থাৎ ১৭ই জুন। যেদিন তিনি কামদুনিতে গিয়েছিলেন, সেদিনই তিনি কামদুনির মেয়েদের দেখে চিনতে পেরেছিলেন সি পি এম এবং মাওবাদী বলে। এবং —

‘‘… ১৭ই জুন কামদুনিতে তাঁর প্রাণনাশের চেষ্টা হয়েছিল। পুলিসের কাছ থেকেই তিনি এই প্রাণনাশের চক্রান্তের কথা জানতে পেরেছেন বলে সভায় জানিয়েছিলেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর সেই বক্তব্য নিয়েই তথ্য জানার অধিকার (আর টি আই) আইনে পুলিসকে চিঠি দেন…হাওড়ার বাসিন্দা অমিতাভ চৌধুরী। … কলকাতার পুলিস কমিশনারের কাছে পাঠানো চিঠিতে অমিতাভবাবু লিখেছিলেন, এক) মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রী এনিয়ে কোনও অভিযোগ দায়ের করেছেন কিনা। দুই) যদি করে থাকেন, তাহলে কোন থানায় করেছেন তার নামসহ জেনারেল ডায়েরি নম্বর, তারিখ ও সময় জানানো হোক। তিন) তাঁর ওই অভিযোগের অনুলিপি দেওয়ার অনুরোধ করছি। চার) ওই অভিযোগে নিযুক্ত তদন্তকারী অফিসারের নাম ও পদ জানানোর অনুরোধ করছি।… কলকাতা পুলিসের যুগ্ম-কমিশনার (প্রশাসন) প্রথম প্রশ্নের জবাবে জানিয়েছেন, কলকাতা পুলিসের কোনও থানায় ওই বিষয়ে কোনও অভিযোগ দায়ের করা হয়নি। তাই বাকি প্রশ্নগুলির উত্তর দেওয়ার প্রশ্ন ওঠে না বলে জানিয়ে দেওয়া হয়।… এই চিঠি পাওয়ার পর অমিতাভবাবুর অভিযোগ, মুখ্যমন্ত্রী নিজের প্রাণনাশের কথা জানালেও পুলিসের কাছে এনিয়ে কার্যত কোনও তথ্যই নেই!’’

১২ই জুলাইয়ে আনন্দবাজার পত্রিকার ৬ পৃষ্ঠায় এই সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। খবরে প্রকাশ, ‘‘পুলিস আসলে পুরো বিষয়টিকে আড়াল করার চেষ্টা করছে…’’। মমতা ব্যানার্জি মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর প্রাণনাশের চেষ্টা হচ্ছে আর পুলিস বিষয়টিকে আড়াল করার চেষ্টা করছে! কেন? পুলিসের এই চেষ্টার কারণ কী?

নেপথ্যে কী রহস্য রয়েছে?

এতো মিথ্যের ওপর একটা সরকার দাঁড়িয়ে রয়েছে। সরকারের ১ নম্বর ব্যক্তি থেকে শুরু করে একেবারে নিচের তলার লোকটি—সবাই নিরন্তর মিথ্যে বলে চলেছেন। এবং এঁরাই এখন আমাদের রাজ্যের সর্বেসর্বা! এবং এঁদের হাতে পড়ে যেমন থাকা উচিত, বাংলা তেমনই আছে।

পুনঃ মমতা ব্যানার্জি একবার বলেছিলেন, ‘‘সি পি এম টালার ট্যাঙ্কে বিষ মিশিয়েছে!’’

Two Years of Mamata’s Rule

June 23, 2013

ashim-dasgupta-mamatas-2-years-c

Left Front Govt.’s Success Story on Rural Development

June 22, 2013

বামফ্রন্ট সরকারের গ্রামোন্নয়ন ও পঞ্চায়েত ব্যবস্থায় বিকল্প নীতি

ড: অসীম দাশগুপ্ত

প্রথম বামফ্রন্ট সরকারের প্রতিষ্ঠা দিবসে (২১শে জুন) স্মরণ করা প্রাসঙ্গিক, সীমিত ক্ষমতার মধ্যেও উন্নয়নের ক্ষেত্রে, এবং নির্দিষ্টভাবে গ্রামোন্নয়ন ও পঞ্চায়েত ব্যবস্থার ক্ষেত্রে, কি বিকল্প নীতি সামনে রেখে ১৯৭৭ সা‍‌লে যাত্রা শুরু করেছিল বামফ্রন্ট সরকার। উল্লেখ করা প্রয়োজন, বামফ্রন্ট সরকারের প্রথম দু’বছরে, এবং পরবর্তী বছরগুলিতে কি কি সাফল্য অর্জিত হয়েছিল, এবং কোনখানে সমস্যাও দেখা দিয়েছিল। একই সঙ্গে লক্ষ্য করা প্রয়োজন, গত দু’বছরে বর্তমান তৃণমূল কংগ্রেসের নেতৃত্বে রাজ্য সরকারের কার্যকলাপ কোনদিকে চলেছে।স্বল্প পরিসরের কারণে এই আলোচনা প্রধানত গ্রামোন্নয়ন এবং পঞ্চায়েত ব্যবস্থার বিষয়েই নির্দিষ্ট রাখা হয়েছে।

গ্রামোন্নয়ন ও পঞ্চায়েত ব্যবস্থার বিকল্প নীতি

সুদীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামের ভিত্তিতে গঠিত বামফ্রন্ট সরকার ১৯৭৭ সালের ২১শে জুন যখন যাত্রা শুরু করে, তখন উপলব্ধির মধ্যেই ছিল, দেশের জমিদার-বুর্জোয়া নিয়ন্ত্রিত রাষ্ট্র ব্যবস্থার অভ্যন্তরে রাজ্যস্তরে অত্যন্ত সীমিত ক্ষমতার মধ্যে রাজ্য সরকারকে কাজ করতে হবে। তাই প্রথম বছর থেকেই বামফ্রন্ট সরকার কেন্দ্র-রাজ্য সম্পর্কের ক্ষেত্রে বিকেন্দ্রীকরণের সুস্পষ্ট দাবি ধারাবাহিকভাবেই উত্থাপন করে। এ‍‌ই দাবি পরবর্তী সময়ে উন্নীত হয় সর্বভারতীয় স্তরে।

কেন্দ্র-রাজ্য সম্পর্কে বিকেন্দ্রীকরণের দাবি উত্থাপন করার সঙ্গে সঙ্গে সীমিত ক্ষমতার মধ্যে দাঁড়িয়েই, বামফ্রন্ট সরকার উন্নয়নের প্রতিটি ক্ষেত্রে, এবং নির্দিষ্টভাবে, গ্রামোন্নয়নের ক্ষেত্রে, এক বিকল্প নীতি সামনে রেখে অগ্রসর হওয়ার উদ্যোগ গ্রহণ করে। এই বিকল্প নীতিতে উন্নয়নের লক্ষ্য শুধুমাত্র উৎপাদন বৃদ্ধি করা নয়, এমনভাবে উৎপাদন বৃদ্ধি করা যাতে সাধারণ শ্রমজীবী মানুষের কর্মসংস্থান ও আর্থিক অবস্থার উন্নতি হয়, তাঁদের মর্যাদা বৃদ্ধি পায় এবং রাজনৈতিক-সামাজিক শক্তির ভারসাম্য তাঁদের অনুকূলে আসার প্রক্রিয়া শুরু হয়।

যেহেতু সাধারণ শ্রমজীবী মানুষের স্বার্থেই এই উন্নয়ন, তাই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, এই উন্নয়ন প্রক্রিয়াতে যাতে স্থানীয় সাধারণ মানুষ অংশগ্রহণ করতে পারেন গণতান্ত্রিক অধিকারের ভিত্তিতে, তা নিশ্চিত করতে হবে। ১৯৭৭ সালে ২১‍‌শে জুন প্রথম বামফ্রন্ট সরকারের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করার পরেই মহাকরণের অলিন্দ থেকে কমরেড জ্যোতি বসু ঘোষণা করেছিলেন, ‘‘বামফ্রন্ট সরকার মহাকরণ থেকে সরকার চালাবে না, অংশগ্রহণমূলক গণতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা করা হবে গ্রামে এবং শহরে নির্বাচিত স্বায়ত্তশাসনমূলক সংস্থাগুলি গড়ে তুলে।’’ এই নির্বাচিত স্বায়ত্তশাসন সংস্থাগুলিই হলো গ্রামের ক্ষেত্রে নির্বাচিত পঞ্চায়েত (এবং শহরের ক্ষেত্রে নির্বাচিত পৌরসভা)।

গ্রামোন্নয়নে ভূমিসংস্কার

গ্রামোন্নয়নের ক্ষেত্রে, বিশেষ করে কৃষির ক্ষেত্রে, রাজ্যের প্রতিটি জেলার খামার স্তরের পরিচালনার তথ্যাবলী থেকে (উৎস: কৃষি দপ্তর, পশ্চিমবঙ্গ সরকার) বারংবার সুস্পষ্টভাবে দেখা গেছে, একর-প্রতি সর্বোচ্চ ফসল উৎপাদনের পরিমাণ (একাধিক ফসল উৎপাদনের তথ্য সমেত) এবং একর-প্রতি সর্বোচ্চ কর্মসংস্থানেরও পরিমাণ, উভয়ই পাওয়া যায় জমিদার বা বৃহৎ কৃষকের জমি থেকে নয়, তা পাওয়া যায় ক্ষুদ্র শ্রমজীবী কৃষকদের জমি থেকেই (বিশেষ করে যদি সেচ, উন্নত বীজ ইত্যাদির সুবিধা তাঁদের জমিতে পৌঁছে দেওয়া যায়)। তাই রাজ্যের কৃষিতে মোট উৎপাদন এবং কর্মসংস্থান বৃদ্ধির জন্যই (যা পূর্বে উল্লিখিত ‍বিকল্প নীতিতে উন্নয়নের লক্ষ্য) প্রয়োজন ভূমিসংস্কারের মাধ্যমে জমিদার-জোতদারদের কাছ থেকে ঊর্ধ্বসীমা-বহির্ভূত জমি রাজ্য সরকারে ন্যস্ত করে তা গরিব কৃষকদের ম‍‌ধ্যে বণ্টন করা। এবং একই সঙ্গে প্রয়োজন বর্গাদারদের নাম নথিভুক্ত করা, যাতে কাজের ও উৎপন্ন ফসলের ভাগের নিশ্চয়তার ভিত্তিতে, তাঁদের কাজ-করা জমি থেকেও বৃদ্ধি পেতে পারে ফসলের মোট উৎপাদন ও কর্মসংস্থান।

ভূমিসংস্কারে বামফ্রন্ট সরকারের প্রথম দু’বছরে পদ‍‌ক্ষেপ

ভূমিসংস্কারের ক্ষেত্রে এই দুটি প্রধান পদক্ষেপই — কৃষি জমির মালিকানার পুনর্বণ্টন এবং বর্গাদারের নথিভুক্তিকরণ — বিশেষ অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে শুরু করা হয় ১৯৭৭ সালের সেপ্টেম্বর মাস থেকেই। এবং এই পদক্ষেপগুলির সঙ্গে যুক্ত করা হয় কৃষক সংগঠনগুলির মাধ্যমে, এবং পরবর্তীতে পঞ্চায়েত ব্যবস্থারও মাধ্যমে, এলাকার সাধারণ শ্রমজীবী মানুষদের। এই সামগ্রিক উদ্যোগ গ্রহণের ফলে ১৯৭৭ সালের ডিসেম্বর মাসের মধ্যেই প্রায় ২০ হাজার একর ঊর্ধ্বসীমা বহির্ভূত জমি দরিদ্র কৃষকদের মধ্যে বণ্টনের জন্য সরকারে ন্যস্ত করা সম্ভব হয়, ১৯৭৮ সালের ডিসেম্বর মাসের মধ্যে তা বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়ায় ৫০ হাজার একরে, এবং ১৯৭৯ সালের ডিসেম্বর মাসের শেষে তা আরো উন্নীত হয় ৯০ হাজার একরে।

ভূমি ও ভূমিসংস্কার দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, রাজ্য সরকারের হাতে ন্যস্ত হওয়া কৃষি জমির বণ্টন থেকে ৩০শে জুন, ১৯৭৯ পর্যন্ত সময়কালের মধ্যেই, অর্থাৎ প্রথম বামফ্রন্ট সরকারের প্রথম দু’বছরের মধ্যেই উপকৃত হন প্রায় ৪.২৬ লক্ষ দরিদ্র কৃষক পরিবার। এছাড়া, বামফ্রন্ট সরকারের প্রথম ছ’মাসের মধ্যে বর্গাদারদের নাম নথিভুক্তিকরণের সংখ্যাও বৃদ্ধি পায় পাঁচগুণ। এবং ‘অপারেশন বর্গা’ কর্মসূচীর মাধ্যমে আরও নিবিড়ভাবে নথিভুক্তিকরণের পদ্ধতি চালু করে ১৯৭৮ সালে ডিসেম্বর মাসের শেষে নথিভুক্ত বর্গাদারের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে পৌঁছায় প্রায় ৫ লক্ষে, এবং ১৯৭৯ সালের আগস্ট মাসের শেষে এই সংখ্যা লক্ষ্যণীয়ভাবে উন্নত হয়ে দাঁড়ায় ৭.৪১ লক্ষে, যা রাজ্যের মোট অনুমিত বর্গাদারের সংখ্যার প্রায় ৫০ শতাংশ।

পঞ্চায়েত ব্যবস্থায় বামফ্রন্ট সরকারের প্রথম দু’বছরে পদক্ষেপ

ভূমিসংস্কারের ক্ষেত্রে পদক্ষেপগুলি গ্রহণ করার মাধ্যমে রাজ্যের গ্রামাঞ্চলে রাজনৈতিক-সামাজিক শক্তির ভারসাম্য সাধারণ শ্রমজীবী কৃষকদের অনুকূলে আসার প্রক্রিয়া শুরু হয়। এই প্রক্রিয়াকে, সাধারণ কৃষকদের স্বার্থেই, কৃষিতে উৎপাদন ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধির ক্ষেত্রে আর‍‌ও কার্যকর করতে বিশেষ প্রয়োজনীয় হয়ে ওঠে, সাধারণ কৃষকদের জন্য জমি-ছাড়া অন্যান্য উৎপাদন-উপাদানের (সেচ, উন্নত বীজ, সার ইত্যাদির) সুবিধাও পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করা, এবং উৎপন্ন ফসলের ন্যায্য দাম ও কৃষি-ঋণের ক্ষেত্রেও সহায়ক পদক্ষেপ গ্রহণ করা। এই সহায়ক পদক্ষেপগুলি গ্রহণ করার লক্ষ্যেই জরুরী হয় গ্রামাঞ্চলে বিকেন্দ্রীকৃত একটি সংগঠন স্থাপন করা, যে সংগঠনটি হবে গণতান্ত্রিক ও নির্বাচিত সংস্থা এবং যা রাজ্যের গ্রামাঞ্চলে সাধারণ মানুষের প্রতিনিধিত্ব করবে।

প্রথম বামফ্রন্ট সরকারের প্রথম বছরেই তাই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, নির্বাচিত ত্রি-স্তর পঞ্চায়েতই হবে এই উপযুক্ত সংগঠন এবং বামফ্রন্ট সরকার গঠিত হওয়ার এক বছরের মধ্যেই (৪ঠা জুন, ১৯৭৮) রাজ্যে নতুনভাবে ত্রি-স্তর পঞ্চায়েতে মোট প্রায় ৫৬ হাজার (তখনকার হিসেবে) প্রতিনিধিদের জন্য অনুষ্ঠিত হয় গণতান্ত্রিকভাবে এক বিশাল নির্বাচন প্রক্রিয়া। এই পঞ্চায়েত নির্বাচনের পরেই ভারত সরকারের একটি খ্যাতনামা সংস্থা (নাম, জাতীয় গ্রামোন্নয়ন সংস্থা) এই নির্বাচন প্রক্রিয়ার উপর সমীক্ষা করে তাদের রিপোর্টে বলে যে, এই নির্বাচন হয়েছে নিরপেক্ষ এবং শান্তিপূর্ণভাবে, এবং ধর্ম ও জাত-পাতের বিভাজনের ঊর্ধ্বে উঠে মূলত আর্থিক ও রাজনৈতিক বিষয়গু‍লির উপর মতামতকেই গুরুত্ব প্রদান করে (জাতীয় উন্নয়ন সংস্থার রিপোর্ট, ১৯৭৮-৭৯)।

এছাড়া, রাজ্য সরকারের উন্নয়ন ও পরিকল্পনা দপ্তরের পক্ষ থেকেও গ্রাম পঞ্চায়েত স্তরে নির্বাচিত সদস্যদের জীবিকা ও জমির মালিকানার উপর একটি নমুনা সমীক্ষা করা হয় (১৯৭৮-৭৯)। এই সমীক্ষার তথ্য থেকে দেখা যায় যে, এই পঞ্চায়েতগুলির নির্বাচিত সদস্যদের ৮০ শতাংশেরও বেশি এসেছেন শ্রমজীবী কৃষক, ভূমিহীন খেতমজুর, বর্গাদার, গ্রামীণ কারিগর, শিক্ষক ও অন্যান্যদের মধ্য থেকে।এছাড়া, শ্রমজীবী কৃষকদের ক্ষেত্রেও, ৭১ শতাংশই হলেন ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষক। অর্থাৎ, পঞ্চায়েতগুলির নির্বাচিত সদস্যরা হলেন সংখ্যাগরিষ্ঠতায় গ্রামের দরিদ্র মানুষেরই প্রতিনিধি। সদস্যদের এই শ্রেণী চরিত্র মনে রেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, পঞ্চায়েতগুলির উপর ধাপে ধাপে ত্রাণ ও উন্নয়নমূলক কাজের দায়িত্ব দেওয়া হবে।

নতুন পঞ্চায়েতগুলি কাজ শুরু করার পরেই ১৯৭৮ সালে বিধ্বংসী বন্যায় ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয় পশ্চিমবঙ্গের গ্রামাঞ্চল। তাই, এই সময়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, গ্রামের মানুষের কাছে ত্রাণসামগ্রী পৌঁছে দেওয়া হবে এই সদ্য নির্বাচিত পঞ্চায়েতগুলির মাধ্যমে। আগে এই রকম বা এর চেয়ে কম প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের সময়েও দেখা গেছে যে, ত্রাণসামগ্রী ঠিকমতো না পাওয়ায় গ্রাম থেকে বন্যাপীড়িত মানুষ শহরে চলে এসেছেন, মহামারীর প্রকোপে ব্যাপক সংখ্যায় সাধারণ মানুষ আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর মুখে পতিত হয়েছেন এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যশস্যের দাম অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু, এবার প্রাকৃতিক দুর্যোগের মুখে দাঁড়িয়ে, পঞ্চায়েতগুলি ত্রাণসামগ্রী এবং জনস্বাস্থ্য পরিষেবা সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে বহুলাংশে সফল হলেন। তার প্রমাণ পাওয়া গেল এই কারণে যে, বন্যার পর গ্রাম থেকে শহরে সাধারণ মানুষ চলে এলেন না, অসুখে, বিশেষ করে কলেরায় প্রাণহানি হলো নগণ্য, এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যশস্যের দাম বন্যার পর বৃদ্ধি পেলেও, তা এক সপ্তাহের মধ্যেই নামতে শুরু করলো।

এরপর ১৯৭৮-৭৯ সালেই পঞ্চায়েতগুলিকে আরও দায়িত্ব দেওয়া হলো ‘কাজের বিনিময়ে খাদ্য’ এই গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচীর রচনা ও রূপায়ণের ক্ষেত্রে। এই কর্মসূচীটির উদ্দেশ্য ছিল, গ্রামের গরিব মানুষদের মজুরি ও খাদ্য সামগ্রীর বিনিময়ে শ্রমে নিযুক্ত করে সামাজিক সম্পদ (জোড় বাঁধ নির্মাণ, খাল সংস্কার, জলাশয় খনন ও উন্নয়ন, জলনিকাশি ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং রাস্তা ইত্যাদি) নির্মাণ করা। প্রকল্পগুলির ব্যয়ভার কিছুটা বহন করতো রাজ্য সরকার অর্থের মাধ্যমে এবং কিছুটা কেন্দ্রীয় সরকার খাদ্য সামগ্রীর মাধ্যমে। সেই সময়ে একমাত্র পশ্চিমবঙ্গেই বামফ্রন্ট সরকার এই কর্মসূচীগুলির রচনা ও রূপায়ণের দায়িত্ব দিয়েছিল পঞ্চায়েতগুলিকে। অন্য রাজ্যে এই কর্মসূচীগুলি রূপায়িত হতো আমলাদের মাধ্যমে। পশ্চিমবঙ্গে বামফ্রন্ট সরকারের তরফ থেকে বিশেষভাবে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল, প্রকল্প নির্বাচনের সময় পঞ্চায়েতগুলি যেন স্থানীয়ভাবে উন্মুক্ত সভা আহ্বান করে সাধারণ মানুষের সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে প্রকল্পগুলির ক্ষেত্রে অগ্রাধিকারের সিদ্ধান্ত নেয়, এবং রূপায়ণের সময়েও তারা যেন এলাকার মানুষদের সরাসরি যুক্ত করে ‘উপকৃত কমিটি’র মাধ্যমে। এছাড়া, সুস্পষ্টভাবে বলা হয়েছিল, কারিগরি দিক থেকে যেন অগ্রাধিকার দেওয়া হয় শ্রম-নিবিড় এবং স্থানীয় সম্পদ-নির্ভর প্রযুক্তির ব্যবহারের উপর, যাতে যতটা সম্ভব বেশি কর্মসংস্থান এবং শ্রমজীবী মানুষদের আয় সৃষ্টি করা সম্ভব হয়।

উল্লেখ করা প্রয়োজন, ভারত সরকারের যোজনা কমিশনের কর্মসূচী মূল্যায়ন সংস্থা ১৯৭৯ সালে বিভিন্ন রাজ্যে ‘কাজের বিনিময়ে খাদ্য’ কর্মসূচীর মূল্যায়নের জন্য একটি নমুনা সমীক্ষা করে। এই সমীক্ষার চূড়ান্ত বিবরণীতে পশ্চিমবঙ্গকে বিশেষভাবে স্বীকৃতি দেওয়া হয় এই বলে যে, মুষ্টিমেয় যে কয়েকটি রাজ্যে এই কর্মসূচী সাফল্যের সঙ্গে রূপায়িত হয়েছে, পশ্চিমবঙ্গ তাদের মধ্যে অন্যতম। পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে অন্যান্য রাজ্যের পরিস্থিতির পার্থক্য উল্লেখ করে বলা হয়, ‘‘এখানে জেলা কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে বরাদ্দ খাদ্যশস্য ও অর্থ পাওয়ার পর গ্রামের জন্য প্রকল্প প্রস্তুত করার উদ্দেশ্যে গ্রাম পঞ্চায়েতগুলি জনসাধারণের সভা ডাকে। এইসব সভাতেই প্রকল্পগুলির অগ্রাধিকারও স্থির করা হয়।’’

এছাড়া, রাজ্য সরকারের উন্নয়ন ও পরিকল্পনা দপ্তরের পরিচালিত সমীক্ষা (১৯৭৯-৮০) থেকে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জানা যায়। সমীক্ষার মতে, ‘‘এ-রাজ্যে এই কর্মসূচীতে যে প্রকল্পগুলি রূপায়িত হয়েছে, সেগুলি অধিকতর শ্রম-নিবিড় এবং তাদের গড় নির্মাণ খরচও প্রচলিত খরচের তুলনায় অপেক্ষাকৃত কম। এই ব্যয় হ্রাসের কারণ হিসেবে বলা হয়েছে যে, সাধারণভাবে এই প্রকল্পগুলির রূপায়ণে ঠিকাদার নিযুক্ত করা হয়নি; তত্ত্বাবধানের কাজের প্রায় ৭৩ শতাংশ বহন করেছেন স্থানীয় জনসাধারণ এবং বিনা পারিশ্রমিকে।’’

গ্রামোন্নয়ন ও পঞ্চায়েত ব্যবস্থায় বিকল্প নীতির ফলাফল প্রথম দু’বছরে (১৯৭৭-৭৯)

ভূমিসংস্কারের ভিত্তিতে পঞ্চায়েত ব্যবস্থাকে যুক্ত করে কৃষিতে অন্যান্য উপকরণের সুবিধা সাধারণ কৃষকদের পৌঁছে দেওয়ার সিদ্ধান্তের ফলে প্রথম বামফ্রন্ট সরকারের প্রথম দু’বছরের মধ্যেই সেচের সম্প্রসারণ, উন্নত বীজের ব্যবহার এবং সারের প্রয়োগের ক্ষেত্রে লক্ষণীয় অগ্রগতি সূচিত হয়। ক্ষুদ্র সেচ দপ্তর এবং সেচ ও জলপথ দপ্তরের প্রকল্পগুলির রূপায়ণের সঙ্গে সঙ্গে পঞ্চায়েত ব্যবস্থার মাধ্যমে ‘কাজের বিনিময় খাদ্য’ কর্মসূচীর আওতায় ব্যাপক সংখ্যক সেচ প্রকল্প রূপায়িত হওয়ার কারণে, ১৯৭৬-৭৭ সালের পর বামফ্রন্ট সরকারের প্রথম দু’বছরে, ১৯৭৭-৭৮ এবং ১৯৭৮-৭৯ সালে অতিরিক্ত প্রায় ৩ লক্ষ হেক্টর কৃষি জমিতে সেচ প্রদানের ক্ষমতা সম্প্রসারিত করা সম্ভব হয়। এছাড়া পঞ্চায়েতের সহায়তায় কৃষকদের মধ্যে উন্নত বীজ ব্যবহারকে উৎসাহিত করায়, ধানের উৎপাদনে উন্নত বীজের অনুপাত ১৯৭৬-৭৭ সালে ২২ শতাংশ থেকে দু’বছর পরে ১৯৭৮-৭৯ সালে বৃদ্ধি পায় ২৮ শতাংশে। এছাড়া, সারের ব্যবহারও এ‍ই দু’বছরে লক্ষণীয়ভাবে বৃদ্ধি পায়, ১৯৭৬-৭৭ সালে ৫১.৬ হাজার মেট্রিক টন থেকে ১৯৭৮-৭৯ সালে প্রায় ৮৬.৬হাজার মেট্রিক টনে (উৎস : আর্থিক সমীক্ষা, পশ্চিমবঙ্গ সরকার, ১৯৭৯-৮০ ও ১৯৮০-৮১)।

এর পাশাপাশি, এক বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হয়, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কগুলির মারফৎ ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের, এবং নির্দিষ্টভাবে ভূমিসংস্কার থেকে উপকৃত পাট্টাদার ও নথিভুক্ত বর্গাদারদের ঋণ প্রদানের ব্যবস্থা করতে। তার ফ‍‌লে, ২৭শে আগস্ট, ১৯৭৯ পর্যন্ত সময়কালে ব্যাঙ্ক থেকে ঋণ পান ৫৮,৯৪৮ জন পাট্টাদার ও বর্গাদার, যা সংখ্যায় অল্প হলেও সমগ্র দেশের ক্ষেত্রে সৃষ্টি করে এক নতুন নজির। একই সঙ্গে শুরু হয় সমবায় ব্যবস্থার উপর গুরুত্ব প্রদান এবং সমবায় ব্যাঙ্ক ও সংস্থাগুলির মাধ্যমে ঋণ প্রদান বৃদ্ধিরও উদ্যোগ। এছাড়া, সাধারণ কৃষকরা যাতে তাঁদের উৎপন্ন ফসলের ন্যায্য দাম পান, তার জন্য ১৯৭৭-৭৮ সাল থেকেই শুরু হয় সরকারের মাধ্যমে কৃষকদের কাছ থেকে সরাসরি ন্যায্য দামে চাল কেনার উদ্যোগ, যার সঙ্গে পরে যুক্ত করা হয় পঞ্চায়েত সমিতিগুলির ভূমিকা।

ভূমিসংস্কারকে ভিত্তি করে পঞ্চায়েত ব্যবস্থার মাধ্যমে এই সামগ্রিক পদক্ষেপগুলি গ্রহণ করার ফলে রাজ্যে চালের উৎপাদন ১৯৭৬-৭৭ সালে ৫৯.৪ লক্ষ মেট্রিক টন থেকে প্রায় ২৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ১৯৭৭-৭৮ সালে উন্নীত হয় ৭৪.৯ লক্ষ মেট্রিক টনে। পরবর্তী বছরে (১৯৭৮-৭৯), ভয়াবহ বন্যায় আউশ ও আমন ধানের ব্যাপক ক্ষতি হওয়া সত্ত্বেও, ক্ষুদ্র সেচের সম্প্রসারণ এবং উন্নত বীজ ও সারের সরবরাহের ক্ষেত্রে পঞ্চায়েতকে যুক্ত করে তৎপরতার সঙ্গে পদক্ষেপ নেওয়ায়, বোরো ধানের উৎপাদন লক্ষণীয়ভাবে বৃদ্ধি পায় প্রায় ৪১ শতাংশ, যা আগে কখনো হয়নি। শুধু উৎপাদন বৃদ্ধি নয়, ১৯৭৭-৭৮ সালে খেতমজুরদের মজুরির হার টাকার হিসেবে বৃদ্ধি পায় প্রায় ১৯ শতাংশ হারে, যা ওই বছরে খেতমজুরদের পক্ষে প্রাসঙ্গিক মূলসূচকের বৃদ্ধির হারের থেকে বেশি, এবং এর ফলে প্রকৃত অর্থেও খেতমজুরদের মজুরি ১০ শতাংশে বেশি হারে‍ই বৃদ্ধি পায়। খেতমজুরদের মজুরি বৃদ্ধির ধারা পরের বছরেও অব্যাহত থাকে।

বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ হলো, বামফ্রন্ট সরকার প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় পর, ধান কাটা নিয়ে সংঘর্ষের ঘটনা কমে হয় নগণ্য, এবং সাধারণ কৃষকরা তাঁদের ফসল এবং বর্গাদাররা তাঁদের ফসলের ন্যায্য ভাগ নিজেদের ঘরের গোলায় তুলতে পারেন শান্তিতে। কোনো আত্মহত্যা বা গ্রামাঞ্চলে দরিদ্র মানুষদের উপর সংগ‍‌ঠিত আক্রমণের ঘটনাও ঘটেনি। গ্রামাঞ্চলে শ্রেণী ভারসাম্য, শ্রমজীবী মানুষদের অনুকূলে আসতে শুরু করে।

বামফ্রন্ট সরকারের পরবর্তী বছরগুলিতে অগ্রগতি

বিকল্প নীতির ভিত্তিতে বামফ্রন্ট সরকারের আম‍‌লে পরবর্তী বছরগুলিতে, ধারাবাহিকতা রেখে, প্রত্যেকটি ক্ষেত্রে—ভূমিসংস্কার, পঞ্চায়েত ব্যবস্থা এবং গ্রামোন্নয়নের প্রতিটি বিষয়ে—অগ্রগতি শুধু বজায় থেকেছে তাই নয়, তাকে করা হয়েছে আরো সম্প্রসারিত।

ভূমিসংস্কারের উপর ধারাবাহিকভাবেই বিশেষ অগ্রাধিকার আরোপ করার কারণে রাজ্যে বণ্টিত কৃষিজমির পরিমাণ ক্রমাগত বৃদ্ধি পেয়ে (১৫ই জানুয়ারি, ২০১১ পর্যন্ত সময়কালে) দাঁড়িয়েছে ১১.৩ লক্ষ একরে, এবং তার থেকে উপকৃত হয়েছেন প্রায় ৩০.৫ লক্ষ কৃষক পরিবার, যাঁদের মধ্যে তফসিলী জাতি, আদিবাসী ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের উপকৃতরাই হলেন ৬৬ শতাংশ। মহিলাদের ক্ষমতায়নের উপর গুরুত্ব আরোপ করে যৌথ পাট্টা বণ্টন করা হয়েছে ৬.২ লক্ষ এবং মহিলা পাট্টা ১.৬৫ লক্ষ সংখ্যায়, যা সমগ্র দেশের ক্ষেত্রেই নজিরবিহীন। এছাড়া, নথিভুক্তিকরণ ‍‌থেকে উপকৃত বর্গাদারদের সংখ্যা ক্রমাগত বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছে ১৫.১৬ লক্ষে।

তাছাড়া, ভূমিহীন খেতমজুর ও অন্যান্যদের বাস্তুজমির মালিকানা থেকে উপকৃত হয়েছেন ৩.২৪ লক্ষ দরিদ্র পরিবার। ভূমিসংস্কারের ক্ষেত্রে এই প্রত্যেকটি পদক্ষেপ একত্রিত করলে, এর সামগ্রিক ফল হিসেবে পশ্চিমবঙ্গের গ্রামাঞ্চলে উপকৃত হয়েছেন প্রায় ৪৯ লক্ষ দরিদ্র পরিবার, যা রাজ্যের মোট কৃষি-নির্ভর পরিবারের প্রায় ৫০ শতাংশ। উল্লেখ করা প্রয়োজন, সমগ্র দেশে ভূমিসংস্কারের ক্ষেত্রে, জমি বণ্টন থেকে উপকৃত মোট পরিবারের মধ্যে শতকরা ৫৪ জনই হলেন পশ্চিমবঙ্গের, এবং ভূমিসংস্কারে রাজ্যগুলির মধ্যে পশ্চিমবঙ্গের স্থান হয়েছে সর্বপ্রথম।

পঞ্চায়েত ব্যবস্থার ক্ষেত্রে পূর্বে বর্ণিত প্রাথমিক সাফল্যের পর এই ব্যবস্থাকে আরো সমন্বিত এবং বিকেন্দ্রীকৃত করা হয়েছে। পঞ্চায়েতের মাধ্যমে রূপায়িত প্রকল্পগুলির সঙ্গে যাতে জেলাতে রাজ্য সরকারের বিভিন্ন দপ্তরের মাধ্যমে রূপায়িত প্রকল্পগুলির মধ্যে সুষ্ঠু সমন্বয় থাকে, তার জন্য ১৯৮৫-৮৬ সালে সমগ্র দেশে এরাজ্যেই সর্বপ্রথম জেলাস্তরে জেলা পরিকল্পনা কমিটি এবং ব্লকস্তরে ব্লক পরিকল্পনা কমিটি গঠিত হয়। উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, ১৯৮৯ সালে কলকাতায় অনুষ্ঠিত পূর্বাঞ্চল এবং উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সমস্ত রাজ্যগুলির পঞ্চায়েতীরাজ সম্মেলনের উদ্বোধন করতে এসে তদানীন্তন প্রধানমন্ত্রী প্রয়াত রাজীব গান্ধী বামফ্রন্ট সরকারের আমলে পশ্চিমবঙ্গের পঞ্চায়েত ব্যবস্থা এবং বিকেন্দ্রীকরণের এই উদ্যোগকে প্রশংসা করে তাকে সমগ্র দেশের ‘মডেল’ হিসেবেই চিহ্নিত করেন।

তারপর এই ধারণাকে সামনে রেখেই পঞ্চায়েত এবং পরে পৌর সংস্থাগুলির মাধ্যমে বিকেন্দ্রীকরণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সংবিধান সংশোধনও (যথাক্রমে ৭৩তম এবং ৭৪তম সংশোধন) করা হয়। আরো উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, বামফ্রন্ট সরকারের আমলে, পরবর্তী পর্যায়ে, পঞ্চায়েত ব্যবস্থার বিকেন্দ্রীকরণের উদ্যোগকে আরো সম্প্রসারিত করা হয়েছে। বিকেন্দ্রীকরণের প্রক্রিয়াকে কাঠামোগতভাবে শুধু গ্রাম পঞ্চায়েতের স্তর নয়, প্রতিটি গ্রামের ক্ষেত্রে গ্রাম সংসদ স্তর পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া হয়েছে, যাতে গ্রামের সাধারণ মানুষ উন্মুক্ত সভার মাধ্যমে উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় আরো সরাসরি গণতান্ত্রিকভাবে অংশগ্রহণ করতে পারেন। উল্লেখ করা অপ্রাসঙ্গিক নয় যে, ভারত সরকারের পঞ্চায়েতীরাজ মন্ত্রকের রাজ্যওয়াড়ি পর্যালোচনার (২০০৯-১০) প্রকাশিত ফল অনুযায়ী, পঞ্চায়েত ব্যবস্থার মাধ্যমে অংশগ্রহণমূলক বিকেন্দ্রীকরণের নিরিখে সমস্ত দেশের মধ্যে বামফ্রন্ট সরকারের আমলেই পশ্চিমবঙ্গ অর্জন করে প্রথম স্থলাভিষিক্ত হওয়ার বিশেষ সম্মান।

ভূমিসংস্কারকে ভিত্তি করে পঞ্চায়েত ব্যবস্থার মাধ্যমে কৃষির ক্ষেত্রে উৎপাদন-উপাদানের (সেচ, উন্নত বীজ, সার ইত্যাদিতে) সহায়তার মাত্রা পরবর্তী বছরগুলিতে ক্রমাগতই প্রসারিত করা হয়। ফলে, রাজ্যের সেচ-ক্ষমতা যুক্ত কৃষি জমির অনুপাত ১৯৭৮-৭৯ সালে ৩৪ শতাংশ থেকে ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পেয়ে ২০১০-১১ সালে উন্নীত হয় প্রায় ৭২ শতাংশে। উন্নত বীজের ক্ষেত্রে, বিশেষ করে ধানের উৎপাদনে, ১৯৭৮-৭৯ সালে চাষের জমিতে উন্নত বীজের ব্যবহারের যে অনুপাত ছিল ২৮ শতাংশ, তা ২০১০-১১ সালে পৌঁছায় ৯৮ শতাংশে। সারের ক্ষেত্রে, রাসায়নিক সারের ব্যবহারের সঙ্গে সঙ্গে বিশেষ জোর দেওয়া শুরু হয় অপেক্ষাকৃত স্বল্প ব্যয়ে স্থানীয় সম্পদ-নির্ভর জৈব সার ও জীবাণু সারের ব্যবহারের উপর। এই লক্ষ্যে শুরু করে দেওয়া হয় জৈব গ্রাম ও বীজ গ্রাম স্থাপনের কাজ, এবং উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি করতে উন্নত এম আর আই পদ্ধতির ব্যবহার।

Arabul Model — How Arabul Wins Uncontested

June 13, 2013

বন্দুকের নলেই আরাবুলের ‘জয়’

 নিজস্ব প্রতিনিধি

 কলকাতা, ১২ই জুন – কলকাতার অদূরে ভাঙড়েই মমতা ব্যানার্জির আসল ‘জমি নীতির’ মডেলের সন্ধান মিলেছিল। এবার রাজ্য পুলিস রেখেই কীভাবে পঞ্চায়েতে বিরোধী প্রার্থীদের মনোনয়ন জমা দেওয়া ঠেকাতে হয়, কীভাবে বিরোধী প্রার্থীদের জোর করে মনোনয়ন প্রত্যাহার করে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়ী হতে হয়, সেই মডেলও ‘উপহার’ দিয়েছে ভাঙড়। ‘দাতা’ আরাবুল ইসলাম। শাসক তৃণমূলের ‘গর্ব’, ‘তাজা’ নেতা।

কলকাতা অদূরের ভাঙড়-২ নম্বর ব্লকই এখন শহর লাগোয়া এলাকায় তৃণমূলী সন্ত্রাসের ‘মডেল’ হয়ে উঠেছে। শ্যামবাজারের জনসভায় দাঁড়িয়ে সেদিন মুখ্যমন্ত্রী বলেছিলেন, ‘আরাবুল তো মারধর করেনি, তবুও তো ও জেল খাটলো’। মঞ্চে তখন আরাবুল নিজেই দাঁড়িয়ে। ইঙ্গিত মিলেছিল তখনই।

বিধানসভা নির্বাচনে হেরে যাওয়া সেই আরাবুল ইসলামকেই এরপর ভাঙড়-২ নম্বর পঞ্চায়েত সমিতির প্রার্থী করলো তৃণমূল। এবং পোলেরহাট থেকে পঞ্চায়েত সমিতির তৃণমূলী প্রার্থী হিসাবে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়ী হয়ে শংসাপত্রও নিয়ে ফেললো আরাবুল ইসলাম!

আরাবুলের সেই ‘বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়ী’ হওয়ার কাহিনীর মধ্যেই রয়েছে রাজ্য পুলিসের তত্ত্বাবধানে তৃণমূল সরকারের আমলে যে কোন স্তরে নির্বাচনের আসল চেহারা। ২৯শে মে এরাজ্যে অষ্টম পঞ্চায়েত নির্বাচনের প্রথম দফার ভোটের মনোনয়ন পর্ব শুরু। ভাঙড়-২ নম্বর ব্লকে ২৯মে সকাল থেকে ১০ই জুন দুপুর পর্যন্ত যা ঘটেছে তাই-ই আসলে এরাজ্যের গণতান্ত্রিক পরিবেশের নির্মম বিজ্ঞাপন।

২৯শে মে’র আগের দিন থেকেই ভাঙড় বাজার লাগোয়া বিডিও অফিসে রীতিমতো ক্যাম্প করে পাহারা দেওয়া শুরু করে তৃণমূলের সশস্ত্র বাহিনী। পরিস্থিতির আঁচ পেয়ে তাই প্রথম দিনে নমিনেশন ফি দিতে অল্প কয়েকজন বামফ্রন্ট কর্মীরা যান। কিন্তু সেখানেই তাঁদের ওপর হামলা, বেধড়ক মারধর হয়। পঞ্চায়েত সমিতির প্রার্থী পলাশ গাঙ্গুলিসহ বেশ কয়েক জন গুরুতর জখম হন। আতঙ্ক ছড়ানোর চেষ্টা প্রথম দিনেই। এরপরেও দ্বিতীয় দিনে বামফ্রন্ট কর্মীরা লাইনে দাঁড়িয়ে মনোনয়নপত্র তুলতে গেলে হামলা চালানো হলো। বিডিও অফিসের ভিতরেই প্রায় ৫০-৬০জনের সশস্ত্র তৃণমূলী বাহিনী। যাদেরকে ভাঙড়বাসী চেনেন ‘আরাবুলের টিম’ হিসাবে।

ততক্ষণে সমস্ত অভিযোগ পুলিস সুপার, জেলাশাসক, নির্বাচন কমিশনকে জানানো হয়েছে সি পি আই (এম)-র তরফে। এরপরেই ভাঙড়ের পোলেরহাট, হাতিশালা, ভগবানপুর, পোগালি এলাকায় প্রকাশ্যে চলে তৃণমূলী বাইক বাহিনীর ‘তলোয়ার মিছিল’। বিডিও অফিসে তৃণমূল বাদে যাঁরা মনোনয়ন তোলার লাইনে দাঁড়িয়েছিলেন তাঁদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভাঙচুর, বৃদ্ধ বাবা-মাকে ধরে পেটানো সবই চলেছে। বিডিও অফিসের ১০০ মিটারের মধ্যেই চললো তৃণমূলী মারধর, হুমকি সবই। আরাবুল বাহিনীর তাণ্ডবে শেষমেশ মহকুমা শাসকের দপ্তরে যেতে হলো বামফ্রন্ট প্রার্থীদের।

সেদিন ছিল ১লা জুন। সকাল ১১টার আগে অফিস খুলবে না জেনেও ভোর পাঁচটার মধ্যে অফিস চত্বরে গিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন ভাঙড়-২ ব্লকের গ্রাম পঞ্চায়েতের ১৫৯জন প্রার্থীর মধ্যে ১৪২জন। খাস আরাবুলের পাড়া থেকেও লোকজন ভোররাতে বেরিয়ে চলে এসেছে । অদম্য জেদ নিয়েই। ২রা জুনের মধ্যেই ভাঙড়- ২ পঞ্চায়েত সমিতির ৩০টি আসনে, জেলা পরিষদের দুটি আসনে এবং পঞ্চায়েতের ১৫৯টি আসনেই প্রার্থী দেয় বামফ্রন্ট। প্রার্থী দেওয়া হয় আরাবুল ইসলামের বিরুদ্ধেও।

১লা জুন রাত থেকেই এরপর শুরু হলো দ্বিতীয় দফার আক্রমণ। পঞ্চায়েত সমিতির বামফ্রন্ট প্রার্থী হাসান নস্কর-সহ বামফ্রন্টের প্রায় সাতজন প্রার্থী সেদিন রাতে বাড়ি ফিরছিলেন। সন্ধ্যায় বাড়ি আক্রমণ হতে পারে এই আশঙ্কা থেকে মনোনয়ন জমা দেওয়ার পরে গভীর রাতেই তাঁরা বাড়ি ফিরছিলেন। বাসন্তী মেইন রোড সে সময় রাস্তা বন্ধ থাকায় তাঁরা গাড়ি ঘুরিয়ে গাজীপুকুর অর্থাৎ আরাবুলের পাড়ার ওপর দিয়েই যাচ্ছিলেন। সেই সময়েই আরাবুল ইসলামের বাড়ির সামনেই জড়ো থাকা প্রায় ১৫জনের সশস্ত্র বাহিনী গাড়িতে বামফ্রন্ট প্রার্থীদের দেখেই ‘ডাকাত ডাকাত’ চিৎকার করে তাড়া করতে শুরু করে। গাড়ি ছেড়ে জীবন বাঁচাতে বামফ্রন্ট প্রার্থীরা অন্ধকারের মধ্যে কোনক্রমে পালান। কেউ পুকুরের মধ্যে ঝাঁপ দিয়ে নাক বাইরে রেখে ডুব দিয়ে রয়েছেন, কেউ কাদার মধ্যে শুয়ে, কেউবা ঝোপের পোকামাকড়ের মধ্যেই কোনমতে গা ঢাকা দেন। রাতভর সেই অবস্থায় থাকতে হয়েছে।

এদিকে ততক্ষণে ঐ পঞ্চায়েতে সমিতির প্রার্থীর বাড়িতে বোমা ছোঁড়া, গুলি চালিয়ে ভয় দেখানো সবই চলছে। আরাবুলের ইসলামের বিরুদ্ধে প্রথমে যাঁকে প্রার্থী করা হয়েছিল বামফ্রন্টের তরফে, তাঁর বাড়িতে গিয়ে মহিলা সদস্যের সঙ্গে অভ্যবতা করা, বাড়ির লোকজনকে মারধর করাও শুরু হয়ে যায়। প্রাণভয়ে তিনি পালিয়ে যান। সেই রাতেই কাশীপুর থানার ৫০মিটারের মধ্যে সাতটি বাড়ি ভাঙচুর, ভগবানপুরে বামফ্রন্ট প্রার্থীর বাবা-মাকে মারধর করা হয়।

এরপরেও খোদ আরাবুলের পাড়ারই এক বাসিন্দা এবার নিজেই প্রার্থী হওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেন এবং মনোনয়ন জমা দেন। একেবারে দিনমজুর পরিবারের যুবক। বিডিও অফিস থেকে সেই খবর পেয়ে যায় আরাবুলের টিম। জানতে পারে প্রস্তাবক কে। ৪তারিখ রাতে শুরু হয়ে আবার আক্রমণ। ভাঙড়ের মাছিভাঙা গ্রামের কুড়ি জন সি পি আই( এম) কর্মীকে সে রাতে তুলে নিয়ে আসা হয় আরাবুলের বাড়িতে। চলে বিচারসভা। সেখান থেকে তিনজনকে নিয়ে ওই রাতেই যাওয়া হয় উত্তর ২৪পরগনার আটঘরা এলাকায়, ওখানেই কাজ করতেন আরাবুলের বিরুদ্ধে বামফ্রন্ট প্রার্থী হিসাবে দাঁড়ানো সেই যুবক। চলে তল্লাশি। খোঁজ মেলেনি।

পরের দিন সেই যুবকের দুই ভাইকে তুলে এনে চলে মারধর, যেন তেন ভাবে মনোনয়ন প্রত্যাহার করতেই হবে। স্ত্রীও বাড়ি ছাড়া হয়ে যান। বাবা-মা-স্ত্রী-দাদার ওপর এই অত্যাচার, পরিবারের সদস্যদের খুনের হুমকি দেওয়ার পর আর পারেননি সহ্য করতে। এরপর অজানা আশ্রয় থেকে বেরিয়ে এসে ১০ই জুন বেলা বারোটায় নিজের মনোনয়ন প্রত্যাহার করে নেন সেই যুবক।

বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অবশেষে ‘জয়ী’ হলেন আরাবুল ইসলাম। মঙ্গলবার বিডিও অফিস থেকে শংসাপত্রও গ্রহণ করলেন। তৃণমূলীরা মেতে উঠলো উল্লাসে। বন্দুকের নল, স্ত্রী-ছেলে মেয়ের প্রাণনাশের হুমকির মুখে প্রার্থীপদ প্রত্যাহার করতে বাধ্য হলেন আরও অনেকে। গোটা ঘটনায় পুলিসের ভূমিকার কোন নজির মেলেনি। তাই পুলিসের ভূমিকার কথা উল্লেখও করা গেলো না।

Panchayat Election – An Acid Test for Mamata

June 11, 2013

রাজ্য সরকারকে সতর্ক করার সুযোগ কাজে লাগান

গৌতম দেব

পঞ্চায়েত ভোট নিয়ে মজাদার যুদ্ধ চলছে। নির্বাচন কমিশনকে শ্রীমতী মমতা তার সরকারের হালকা মাপের একটি দপ্তরে পরিণত করেছেন। আর নির্বাচন কমিশনের কাজকর্মের খানিকটা বর্তেছে কোর্টের উপর, বাকিটা মহাশূন্য। এয়ার গ্যাপে পড়লে প্লেনের যে দশা হয় তাই হচ্ছে মাঝে মধ্যে।

মমতার ক্ষমতা থাকলে পঞ্চায়েত, পৌরসভা তুলে দিতেন। এত জায়গায় ক্ষমতার ভাগাভাগি তার না-পসন্দ। মন্ত্রীদের যিনি স্বাধীনভাবে কাজ করতে দেন না তিনি মানসিক দিক থেকে স্বৈরাচারী ডি এন এ-তে আক্রান্ত তা বলাই বাহুল্য। এতো সভা করেন মুখ্যমন্ত্রী। আজ পর্যন্ত একদিনও সময় পেলেন না রাজ্যের ১৮টি জেলার সভাধিপতিদের নিয়ে একটি সভা করার। জেলা পরিষদে বামেদের প্রাধান্য থাকলেও জেলার পর জেলায় সমিতি এবং গ্রাম পঞ্চায়েতে তৃণমূলীদের সংখ্যাধিক্য আছে। তেমন জেলাতেও সমিতির সভাপতি, পঞ্চায়েতের প্রধানদের নিয়ে কোন সভা উনি করেছেন এমন নজির নেই।

বাধ্য হয়ে ভোট করতে হচ্ছে। যদিও কাজের কথাটা হচ্ছে, এখনও উনি সব রকম চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন যাতে ভোটটা শেষ পর্যন্ত বন্ধ হয়ে যায় এবং অফিসাররা পঞ্চায়েত চালায়। অথচ অবান্তর বকে যাচ্ছেন — গত বছর শীতে উনি নাকি ভোট চেয়েছিলেন। উনি বলে বেড়াচ্ছেন — এক বছর আগে পঞ্চায়েত ভোট উনি করতে চেয়েছিলেন। কে ওনাকে বোঝাবে যে, সমস্ত নিয়মকানুন অগ্রাহ্য করে, পাঁচ বছরের জন্য নির্বাচিত পঞ্চায়েতকে চার বছরে শেষ করার উনি কে? কাল যদি প্রধানমন্ত্রী বলেন যে পাঁচ বছরের জন্য নির্বাচিত পশ্চিমবঙ্গ সরকারের ভোট চার বছরের মাথায় করবেন, তাহলে ওনার মাথায় কি বাজ পড়বে না? চারদিকে মারামারি চলছে। আইন-শৃঙ্খলা ভেঙে পড়ছে। তৃণমূলের হাতে আক্রান্ত সব বিরোধী দল।

পঞ্চায়েত ভোটের জন্য প্রচুর পুলিস দরকার। রাজ্যের এবং বাইরের, বিশেষ করে কেন্দ্রীয় বাহিনী। কোন প্রস্তুতি নেই। পুলিস ছাড়া কলেজের ভোটও এখন হচ্ছে না। পঞ্চায়েত নির্বাচনের তো প্রশ্নই ওঠে না। আনন্দের সঙ্গে গর্বভরে রাইটার্সে ঘোষণা করলেন — দিল্লি জানিয়েছে কেন্দ্রীয় বাহিনী দিতে পারবে না, কোন রাজ্য থেকে ফোর্স পাঠানোর চিঠি আসেনি। বিশ্বাস যাতে করে (ওনাকে অবিশ্বাস করে এটা জানেন) তাই কেন্দ্রীয় সরকারের চিঠির ডি ও নাম্বারও জানিয়ে দিলেন। অর্থাৎ আমার হাত পরিষ্কার। এখন যা এই রাজ্যের মধ্য দিয়ে জুটবে তাই দিয়ে ভোট করো। সাথে আছে সবুজ, নীল হরেক রঙের এক হপ্তার ট্রেনিংপ্রাপ্ত পুলিস।

কমিশন, সরকার, আদালত ব্যস্ত শুনানি পালটা শুনানিতে। এদিকে মাঠে-ময়দানে বাইক বাহিনী তার অপারেশন ‘নো ভোট ইন্‌ আদার ওয়ে’ … কার্যকর করতে ঝাঁপিয়ে পড়েছে। হাজার হাজার কেন্দ্রে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অর্থাৎ ‘নো ভোট’ — তৃণমূল জয়ী। অন্য কোন নমিনেশনই জমা পড়েনি। এর পর ‘‘স্বেচ্ছায়’’ প্রত্যাহারের পালা। একটু বন্দুকের নল ছুঁয়ে দেওয়া, গুলি তো চলেনি। বাড়ির টালি চুরমার, এজবেস্টাস্‌ উধাও — দেওয়াল তো আছে। স্ত্রীকে থান পাঠানো হয়েছে; স্বামীকে খুন তো করা হয়নি? ‘‘স্বেচ্ছায়’’ বিরোধী দলগুলির দলে দলে নাম প্রত্যাহারের পর দেখা যাবে হাইকোর্ট বুথপিছু যা পুলিস দিতে বলেছে, কেন্দ্র ও অন্য রাজ্য না দিলেও রাজ্যের পুলিসেই কুলিয়ে যাবে। অঙ্কে মমতার মাথা ভালো।

বাকি থাকলো প্রচার আর পড়ে থাকা আসনগুলিতে ভোট। কেউ জানে না কত মৃত্যু, কত রক্ত এই সময়ে ঝরবে। এত ঝুঁকি নিয়ে, যে পঞ্চায়েত ব্যবস্থায় আস্থা অথবা বিশ্বাস নেই, তার নির্বাচনে ‘‘বিপুল বিজয়’’ কেন মমতার কাছে এত জরুরী? হাওড়ার ভোট হয়ে গেল। জয়টা তৃণমূলীরা উপভোগ করতে পারছে না। কারণ, অন্দরমহলের খবর — আসলে পরাজয় হয়েছে। বালি, উত্তর হাওড়ায় বাইপাস অপারেশন আর বি জে পি’র বদান্যতা বাদ দিলে বাম প্রার্থীর জয় অবধারিত ছিল। মমতা নিজে পাড়ায় পাড়ায় প্রচার করার পরেও। এর আগে হল তিনটে বিধানসভার উপনির্বাচন, দুটোতে শুধু হারল না, তিনজনের মধ্যে তৃতীয় হল! ইংলিশবাজারে কংগ্রেস কৃষ্ণেন্দুর সাথে একজোটে ভোট করে ওকে জিতিয়েছে। মমতা বা তৃণমূলীদের বড় একটা কৃতিত্ব নেই। মমতার জনমোহিনী ক্ষমতা কমছে। এটা মমতা নিজেও তার জনসভাগুলির দিকে তাকালে বুঝতে পারছেন।

এই পটভূমিকায় আসছে দেশের ভোট। অনেকের সঙ্গে মমতারও বিশ্বাস আগামী বছরের মে মাসে না করে হঠাৎ করে এবছরের নভেম্বর/ ডিসেম্বর মাস নাগাদ লোকসভার ভোট কেন্দ্রীয় সরকার ডেকে দিতে পারে। কোটি কোটি টাকার বিজ্ঞাপন গত মাস থেকে দেশের সর্বত্র সব মিডিয়াতে দেওয়া শুরু হয়েছে। একবছর ধরে এই বিপুল সম্ভারের বিজ্ঞাপন কেউ দেয় না। ওতে বিজ্ঞাপনের ভাষায় কাউন্টার প্রোডাক্টিভ্‌ হবে। অর্থাৎ লোকে বিরক্ত হবে। ২/৩ মাস চলে। তার পর Code of conduct. তাই বিজ্ঞাপন চলবে না। কেন্দ্রীয় সরকারের তাড়াহুড়োর অন্যান্য দিকগুলো রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের নজরে পড়ছে, তাই মমতার রক্তচাপ বাড়ছে। বিধানসভার উপনির্বাচন এবং হাওড়ার ভোট সেই রক্তচাপ আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। কি করবে তৃণমূল? কখনও মমতা বলছেন আঞ্চলিক দলগুলিকে এক করব। অর্থাৎ বামদের বাদ দিয়ে তৃতীয় ফ্রন্ট। কেউ কেউ বলছেন মমতা, মায়াবতী, জয়ললিতা এক হয়ে তৃতীয় ফ্রন্টের জন্মের ধাত্রীর কাজ করবেন। কঠিন, প্রায় অসম্ভব রসায়ন। বিস্ফোরকও বটে। ফায়ার ব্রিগেড, অ্যাম্বুলেন্স প্রচুর সংখ্যায় রেডি থাকতে হবে। এই পছন্দ (option) অলীক বুঝে মমতা বাজিয়ে দেখছেন কংগ্রেসের সাথে ‘লিভ টুগেদার’ আবার শুরু করা যায় কিনা।

হঠাৎ সাংবাদিক সম্মেলনে বললেন — মনে রাখবেন হাওড়ায় আমাদের ৪৬; আর কংগ্রেসের ১০, মোট ৫৬ শতাংশ ভোট। এছাড়া ‘শোকাহত’ মমতা হাওড়া ভোটের ক’দিন আগে কংগ্রেসের উদ্দেশ্যে বললেন — জঙ্গীপুর লোকসভায় কংগ্রেস প্রার্থীর বিরুদ্ধে তৃণমূল প্রার্থী দেয় নি, কংগ্রেসের জয় সহজ করে দিয়েছে। অথচ কংগ্রেস হাওড়ায় প্রার্থী দিয়ে দিলো! কিন্তু কংগ্রেস যদি মমতার SOS -এ সাড়া না দেয়? হাওড়ায় মমতার মান বাঁচানো বি জে পি নির্ভরযোগ্য মিত্র। মমতা প্রধানমন্ত্রী, রাহুল সবাইকে ইচ্ছামত গাল পাড়েন, কিন্তু বি জে পি ও তার তারকা নেতা-নেত্রীদের সম্পর্কে টুঁ শব্দটি করেন না; বি জে পি’র শীর্ষ নেতারা মমতাকে সার্টিফিকেট দিয়ে যাচ্ছেন। নতুন একটি তত্ত্ব মমতা তৈরি করছেন। তা হল ‘বাংলার বি জে পি’ সি পি এম-কংগ্রেসের সাথে মিলে এই রাজ্যে ষড়যন্ত্র করছে। অর্থাৎ সর্বভারতীয় ক্ষেত্রে বি জে পি মমতার টার্গেট লিস্টের বাইরে। আর তাছাড়া ভোটের আগে বি জে পি’র বিরুদ্ধে কথা বলে ভোট মিটে যাবার পর বি জে পি-কে ‘শর্তাধীনে’ সমর্থন করলে ভোটারদের আর কি করার আছে? আগেও বি জে পি সরকারে উনি থেকেছেন। তখন যুক্তি ছিল – বাজপেয়ীর সাথে আছি; NDA’র সাথে আছি — বি জে পি’র সাথে নেই। সেরকম একটা গল্প প্রয়োজনে বানিয়ে নেওয়া যাবে।

কিন্তু আসল কথা বাজার দর। বাজার দর পড়ে গেলে সব প্ল্যান ভেস্তে যাবে। বিধানসভার উপনির্বাচন, হাওড়ার নির্বাচন সারা দেশে ভাল সিগন্যাল পাঠায় নি। তাই পঞ্চায়েত ভোট শুধুমাত্র আর একটা ভোট না। ওদের অস্তিত্ব রক্ষার ভোট। যেভাবেই হোক পঞ্চায়েতে বিপুল জয় সুনিশ্চিত করে দিল্লিতে বার্তা পাঠাতে হবে। মমতার সেক্রেটারি জেনারেল মুকুল ঘোষণা করেছেন লোকসভায় ৩২টি আসন পাবে। নরম স্বভাবের মানুষ কংগ্রেসের সভাপতি প্রদীপবাবু জানিয়েছেন কংগ্রেস ১২টা সিট জিতবে। দুই দলে হল ৪৪। আসন ৪২! বামদের জন্য BPL card?

হিসাবমত আরো তিন বছর মমতার সরকার রাইটার্সে থাকবে। ফেলে আসা দুই বছর মমতাকে ভোট দেওয়া মানুষদেরও খুশি করতে পারেনি। দায়সারাভাবে দুই বছর উদ্‌যাপন করল তৃণমূলীরা। একবছর পালনের সঙ্গে গুণগত ও পরিমাণগত পার্থক্য সকলের নজরে পড়েছে। যতগুলো দল মমতার সাথে ছিল তারা প্রায় সবাই ওনাকে ত্যাগ করেছে। জঙ্গলমহলে নতুন করে হিংসার মেঘ আনাগোনা করছে। তৃণমূলের নেতাদের জেড ক্লাসের নিরাপত্তা দিতে হচ্ছে। পাহাড় ছেড়ে গুরুং ডুয়ার্স দখলের জন্য নেমে এসেছে। নিজের দলে মারামারি-খুনোখুনি দ্রুত বাড়ছে। রাইটার্সে মারামারি হওয়াটা শুধু বাকি। অসম্ভব অসত্য ভাষণে পটিয়সী মুখ্যমন্ত্রী। বলেন সাহসের সঙ্গে। মাইনরিটির কোন সমস্যা তার মেটানো বাকি নেই। দুই বছরে ‘১০ লক্ষ ছেলে-মেয়ে চাকরি পেয়ে গেছে’, হাজার হাজার কোটি টাকা শিল্পে বিনিয়োগ হচ্ছে। বোরো চাষ এক-তৃতীয়াংশ জমিতে করা গেল না, অথচ ধান উৎপাদন বেড়ে গেছে।

১০০ দিনের কাজের পয়সা লুট হচ্ছে। অথচ রাজ্য দেশে নাকি প্রথম হয়েছে। সারদা কোন সমস্যাই না। অথচ ওনার তৈরি শ্যামল সেন কমিশনে ৭/৮ লক্ষ আমানতকারীর অভিযোগ জমা পড়েছে। এক নেতা বুক চিতিয়ে ঘোষণা করছেন — খেজুরীতে ভোটটা আমিই করব। আর এক নেতা ভগবানের নামে রাস্তায় ছেড়ে দেওয়া ষাঁড়ের মতো শিং তুলে হুঙ্কার দিচ্ছেন — তৃণমূল ছাড়া কাউকে নমিনেশন জমা দিতে দেবেন না। মন্ত্রী বলছেন — সি পি এমের হয়ে কেউ দাঁড়ালে তাদের বাড়ি গিয়ে এমনভাবে বোঝান যাতে ভোটে দাঁড়াবার ইচ্ছা পরিত্যাগ করেন। এদিকে রাইটার্সে সরকার অচল। দিন যত এগোচ্ছে প্রশাসন এবং পুলিসের উপর সরকারের যে নিয়ন্ত্রণ থাকা দরকার তা দুর্বল হচ্ছে। যত্রতত্র, যাকে তাকে অপমান করা অনেকেরই আত্মসম্মানে খোঁচা দিচ্ছে। ধীরে হলেও।

সব মিলিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে রাজ্য। বাকি তিনবছর মমতা সরকারে মন দিক — এটা আমরা চাই। তাই পঞ্চায়েত নির্বাচনে মানুষ একটা বড় সুযোগ পাচ্ছেন সরকারে রেখেও মমতাকে সতর্ক করে দেওয়ার। এবং প্রধান দায়িত্ব যারা মমতাকে ক্ষমতায় এনেছেন তাদের। মমতার যা টাইপ, জিতলে বুঝবে সব ঠিক হ্যায়। দল, সরকার, নিজের মধ্যে পরিবর্তন আনা জরুরী — সেব্যাপারে ভ্রু‍‌ক্ষেপ করবে না। হারলে হয়তো বা বাধ্য হবে, দলটা দল চালাবার কায়দায় কিছুটা চালাতে। মুকুলের মাধ্যমে যা ইচ্ছা তাই করার আগে পাঁচবার ভাববে। সরকারের মন্ত্রীরা কিছুটা নিজস্ব উদ্যোগ বাড়াতে পারেন। স্বয়ং মমতাকে মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে অনেক পরিবর্তন আনতে হবে। নিজেকে সব কিছুর ঊর্ধ্বে তুলে ধরার প্রবণতা ধাক্কা খাবে। গণতন্ত্রে বিরোধীদের সঙ্গে আলোচনা করতে হয়। অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আছে যেখানে অনায়াসে সরকার-বিরোধীরা একসাথে কথা বলতে পারেন।

মানুষ চায় বামপন্থীদের মধ্যে কিছু পরিবর্তন আসুক। কিছু ব্যাপার সংশোধন করুক। পরপর কয়েকটা ভোটে সেটা স্পষ্ট হয়েছে। বামফ্রন্টে আসন রফার প্রশ্নে যে ঐক্য হয়েছে তা এককথায় অভূতপূর্ব। প্রচুর সংখ্যায় কমবয়সী প্রার্থী দাঁড় করানো হয়েছে। সংশোধনের অযোগ্য নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে; পার্টির মধ্যে লাগাতার প্রচার চলছে। মানুষের সমর্থন পেলে পঞ্চায়েত পরিচালনায় সেই সব পরিবর্তনের বিষয়ে সাধারণ মানুষ অনেকটাই নতুন অভিজ্ঞতা অর্জন করবেন। রাজ্য সরকারে মমতা — পঞ্চায়েতে বামপন্থীরা। সুস্থ প্রতিযোগিতা চলুক। মানুষ উপকৃত হবেন। সরকার ভাল চলছে না পঞ্চায়েত। হোক প্রতিযোগিতা। কে গরিবের পক্ষে বেশি কাজ করছে দেখুক মানুষ। সরকার এবং বিরোধীদের মধ্যে বোঝাপাড়ার একটা বাস্তবতা তৈ‍‌রি হবে। নীতিগত পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও। পশ্চিমবাংলার সচেতন গ্রামবাসীরা নিজেদের স্বার্থে, এমনকি তৃণমূলের সাথে থাকা মানুষও রাজ্যে উন্নয়ন ত্বরান্বিত করতে বামপন্থীদের বিপুল ভোটে বিজয়ী করবেন। এই বিশ্বাস আমাদের আছে।